Saturday, 16 March 2013

রফিক বিন সাইদী ...এক টুকরো স্মৃতি

আমার দাদা শর্ষিনার পীরের মুরিদ ...আর আমাদের এলাকায় শর্ষিনার পীরের আরেকটি ব্রাঞ্চ ছিলো যেটি মৌকারা নামক স্থানে অবস্থিত..ওরা ছিলো আল্লামা সাইদীর বিরুদ্বে ..কিন্তু আমার দাদা শর্ষিনার মুরিদ হলে ও সাইদীর ওয়াজ প্রত্যেক দিন সকালে শুনতেন ....আমি ইসলাম সম্পর্কে তেমন কিছু না জানলে ও তার সম্মোহনী কণ্ঠ আর যুক্তিপুর্ন বক্তব্য আমার ভালো লাগতো.. 

২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাস ...আমি তখন ইউকের স্টুডেন্ট ভিসার জন্য অপেক্ষা করেছিলাম ...ফেব্রুয়ারী মাসের মাঝামাঝি কোনো এক দুপুরে মাইকে আওয়াজ ভেসে এলো .....আগামী ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে এক বিরাট ওয়াজ ও দোয়ার মাহফিল ...স্থান : দায়েমছাতি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ ...যেটি আমার নানার বাড়ির পাশে অবস্থিত ....আর এখানে প্রধান বক্তা থাকবেন রফিক বিন সাইদী ...লোক মুখে শুনলাম উনি নাকি দেলোয়ার হুসাইন সাইদীর বড় ছেলে ...বাপের ওয়াজ তো ভালই লাগে ছেলের ওয়াজ কেমন সেটা দেখতে ওয়াজে যাওয়ার একটু আগ্রহ পেলাম 

ওয়াজের আগের দিনই নানার বাড়িতে চলে গেলাম .....পরের দিন ওয়াজ শুরু হওয়ার আগেই মঞ্চের সামনের খালি স্থানে বসে পড়লাম ....সাইদীর ছেলে দেখতে কেমন হবে , কি রকম বক্তব্য দিবে , এই নিয়ে একটু কৌতহলী ছিলাম ...অবশেষে তিনি মঞ্চে এলেন সন্ধ্যার দিকে .....মায়াবী চেহারাটা দেখে খুব ভালো লাগলো ....এবার ওয়াজ করার পালা ... ওয়াজ চলতে লাগলো , লোকজন বলাবলি করছে , মাসল্লাহ ছেলে তো পিতার চেয়ে কম নয়......পিতার মত উনি ও খুব সুন্দর ওয়াজ করলেন ...ওয়াজের এক জায়গায় উনি বললেন ,এই পৃথিবীর কোনো সিস্টেমই সবসময় কার্যকর থাকে না , শুধু আল্লাহ প্রদত্ত সিস্টেম ছাড়া ..উনি উদাহরণ দিয়েছিলেন এই মহাকাশে কত গ্রহ , সবাই আল্লাহর নির্দেশে চলে , কখনো সুর্য রাত্রে উঠে না , চাদ দিনে উঠে না ....কিন্তু মানুষের তৈরী যে কোনো আইন , সিস্টেম যে কোনো সময় বিপর্যয়ে পড়ে ...উনি লন্ডন আমেরিকার ট্রাফিক সিগনাল ফেইলারের উদাহরন দিলেন ..আসলেই তো এখানে প্রায় সময় সিগনাল ফেইলারের কারণে ট্রেইন আসতে দেরি হয় ...উনি বুঝতে চেয়েছিলেন আল্লাহ প্রদত্ত বিধান ছাড়া মানুষের মুক্তি নাই ...মনে প্রচন্ড ধাক্কা খেলাম ........আসলেই তো আমরা কি তাহলে অন্য বিধান অনুসরণ করে মরিচিকার পিছনে হাটছি না   

তার পর ১৮ই মে ২০০৮ আমি লন্ডনে চলে আসলাম ......দেশ থেকে সেমিস্টার ধরার জন্য তাড়াহুড়া করে আসার কারণে , নামাজ পরার জন্য জায়নামাজ কিনতে ভুলে গিয়েছিলাম ....আসার কয়েকদিন পর ইস্ট লন্ডন মসজিদের সাথে একটি ইসলামিক দোকানে জায়নামাজ কিনতে গিয়ে দেখি সেই মায়াবী চেহারার লোকটি যাকে আমি সেই ২৬ সে ফেব্রুয়ারী দেখেছিলাম .... উনার সাথে কথা বললাম আর স্বরণ করিয়ে দিলাম যে উনি ঐদিন ওয়াজ করতে দায়েমছাতি গিয়েছিলেন ..এই কথা শুনার পর উনি আমাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন....খোজ খবর জিগ্গেস করলেন , কেমন যাচ্ছে বিদেশের নতুন জীবন ....শেষমেষ উনার নাম্বার নিয়ে বিদায় হলাম ........অসম্ভব ভালোলেগেছিল লোকটিকে .... 

তারপর আর কখনো দেখা হয় নি ..কিন্তু প্রযুক্তির কল্যানে ফেসবুকে আবার ও উনার সাথে দেখা ....বিশেষ করে উনার স্টাটাসগুলো খুব ভালো লাগতো ..দিগন্ত টিভির সরল পথ অনুষ্ঠানটি প্রায়ই দেখতাম ...আর উনার মাঝে একজন সত্যিকারের ইসলামিক স্কলারের ছায়া দেখতাম   

আজকে দুপুরে ঘুম থেকে উঠে ব্লগে প্রথম উনার মৃত্যুর খবরটি দেখলাম ..বিশ্বাস করতে পারি নি ...ফেসবুকে ডুকে দেখি একই সংবাদ ..কিচ্ছু ভালো লাগছে না ..সত্যিই মনটা খুব খারাপ ..উনার থেকে অনেক আশা ছিলো ....কিন্তু উনি যে এতো সকাল আমাদের চেয়ে চলে যাবেন তা কি আমরা জানতাম ?জানি উনি আর কোনো দিন ফেসবুকে আর স্টাটাস দিবেন না , করবেন না সরলপথ অনুষ্ঠান ...হয়ত দেখা হবে আমাদের কাঙ্খিত মঞ্জিলে ...তাই আসুন আমরা সকলে উনার জন্য দুয়া করি ..আল্লাহ যেনো উনার সকল ভুল ক্ষমা করে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করেন