Wednesday, 23 October 2013

সৌদি গেজেটের প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারে অনুসন্ধানী সক্ষমতা নেই বাংলাদেশের

মানবজমিন ডেস্ক: আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করার ক্ষেত্রে অনুসন্ধানী সক্ষমতা নেই বাংলাদেশের। এখানে নেই স্বাধীন বিচার বিভাগ। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধে যে আদালতে বিচার হচ্ছে তাতে যে আইন ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে না। সিয়েরা লিয়নে যে স্পেশাল কোর্ট গঠন করা হয়েছিল এবং এমন আরও যেসব আদালত গঠন করা হয়েছিল তার মতোও নয় এটা। এতে পরিষ্কার যে, বাংলাদেশ সরকার নির্যাতিতদের কাছে ন্যায়বিচার দেয়ার লক্ষ্যে এই আদালত গঠন করেনি। তারা এটা করেছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে টার্গেট করে। গতকাল সৌদি আরবে রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র সৌদি গেজেটে প্রকাশিত এক মন্তব্য প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। ‘ইন্টারন্যাশনালাইজিং দ্য ওয়্যার ক্রাইমস ট্রাইবুনাল অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি লিখেছেন ড. আলী আল গামদি। তিনি সৌদি আরবের একজন সাবেক কূটনীতিক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুপরিচিত। তিনি বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে উল্লিখিত প্রতিবেদনে লিখেছেন, এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘের উচিত বাংলাদেশের বিচারকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।

পিলখানায় নিহত ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাদের সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত

২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারী বিডিআর বিদ্রোহে আমরা হারিয়েছি বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর মেধাবী ও চৌকশ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসেও এত সামরিক কর্মকর্তা জীবন দেন নাই। একটি সামরিক বিদ্রোহে কখনো এমন ম্যাসাকার ঘটে না। অত্যন্ত কষ্টের বিষয় এই যে, ঘটনার মাত্র চার বছরেই আমরা আমাদের এই বীর শহীদদের ভুলে যেতে বসেছি। আজ ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে শহীদদের পূর্নাঙ্গ তালিকাটা পর্যন্ত পাওয়া মুশকিল হয়ে গিয়েছিলো। অবশেষেশহীদ কর্নেল মো. মজিবুল হক স্মৃতি পরিষদের  ওয়েব সাইটে সবার তালিকা ও জীবন বৃত্তান্ত মিললো, তাও আবার পিডিএফ ফরমেটে। সেখান থেকে নাম, ছবি ও জীবন বৃত্তান্ত নিয়ে এই নোট প্রকাশ করলাম। 

 ০১/ শহীদ মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ, এনডিসি, পিএসসি ১৯৫৬ সালের ১৮ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৭৬ সালের ৩০ নভেম্বর আর্টিলারি রেজিমেন্টে কমিশন লাভ করেন। চাকরি জীবনে তিনি ১, ২, ৩, ৯ ও ২০ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি; আর্টিলারি সেন্টার অ্যান্ড স্কুল, ৯ আর্টিলারি ব্রিগেড, ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে বিভিন্ন নিযুক্তিতে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া তিনি বিডিআরে সেক্টর কমান্ডার (রংপুর), ৬৬ আর্টিলারি ব্রিগেডে কমান্ডার, সেনাবাহিনী সদর দপ্তরে সামরিক সচিব ও ৬৬ পদাতিক ডিভিশনে জেনারেল অফিসার কমান্ডিং হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ দূতাবাসে সহকারী প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা পদেও নিয়োজিত ছিলেন। সবশেষে তিনি বিডিআরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর স্ত্রী নাজনীন হোসেন শাকিল পিলখানা হত্যাকাণ্ডে শহীদ হয়েছেন। তিনি কন্যা আকীলা রাইদা আহমেদ ও পুত্র রাকীন আহমেদকে রেখে গেছেন।

 ০২/ শহীদ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাকির হোসেন ১৯৫৩ সালের ৩০ জুন রংপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৮১ সালের ২৩ জুন মেডিক্যাল কোরে কমিশন লাভ করেন। তাঁর জ্যেষ্ঠতার তারিখ ২৩ জুন ১৯৭৮, চাকরি জীবনে তিনি রংপুর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল ১০, ১৮, ২১ ও ৩১ ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্স; ১ ইস্ট বেঙ্গল, রংপুর ক্যাডেট কলেজ, আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট, ২৪ পদাতিক ডিভিশন, সেনা সদর সামরিক সচিবের শাখা, মোমেনশাহী সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, ১৯ পদাতিক ডিভিশন ও বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মোজাম্বিকে জাতিসংঘ মিশন এবং রুয়ান্ডায় জাতিসংঘ সহায়তা মিশনে দায়িত্ব পালন করেন।

একান্ত সাক্ষাত্কারে নিহত বিডিআর মহাপরিচালক শাকিল আহমেদের ছেলে : রাজনৈতিক প্রটেকশন ছাড়া পিলখানা হত্যাকাণ্ড সম্ভব ছিল না : হত্যাকাণ্ডের কথা শেখ হাসিনা জানতেন

পিলখনায় ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারির হত্যকাণ্ডে নিহত তত্কালীন বিডিআর প্রধান মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের ছেলে রাকিন আহমেদ বলেছেন, রাজনৈতিক প্রটেকশন ছাড়া পিলখানায় এত বড় ঘটনা ঘটতে পারে না। রাকিন আহমেদ বলেছেন, যারা পিলখানায় সেনাবাহিনীর ৫৭ অফিসার খুন করতে সহযোগিতা করেছে, তারাই খুনিদের পালিয়ে যাওয়ারও সুযোগ করে দিয়েছে।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে আমার দেশ-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাত্কারে রাকিন আহমেদ বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানতেন; তাই তিনি সেদিন পিলখানা যাওয়ার কর্মসূচি বাতিল করেন। প্রধানমন্ত্রী খুনিদের সঙ্গে সমঝোতা করেছেন। তিনি বলেছেন, বিদ্রোহ দমনে সেনাবাহিনী না পাঠানোর কারণ হিসেবে শেখ হাসিনা ও তত্কালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদকে একে অপরকে দায়ী করেছেন।

Tuesday, 22 October 2013

আনিস উজ জামান এর নেতৃত্বে বিডিআর হত্যাকান্ডে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের উল্লেখযোগ্য অংশ। যা প্রমান করে এতে আওয়ামীলীগ জড়িত

পিলখানাস্থ বিডিআর হেডকোয়ার্টার্সে সংঘটিত বিদ্রোহ এবং নৃশংস হত্যাকান্ড তদন্তে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন যা সুস্পস্ট ভাবে প্রমান করে এই হত্যাকান্ডে আওয়ামীলীগ জড়িত।  উল্লেখযোগ্য অংশগুলো দেওয়া হলো।

১) তদন্তের স্বার্থে এ কমিটি কয়েকটি সংস্থার প্রধান, কতিপয় গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার নিকট হতে গোয়েন্দা তথ্যসংগ্রহ করা আবশ্যক বলে মনে করেছে। কিন্তু পর্যাপ্ত সহযোগিতার 
অভাবে একাজগুলো করা সম্ভব হয়নি। ফলশ্র“তিতে, পর্যাপ্ত তথ্য প্রমানসহ এ বিদ্রোহ এবং হত্যাকান্ডের মূল ষড়যন্ত্রকারীদের সনাক্ত করা এবং ঘটনার পেছনের মূল কারণ বা মোটিভ উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি।  কমিটি সংশিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ যেমন এনএসআই, ডিজিএফআই, র‌্যাব, সিআইডি ও পুলিশের এসবিকে তাদের সংগৃহীত বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য ও প্রয়োজনীয় প্রমানাদি পেশাগত দৃষ্টিকোন থেকে বিশে−ষন করে কমিটির নিকট সরবরাহ করার জন্য অনুরোধ করেছিল। কিন্তু বর্ণিত সংস্থাসমূহ হতে ঈপ্সিত সহযোগিতা পাওয়া যায় নি। 
যেহেতু এ কমিটির কাছে সত্য উদঘাটনের জন্য সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করার উপযুক্ত উপকরন, প্রযুক্তি এবং কৌশল ছিল না, তাই জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কমিটির নিকট উপস্থাপিত বা আনীত প্রায় সবাই কোন প্রকার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা প্রমান দেয় নি।  ফলশ্র“তিতে কমিটির নিকট এটা প্রতীয়মান হয়েছে যে, বিডিআর এর বিদ্রোহের ঘটনায় প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী ও পেছনের পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত না করা পর্যন্ত এ ঘটনার পেছনের কারণ ও উদ্দেশ্য বের করা একটি দুরূহ ও সময়-সাপেক্ষ কাজ। 

বিডিআর বিদ্রোহের না জানা গোপন অধ্যায় এবং অন্তরালের খুনি



প্রথমেই বলে নেই, চুলকানী উঠলে এই পোস্ট হতে দূরে থাকবেন। আমার দেশের ৫৭জন অফিসারকে হত্যা করা হয়েছে, এর বিচার আমরা এখনই দাবী করব। কবে বাংলা পরীক্ষা শেষ হবে, ৪২ বছর পর শাহবাগে দল বেঁধে রাজনৈতিক ভরণ পোষণে আন্দোলন করা হবে, সেই আশায় বসে এখন আঙ্গুল চুষবোনা।

অত্যন্ত পরিকল্পিত এই হত্যাযজ্ঞের পিছনে যেমন অনেক ইতিহাস ছিল, তেমনি পরেও তদন্ত,বিচার নিয়ে ঘটা অসংখ্য নাটক লোকচক্ষুর আড়ালেই রয়ে গেছে। সেগুলোই আপনাদের কাছে তুলে ধরবো। আপনারা পড়ুন, জানুন এবং শেয়ার করে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিন।

বিডিআর বিদ্রোহ সেনাহত্যা \ একটি চাপাপড়া রক্তাক্ত বিয়োগান্ত আখ্যান-আজিজুল হক বান্না

ভাষা-শহীদদের মহান আত্মত্যাগ ও স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আজকের লেখা শুরু করছি। ভাষা-আন্দোলনের পথিকৃৎ সংগঠন-তমুদ্দুন মজলিশের জীবিত কুশীলবরা বলেছেন, ভাষা আন্দোলনের মূল লক্ষ্য এখনও অর্জিত হয়নি। ভাষা-আন্দোলনের চেতনাকে যারা স্বাধিকার ও স্বাধীনতার চেতনার সূতিকাগার বলে মনে করেন, তাদের কাছে ভাষা-সংস্কৃতির স্বকীয়তা সংরক্ষণের প্রশ্নটি কখনও গুরুত্ব পায়নি। ভারতীয় বাঙ্গালী হিন্দু জাতীয়তাবাদ, আওয়ামী লীগ নেতা-সাংবাদিক মরহুম আবুল মনসুর আহমদের ভাষায় ‘টাওয়ার বাংলার' সংস্কৃতি মাসে আমাদের ‘আমার বাংলাদেশের ভাষা-সংস্কৃতি-রেওয়াজ-রসমের অনতিক্রম ও অমোছনীয় একটা গভীর ব্যঞ্জনাময় স্বাতন্ত্র্য রয়েছে বলেই ১৯৭১-এর বাঙ্গালীর বিজয় উৎসবের' উচ্ছবাসে যোগ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ-শ্যামাপ্রসাদের খন্ডিত পশ্চিম বাংলা আমাদের সাথে মিশে যেতে এগিয়ে আসেনি।

পিলখানা ট্রাজেডি - বিদ্রোহ না গণহত্যা

পিলখানা ট্রাজেডি - বিদ্রোহ না গণহত্যা
অনিকেত শামীম
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একসঙ্গে এতো সেনা কর্মকর্তা নিহত হওয়ার নজির বিশ্ব ইতিহাসে নেই। আর সেই নজির স্থাপিত হলো ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯। ঘটনার দিন কেউ বুঝতে পারেনি বিডিআর সদর দফতরে এতোবড় ম্যাসাকার হয়ে গেছে। ২৫ ফেব্রুয়ারির পর যতই দিন যাচ্ছে ততই লাশের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘটনার অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ চলছে। বিশ্লেষকরা নানাভাবে বিশ্লেষণের চেষ্টা করছেন, টেলিভিশনের টক শো-তে, বিভিন্ন মিডিয়াতে এ পর্যন্ত প্রায় দু’শজন তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। এ সমস্ত  আলাপ-আলোচনা, বিশ্লেষণ, তর্ক-বিতর্ক,বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়ার কলামগুলো পর্যালোচনা করলে মাত্র কয়েকটি কমন বক্তব্য পাওয়া যায়। তারমধ্যে অন্যতম হচ্ছে- এটি শুধু বিডিয়ার জওয়ানদের বিদ্রোহ নয়, এটি একটি পরিকল্পিত গণহত্যা এবং এ গণহত্যার পিছনে বাইরের ইন্ধন আছে।

পিলখানা হত্যাকান্ড ► কেঁদেছে বাংলাদেশ! অনেক প্রশ্নের জবাব নেই!!

২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি। ৩৬ ঘণ্টার নারকীয় বিডিআর হত্যাযজ্ঞে ঝরে গিয়েছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৫৭ জন চৌকস অফিসারসহ ৭৫টি তাজা প্রাণ। রেহাই পাননি তাদের স্ত্রী-সন্তানরাও।হত্যার আগে তাদের ওপর চালানো হয়েছে নির্যাতন। পানির ট্যাংকি, বাথরুম কিংবা গাড়ির ভেতরে লুকিয়েও প্রাণ রক্ষা করতে পারেননি তারা। শিকারি কুকুরের মত গন্ধ শুঁকে শুঁকে বের করে এনে একে একে হত্যা করা হয় তাদের।
হত্যা সংক্রান্ত  কিছু মারাত্ত্বক প্রশ্ন-১,কেন প্রধানমন্ত্রী ২৬তারিখের ডিনারের অনুষ্ঠানে আসার দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করলেন? তাহলে তিনি কী কিছু জানতেন আগে থেকে ?
২.কেন বিদ্রোহীদের পক্ষথেকে আসা মধ্যস্ততাকারীদের নাম ও পরিচয় রেজিস্ট্রী করা হয়নি যখন তারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে সমঝোতার জন্য এসেছিলেন ?

ব্রেকিং:" বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল 3G " এটিই চরম সত্য বলে আবিস্কার করলেন বাংলাদেশী বিজ্ঞানী



আপনারা হয়তো অনেকেই জানেন ১৯৮০-এর দশকের প্রথম দিকে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের গবেষণার মাধ্যমে থ্রিজি প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটে। প্রায় ১৫ বছরের গবেষণার মাধ্যমে এর মানোন্নয়ন ঘটেছে। এটি জনসাধারণের জন্য অবমুক্ত করা হয় আইএমটি-২০০০ নামে। এত দিন এই তথ্যই ঠিক ছিলো। কিন্তু আজকে আমাদের সাবেক ৪৮ ঘন্টিয় মন্ত্রী ও বর্তমান টেলি-সামাদ থুক্কু টেলিমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল 3G... এর পরেই লাগে যতসব গন্ডগোল। সবাই টেনশনে পড়ে যায় কিভাবে কি করা যায়। সত্যিই কি এটা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল ?

এই টেনশনের পরেই বিস্তারিত জানতেই ব্লগার চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী গবেষনার কাজে নেমে পড়েন । কিভাবে শেখ মুজিবের স্বপ্ন ছিলো এবং আমরা কি আবিস্কার করলাম তা বলবো এখন আপনাদের। Happy Thumbs Up

প্রথমেই আমরা ঢাকা থেকে টুঙ্গিপাড়ায় রওনা দিলাম। গিয়ে শেখ মুজিবের কবর জেয়ারত করলাম। Happy>- Happy>-



তার আগেই প্রধানমন্ত্রীর থেকে সাহারার দাবী প্রমানের জন্য প্রধানমন্ত্রী থেকে শেখ মুজিবের মাথার খুলি কবর থেকে তোলার জন্য অনুমুতি নিলাম। জেয়ারতের পর আল্লামা ফরিদ উদ্দিন মাসুদ ও ইফা ডিজি শামিম আফজালের নেতৃত্বে কবর থেকে মুজিবের মাথার খুলি তোলা হলো। Thumbs Down



খুলি তোলার পর একাত্তর টিভির এক চাটুকার সাংবাদিক পরীক্ষা করছেন শেখ মুজিব কি সত্যিই ৩ জি না ৪ জি দেখেছেন। Thinking

মাথার খুলি তোলার পর আমরা নিয়ে গেলাম এটা গোপালগঞ্জে অবস্থিত জাদুঘরে 



তারপর সেই খুলিকে অত্যন্ত যত্ন সহকারে , যাতে জাতির পিতার সাথে বেয়াদবি না হয় , নিয়ে গেলাম ল্যাবরেটরিতে 



জয়ের ফেসবুক পেইজের মত মুজিবের খুলি ভেরিফাই করতেছেন একজন বিজ্ঞানী। এটি কি সত্যিই মুজিবের খুলি কিনা। ভেরিফাই করে বিজ্ঞানী নিশ্চিত হয়েছেন এটিই মুজিবের খুলি। 

তারপর বিজ্ঞানীরা বসলেন সাহারার দাবিকে প্রমানের জন্য কিভাবে আগানো যায়। বিজ্ঞানী যখন অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে সুক্ষভাবে মুজিবের খুলি দেখলেন , হায় হায় এখানে তো ৩ টা খুলি আবার ৫ টা খুলি । বিজ্ঞানী কিছুটা আশ্চর্য্য হয়ে গেলেন। 



বিজ্ঞানী ভাবলেন ১ টা মাথা দিয়ে যদি ১ জি করে ভাবা যায় তাহলে ৩ মাথা দিয়ে ৩ জির স্বপ্ন দেখতেই পারেন। ৪ জির স্বপ্ন ও দেখতে পারেন। 

আমরা পরে আবার আরেক সূত্র ধরে আগালাম। ৩ শব্দের প্রতি মুজিবের প্রচুর দুর্বলতা রয়েছে। কথিত আছে তিন লক্ষকে উনি ৩০ লক্ষ বলেছেন। পরে বিজ্ঞানীরা মাথার খুলিকে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এই সিদ্বান্তে উপনীত হয়েছেন যে শেখ মুজিব শুধু ৩ জির স্বপ্ন দেখেননি তিনি মিনিমাম ৩০ লক্ষ জির স্বপ্ন দেখেছেন। আবার রিকমেন্ড করেছেন সাহারা খাতুন বা আওয়ামীলীগের নেক্সট টেলি মন্ত্রী যেন কোনো ভাবেই কখনোই কোনো ভাবে ৩০ লক্ষ জি এর উপরে না যায়। Big Grin Big Grin 

এই দিকে এই ধরনের এক্সেপশনাল আবিস্কারের কথা শুনে নোবেল কমিটি ব্লগার চেয়ারম্যান ও তার দলকে নোবেল পুরুস্কার দেওয়ার প্রস্তাব করেন। কিন্তু বিনয়ের সাথে বিজ্ঞানীদল এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে স্বপ্নকন্যার মেয়েকে নোবেল দেওয়ার সুপারিশ করেন Love Struck Winking Winking

(মূলত এটি একটি অলস মস্তিস্কের কল্পনা,বাস্তবতার সাথে না মিললে কেউ চেয়ারম্যানের গমের বস্তা নিয়ে টানাটানি করবেন না )

Monday, 21 October 2013

প্রশাসনের আষ্টেপৃষ্ঠে দলীয়করণ : চাকরিচ্যুতি ওএসডিতে রেকর্ড

মহাজোট সরকারের পাঁচ বছর পার হতে চলেছে। সরকারের পুরো সময়টি কেটেছে দলীয়করণ, ভিন্নমতের কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতি ও বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান, সব যোগ্যতা থাকার পরও দফায় দফায় পদোন্নতিবঞ্চিত করা, শাস্তিমূলক ওএসডি এবং দলীয় লোকদের পুরস্কারস্বরূপ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মধ্য দিয়ে। প্রশাসনকে দলীয়করণের মধ্য দিয়ে চেইন অব কমান্ড পুরোপুরি ভেঙে দেয়া হয়েছে। এমন দলীয়করণের কঠোর সমালোচনা করে প্রশাসনের এক সময়ের শীর্ষ দুই কর্মকর্তা ড. আকবর আলি খান ও এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, এর ফলে প্রশাসন নিরপেক্ষতা হারিয়ে বিতর্কিত হয়ে পড়েছে। এটা দেশের জন্য অমঙ্গল ডেকে আনবে।

চাকরিচ্যুতি ও বাধ্যতামূলক অবসর
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথমে ভিন্নমতের সরকারি কর্মকর্তাদের ওএসডি করে। এরপর শুরু করে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান। কথায় কথায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটছে অহরহ।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, শেখ মুজিব বা শেখ হাসিনার সমালোচনা করার অজুহাতে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের। এমনি একজন হলেন তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আ.ত.ম. ফজলুল করিম। ‘বাগানে ফুটে আছে অসংখ্য গোলাপ’ নামে তার লেখা কবিতার বইয়ে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ইঙ্গিত করে আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করেছেন অভিযোগ এনে ২০০৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ফজলুল করিমকে (আবু করিম) বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
সম্প্রতি অবসর দেয়া হয়েছে গত সাড়ে চার বছর ওএসডিতে থাকা যুগ্ম সচিব ড. আবদুল মোমেনকে। তার আগে অবসর দেয়া হয় অতিরিক্ত সচিব নাসিমুল গনি ও যুগ্ম সচিব শফিক উল্লাহকে। গণকর্মচারী অবসর আইন ১৯৪৭ ধারার ক্ষমতাবলে চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার অজুহাতে সরকার প্রজাতন্ত্রের চৌকস এসব কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।
অতিরিক্ত সচিব নাসিমুল গনিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয় গত ২৯ মে। ওই রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে এ আদেশ জারি করা হয়। গণকর্মচারী (অবসর) আইন ১৯৭৪-এর ৯(২) ধারা অনুযায়ী তাকে এ অবসর দেয়া হয়। প্রজ্ঞাপন জারির দিনে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে রাত ৮টায় আদেশটি জারি করা হয়। গণকর্মচারী (অবসর) আইন ১৯৭৪-এর ৯(২) ধারায় বলা আছে, চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর সরকার চাইলে জনস্বার্থে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই যে কোনো কর্মচারীকে চাকরি থেকে অবসর দিতে পারবে। প্রশাসন ক্যাডারের এ কর্মকর্তা সাবেক চারদলীয় জোট সরকারের সময় স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের একান্ত সচিব ছিলেন। স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার বিদায় নেয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এ পদে কর্মরত ছিলেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তাকে ওএসডি করা হয়। এরপর তাকে আর কোনো পোস্টিং দেয়া হয়নি। ২০১৬ সালের ৭ মার্চ তার স্বাভাবিক অবসরে যাওয়ার কথা ছিল।
নাসিমুল গনিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর তিন দিনের মাথায় গত ১ মে যুগ্ম সচিব মো. শফিউল্লাহর ভাগ্যেও একই পরিণতি ঘটে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে রোববার রাতে তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, চাকরি থেকে বিদায় দেয়ার আদেশ জারির আগ পর্যন্ত শফিউল্লাহ একটানা সাড়ে চার বছর ওএসডি ছিলেন। তাকে ২০০৯ সালের ২১ জানুয়ারি ওএসডি করার পর আর কোনো পোস্টিং দেয়া হয়নি। প্রশাসন ক্যাডারের ৮২ ব্যাচের (গ্রুপ-৭৭) এ কর্মকর্তার নিজ জেলা নরসিংদী। তিনি চাকরিতে যোগ দেন ১৯৮৪ সালের ১ নভেম্বর। চাকরির মেয়াদ ছিল ২০১৭ সালের ২৯ জুন পর্যন্ত। কিন্তু চার বছর বাকি থাকতেই তাকে অবসর দেয়া হয়েছে। তাকেও গণকর্মচারী (অবসর) আইন ১৯৭৪-এর ৯(২) ধারাবলে চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে। ওএসডি হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ২০০৬ সালের ১ জুন থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলেন। এর আগে দুর্নীতি দমন কমিশন ও প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
বাংলাদেশ পুলিশের দুজন উপ-মহাপরিদর্শককে (ডিআইজি) সম্প্রতি বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এরা হলেন একেএম মাহফুজুল হক এবং মাজেদুল হক।
এর মধ্যে মাহফুজুল হককে গত ২০ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে অবসর দেয়া হয়। তাকে ২০০৯ সালের ১৫ মার্চ থেকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে রাখা হয়েছিল। গত ১২ জুন মাজেদুল হককে অবসর দেয়া হয়। এই দুই পুলিশ কর্মকর্তার চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় গণকর্মচারী (অবসর) আইনের ১৯৭৪ অনুসারে অবসর দেয়া হয়। সূত্র জানায়, অবসরপ্রাপ্ত এই দুই কর্মকর্তা বিএনপি সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কর্মরত ছিলেন। এ কারণে তাদের বিএনপির ঘনিষ্ঠ লোক বলে ধরে নেয়া হয়। এর আগে ডিআইজি খান সাঈদ হাসান ও ফারুক আহমেদ, পুলিশ সুপার কোহিনুর মিয়া এবং সহকারী পুলিশ সুপার গিয়াস উদ্দিনকে বিভিন্ন অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হয়।
এছাড়াও সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) খোদা বখশ চৌধুরী, অতিরিক্ত আইজিপি বজলুর রহমান, মিজানুর রহমান এবং ডিআইজি আনিসুর রহমান ওএসডি থাকাবস্থায় অবসরে যান।
এদিকে অতিসম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তিন ক্যাডার কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
অবসরে পাঠানো এই তিন কর্মকর্তা হলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব মারুফ জামান, মহাপরিচালক আশরাফ উদ্দিন এবং মহাপরিচালক মো. হাসিব আজিজ। তারা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে ছিলেন। আদেশে বলা হয়, চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় জনস্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
এর আগে সরকারের ইচ্ছায় চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিতে হয়েছে সাবেক কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়াসহ আরও কয়েকজনকে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর শত শত কর্মচারীর চাকরি গেছে গত সাড়ে চার বছরে। সরকারের রোষানলের শিকার হয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী সমন্বয় পরিষদের মহাসচিব মো. সালেউদ্দিন সেলিমকে চাকরি হারাতে হয়। ক্ষোভে-দুঃখে অসুস্থ হয়ে এক পর্যায়ে তিনি মারা যান। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলায় গত বছরের ৩ জুলাই তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এর আগে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এ ট্রেড ইউনিয়ন নেতাকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর থেকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয় শরীয়তপুর সরকারি কলেজে। সেখানে যোগদানও করেন তিনি। এরপর কিছুদিন ছুটি কাটিয়ে আবার কাজে যোগদান করতে গেলে তাকে আর যোগদান করতে দেয়া হয়নি। বলা হয়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তাকে যোগদানের অনুমতি প্রদানে নিষেধ করা রয়েছে।
জানা যায়, ২০০৩ সালে বিজয় দিবস উপলক্ষে বন মিনিস্ট্রিয়াল কর্মচারী সমিতির একটি সঙ্কলনে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে সম্বোধন করে একটি বাণী দিয়েছিলেন। এটাকে ইস্যু করে শিক্ষা অফিসার মু. আবুল কাসেম ডিজির পক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন মহলে চিঠি দেন। তখন প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে সালেউদ্দিন সেলিমকে চাকরিচ্যুত করার নির্দেশ দেয়া হয়।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগের ওপর ভর করে আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. শাহাব উদ্দিন খানকে ২০০৯ সালের ২৪ আগস্ট চাকরিচ্যুত করা হয়। তার বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অভিযোগ করেন, শেখ মুজিবুর রহমানের ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী ও জাতীয় শোকদিবস উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিতব্য প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে তিনি বাধা প্রদান করেছেন। ২০০৯ সালের ২৩ নভেম্বর সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব আবদুল ওয়াহাব খানকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তদন্ত কমিটি দীর্ঘ তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দেয়, আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. শাহাব উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদফতরের নতুন পরিচালকও জানান, শাহাব উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটি সত্য নয়। অভিযোগের সত্যতা না পেয়ে এক বছর পর আবার তার চাকরি ফিরিয়ে দেয়া হয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমান সরকারের আমলে ৫০ জনেরও বেশি বিসিএস অফিসারকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

মেধাবীরা ওএসডি থেকেই বিদায়
সরকারের রোষানলে পড়ে ওএসডি অবস্থায় বিদায় নিতে হয়েছে অনেক মেধাবী কর্মকর্তাকে। আনুষ্ঠানিক বিদায়ও ভাগ্যে জোটেনি তাদের। এদের মধ্যে অনেকেই আবার বিদায় নিয়েছেন ন্যায্য পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত অবস্থায়। বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে এ পর্যন্ত ১৮৭ জন মেধাবী কর্মকর্তাকে অতি নীরবে চাকরি থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। সরকারি চাকরির বয়সসীমা ২ বছর না বাড়ালে আরও শতাধিক কর্মকর্তাকে ওএসডি অবস্থায় এরই মধ্যে বিদায় নিতে হতো।
শুধু তাই-ই নয়, ওএসডি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কর্মরত কর্মকর্তারা কথা বলতেও সাহস পান না। এলপিআর ভোগরত সরকারের সাবেক এক সচিব সম্প্রতি তার তিন ব্যাচ জুনিয়র এক সচিবের কাছে গিয়েছিলেন তিনি যে সরকারি বাড়িতে থাকছেন, সেখানে আরও দু’মাস বেশি সময় থাকার অনুমতি চাওয়ার জন্য। সরকারের প্রভাবশালী ওই সচিব এক কাপ চা খাইয়ে মিটিংয়ের দোহাই দিয়ে তাকে তড়িঘড়ি বিদায় করে দেন। সপ্তাহখানেক পর আবার ওই সচিবের কাছে ফলোআপ জানতে গেলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, আপনি বিএনপিপন্থী অফিসার, তাই আমার পক্ষে এটা করা সম্ভব নয়। আপনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চেষ্টা করে দেখুন পারমিশন আনতে পারেন কি-না।
ওএসডিতে থাকা এক যুগ্ম সচিব তার ব্যাচেরই এক সহকর্মীর (অতিরিক্ত সচিব) কাছে দেখা করতে গিয়েছিলেন মন্ত্রণালয়ে। ওই অতিরিক্ত সচিব তার সঙ্গে দেখা না করে ফোনে রাতে বাসায় আসার অনুরোধ জানান। সহকর্মীর এমন আচরণে অপমানবোধ করেন ওই ওএসডি কর্মকর্তা।
বিএনপি সরকারের সময় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন জাফর আহমেদ চৌধুরী। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই তাকে ওএসডি করা হয়। প্রায় দু’বছর ওএসডি থাকার পর গত ৩১ ডিসেম্বর এলপিআরে গেছেন তিনি। ৩১ বছরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের ইতি টানতে হলো তাকে একেবারেই নীরবে-নিভৃতে। ১৯৭৯ সালে বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে তিনি জনপ্রশাসনে যোগ দেন। ৩১ বছরের কর্মময় জীবনে অনেক সহকর্মী রয়েছেন তার। কারও কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নিতে পারলেন না তিনি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আবদুল মজিদ এলপিআরে যান ওএসডি অবস্থায়ই। যাওয়ার প্রাক্কালে একরাশ ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি একটি পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাত্কারে বলেন, ‘৩০ বছর সরকারি চাকরি করলাম। কিন্তু আজ বিদায়ের সময় নিজের কোনো অফিস নেই। দীর্ঘ চাকরি জীবনে অনেককে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় দিয়েছি। আজ আমাকে বিদায় জানানোর কেউ নেই। কারও কাছ থেকে যে বিদায় নেব, তেমনও কেউ নেই।’ বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ২০০৯ সালের ৮ এপ্রিল অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। মেধাবী এ অফিসারের আর কোনো সেবাই নিল না সরকার। এক পর্যায়ে ওএসডি অবস্থায়ই সরকারি চাকরিতে তিন দশকের ইতি টানলেন তিনি।
অত্যন্ত মেধাবী ও দক্ষ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন এহসান-উল ফাত্তাহ। ৭৯ ব্যাচের এ কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয় ২০০৯ সালের ১০ ডিসেম্বর। ওএসডি অবস্থায় গত বছরের ১১ জানুয়ারি তিনি এলপিআরে গেছেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার ১২ দিনের মাথায় সচিব আবদুর রশিদ সরকারকে ওএসডি করা হয়। কর্মহীন অবস্থায় বিদায় নিতে হয় তাকেও। সচিব মোমতাজুল ইসলাম, ওয়াহিদুন্নবী চৌধুরী, ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, ইসমাইল হোসাইন, আবদুল হাকিম মণ্ডল, আবদুস সালাম খান, মো. শাহজাহান, আবদুস সবুর, এএমএম নাসির উদ্দিন, শরফুল আলম, মোস্তাক উদ্দিন আহমেদ, নুরুজ্জামান ভূঁইয়া, শাহ আলম, কামাল উদ্দিন আহমেদ, ইলিয়াস আহমেদ, এসএম জহুরুল ইসলাম খান, মোহাম্মদ ইব্রাহিম হোসেন, মনিরুজ্জামান খান, কামরুল হাসান, আবদুস সাত্তার, এটিএম আতাউর রহমান, এটিএম ইসমাইল, সৈয়দ নকীব মুসলিম, অতিরিক্ত সচিব মো. জাহাঙ্গীর, তাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. মাহফুজুল হক, ড. খন্দকার রাশিদুল হক, ফিরোজ কিবরিয়া, একেএম আজিজুল হক, ইসমাইল হোসেন, আবুল কাসেম, খোরশেদ আলম, ফরহাদ খান, ফজলুর রহমান, মোহাম্মদ মুসা, ইকরাম আহমেদ, এসএম শাজাহান আলী, ড. মো. মোস্তফা, আবুল কাশেম, জাহিদ হোসেন, একেএম হেলালুজ্জামান, বদরুল আলম তরফদার, আলীমুশ্বান, আবদুস সাত্তার, ওয়াজেদ আলী খান, হাফিজুল ইসলাম মিয়া এবং আবদুল বারী খানকেও একইভাবে বিদায় নিতে হয়েছে। অতিরিক্ত সচিব হিসেবে যারা বিদায় নিয়েছেন, তাদের সবারই সচিব হিসেবে বিদায় নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের রোষানলে পড়ে এদের সবাই পদোন্নতিবঞ্চিত হন। এতে বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত হয়েছেন।

সরকারি কর্মকমিশনে বেপরোয়া দলীয়করণ
এদিকে সরকারি কর্মকমিশনে (পাবলিক সার্ভিস কমিশন-পিএসসি) চলছে বেপরোয়া দলীয়করণ। বর্তমান মহাজোট সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠজনদের অথবা সরকারদলীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত লোকজনকে পিএসসির চেয়ারম্যান ও সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এতে গতি হারিয়েছে সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটি। পিএসসির বর্তমান চেয়ারম্যান ২০১১ সালের ২৩ নভেম্বর নিয়োগ পান। তিনি বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের সদস্য ছিলেন। ’৯৬ সালে তত্কালীন বিএনপি সরকারবিরোধী জনতার মঞ্চে অংশগ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পিএসসিতে তার বর্তমান আমলে বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। এ কারণে পিএসসি ওই পরীক্ষা স্থগিত করে।
এছাড়া দলীয় বিবেচনায় পিএসসিতে সদস্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়া যুবলীগের আন্তর্জাতিক সম্পাদক ইমরান কবীর চৌধুরীর বাসভবন ভাংচুর করেছে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। অভিযোগ ওঠে, তাদের কাছ থেকে অর্থ নিয়েও নিয়োগ দেননি তিনি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পিএসসিতে পূর্ণ প্যানেলের ১৫ সদস্যের মধ্যে ১৩ জনই সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপির আত্মীয় ও দলীয় অনুগত। এদের মধ্যে পিএসসি সদস্য মোহাম্মদ হোসেন সেরনিয়াবাত আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ও সাবেক চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর চাচাতো ভাই। সদস্য অধ্যাপক এমরান কবির চৌধুরী যুবলীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক। ২০০৯ সালের ১৫ এপ্রিল তিনি যোগদান করেন। সদস্য সৈয়দ হাসিনুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমামের ভাগ্নে। তিনি ২০০৯ সালের ২৯ জুলাই যোগদান করেন। এর আগে তিনি অতিরিক্ত সচিব ছিলেন। সদস্য ইকরাম আহমেদ সংরক্ষিত মহিলা আসনে আওয়ামী লীগ এমপি তারানা হালিমের আত্মীয়। ২০০৯ সালের ২৯ জুলাই তিনি যোগদান করেন। সদস্য অধ্যাপক ডা. ফরিদা আদিব খানম আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের আত্মীয়। তিনিও ২০০৯ সালের ২৯ জুলাই যোগদান করেন। সদস্য মুহম্মদ লিয়াকত আলী খান ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ এবং জনতার মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০০৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর যোগদান করেন তিনি। এর আগে তিনি কারা মহাপরিদর্শক ছিলেন। সদস্য হিসেবে রয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের বোন অধ্যাপিকা রাশিদা বেগম।

বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারি চিঠি
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোকে (ইপিবি) বিরোধী দলমুক্ত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চিঠি দেয়। এতে বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব সাকিউন নাহার বেগম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে ইপিবিতে বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং বিসিএস কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ফেল করেও পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরে ১৪৪ জনের চাকরি
লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়েও পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরে বিভিন্ন পদে ১৪৪ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়। পরীক্ষার ফল জালিয়াতি করে এদের নিয়োগ দেয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মৌখিক পরীক্ষার জন্য তালিকা তৈরির সময় এই জালিয়াতি করা হয়।

বিএসএমএমইউতে রাজনৈতিক আক্রোশে চাকরিচ্যুতি
রাজনৈতিক আক্রোশের শিকার হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ৪৫ শিক্ষক-কর্মকর্তাকে চাকরি হারাতে হয়েছে। নিয়োগ ও পদোন্নতি সংক্রান্ত অনিয়মে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ৪৫ শিক্ষক-কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে চাকরিচ্যুত করে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। চাকরিচ্যুতরা চারদলীয় জোট সরকারের আমলে নিয়োগ পান।
চাকরিচ্যুতদের মধ্যে রয়েছেন—বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরো মেডিসিন বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. জুবায়ের, অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন, সার্জারির অধ্যাপক ডা. শহিদুর রহমান, ডা. নিয়াজ আহমেদ চৌধুরী, ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. শহিদুল আলম খান, রেডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. ইকবাল হোসেন, ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলো-ফেসিয়াল সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মতিউর রহমান মোল্লা, কলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসান ইমাম আল হাদী, ইএনটি বিভাগের ডা. হোসেন ইমাম আল হাদী, চক্ষু বিভাগের ডা. আবদুল কুদ্দুস, অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের ডা. জেরজিনা রহমান, ডা. ইকবাল হোসেন চৌধুরী, ডা. আসিয়া আলী, নেফ্রোলজি বিভাগের ডা. নজরুল ইসলাম, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের ডা. মুজিবুর রহমান ভূঁঁইয়া, সার্জারি বিভাগের ডা. কামরুজ্জামান, ডা. আতিয়ার রহমান, ডা. মহিবুল আজিজ, ডা. আবদুল ওহাব খান, মেডিসিন বিভাগের ডা. শাহিদুল ইসলাম, ইউরোলজি বিভাগের ডা. সাইফুল ইসলাম, চর্ম ও যৌন বিভাগের লে. কর্নেল ডা. আবদুল ওয়াহাব, গাইনি অ্যান্ড অবস্টেট্রিক বিভাগের ডা. নুরুন নাহার খানম, ডেন্টিস্ট্রি বিভাগের ডা. মজিবুর রহমান, প্রস্থোডন্টিকস বিভাগের ডা. আলিয়া সুলতানা ও সহকারী অধ্যাপক চক্ষু বিভাগের ডা. খন্দকার জিয়াউল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক গাইনি বিভাগের ডা. সাঈদা সুলতানা, ডা. হামিদা বেগম, ইএনটির এএফএম একরামুদৌলা, মেডিসিন বিভাগের ডা. আবদুল কাদের, নিউনেটোলজি বিভাগের ডা. খালেদ নূর, পেডিয়াট্রিক বিভাগের ডা. হেলেনা বেগম, পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজি বিভাগের ডা. সালমা জাহান, গাইনি বিভাগের ডা. হুমায়রা আলম ও ডা. রিয়া হুমায়রা।

এছাড়া কর্মকর্তাদের মধ্যে সাময়িক বরখাস্তরা হলেন
উপ-রেজিস্ট্রার ডা. এসএম রফিকুল ইসলাম, ডা. সাইফ উদ্দিন নিসার, সহকারী গ্রন্থাগারিক মার্জিয়া বেগম, সহকারী লাইব্রেরিয়ান সুফিয়া বেগম, উপ-পরিচালক মাসুদ আলম, সহকারী পরিচালক খন্দকার শফিকুল হাসান, সহকারী পরিচালক নাছির উদ্দিন ভূঁইয়া, সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আখতারুজ্জামান, সহকারী পরিচালক বদরুল হুদা, সহকারী রেজিস্ট্রার ফেরদৌসী বেগম ও আশরাফ-উস-সালেহীন।

সংসদ সচিবালয়ে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম
আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে ২১ জনকে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা হিসেবে আত্তীকরণ করে। এবার ক্ষমতায় এসে তাদের পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। আত্তীকৃতদের মধ্যে ১৩ জন প্রথম শ্রেণীর ও আটজন দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে চাকরিপ্রাপ্তদের বঞ্চিত করে এদের পদোন্নতি দেয়ায় সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, ওই ২১ জনকে নিয়োগ দিতে গিয়ে নিয়োগবিধির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। আর পদোন্নতি দিতে নিয়োগবিধিতে সংশোধনী আনা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সরকারের কর্মচারী নন—এমন ব্যক্তিদের স্পিকারের ক্ষমতাবলে নিয়োগ দিয়ে ২০০০ সালের ৯ আগস্ট সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সম্মতি চেয়ে চিঠি দেয়া হয়। ১১ সেপ্টেম্বর সংস্থাপন মন্ত্রণালয় জানায়, সরকারের কর্মচারী নন—এমন ব্যক্তিদের সরকারি প্রতিষ্ঠানে আত্তীকরণের সুযোগ নেই।
প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী, সাবেক স্পিকার আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেট, সাবেক চিফ হুইপ আবদুস শহিদ ও হুইপ মিজানুর রহমানের সহকারী একান্ত সচিবরা (এপিএস) রয়েছেন। এপিএস নিয়োগে ব্যক্তির পছন্দই গুরুত্ব পায়।
সূত্র জানায়, অমলেন্দু সিংহ হুইপ আবদুস শহিদের এপিএস ছিলেন। তাকে লেজিসলেটিভ ড্রাফটসম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এর আগে তিনি সমাজসেবা অধিদফতরের একটি প্রকল্পে অনিয়মিত কর্মকর্তা হিসেবে সুনামগঞ্জে কর্মরত ছিলেন। এবার পদোন্নতি পেয়ে তিনি সিনিয়র লেজিসলেটিভ ড্রাফটসম্যান হয়েছেন। সামিয়া হোসাইন সাবেক স্পিকারের এপিএস-২ ছিলেন। তিনি সহকারী সচিব পদে নিয়োগ পান। পদোন্নতির পর সিনিয়র সহকারী সচিব হয়েছেন। সিরাজুল ইসলাম বাদশা স্পিকারের এপিএস-১ ছিলেন। সেখান থেকে কমিটি কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। এখন তিনি সিনিয়র কমিটি কর্মকর্তা। চৌধুরী আশরাফ আলী স্পিকারের এপিএস-২ ছিলেন। তিনি নিয়োগ পান গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে। আবদুল হাই সাবেক স্পিকার আবদুল হামিদের ভাই ও আগের আমলে তার এপিএস ছিলেন। সেখান থেকে তাকে সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ দেয়া হয়। এখন তিনি উপ-পরিচালক হয়েছেন। সাবেক হুইপ মিজানুর রহমানের এপিএস এমএ মাসুম প্রটোকল কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। পদোন্নতি পেয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব হয়েছেন তিনি। মালেকা পারভীন সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর এপিএস থেকে কম্পিউটার প্রোগ্রামার পদে নিয়োগ পান। অগ্রণী ব্যাংকের জুনিয়র কর্মকর্তা একেএম জি কিবরিয়া মজুমদার সংযুক্তির মাধ্যমে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির সভাপতির একান্ত সচিব (পিএস) হন। আত্তীকরণ করে তাকে কমিটি কর্মকর্তা করা হয়। এখন তিনি সিনিয়র কমিটি কর্মকর্তা হয়েছেন।

দলবাজদের দৌরাত্ম্যে প্রশাসন তছনছ
মহাজোট সরকারের চার বছরে নিস্পিষ্ট হতে হয়েছে জনপ্রশাসনের বেশিরভাগ কর্মকর্তাকে। তবে দলবাজ কর্মকর্তাদের ছিল পোয়াবারো। একটানা পাঁচ বছর শাস্তিমূলক ওএসডি রাখা যেমন হয়েছে, তেমনি দেড় বছরের মাথায় সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে সচিব পদোন্নতি পাওয়ার মতো তুঘলকি কাণ্ডও ঘটেছে। ব্যাচের সবচেয়ে মেধাবী অফিসারটি পদোন্নতিবঞ্চিত হয়ে যখন উপসচিব হিসেবে কাজ করছেন, তখন তার দলবাজ বন্ধুটি অতিরিক্ত সচিব হিসেবে ক্ষমতা এনজয় করছেন। এভাবে একচক্ষু প্রশাসনের কারণে হতাশা ও স্থবিরতা বিরাজ করছে জনপ্রশাসনে।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে দলীয়করণমুক্ত, অরাজনৈতিক ও গণমুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে বলা হয়েছিল—যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা এবং মেধার ভিত্তিতে সব নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা হবে। গত চার বছরে এসব প্রতিশ্রুতির কোনোটিই রক্ষা হয়নি। বরং জনপ্রশাসনের দলীয়করণ ও পদোন্নতিবঞ্চনা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
সরকারের পাঁচ বছরের আলোচিত ছিল প্রশাসনের গতি বাড়াতে সরকারের ঊর্ধ্বতনদের দফায় দফায় তাগাদা, সিনিয়র সচিবের পদ সৃষ্টি, রেকর্ড পদোন্নতি ও সুপারসিডবঞ্চনা, নিয়োগ নিয়ে হাঙ্গামা, কর্মকর্তাদের নতুন সংগঠন, সিভিল সার্ভিস আইন বাতিল, সাবেক ৫০ আমলাকে সচিবালয়ে নিষিদ্ধ, ওএসডি ন্যস্ত’র নামে বেতন বন্ধ করে দেয়া এবং মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিদের প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের ঘটনা। এর মধ্যে ২০১০ সালে পাবনায় নিয়োগ নিয়ে হাঙ্গামার ঘটনা সারাদেশে আলোড়ন তোলে।

পদের চেয়ে পদোন্নতি বেশি
পদোন্নতিবঞ্চনা এবং ওএসডি যাতনায় ভুগছেন প্রশাসনের দলনিরপেক্ষ অনেক দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তা। পদের চেয়ে পদোন্নতি বেশি হওয়ায় শত শত দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তা পোস্টিং পাচ্ছেন না। বিএনপি-জামায়াতপন্থী কর্মকর্তারা তো বছরের পর বছর ধরে ওএসডি। সরকারি চাকরি করেও তারা কোনো কাজ করতে পারছেন না। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন হাজার হাজার কর্মকর্তা। এদের মধ্যে অনেকে তৃতীয় ও চতুর্থবারের মতো বঞ্চিত হয়েছেন। দলনিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের ওএসডি করার প্রবণতাও দিন দিন বাড়ছে। ওএসডি এখন ভিন্ন মতাদর্শের কর্মকর্তাদের শাস্তির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভিন্নমতের কারণে এই শাস্তি কার্যক্রম এখন চরম। ওএসডির যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে এরই মধ্যে দুই কর্মকর্তা আত্মহত্যাও করেছেন।

ওএসডি থেকে মুক্তি পেতে দুই কর্মকর্তার আত্মহত্যা
পদোন্নতি বঞ্চনা ও দীর্ঘদিন ওএসডি থাকা যুগ্ম সচিব মো. মনোয়ার হোসেন যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে গত বছরের ১২ জুলাই নিজ বাসায় আত্মহত্যা করেন। তার ছেলে সাজ্জাদ হোসেন জানান, বাবা প্রায় আমাদের বলতেন তাকে অহেতুক ওএসডি করে রাখা হয়েছে। কিন্তু জুনিয়রদের পদোন্নতি দিয়ে করা হচ্ছে সচিব। জুনিয়র হওয়ার পরও তাদের স্যার বলতে হচ্ছে। এটা চরম অপমানের। যুগ্ম সচিব মনোয়ার হোসেন সর্বশেষ ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের পরিচালক ছিলেন। ’৮৩ স্পেশাল ব্যাচের এ কর্মকর্তার ব্যাচমেট ড. খোন্দকার শওকত হোসেন, নজরুল ইসলাম খান ও নিয়াজ উদ্দিন মিয়া এখন সচিব পদে কর্মরত আছেন। তার জুনিয়র অনেক কর্মকর্তাই এখন অতিরিক্ত সচিব। বর্তমান সরকারের আমলে দুই-দুইবার তিনি পদোন্নতি বঞ্চিত হন। বর্তমান সরকারের আমলে গত জানুয়ারিতে তাকে ওএসডি করা হয়। এর আগে ২০১০ সালের ১৬ আগস্ট একই কারণে ডিসিসির কর্মকর্তা শহিদুর রহমান আত্মহননের একই পথ বেছে নেন। তার পারিবারিক সূত্রে বলা হয়, ২০০৮ সালের শেষের দিকে শহিদুর রহমান গুরুতর অসুস্থ হন। কর্তৃপক্ষ তার পাশে এসে না দাঁড়িয়ে তাকে ওএসডি করে। তিনি সুস্থ হলেও ওএসডি আদেশ বলবত্ রাখা হয়। ২২ মাস ধরে তিনি ওএসডি থাকেন। সারাজীবন কাজের মধ্যে থাকায় এ কর্মকর্তা কোনোভাবেই এটা মানতে পারছিলেন না। ঠিকমত খাওয়া-দাওয়া করতেন না। অসংলগ্ন কথা বলতেন। এক রকম মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন তিনি। ১৬ আগস্ট রাতে বনানীর বাসভবনে নিজের লাইসেন্স করা পিস্তলের গুলিতে তিনি আত্মহত্যা করেন।

দীর্ঘ হচ্ছে বঞ্চিতদের তালিকা
বর্তমান সরকারের সময় প্রতিটি পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যাচের মেধাক্রমে প্রথম দিকে থাকা অসংখ্য কর্মকর্তাকে পদোন্নতির তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। পদোন্নতির সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কয়েকশ’ কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করে দীর্ঘ করা হয়েছে বঞ্চিতদের তালিকা। এছাড়া বিগত সময়ে বিভিন্ন জনকে বিভিন্ন পর্যায়ে পদোন্নতি দেয়া হলেও বঞ্চিতরা বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছেন। ফলে বঞ্চিত এসব কর্মকর্তা কোনোভাবেই এটি মেনে নিতে পারছেন না। তাত্ক্ষণিকভাবে তারা সাংবাদিকদের কাছে ক্ষোভের কথাও জানিয়েছেন। তারা দাবি করেন, পদোন্নতির ক্ষেত্রে যেসব দিক বিবেচনা করা হয়, সব দিকে তারা পরিপূর্ণ থাকলেও তাদের অযথা বঞ্চিত করা হয়েছে। মেধাবী কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে যারা দলবাজি করেন, তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেন। আর পদোন্নতির ক্ষেত্রে বঞ্চিত প্রথা প্রশাসনকে দুর্বল করার হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন সাবেক আমলারা। তারা মনে করছেন, প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বঞ্চিত করার প্রথাই প্রশাসনিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়ার অন্যতম কারণ। এতে বঞ্চিতদের মনোবল ভেঙে যায়। তাদের কাজকর্মে দেখা দেয় অনীহা। বেড়ে যায় প্রশাসনে অস্থিরতা। ফলে পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেয়া উচিত বলে তারা মনে করেন।
বর্তমান সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত প্রশাসনে মোট ১ হাজার ৯০৬ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়। এর মধ্যে ৬০ জন সচিব, ২৯৩ জন অতিরিক্ত সচিব, ৬৮৮ জন যুগ্ম সচিব এবং ৮৬৫ জন উপসচিব হিসেবে পদোন্নতি পান।
সরকার দায়িত্ব নেয়ার এক মাসের মধ্যেই ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি সচিব পদে সাতজন পদোন্নতি পান। পছন্দের সাত কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিতে গিয়ে বেশ কয়েকজন মেধাবী অফিসারকে বাদ দেয়া হয়। ওই পদোন্নতির দু’দিন পর ২৭ জানুয়ারি অতিরিক্ত সচিব পদে ৭২ জনকে পদোন্নতি দেয়ার সময়ও অর্ধশতাধিক কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করা হয়। তখনও দলীয়করণের অভিযোগ ওঠে। ২০১১ সালে উপসচিব, যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদে ৫০৩ জনকে পদোন্নতি দিতে গিয়ে ৫৫৩ জনকে বঞ্চিত করা হয়। বঞ্চিত কর্মকর্তারা বেশিরভাগই পদোন্নতির যোগ্য ও মেধা তালিকায় এগিয়ে ছিলেন। একই বছরের অক্টোবরে সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন জনপ্রশাসনের ৪৩ জন কর্মকর্তা। এদের মধ্যে সচিব হন অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের ১২ জন ও অতিরিক্ত সচিব হন যুগ্ম সচিব পর্যায়ের ৩১ জন কর্মকর্তা। এ পদোন্নতিতেও আগের মতোই বঞ্চিত হন বেশকিছু কর্মকর্তা। সর্বশেষ গত বছরের প্রশাসনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল প্রশাসন কাঁপানো পদোন্নতি ও বঞ্চনা। পদ ছাড়াই পদোন্নতি দেয়া হয় অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিব পদে ৬৪৯ কর্মকর্তাকে। পাশাপাশি যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বঞ্চিত করা হয় প্রায় হাজার খানেক কর্মকর্তাকে। এ পদোন্নতিতে ১২৭ জন যুগ্ম সচিবকে অতিরিক্ত সচিব, ২৬৪ জন উপসচিবকে যুগ্ম সচিব এবং ২৫৮ জন সিনিয়র সহকারী সচিবকে উপসচিব করা হয়। এ পদোন্নতিতে সব ধরনের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বঞ্চিত করা হয় ৯০০’র বেশি কর্মকর্তাকে। এদের মধ্যে অনেকে তৃতীয় ও চতুর্থবারের মতো বঞ্চিত হন।
গত মার্চে জনপ্রশাসনে ২০৪ জন কর্মকর্তাকে উপসচিব পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এ দফায় বঞ্চিত করা হয়েছে অর্ধশতাধিক মেধাবী কর্মকর্তাকে। অতিসম্প্রতি যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন ৭২ জন। এর আগে গত ১৮ জুলাই যুগ্ম সচিব পদে ৩৪৫ জনকে পদোন্নতি দেয়া হয়। কিন্তু উদারভাবে বিপুল সংখ্যায় এ পদোন্নতি দিলেও যোগ্য কর্মকর্তাদের অনেকে বাদ পড়ে যান। যাদের অনেকে দলমত-নিরপেক্ষ নিরীহ মেধাবী অফিসার। এ দফায় যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেয়ার সময় দু’শতাধিক কর্মকর্তা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বঞ্চিত হন বলে অভিযোগ ওঠে।

২৪ বছরের সিনিয়র-জুনিয়র একই পদে
সরকারের একচোখা নীতির কারণে জনপ্রশাসনে পদোন্নতিবন্ধ্যাত্ব সৃষ্টি হয়েছে। শুধু সিনিয়র সহকারী সচিব পদে কাজ করছেন ১৬টি ব্যাচের কর্মকর্তারা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ২৪ বছরের সিনিয়র ও জুনিয়র কর্মকর্তারা একই পদে কাজ করছেন। একই ব্যাচের কোনো কোনো কর্মকর্তা যখন সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তখন সিনিয়র সহকারী সচিব পদে কাজ করছেন ওই ব্যাচেরই অনেকে। দলীয় পরিচয় না থাকায় এসব কর্মকর্তা বারবার পদোন্নতিবঞ্চিত হন বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। সিভিল সার্ভিসের ইতিহাসে বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও এমন নজির নেই।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ওএসডির বেহাল চিত্র : জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রশাসন ক্যাডারের প্রায় ৬০০ কর্মকর্তা ওএসডি হয়ে আছেন। তাদের কোনো দফতর নেই, কাজও নেই। অথচ তাদের বেতন-ভাতা বাবদ মাসে রাষ্ট্রের খরচ হচ্ছে প্রায় তিন কোটি টাকা।
এদিকে নিয়মিত কর্মকর্তারা পদ না পেলেও প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক ও সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। পাঁচ বছরে সবসময়ই কম-বেশি ২৫০ কর্মকর্তা চুক্তিতে ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় ১০০ কর্মকর্তা প্রেষণে ছিলেন।

পদের চেয়ে কর্মকর্তা দ্বিগুণ
পদ নেই, তারপরও প্রশাসনে রেকর্ডসংখ্যক পদোন্নতি দেয়ার ফলে নানামুখী সঙ্কট তৈরি হয়েছে। পদ খালি না থাকায় পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা উন্নীত পদে পোস্টিং পাচ্ছেন না। এর ফলে তাদের পদোন্নতি-পূর্ব ক্ষেত্রে (এক ধাপ নিচের পদ) কাজ করতে হচ্ছে।

সরকারি চাকরি নিয়ে দুর্নীতির মহোত্সব
মহাজোট সরকারের শেষ সময়ে সরকারি অফিসে জনবল নিয়োগে ধুম পড়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় প্রথম হয়েও চাকরি মিলছে না—এমনও অভিযোগ রয়েছে। দলীয় পরিচয় অথবা অর্থ নিয়োগ চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সব নিয়োগের ক্ষেত্রে মন্ত্রী-এমপিদের সুপারিশকেই প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। তাদের সুপারিশ ছাড়া কোনো চাকরি হচ্ছে না বললেই চলে। বর্তমান সরকারের আমলে নিয়োগকে কেন্দ্র করে পাবনায় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মারধরের ঘটনা দেশে সমালোচনার ঝড় তোলে। ওই কর্মকর্তাদের অপরাধ ছিল এমপির নির্দেশ অনুযায়ী তার পছন্দসই চাকরিপ্রার্থীদের নিয়োগ না দেয়া।
ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকার আড়াই লাখ শূন্যপদে নিয়োগের উদ্যোগ নেয়। এরই মধ্যে এসব নিয়োগ প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছে। চাকরিপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, প্রতিটি নিয়োগের ক্ষেত্রে চলছে দলীয়করণ ও আর্থিক বাণিজ্য।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুলিশ বাহিনীতে ৩০ হাজার লোক নিয়োগ দেয়া হয়। এর পুরোটাই নিয়োগ দেয়া হয়েছে দলীয় বিবেচনায়। এমপিদের তালিকার বাইরে থেকে কাউকেই নিয়োগ দেয়া হয়নি। এমপিরা এসপিদের কাছে যে তালিকা দিয়েছেন, তা থেকেই নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়েছেন এসপিরা। শুধু এসপিদের কাছে তালিকা দিয়েই ক্ষান্ত হননি এমপিরা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও দিয়েছেন এ তালিকা। নামমাত্র পরীক্ষা নিয়ে এমপিদের দেয়া তালিকা থেকেই নিয়োগ দেয়া হয়েছে পুলিশ সদস্যপদে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নিয়োগ দেয়া হয় হাজার হাজার লোককে। এর সবই হয়েছে দলীয় বিবেচনায়।
সচিবালয় সূত্র জানায়, গত বছরের জুলাইয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণীর পাঁচটি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিভিন্ন পদে প্রায় সাড়ে পাঁচশ’ চাকরিপ্রার্থী আবেদন করেন। ২৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের ব্যবহারিক পরীক্ষাও নেয়া হয়। মৌখিক পরীক্ষা নেয়ার আগেই ওই নিয়োগ অনিবার্য কারণ দেখিয়ে প্রথমে স্থগিত ও পরে তা বাতিল করা হয়। এর কারণ হিসেবে মন্ত্রণালয়ের নিয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, ওই মন্ত্রণালয়ের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের এক ব্যক্তি ওই পদে দুইপ্র্রার্থীকে নেয়ার সুপারিশ করেন। তাদের দু’জনেরই বাড়ি ওই ব্যক্তির নিজ জেলা খুলনায়। কিন্তু খুলনা জেলায় কোনো কোটা না থাকায় তারা পিরোজপুর জেলার নাগরিক হিসেবে আবেদন করেন। ঊর্ধ্বতন কর্তার সুপারিশ অনুযায়ী তাদের লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেয়া হয়। লিখিত পরীক্ষায় তারা অকৃতকার্য হলে তাদের কৃতকার্য দেখিয়ে ব্যবহারিক পরীক্ষা নেয়ার নির্দেশ দেন ওই ব্যক্তি। এটি কোনোভাবে সম্ভব নয় বলে তাকে জানিয়ে দেয়া হলে তিনি পরীক্ষা স্থগিত করে দেন। ফলে ব্যবহারিক পরীক্ষা চলাকালে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
একইভাবে বস্ত্র অধিদফতর, রেল মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোয় কয়েকটি পদে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা হলেও পছন্দসই লোক নিয়োগ দিতে না পারায় পরে তা স্থগিত করা হয়েছে।
সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনে বিভিন্ন কর বিভাগে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণী পদে ২ হাজার ২০০ লোককে তড়িঘড়ি করে নিয়োগ দিয়ে বিতর্কের জন্ম দেয়া হয়েছে। যেদিন লিখিত পরীক্ষা হয়েছে, তার পর দিন মৌখিক পরীক্ষা নিয়েই চূড়ান্ত ফল দেয়া হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় একটি পদের বিপরীতে শত শত প্রার্থী অংশগ্রহণ করলে কীভাবে মাত্র একদিনে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হলো, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। চূড়ান্ত ফলে দেখা গেছে, লিখিত পরীক্ষায় প্রথম হয়েও তার নাম স্থান পায়নি ওই তালিকায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষার ফলে নাম না থাকলেও চূড়ান্ত ফলাফলে নাম আসার মতো ঘটনাও ঘটেছে বিভিন্ন কর অঞ্চলের কয়েকটি পদের ক্ষেত্রে।
এ প্রসঙ্গে কর বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, বিভিন্ন কর অঞ্চলে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণী পদে যে পরীক্ষা নেয়া হয়, তা লোক দেখানো। চাকরি যাদের দেয়া হবে, তাদের তালিকা আগেই তৈরি করা হয়। নিয়ম রক্ষায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে ওই তালিকাই টানিয়ে দেয়া হয়েছে।

সীমাহীন দলীয়করণে গতিহীন প্রশাসন
সীমাহীন দলীয়করণে গতিহীন হয়ে পড়েছে প্রশাসন। এ নিয়ে শুধু আমলাদের মধ্যেই নয়, সুশীল সমাজেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে কঠোর সমালোচনা হলেও সরকারের কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়নি। আন্তর্জাতিক জনপ্রশাসন দিবস উপলক্ষে বিবিসির সঙ্গে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক দুই উপদেষ্টা ও এক সময়ের প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা ড. আকবর আলি খান ও এম হাফিজউদ্দিন খান প্রশাসনে দলীয়করণের কঠোর সমালোচনা করেন। সরকারের সাবেক এ শীর্ষ কর্মকর্তাদ্বয় বিবিসিকে বলেন, বাংলাদেশের প্রশাসনের সব ক্ষেত্রেই এখন রাজনীতিকরণ হয়েছে। প্রশাসনের এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে দলীয়করণ হচ্ছে না। নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি এমনকি চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও দলীয়করণ হচ্ছে। এক কথায় প্রশাসন এখন সম্পূর্ণরূপে দলীয়করণ করা হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর প্রেসিডেন্ট সাবেক সচিব এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, আমি মনে করি বাংলাদেশের প্রশাসনের সব ক্ষেত্রেই রাজনীতিকীকরণ হয়েছে। এখন প্রশাসন সম্পূর্ণরূপে দলীয়করণ করা হয়ে গেছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক মাত্রায় প্রশাসনে দলীয়করণ শুরু করে। পরের মেয়াদে বিএনপি ক্ষমতায় এসে এই দলীয়করণ আরও বাড়িয়ে দেয়। আওয়ামী লীগের বর্তমান শাসনামলে দলীয়করণ সীমাহীন বেড়ে গেছে। এ দলীয়করণ যেমন সিভিল প্রশাসন, পুলিশ, জুডিশিয়ারির ক্ষেত্রে হচ্ছে, এমনকি ডাক্তারদের ব্যাপারেও হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের নিয়োগ থেকে শুরু করে এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে দলীয়করণ হয়নি।
সাবেক কেবিনেট সেক্রেটারি ড. আকবর আলি খান বলেন, প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় এখন রাজনীতি ছড়িয়ে পড়েছে। জনপ্রশাসনে রাজনীতিকীকরণের ক্ষেত্রে নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন এমনকি চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও রাজনীতিকরণ হচ্ছে। এতে জনগণের কাছে সরকারি কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। প্রশাসন দলীয়করণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ক্ষতিকর যে দিকটি, তা নিয়োগের ক্ষেত্রে। দলীয় লোক একচ্ছত্রভাবে নিয়োগ হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের যে আত্মসম্মানবোধ ছিল অর্থাত্ তারা বলতেন, আমি কারও দয়ায় নয়,প্র্রতিযোগিতা করে এখানে এসেছি। এটা অনেকাংশে ম্লান হয়ে গেছে। আর অন্যদিকে জনসাধারণের কাছে তাদের সে ভাবমূর্তিটা আর আগের মতো নেই।
তিনি আরও বলেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) ভাবমূর্তিতে ধস নেমেছে। পিএসসিকে এখন সম্পূর্ণ রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে। বিশেষ করে ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের পিএসসিতে নিয়োগ দেয়ায় পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। তিনি এ পরিস্থিতির উন্নয়নে পিএসসির চেয়ারম্যান ও কমিশনের সদস্যসহ কর্মকর্তা পদে শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়ার পরামর্শ দেন।

কে এই এডিসি মেহেদী হাসান?

দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নজিরবিহীন তাণ্ডব চালানোর অভিযানে নেতৃত্বদানকারী কে এই এডিসি মেহেদী হাসান? সোমবার টেলিভিশনে তার এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ দেখে দেশের মানুষ হতবাক। বার বার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা দেশের জনপ্রিয় দল বিএনপিকে তিনি একাই যেন শেষ করে দিতে চান। এ দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা, বিরোধী দলের চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যে বেয়াদবি এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছেন মেহেদী হাসান, তাতে কর্তব্যরত সাংবাদিকরাও স্তম্ভিত হয়ে গেছেন। শুধু বিএনপিই নয়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অনেক নেতাও তার বাড়াবাড়িকে ভালো চোখে দেখেননি। আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, এভাবে দলীয় কার্যালয়ে ঢুকে নেতাদের আটক করা প্রত্যাশিত নয়।
মেহেদী হাসান সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। খোদ পুলিশ বাহিনীতেই মূর্তিমান আতঙ্ক মেহেদী হাসান। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মতিঝিল অঞ্চলের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার তিনি। পদের দিক থেকে তিনি অতিরিক্ত এসপি। পুলিশ বাহিনীতে এটি ছোট পদ হলেও ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছেন আইজিপিকেও ছাড়িয়ে। তার দাপটে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারাও থাকেন তটস্থ। হামলা, নির্যাতন, ধরপাকড়, রিমান্ডে নির্যাতন, গ্রেফতার—এসবের মাধ্যমে এরই মধ্যে মেহেদী হাসান অতিউত্সাহী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।
মেহেদী হাসানের বাবার নাম মো. আবদুল মজিদ। বাড়ি খুলনা জেলার তেরখাদা উপজেলার পানতিতা গ্রামে। সরকারি চাকরিজীবী আবদুল মজিদের ৮ ছেলের মধ্যে তৃতীয় মেহেদী হাসান। তার বড় ভাই মারুফ হাসান পুলিশ কর্মকর্তা। অপর ভাইদের মধ্যে একজন সেনাবাহিনীতে, অন্যরাও প্রতিষ্ঠিত। কট্টর আওয়ামী পরিবারের সন্তান মেদেহী হাসানকে পুলিশ বাহিনীতে সবাই জানেন বর্ণচোরা, অতিউত্সাহী ও বেপরোয়া পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে। তার এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, মেহেদী হাসান ও তার ভাইয়েরা এখন গ্রামের বাড়িতে যান না। এর নেপথ্য কারণ তার মায়ের মৃত্যুর পর বাবা আবদুল মজিদ গৃহকর্মীকে বিয়ে করেন। এ নিয়ে মেহেদী হাসানের ভাইয়েরা বাবার সঙ্গে সম্পর্ক অনেকটাই ছিন্ন করেছেন। মেহেদী হাসানের ঘনিষ্ঠ একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ছাত্রজীবনে মেহেদী হাসান ছিলেন ছাত্রলীগ ক্যাডার। সে সুবাদে শেখ হেলাল এমপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে তার। সে সুযোগে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের আঙুলের ইশারায় ঘোরাচ্ছেন এই মেহেদী হাসান।
বিগত এক বছর ধরে বাড়াবাড়ি করে বেশ বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন এই মেহেদী হাসান। বিরোধী দলের মিছিল-মিটিংয়ে গুলি, হামলা, রায়টকার নিয়ে হামলায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। পুলিশের আইন অনুযায়ী নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই নজিরবিহীন সব অ্যাকশনে যাচ্ছেন তিনি। জামায়াত-শিবিরসহ যেখানে বিরোধী দলের মিছিল, সেখানেই হামলা করতে উপস্থিত হচ্ছেন এই মেহেদী হাসান। গত ২২ ফেব্রুয়ারি বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে এডিসি মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে হামলা, গুলি চালানো হয় আলেমদের মিছিলে। রাসুল (সা.) ও ইসলাম অবমাননার প্রতিবাদে ওইদিন বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেন দেশের প্রখ্যাত আলেমরা। জুমার নামাজের পর মিছিল শুরু হওয়া মাত্রই মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে হাজার হাজার রাউন্ড গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল নিক্ষেপ, রায়টকারের গুলি চালানোর অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন এই মেহেদী হাসান।
৬ মার্চ নয়াপল্টনে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল পণ্ড করার জন্য নজিরবিহীন অ্যাকশন চালান মেহেদী হাসান। তার নেতৃত্বে হামলা চালানো হয়েছিল বিএনপির জনসভার প্যান্ডেলে। ওইদিন মেহেদী হাসানের নির্দেশে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা নজরুল ইসলাম খান, আমানউল্লাহ আমান, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবদুস সালামসহ শত শত নেতাকর্মী। ওইদিন মেহেদী হাসানের অন্যায় নির্দেশমত গুলি না করায় তাত্ক্ষণিক প্রত্যাহার করা হয়েছিল দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল আরও ক’জনের বিরুদ্ধে।
গত শুক্রবার বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে ওলামা-মাশায়েখদের বিক্ষোভ মিছিল ছিল। ওইদিন মেহেদী হাসান পুরানা পল্টনের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হামলা করেন। তিনি পুরানা পল্টনে ‘ঠিকানা’ নামে একটি ভবনের ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে গিয়ে তল্লাশি চালান। সেই তল্লাশির সময় এক যুবককে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
পরে জানা গেছে, নিহত ওই ব্যক্তি শিবির নেতা ফয়জুল্লাহ। ওই হামলাতেও নেতৃত্ব দিয়েছেন মেহেদী হাসান। ওই সময় তিনি উচ্চকণ্ঠে অভিযানের বিষয়ে সাংবাদিকের বলেছেন। ঠিকানা নামের ওই ভবন থেকে বেশ কিছু শিয়া মুসলমানকেও গ্রেফতার করেন মেহেদী হাসান, যাদের কেউই জামায়াত-শিবির বা অন্য কোনো ইসলামি দলের সদস্য ছিলেন না। শুধু হয়রানি ও অর্থ আদায়ের জন্যই সেটি করা হয়েছিল বলে ওই ভবনের বাসিন্দারা জানান।
মেহেদী হাসান ঔদ্ধত্যের সীমা ছাড়িয়ে যান গত সোমবার রাতে—বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ভাংচুর ও টানা আড়াই ঘণ্টা অভিযান চালিয়েছেন তিনি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর, ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা, কেন্দ্রীয় নেতা রুহুল কবির রিজভীসহ উপস্থিত নেতাদের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করেন তিনি। তাদের অনেককেই তিনি তুই-তুকারি সম্বোধন করেন এবং লাঞ্ছিত করেন মহিলা নেতাকর্মীদের। সারাদেশের মানুষ ওই দৃশ্য টেলিভিশনে সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন। বিএনপি অফিস থেকে এ সময় গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রসহ কাউন্সিলের কয়েক লাখ টাকা পুলিশ নিয়ে যায়।
পুলিশ কর্মকর্তা মেহেদী হাসান এর আগে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছেন। রায়ট কার থেকে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি ও বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে গুলি করার নেপথ্যেও ছিলেন এই মেহেদী হাসান।
এর আগেও মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানোর অভিযোগ করেছিলেন গ্রেফতারকৃত জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। ডিবি পুলিশের কার্যালয়ে বেশ কয়েকজন জামায়াত নেতাকে ব্যাপক নির্যাতন করেছিলেন এই মেহেদী হাসান ও তার সহযোগীরা।
পুলিশ কর্মকর্তা মেহেদী হাসানের অপকর্মের কাহিনী মিছিল-সমাবেশে হামলা আর গুলির মধ্যেই শেষ নয়। তিনি আগে ডিবি পুলিশে ছিলেন। গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ হাসান নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলায় ৯ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। মোহাম্মদ হাসানকে জঙ্গি সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য ডিবি কার্যালয়ের ছোট রুমে নিয়ে পুরুষাঙ্গে ইলেকট্রিক শক দেয়াসহ নানা কায়দায় তার ওপর নির্যাতন চালায় পুলিশ। এ নির্যাতনে তিনি আর কখনও সন্তানের বাবা হতে পারবেন না বলে চিকিত্সক তাকে জানিয়েছে। ওই সময় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এডিসি মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে আবেদন করেও কোনো প্রতিকার পাননি মোহাম্মদ। উল্টো মেহেদী হাসান তাকে আবার গ্রেফতার করে একই ভাবে নির্যাতন করবেন বলে হুমকি দেন। উপায়ন্তর না দেখে তিনি এখনও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। মোহাম্মদ হোসেন আক্ষেপ করে সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশ তার জীবনটা ধ্বংস করে দিয়েছে। নির্যাতনের পাশাপাশি তার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। মোহাম্মদের আফসোস, তিনি কখনও কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং এখনও নন। তার মতো শত শত নিরপরাধ ব্যক্তি এবং বিভিন্ন মামলার আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করতে নানা কায়দায় নির্যাতন করছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মেহেদী হাসানের আরেক ঘনিষ্ঠ সহচর পল্টন থানার ওসি সরোয়ার হোসেন। তাদের কাজ হলো মতিঝিল, ফকিরাপুল, পল্টন এলাকা থেকে হুন্ডি ব্যবসায়ী, আদম ব্যবসায়ী, এমএলএম ব্যবসায়ী ধরে নিয়ে নিয়ে নির্যাতনের মাধ্যমে অর্থ আদায় করা। নিজেদের সাজানো বাদী দিয়ে মামলা করে ওইসব ব্যক্তির কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মেহেদী সিন্ডিকেট। টাকা নেয়ার পরও মামলা দিয়ে এবং রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক নির্যাতন চালানোর কথা জানা গেছে। কিন্তু ফের হয়রানির ভয়ে কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলছে না।
ভুক্তভোগী একাধিক ব্যক্তি জানান, রিমান্ডের আসামিদের কাছে এক আতঙ্কের নাম মেহেদী হাসান। গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে লাখ লাখ টাকা আদায়, টাকার জন্য ক্রসফায়ারে দেয়ার হুমকি, নির্যাতনের কাহিনী ফাঁস করে দিলে আবার গ্রেফতার করে ক্রসফায়ারের হুমকিসহ হেন অপকর্ম নেই এ মেহেদী হাসান সিন্ডিকেট করেনি।
ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা জানান, মেহেদী হাসান গিরায় গিরায় পিটিয়ে নির্যাতন, বাদুড় ধোলাই নির্যাতন, ওয়াটার থেরাপি নির্যাতন, উলঙ্গ করে নির্যাতন, সারাদিন না খাইয়ে রেখে নির্যাতন, বোতল থেরাপি নির্যাতন, ডিম থেরাপি নির্যাতন, ডিস্কো ড্যান্স নির্যাতন, সিলাই নির্যাতন, ঝালমুড়ি নির্যাতন, টানা নির্যাতন, বাতাস নির্যাতন, ইলেকট্রিক শক এসব নির্যাতন করায় মেহেদী অত্যন্ত পারদর্শী। মূলত অর্থ আদায়ের জন্য ব্যবসায়ী ও ভিন্ন মতের লোকজনের ওপর এসব নির্যাতন চালিয়েছেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এসবের মাধ্যমে মেহেদী হাসান যেমন বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন, তেমনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন দলের নিপীড়ক ব্যক্তিদের আস্থাভাজন হয়েছেন। তাকে ডেকে নিয়ে প্রতিনিয়ত বিশেষ স্থান থেকে ইনস্ট্রাকশন দেয়া হচ্ছে, পাশাপাশি তার পারফরম্যান্সের প্রশংসা করা হচ্ছে।
পুলিশ বাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মেহেদী হাসানের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির বিষয়ে বলেন, এসব কালপ্রিট পুলিশ কর্মকর্তাদের কারণে সাধারণ মানুষের কাছে গোটা বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়। মানুষ পুলিশের ওপর আস্থা হারায়। তিনি আরও বলেন, সরকারের উচিত এসব বেপরোয়া ও অতিউত্সাহী কর্মকর্তাদের প্রশ্রয় না দেয়া।
এসব বিষয়ে আমরা কয়েক দফা মেহেদী হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি হরতাল নিয়ে ব্যস্ত আছেন উল্লেখ করে পরে যোগাযোগ করতে বলেন।

Sunday, 20 October 2013

বি ডি আর হত্যাকান্ডের সেই গোপনীয় অধ্যায়গুলো-৪র্থ খন্ড

এই লেখার ১ম-২য়-৩য় খন্ডের পর- এই জঘন্য হত্যাকান্ড যখন চলছিল তখন মীর্জা আজমকে অনবরত বিদ্রোহীদের সাথে সেল ফোনে কথা বলতে শুনা যাচ্ছিল। সে হত্যাকারীদের সুনির্দিষ্ট ভাবে কর্ণেল গুলজারের চোখ তুলে ফেলতে এবং গুড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ জ্ঞাপন করে। কর্ণেল গুলজারকে ঐরুপ বীভৎসভাবে হত্যা করার জন্যে মির্জা আজমের নির্দেশের পিছনে কারন ছিল তার বোনের স্বামীর মৃত্যুর প্রতিশোধ গ্রহণ করা। কর্ণেল গুলজার তখন, র্যাব গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ছিলেন। তার নেতৃত্বে মির্জা আজমের বোনের স্বামী জেএমবির প্রধান আবদুর রহমানকে তার গোপন আসত্দানায় র্যাব অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে এবং পরবর্তীতে তাকে ফাঁসি দেয়া হয়। কর্ণেল গুলজার ইতিহাসে সিলেট আওয়ামী লীগের এক নেতার ভাড়াকরা বাড়ী থেকে আব্দুর রহমানকে গ্রেফতার করে।

এছাড়াও কর্ণেল গুলজার যুবলীগ প্রেসিডেন্ট নানক ও জেনারেল সেক্রেটারী আযমের ব্যক্তিগত আক্রোশের মুখে ছিল উল্লেখ্য যে আওয়ামীলীগ আহুত হরতালের সময় প্রথমবারের মত বাংলাদেশে হরতালে গান পাউডার ব্যবহার করে হোটেল শেরাটনের সনি্নকটে ১১ জন যাত্রীসমেত একটি বিআরটিসি বাস জ্বালিয়ে দেয়ার ঘটনার সাথে নানক ও আযমের সম্পৃক্তির প্রমানাদি কর্ণেল গুলজার প্রতিষ্টা করে। শেখ হাসিনা তখন যুবলীগের এই দুই নেতাকে এই মর্মে নির্দেশ জ্ঞাপন করে যে 'হয় সরকারী ক্ষমতার নিকট বশ্যতা স্বীকার করো; না হলে রাজপথ জনগনের রক্ত রঞ্জিত করে দাও।' ২০০৮ সালে র্যাবের কাছে আটক থাকার সময় শেখ সেলিম বাস জ্বালানোর সে লোমহর্ষক কাহিনী কর্ণেল গুলজারের নিকট ব্যাক্ত করেন এবং ঘটনা্র সাথে নানক ও আযমের সরাসরি সম্পৃক্তির কথা গুলজারকে জানান। শেখ সেলিমের সে স্বীকারোক্তির অডিও টেপ ইউটিউব এ প্রচার করা হয়। গুলজারকে অমন বীভৎস মৃত্যু ঘটানোর মধ্য দিয়ে নানক আযমরা কেবল যে প্রতিশোধই গ্রহন করেছিল তাই নয় তাদের সেই ঔদ্ধত বাংলাদেশে সৎ ও দেশপ্রেমিক লোকদের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি হিসেবেও প্রতিষ্টা লাভ করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর বাড়ীতে বিকেলের দোদুল্যমান বৈঠক যখন চলছিল তখন নানক লাউড স্পীকার এ পীলখানা বিডিআর সদর দফতরের তিন কিলোমিটার এলাকার মধ্যে অবস্থানকারী সকল শহরবাসীকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান নেবার নির্দেশ প্রদান করে। পরে রাতের দিকে বিডিআর সদর দফতরের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়। সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ দরকার ছিল ভাড়াটে ও স্থানীয় হত্যাকারীরা যাতে নিরাপদে সরে যেতে পারে। তোরাব আলী ও তার ছেলে অবৈধ অস্ত্রের ডিলার, সন্ত্রাসী লেদার লিটন এর মাধ্যমে বেসামরিক পোষাক পরিচ্ছেদ সরবরাহ সহ হত্যাকারীদের পালিয়ে যাবার খরচাদি প্রদান করা হয়। উক্ত লিটনকে র্যাব এর আটকাবস্থা থেকে তাপস ও নানকের হসত্দক্ষেপে জানুয়ারী মাসে মুক্ত করা হয়। ঐ দিন রাত ৭টা থেকে ৯টার মধ্যে স্পীড বোট যোগে হত্যাকারীদের বুড়িগঙ্গা নদী পার করিয়ে দেয়া হয়। এই পারাপারে হাজী সেলিমের সহায়তায় তার সিমেন্ট ঘাটকে ব্যবহার করা হয়। হাজী সেলিম এই কাজে পুরোপুরি সমন্বয় সাধনের দ্বায়িত্ব পালন করে। হাজী সেলিমের লোকজন সেই সময় স্থানীয় লোকজনকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। ঢাকার একটি টিভি চ্যানেল ২৫ তারিখ রাত ১টার সংবাদে উক্ত ঘটনার খবর প্রচার করে। সেই রিপোটে ঘটনার কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য তুলে ধরে বলা হয় যে বেশ কিছু স্পীডবোর্টকে তারা আসা যাওয়া করতে দেখেছে; কিন্তু তারা কাছাকাছি যেতে পারেনি যেহেতু কিছু রাজনৈতিক কর্মী তাদেরকে সেদিকে যেতে বাধা দেয়।

হাজী সেলিম ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি সময়ে বেশ কিছু গোলাবারুদ ক্রয় করে যা বিদেশী ভাড়াটে খুনীরা প্রথমে ব্যবহার করে। ঢাকার দৈনিক প্রথম আলোর এক সাংবাদিক এটা জানার পর সে এন এস আইকে এই মর্মে অবহিত করে যে পীলখানায় কোন ধরনের ষড়যন্ত্রের প্রস্তুতি চলছে যার সাথে বিডিআর ও আওয়ামীলীগ রাজনীতিবিদদের কেউ কেউ জড়িত। ষড়যন্ত্রের নীল নকশামত উক্ত সাংবাদিককে এনএসআই থেকে বলা হয় যে তিনি যেন আর কারো সাথে বিষয়টা নিয়ে আলাপ আলোচনা না করেন। বিষয়টির সত্যাসত্য যাচাই বা তদনত্দ না করে এনএসআই গোটা বিষয়টি চাপিয়ে যায়।

পরের দিন সকালে সদর দফতরের কিছু বাসাবাড়ী থেকে উদ্ধার করতে ভাগ্যাহত অফিসারদের পরিবার পরিজনকে জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মীর্জা আযম এই মর্মে সতর্ক করে দেয় যে তারা যেনো কেেেনা অবস্থাতেই সংবাদ মাধ্যমকে কিছু না বলে কেননা তখনও তাদের স্বামীরা বিদ্রোহীদের হাতে আটক আছে। নতুন করে এই ধরনের ভয়-ভীতি আতংক ভাগ্যাহতদের পরিবার পরিজনের মনে ঢুকিয়ে দেয়া এবং তার সাথে কিছু আশার সংমিশ্রন ঘটানোর পিছনে সেই দু'ব্যক্তির লক্ষ্য ছিল।

(১) পীলখানার অভ্যনত্দরে বর্বর হত্যাকান্ডের পাশাপাশি পরিবার পরিজনদের নির্যাতন, ধর্ষন সহ অন্যান্য অপরাধের খবর যেন দেশবাসী খুব সত্বর জানতে না পারে।

(২) এটা নিশ্চিত করা যে সেনা অভিযান যেন না করা হয় এবং মৃতদেহগুলো সরিয়ে ফেলা সহ রক্তপাত ও ধ্বংসযজ্ঞের সকল চিহ্ন মুছে ফেলার জন্যে যেন প্রয়োজনীয় সময় ও সুযোগ পাওয়া যায়।

২৬ তারিখ রাতেও নানকের নির্দেশে পীলখানায় বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। সেই সময় সকল ধরনের প্রমাণাদি নিশ্চিহ্ন করার জন্যে হত্যা করা সেনা অফিসারদের লাশ পুড়িয়ে ফেলা সহ হত্যার প্রমানাদি মুছে ফেলার কাজে বিডিআর এর হিন্দু জওয়ানদের নিয়োজিত করা হয়। বর্তমানে আটকাবস্থাধীন মনোরঞ্জন নামে এক হিন্দু জওয়ান ঐ কাজে জড়িত ছিল।হিন্দু জওয়ানদের এই জন্যই এই কাজে নিয়োগ করা হয় তেমন আশংকায় যে মুসলমান জওয়ানরা লাশ পুরে ফেলার ব্যাপারটা নাও মানতে পারে। এই রাতে সব কিছু ধুয়ে মুছে সাফ করা সহ বাকী বিদ্রোহীরা নিরাপদে সড়ে পড়ে। সব পরিকল্পনা অতি সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করা হয়।

অপরাধ ঢেকে ফেলা দুইদিন পরে তথা ২৭ তারিখে সরকারী সন্ধানকারী দলকে ভিতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়। এ্যাম্বুলেন্সযোগে নিহত ও আহতদের পারাপার করতে দেখা যায়। কিন্তু বিডিআর এর প্রধান প্রবেশ পথ দিয়ে ৩ দিন ধরে অপেৰমান বিডিআর এর নিকট আত্নীয় স্বজনদের কাউকেও প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি কিংবা ভেতর থেকেও কাউকেও বের হতে দেয়া হয়নি। এমন অবস্থা বজায় রাখার মধ্যেও যে অন্য কোন লক্ষ্য লুকায়িত থাকতে পারে এটা শোকাতুর ও হতভাগ্য লোকদের বুঝার কোন উপায় ছিলনা। এটা তাদের নিকট যৌক্তিক বলেই মনে হয়েছে যে ভাগ্যাহত মৃত ব আহতদের যথাযথভাবে সরিয়ে না ফেলা পর্যনত্দ এবং হত্যাকারীদের ধরতে তলস্নাশী অভিযান ও হত্যাকান্ডের প্রমাণাদি সংগ্রহ না হওয়া পর্যনত্দ বধ্যভূমি এলাকায় সাধারনের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ থাকাই শ্রেয়। এতবড় ধ্বংসযজ্ঞের পিছনে যে সরকার ও সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পযর্ায়ের কর্মকর্তা জড়িত এটা কারোর পক্ষে আঁচ করা সম্ভব হয়নি। বরং দেশের বিভিন্ন স্থানে বিডিআর ইউনিট সমুহ বিদ্যমান উত্তেজনার জন্য সাধারন্যে উদ্বিগ্নভাব স্পষ্টতই পরিলক্ষিত হতে পারে।

আসলে সেই সময়ও নিঃসন্দেহ জনগণ এটা বুঝতে পারেনি যে সরকার ও সেনাবাহিনীর উচ্চ মহল যারা এমনিতেই একটা বিশেষ সুবিধাভোগী এবং যারা তাদের সেই অবস্থার সুযোগে জাতির সাথে যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে সেই বিশ্বাসঘাতকতাকে বেমালুম চাপিয়ে রাখার জন্যই ২৭ তারিখও তারা তৎপর থাকে। এই বিশ্বাসঘাতকতার চিহ্ন মুছে ফেলার জন্য প্রয়োজনছিল গোটা ষড়যন্ত্র বাসত্দবায়নের চাইতে আরও নিষ্ঠুর ও ভয়ংকর পদক্ষেপ। একই দিন অর্থাৎ ২৭ শে ফেব্রুয়ারী যখন দ্বিতীয় গণকবর আবিস্কারের মধ্যদিয়ে বিদ্রোহীদের নৃশংস মহা অপরাধের মানচিত্র প্রমানিত হতে শুরু করে তখন নানক ডিজিএফআই এর ডাইরেকটর (সিআইবি) ব্রিগেডিআর জেনারেল মামুন খালেদকে এই মর্মে পরামর্শ দেয় যে প্রচার মাধ্যমকে না জানিয়ে কোন রুপ রাষ্ট্রীয় দাফন অনুষ্ঠান ব্যতিরেকই যেন নিহতদের বিচ্ছিন্ন ও ক্ষতবিক্ষত লাশ অবিলম্বে আত্নীয়স্বজনদের নিকট হসত্দানত্দর করা হয়। নানকের সেই প্রতারনাপূর্ন পরামর্শের কথা সেই সময় উপস্থিত অন্যান্য সেনা কর্মকর্তাদের নজর এড়ায়নি। এমন পরামর্শে ইনি্জিনিয়ারিং কোরের এক অফিসারতো রাগের মাথায় রীতিমত নানককে আক্রমন করতেও সচেষ্ট হয়। অন্য সেনা কর্মকর্তারা তাকে অবশ্য নিবৃত্ত করে। পরিস্থিতি আরও অগি্নশর্মা হয়ে উঠতে পারার আশংকায় নানক দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
অপেক্ষমান বিডিআর এর নতুন ডিজি বিগ্রেডিআর জেনারেল মঈনুল ইসলামও জেনারেল হেড কোয়াটার এ বসে বসে এই ষড়যন্ত্রের বাকী নীল নকশা বাসত্দবায়নে তৎপর হয়ে উঠে। তিনি পীলখানার ঘটনা নিয়ে আলোচনার জন্য সেনাবাহিনীর একদল অফিসারকে একটি বৈঠকে জড় করেন। তিনি তাদেরকে বলেন যে ব্যক্তিগতভাবে তিনি মনে করেন যে পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ও সেনাপ্রধান সম্পূনভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। না হলে সেনাবাহিনীর এত জন অফিসার এমনভাবে নিহত হতোনা।

তিনি তার বক্তব্যের সমর্থনে কিছু কিছু যুক্তি তুলে ধরেন। বৈঠকে উপস্থিত সেনা অফিসাররা যখন তাদের মতামত উপস্থাপন করতে শুরু করে তখন তিনি তাদেরকে তাদের বক্তব্য লিখিতভাবে তার নিকট প্রদানের কথা বলে এই মর্মে আশ্বাস প্রদান করেন যে তিনি তাদের বক্তব্য সেনাবাহিনীর উচ্চ মহলে পেশ করবেন। তিনি সেইসব মতামত অবিকলভাবে তখন সিজিএম পদে কর্মরত লে: জে: আমিনুল করিম এর নিকট দাখিল করে এবং তাদের সাথে সেনাপ্রধানের একটি বৈঠক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা গ্রহনের অনুরোধ জানায়। মঈনুল পরের দিন সেনাকুঞ্জে অনুষ্ঠিত সেনা প্রধানের বৈঠকে সংশ্লিষ্ট অফিসারদেরকে ...........তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের পরামর্শ জ্ঞাপন করে। সেই বৈঠকে অফিসাররা সেনাপ্রধানের মুখের উপর তার কঠোর সমালোচনা করলে বৈঠকে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং এক পর্যায়ে সেনা নিরাপত্তা ইউনিট এর সহায়তায় আতংকগ্রসত্দ সেনাপ্রধান সভা স্থল ত্যাগ করে। সে বৈঠকের পর পরই পূর্ব নির্ধারিত জানাযায় অংশপ্রহনের জন্যে সেনাপ্রধানকে তার পরিচ্ছেদ বদল করতে আসতে হয়। পরিহাসের বিষয় হচ্ছে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষুদ্ধ সেনা অফিসারদের উত্তেজিত করার দায়ে মঈনুল এর বদলে দায়ী করা হয় আমিনুল করিমকে। তাকে অবিলম্বে চাকুরী থেকে বরখাসত্দ করা হয়। একজন সম্মানীয় দেশপ্রেমিককে সেনাবাহিনী থেকে হটিয়ে মঈনুল বিডিআর পুনর্গঠনে তার নির্ধারিত দায়িত্ব পালনে মশগুল হয়ে পড়েন।

সরকারের বিরুদ্ধে সেনা অফিসারদের উস্কিয়ে দেয়ার কল্পিত ষড়যন্ত্রের তদনত্দের সাথে মইনুল করিমকে জড়ানোর পাশাপাশি সেনাবাহিনীর অভ্যনত্দরে সক্রিয় বিদ্রোহের হোতাদের যোগসাজসে সরকার আরও একটি ঘটনাকে সঙ্গোপন করে রাখে। ঘটনাটি ছিল ঐ দিন উপ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সোহেল তাজ পীলখানায় হত্যাযজ্ঞে নিয়োজিত বিদেশী কিলারদের অতি নিরাপদে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়। উল্লেখ্য যে ১৮ই ফেব্রুয়ারী থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারী পর্যনত্দ সোহেলকে তার অফিস কিংবা জনসমুক্ষে দেখা যায়নি। কোন কোন সংবাদ মাধ্যমে এই মর্মে সংবাদ প্রকাশিত হয় যে ২৫ ও ২৬ শে ফেব্রুয়ারী সে তার পরিবারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিল। এটা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যাচার। সে ১৮ই ফেব্রুআরী গোপনে ভারত সফরে যায় এবং দুই বা তিন দিন পর সে ফিরে এসে পরিকল্পনা মোতাবেক ২৫ তারিখ রাতে বিদেশী ভাড়াটে খুনীদের বিমানযোগে নিরাপদে বিদেশে পার করে দেয়ার কাজে সহায়তা করে। ২৮ তারিখ সন্ধায় সেনাবাহিনীর একটি পরিবহন হেলিকপ্টারে করে সোহেল তাজ সিলেট যায় এবং সে রাতেই ওসমানী বিমান বন্দর থেকে একটি বেসামরিক বিমানে সে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়। সেনাবাহিনীর লে: ক: শহীদ সে হেলিকপ্টার চালায় যে কিছুদিন পর নিহত হয়। সে ও ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের মেজর জেনারেল রফিকুল ইসলাম সহ একটি রহস্যময় হেলিকপ্টার দূর্ঘটনায় টাঙ্গাইলের সনি্নকটে তারা নিহত হয়। হেলিকপ্টার বিধসত্দ হওয়ার ঘটনাটি ছিল নাশকতামূলক। সোহেল তাজ এর দুষ্কর্ম গোপন রাখতে নিরাপরাধ শহীদকেই কেবল হত্যা করা হলোনা; সেই সাথে হত্যা করা হলো আরো একজন দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাকে।
পরবর্তীতে ডিজিএফআই এর ব্রিগেডিআর জেনারেল মামুন খালেদকে দায়িত্ব দেয়া হয় সেই সব অফিসারের তালিকা প্রনয়নের জন্য যারা সেনাকুঞ্জের বৈঠকে সেনাপ্রধানের সামনে দাড়ীয়ে অভিযোগ জানানোর সাহস দেখিয়েছিল। এমন ৫০ জন অদ্ভূত অফিসারের তালিকা প্রস্তুত করা হয়; যাদের অনেককে ইতিমধ্যে চাকুরীচ্যুত করা হয়েছে আর বাকীদের ঢাকার বাইরে গুরুত্বহীন পদ সমূহে বদলী করা হয়।

পীলখানা হত্যাযজ্ঞ থেকে যে কয়েকজন নিরাপদে বেরিয়ে আসে তাদের মধ্যে ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে: ক: শামস একজন এবং তাকেই কেবলমাত্র টেলিভিশনে উপস্থাপন করা হয় এবং সাধারন্যে তিনি আকস্মাৎ একজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। মিডিয়া সমুহে তিনি তার ভাই ভাগ্যাহত অফিসারদের হত্যাকান্ড ও তাদের অত্যাচার যন্ত্রনা সম্পর্কে কেবল গীত গেয়েই ক্ষানত্দ হলেন না; তিনি বলে দিলেন যে সকল অফিসারকে ২৫ তারিখ সকাল ১১টার মধ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার চাক্ষুস বর্ণনা প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান কতৃক সেনা হসত্দক্ষেপ ছাড়া বিদ্রোহ দমনের গৃহীত নীতির যৌক্তিকতা নিরুপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ সেনা অফিসাররাতো ১১টার মধ্যেই নিহত হয়ে যায়। অতএব তার পর বিদ্রোহ দমনে সেনাবাহিনী এগিয়ে গেলে আরো কিছু জীবন হানী ও রক্তপাত ছাড়া আর কি হতো? এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সাাঙ্গাতরা বিদ্রোহ মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রীর গৃহিত বুদ্ধিদ্বীপ্ত সিদ্ধানত্দের প্রশংশাস সারা দেশকে মাতোয়ারা করার জজবায় মেতে উঠে। প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান কর্ণেল শামস এর প্রদত্ত ভাষ্যের ঋন খুব দ্রুতই পরিাশোধ করে। তাকে এলিট এস এফ এফ এ বদলী করা হয়।
বিদ্রোহ সম্পর্কে গঠিত সেনা তদনত্দ টীম শুরু থেকেই বিদ্রোহের ভিন্ন চিত্র পেতে শুরম্ন করে। তারা এটা বের করে ফেলে যে পীলখানা বিদ্রোহীদের মূল উৎস কর্ণেল শামস এর ৪৪ ব্যাটালিয়ান এবং উক্ত ব্যাটালিয়ানের কোন কমান্ডিং অফিসারকে তথা কর্ণেল শামস মেজর মাহাবুব এবং মেজর ইসতিয়াক কে হত্যা করা হয়নি।

কিংবা তদের অফিসও অন্যান্য নিহত অফিসারের অফিস এর ন্যায় লন্ড ভন্ড করা হয়নি। তদনত্দে আরও গুরুতর যে তথ্য ফাস হলো তা হচ্ছে মিনিট কয়েক পূর্বে বিডিআর এর ৫ নং গেট এর সনি্নকটে কর্ণেল শামস কে একদল বিডিআর সেনাকে কি যেনো ব্রিফিং করতে দেখা যায়। যখন কেউ একজন চিৎকার দিয়ে উঠে যে অফিসাররা সৈনিক থেকে আলাদা হয়ে যাও তখন সে খুব তাড়াতাড়ি তার ব্রীফিং সমাপ্ত করে দ্রুত সরে পড়ে। ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়ানের গ্রেফতার কৃত বিদ্রোহীদের কেউ কেউ জিজ্ঞাসাবাদে এই মর্মে উল্লেখ করেছে যে বিদ্রোহ পরিকল্পনার ব্যাপারে কর্ণেল শামসকে জিজ্ঞাসা করা হোক। তারা পরিকল্পনার কথা কিছুই জানেনা বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানায়। সেনা তদনত্দ বোর্ড এই ব্যাপারে কর্ণেল শামসকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অনুমতি চাইলে প্রধানমন্ত্রির অফিস সে অনুমতি প্রদানে অসম্মতি জ্ঞাপন করে।
আবার বিডিআর এর যোগাযোগ ইউনিট এর কোন অফিসারও নিহত হয়নি। এর অধিনায়ক কর্ণেল কমরুজ্জামানকেউ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সেনা তদনত্দ বোর্ডের অনুরোধ প্রধানমন্ত্রীর অফিস প্রত্যাখান করে।

সেনা তদনত্দের প্রাথমিক পর্যায়ে র্যাবের নিম্ন পদস্থ অফিসাররা যখন বিদ্রোহের আগে পরের সন্দেহভাজনদের ফোন কল রেকর্ড পরীক্ষা শুরু করে তখন এমন অনেক তথ্য তারা লাভ করে যার মধ্যে বিডিআর হত্যাযজ্ঞের সাথে আওয়ামীলীগ নেতাদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। আওয়ামীলীগ নেতা তোরাব আলী বিদ্রোহের পরিকল্পনা সম্পর্কে বিদেশে কারো সাথে তাদের পরিচয় গোপন করে ব্রিগেডিআর জেনারেল হাসান নাসির এর বেনামে বহু চিঠি অনেক সেনা কর্মকর্তার নিকট প্রেরন করে। এটা অনেকটাই নিশ্চিত যে হাসান নাসিরকে খুব দ্রুতই বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হবে। নিয়মিত যোগাযোগ করতো কিংবা সরকার সাহায্য না করায় বিদেশের সে ফোন ও তার সাথে জড়িত ব্যক্তির পরিচয় ও হদিস বের করা সেনা তদনত্দ বোর্ডের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
এমনিতর ঘটনা সমুহের অন্যতম একটি উল্লেখ্য ঘটনা হচ্ছে ২৪ শে ফেব্রম্নয়ারী ফোনে ডিএ ডি তৌহিদের সাথে নানকের ২০৪ মিনিটের কথোপকোথন। এই কথোপকোথন ও নানকের আরো কিছু দোষনীয় কার্জকর্মের প্রমাণ পওয়া যায় এবং ২৫শে মার্চ রাতে যখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সাহারা খাতুন পীলখানায় অস্ত্র সংবরণ নাটক মঞ্চস্থ করছিল তখন নানক কি করছিল তা জানার জন্য নানককে সেনা তদনত্দ বোর্ড জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করলে নানক তা থেকে বাঁচার জন্যে হটাৎ বুকের ব্যথার ভান করে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তী হয়। এবং দ্রুত সেখান থেকে সিঙ্গাপুর চলে যায়। হত্যাযজ্ঞের দিন কয়েকপর ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব মেনন এক অনির্ধারিত সফরে ঢাকায় আগমন করে এবং জরুরী ভাবে প্রধানমন্ত্রী ও সেনা প্রধানের সাথে গোপন শলা পরামর্শে মিলিত হয়। এদিকে সেনা তদনত্দ বোর্ড ঘটনা তদনত্দে নানকের সাথে কথা বলা দরকার এটা প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হলে তিনি তা সরাসরি প্রত্যাখান করেন। শুধু তাই নয় ব্রিগেডিআর জেনারেল হাসান নাসির যিনি সেনাতদনত্দ বোর্ডের সদস্য ছিল এবং তিনি নানককে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিল বিধায় তাকে সেনা তদনত্দ টীম থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। নানক যখন জানতে পরলো যে তাকে জিজ্ঞাসা বাদ না করার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয়েছে এবং তাকে আইনের উর্দ্ধে রাখা হবে তখনই সে দেশে ফিরে আসে। আর অত্যনত্দ পরিশ্রমী ও দ্বায়িত্ববান অফিসার নাসিরকে প্রতিহিংসার শিকার হতে হলো।

র্যাবের আরেকটি কল রেকর্ড থেকে জানা যায় যে, লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল মুকিম সরকার (সিও ২৫ রাইফেল ব্যাটেলিয়ন, পঞ্চগড়) যিনি পিলখানায় দরবারে যোগ দিয়েছিলেন এবং অক্ষতভাব বেচে গিয়েছিলেন, তাকে ২৫ তারিখ রাত সাড়ে ন'টায় সুবেদার মেজরকে বলতে শোনা গিয়েছিল, " আমাদের নির্দেশ হলো সৈনিকদের যাতে কোন ক্ষতি না হয়। যারা পালিয়ে গেছে তো গেছে-- আপনারা ডিএডি সাহেবকে নিয়ে ভাল থাকেন; আর কোন বাহিনী যাতে ভিতরে ঢুকতে না পারে । ডিএডি সাহেবকে এনাদের সাথে কথা বলতে বলবেন--। " যা ডিএডি তৌহিদকে ভারপ্রাপ্ত ডিজি হিসাবে তাপসের ঘোষণার কিছু পরে হয়েছিল। স্পষ্টভাবেই সরকার এ ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল; তবে সে কোন আদেশ দিয়েছিল? ঘটনা হচ্ছে, লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামস্ ও কামরুজ্জামানের মত লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার অক্ষত ছিল বলে বোঝা যায়।

তাদের প্রাথমিক তদন্তকালে ভাড়াটে বিদেশী খুনীরা যে জাল ইউনিফর্ম পরিধান শেষে ফেলে গিয়েছিল তার প্রস্তুকতকারী দর্জি ও দর্জির দোকান র্যাবের কর্মকর্তারা খুজে পেয়েছিল। সে সকল খুনীদের পিলখানা থেকে পলায়নে ও এয়ারপোর্টে যাবার কাজে ব্যবহৃত এমবুলেন্স ও মাইক্রোবাস সম্পর্কে তারা তথ্য নিতে পারত। মাইক্রেবাসগুলোতে ভূয়া নম্বর প্লেট ছিল এবং সেগুলোর চালক ও মালিকদের খুজে বের করা কঠিন ছিল। তবে নিদেনপক্ষে তারা এ ঘটনা বুঝতে দিয়েছিল যে, আওয়ামী লীগের একজন সহানুভূতিশীল ব্যক্তি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালকে সামাল দিয়েছিল এবং প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসকের মেডিকেল ক্লিনিক থেকে এমবুলেন্স সরবরাহ প্রশ্নসাপেক্ষ ছিল।
পিলখানা হত্যাকান্ডের প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসতে শুরু করলে ডিজি ডিজিএফআইয়ের ফজলে আকবর ব্যক্তিগত ব্রিফিংয়ে ঘটনার সাথে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা বাদ দিয়ে তদন্ত কার্যক্রম চালানোর জন্য তার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দানের কথা জানান। কিছু জুনিয়র কর্মকর্তা গুঞ্জন করতে থাকেন, যারা বিরোধী বলে চিহ্নিত তাদেরকে দু্রত ডিজিএফআই থেকে অন্যত্র সরিয়ে দেয়া হয়; বাকীদের কাছে সংবাদটি অক্ষুণ্ন থাকে। মার্চের শুরু থেকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামুন খালেদের নেতৃত্বে ডিজিএফআই টিম সকল টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্রে কাজ শুরু করেন যাতে অপ্রিয় সত্য বেরিয়ে আসতে না পারে।

র্যাবের লেফটেন্যান্ট কর্নেল মজিদ এবং মেজর হামিদ বিদ্রোহ ও হত্যাকান্ডে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার দৃঢ় প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন। মজিদকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর চাচাতো ভাই শেখ হেলাল এম.পির ঘনিষ্ট আত্মীয় মেজর আজিমকে র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক করা হয়েছিল, একইসাথে হামিদকে র্যাব থেকে বদলী করা হয়েছিল। দায়িত্ব নিয়ে আজিম, যিনি পরবর্তী পদে পদোন্নতি লাভের অযোগ্য বলে বিবেচিত ছিলেন, মেজর আতিককে পিলখানা হত্যাকান্ডের সাথে জেএমবি, বিএনপি অথবা অন্য কোন সামরিক সংস্থার সাথে যোগাযোগ করতে নির্দেশ দেন। তাছাড়া মজিদ ও হামিদের সংগৃহীত সকল অবৈধ রূপে প্রতীয়মাণ আলামত তিনি ধ্বংস করে ফেলেন।

সে সময়ে নানকের উপরস্থ এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম প্রকাশ্যে বিদ্রোহের সাথে জেএমবি বা কোন স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের যোগসাজশের প্রমাণ না পাওয়ার জন্য আর্মি তদন্ত বোর্ডকে তিরস্কার করেন। আজিমের নেতৃত্বে র্যাবের গোয়েন্দা শাখা মোকদ্দমাটি অনুসরণ করতে থাকে। হঠাৎ মাওলানা আব্দুস সোবহানকে নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়ে র্যাবের হেফাজতে রাখা হয়। প্রধানমন্ত্রী যাকে তদন্ত সমন্বয়ের দায়িত্ব দিয়েছিলেন সেই লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবঃ) ফারুক খান দু্রত দাবী করেন যে, বিদ্রোহে কিছু ইসলামী সন্ত্রাসী জড়িত রয়েছে। আজিমের পরিকল্পনা ছিল মাওলানা সোবহানকে চাপ প্রয়োগ করে মিথ্যা জবানবন্দি নেয়া যে, হত্যাকান্ডে ইসলামী জঙ্গীরা জড়িত রয়েছে। সে সময় ঢাকার একটি দৈনিকে তদন্ত প্রতিবেদনে মন্ত্রীর দাবীর বিরুদ্ধে বেশ কিছু তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনটি ছিল যথার্থ; যাতে হত্যাকান্ডে সাথে ইসলামী জঙ্গীর জড়িত থাকার বিষয়টি সরকারকে পরিত্যাগ করতে বলা হয়। তখন আব্দুস সোবহানকে নিরাপত্তা হেফাজত থেকে ছেড়ে দেয়া হয়। কিছুদিন পরে কয়েকজন দলীয় সদস্য নিয়ে সে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে সরকারের সাথে সংহতি প্রকাশের ঘোষণা দেন।

বি ডি আর হত্যাকান্ডের সেই গোপনীয় অধ্যায়গুলো-৩য় খন্ড

১ম খন্ড ও ২য় খন্ডের পর-সমগ্র পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয় অতি বিস্ময়কর চালাকী ও নিষ্ঠুরতার সাথে। বাংলাদেশকে দীর্ঘসময় ধরে এহেন ভ্রাতৃঘাতী ঘটনার বেদনাদায়ক মর্মবেদনায় ভুগতে হবে। আমাদের ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে সর্বসাকুল্যে সেনাবাহিনীর ৫৫ জন অফিসার শহীদ হয়। তাদের মধ্যে সবাই যুদ্ধে নিহত হয়নি; কেউ কেউ সড়ক দূর্ঘটনা সহ অন্যবিধ কারনেও মৃতু্যবরণ করে। সেনা বাহিনীর কোন সেক্টর কমান্ডার এই মৃতু্য তালিকায় ছিল না। অথচ বিডিআর বিদ্রোহে মাত্র দুই দিনের মধ্যে হত্যা করা হলো ২ জন মেজর জেনারেল, ২ জন ব্রিগেডিআর জেনারেল, ১৬ জন কর্ণেল, ১০ জন লেন্ট্যানান্ট কর্ণেল, ২৩ জন মেজর, ২ জন ক্যাপ্টেন, মেডিক্যাল কোরের ৩ জন অফিসার। বিদ্রোহে উপস্থিত সেনা অফিসারদের দুই তৃতীয়াংশই নিহত হলো। এই পৈশাচিক উপখ্যানের সূদুরপ্রসারী পরিণতি নিয়ে ভাববার আগে দেখা যাক বাংলাদেশী ষড়যন্ত্রকারী ও তাদের সাঙ্গাতরা কে কিভাবে এই হত্যাযজ্ঞ সংঘটনে ভূমিকা রেখেছে।

২৪শে ফেব্রম্নয়ারী রাত ১০টা থেকে ১১ টার মধ্যে ঢাকার ঝিকাতলাস্ত একটি ফিলিং ষ্টেশনের মালিক আতাউর তার মোবাইল থেকে বিডিআর এর ডিজিকে একটি ফোন করে বিডিআর এর ডিজি শাকিলকে এই মর্মে জানায় যে, স্যার আপনাকে কালকে পীলখানায় মেরে ফেলবে। আপনি কালকের অনুষ্ঠানে যাবেননা্ তার এই ফোন কল, র্যাব হেড কোয়াটার আড়িপেতে শুনে এবং কিছু সময়ের মধ্যে আতাউরকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনার পর তাকে অবশ্য ছেড়ে দেয়া হয়। র্যাব এবং এডিজি কর্ণেল রেজা নুর অনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য টিএফআই সেলকে প্রদান করে। এতদসত্বেও আমার জানা মতে এমন একটি তথ্য কোন তদনত্দ রিপোটেই উল্লেখ করা হয়নি। এটা মেনে রীতিমত অবিশ্বাস্য যে টি এফ আই সেল এমন একটি গুরম্নত্বপূর্ন তথ্য ধর্তব্যের মধ্যে তথা তাদের বিবেচনায় আনেনি। কিভাবে এমন একটি তাৎপর্যময় তথ্য গোপন করা হলো তা নির্ণয় করা সম্ভব না হলেও এটা সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় যে, কোন একটি ফন্দি-ফিকির করে সেই তথ্যটিকে চাপিয়ে ফেলা হয়েছে। আমরা দেখব যে সরকারের ভিতর থেকে কিভাবে এমনি ধরনের ছল-চাতুরী পূর্ন ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে অপরাধীদের রক্ষা ও দেশকে প্রতারিত করা হয়েছে।

২৫ তারিখ সকাল পৌনে নয়টার সময় গোয়েন্দা সংস্থা এন এস আই এই মর্মে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করে যে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পীলখানায় বিদ্রোহ শুরু হবে। একই তথ্য সেনাবাহিনী প্রধানকেও দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী কোনরম্নপ পাল্টা ব্যবস্থা প্রহন করেনি। সেনাপ্রধানও বিষয়টাতে নীরবতা অবলম্বন করে। তাদের পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের নিবৃত্ত থাকা ও নীরবতা অবলম্বন থেকে এটা ষ্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে বিদ্রোহ পরিকল্পনামাফিক বাস্তবায়িত হবার ব্যাপারে তারা আগ্রহী ছিলেন। পীলখানায় বিদ্রোহের শুরুতেই বিডিআর এর ডিজি প্রধানমন্ত্রী, সেনাপ্রধান ও ডিজিএফআই এর ডিজিকে ফোন করলে তারা অবিলম্বে তাকে সাহায্য করার অঙ্গীকার করে। কর্ণেল গুলজার (?) সেনাবাহিনীর সিজিএস এবং ডিএমও'র সাথে কথা বলে এবং র্যাব-২ এর কমান্ডিং অফিসার লে: ক: জামান এর সাথে কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে অবিলম্বে সেনাবাহিনী প্রেরনের অনুরোধ জানায়। তারা বিডিআর এর ডিজির সাথে ধোঁকাবাজি করে এবং ঢাকা সেক্টরের কমান্ডার মজিব ৩৬ রাইফেল ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে: কর্ণেল এনায়েত ও লে: কর্ণেল বদরুল ও অন্যান্য সিনিয়র অফিসারদের তাদেও ইউনিট এ গিয়ে জওয়ানদের শানত্দ করার নির্দেশ জ্ঞাপন করে।

বিডিআর এর মহাপরিচালক যদিও জানতো যে একটা গন্ডগোল হবে; কিন্তু এটা যদি জানতো যে তাদেরকে উপর মহলের প্রদত্ত আশ্বাস হবে স্রেফ ধোঁকাবাজি এবং তাদেরকে বলির পাঁঠা বানানো হবে তাহলে অবশ্যই তারা ভিন্ন ভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সচেষ্ট হতো। তাদের মধ্যে অনেক নাম করা কমান্ডো অফিসার ছিল। তারা সহজেই কিছু এসএমজি ছিনিয়ে নিয়ে ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে পাল্টা আক্রমন চালিয়ে বিদ্রোহ সর্বাত্বকভাবে দমন করতে না পারলেও অনত্দত বিদ্রোহীদের বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারতো। ভাগ্যাহত অফিসারদের অনেকের স্ত্রী বিদ্রোহ শুরু হলে সেনা প্রধান মঈনের স্ত্রীকে সাহায্যের জন্যে ফোন করলে মঈনের স্ত্রী এ মর্মে ফোনে বকবকনো করতে থাকেন যে, ইনকামিং কল তিনি কিছুই শুনতে পারছেননা। তার এই চাতুর্যপূর্ণ ভূমিকা থেকে এটা আরো একটু বুঝা যায় যে বিদ্রোহে তার স্বামীর ভূমিকা ছিল সন্দেহজনক।

সকাল সাড়ে দশটায় র্যাব ১০ এর অফিসাররা পীলখানার ৫নং গেট সংলগ্ন নিচু উচ্চতার দেয়ালের নিকটে পেঁৗছে যে দেয়াল দ্বারা সনি্নহিত বেসামরিক এলাকা থেকে বিডিআর সদর দফতরকে আলাদা করা হয়েছে। ঐ জায়গাটা ছিল বিদ্রোহ দমনে ঝটিকা অভিযান শুরু করে সদর দফতরকে মুক্ত করার সবচাইতে উপযুক্ত জায়গা। কিন্তু সাড়ে এগারটার দিকে র্যাব এর এডিজি কর্ণেল রেজা নূর র্যাব-১০ অফিসারদের অধিনায়ককে পীলখানা থেকে ৩ মাইল দূরে বেড়ী বাঁধ এলাকায় গিয়ে অবস্থান গ্রহনের নির্দেশ জ্ঞাপন করে। এটা স্বভাবতই জিজ্ঞাস্য যে কার নির্দেশে কিংবা পরামর্শে এবং কেন কর্ণেল রেজা সে নির্দেশ প্রদান করেছিল? বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে তদনত্দ কর্যক্রমে এই সব দিক মোটেই আমলে নেয়া হয়নি। কর্ণেল রেজা নূর এর চাচাতো ভাই হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ট সহকারী বাহউদ্দীন নাসিম। সে কারনে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চিনে। যথাসম্ভব হয় প্রধানমন্ত্রী নিজে অথবা তাঁর ঘনিষ্ট মহলের কেউ রেজা নূরকে দিয়ে ঐ কাজটি করিয়ে থাকবে। র্যাব -১০ কে ওখান থেকে সরিয়ে নেয়ায় বিদ্রোহ পরিকল্পনা বাসত্দবায়নে অনেক অনুকুল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

ঐ পথ দিয়েই বিদ্রোহীরা সদর দফতরের অস্ত্রাগার লুন্ঠন করে তার আওয়ামীলীগের কমিশনার তোরাব আলীর বাসভবনে স্থানানত্দর করে যা ছাত্রলীগের ক্যাডারদের মধ্যে বিতরন করা হয় এবং তার চাইতেও বড় সুবিধা যে সে পথ দিয়ে বিডিআর এর হত্যাকারীরা নিরাপদে হাজারীবাগ ও ঝিকাতলা এলাকা দিয়ে বিনা বাধায় পালিয়ে যায়। র্যাব-১০ এর মোতায়েনকে পুন বিন্যস্থ করা ছিল স্পষ্টতই বিদ্রোহীদের অনুকুলে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। আরো উল্লেখ্য যে, র্যাব ১০ এর পাশাপাশি র্যাব ২ এবং ৩ কে ধানমন্ডি এলাকায় মোতায়েন করা হলেও তাদেরকে দিয়ে বিদ্রোহ দমনে কোন উদ্যেগই নেয়া হয়নি। তাদেরকে নড়চড়হীন করে রাখা হয়।

বিডিআর এর ডিজি নিহত হয় সকাল সাড়ে দশটায়। ভারতীয় টিভি চ্যানেল 'চবি্বশ ঘন্টা' বিষ্ময়করভাবে অতি অল্পসময়ের মধ্যে বিডিআর ডিজি ও তার স্ত্রী নিহত হবার সংবাদপ্রচার করে সকাল এগারটায়। ভারতের আর একটি চ্যানেল এনডি টিভি সংবাদ শিরোনামে দেখায় ১২টার সময় এবং আরও সংবাদ প্রচার করে ১২.১৫ মি: এর সময়ে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে এই বিদ্রোহের সংবাদ চাপা রাখা হয় ২৬ তারিখ অপরাহ্ন পর্যনত্দ। অথচ কর্ণেল মজিব ও লে: ক: এনায়েত এর লাশ উদ্ধার করা হয় ২৫ তারিখ বিকেল আড়াইটার সময়। এদিকে বিকেল ৩.৩০মি: এর সময় বাংলাদেশের মিডিয়া ঘটা করে নানক কতর্ৃক নিয়ে আসা ১৪ জন বিডিআর বিদ্রোহীর সাথে চা বিস্কুট খেতে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারী বাসভবনে বৈঠক করার খবর প্রচার করা হয়। উক্ত সভা চলে ১৫০ মিনিট। মাঝপথে প্রধানমন্ত্রী একটি টেলিফোন কল রিসিভ করার পর তিনি বিডিআর বিদ্রোহীদের প্রতিনিধিদলকে বলেন, তোমরাতো বিডিআর এর ডিজিকে মেরে ফেলেছো, এই সময় বিডিআর এর ডিএডি তৌহিদ বলে উঠে যে, তাহলে সম্ভবত ডিজি মারা গেছেন এটা রীতিমত অবিশ্বাস্য যে তখন পর্যনত্দ প্রধানমন্ত্রী ও তার মেহমান হিসাবে আসা বিদ্রোহীরা জানতোনা বিডিআর এর ডিজির হত্যাকান্ডের খবর অথচ সকাল ১১ টা থেকে ভারতীয় টেলিভিশনের পর্দায় বিডিআর কর্মকর্তাদের হত্যাকান্ডের খবর অবিরত প্রচার করা হচ্ছিল আর ইতিমধ্যে সমগ্র রাজধানীতে এটা নিয়ে ব্যপক আলাপ আলোচনা হচ্ছিল অথবা এটা কি সত্যিই বিশ্বাস করা যায় যে বিদ্রোহীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর তেমন জিজ্ঞাসা নিতানত্দই উদাসীনতা বশত করা হয়েছিল? সম্ভবত প্রধানমন্ত্রীর তেমন অজ্ঞতাসূলভ (?) জিজ্ঞাসার মধ্যে বিদ্রোহীদের প্রতিনিধি দলের জন্য একটি বার্তা নিহিত ছিল।

উক্ত ফোন কলের বার্তা লাভের পরও বিদ্রোহীদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক থেকে এটা স্পষ্টতই মনে হয় যে আসলে তেমন কোন ঘটনাই তথা হত্যাকান্ড বা রক্তপাত তখন পর্যনত্দ ঘটেনি। সভার বাকী সময় অতি শানত্দভাবে কেটে গেলেও একবারের জন্যও প্রধানমন্ত্রী ডিজির স্ত্রী ও তাদের ছেলে মেয়ে ও অন্যান্য অফিসার ও তাদের ছেলে মেয়েদের ভাগ্য সম্পর্কে কোন খোঁজ খবর নেয়নি। অথবা সে তাদের নিরাপত্তা বিধানের কোন আহবানও বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী রাখেননি। অথচ দরবার হলে হত্যাকান্ড শুরুর পর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষনে নিয়োজিত ন্যাশনাল মনিটরিং সেল থেকে অফিসারদের পরিবার পরিজনদের নির্যাতনের কথা প্রধানমন্ত্রীকে বহু বার জানানো হয়। সেনা প্রধানকে বিডিআর বিদ্রোহীদের সাথে বাইরের লোকজনের কথাবার্তার বিষয়ে জানানো হয়। কিভাবে বিদ্রোহীরা অফিসারদের হত্যা করছে এবং তাদের পরিবার পরিবার পরিজনদের উপর অত্যাচার নির্যাতন চালাচ্ছে সেই সব কথাবার্তায় তার বিবরণ শুনা যায়। সেনাপ্রধান এহেন বর্বরতা মোকাবেলা করার মত কোন পদক্ষেপ গ্রহনের বদলে ন্যাশনাল মনিটরিং সেল এর অফিসারদের শানত্দ থাকার এবং কোনরুপ আবেগ তাড়িত হতে নিবৃত্ত থাকার নির্দেশ জ্ঞাপন করেন।

বিদ্রোহের সাতে প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের মৌন সম্মতির সাথে সঙ্গতি রেখে বিডিআর হত্যাকারীদের জন্য সাধারন ক্ষমা ঘোষনা ও তাদের দাবী দাওয়া মেনে নেয়ার আশ্বাস প্রদান করা হয়। রাত নেমে আসার সাথে সাথে আত্মতৃপ্তিতে বলিয়ান বিডিআর বিদ্রোহীদের প্রতিনিধি দল নানককে সাথে নিয়ে বিডিআর সদর দফতরে প্রত্যাবর্তন করেন। নানক একজন সাহসী নেতা ও বিদ্রোহীদের কাজকে সমর্থন জ্ঞাপনে সাফল্য অর্জনকারী হিসেবে বিদ্রোহীদের দ্বারা সমাদৃত হন। কিছু সময় পরই সাংসদ তাপস সংবাদ মাধ্যমকে জানায় যে ডি এডি তৌহিদ এখন থেকে বিডিআর এর মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর নাতির এমন ঘোষনা টিভির পর্দায় ভাসতে থাকে হত্যাকারী ও তাদের দুষ্কর্মের সহায়তাকারীরা বুঝতে পারলো যে সেনা অভিযানের আশংকা দূরীভূত হয়ে গেছে। পরবর্তীতে তাপস বিডিআর সদর দপ্তরের অভ্যনত্দরে গিয়ে বিদ্রোহেিদর সবকিছু ধুয়েমুছে সাফ করে ফেলার নির্দেশ জ্ঞাপন করে। কার্যক্ষেত্রে এটা ছিল হত্যাকান্ডের জন্য লাইসেন্স প্রদান করা। সেই লাইসেন্স সে অর্থহীন ছিলনা পরবর্তীতে তা সবাই বুঝতে পারে।

দরবার হলের একটি টয়লেট এ কর্ণেল এমদাদ জীবিত ছিলেন। সেখানে সে জোহর এর নামায আদায়ের পর তার স্ত্রীরর সাথে মোবাইলে কথা বলেন। রংপুরের সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল আফতাব তার সহকর্মী একজন ব্রিগেডিয়ার ও দুইজন কর্ণেল এর নিকট বিকেল সাড়ে চারটার সময় এই মর্মে তিনটি এসএমএস প্রেরণ করেন যে আমি দরবার হলে বেঁচে আছি। আমাদের দয়া করে বাচাঁও। গুরম্নতর ভাবে আহত মেজর মোসাদ্দেকের অতি উদ্বেগজনক ও অব্যাহত ফোন কল এ তাঁকে বাঁচানোর আশ্বাস প্রদান করা হলেও কার্যক্ষেত্রে কিছুই করা হয়নি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরনে সে সাড়ে ৫টার দিকে ইনত্দেকাল করে। সেনা অফিসারদের বাচাঁনোর কোন উদ্যোগই গ্রহন করা হয়নি। তাদেরকে বাঁচানোর দ্বায়িত্ব যাদের ছিল তারা অন্যদের পৃষ্টপোষকতায় ব্যাসত্দ ছিল।
সন্ধ্যা রাত্রির দিকে পীলখানা থেকে এ্যাম্বুলেন্স যোগে আহতদের স্থানানত্দরের কাজ শুরু হয়। কিন্তু এটা ছিল একটা বাহানা। ঐ এ্যাম্বুলেন্স এ করে ভাড়াটে খুনীদের বধ্যভূমি থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। পীলখানা থেকে এ্যাম্বুলেন্স এ বের করে তাদেরকে পূর্ব নির্ধারিত পয়েন্ট এ অপেক্ষমান মাইক্রোবাসে উঠিয়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশ বিমানের বিজি০৫৯ নং বিমানে তাদেরকে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গনত্দব্যে পেঁৗছিয়ে দেয়া হয়।
ঐ দিন বিকেলে পুলিশের আইজি নূর মোহাম্মদ পীলখানা থেকে তার সদ্য বিবাহিত কন্যাকে উদ্ধারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। সে পীলখানা প্রবেশের জন্য কয়েকবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের অনুমতি প্রার্থনা করে। কিন্তু তার প্রার্থনা না মঞ্জুর করা হয়। বিক্ষুদ্ধ আইজি মরীয়া হয়ে একাই যাওয়ার সিদ্ধানত্দ গ্রহন করে। এমতাবস্থায় সাহারা অস্ত্র সমর্পন ও অফিসারদের পরিবার পরিজনদের উদ্ধারের নাটক শুরু করে। সাহারা কেবলমাত্র ওটোশী ভবন থেকে আইজির কন্যা ও বিদ্রোহের ষড়যন্ত্রে জড়িত কর্ণেল কামরুজ্জামানের স্ত্রী ও মিসেস আকবরকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। এমনকি উক্ত ভবনের দোতালার উপরে তিনি যাননি। উক্ত ভবনের উপরের দিকে অবস্থানকারীরা সহ অন্যান্য আবাসিক ভবনের সবাইকে তাদের ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে আসা হয়।

সাহারা খাতুন পীলখানা ত্যাগ করার পর পরই কর্ণেল আফতাবকে হত্যা করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর আগমনে তার মনে হয়তো এই বিশ্বাস হয়েছিল যে বিদ্রোহের নিষ্পত্তি হয়েছে এবং তাই তিনি তার গোপন স্থান থেকে বের হয়ে এসে তার স্ত্রী ও কন্যার সাথে সাক্ষাত করতে যায়। সে জানতো যে তারা অফিসারস মেসে আছে। কোয়াটার গার্ড অভিমুখে যাওয়ার পথেই তাকে গুলি করা হয়। কর্ণেল রেজাকে হত্যা করা হয় রাত ৩টার পরে। সাহারা খাতুনের প্রত্যাবর্তনের পর কর্ণেল এলাহীকেও হত্যা করা হয়। সে একটি ম্যানহোলে পালিয়ে ছিল। সেখান থেকে বের হলেই তাকে হত্যা করা হয়। এই ভাবে বেশ কয়েকজন অফিসারকে রাতে হত্যা করা হয়। সরকার প্রধান ও নিজেদের সেনাপ্রধানের বিশ্বাসঘাতকতায় জাতীর নিরাপত্তা বিধানে নিবেদিতপ্রাণ এইসব অফিসারদের জীবন প্রদীপ অতি অল্প সময়ে নিভে যায়। সেনাবাহিনীতে কর্মরত তাদের অসহায় ও অবমানিত সহকর্মীদের পক্ষে তাদের বাঁচানোর কোন ফুরসতই ছিলনা।