Showing posts with label বাকশাল ও রক্ষী বাহিনী. Show all posts
Showing posts with label বাকশাল ও রক্ষী বাহিনী. Show all posts

Tuesday, 4 March 2014

নীলফামারীতে এমপি নূরের গাড়িবহরে হামলা : মামলার নিখোঁজ আসামি রাবি শিবির নেতা মহিদুল ইসলামের লাশ মিলেছে বগুড়ায়

বগুড়ায় অজ্ঞাত লাশ হিসেবে দাফনের এক মাস তিনদিন পর নীলফামারী সদর থানায় পাঠানো লাশের ছবি দেখে নিখোঁজ শিবির নেতা মহিদুলের লাশ শনাক্ত করেছে পরিবারের সদস্যরা। গত ১লা ফেব্রুয়ারি বগুড়া আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম অজ্ঞাতনামা হিসেবে মহিদুলের লাশ দাফন করেছিল। নীলফামারী সদর উপজেলার টুপামারী ইউনিয়নের সুখধন গ্রামের কস্ফারি আনোয়ার হোসেন ছেলে মহিদুল। সে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মান তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সদস্য ছিল। ২০১৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর জেলা সদরের রামগঞ্জ বাজারে এমপি আসাদুজ্জামান নূরের গাড়িবহরে হামলা ও আওয়ামী লীগের চারজন নেতাকর্মী হত্যার মামলার নয় নম্বর আসামি ছিলেন মহিদুল। মহিদুল ইসলামের খালা মমেনা বেগম, মামী রাশেদা খানম, বড় বোন আম্বিয়া ও আফরোজা বেগম জানান, ওই ঘটনার পর থেকে মহিদুল ও তার বন্ধু আতিক টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলার দেবীডুবা গ্রামে সাথিয়া স্কুলের নিকটবর্তী আতিকের আত্মীয় বাবুল খানের বাড়িতে আত্মগোপনে ছিল। 

Saturday, 4 January 2014

দুর্ভিক্ষ ১৯৭৪, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কৃষ্ণকাল

একটি তিন বছরের শিশু এতই শুকনো যে, মনে হল সে যেন মায়ের পেটে থাকাকালীন অবস্থায় ফিরে গেছে। আমি তার হাতটা ধরলাম। মনে হল তার চামড়া আমার আঙ্গুলে মোমের মত লেগে গেছে। এই দুর্ভিক্ষের আর একটি ভয়ঙ্কর পরিসংখ্যান এই যে, বিশ্বস্বাস্থ্ সংস্থার মতে ৫০ লাখ মহিলা আজ নগ্ন দেহ। পরিধেয় বস্ত্র বিক্রি করে তারা চাল কিনে খেয়েছে।” 

“সন্ধা ঘনিয়ে আসছে এবং গাড়ী আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম-এর লরীর পিছনে পিছনে চলেছে। এই সমিতি ঢাকার রাস্তা থেকে দুর্ভিক্ষের শেষ শিকারটিকে কুড়িয়ে তুলে নেয়। সমিতির ডাইরেক্টর ডাঃ আব্দুল ওয়াহিদ জানালেন,“স্বাভাবিক সময়ে আমরা হয়ত কয়েক জন ভিখারীর মৃতদেহ কুড়িয়ে থাকি। কিন্তু এখন মাসে অন্ততঃ ৬০০ লাশ কুড়াচ্ছি- সবই অনাহার জনিত মৃত্যু।” 

ছাত্রলীগের রগকাটা কব্জিকাটার টুকরো ইতিহাস --

সিলেট পলিটেকনিকে রামদা হাতে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা- সংগ্রাম, ১৬ মে ২০১০
সিলেট পলিটেকনিকে রামদা হাতে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা- সংগ্রাম, ১৬ মে ২০১০
দার্শনিক গোয়েবলৎসের একটি সুত্র হচ্ছে কোন একটি মিথ্যাকে সত্য বলে প্রমানিত করার জন্য সেই মিথ্যাকে ১ শত বার বলাই যথেষ্ট। বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে সম্ভবত দার্শনিক গোয়েবলৎসের সেই সুত্রটিই টিকে গেছে। কারন যারা রগকাটার সাথে আদৌও সম্পর্কিত নয় তারা আজ রগকাটার দল আর যারা প্রকৃতপক্ষে প্রতিনিয়ত রগকাটে তাদের বেলায় এ কথাটি প্রযোজ্য হয়না। ১৯৭৭ সালে ছাত্রশিবির নামক একটি আদর্শিক ছাত্রসংগঠনের জন্ম হয় বাংলাদেশে। যারা এই আদর্শিক সংগঠনটিকে আদর্শ দিয়ে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয় তারা তাদের সর্বোচ্চ পেশীশক্তি এ সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে। কিন্তু পেশীশক্তি ব্যবহার করে এমনকি এই সংগঠনের শতশত নেতা কর্মীকে হত্যা করার পরও যখন সংগঠনটিকে দমাতে পারলোনা তখন কল্প কাহিনীর মত প্রচার করতে থাকল এই সংগঠনটি রগ কাটে।

Wednesday, 13 November 2013

বঙ্গবন্ধুর আমল স্বৈরতান্ত্রিক, তথ্যমন্ত্রীর তথ্য

বঙ্গবন্ধুর আমল স্বৈরতান্ত্রিক, তথ্যমন্ত্রীর তথ্য
পরিবর্তন প্রতিবেদক •
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের শাসনামল ছিল স্বৈরতান্ত্রিক। -এ তথ্য দিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। আর তা প্রকাশিত হয়েছে মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে।
তথ্যমন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ইংরেজিতে হাসানুল হক ইনুর যে জীবনবৃত্তান্ত দেয়া রয়েছে তাতে এমন তথ্য দেওয়া হয়েছে।

ওয়েবসাইট ঘুরে দেখা গেছে, এতে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তথ্যমন্ত্রীর দুটো জীবন বৃত্তান্ত পরিবেশন করা হয়েছে। বাংলা জীবন বৃত্তান্তে বঙ্গবন্ধু সরকারের ব্যাপারে কোনো বিরূপ মন্তব্য নেই। কিন্তু ইংরেজি জীবন বৃত্তান্তে বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে স্বৈরশাসন ও হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

Monday, 4 November 2013

চট্টগ্রামে পুলিশ খুন : ১১ যুবলীগ ক্যাডারের বিরুদ্ধে মামলা ৪ জনকে গ্রেফতারের পর ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ

চট্টগ্রামে পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় ১১ যুবলীগ ক্যাডারের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ৭-৮ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। তবে ঘটনার ২ দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। তবে ঘটনার পর জিলাপির পাহাড়ে ব্লক রেইড দিয়ে চার যুবলীগ ক্যাডারকে আটক করা হলেও গত রোববার রাতেই সরকারের শীর্ষ মহলের চাপে পুলিশ তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। 

Sunday, 6 October 2013

যশোরের শার্শা সীমান্তে বিএসএফের নির্যাতনে বাংলাদেশী তরুণের মৃত্যু

যশোরের শার্শা সীমান্তে বিএসএফের নির্যাতনে তৌহিদুর রহমান শিকদার নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে তার মৃত্যু যে বিএসএফের নির্যাতনে হয়েছে, বিজিবি কর্মকর্তারা তা নিশ্চিত করতে পারেননি।
নিহত তৌহিদুর রহমান শার্শা উপজেলার গোগা গ্রামের লিয়াকত আলী শিকদারের ছেলে। তার স্বজনরা জানায়, শনিবার রাতে তৌহিদুরসহ একদল ব্যবসায়ী ভারতে যায় গরু আনতে। গভীর রাতে দলটি ফিরে আসার সময় ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ঝাউডাঙ্গা ক্যাম্পের সদস্যরা তাদের তাড়া করে। অন্যরা নিরাপদে দেশে ফিরতে পারলেও তৌহিদকে ধরে ফেলে বিএসএফ সদস্যরা। তারা তৌহিদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালিয়ে মৃতপ্রায় অবস্থায় ফেলে যায় বাংলাদেশ ভূখণ্ডে। পরে গ্রামবাসী তাকে উদ্ধার করে প্রথমে বাগআঁচড়ার একটি ক্লিনিকে এবং পরে রাত সোয়া ২টায় যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। গতকাল রোববার বিকালে তৌহিদ চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যায়।
বিজিবি ২৩ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল তায়েফ উল হক তৌহিদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করলেও কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে সে ব্যাপারে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি। তিনি বলেন, তৌহিদ নামে এক তরুণের মৃত্যুর খবর জেনে তিনি বিজিবি ২৬ ব্যাটালিয়নের অপারেশনাল অফিসার এ কে এম রায়হান হাফিজকে গতকাল সন্ধ্যায় যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। কর্নেল তায়েফ জানান, মৃত তৌহিদের মুখমণ্ডলসহ শরীরের অন্যান্য স্থানে আঘাত রয়েছে। এগুলো যদি ছররা গুলির দাগ হয়, তাহলে তার জন্য বিএসএফ দায়ী।
বিজিবি ২৬ ব্যাটালিয়নের অপারেশনাল অফিসার মেজর রায়হানও একই ধরনের তথ্য দেন। তিনি বলেন, তৌহিদের মৃত্যু কীভাবে হয়েছে ময়নাতদন্ত রিপোর্টের পরই তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।
নিহতের স্বজনদের দাবি, তৌহিদের মুখে কলম বা অন্য কোনো সুচালো বস্তু দিয়ে আঘাত করেছে বিএসএফ। এছাড়া তার সারা শরীর পিটিয়ে থেঁতলে দেয়া হয়েছে বলে তাদের দাবি।

Tuesday, 4 June 2013

আওয়ামী লীগের সম্পাদক নির্যাতনের রেকর্ড


আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলেই ভিন্নমতের সম্পাদকরা নির্যাতিত ও নিগৃহীত হন। স্বাধীনতা-পরবর্তী শাসনকাল থেকে শুরু করে বর্তমান আমল পর্যন্ত প্রতিটি আওয়ামী লীগ আমলেই সত্যনিষ্ঠ ও সাহসী সাংবাদিকরা কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের তোষণ না করায় কোনো কোনো সম্পাদককে সরকারি মালিকানাধীন সংবাদপত্র থেকে চাকরিচ্যুত হতে হয়েছে। তবে কোনো সম্পাদককে গ্রেফতারের পর দফায় দফায় রিমান্ডে নিয়ে নির্মম নির্যাতনের ঘটনা প্রথম বারের মতো ঘটেছে বর্তমান শাসনকালে। দৈনিক আমার দেশ-এর সাহসী সম্পাদক মাহমুদুর রহমান হয়েছেন এ নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে দেশের বিশিষ্ট ও বরেণ্য সম্পাদকরা নির্যাতিত হন। গ্রেফতারের পর সম্পাদকদের রিমান্ডে নিয়ে চরমভাবে নির্যাতন এ দলের রেকর্ডেই আছে। আদালতকে ব্যবহার করে সম্পাদককে ভিত্তিহীন মামলায় সাজা দেয়ার ঘটনা স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের আমলেই ঘটেছে। রিমান্ডে নিয়ে সম্মানিত সম্পাদককে বিবস্ত্র করার জঘন্য রেকর্ডটিও আওয়ামী লীগের দখলে। সম্পাদকদের নির্যাতনের জন্য নতুন আইন প্রণয়ন আওয়ামী লীগের রাজনীতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
দলটির সমালোচনা করে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ কর্মকাণ্ডের দায়ে গ্রেফতারের শিকার হয়েছেন প্রখ্যাত সম্পাদকরা। সম্পাদক নির্যাতনে আওয়ামী লীগের এ রেকর্ড দেশের আর কোনো রাজনৈতিক দলের তো নেই-ই, এমনকি বিভিন্ন দেশের সামরিক শাসকদের ইতিহাসেও নেই। স্বাধীনতার পর থেকে শুরু হওয়া আওয়ামী লীগের সম্পাদক নির্যাতন এখনও চলছে।
এর আগে দু’বারের (১৯৭২-৭৫, ১৯৯৬-০১) শাসনামলে নির্যাতন ও গ্রেফতারের শিকার হয়েছেন গণকণ্ঠ সম্পাদক প্রখ্যাত কবি আল মাহমুদ, অবজারভার সম্পাদক আবদুস সালাম, হলিডে সম্পাদক এনায়েতুল্লাহ খান, হক কথা সম্পাদক ইরফানুল বারী। এছাড়া গ্রেফতার করার চেষ্টা করা হয়েছে ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীনকে। দলটির সমর্থক হলেও সামান্য ভিন্নমত পোষণ করায় দৈনিক বাংলার সম্পাদনা পরিষদ থেকে হাসান হাফিজুর রহমান, তোয়াব খানকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার।
এবার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে দৈনিক সংগ্রাম সম্পাদক, প্রবীণ সাংবাদিক আবুল আসাদ, আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ও শীর্ষনিউজ সম্পাদক একরামুল হককে। সম্পাদককে গ্রেফতারের পাশাপাশি দু’দফায় আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ করা হয়েছে। সম্পাদককে নির্যাতনের মাধ্যমে সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজ ও অনলাইন পত্রিকা শীর্ষনিউজডটকম-এর প্রকাশনা বন্ধ করতে বাধ্য করা হয় বলেও অভিযোগ আছে। মহাজোট সরকারের আমলে দু’বার গ্রেফতার হয়েছেন নন্দিত সম্পাদক কলামিস্ট মাহমুদুর রহমান। দু’বারই রিমান্ডে নিয়ে তাকে নির্যাতন করা হয়। বানোয়াট মামলায় গত ১১ এপ্রিল তাকে আমার দেশ কার্যালয় থেকে দ্বিতীয় বার গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নিয়ে ডিবি অফিসে নির্মম নির্যাতন চালানো হলে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর ১৮ এপ্রিল সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় তাকে আদালতে হাজির করে চিকিত্সার জন্য রাজধানীর বিএসএমএমইউ’র আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। তার চিকিত্সা শেষ না হতেই এবং তার চিকিত্সকদের অনুরোধ, দাবি উপেক্ষা করে গত ২৭ মে তাকে অন্যায়ভাবে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যমতে, একাত্তরে স্বাধীনতা লাভের পরের বছর, অর্থাত্ ’৭২ সাল থেকে শুরু হয় তখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংবাদপত্র, সাংবাদিক ও সম্পাদক নির্যাতন। সংবিধানে তখন ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’র অধিকার দেয়া থাকলেও আওয়ামী লীগ ভিন্নমতের পত্রিকার প্রতি ছিল অসহনশীল। এসব পত্রিকার সম্পাদকেরও জেল-নির্যাতনের শিকার হতে হয়। বঙ্গবন্ধু সরকারের সাড়ে তিন বছরের শাসনকালের সব বছর পত্রিকা বন্ধ, সাংবাদিক, সম্পাদকদের গ্রেফতার, হয়রানির ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ অবজার্ভার সম্পাদক আবদুস সালাম জাতীয় সরকার গঠনের দাবির সমর্থনে ‘দ্য সুপ্রিম টেস্ট’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় লেখেন, যা ’৭২ সালের ১৫ মার্চ প্রকাশিত হয়। এ সম্পাদকীয় প্রকাশের দিন তাকে চাকরিচ্যুত করে সরকার। এভাবেই একজন সম্মানিত সম্পাদককে তার অভিমত প্রকাশের মূল্য দিতে হয়। ’৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি হলিডে সম্পাদক এনায়েতুল্লাহ খান একটি নিবন্ধ লেখার কারণে তার বিরুদ্ধে সংসদে, এর বাইরে আওয়ামী লীগের নেতারা অত্যন্ত কুিসত ভাষায় বিষোদ্গার করেন। এ বিষোদ্গার থেকে তার স্ত্রীও তখন রেহাই পাননি। ’৭৩ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকায় ছাত্রহত্যার ঘটনায় সেদিন বিকালে দৈনিক বাংলা একটি টেলিগ্রাম ইস্যু প্রকাশ করে। এতে সরকার ক্ষুব্ধ হয়। দৈনিক বাংলার সম্পাদনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হাসান হাফিজুর রহমান, সম্পাদক তোয়াব খানকে অপমানজনকভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়।
শামছুল হক সম্পাদিত বাংলা সাময়িকপত্র ১৯৭২-৮১ বইয়ে উল্লেখিত তথ্যমতে, স্বাধীনতালাভের বারো মাসের মধ্যে গণশক্তি, হক কথা, লাল পতাকা, মুখপত্র, বাংলার মুখ, স্পোকসম্যান ইত্যাদি সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলো নিষিদ্ধ করে সরকার। পত্রিকাগুলোর সম্পাদকদেরও তখন গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন মুখপত্র, স্পোকসম্যান সম্পাদক ফয়জুর রহমান, হক কথার সম্পাদক ইরফানুল বারী প্রমুখ। ’৭৩ সালের মার্চে ঢাকার দৈনিক গণকণ্ঠ আর আগস্টে চট্টগ্রামের দৈনিক দেশবাংলার প্রকাশনা বাতিল করে পত্রিকা দুটির সম্পাদককে গ্রেফতার করে সরকার। গণকণ্ঠ সম্পাদক কবি আল মাহমুদকে রাতের অন্ধকারে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে গণকণ্ঠ কার্যালয়ে বঙ্গবন্ধু সরকারের রক্ষীবাহিনী পত্রিকাটির কার্যালয়ে তল্লাশি চালায়। পুলিশ সাংবাদিক, কর্মচারীদের গণকণ্ঠ কার্যালয় থেকে বের করে দেয়। ওই সময় সম্পাদকসহ অন্য সাংবাদিকদের শারীরিক নির্যাতন ও লাঞ্ছিত করা হয়। উল্লেখ্য, ’৭২ সালে আল মাহমুদের সম্পাদনায় ঢাকা থেকে গণকণ্ঠ সাপ্তাহিক হিসেবে প্রকাশিত হয়। প্রকাশনা শুরুর ৪২ দিন পর পত্রিকাটি দৈনিকে রূপান্তরিত হয়।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের সরকার গঠনের পর ভিন্নমতের পত্রিকা ও সম্পাদকরা রোষানলে পড়েন। সরকারের দাবি করা ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ এক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয় দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এ এম এম বাহাউদ্দীনের বিরুদ্ধে। কয়েক সম্পাদকের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক অসংখ্য মামলা করেন মন্ত্রী, সরকার দলীয় সংসদ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগের তখনকার ফেনীর সংসদ সদস্য জয়নাল হাজারী, লক্ষ্মীপুরের আবু তাহেরসহ আরও কয়েক সংসদ সদস্য প্রকাশ্যে, এমনকি জাতীয় সংসদেও দেশের বরেণ্য সম্পাদকদের বিষোদ্গার করেন। জয়নাল হাজারী সংসদে দৈনিক প্রথম আলো সম্পাদককে অশ্লীল, অশ্রাব্য ভাষায় আক্রমণ করেন ও হুমকি দেন। সরকার প্রকাশনা নিষিদ্ধ করে সাপ্তাহিক দেশব্রতী, সাপ্তাহিক উপমা, সাপ্তাহিক দিশারী, সাপ্তাহিক সমকাল বার্তা, দৈনিক নতুন দিশারী ও ইংরেজি সাপ্তাহিক এভিডেন্স পত্রিকার। এসব পত্রিকার সম্পাদকদের গ্রেফতারের হুমকি দেয়া হয়। ’৯৭ সালের ৩০ অক্টোবর সরকার দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ টাইমস, বিচিত্রা ও আনন্দ বিচিত্রা-এ চারটি পত্রিকা বন্ধ করে দেয়। এসব পত্রিকার সম্পাদকদের সঙ্গেও সরকার অসদাচরণ করে।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ২০০৯ সালের শুরুতে মহাজোট সরকার গঠনের শুরু থেকেই সম্পাদক নির্যাতন চলে আসছে। সম্পাদক গ্রেফতার, সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা সাংবাদিকদের হুমকি-মামলা, পত্রিকা, টিভি চ্যানেল বন্ধ করার মতো গণমাধ্যমবিরোধী ঘটনা অবিরাম ঘটছে। এ পর্যন্ত তিনজন সম্পাদককে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নেয়া হয়। তারা হলেন সংগ্রাম সম্পাদক আবুল আসাদ, আমার দেশ-এর মাহমুদুর রহমান ও শীর্ষ নিউজর একরামুল হক। বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর করা মামলায় ২২ মে দৈনিক মানবকণ্ঠ সম্পাদক শাহজাহান সরদার এবং ঢাকা টাইমসের সম্পাদক আরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে হুমকি দেয়া হয়েছে বিভিন্ন সম্পাদককে। ২০১১ সালের ১৯ মে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমদ সিদ্দিকী দৈনিক প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানকে গ্রেফতারের হুমকি দিয়ে বলেন, ‘চাইলেই আমরা ওই সম্পাদককে গ্রেফতার করতে পারি।’ ‘২০১১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ইংরেজি দৈনিক নিউএজ সম্পাদক নুরুল কবীরকে মোবাইল ফোনে হত্যার হুমকি দেয় আওয়ামী লীগের কয়েক ক্যাডার। আমাদের সময়-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খানকেও হত্যার হুমকি দেয়া হয়। প্রথম আলো, নয়া দিগন্ত, মানবজমিন, ইত্তেফাক, যুগান্তর, সমকাল, কালের কণ্ঠ ও বাংলাদেশ প্রতিদিনসহ বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মন্ত্রী, সরকারি দলের সংসদ সদস্য, নেতারা কয়েক ডজন মামলা করেন। আমার দেশ পত্রিকায় প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহীর ঘুষ নেয়ার অভিযোগ সম্পর্কে ২০০৯ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে আওয়ামী লীগ নেতারা প্রকাশ্য জনসভা ডেকে মাহমুদুর রহমানকে দেখে নেয়ার হুমকি দেন।
অন্যদিকে মহাজোটের আমলে ২০১০ সালের ২ জুন গভীররাতে প্রথমবার গ্রেফতার হন সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তাকে আমার দেশ কার্যালয় থেকে গ্রেফতার করা হয়। দ্বিতীয় দফায় চলতি বছরের ১১ এপ্রিলও তাকে আমার দেশ কার্যালয় থেকে কমান্ডো স্টাইলে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়। ২০১০ সালে গ্রেফতারের পর একের পর এক মামলা দিয়ে তাকে বারো দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। জেলখানায়ও তার সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয়। তাকে তখন রিমান্ডে নিয়ে বিবস্ত্রও করা হয়। সরকারের প্রভাবশালীদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে, বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষায় লিখতে গিয়ে রোষানলের শিকার হয়ে ৯ মাস ১৭ দিন বা ২৮৮ দিন তাকে কারাভোগ করতে হয়। এ দেশের ইতিহাসে আর কোনো সম্পাদককে এভাবে গ্রেফতার করা, রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন আর একটি প্রতিবেদন ছাপা হওয়ার কারণে আপিল বিভাগের হুকুমে এতদিন কারাভোগ করতে হয়নি। আদালতকে ব্যবহার করে কোনো সম্পাদককে সরকারের নির্যাতনের উদাহরণ স্বাধীন বাংলাদেশে মাহমুদুর রহমান ছাড়া আর একটিও নেই। ’১০ সালের ২১ এপ্রিল আমার দেশ এ ‘চেম্বার জজ মানেই সরকার পক্ষের স্টে’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য সুপ্রিমকোর্টের সরকারি দলের সমর্থক দুজন আইনজীবী মামলায় শাস্তি দেয়া হয় মাহমুদুর রহমানকে। মহাজোট সরকারের শুরু থেকে একে একে মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে অর্ধশতের বেশি মামলা হয়।
গত ১১ এপ্রিল গ্রেফতারের পর মাহমুদুর রহমানকে তিনটি মামলায় ১৩ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের বহুল আলোচিত স্কাইপ কেলেঙ্কারি ফাঁস, পুলিশের কাজে বাধাদান ও মারপিটের অভিযোগ—এ তিনটি মামলায় মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার দেখানো হয়। পুলিশ ২৪ দিনের রিমান্ড চাইলে নিম্ন আদালত ১৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ২৭ মে বিএসএমএমইউ থেকে মাহমুদুর রহমানকে কামিশপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তরের সময়ও নির্যাতনের পন্থা বেছে নেয় পুলিশ। সম্পাদক হিসেবে তাকে মর্যাদা দেয়া হয়নি। মাহমুদুর রহমানকে জরাজীর্ণ প্রিজন-ভ্যানে দাঁড় করিয়ে রেখে কারাগারে নেয়া হয়। রাস্তায় উত্তরায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) কার্যালয়ের সামনে গিয়ে বিকল হয়ে পড়ে ভ্যানটি।

সূত্র : আওয়ামী লীগের সম্পাদক নির্যাতনের রেকর্ড

Monday, 20 May 2013

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ হয়েছিল যেকারনে !!


১৯৭২ সালের যে কোন খবরের কাগজ খুললে দেখা যাবে প্রায় সব খবরই হচ্ছে খুন, রাহাজানি এবং ছিনতাই সংক্রান্ত। 

১৯৭২ সালের যে কোন জাতীয় সংবাদপত্র খুললে প্রথমেই চোখে পড়বে খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানী, আর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির খবর। প্রতিদিন দেশের শহরগুলোতে ঘটছিল প্রকাশ্য খুন, ডাকাতি ও রাহাজানীর ঘটনা। গ্রামে-গঞ্জেও চলছিল ত্রাসের রাজত্ব। ক্রমবর্ধমান এ ত্রাসের নাগপাশে জনগণ এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় কাল অতিবাহিত করছিল। যখন জনগণের পরনে কাপড় নেই তখনই ঘটেছিল সুতা নিয়ে কেলেংকারী। পেটে যখন ভাত নেই তখন লাখ লাখ টন বিদেশী সাহায্যে প্রাপ্ত খাদ্য নির্বিবাদে পাচাঁর হয়ে গিয়েছিল সীমান্তের ওপারে।

 
মজলুম নেতা ভাসানী অবাধে চোরাচালানের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠেন। তিনি আওয়াজ তোলেন সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতীয় সম্প্রসারনবাদের বিরুদ্ধে। জবাবে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে চীন ও পাকিস্তানের দালাল, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তল্পিবাহক প্রভৃতি বলে আখ্যায়িত করে। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে ১৯৬৮-১৯৬৯ এর সাড়া জাগানো আন্দোলনকালে বরফের উপর আঘাত করেছিলেন সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি তার নাম মাওলানা ভাসানী। মাওলানার সার্বজনীন আহ্‌বানের পরিপ্রেক্ষিতেই ছাত্ররা দিলেন ১১ দফা। তারই নির্দেশে ন্যাপ তার নিজস্ব ১৪ দফা বাদ দিয়ে ১১ দফাকেই তাদের দাবি হিসাবে গ্রহণ করে। ঊনসত্তোরের কারাবন্দী মুজিবর রহমানকে মুক্ত করার দুর্বার গণ আন্দোলনও গড়ে তুলেছিলেন এই মাওলানা ভাসানীই। ১৬ই ফেব্রুয়ারী পল্টনের বিশাল জনসভায় তিনি বজ্রকন্ঠে হুশিঁয়ারী উচ্চারণ করেন, “প্রয়োজন হলে ফরাসী বিপ্লবের মত জেলখানা ভেঙ্গে মুজিবকে বের করে আনব।” তার মতো একজন অভিজ্ঞ প্রবীণ রাজনৈতিক উদারপন্থী নেতাকে সাম্প্রদায়িক উস্কানিদাতা বলে গালাগালি দিতেও কুন্ঠাবোধ করেনি শাসক দল। এই গালাগাল পর্ব শুরু করেন তরুণ নেতারা। পরে প্রবীণরাও ক্রমে তাদের সাথে যোগদান করেন। মার্চের শুরু থেকেই খবর আসতে থাকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে- মানুষ মরছে অনাহারে, না খেয়ে। বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, টাঙ্গাইলে বিরাজ করছে দুর্ভিক্ষ অবস্থা। আকাশচুম্বী দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল বের হতে থাকে স্থানে স্থানে। এ অবস্থায় ভারতীয় দূতাবাসের মুখপাত্রও স্বীকার করেন যে, চোরাচালান হচ্ছে ব্যাপক হারে। তারা বলেন, “সীমান্ত বাণিজ্য চুক্তি হয়ে গেলেই এই চোরাচালান বন্ধ হবে।” এ বক্তব্য দূতাবাস থেকে দেয়া হয় ২৩-৩-১৯৭২ তারিখে। দুর্নীতি ছড়িয়ে পরে দেশের সব জায়গায়, সর্বস্তরে।
 
১৯৭২ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারী শেখ মুজিব তার সংসদ সদস্যদের প্রতি এক নির্দেশ জারি করে বলেন, “চাকুরি, নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতির জন্য কেউ সুপারিশ করবেন না। প্রশাসনকে চলতে দিন।” ১১ই মার্চ দৈনিক বাংলায় এক খবর বের হয় সিগারেটের পারমিট নিয়ে, “বাংলাদেশ ট্যোবাকো কোম্পানীর ২৫জন ডিষ্ট্রিবিউটর নিয়োগের জন্য কর্তৃপক্ষ তিন হাজার সুপারিশপত্র পেয়েছেন। সুপারিশকারীরা প্রত্যেকেই এমন প্রভাবশালী যে, কোম্পানী কাকে ছেড়ে কাকে ডিলারশীপ দেবেন সে সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্তই নিতে পারছেন না।” ৬ই জুন চোরাচালানের স্বর্গ সিলেট থেকে দৈনিক বাংলার প্রতিনিধি খবর পাঠান যে, গ্রেফতারকৃত চোরাচালানীরা প্রভাবশালী ক্ষমতাসীন নেতাদের চাপে ছাড়া পাচ্ছে। একইভাবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চরম নৈরাজ্য নেমে আসে সরকারের পারমিটবাজী নীতির সূচনায়। সুতার পারমিট যে পাচ্ছে তার তাঁত নেই, কেরসিনের পারমিট যে পেল সে কোন ডিলার নয়। পারমিট দেয়া হল অব্যবসায়ী রাজনৈতিক টাউটবাজদের খুশি করার জন্য। ফলে র্দুভোগ গিয়ে বর্তাল জনগণের উপর। পারমিট হাত বদল প্রথায় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেল কয়েকগুন। কাপড়ের অভাবে মা-বোনেরা দিনের বেলায় ঘর থেকে বেরুতে পারতেন না। মেয়ে-মা একখানি কাপড় গোসল করে পালা বদলিয়ে পরছে। এ সমস্ত খবরও প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক পত্রিকায়। ঠিক সেই সময় সরকার টিসিবি’র মাধ্যমে ভারত থেকে আনল ‘সুন্দরী শাড়ী’। যে শাড়ীতে হাঁটু ঢাকে না, পর্দাও হয় না। ভারতীয় দূতাবাস বলল টিসিবি দেখেই এনেছে এই শাড়ী। টিসিবি কোন জবাব দিতে পারল না।
 
আগষ্ট মাসে দেশে বন্যা শুরু হয়। আসে বিস্তর রিলিফ। রিলিফ নিয়ে লুটপাটের কাহিনী পাওয়া যাবে ১৯৭৪ সালের আগষ্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর মাসের সংবাদপত্রসমূহে। অবাধ লুটপাট চলে বাশঁ, টিন, খাদ্যসামগ্রী, রিলিফের ঔষধপত্র এবং কম্বল নিয়ে। প্রতিদিনের সংবাদপত্রে ছাপা হয় ক্ষুধাতুর মানুষের ছবি। অন্ন নেই, বস্ত্র নেই, মাথা গোজাঁর ঠাই নেই। কোটি কোটি লোক হয় ক্ষতিগ্রস্ত ও বাস্তুহারা। ৩রা আগষ্ট ইত্তেফাকে ছাপা হয় এসব ছবি। দৈনিক বাংলায় খবর বের হয়, বমি খাচ্ছে মানুষ। বাংলাদেশ রেডক্রস সর্ম্পকে প্রকাশিত হয় চুরি, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অসংখ্য অভিযোগ। গ্রামে-গঞ্জে রেডক্রস প্রধান গাজী গোলাম মোস্তফার নামে ছড়া বের হয়। আতাউর রহমান খান রেডক্রসের অসাধু তৎপরতার প্রতিবাদ করেন। দুর্নীতির অভিযোগ করেন। ১০ই আগষ্টের ইত্তেফাকে সে বিবৃতি ছাপা হয়। ১৩ তারিখ সংবাদপত্রের রিপোর্টে দেখা যায় যে, সারাদেশের মানুষ কচু-ঘেচু খেয়ে জীবনধারণ করছে। আতাউর রহমান খান অভিযোগ করেন যে, বিরোধী দলীয় সদস্যদের ত্রান সাহায্য সংগ্রহের চেষ্টায় পুলিশ বাধা দিচ্ছে। তাদের গ্রেফতার করছে। জনাব খান ১১ই আগষ্ট কাগজে বিবৃতি দেন যে, দুনিয়ায় এমন কোন নজির নেই যে রেডক্রস সমিতির চেয়ারম্যান কোন দলীয় লোক হয়। তিনি একজন বিচারপতি অথবা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদকে এ সমিতির দায়িত্ব দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্‌বান জানান।
 
গ্রাম থেকে, উপদ্রুত এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ শহরে আসতে থাকে। ঢাকা শহরে ১৩৫টি রিলিফ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। ১২ই আগষ্ট যাত্রাবাড়ির রিলিফ ক্যাম্পে আশ্রয় গ্রহণকারীরা বলেন যে, তিনদিনে তাদের জন্য একমুঠো খাবারও বরাদ্দ করা হয়নি। ১৬ই আগষ্ট আইসিআরসির সদস্য মিঃ এলভিন কাজ পরিদর্শনের জন্য আদমজী রিলিফ ক্যাম্পে গেলে লোকেরা কমিটির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে চুরি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ করে। এলভিন চলে এলে কমিটির চেয়ারম্যান তার গুন্ডা বাহিনী দ্বারা অভিযোগকারীদের উপর হামলা চালায়। এতে ছুরিকাহত দুই ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। খাওয়ার অনুপযুক্ত পচাঁ বিস্কুট সরবরাহ করা হয়। তা থেকে ক্যাম্পগুলোতে কলেরা মহামারী আকারে দেখা দেয়। মরতে থাকে মানুষ।

মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলে। সে সময়কার পত্রিকার পাতা উল্টালে গা শিউরে উঠে। মানুষের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ কেড়ে নেয় লাখ লাখ মানুষের প্রাণ। হাজার হাজার চাষী যারা একদা কষে ধরতো লাঙ্গল, মাঠ ভরে তুলত সবুজ শস্যের সমারোহে, তারা ভিক্ষার জন্য শহরের মানুষের কাছে হাত পাতে। ফিরে যায় ভিক্ষা না পেয়ে। তারপর বেওয়ারিশ লাশ হয়ে পড়ে থাকে। আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম প্রতিদিন ঢাকা শহর থেকেই তিরিশ থেকে চল্লিশটি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করছিল। সে কাহিনী ও ছবি আছে সেই সময়কার দৈনিক সংবাদপত্রগুলোর পাতায় পাতায়। ঢাকায় প্রতি ঘন্টায় ৩-৪ জন লোক মারা যেতে থাকে অনাহারে। এর এক পর্যায়ে আঞ্জুমানের লাশ দাফনের কথা খবরের কাগজে প্রকাশ করা বন্ধ করে দেয়া হয় সরকারি আদেশে। আগষ্ট থেকে ডিসেম্বর মাস অব্দি প্রতিটি জেলা থেকে খবর আসতে থাকে যে, শত শত লোক অনাহারে মারা যাচ্ছে। ভাত নেই, কাপড় নেই, বাসস্থান নেই। ১০ই সেপ্টেম্বর ইত্তেফাক ছবি ছাপে- মাছ ধরার জাল পরে লজ্জা ঢাকার চেষ্টা করছে গ্রামের কোন কুল বধু। চট পরে ভিক্ষার আশায় সন্তান কোলে ঘুরে ফিরছে অসহায় জননী। গৃহবধুরা ক্ষুধার জালায় হচ্ছে প্রমোদবালা। রিলিফের কেলেঙ্কারীর খবর ছাপা হচ্ছিল খবরের কাগজে। কিন্তু অপরাধী ব্যক্তিদের একজনেরও বিচার হয়েছে এমন কথা শোনা যায়নি কখনো। কেন হয়নি সে খবরও সংবাদপত্রের পাতায় আসেনি। উত্তরাঞ্চলে পানির দামে বিক্রি হতে থাকে জমি। অসংখ্য সম্ভ্রান্ত কৃষক ভিক্ষুকে পরিণত হন। সে সময়ের ২২শে সেপ্টেম্বর বায়তুল মোকাররমে দুই শতাধিক উলঙ্গ, অর্ধউলঙ্গ নারী পুরুষ অন্নবস্ত্রের দাবিতে মিছিল করে। গ্রাম থেকে আসা অসহায় মানুষের আর্তনাদ একটুও কম্পিত করতে পারেনি আওয়ামী লীগের শাসককুলের হৃদয়। আর সেই সময়েই শেখ মুজিবের ৫৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ৫৫ পাউন্ড ওজনের কেক কাটেন শেখ মুজিব নিজেই!!!
 
২৩শে সেপ্টেম্বর সারাদেশে ৪৩০০ লঙ্গরখানা খোলার কথা ঘোষণা করা হয়। সে সমস্ত লঙ্গরখানার ইতিহাস আর এক করুণ কেলেঙ্কারীর ইতিহাস। নওগাঁর আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য ২৪শে সেপ্টেম্বর এক বিবৃতি দিয়ে জানান যে, সারা জেলার মানুষ গত ৩-৪ দিন ধরে না খেয়ে আছে। চালের সের সাত টাকা। তার ক’দিন পরেই ৬ই অক্টেবর ইত্তেফাক খবর দেয় যে, ২১ লাখ টাকার বিদেশী মদ ও সিগারেট আমদানি করা হয়েছে সরকারি টাকায়। ঐ দিনই খাদ্যমন্ত্রী বললেন, “তখন পর্যন্ত অনাহারে কতলোক মরেছে সরকারের তা জানা নেই। প্রকাশিত পত্রিকাগুলোর খবর অতিরঞ্জিত।” তবে তিনি স্বীকার করেন চোরাচালান কিছুটা হয়েছে।

৮ই অক্টোবর অধ্যাপক আবুল ফজলসহ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৪ জন শিক্ষক এক বিবৃতিতে বলেন, “জাতির জীবনে দুর্যোগ মোকাবেলার প্রতি এত অনাসক্তি, এত অবজ্ঞা, এত অদ্ভুত রকম ঔদাসীন্য কখনও দেখা গেছে বলে মনে হয় না। নিজের প্রতি আস্থাহীন জাতি যে কী রকম জড় পদার্থে পরিণত হতে পারে বর্তমান বাংলাদেশ তার জ্বলন্ত উদাহরণ। স্বাধীনতা সংগ্রামের সেই একাত্মতা, ত্যাগের মহৎ শক্তির সেই প্রচন্ডতা পরবর্তিকালে সিদ্ধান্তহীনতায়, ভুল সিদ্ধান্তে, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তায় আর গুটিকতক লোকের লাগামহীন দুর্নীতির সয়লাবে সব ধুয়ে গেছে। দেশের নেতৃত্বের প্রতি এই জাতীয় দুর্দিনে আমাদের আকুল প্রার্থনা, জাতি হিসেবে আমাদের শক্তিতে আস্থাবান হওয়ার পরিবেশ ফিরিয়ে দিন।”

৮ই অক্টোবর ১৯৭৪ শ্রমিক লীগের আব্দুল মান্নান এমপি জানান, “লবনের দুঃপ্রাপ্যতা সম্পর্কে সম্ভাব্য সকল প্রকার খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে যে, মজুতদার উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে ২টাকা মন দরে লবন কিনে থাকে। সরকারিভাবে মজুতদারদের জন্য অশোধিত লবনের দাম ১৫ টাকা আর শোধিত লবনের দাম ৫৫ টাকা নির্ধারিত করা হয়েছে।” তিনি আরো বলেন, “অশোধিত লবনের দাম ৪০ টাকা করা হলে বাজারে প্রচুর লবন পাওয়া যাবে। প্রকাশ, এ ব্যাপারে নাকি আমাদের দলীয় কোন কোন সংসদ সদস্য জড়িত রয়েছেন বলে অনুমান করা হচ্ছে।”
 
১৩ই অক্টোবর ঢাকার সংবাদপত্র সূত্রে জানা যায় যে, প্রতিদিন গড়ে ৮৪টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন হচ্ছে। ২৭শে অক্টোবর খবর আসে জামালপুরে প্রতিদিন অনাহারে শতাধিক লোক মারা যাচ্ছে। সরকার এই মৃত্যুকে পুষ্টিহীনতা বলে অভিহিত করে। অনাহারে মানুষ মরছে সরকার সেটা অস্বীকার করে। ২৫শে অক্টোবর ঢাকার সংবাদপত্রে বের হয় ট্রাক বোঝাই ধানচাল ভারতে পাচাঁর হচ্ছে। দিনাজপুরে চালের সের ৮ টাকা। ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য মানিকগঞ্জের এক পরিবারের ৭জন আত্মহত্যা করেছে। এসময়ে ২৫শে অক্টোবর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি জনাব কামরুজ্জামান দাবি করেন, “দেশের প্রচলিত আইনে চোরাচালানীদের দমন করা হচ্ছে না। কয়েক মাস আগে সংসদে চোরাচালানীদের গুলি করে হত্যা করার বিধান পাশ হয়। কিন্তু কাউকে কোন দিন ঐ বিধানে হত্যা করা হয়নি।” একই সঙ্গে কামরুজ্জামান অবশ্য বলেন, “দলের ভেতর থেকে দলের সমালোচনা চলবে না।” তখন থেকে আওয়ামী লীগের ভেতরেও কোন্দল দানা বেঁধে উঠে। সেই ক্রান্তিলগ্নে ২৬শে অক্টোবর ’৭৪ স্বাধীনতা সংগ্রামকালের প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজুদ্দিন আহমদ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের নির্দেশে মন্ত্রীত্ব হারান। জনাব তাজুদ্দিন এক বিবৃতিতে বলেন, “জাতির বৃহত্তর স্বার্থে তিনি কোন বিতর্ক সৃষ্টি করতে চান না।” ঢাকার এবং বিদেশী সাংবাদিকদের মতে স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করায় জনাব তাজুদ্দিন আহমদের যে ইমেজ গড়ে উঠে তা পাকিস্তানে আটক শেখ মুজিবর রহমান সহ্য করতে পারছিলেন না। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে আটক শেখ মুজিবের চেয়ে স্বাধীনতার প্রশ্নকে বড় করে দেখার জন্য বেগম মুজিবও তাজুদ্দিনকে সহ্য করতে পারতেন না বলে জানা যায়। তাজুদ্দিন সম্পর্কে সরকার পক্ষ থেকে প্রচার চালানো হয় যে, তিনি অর্থমন্ত্রী থাকাকালে দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের পথে চলে যায়। তাজুদ্দিন আহমদ বাকশালের কেন্দ্রিয় কমিটি থেকেও পরবর্তিতে বাদ পড়েন।

২৯শে অক্টোবর সারাদেশে ধর্মঘট নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। একই দিন মজুতদারী আর কালোবাজারীর দায়ে আওয়ামী লীগের আর একজন সংসদ সদস্য গ্রেফতার হন। ৩০ তারিখে লবন মজুতের জন্য আওয়ামী লীগের এমপি ডঃ শামসুদ্দিন আহমদকে গ্রেফতার করা হয়।

এ অবস্থায় মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ ও আইন সাহায্য কমিটির উদ্যোগে ১লা নভেম্বর ১৯৭৪ বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গনে শিক্ষক, আইনজীবি, চিকিৎসক, লেখক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, চিত্রশিল্পী ও ছাত্রসহ বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত ব্যক্তিরা বাংলাদেশের বর্তমান মন্বন্তর প্রতিরোধের জন্য আন্দোলন গঠনের উদ্দেশ্যে এক বিরাট সমাবেশে যোগদান করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বুদ্ধিজীবিদের এত বিরাট সমাবেশ ইতিপূর্বে আর অনুষ্ঠিত হয়নি। ‘মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ ও আইন সাহায্য কমিটির’ সভাপতি সিকান্দার আবু জাফরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দুই ঘন্টার উপর এ অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন এডভোকেট মির্জা গোলাম হাফিজ, ডঃ আহমদ শরীফ, মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সম্পাদক জয়নাল আবেদীন, ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমেদ, এনায়েত উল্লাহ খান, কামরুন্নাহার লাইলী, নিজামুদ্দিন আহমদ, মহিউদ্দিন আলমগীর, মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির মুহাম্মদ জাকারিয়া এবং বদরুদ্দিন উমর। সমাবেশে বিদ্যমান মন্বন্তর পরিস্থিতি ও মৌলিক আধিকার সম্পর্কে ১৭টি প্রস্তাব গৃহিত হয়। সমাবেশের পর বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গন থেকে একটি মিছিল বের হয়ে শহীদ মিনার পর্যন্ত যায় এবং সেখানেই সমাবেশের কর্মসূচী শেষ হয়। সমাবেশে গৃহিত প্রস্তাববলীর বিবরণ:-<br /> 
১৯৭৪ সালের ১লা নভেম্বর বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত মন্বন্তরের গৃহিত প্রস্তাবে বলা হয় যে, এই মন্বন্তরের ব্যাপকতা ও ভয়াবহতা ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের ব্যাপকতা ও ভয়াবহতাকেও অতিক্রম করেছে এবং এই মম্বন্তর, বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে সৃষ্টি হয়নি বরং শাসকশ্রেণী ও তাদের সহযোগীদের গণবিরোধী নীতি ও কর্মকান্ডেরই প্রত্যক্ষ পরিণতি। সমাবেশের প্রস্তাবে এই মন্বন্তরকে ‘প্রায় দুর্ভিক্ষাবস্থা’ বলে বর্ণনা না করে একে মন্বন্তর বলে ঘোষণার জোর দাবি জানানো হয়। প্রস্তাবে বৈদেশিক সাহায্যের একটি শ্বেতপত্র ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।

সমাবেশের প্রস্তাবে সর্বদলীয় রিলিফ কমিটি গঠনে সরকারের বিরোধিতার নিন্দা করে অবিলম্বে একটি সর্বদলীয় রিলিফ কমিটি গঠন করার দাবি জানানো হয় এবং এ ব্যাপারে বিরোধী দলসমূহের প্রতি উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণের আহ্‌বান জানানো হয়। এছাড়াও রেশনিং এলাকা সম্প্রসারন ও টেষ্ট রিলিফ চালু করার দাবি জানানো হয়। সমাবেশের প্রস্তাবে লঙ্গরখানার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সেখানে নির্যাতন বন্ধ করার দাবি জানানো হয়। মন্বন্তর প্রতিরোধ আন্দোলন সমাবেশে রেডক্রসের চেয়ারম্যান হিসাবে সুপ্রীম কোর্টের একজন বিচারপতিকে নিয়োগ করার দাবি জানানো হয়। রাজনৈতিক নির্যাতন বন্ধ ও মিথ্যা মামলায় আটক ও বিনা বিচারে আটক রাজনৈতিক বন্দীসহ সকল রাজবন্দীর মুক্তির দাবি জানানো হয়।

পরবর্তিকালে বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় আওয়ামী লীগ সরকার ও সরকারি দলের নেতা-সদস্যদের রিলিফ চুরির ও চোরাচালানের বিবরণ দিতে গিয়ে ১৩ই আগষ্ট ১৯৯২ সালে সংসদে বলেছিলেন, “রিলিফ চুরি ও চোরাচালানের মাত্রা এতটা বৃদ্ধি পেয়েছিল আওয়ামী শাসনামলে যে তদানীন্তন রাষ্ট্রপ্রধানকে বলতে হয়েছিল, ‘আমার কম্বলটা কোথায়??’ ”(২১শে আগষ্ট ১৯৯২ বিচিত্রায় প্রকাশিত)।

সেই সময় বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা সংসদে উপস্থিত ছিলেন কিন্তু ঐ বক্তব্যের বিরোধিতা করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তিক্ত সত্যকে গলঃধরণ করে তাকে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকতে হয়েছিল বাধ্য হয়ে অসহায়ের মত। 

সূত্র : মাহমুদ ইমতিয়াজ

১৯৭৫ সালের সংবাদপত্রে ১৫ আগস্ট

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট ছিল শুক্রবার। সকালে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা ছিল। ওই খবর ফলাও করে পত্রিকায় ছাপা হয়। দৈনিক বাংলা ও ইত্তেফাক-এ প্রকাশিত হয় আট পৃষ্ঠার বিশেষ ক্রোড়পত্র। আর এই পত্রিকা পাঠকের হাতে পৌঁছানোর আগেই সপরিবারে নিহত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৭৫ সালের ১ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত সংবাদপত্রের খবর ছিল অনেকটাই বাকশালকেন্দ্রিক। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করা হয়। কিন্তু আগস্টে বাকশালের সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। এর পাশাপাশি, বঙ্গবন্ধু সরকারকে উত্খাতের ষড়যন্ত্র যে চলছিল তার প্রমাণ ১৫ আগস্ট।

দৈনিক ইত্তেফাক-এর ৪ আগস্ট সংখ্যার শীর্ষ খবর ছিল ‘জেলা বাকশাল সম্পাদক ও যুগ্ম সম্পাদকদের নাম ঘোষণা’। ওই দিন দৈনিক বাংলার শীর্ষ খবর ছিল ‘জাতীয় দলের জেলা সম্পাদকদের নাম ঘোষণা’। ওই খবরের উপশিরোনামে বলা হয়, প্রতিটি কমিটিতে একজন সাধারণ সম্পাদক ও পাঁচজন যুগ্ম সম্পাদক নিয়োগ। ৫ আগস্ট বাকশালের জেলা সম্পাদকদের প্রশিক্ষণের খবর ছাপা হয় দৈনিক বাংলার প্রথম পাতায়। অবশ্য ওই দিন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাকের বরাত দিয়ে পত্রিকাটির শীর্ষ খবরে বলা হয় ‘আটটি দেশের সঙ্গে শুল্ক রহিতের চুক্তি হবে।’

বাকশাল নিয়ে ১০টি খবর: ১৫ আগস্ট দৈনিক বাংলার প্রথম পাতায় বাকশাল নিয়ে ১০টি খবর প্রকাশিত হয়। প্রধান শিরোনাম ছিল ‘গ্রামপর্যায়ে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে’। শিল্পমন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামান বাকশাল জেলা সম্পাদকদের প্রশিক্ষণ কোর্সে এ কথা বলেন। ওই অনুষ্ঠানে প্রত্যেক মন্ত্রীর বক্তব্য আলাদা শিরোনামে এক বা দুই কলামে প্রকাশ হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী আব্দুল মান্নান বলেন, ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য চাই পরিকল্পিত জনসংখ্যা’। শ্রম ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী বলেন, ‘প্রথম পরিকল্পনাকালে ৪১ লাখ নতুন চাকরি হবে’। শিক্ষামন্ত্রী মোজাফফর আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘দ্বিতীয় বিপ্লব সফল করতে সততার সাথে কাজ করুন’। আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর বলেন, ‘ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাই সমাজতন্ত্রে উত্তরণের পথ’। বাকশালের সাধারণ সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মনি জেলা সম্পাদকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন না’। এ ছাড়া প্রথম পৃষ্ঠায় আরেকটি খবরের শিরোনাম ছিল, বঙ্গবন্ধু কাল জেলা গভর্নর ও সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হবেন। অপর খবরটি ছিল জেলা সম্পাদক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ রদবদল।
দৈনিক বাংলার প্রথম পাতায় বাকশাল নিয়ে ১০টি খবর প্রকাশ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এটা স্পষ্ট যে তখন সরকার কর্মকাণ্ড ছিল মূলত বাকশালকেন্দ্রিক। ১৪ আগস্টের পত্রিকায়ও বাকশাল জেলা সম্পাদকদের প্রশিক্ষণ কোর্সে তথ্যমন্ত্রী কোরবান আলীর ‘অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যই দ্বিতীয় বিপ্লব’ শীর্ষক বক্তব্য শীর্ষ খবর হিসেবে ছাপা হয়। এ ছাড়া জিল্লুর রহমান, আব্দুর রাজ্জাক, শেখ ফজলুল হক মনি, অধ্যাপক ইউসুফ আলীসহ কয়েকজন বাকশাল নেতার বক্তব্য পৃথক শিরোনামে প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছিল।

১৩ আগস্টও দৈনিক বাংলার খবরে প্রাধান্য পায় বাকশালের খবর।
সেদিন সেজেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ১৫ আগস্ট, রাষ্ট্রপতি হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা। ওই দিন দৈনিক বাংলার প্রথম পৃষ্ঠায় বাম পাশে দুই কলামে প্রধান খবরে বলা হয়, ‘বঙ্গবন্ধু আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করবেন।’ এ খবরের পাশাপাশি আরেকটি খবর ছিল ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণের সাড়া’। পত্রিকার শেষ পাতায় বঙ্গবন্ধুর হাস্যোজ্জ্বল ছবি দিয়ে বক্স ফিচার ছিল ‘বঙ্গবন্ধুকে আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বাগত জানাবে’। ওই দিন সকালে পাঠক পত্রিকায় এ খবর পেলেও তার আগেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। অবশ্য ওই দিন কোনো সংবাদমাধ্যম সে খবর প্রকাশ করতে পারেনি।
দৈনিক বাংলায় যা ছাপা হয়েছিল: বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পরদিন ১৬ আগস্ট দৈনিক বাংলার শীর্ষ খবর ছিল ‘খন্দকার মোশতাক নয়া রাষ্ট্রপতি’। ওই খবরের উপশিরোনামে ছোট্ট করে বলা হয়, ‘শেখ মুজিব নিহত: সামরিক আইন ও সান্ধ্য আইন জারি: সশস্ত্র বাহিনীসমূহের আনুগত্য প্রকাশ’।
খবরের প্রথম অনুচ্ছেদ ছিল—‘শুক্রবার সকালে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের পতন ঘটিয়ে প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে ক্ষমতা গ্রহণ করে। সশস্ত্র বাহিনীর এই ক্ষমতা গ্রহণের সময় সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বাসভবনে নিহত হন বলে বলে ঘোষণা করা হয়।’
সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস-এর বরাত দিয়ে একই খবরে বলা হয়, সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য সামরিক আইন ঘোষণা ও সান্ধ্য আইন জারি করা হয়। দুপুরের পর অবশ্য মুসল্লিদের জুমার নামাজ আদায়ের সুবিধার্থে দেড় ঘণ্টার জন্য সান্ধ্য আইন তুলে নেওয়া হয়।
ওই খবরে অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি সৈয়দ এ বি মাহমুদ হোসেনের কাছ থেকে খন্দকার মোশতাকের শপথ নেওয়ার তথ্য, মোহাম্মদ উল্লাহকে ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগ, ১০ মন্ত্রী ও ছয় প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়। আরও উল্লেখ করা হয়, সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ, নৌবাহিনী প্রধান কমোডর মোশাররফ হোসেন খান এবং বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার পৃথক পৃথক বেতার ভাষণে মোশতাক আহমদের নেতৃত্বাধীন নয়া সরকারের প্রতি আনুগত্য ও দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান, রক্ষীবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সাবিউদ্দিন আহমেদ এবং আইজিপি এ এইচ নুরুল ইসলাম বেতার মারফত মোশতাক সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন মর্মে খবর প্রকাশ করা হয়।
ওই সংখ্যায় শীর্ষ খবরের বাঁ পাশে ছিল অস্থায়ী প্রধান বিচারপতির কাছে মোশতাকের শপথ নেওয়ার ছবি। এর নিচে ছিল ‘দুর্নীতির সঙ্গে আপস নেই’ মর্মে মোশতাকের বেতার ভাষণ। ওই ভাষণের প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘প্রিয় দেশবাসী ভাই ও বোনেরা। এক ঐতিহাসিক প্রয়োজনে এবং বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের সঠিক ও সত্যিকারের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপদানের পূত-পবিত্র দায়িত্ব সামগ্রিক ও সমষ্টিগতভাবে সম্পাদনের জন্য পরম করুণমায় আল্লাহ তায়ালা ও বাংলাদেশের গণমানুষের দোয়ার ওপর ভরসা করে রাষ্ট্রপতি হিসেবে সরকারের দায়িত্ব আমার ওপর অর্পিত হয়েছে। বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের বজ্রকঠিন দায়িত্ব সম্পাদনের পথ সুগম করার জন্য বাংলাদেশের সেনাবাহিনী সত্যিকারের বীরের মতো অকুতোভয়চিত্তে এগিয়ে এসেছেন।’

দৈনিক ইত্তেফাকে যা ছাপা হয়েছিল: ১৬ আগস্ট ইত্তেফাকে মূল শিরোনাম ছিল ‘খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনীর শাসনক্ষমতা গ্রহণ’। খবরের কোথাও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার কথা উল্লেখ করা হয়নি। শীর্ষ খবরের প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী জাতির বৃহত্তর স্বার্থে গতকাল প্রত্যুষে সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতাচ্যুত করিয়া দেশের শাসনভার গ্রহণ করিয়াছেন। শাসনভার গ্রহণকালে সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান স্বীয় বাসভবনে নিহত হইয়াছেন।’
ওই দিন ইত্তেফাকের বিশেষ সম্পাদকীয় ছিল ‘ঐতিহাসিক নবযাত্রা’। এর শুরুতে বলা হয়, দেশ ও জাতির এক ঐতিহাসিক প্রয়োজন পূরণে গতকাল প্রত্যুষে প্রবীণ জননায়ক খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী সরকারের সর্বময় ক্ষমতা গ্রহণ করিয়াছেন। পূর্ববর্তী সরকার ক্ষমতাচ্যুত হইয়াছেন।
সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জীবনে এই পরিবর্তনের এক বিষাদময় গুরুত্ব রহিয়াছে। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত ও অসংখ্য মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা একদিন যে স্বাধীনতা অর্জন করিয়াছিলাম সেখানে আমাদের আশা ও স্বপ্ন ছিল অপরিমেয়। কিন্তু গত সাড়ে তিন বছরেরও ঊর্ধ্বকালে দেশবাসী বাস্তবক্ষেত্রে যাহা লাভ করিয়াছে তাহাকে এক কথায় গভীর হতাশা ও বঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। ...গণমানুষের ভাগ্য উন্নয়নের পরিবর্তে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির আশ্রয় গ্রহণ করিয়া এবং একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাখিবার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষায় মাতিয়া উঠিয়া স্বাধীনতার সুফল হইতে জনগণকে নির্মমভাবে বঞ্চিত করা হইয়াছে।’ সম্পাদকীয়তে এসব প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সামরিক হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে ওঠার কথা উল্লেখ করা হয়।

১৬ আগস্টের ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবার ও নিরাপত্তাকর্মীদের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কোনো তথ্য ছিল না। অন্যান্য খবরের মধ্যে ছিল মোশতাক সরকারের প্রতি পাকিস্তানের স্বীকৃতি, নয়া সরকারের জন্য জুমার নামাজ শেষে বিশেষ মোনাজাত, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাভাবিক কূটনৈতিক কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ, বিদেশি দূতাবাসের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার আশ্বাস, গাজী গোলাম মোস্তফাকে অপসারণ করে বি এ সিদ্দিকীকে রেডক্রসের চেয়ারম্যান নিয়োগ, লন্ডন হাইকমিশন ভবনে বিক্ষোভ ও সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি নামিয়ে ফেলাসহ কয়েকটি খবর।
ওসমানি, জিয়া, এরশাদ ও ভাসানী: ২৪ আগস্ট মোশতাক সরকারের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা পরদিন সংবাদপত্রে প্রকাশ হয়। রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান জেনারেল এম এ জি ওসমানি। দৈনিক বাংলায় এ সংক্রান্ত খবরে বলা হয়, জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ওসমানী জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন। একদলীয় শাসন পদ্ধতি নিয়ে মতানৈক্যের কারণে তিনি পদত্যাগ করেন। ওই দিনের পত্রিকায় মওলানা হামিদ খান ভাসানী বিবৃতিতে বলেন, মুষ্টিমেয় সংখ্যক লোক মুজিব সরকারের সহায়তায় বিদেশি শোষকদের সঙ্গে আঁতাত করে কোটি কোটি টাকার সম্পদ দেশের বাইরে পাচার করে দিয়েছে। তিনি দুর্নীতিবাজদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তাদের কঠোর সাজা দেওয়ার দাবি জানান।

এদিকে ২৪ আগস্ট সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং দৈনিক বাংলায় এটা ছিল মূল খবর। এতে সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে রদবদলের খবর প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দিয়ে কে এম সফিউল্লাহর চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল খলিলুর রহমানকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ভারতে প্রশিক্ষণরত ব্রিগেডিয়ার এইচ এম এরশাদকে মেজর জেনারেল পদমর্যাদায় উন্নীত করে মেজর জিয়ার স্থলে ডেপুটি চিফ অব আর্মি স্টাফ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার কাজী গোলাম দস্তগিরকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে বিডিআরের মহাপরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

অন্যান্য খবর: ১৫ আগস্টের পর সংবাদমাধ্যমে মোশতাক সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে। এ ছাড়া উন্নয়ন ও আশাব্যঞ্জক খবর প্রকাশিত হয়। ২০ আগস্ট দৈনিক বাংলার শীর্ষ খবর ছিল ‘নয়া সরকারের সাথে বাদশাহ খালেদের ইসলামী সংহতি প্রকাশ, সৌদী আরব ও সুদানের স্বীকৃতি’। ওই দিন প্রথম পৃষ্ঠায় ছবিসহ খন্দকার মোশতাকের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ছাপা হয়। আরেক খবরে বলা হয়, ‘দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি সন্তোষজনক’।

২৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী মনসুর আলী, উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রী কোরবান আলী ও আব্দুস সামাদ আজাদসহ ২৬ শীর্ষ মন্ত্রী, সাংসদ ও বাকশাল নেতাকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়। ওই সময়ের পত্রিকায় ভারত, পাকিস্তান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, সুদানসহ বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি বড় করে ছাপা হয়।

২২ আগস্ট মোশতাক সরকার দৈনিক ইত্তেফাক ও সংবাদ তাদের আগের মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তথ্যমন্ত্রী তাহেরউদ্দিন ঠাকুরের এই ঘোষণা ২৩ আগস্ট দৈনিক বাংলায় ছাপা হয়। 

সূত্র : প্রিয়বই .কম

আওয়ামী লীগ ও রক্ষীবাহিনীর নির্যাতন : কেউ ভোলে কেউ ভোলে না (পর্ব-২)

১৯৭২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রক্ষীবাহিনী গঠিত হয়। গঠনের পর থেকেই এ রক্ষীবাহিনী সবসময় সরকার প্রধানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থেকে কাজ করেছে। রক্ষী বাহিনী গঠন সম্পর্কে এনায়েতুল্লাহ খান লিখেছেনঃ 'একটি বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত এই এলিট ফোর্স সৃষ্টির ইতিহাস আরো বিচিত্র। মুজিব বাহিনীর নেতৃবৃন্দের পরিকল্পনা অনুযায়ী শেখ মুজিবর রহমানের স্বহস্তে লিখিত পত্রের ওপর ভিত্তি করে এবং তারি উত্তরাধিকারীদের নেতৃত্বে এই রাজনৈতিক বাহিনী গঠন করা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, দেরাদুনে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত এই বিশেষ প্রতিবিপ্লবী সংগঠন জেনারেল ওসমানী পরিচালিত মুক্তিবাহিনী এমন কি তাজুদ্দিনের নিয়ন্ত্রণেও ছিল না। জনৈক ভারতীয় সেনাবাহিনীর জেনারেল ওবানের প্রত্যক্ষ পরিচালনায় এর সাংগঠনিক কাঠামো এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে একথাই নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে, জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সংগে এই বাহিনীর মৌলিক বিরোধ ছিল।’

অন্যদিকে রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার ও হত্যার লাইসেন্স দেয়া প্রসঙ্গে ১৯৭২ সালের ২ এপ্রিল সাপ্তাহিক হলিডে পত্রিকার ‘স্যাংশান টু দ্য কিল ডিসেন্টার’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলা হয়, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব যখন প্রকাশ্যে জনসভায় নির্দেশ দিলেন, “নক্সালদের দেখামাত্র গুলী কর” তখন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চালানোর জন্য অন্য কোনো অনুমোদনের আর দরকার পড়ে না।’ এ পত্রিকার ১৯৭৩ সালের ২০ মে প্রকাশিত ‘ভিসেজ অব কাউন্টার রেভ্যলুশন’ শীর্ষক প্রবন্ধে বলা হয়, “রক্ষীবাহিনী হচ্ছে প্রতি বিপ্লবের অস্ত্র, যার উপর এমনকি সর্বভুক শাসক শ্রেণীর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ভারতীয় শাসক শ্রেণীর অনুগত এক সরকারকে এবং ভারতীয় উপ-সাম্রাজ্যবাদের সম্প্রসারণবাদী স্বার্থকে রক্ষা করার জন্য এটা হচ্ছে সিআরপির সম্প্রসারণ। এর নিঃশ্বাসে রয়েছে মৃত্যু আর ভীতি। আপনি অথবা আমি যে কেউ হতে পারি এর শিকার এবং বাংলাদেশের প্রশাসনের পুস্তকে আমাদের পরিচিতি হবে ‘দুষ্কৃতকারী’ হিসাবে।” 


রক্ষীবাহিনীকে ইনডেমনিটি দেয়া প্রসঙ্গে সাবেক উপরাষ্ট্রপতি ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদের লেখা, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল’ বইয়ে উল্লেখ করা হয়-‘যখন রক্ষীবাহিনীর আচরণ এবং ভুমিকা নিয়ে জনগণের অসন্তোষ চরম পর্যায়ে উপনীত হয় এবং দেশের সংবাদপত্রগুলো তাদের ক্ষমতা, কতৃ ত্ব ও ভুমিকা নিয়ে অব্যাহতভাবে প্রশ্ন উত্থাপন করতে থাকে তখন ২০ মাস কার্যধারা পরিচালনায় ঢালাও লাইসেস দেয়ার পর সরকার রক্ষী বাহিনীর তৎপরতাকে আইনসিদ্ধ প্রতিপন্ন করার লক্ষ্যেও একটি অধ্যাদেশ জারি করে।’

আজকের পর্বে রক্ষীবাহিনীর বর্বরতার দুটি চিত্র তুলে ধরবো। 

১.
রক্ষী বাহিনী এসে বিপ্লবকে প্রথম খুব মারধর করলো।.. খুব মেরে বিপ্লবের মা ও বাবাকে ডাকিয়ে আনলেন। তারপর বিপ্লবকে বললো,’কলেমা পড়’। বাধ্য হয়ে বিপ্লব হিন্দু হয়েও কলেমা পড়লো। এরপর বললো, ‘ সেজদা দাও পশ্চিমমুখী হয়ে।‘ ভয়ে বিপ্লব তাই করলো। যখন সেজদা দিল, পেছন থেকে বেয়োনেট চার্জ করে বাবা-মা ও অনেক লোকের সামনে হত্যা করলো তাকে। বেয়োনেট চার্জ করার সময় রক্ষীদের একজন বললো, মুসলমান হয়েছো, এবার বেহেশতে চলে যাও।... 

আমার সাথে যে ৪০জনের মতো ছেলে রাজনীতি করতো তারা সবাই ছিল ব্রিলিয়ান্ট, ফাস্টক্লাস পাবার মতো ছেলে। শুধু বেঁচে আছি আমি ও আরেকজন। বাকী সবাই রক্ষী বাহিনী, মুজিব বাহিনী ও মুজিবের অন্যান্য বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে গৌতম দত্তকে গ্রেফতার করা হয় ঢাকায় এবং হত্যা করা হয় কাটুবুলিতে তার নিজের বাড়িতে নিয়ে। রশিদকে হত্যা করা হয় রামভদ্রপুরে নিয়ে। ডামুড্যার আতিক হালদার, ধনুই গ্রামের মোতালেব এদেরকেও তাদের বাড়িতে নিয়ে আত্মীয়স্বজনের সামনে হত্যা করা হয়। পঁচাত্তরের প্রথম দিকে মোহর আলীকে ধরেছিল পুলিশে। শিবচর থেকে তাকে নিয়ে গিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তার শরীরের চামড়া খুলে লবণ মাখিয়ে তাকে হত্যা করা হয় এবং তার লাশ ডামুড্যা বাজারে টানিয়ে রাখা হয় কয়েকদিন। .... আঘাত এলো সিরাজ সরদারের উপরে। তিনি পালিয়ে গিয়ে সিরাজ সিকদারের বাহিনীতে আশ্রয় নিলেন। সিরাজ সিকদার তাকে চারজন গার্ড দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। একদিন তাকে ডেকে নিয়ে এলো। এরপর ঘেরাও করে প্রথমে তারা সিরাজ সিকদারের দেয়া চারজন গার্ডকে হত্যা করলো। আর সিরাজ সিরদারকে নিয়ে এলো নদীতে। নৌকার মাঝির বর্ণনামতে, প্রথমে তারা সিরাজ সরদারের হাতের কব্জি কাটল, তারপর পা ও অন্যান্য অংগ প্রত্যঙ্গ কেটে এবং শরীরের মাংস কেটে টুকরো টুকরো করে নদীতে ফেলে দিলো।‘ ( বামপন্থী নেতা শান্তি সেনের বর্ণনা)

২.
’৭৩ সালের প্রথম থেকেই গ্রামে গ্রামে চলে রক্ষীবাহিনীর বর্বর, নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক অভিযান। মুজিব আমলের স্বৈরাচার ও বিরোধী নির্যাতনের একটি দলিল আত্মগোপনকারী কম্যুনিষ্ট নেতা শান্তি সেনের স্ত্রী শ্রীমতি অরুণা সেনের বিবৃতি। অরুনা সেন, রানী সিংহ ও হনুফা বেগমকে ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার রামভদ্রপুর গ্রাম থেকে রক্ষীবাহিনী ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা দায়ের করেনি। তাদেরকে কোন আদালতেও হাজির করেননি। ঢাকার বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় এ নিয়ে অনেক লেখালেখি হয় এবং পরে সুপ্রীম কোর্টে তাদের পক্ষে রীট আবেদন করার পর কোর্টের নির্দেশে তাদেরকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার শুনানির সময় সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রমাণযোগ্য অভিযোগ আনতে অক্ষম হওয়ায় সুপ্রীম কোর্ট অবিলম্বে তাদের তিনজনকেই বিনা শর্তে মুক্তিদানের নির্দেশ দেন। অরুণা সেন ও অন্যান্যদের পক্ষে এই মামলা পরিচালনা করেছিলেন ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ ও ব্যারিষ্টার জমিরুদ্দিন সরকার। 

মুক্তি পাবার পর আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যায়-নির্যাতনের স্বরূপ প্রকাশের জন্য শ্রীমতি অরুণা সেনের সংবাদপত্রে একটি বিবৃতি দেন। তিনি বলেন, 

“গত ১৭ই আশ্বিন রক্ষীবাহিনীর লোকেরা আমাদের গ্রামের ওপর হামলা করে। ঐদিন ছিল দূর্গাপূজার দ্বিতীয় দিন। খুব ভোরে আমাকে গ্রেফতার করে। গ্রামের অনেক যুবককে ধরে বেদম মারপিট করে। লক্ষণ নামের একটি কলেজের ছাত্র ও আমাকে ধরে তারা নড়িয়া রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে জিজ্ঞাসা করে আমার স্বামী শান্তি সেন ও পুত্র চঞ্চল সেন কোথায়? বলে তারা রাষ্ট্রদ্রোহী, তাদের ধরিয়ে দিন। আরো জিজ্ঞাসাবাদের পর সন্ধ্যার দিকে তারা আমাকে ছেড়ে দেয়। লক্ষণকে সেদিন রেখে পরদিন ছেড়ে দেয়। সে যখন বাড়ি ফেরে, দেখি বেদম মারের ফলে সে গুরুতররূপে আহত ও অসুস্থ হয়ে পড়েছে। চার/পাঁচ দিন পর আবার তারা আমাদের গ্রামের উপর হামলা চালায়। অনেক বাড়ি তল্লাশী করে। অনেককে মারধর করে। কৃষ্ণ ও ফজলু নামের দু’জন যুবককে তারা মারতে মারতে নিয়ে যায়। আজও তারা বাড়ি ফিরে আসেনি। তাদের আত্মীয়রা ক্যাম্পে গিয়ে তাদের খোঁজ করলে বলে দেওয়া হয় তারা সেখানে নেই। তাদেরকে খুন করে গুম করে ফেলা হয়েছে বলেই মনে হয়। এরপর মাঝে মাঝেই তারা গ্রামে এসে যুবক ছেলেদের খোঁজ করত। 

গত ৩রা ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪ রাতে রক্ষীবাহিনী এসে সম্পূর্ণ গ্রামটিকে ঘিরে ফেলে। ভোরে আমাকে ধরে নদীর ধারে নিয়ে গেল। সেখানে দেখলাম, গ্রামের উপস্থিত প্রায় অধিকাংশ সক্ষম দেহী পুরুষ এমনকি বালকদের পর্যন্ত এনে হাজির করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের থানা সম্পাদক হোসেন খাঁ সবকিছুর তদারকি করছে। আমার সামনে রক্ষীবাহিনী উপস্থিত সকলকে বেদম মারপিট শুরু করে। শুনলাম এদের ধরতে গিয়ে বাড়ির মেয়ে-ছেলেদেরও তারা মারধর করে এবং অনেকক্ষেত্রে অশালীন আচরণ করেছে। এরপর আমাকে রক্ষীবাহিনীর কমান্ডার হুকুম করল পানিতে নেমে দাড়াতে। সেখানে নাকি আমাকে গুলি করা হবে। আমি নিজেই পানির দিকে নেমে গেলাম। ওরা রাইফেল উচিঁয়ে তাক করল গুলি করবে বলে। কিন্তু পরষ্পর কী সব বলাবলি করে রাইফেল নামিয়ে নিল। আমি কাঁদা-পানিতে দাঁড়িয়েই থাকলাম। কমান্ডার গ্রেফতার করা সবাইকে হিন্দু মুসলমান দুই কাতারে ভাগ করে দাড় করালো। মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিয়ে বলল, ‘মালাউনরা আমাদের দুশমন। তাদের ক্ষমা করা হবে না। তোমরা মুসলমানরা মালাউনদের সাথে থেকো না। তোমাদের এবারের মত মাফ করে দেয়া হল।’ এই বলে কলিমুদ্দিন ও মোস্তাফা নামের দু’জন মুসলমান যুবককে রেখে বাকি সবাইকে এক একটা বেতের বাড়ি দিয়ে বলল, ‘ছুটে পালাও’। তারা ছুটে পালিয়ে গেল। আমার পাক বাহিনীর কথা মনে পড়ল। তারাও বিক্ষুব্ধ জনতাকে বিভক্ত করতে এমনিভাবে সাম্প্রদায়িকতার আশ্রয় নিয়েছিল। পার্থক্য শুধু তারা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়ীকতার আশ্রয় নিত আর এই ধর্মনিরপেক্ষতার ধব্জাধারীরা ভন্ডামীর আশ্রয় নিচ্ছে। আমাকে ছেড়ে দিয়ে ওরা কলিমুদ্দিন ও মোস্তাফাসহ ২০জন হিন্দু যুবককে নিয়ে রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পের দিকে রওনা হল। তিনজন ছাড়া এরা সবাই পেশায় জেলে। মাছ ধরে কোনরকমে তারা জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের আত্মীয়-স্বজনরা সব আকুল হয়ে কান্নাকাটি করতে থাকল। সে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য! সন্ধ্যার সময় কলিমুদ্দিন, মোস্তাফা, গোবিন্দনাগ ও হরিপদ ঘোষ ছাড়া বাকি সবাই গ্রামে ফিরে এল। আমি গেলাম তাদের দেখতে। দেখলাম তারা সবাই চলতে অক্ষম। সর্বাঙ্গ ফুলে গেছে তাদের। বেত ও বন্দুকের দাগ শরীর কেটে বসে গেছে। চোখ-মুখ ফোলা। হাতপায়ের গিরোতে রক্ত জমে আছে। তাদের কাছে শুনলাম, সারাদিন দফায় দফায় তাদের চাবুক মেরেছে। গলা ও পায়ের সঙ্গে দড়ি বেঁধে পানিতে বার বার ছুড়ে ফেলে ডুবিয়েছে। পিঠের নিচে ও বুকের উপর পা দিয়ে দু’দিক থেকে দু’জন লোক তাদের উপর উঠে দাড়িয়েছে। মই দিয়ে ডলেছে। এদের অনেককেই আত্মীয়রা বয়ে এনেছে। এদের অবস্থা দেখে মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল। ভাবলাম, যারা দিনরাত্রি পরিশ্রম করেও একবেলা পেটপুরে খেতে পায়না, অনাহার, দুঃখ-দারিদ্রের জ্বালায় আজ অর্ধমৃত তাদের ‘মরার উপর খাড়ার ঘাঁ’র অবসান কবে হবে? যে শাসকরা মানুষের সামান্য প্রয়োজন ভাত-কাপড়ের ব্যবস্থা করতে পারছে না, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানী, শোষণ, নির্যাতন যারা বন্ধ করতে পারছে না, তারা কোন অধিকারে আজ নিঃস্ব মানুষের উপর চালাচ্ছে এই বর্বর নির্যাতন? অবশেষে চরম নির্যাতন আমার উপরও নেমে এল। 

৬ই ফেব্রুয়ারীর রাতে ভোর না হতেই রক্ষীবাহিনী ঘুম থেকে আমাকে তুলল। আমাকে বাড়ির বাইরে নিয়ে এলে দেখলাম রানীও রয়েছে। আমাদের নিয়ে তারা দুই মাইল দূরে ভেদরগঞ্জ রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পের দিকে রওনা হল। রাস্তায় তারা রানীর প্রতি নানারকমের অশ্লীল উক্তি করেছিল। ক্যাম্পে পৌঁছে দেখলাম সেখানে কলিমুদ্দিন, মোস্তাফা, গোবিন্দনাগ এবং হরিপদও রয়েছে। বুঝতে পারলাম তাদের উপর চরম দৈহিক নির্যাতন করা হয়েছে। বিশেষ করে কলিমুদ্দিন ও মোস্তাফাকেই বেশি অসুস্থ দেখলাম। কলিমুদ্দিন ও মোস্তাফা দুই ভাই। এদের সংসারে আর কোন সক্ষম ব্যক্তি নেই। অপরের জমিতে চাষ করে ওরা কোনরকমে জীবিকা নির্বাহ করে। এরা বিবাহিত ও ছোট ছোট ছেলেমেয়ের জনক। আমরা ক্যাম্পে আসতেই অনেক রক্ষীবাহিনী এসে আমাদের ঘিরে দাড়াল। কেউ অশ্লীল মন্তব্য করে, কেউ চুল ধরে টানে, কেউ চড় মারে, কেউ খোঁচা দেয়। এমন সব বর্বরতা। কিছুক্ষণ পর আমাদের রোদের মধ্যে বসিয়ে রেখে তারা চলে গেল। সন্ধ্যায় আমাকে উপরে দোতালায় নিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরেই শুনলাম রানীর হৃদয়বিদারী চিৎকার। প্রায় আধঘন্টা পর আর্তনাদ স্তিমিত হয়ে থেমে গেল। নিঃস্তব্ধ রাতের অন্ধকার ভেদ করে ভেসে আসছিল বেতের সপাং সপাং শব্দ আর পাশবিক গর্জন। রানীকে যখন এনে তারা কামরার মধ্যে ফেলল, রাত্রি তখন কত জানিনা। রানীর অচৈতন্য দেহ তখন বেতের ঘায়ে ক্ষতবিক্ষত। রক্ত ঝড়ছে। জ্ঞান ফিরলে রানী পানি চাইলো, আমি তাকে পানি খাওয়ালাম। রানী আস্তে আস্তে কথা বলতে পারল। রাত্রি তখন ভোর হয়ে এসেছে। রানীর মুখে শুনলাম উপরে ভেদরগঞ্জ ও ডামুড্যার আওয়ামী লীগ সম্পাদকরা এবং ঐ দুই স্থানের ক্যাম্প কমান্ডাররা উপস্থিত ছিল। তারা শান্তি সেন ও চঞ্চলকে ধরিয়ে দিতে বলে এবং অস্ত্র কোথায় আছে জিজ্ঞাসা করে। রানী কিছুই জানে না বলায় তাকে এমন সব অশ্লীল কথা বলে যা কোন সভ্য মানুষের পক্ষে বলা তো দূরের কথা কল্পনা করাও সম্ভব নয়। কিছুক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ ও গালি বর্ষণের পর ভেদরগঞ্জ ক্যাম্প কমান্ডার বেত নিয়ে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এলোপাতাড়ি এমন পেটাতে থাকে যে তিনখানা বেত ভেঙ্গে যায়। আবার জিজ্ঞাসা করে, শান্তি ও চঞ্চল কোথায়? রানীর একই উত্তর। ক্ষীপ্ত হয়ে রানীকে তারা সিলিং এর সাথে ঝুলিয়ে দেয় এবং দু্‌ই কমান্ডার এবার একই সাথে চাবুক দিয়ে পেটাতে শুরু করে। মারার সময় অসহ্য যন্ত্রণায় রানী বলেছিল, ‘আমাকে এভাবে না মেরে গুলি করে মেরে ফেলুন।’ জবাবে একজন বলে, ‘সরকারের একটা গুলির দাম আছে। তোকে সাতদিন ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলব। এখন পর্যন্ত মারার দেখেছোটা কি?’অল্পক্ষণ পরেই রানী অচেতন হয়ে পড়ে। কিন্তু তাদের চাবুক চালানো বন্ধ হয়নি। যখন জ্ঞান ফেরে রানী দেখে সে মেঝেতে পরে আছে। পানি চাইলে তারা তাকে পানি দেয় নাই। 
৮ই ফেব্রুয়ারী প্রথমে আমাকে ও পরে রানীকে দোতালায় নেয়া হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ডামুড্যার আওয়ামী লীগ সেক্রেটারী ফজলু মিঞা ও ভেদরগঞ্জের সেক্রেটারী হোসেন খাঁ। তারা চেয়ারে বসে আছেন।

আমাকে বলল, তোমার স্বামী ও ছেলেকে ধরিয়ে দাও। অস্ত্র কোথায় আছে বলে দাও। তারা ডাকাত, অস্ত্র দিয়ে ডাকাতি করে। আমি বললাম, তারা ডাকাত নয়। তারা সৎ দেশপ্রেমিক, আমার স্বামী রাজনীতি করেন এ কথা কে না জানে। দেশের সাধারণ লোকের অতি প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় তিনি। রানীকে তারা একই প্রশ্ন করেন। রানী কিছুই জানে না বলায় তারা ক্ষীপ্ত হয়ে উঠে। ডামুড্যা ক্যাম্পের কমান্ডার করম আলী এবং ভেদরগঞ্জ ক্যাম্প কমান্ডার ফজলুর রহমান আমাদের অশ্লীল গালাগাল দিতে শুরু করে এবং আমাকে ও রানীকে একসঙ্গে ঝুলিয়ে দিয়ে রানীর বস্ত্র খুলে নেয়। তারপর আমাদের দু’জনকে দু’দিক থেকে চাবুক মারতে থাকে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান হলে দেখি দু’জনেই মেঝেতে পরে আছি। রানীর সর্বাঙ্গ দিয়ে রক্ত ঝরছে। আমার গায়ে কাপড় থাকায় অপেক্ষাকৃত কম আহত হয়েছি। তবুও এই রুগ্ন বৃদ্ধ দেহে এই আঘাতই মর্মান্তিক। সর্বাঙ্গ ব্যাথায় জর্জরিত। তৃষ্ণায় বুক শুকিয়ে যাচ্ছে। নড়বার ক্ষমতা নেই। ওরা আমাদের দিকে তাকিয়ে নারকীয় হাসি হাসছে। এদের হুকুমে দু’জন সিপাই আমাকে টেনে তুলল। আমি অতিকষ্টে দাড়াতে পারলাম। রানী পারল না। দু’জন রক্ষী তার দুই বগলের নিচে হাত দিয়ে তাকে টেনে তুলল ও তার গায়ে কাপড় জড়িয়ে দিল। তারপর টানতে টানতে নিচে নামিয়ে নিয়ে এল। কমান্ডার পেছন থেকে নির্দেশ দেয় ওকে ভালো করে হাটা নয়তো মরে যাবে। সকালে কমান্ডার কয়জন রক্ষীসহ রানীকে নিয়ে গ্রামের দিকে রওনা হল। বলল, ‘বাচঁবিতো না, চল তোর মাকে দেখিয়ে আনি।’ 
রানীর সর্বাঙ্গ ফুলে কালো হয়ে গিয়েছে। পা ফেলবার ক্ষমতা নেই। সে অবস্থায় তাকে হেচঁড়াতে হেচঁড়াতে দু’মাইল পথ টেনে নিয়ে যাওয়া হল। রানীর মা রানীকে দেখেই অজ্ঞান হয়ে যান। কমান্ডার রানীকে তার মার মাথায় পানি দিতে বলে। রানীর মার জ্ঞান এলে রানীর চেহারা এমন কেন জিজ্ঞেস করায় কমান্ডার বলে পুকুর ঘাটে পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছে। রানীকে ছেড়ে দেবার অনুরোধ জানালে কমান্ডার বলে ‘খাসী খাওয়ালে ফিরিয়ে দিয়ে যাব।’ এরপর আবার দু’মাইল রাস্তা হেচঁড়াতে হেচঁড়াতে তাকে ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনা হল। ঐ দিন ছিল ৯ই ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪। হনুফাকেও তারা ধরে নিয়ে এল ঐদিন। করিম নামের আর একটি কৃষক যুবককেও ওরা ধরে এনেছে দেখলাম রামভদ্রপুর থেকে। তাকে এত মারা হয়েছে যে তার অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন। নড়িয়া থানার পন্ডিতসার থেকেও একজন স্কুল শিক্ষক ও দু’জন যুবককে এনেছে দেখলাম। বিপ্লব নামের একটি ছেলে নাকি মারের চোটে পথেই মারা যায়। রক্ষীবাহিনীর সিপাইরা বলাবলি করছিল। একজন জল্লাদ গর্জন করে বলছিল, ‘দেখ এখনও হাতে রক্ত লেগে আছে!’ শুনেছি মতি নামের আর একটি যুবককেও তারা পিটিয়ে মেরেছে। আর আমাদের ধরে আনার দু’দিন আগে কৃষি ব্যাংকের পিয়ন আলতাফকে পিটাবার পর হাত-পা বেধে দোতালার ছাদ থেকে ফেলে মেরে ফেলেছে। ৯ তারিখ দুপুরের অল্প পরে তারা হনুফা, রানী ও আমাকে নিয়ে গেল পুকুরের ধারে। সেখানে আমাদের একদফা বেত দিয়ে পিটিয়ে চুবানোর জন্য পানিতে নামাল। প্রথমে ওরা আমাদের সাতঁরাতে বাধ্য করল। আমরা ক্লান্ত হয়ে কিনারায় উঠতে চেষ্টা করি, ওরা আমাদের বাঁশ দিয়ে ঠেলে দূরে সরিয়ে দেয়। পরিশ্রান্ত হয়ে যখন আমরা আর সাঁতরাতে পারছিলাম না তখন পানি থেকে তুলে আবার বেত মারতে থাকে। শেষের দিকে আমরা যখন আর সাতঁরাতে পারছিলাম না, তখন আমাদের পানিতে ডুবিয়ে দেহের উপর দু’পা দিয়ে দাড়িয়ে থাকত। 

এভাবে আমাদের তিন দফা পেটানো ও চুবানো হয়। কিছুক্ষণ আগেই করিম মারের চোটে মরে গিয়েছে। আমাদের সঙ্গে আর একটি অল্প বয়সী যুবককে চুবিয়ে অচেতন করে ফেলেছিল। তাকে ঘাটলার উপর ফেলে রাখে। আমার আঁচল দিয়ে গা মোছানোর সময় হঠাৎ ছেলেটি চোখ খুলে তাকায়। আমি চোখের জল রাখতে পারলাম না। রক্ষীরা তাকে সরিয়ে নিয়ে যায়। পরে শুনেছি ছেলেটাকে নাকি মেরে ফেলেছে। সন্ধ্যার অল্প আগে আমাদের পানি থেকে তুলে ভিজা কাপড়েই থাকতে বাধ্য করল। দারুন শীতে আমরা কাঁপছি। প্রচন্ড জ্বর এসে গেছে সকলের। এমনি করেই রাতভর ছালার চটের উপর পরে থাকলাম। পরদিন রাতে রানীকে আবার নিয়ে গেল দোতালায়। সেখানে আবার তাকে ঝুলিয়ে বেত মারল। ১১ তারিখে আবার রানীর ওপর চলল একই অত্যাচার। রানী জ্ঞান হারাল। রক্ষী সিপাইদের বলাবলি করতে শুনলাম ‘রানী মরে গিয়েছে’। রানীর কাছে শুনলাম তার যখন জ্ঞান হল তখন সে দেখে তার পাশে ডাক্তার বসা। রানী জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি কে,আমি কোথায়?’ ডাক্তার জবাব দেয়, ‘আমি ডাক্তার, তুমি কথা বলো না।’ কিছুক্ষণ পর ডাক্তার চলে গেলে রানীকে তারা ধরাধরি করে নিচে আমাদের কাছে নিয়ে এল। 

একজন সিপাই রানী ও হনুফাকে বলল, ‘তোরাতো মরেই যাবি। তার আগে আমরা প্রতি রাতে পাঁচজন করে তোদের ভোগ করব। তারা অবশ্য ‘ভোগ’ শব্দটি বলে নাই, বলেছিল অতি অশ্লীল কথা। একদিন রাতে দু’জন রক্ষী সিপাই ঘরে ঢুকে আলো নিভিয়ে দেয় এবং রানী ও হনুফার মুখ চেপে ধরে। ধস্তাধস্তি করে তারা ছুটে গিয়ে চিৎকার করে। চিৎকার শুনে ক্যাম্পের অন্য রক্ষীরা ছুটে আসে। কমান্ডারও আসে। ওরা তাকে সব বললে সে বলে, ‘খবরদার এ কথা প্রকাশ করবি না। তাহলে মেরে ফেলব।’ 

রক্ষী সিপাইদের কারও কারও মাঝে মানবতাবোধের লক্ষণ পাচ্ছিলাম। তাদেরই একজন সিপাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছ?’ প্রশ্ন শুনে সে চমকে উঠল। বলল, ‘বাংলাদেশে লেখাপড়া দিয়ে কি করব? আমরা জল্লাদ, জল্লাদের আবার লেখাপড়ার দরকার কি?’ এই বলে সে দে ছুট্‌। মনে হয় যেন চাবুক খেয়ে একটি ছাগল ছুটে পালাল। রক্ষী সিপাইদের কানাঘুষায় শুনছিলাম, আমাকে আর হনুফাকে অন্যত্র কোথাও পাঠিয়ে দেবে আর রানী ও অন্যান্য পুরুষ বন্দীকে মেরে ফেলা হবে। ১২ই ফেব্রুয়ারী আমাকে ও হনুফাকে নিয়ে রক্ষীরা রওনা দিল। আমরা রানীকে ফেলে যেতে আপত্তি জানালাম। রানীও আমাদের সাথে যেতে খুব কান্নাকাটি করছিল। কমান্ডারের কাছে অনুনয়-বিনয় করছিল। কমান্ডার তার সহকর্মীদের সাথে কি যেন আলাপ করে সেদিন আমাদের পাঠানো স্থগিত রাখল। ১২তারিখ রাতেও ওরা আবার রানীকে ঝুলিয়ে হান্টার দিয়ে পেটায়। ১৩ তারিখে তারা রানীকে মারে না, কিন্তু নির্যাতনের নতুন কৌশল নেয়। দম বন্ধ করে রাখে। জোর করে চেপে ধরে রাখে নাক-মুখ-চোখ। এমনি করে জ্ঞান হারালে ওরা তাকে ছেড়ে দেয়। 

১৯শে ফেব্রুয়ারী গভীর রাতে ওরা আমাদের তিনজনকে নিয়েই রওনা দিল প্রায় চার মাইল দূরে ডামুড্যা রক্ষীবাহিনী ক্যাম্পের দিকে। কলিমুদ্দিন, মোস্তাফা, গোবিন্দ ও হরিপদ থেকে গেল। রক্ষীরা বলাবলি করছিল তাদের মেরে ফেলা হবে। আমরা কিছুদূর এলে ক্যাম্পের দিক থেকে চারবার গুলির আওয়াজ পেলাম। ভাবলাম ওদের বুজি মেরে ফেলল। মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল। আমাদের শরীরের অবস্থা এমন ছিল যে, হাটতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল। তবু আমরা বাধ্য হচ্ছিলাম হাটতে। বোধ হয় আমাদের অন্যত্র পাঠিয়ে দিচ্ছে। বোধ হয় বেঁচে যাব। এ চিন্তাই আমাদের হাটতে শক্তি যোগাচ্ছিল। অনেক রাতে ডামুড্যা রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পে পৌঁছলাম। সেখানে কিছুক্ষণ রেখে স্পীডবোট করে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল। সর্বক্ষণ আমাদের কম্বল চাপা দিয়ে মুর্দার মত ঢেকে রাখা হল। বেদনা জর্জরিত ক্ষত-বিক্ষত শরীর। তার উপর কম্বল চাপা থাকায় শ্বাসরুদ্ধ হবার উপক্রম। যেন জ্যান্ত কবর! সমস্ত দিন আমাদের ওভাবেই রাখল। খেতে দিল না। শেষরাতে আবার কম্বল চাপা দিয়ে জিপে করে ঢাকার দিকে রওনা দিল। আবার সেই সুদীর্ঘ পথ জ্যান্ত কবরের যন্ত্রণা। 

ঢাকায় আমাদের প্রথমে রক্ষীবাহিনীর ডাইরেক্টরের কাছে নিয়ে গেল। সে আমাদের খুব ধমকাল। সেখান থেকে নিয়ে গেল তেজগাঁ থানায়, তারপর লালবাগ থানায়। রাতে সেখানে থাকলাম। পরদিন পাঠাল সেন্ট্রাল জেলে। সেখানে পাঁচদিন রাখার পর আমাদের নিয়ে এল তেজগাঁ গোয়েন্দা বিভাগের অফিসে। জেলে আমাদের তৃতীয় শ্রেণীর কয়েদীদের মত রাখা হত। দিনরাত সেলে বন্দী। একই আহার্য দেয়া হত। সেখানে রাজনৈতিক অভিযোগে আরোও বন্দিনী আছেন। তার মধ্যে ১৭ই মার্চে গ্রেফতারকৃত জাসদ নেত্রী মোমতাজ বেগম আছেন। অস্ত্র আইনে সাজাপ্রাপ্ত পারভীন। আরও একজন আছেন নাম রুমা। সবাইকেই তৃতীয় শ্রেণীর কয়েদী করে রাখা হয়েছে। সাধারণ কয়েদীদের মত খাটানো হচ্ছে। এর উপর জমাদারনীরা (মেয়ে সিপাই জমাদার) তাদের নিজেদের জামা-কাপড় সেলাই, কাথাঁ সেলাই, কাপড়-চোপড় ধোয়ানো সবকিছুই মেয়ে কয়েদীদের দিয়ে করিয়ে নিচ্ছে। রাজনৈতিক বন্দীরাও রেহাই পাচ্ছেন না।” 

এমনই হাজার হাজার করুণ কাহিনীর সৃষ্টি হয়েছে মুজিব শাসন আমলে । মুজিবের পরও আওয়ামী লীগ একই ধরনের অসংখ্য ঘটনার জন্ম দিয়েছে এবং এখনও তা অব্যাহত রেখেছে। 

সূত্র প্রিয় বই

আওয়ামী লীগ ও রক্ষী বাহিনীর নির্যাতন : কেউ ভোলে কেউ ভোলে না (পর্ব-১)

একাত্তরে বাঙালীদের ওপর পাকিস্তানীদের বর্বরতা ও নৃশংসতার কাহিনী শুনলে গা শিউরে ওঠে। কিন্তু লক্ষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে বিশ্বের বুকে একটি স্বাধীন দেশের মর্যাদা লাভের পরও বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতন অব্যাহত থাকে। বাহাত্তর থেকে পচাত্তর এ কয়েক বছরে ২৫ হাজার বিরোধী বামপন্থী রাজনীতিক, পরাজিত বিহারী, রাজাকার ও শান্তি কমিটি, ইসলামপন্থী এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে মুক্তিযোদ্ধা ও হিন্দুদেরকেও পাকিস্তানীদের মতোই পাশবিক কায়দায় হত্যা করে রক্ষী বাহিনী ও আওয়ামী লীগ। কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ডের খবর ব্যাপকভাবে জাতির সামনে আসেনি। 

স্বাধীনতা যুদ্ধকালে মতপার্থক্যজনিত বিরোধের ফল হিসেবেই আওয়ামী লীগ বিরোধী মুক্তিযোদ্ধা ও বামপন্থীরা স্বাধীনতা পরবর্তীকালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক হত্যার শিকারে পরিণত হয়। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, এসব হত্যাকাণ্ডে রাষ্ট্রশক্তি এবং আওয়ামী লীগের দলীয় শক্তি ব্যবহার করা হয়। 

আহমদ মুসা তার ইতিহাসের কাঠগড়ায় আওয়ামী লীগ বইয়ে লিখেছেন, “আওয়ামী লীগ শাসনামলে যেসব প্রকাশ্য ও গোপন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ সরকার ও তার নীতির বিরোধিতা করেছে, সেসব দলের মতে, সে আমলে ২৫ হাজার ভিন্ন মতাবলম্বীকে হত্যা করেছে আওয়ামী লীগ। এ হতভাগাদের হত্যা করা হয়েছে চরম নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার মধ্য দিয়ে- যে নৃশংসতা অনেক ক্ষেত্রে পাকিস্তানী সৈন্যদেরও ছাড়িয়ে গেছে। খুন, সন্ত্রাস, নির্যাতন, হয়রানি, নারী ধর্ষণ, লুণ্ঠন কোনো কিছুই বাদ রাখা হয়নি।” 

বামপন্থীদের ওপর হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য সম্পর্কে মাওলানা ভাসানীর হক কথা লিখে, “একটি বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা বিশেষ প্রোগ্রামে এ দেশে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের হিসেব হলো, বাংলাদেশে সোয়া লক্ষ বামপন্থী কর্মীকে হত্যা করতে হবে। তা না হলে শোষণের হাতিয়ার মজবুত করা যাবে না।” (২৬ মে-১৯৭২ : সাপ্তাহিক হক কথা) 

স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞে শেখ মুজিবের ভূমিকার এক ভয়ঙ্কর তথ্য জানা যায় মাসুদুল হক রচিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এবং সিআইএ' গ্রন্থে। ঐ গ্রন্থের ১০৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে,‘১৯৭২ সালে একদিকে তিনি (মুজিব) সকল মুক্তিযোদ্ধাকে অস্ত্র জমা দেয়ার নির্দেশ দেন, অপরদিকে আব্দুর রাজ্জাক ও সিরাজুল আলম খানকে অস্ত্র জমা দিতে বারণ করলেন। শেখ মুজিবের ওই নিষেধ সম্পর্কে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সিরাজুল আলম খান আর আমাকে ডেকেই বঙ্গবন্ধু (শেখ মুজিব) বলেছিলেন, সব অস্ত্র জমা দিও না। যেগুলো রাখার দরকার সেগুলো রেখে দাও। কারণ, সমাজ বিপ্লব করতে হবে। প্রতি বিপ্লবীদের উৎখাত করতে হবে, সমাজতন্ত্রের দিকে এগুতে হবে। এটা আমাদের পরিষ্কারভাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন। 

সুতরাং মুজিব আমলে এসব হত্যাকাণ্ড যে পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় মদদে হয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। 

এবার আমরা আওয়ামী লীগ ও রক্ষীবাহিনীর নির্মমতার কিছু কাহিনী তুলে ধরবো। 


মুক্তিযোদ্ধাকে জীবন্ত কবর

“ঢাকা জেলার মনোহরদী থানার পাটুলী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কর্মকর্তার দলীয় কর্মীদের সহযোগিতায় সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত শত্রুতা সাধনের উদ্দেশ্যে জনৈক মুক্তিযোদ্ধাকে জীবন্ত কবর দিয়েছে। এই অপরাধে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করিয়া নারায়ণগঞ্জ থানায় চালান দিলে জনৈক এমসিএ হস্তক্ষেপ করিয়া এই নরঘাতকটিকে মুক্ত করিয়াছেন।(২ জুন-১৯৭২ : সাপ্তাহিক হক কথা ) 

‘তোর নিজের হাতে ছেলের গলা কেটে দে, ফুটবল খেলবো তার মাথা দিয়ে’

আহমেদ মুসা তার ‘ইতিহাসের কাঠগড়ায় আওয়ামী লীগ' গ্রন্থের উৎসর্গনামায় আওয়ামী ঘাতক বাহিনীর অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার বাজিতপুরের ইকুরটিয়া গ্রামের বৃদ্ধ কৃষক আব্দুল আলীর অভিজ্ঞতার বর্ণনা তুলে ধরে লিখেছেন, ‘....ঐখানে আমাকে (আব্দুল আলী) ও আমার ছেলে রশিদকে হাত-পা বেঁধে তারা খুব মারলো। রশিদকে আমার চোখের সামনে গুলী করলো। ঢলে পড়লো বাপ আমার। একটা কসাই আমার হাতে একটা কুঠার দিয়ে বলল, তোর নিজের হাতে ছেলের গলা কেটে দে, ফুটবল খেলবো তার মাথা দিয়ে। আমার মুখে রা নেই। না দিলে বলল তারা, তোরও রেহাই নেই। কিন্তু আমি কি তা পারি? আমি যে বাপ। একটানা দেড় ঘণ্টা মারার পর আমার বুকে ও পিঠে বন্দুক ধরল। শেষে নিজের হাতে কেটে দিলাম ছেলের মাথা। আল্লাহ কি সহ্য করবে?"

ময়মনসিংহে এক হাজার ৫শ' কিশোরকে হত্যা

“....রক্ষীবাহিনী গত জানুয়ারীতে এক ময়মনসিংহ জেলাতেই অন্তত এক হাজার ৫শ' কিশোরকে হত্যা করেছে। এদের অনেকেই সিরাজ সিকদারের পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি (ইবিসিপি)-এর সদস্য ছিল। অন্যদের মার্কসবাদী ও লেনিনবাদী দলের প্রতি সহানুভূতিশীল বলে সন্দেহ করা হয়েছিল। এমনকি অনেক বাঙ্গালী যুবক যারা রাজনীতিতে ততটা সক্রিয় ছিল না, তারাও এই সন্ত্রাসের অভিযানে প্রাণ হারিয়েছেন... বস্তুত বাংলাদেশে বীভৎসতা ও নিষ্ঠুরতার অভাব নেই।”(ইতিহাসের কাঠগড়ায় আওয়ামী লীগ : আহমেদ মুসা, পৃষ্ঠা-১৩৬)

রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পগুলো ছিল হত্যাযজ্ঞের আখড়া

‘মুজিববাদীদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো সন্ত্রাসের রাজনীতি, প্রকাশ্য হত্যা, গুপ্ত হত্যা, গুন্ডামি এগুলো ছিল খুবই সাধারণ ব্যাপার। রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পগুলো ছিল হত্যাযজ্ঞের আখড়া। যশোরের কালীগঞ্জ থেকে রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্প উঠে গেলে সেখানে গণকবর আবিষ্কৃত হয়-যেখানে ৬০টি কঙ্কাল পাওয়া যায়। টঙ্গী থানার সামনে মেশিনগান স্থাপন করে শ্রমিক কলোনীর উপর নির্বিচারে গুলী চালানো হলো। শতাধিক নিহত হলেন। হাজার হাজার শ্রমিক বিশ মাইল হেঁটে ঢাকায় চলে আসতে বাধ্য হল এবং তারা তিনদিন তিনরাত পল্টন ময়দানের উন্মুক্ত আকাশের নিচে অবস্থান করতে বাধ্য হল।' (বাম রাজনীতি : সংকট ও সমস্যা' -হায়দার আকবার খান রনো)

(মুজিব আমলে আওয়ামী লীগ ও রক্ষী বাহিনীর নির্যাতন সম্পর্কে কোন তথ্য থাকলে এখানে শেয়ার করতে পারেন)