Thursday, 3 October 2013

বেপরোয়া দুর্নীতির উপাখ্যান- ১ : শেয়ারবাজার লুটপাট

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের বেপোরোয়া দুর্নীতির এক নিষ্ঠুর উপাখ্যান শেয়ারবাজার লুটপাট। ক্ষমতাসীন দলের লুটেরারা শেয়ারবাজারে কারসাজি করে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা গ্রাস করে নিয়ে গেছে। এই টাকার বেশিরভাগই পাচার হয়ে গেছে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারের ৩৩ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী তাদের পু্ঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। তাদের হাহাকারে সারাদেশ স্তম্ভিত। তবে লুটেরারা নির্বিকার। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার ঠিক দুই বছরের মাথায় শেয়ারবাজারে লুটপাটের এ ঘটনা ঘটে। লুটপাটের সঙ্গে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা সালমান এফ রহমান, মন্ত্রী ফারুক খান, লোটাস কামালসহ সরকারের ঘনিষ্ঠজন জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। দেশের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে দু’বার কেলেঙ্কারি আর লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। আর দুটি ঘটনাই ঘটেছে আওয়ামী লীগের শাসনামালে। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে নিয়ে গেছে আওয়ামী লীগের লুটেরা গোষ্ঠী। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর তারা লুটপাটের কলঙ্কের দাগ মোছনের কোনো চেষ্টা তো করেইনি; বরং ১৯৯৬ সালের চেয়ে আরও বড় ধরনের কেলেঙ্কারি আর লুটপাটের রেকর্ড গড়েছে আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬ সালের মতো এবারও লুটপাটকারীদের কোনো ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি। তারা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। দেশের শেয়ারবাজারে এতো বড় লুটপাট ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটলেও আওয়ামী লীগের আজ্ঞাবাহী দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করেছে।

আওয়ামী লীগের লোকেরাই শেয়ারবাজারে লুটপাটের সঙ্গে জড়িত :
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে শেয়ারবাজারে সাধারণ মানুষকে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করা হয়। সাধারণ মানুষ না বুঝেই এ পাতা ফাঁদে পা দেয়। শেষ পর্যন্ত লুটপাটকারীরা নানা উপায়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুঁজির সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যায়। এ লুটপাটে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা জড়িত ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। তারা বলেন, ১৯৯৬ সালে যারা লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ছিল, এবারও তারা এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এবার নতুন করে আরও অনেকে যুক্ত হয়েছেন। তবে লুটপাটের সঙ্গে যারাই যুক্ত ছিলেন তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। লুটপাটের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততার বিষয়টি দলটির অনেক নেতাও স্বীকার করেছেন।
২০১১ সালের ২৩ মে সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য শেখ সেলিম বলেন, আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার জন্য আওয়ামী লীগ নামধারী কিছু লোক এ কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছে। দু’-একজনের জন্য সরকার বা আওয়ামী লীগ তার দায় নেবে না।’ তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ নামধারী কিছু লোক শেয়ারবাজারের এ অবস্থা করেছে। ১৯৯৬ সালেও এমন হয়েছিল। তখনও ব্যবস্থা নেবো-নিচ্ছি করতে করতে পুরো দায় আওয়ামী লীগের ওপর পড়েছিল।’ আওয়ামী লীগের আরেক সংদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একই আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘শেয়ারবাজার কারসাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ধরতে হলে অর্থমন্ত্রীকে সর্ষের মধ্যেই ভূত খুঁজতে হবে। শেয়ারবাজার ঘটনায় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সর্ষ দিয়ে ভূত তাড়ানো যাবে না। কারণ, ‘ভূত সর্ষেতেই আছে। তিনি আরও বলেন, শেয়ারবাজার কারসাজির ঘটনায় কোথায় দরবেশ, কোথায় ইমাম, কোথায় মোয়াজ্জেম আছে খুঁজে বের করুন।’
বহুল আলোচিত, সমালোচিত সালমান এফ রহমান শেয়ারবাজারে ‘দরবেশ’ নামেই পরিচিত। তার শ্বেতশুভ্র দাড়ি এবং ধবধবে সাদা পোশাক-পরিচ্ছদের কারণে তিনি এ নামে পরিচিত। সালমান এফ রহমান আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা।
অবশ্য শেয়ারবাজার লুটপাটে বিএনপির লোকেরা জড়িত বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অভিযোগ করে বক্তব্য দিলেও আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য আ হ ম মোস্তফা কামাল প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যটি রাজনৈতিক।’ অর্থাত্ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের বিরোধিতা করে আ হ ম মোস্তফা কামাল প্রকারান্তে বলে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের লোকেরাই শেয়ারবাজার লুটপাটের সঙ্গে জড়িত। আর এ কারণেই লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের কোনো ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

আওয়ামী লীগ নেতাদের কয়েকটি কোম্পানির দুর্নীতি ও লুটপাটের চিত্র :
শেয়ারবাজার লুটপাটে আওয়ামী লীগের লুটেরাগোষ্ঠীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতার কোম্পানি নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে গেছে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া তো দূরেই থাকুক; বরং নানা আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে সেসব অনিয়মগুলোকে বৈধতা দিয়েছে। বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী ফারুক খানদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপ, সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো, অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য আ হ ম মোস্তফা কামালের মালিকানাধীন সিএমসি কামাল টেক্সটাইল মিলস নানা অনিয়ম আর কারসাজির মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বলে বড় ধরনের অভিযোগ রয়েছে।
‘সরাসরি তালিকাভুক্তি’র মাধ্যমে বেসরকারি কোম্পানির পরিচালকরা শেয়ারবাজার থেকে অর্থ তুলে নিজেদের পকেট ভারি করে থাকেন বিধায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে বিএসইসি এ পদ্ধতিটি বাতিল করে দেয়। কিন্তু এরপরও নিয়ম বহির্ভূতভাবে তত্কালীন বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খানের (পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী) পারিবারিক প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপের কেপিসিএল এবং ওসিএলকে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ দেয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বিএসইসিকে সুপারিশ করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশক্রমে কোনো ধরনের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই কোম্পানি দুটিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেয় বিএসইসি। শেয়ারের প্রিমিয়াম নির্ধারণে ব্যবহার করা হয় বুকবিল্ডিং পদ্ধতি। এ পদ্ধতিটি ব্যবহার করে মূলত কারসাজির মাধ্যমে অযৌক্তিক প্রিমিয়াম নির্ধারণ করে কোম্পানি দুটো। আর অযৌক্তিক দরেই কোম্পানি দুটিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেয় বিএসইসি। ১০ টাকা অভিহিত দরের কেপিসিএলের শেয়ারের প্রিমিয়াম ধরা হয় ১৮৪ টাকা। সে হিসাবে প্রতিটি শেয়ারের ওসিএলের ১০ টাকার শেয়ারের দর নির্ধারণ করা হয় ১৪৫ টাকায়। এর মাধ্যমে কেপিসিএল এবং ওসিএলের পরিচালকরা শেয়ারবাজার থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।
ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর করার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের টাকা হাতিয়ে নেয় সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপের বেক্সটেক্স কোম্পানি। কোম্পানির ২০০৮ সালের ব্যালেন্সশিট অনুযায়ী ৪৫৩ কোটি টাকার ঋণ ছিল। পরবর্তীতে ঋণের বিপরীতে ৬৫৩ কোটি টাকার নতুন শেয়ার ইস্যু করা হয়। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ২২ টাকা প্রিমিয়াম ধরা হয়। ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর করে আবার সেই শেয়ারকে প্রিমিয়ামে বিক্রি করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে কোম্পানিটি। এ অনিয়মের বিষয়ে যাতে ভবিষ্যতে প্রশ্ন তোলা না যায় তারই অংশ হিসেবে বেক্সটেক্স কোম্পানিকে বেক্সিমকোর সঙ্গে মার্জ করা হয়েছে।
হিসাব জালিয়াতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য আ হ ম মোস্তফা কামালের মালিকানাধীন সিএমসি কামাল টেক্সটাইল মিলস। এ কোম্পানিটি প্রিমিয়াম মূল্যে রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ৬৬ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা এ কোম্পানিটিকে হঠাত্ করেই ২০০৯ সালে লাভজনক কোম্পানি হিসেবে দেখানো হয়। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে হিসাব জালিয়াতির মাধ্যমে কোম্পানির আর্থিক হিসাব বিবরণী পাল্টে দিয়ে প্রিমিয়াম মূল্যে রাইট শেয়ার ইস্যুর অনুমোদনে আবেদন করে। কিন্তু হিসাব জালিয়াতি করেও প্রিমিয়াম মূল্যে রাইট শেয়ার ইস্যুর শর্ত পূরণ করতে পারেনি সিএমসি কামাল টেক্সটাইলস মিলস। পূর্ববর্তী ৩ বছরে কোনো কোম্পানি লোকসানে থাকলে প্রিমিয়াম মূল্যে রাইট শেয়ার ইস্যু করতে পারে না। কিন্তু সিএমসি কামাল টেক্সটাইলস মিলস ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে সাড়ে ৭ টাকা প্রিমিয়ামে বাজার থেকে অর্থ তুলে নিয়েছে। অর্থমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে রাইট শেয়ার ইস্যুর অনুমোদন করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া পরিকল্পিতভাবে সিএমসি কামাল টেক্সটাইলস মিলসের মূল্য সংবেদনশীল নানা ধরনের তথ্য প্রচার করে কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়িয়ে অত্যন্ত চড়া দরে বোনাস শেয়ার বিক্রি করে আ হ ম মোস্তফা কামাল এবং তার পরিবারের সদস্যরা কোটি কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নিয়ে গেছেন।
এছাড়া কোনো নিয়মনীতি না থাকা সত্ত্বেও বিএসইসি ২০১০ সালে ৮টি কোম্পানিকে অগ্রাধিকার শেয়ার ছাড়ার অনুমোদন দেয়। এসব কোম্পানি অগ্রাধিকার শেয়ারের মাধ্যমেও হাজার কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নেয়। অগ্রাধিকার শেয়ার ছেড়ে অর্থ সংগ্রহকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে শেখ হাসিনার অন্যতম উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন কোম্পানি বেক্সিমকো ফার্মা। ফারুক খানদের পাবিরাবিক কোম্পানি সামিট পাওয়ার। এভাবে শেখ হাসিনার আমলে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে জড়িতরা শেয়ারবাজার থেকে নানা উপায়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এসব অপকর্মের হোতারা রয়ে গেছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

লুটপাটের নানা উপায় :
শেয়ারবাজারকে পরিকল্পিতভাবে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলার পর নানা উপায়ে শেয়ারবাজারে লুটপাটের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। শেয়ারের প্রচুর চাহিদা থাকার কারণে মাত্রাতিরিক্ত প্রিমিয়ামের মাধ্যমে কোম্পানির আইপিও, রাইট শেয়ারের অনুমোদন, কোনো ধরনের নিয়মনীতি ছাড়াই অগ্রাধিকার শেয়ার, মূলধন বাড়ানোর নামে প্রাইভেট প্লেসমেন্ট শেয়ারের বাণিজ্য গড়ে ওঠে। প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রির শক্তিশালী কয়েকটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়। সিন্ডিকেট চক্রগুলোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুরু করে সামরিক, আধা-সামরিক, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জড়িয়ে পড়েন। সারাদেশে প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রির কার্ব মার্কেট গড়ে ওঠে। নাম সর্বস্ব অনেক কোম্পানির শেয়ারও প্লেসমেন্টের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে। প্লেসমেন্টের মাধ্যমে শেয়ার বিক্রি করে সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন জিএমজি এয়ার লাইন্স সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এরই মধ্যে জিএমজি এয়ার লাইন্স তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে। এ কোম্পানিটি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের টাকা নিয়ে সটকে পড়েছে। এভাবে আরও অনেক কোম্পানি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্লেসমেন্টের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। কিন্তু যারা এভাবে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে তাদের কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শুরু হয় লুটপাটের আয়োজন :
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই ১৯৯৬ সালে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতরা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রেসিডেন্ট হন শেয়ারবাজারে বহুল বিতর্কিত ও আলোচিত রকিবুর রহমান। ১৯৯৬ সালের কেলেঙ্কারির ঘটনার অন্যতম অভিযুক্ত হিসেবে তিনি ব্যাপকভাবে আলোচিত। শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ ও শেখ হাসিনার বিশেষ আস্থাভাজন রকিবুর রহমান ডিএসইর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। রকিবুর রহমান ‘শেখ রাসেল শিশু-কিশোর’ নামে একটি সংগঠনের প্রেসিডেন্টও বটে। আর তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরই শুরু হয় শেয়ারবাজার ঘিরে নানা পরিকল্পনা। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথম বছর (২০০৯ সালে) সাধারণ মানুষদের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগী আগ্রহী করে তুলতে নেয়া হয় নানা উদ্যোগ এবং তার পরের বছর অর্থাত্ ২০১০ সালে শুরু হয় শেয়ারবাজার লুটের ঘটনা। নানা উপায়ে, আইনের দুর্বলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ও কারসাজির মাধ্যমে লুটপাট করা হয় শেয়ারবাজার। আর এ জন্য পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসির) চেয়ারম্যান পদে বসানো হয় ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল হক খন্দকারকে। রকিবুর রহমানসহ শেয়ারবাজারে আওয়ামী লীগের কারসাজির সিন্ডিকেটের তদবিরের জোরে তিনি এসইসি (বর্তমানে বিএসইসি) চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পান। এসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে তার দক্ষতা ও যোগ্যতা ছিল প্রশ্নসাপেক্ষ। মূলত জিয়াউল হক খোন্দকারের এসইসি চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ ছিল শেয়ারবাজারে কারসাজির পরিকল্পনারই একটি অংশ।
শেয়ারবাজারে ভয়াবহ ধসের পর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি শেয়ারবাজারে নানা অনিয়মের জন্য এসইসি চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খোন্দকারকে দায়ী করে তার অপসারণের সুপারিশ করে। অপরদিকে রকিবুর রহমান ও সালমান এফ রহমান পুঁজিবাজার লেনদেন ও প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে। এ থেকে স্পষ্ট আওয়ামী লীগের একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী শেয়ারবাজার থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ লুট করে নিয়েছে।

শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী বিনিয়োগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা :
সাধারণ বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বেড়ে যাওয়ায় শেয়ারবাজারে তারল্য প্রবাহ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। তবে শেয়ারবাজারে তারল্য বৃদ্ধিতে ব্যাংকগুলোর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজারে তার আমানতের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারে। কিন্তু ব্যাংকগুলো সে নিয়মের তোয়াক্কা না করে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত অর্থ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে। নির্ধারিত সীমার দুই থেকে ৩ গুণ বেশি অর্থও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে। এমনকি কলমানি মার্কেটের টাকাও শেয়ারবাজারে খাটাতে থাকে ব্যাংকগুলো। ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত বিনিয়োগের বিষয়টি জানা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। আওয়ামী লীগের মদতপুষ্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান রাজনৈতিক কারণেই ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেননি। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত বিনিয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক শুরু থেকেই কঠোর অবস্থান নিলে শেয়ারবাজারে এত তারল্য প্রবাহ তৈরি হতো না এবং বাজারেও ধস নামতো না। শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত বিনিয়োগ কারসাজির একটি অংশ বলে অনেকে ধারণা করছেন।
শুধু বাণিজ্যিক ব্যাংকই নয়, মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলো শেয়ার ক্রয়ে আগ্রাসী অর্থায়ন শুরু করে। একই সঙ্গে একের পর এক মিউচুয়াল ফান্ডের অনুমোদন দিয়ে বাজারে তারল্যের জোয়ার বইয়ে দেয়ার বিষয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও (বিএসইসি) বিশেষ ভূমিকা পালন করে। গ্যাস, বিদ্যুত্ ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে শিল্প বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে শিল্পোদ্যোক্তারাও পুঁজিবাজারে অর্থ বিনিয়োগ শুরু করে। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে শিল্পঋণ, এসএমই ঋণের একটি বড় অংশ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেন তারা। ফলে শেয়ারবাজারে তারল্যের স্রোত বয়ে যায়।

চাহিদা ও সরবরাহে ভারসাম্যহীনতা তৈরির মাধ্যমে লুটপাট :
মূলত শেয়ারের লুটপাটের আয়োজনটি হয়েছে শেয়ারের চাহিদা এবং জোগানের মধ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করার মাধ্যমে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি ব্যাংকের মাত্রাতিরিক্ত বিনিয়োগের ফলে শেয়ারবাজারে যখন তারল্য প্রবাহ বেড়ে যায় তখন স্বাভাবিকভাবেই শেয়ারের চাহিদাও তৈরি হয়। কিন্তু এ চাহিদা অনুযায়ী শেয়ার সরবরাহ না বাড়িয়ে বরং কোম্পানির তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে নানা ধরনের শর্তজুড়ে দেয় বিএসইসি। ৪০ কোটি টাকা কমমূল্যের পরিশোধিত মূল্যের কোম্পানির শেয়ার বাজারে তালিকভুক্ত না করার বিষয়ে বিএসইসি সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে অনেক কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারেনি। অপরদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ২৬টি কোম্পানির শেয়ার ছাড়ার জন্য সময়সীমা বেধে দিয়েও একটি কোম্পানির শেয়ারও বাজারে ছাড়া হয়নি। ফলে বাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে কিছু কিছু কোম্পানির শেয়ারের দর ৫০০ থেকে ৮০০ শতাংশ বেড়ে যায়। এর মধ্যে স্বল্পমূলধনী, দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলো ছিল মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায়। মূলত কারসাজিচক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বাজার। নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বরং কারসাজিচক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। বিএসইসির তত্কালীন চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খোন্দকারসহ আরও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্লেসমেন্টের শেয়ার বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে।
বাজার অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে শেয়ারবাজার থেকে অতিরিক্ত বিনিয়োগ সরিয়ে নেয়ার জন্য ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের সময়সীমা বেধে দেয়। এছাড়া একক গ্রাহক হিসেবে অতিরিক্ত ঋণ সমন্বয়েরও সময় বেধে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ফলে ২০১০ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে ব্যাংকগুলো তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার শুরু করলে কারসাজিচক্রের হোতারাও শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে সরে যেতে থাকে। এতে শুরু হয় শেয়ারাবাজারে ধস। গত আড়াই বছরে নানা উদ্যোগ নিয়েও ধসে ঠেকানো যায়নি। শেয়ারবাজার এখন তলানিতে এসে দাঁড়িয়েছে।

শেয়ারবাজারে লুটপাটে নিঃস্ব বিনিয়োগকারীরা :
শেয়ারবাজারে লুটপাটে নিঃস্ব হয়ে গেছে শেয়ারবাজারের ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারী। ১৯৯৬ সালের পুনরাবৃত্তি হবে না, এমন আশ্বাস দিয়ে সাধারণ মানুষকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করে অবশেষে তার চেয়ে আরও বড় কেলেঙ্কারির মাধ্যমে তাদের সব পুঁজি লুটে নিয়েছে আওয়ামী লীগের লুটেরা গোষ্ঠী। লাভের আশায় সাধারণ মানুষ সঞ্চিত অর্থের পাশাপাশি, বিভিন্ন উত্স থেকে ধার করে, জায়গা জমি বিক্রি কিংবা লিজ দিয়ে, স্ত্রীর অলঙ্কার বিক্রি করে, ব্যবসার মূলধন ভাঙিয়ে শেয়ারাবাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু লাভ তো দূরেই থাকুক পুঁজিটুকুও তারা ফিরে পাননি। আর পুঁজি হারিয়ে মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন রনি জামান, হাবিবুর রহমান যুবরাজ, দিলদার হোসেন নামে কয়েকজন বিনিয়োগকারী। হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন মিল্লাত হোসেন, রতন চৌধুরীসহ নামা না জানা আরও কয়েকজন বিনিয়োগকারী। শেয়ারবাজারে সর্বস্ব খুইয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন অনেক বিনিয়োগকারী। এক কথায় বিনিয়োগকারীদের পারিবারিক জীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে

Tuesday, 1 October 2013

আই অ্যাম সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী অব বাংলাদেশ’

স্টাফ রিপোর্টার: গত ১৭ই জুন ’১৩ থেকে শুরু করে নয় কার্যদিবস আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। জবানবন্দি শুরু হয় এভাবে- আমার নাম সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। জন্ম ১৩ই মার্চ ১৯৪৯। আমার কাজিনদের মধ্যে রয়েছেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি মাঈনুর রেজা চৌধুরী, সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন, আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী, ফজলে করিম চৌধুরী, আওয়ামী লীগ নেতা সালমান এফ রহমান প্রমুখ। আমার বাবার নাম একেএম ফজলুল কাদের চৌধুরী। তার সূত্রেই আমি এ মামলার আসামি হয়েছি। তাই তার ব্যাপারেতো বিস্তারিত বলতেই হবে। এখানে একজন প্রফেসর সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন যিনি ৪০ বছর ধরে নিজের জন্মস্থান নিয়ে মিথ্যা বলছেন। ফজলুল কাদের চৌধুরী ১৯১৯ সালের ২৬শে মার্চ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি নোয়াখালী জিলা স্কুল, বরিশাল বিএম কলেজ এবং কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষাজীবন অতিবাহিত করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র থাকাকালে তিনি থাকতেন কারমাইকেল হোস্টেলে। মেধাবী এবং এলিট পরিবারের শিক্ষার্থীরা সে হোস্টেলে থাকতেন। ফজলুল কাদের চৌধুরী দুই বার ওই হোস্টেলের নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। ফর্মাল চার্জে আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে তার প্রতিটি লাইনের জবাব আমি দিবো। তারা নবাব সিরাজউদ্দোলা থেকে শুরু করেছেন আমি এটা নিশ্চিত করতে পারি আমি সিরাজউদ্দৌলার আগে যাবো না। আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত ফর্মাল চার্জে বলা হয়েছে, দ্বিজাতি তত্ত্বের কারণে উপ-মহাদেশে সামপ্রদায়িক সংঘাত হয়েছে। এ বক্তব্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য অবমাননাকর। কারণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ২৮৮ পৃষ্ঠার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ তে দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ, তিতিক্ষার বর্ণনা করা হয়েছে। প্রসিকিউশন যে প্রস্তাব দিয়েছে তা বাংলাদেশের সীমানা উঠিয়ে দেয়ার প্রস্তাব। এটা খুবই প্রলুব্ধকর। বাংলাদেশের সীমানা উঠিয়ে অন্য কোন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সঙ্গে এক হয়ে যাওয়ার জন্য এ প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এটি আমাদের সংবিধানের লঙ্ঘন। কারণ ধর্মের ভিত্তিতে যে বিভক্তি হয়েছিল সে পূর্ব পাকিস্তানের সীমানাই সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সীমানা। আর বাংলাদেশের বিচারপতিদের সংবিধান রক্ষার শপথ নিতে হয়েছে। দেশে ফেরার তিন মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধু মিত্র বাহিনীর সদস্যদের দেশ ত্যাগ করিয়েছিলেন। এটাই তার জীবনের এক মহত্তম ঘটনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি এবং জাপান যা করতে পারেনি বঙ্গবন্ধু তা করেছিলেন। উত্তরাধিকারসূত্রে আমি এ মামলার আসামি হয়েছি। আজ চাচার (বঙ্গবন্ধু) বই নিয়ে এসেছি। আমার বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরীর সঙ্গে তার কি সম্পর্ক ছিলো? আমি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী কে তাতো এখানে বলতেই হবে। আমি শুধু নিজের জীবন রক্ষার জন্যই এখানে লড়াই করছি না আমি আমার মর্যাদা রক্ষার জন্যও এখানে লড়াই করছি। ৩৩ বছর ধরে সংসদে আছি। ছয় বার জনগণের কাছে পরীক্ষা দিতে হয়েছে আমাকে। ১৯৭৮ সালের শেষদিকে আমি রাজনীতিতে এসেছিলাম। সংবিধান ২ অনুচ্ছেদের ওপর পূর্ণাঙ্গ আস্থা স্থাপন করেই আমি রাজনীতিতে প্রবেশ করি। (যে অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় সীমানার অন্তর্ভুক্ত হইবে- ক) ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণার অব্যবহিত পূর্বে যে সকল এলাকা লইয়া পূর্ব পাকিস্তান গঠিত ছিল এবং সংবিধান (তৃতীয় সংশোধন) আইন ১৯৭৪-এ অন্তর্ভুক্ত এলাকা বলিয়া উল্লিখিত এলাকা, কিন্তু উক্ত আইনে বহির্ভূত এলাকা বলিয়া উল্লিখিত এলাকা তদবহির্ভূত।) এ সংবিধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের উপহার দিয়েছিলেন। ২ অনুচ্ছেদে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ পর্যন্ত সামপ্রদায়িকতার  ভিত্তিতে নির্ধারিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সীমানাকে স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রতি সুনিশ্চিতভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অঙ্গীকার প্রকাশ পায়। প্রসিকিউশন দ্বিজাতি তত্ত্বের বিরোধিতা করে যে প্রস্তাব দিয়েছে তা দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রতি একধরনের বিদ্রূপ। যে তত্ত্বের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। এ প্রস্তাব বাংলাদেশকে বলকান এবং সিকিম বানানোর প্রস্তাব। এ প্রস্তাবের মাধ্যমে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর এ বক্তব্যে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, সুলতান মাহমুদ সিমনসহ প্রসিকিউটররা বলতে থাকেন, এটা যাবে না। জবাবে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, এটা আমার বক্তব্য। আপনারা আপনাদের যুক্তির সময় জবাব দিবেন। এসময় ট্রাইব্যুনালের আদেশে বলকান এবং সিকিম বানানোর প্রস্তাব কথাগুলো জবানবন্দি থেকে বাদ দেয়া হয়। পরে সালাউদ্দিন কাদের তার জবানবন্দিতে বলেন, এ প্রস্তাব বলকান এবং সিকিম বানানোর প্রস্তাব তা আমি বলতে চাই কিন্তু কিছু লোক তাতে আহত (বিরক্ত) হবেন তাই আমি তা বলছি না। দ্বিজাতি তত্ত্বের সুবিধাভোগী কিছু বিখ্যাত ব্যক্তির নাম রেকর্ডে থাকা প্রয়োজন। এ সম্পর্কে বিখ্যাত আইনজ্ঞ যাদের নাম আমি স্মরণ করতে পারি তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল, সাবেক প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন, সাবেক প্রধান বিচারপতি সাত্তার, ব্যারিস্টার রফিক-উল হকসহ আরও অনেকের কথা। যাদের প্রত্যেককে নিয়ে এ জাতি গর্বিত। এ বক্তব্যের ব্যাপারে প্রসিকিউশনের আপত্তির জবাবে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, দ্বিজাতি তত্ত্ব আমাদের জন্য কিভাবে সুফল বয়ে এনেছে তা বুঝানোর জন্যই এটা বলা প্রয়োজন। আমাদের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুকে নিয়েও আমি গর্বিত। তিনিও দ্বিজাতি তত্ত্বের ফসল। সালাউদ্দিন কাদের বলেন, একজন বিখ্যাত রাজনৈতিক দার্শনিক (জওহরলাল নেহেরু) তার নিজের সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন এভাবে, সংস্কৃতিগতভাবে আমি মুসলিম, শিক্ষাগত দিক থেকে ইংরেজ এবং দুর্ভাগ্যজনিত জন্মগত কারণে হিন্দু। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমি জন্মসূত্রে চট্টগ্রামী। এটা কোন দুর্ঘটনা নয়। মতিলাল নেহেরুর ছেলের মতো আমি নিজেকে দুর্ভাগাও মনে করি না। চট্টগ্রাম কখনওই নবাব সিরাজউদ্দৌলার শাসিত অঞ্চলের অংশ ছিল না। আমি সিরাজউদ্দৌলাকে স্বীকার করি না। আমরা চট্টগ্রামের মানুষ। আমাদের নিজস্ব ভাষা এবং নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। সারা দুনিয়াতেই এখন মুসলিমদের ওপর নির্যাতন চলছে।  সোমালিয়া, বসনিয়া, গুজরাট, ফিলিস্তিন সারা দুনিয়ায় এখন মুসলমানরা নির্যাতনের শিকার। মুসলিমদের প্রতি আমার কমিটমেন্টের কোন রাজনৈতিক সীমানা নেই।
নিজেকে বঙ্গবন্ধুর এক নিকটজন দাবি করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় তখনকার সংসদ সদস্য আব্দুল কুদ্দুস মাখনের সুপারিশে বাংলাদেশের পাসপোর্ট পেয়েছিলাম।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ এবং মুসলিম উম্মাহর পক্ষে আমার অবস্থান। কোন বিশেষ ব্যক্তিবর্গ বা দলের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান নেই। তিনি বলেন, ধারণা এবং বাস্তবতার মধ্যে অনেক সময়ই বড় ফারাক থাকে। এ প্রসঙ্গে তার বন্ধু ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশবন্ত সিংহের বাংলাদেশ সফরের সময় ঘটে যাওয়া এক কৌতূহল উদ্দীপক ঘটনার বর্ণনা দেন তিনি। সাক্ষ্যের এক পর্যায়ে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, মরেই তো যাবো। কিছু রেকর্ডে রেখে যাই। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, পছন্দসূত্রে আমি একজন বাংলাদেশী, জন্মসূত্রে নয়। আমি যখন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলাম। তখন সেখানে একটি সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে এসেছিলেন বিচারপতি স্যার জাফর উল্লাহ খান। যিনি আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক ছিলেন। ভারতের পূর্ব পাঞ্জাবে জন্ম নেয়ায় তার দেশপ্রেম নিয়ে একজন ছাত্র প্রশ্ন তুলেছিল। জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি পাকিস্তানি কারণ তোমার মা পাকিস্তানি। যখন আমি নিজ পছন্দের কারণে পাকিস্তানি। সালাউদ্দিন কাদের বলেন, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর আমি লন্ডনের বাসিন্দা ছিলাম। ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে আমি ঢাকায় আসি। বৃটিশ ভ্রমণ ডকুমেন্ট নিয়ে আমি ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন বিভাগে প্রবেশ করেছিলাম। আমি সে বৃটিশ ডকুমেন্ট ইমিগ্রেশন বিভাগে জমা দিয়েছিলাম এবং তখনকার একজন সংসদ সদস্যের সুপারিশে বাংলাদেশের পাসপোর্ট পেয়েছিলাম। সে সময় বাংলাদেশী পাসপোর্ট পাওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যের সুপারিশ বাধ্যতামূলক ছিল। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় আব্দুল কুদ্দুস মাখনের সুপারিশে সে পাসপোর্ট পেয়েছিলাম। এটা রেকর্ডে থাকা প্রয়োজন যে, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের পূর্বে পূর্ব পাকিস্তানে জন্ম নেয়া বহু মানুষ আর বাংলাদেশে ফিরেননি। তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালে লিঙ্কন্স ইন থেকে আমি বার এট ল’ পরীক্ষার প্রথম পর্ব শেষ করি। ১৯৭৪ সালে আমি দ্বিতীয় পার্টের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম এবং কাউটস অ্যান্ড কোম্পানিতে কাজ করছিলাম। এরইমধ্যে ১৯৭৩ সালের ১৮ই জুলাই আমার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। সালাউদ্দিন কাদের বলেন, প্রসিকিউশনের বর্ণনামত চুপি চুপি আমি বাংলাদেশে ফিরিনি। প্রসিকিউশন যেমনটা দাবি করেছে সে সময়ে অর্থাৎ ১৯৭৪ অথবা ’৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার সময় পর্যন্ত আমি কখনওই আত্মগোপনে ছিলাম না। ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে আমি কিউসি শিপিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আমার কার্যক্রম শুরু করি। ১৯৭৪ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত আমি বেশ কয়েক বার ব্যবসায়িক কারণে বিদেশ সফরে গিয়েছিলাম। এটাও সত্য যে, আমাদের রাজনীতির ইতিহাসের কালো দিন ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট আমি দেশের বাইরে ছিলাম। ১৫ই আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনা প্রতিরোধে কিছু করতে না পারা আমার এবং আমার পরিবারের সদস্যদের জন্য খুবই দুঃখের বিষয়। প্রেসিডেন্টের জীবন বাঁচানো যাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব ছিল, আজ ৩৮ বছর পর আমরা তাদের মায়াকান্না দেখছি। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমার মরহুম পিতা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যকার সম্পর্ক বঙ্গবন্ধু নিজে তার আত্মজীবনীতে বর্ণনা করেছেন। যে জাতীয় ঐতিহ্য (বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী) বঙ্গবন্ধুর এক নিকটজনের এ নিপীড়নমূলক বিচারে প্রদর্শনী হিসেবে গ্রহণ করতে প্রসিকিউশন অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। আমি আমার জীবনে প্রথম বার গ্রেপ্তার হয়েছিলাম ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর। খোন্দকার মোশ্তাক আহমাদের এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে। যিনি আমার পিতার ধানমন্ডির বাড়ি দখল করেছিলেন। মুসলমানদের বন্ধন মুক্তিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের কথা উল্লেখ করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমিও সেই মুসলিম উম্মাহার সদস্য। তিনি বলেন, ২০০ বছর ধরে ভারতে মুসলমানরা বৃটিশ রাজের ভয়াবহ বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন। যারা ভাগ এবং শাসনের (ডিভাইড অ্যান্ড রুল) রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নীতি অনুসরণ করেছিল। বৃটিশরা হিন্দুদের সুবিধা দিয়েছিল আর মুসলিমদের করেছিল বঞ্চিত। বাংলা ভাগ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরোধিতা মুসলিমদের আহত করেছিল। বৃটিশরাজও এতে বিরক্ত হয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে ১৯১১ সালে রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ভারতের মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষায় ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে স্যার সৈয়দ আহমদের আমন্ত্রণে একটি সম্মেলন হয়েছিল। আলাদা রাষ্ট্রের জন্য মুসলমানরা আন্দোলন শুরু করে। এ আন্দোলন মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছিলো। এরপর ১৯৪০ সালে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ছুটে যান লাহোরে। যেখানে তিনি ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। যে প্রস্তাবে মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রসমূহ (ংঃধঃবং) প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন। সালাউদ্দিন কাদের বলেন, এটা আমার বিশ্বাস যে ধারণার সঙ্গে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাস্তবতার ফারাক থাকে। এ প্রসঙ্গে রেকর্ডেড জবানবন্দির বাইরে তিনি বলেন, আমার সম্পর্কে ধারণা থেকে অনেক কথা বলা হয়। অনেকে হয়তো আমার নাম শুনলেই ভেবে বসেন পাকিস্তানের কথা, ভাবেন আমি এন্টি ইন্ডিয়ান। সালাউদ্দিন কাদের বলেন, জর্জটাউন স্কুল অব ফরেন সার্ভিসে পড়ার সময় যশবন্ত সিং আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। আমি এবং আমার স্ত্রী তার পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি। একসময় তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন। ৯০-এর দশকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর সঙ্গে যশবন্ত সিংও বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। সেসময় আমার অফিসের স্টাফরা আমাকে না জানিয়ে এক ঝুড়ি আম যশবন্ত সিংয়ের কাছে পাঠানোর জন্য রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আমের ঝুড়ির সঙ্গে একটি ভিজিটিং কার্ডও দেয়া হয়। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সঙ্গে সঙ্গে রেড এলার্ট জারি করে। আমাকে ফোন করে জানতে চাওয়া  হয় ঝুড়িতে কোন বিস্ফোরক দ্রব্য আছে কি না? প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জবানবন্দিতে আপত্তি জানিয়ে বলেন, উনি অনেক ভালো ইংরেজি বলছেন। বহুদিন এত ভালো ইংরেজি শুনি না। শুনতে ভালো লাগছে। কিন্তু এ মামলার সঙ্গে এসব বক্তব্যের কোন সম্পৃক্ততা নেই। এসব বক্তব্য বাদ দিতে হবে। এসময় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আপনারা আড়াই বছর বলেছেন। অথচ আমাকে বলতে দিচ্ছেন না। আমার সম্পর্কে তো আমাকে বলতে দিতে হবে। এটাতো হ্যামলেটের ভূত নয়। আমাকে তো আমার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে। রাজনীতি মুষ্টিযুদ্ধ নয়। তিনি বলেন, কাজী নজরুল ইসলামকে এ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসা এবং তাকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়া বঙ্গবন্ধুর কোন সাম্প্রদায়িক সিদ্ধান্ত ছিল না। বরং এর মাধ্যমে দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অঙ্গীকারই প্রকাশ পেয়েছে। সালাউদ্দিন কাদের বলেন, সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী হত্যার বিরুদ্ধে আমার প্রকাশ্য অবস্থান রয়েছে। প্রসিকিউশন এ বক্তব্যে তীব্র আপত্তি জানায়। পরে তা বাদ দেয়া হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বার বার সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে সময় বেঁধে দেয়ার কথা বললে তিনি বলেন, ফাঁসিতো দিবেনই। তাড়াহুড়ার কি আছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর পরাজয়কে তিনি বর্ণনা করেন জনগণের ইচ্ছার কাছে শক্তির পরাজয় হিসেবে। রাজনীতিবিদদের ওপর নির্যাতের সংস্কৃতির বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হিসেবে আমি এখানে দাঁড়িয়েছি। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সবাই জানে আমার মুখে যা আসে তাই আমি সামনাসামনি বলে ফেলি। আমার দোষ একটাই আমি পুরো পলিটিশিয়ান। তিনি বলেন, রাজনৈতিক নিপীড়ন দক্ষিণ এশিয়ায় কোন রূপকথার বিষয় নয়। এ যুগে শুধু জ্যামেতিক হারে নিপীড়নের মাত্রা বেড়েছে। ঔপনিবেশিক যুগে রাজনীতিবিদদের কারারুদ্ধ করা হতো তাদের বাড়ি, ভিআইপি গেস্ট হাউজ অথবা কখনও কখনও কারাগারের কোয়ার্টারে। রাজবন্দিদের শারীরিক নির্যাতনের কোন নজির তখন ছিল না। রাজবন্দিদের তাদের চাহিদা অনুযায়ী সব সুযোগ- সুবিধা দেয়া হতো। তাদের ব্যক্তিগত আয়ের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দেয়া হতো। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রখ্যাত নেতাদের মধ্যে মহাত্মা গান্ধী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু এবং তার পিতা পণ্ডিত মতিলাল নেহেরুসহ অনেককে রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে। তাদের সঙ্গে বৃটিশ রাজের ব্যবহার ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ। রাজবন্দিদের প্রতি এ ধরনের শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ এমনকি ১৯৪৭ সালের পরেও বহাল ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার জীবনীতে এ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। পাকিস্তান আমলের দুঃসহ ২৩ বছরেও আমি এমন একটি ঘটনা মনে করতে পারছি না যেখানে কারাবন্দি রাজনৈতিক নেতাকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। এমনকি ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের পর কোন ধরনের শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ আমি শুনিনি।
পোশাকধারী ব্যক্তিদের দ্বারা আমি প্রথম দুর্ব্যবহারের শিকার হই ২০০৭ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তারের সময় যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় ছিল। সে সময় একজন ‘দেশপ্রেমিক’ সেনা কর্মকর্তা ঔদ্ধত্য দেখিয়ে আমার চোখ বেঁধে ফেলে। ধানমন্ডির বাসা থেকে ৫ ফুট দৈর্ঘ্য এবং নয় ফুট প্রস্থের একটি সেলে না নেয়া পর্যন্ত আমাকে ওই অবস্থাতেই রাখা হয়। আমার পাশের সেলেই আটক ছিলেন আমাদের বর্তমান মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর এবং আ.হ.ম মোস্তফা কামাল। পরের ৪৮ ঘণ্টা আমাদের টানা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সে সময় আমাদের ‘সামরিক আতিথেয়তা’ দেয়া হয়। সেটা ছিল ২০ মাসের আঘাতের শুরু। রাজনীতিবিদদের শারীরিক নির্যাতনের এ প্রক্রিয়ার আরও শিকার ছিলেন আবদুল জলিল, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ওবায়দুল কাদেরসহ অনেকে। নির্যাতনের মাধ্যমে অনেকের কাছ থেকে তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে বিবৃতি আদায় করা হয়েছিল। তখন নিপীড়ক সরকারের সহযোগী সংবাদ মাধ্যমে তা ফলাও করে প্রকাশও করা হয়েছিল। প্রত্যেক পেশার মানুষেরই নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সমিতি রয়েছে। আইনজীবী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, এমনকি সরকারি কর্মকর্তাদেরও সমিতি রয়েছে। কিন্তু অসহায় রাজনীতিবিদদের নিজের স্বার্থ রক্ষায় কোন সমিতি নেই। বরং রাজনীতিবিদরা মাংসাশী প্রাণীর মতো নিজ শ্রেণীর মানুষদের গ্রাস করতে ভূমিকা রাখেন। মরহুম ফজলুল কাদের চৌধুরীর সন্তান হিসেবে জন্মের পর থেকেই রাজনীতির সঙ্গে আমার এক ধরনের সংযোগ ছিল। ভিন্নমতের রাজনীতিবিদদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ ৭০-এর দশক পর্যন্ত ছিল। কিন্তু সমসাময়িক রাজনীতিতে তা আর নেই। তার দীর্ঘ জবানবন্দিতে প্রসিকিউশনের আপত্তির জবাবে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমসাময়িক সময়ে খেলাফত আন্দোলনের নেতা মাওলানা মোহাম্মদ আলী ও মাওলানা শওকত আলীকে রাষ্ট্রদ্র্রোহিতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ওই মামলায় ডিফেন্স সাক্ষী হিসেবে মাওলানা মোহাম্মদ আলী ২ মাস ২৪ দিন নিজের পক্ষে দাঁড়িয়ে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। তখন আমরা পরাধীন ছিলাম। অথচ এখন স্বাধীন বাংলাদেশে মাত্র তিন দিন জবানবন্দি দেয়ার পরই আমাকে টাইম ম্যানেজমেন্টের কথা শোনানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, হতে পারে এটাই আমার জীবনের শেষ বক্তৃতা। ফাঁসি দেয়ার দিবেন, কোন সমস্যা নেই। কিন্তু আমাকে আমার কথা বলতে দিতে হবে। পুরনো এক প্রবাদ বাক্যের উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি তুমি কাউকে হত্যা করতে না পারো তবে তাকে একটি খারাপ নাম দাও। ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনীতে ১৬ কোটি মানুষকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে অভিযুক্ত করার যোগ্য করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইচ্ছাকে চাপিয়ে আইনে এ সংশোধনী আনা হয়েছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক নিপীড়ন বাংলাদেশে নিয়মে পরিণত হয়েছে। এটা জনপ্রিয় এবং নির্বাচিত রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে আরও বেশি সত্য। এক এগারোর নায়কেরা রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনেছিল যেন তাদের নির্বাচন এবং ক্ষমতার বাইরে রাখা যায়। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, ওয়ান ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দেশ ত্যাগের জন্য চাপ দেয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনাকে চাপ দেয়া হয়েছিল তিনি যেন দেশে না ফেরেন। খালেদা জিয়াকে তার বাসা ত্যাগ করে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (তৎকালীন নাম) যেতে চাপ দেয়া হয়েছিল। ওয়ান ইলেভেনের দস্যুদের এ দু’টি প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছিল। এ দুই জন জাতীয় আইকনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশী হাইকমিশনার লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত আদালতে তাদেরকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছিল। গণতন্ত্রকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে এ দুই জাতীয় আইকনসহ জনপ্রিয় রাজনীতিবিদদের পার্লামেন্টের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত আদালতের মুখোমুখি করা হয়েছিল। এ অপবিত্র কাজের সঙ্গী হয়েছিলেন ভাড়াটে শ্রেণীর কিছু  লোক। মিডিয়ার একটি অংশ, সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের  একটি অংশ এবং কিছু আইনজ্ঞ তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। যে আইনজ্ঞরা এক এগারোর শাসন সমর্থন করেছিলেন তাদের নেতৃত্বে ছিলেন দ্বিজাতি তত্ত্বের সুবিধাভাগী একজন সংবিধান বিশেষজ্ঞ।  এক এগারোর দস্যুরা যে উদ্দেশ্যে রাজনীতিবিদদের নিপীড়ন করেছিল সে একই উদ্দেশ্যে এখনও রাজনীতিবিদদের ওপর নিপীড়ন হচ্ছে। ১৯৭৯ সাল থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রে আমি একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। এরপর সব নির্বাচনেই আমি অংশ নিয়েছি, যেসব নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও অংশ নিয়েছিল। সমঝোতা অথবা এক দলীয় কোন সরকারে আমি কখনওই অংশ নেইনি। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীকে পরাজিত করে প্রতিটি সংসদেই আমি প্রতিনিধিত্ব করেছিলাম। আমি আমার বিজয় ভাগ করে নিয়েছিলাম প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সমালোচকদের সঙ্গে। সংসদের তৈরি আইনের অধীনে আমাকে এখানে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে এ আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইচ্ছায় সামরিক বাহিনী, আধা সামরিক বাহিনী এবং সহযোগী বাহিনীর সদস্যদের বিচারের জন্য এ আইন করা হয়েছিল। প্রথম যে বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়েছিল তাতে ‘ব্যক্তি’ কথাটি যুক্ত ছিল। কিন্তু পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায় তা বিল থেকে বাদ দেয়া হয়। ২০০৯ সালে চলতি সংসদের দ্বারা সংশোধিত আইনে ‘ব্যক্তি অথবা ব্যক্তিবর্গ’ কথা যুক্ত হয়। এরমাধ্যমে ১৬ কোটি মানুষকে এ আইনে বিচারের যোগ্য করা হয়েছে।
আইন তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংসদ সার্বভৌম। সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি হচ্ছে নারীকে পুরুষ অথবা পুরুষকে নারী বানানো ছাড়া সংসদ সব কাজই করতে পারে। নবম সংসদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইচ্ছাকে চাপিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনীতে ‘ব্যক্তি অথবা ব্যক্তিবর্গ’ শব্দ আইনে যুক্ত করা হয়। ২০১০ সালের ১৯শে ডিসেম্বর থেকে এ আইনে আমাকে আটক রাখা হয়েছে। অথচ কোন আটকাদেশ আমি এখনও পাইনি। এসময়ে সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতে প্রেসিডেন্ট আমাকে সমন পাঠিয়েছেন। সংসদে যোগ দেয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করে আমি এ ট্রাইব্যুনালে আবেদন দায়ের করেছি। অথচ ট্রাইব্যুনাল তার বিচারিক ইচ্ছা অনুযায়ী আমার আবেদনগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জবানবন্দির এ পর্যায়ে আবারও প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়। প্রসিকিউকর তুরিন আফরোজ বলেন, এরই মধ্যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ১০ সেশন জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি যেসব কথা বলছেন তা এ মামলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদেরকে আইনের মধ্যে থেকে এগুতে হবে। জবাবে সালাউদ্দিন কাদের বলেন, আপনারা ১০ সেশনের হিসাব করছেন। আর আমি হিসাব করছি আমার জীবনের। আমাকে আমার কথা বলতে দিতে হবে। বৃটিশ আমলে মাওলানা মোহাম্মদ আলী দুই মাস ২৪ দিন নিজের পক্ষে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। আর স্বাধীন বাংলাদেশে আমাকে প্রতিদিন টাইম ম্যানেজমেন্ট শেখানো হচ্ছে। শাহবাগ চত্বর ডাক দিলো আর আপনারা আইন সংশোধন করে ফেললেন? এখনতো দেখছেন আপিল বিভাগ সাত জন এমিকাস কিউরি নিয়োগ দিয়েছে। প্রসিকিউশন যেভাবে ভাবছে কাল সকালেই আমার ফাঁসি হয়ে যাবে সবকিছু এত দ্রুত হবে না। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, এ মামলায় প্রসিকিউশনের আনা হাজারো মিথ্যার মধ্যে একটাই সত্য আমি মরহুম একেএম ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে। তিনি বলেন, ফর্মাল চার্জে প্রসিকিউশন আমার পিতাকে সামপ্রদায়িক ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তাকে বর্ণনা করা হয়েছে হিন্দু বিরোধী ব্যক্তি হিসেবে। তার অর্জনকে অস্বীকার করা হয়েছে। আমার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী  প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র ছিলেন। সেসময়ে তিনি থাকতেন কারমাইকেল হোস্টেলে। সেসময় নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর শিষ্য হিসেবে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর ভারত ত্যাগ না করা পর্যন্ত তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নেতাজীর দেশ ত্যাগের পর ফজলুল কাদের চৌধুরী ছয় মাসের জন্য আল্লামা মাশরিকির দলে যোগ দিয়েছিলেন। পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন সত্ত্বেও নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সমাবেশে সভাপতিত্ব করা নিয়ে ফজলুল কাদের চৌধুরী সবচেয়ে গর্বিত ছিলেন। প্রসিকিউশন ঐ ঐতিহাসিক সত্য অস্বীকার করেছে যে, ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে কোন ধরনের সামপ্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। যখন আমার পিতা চট্টগ্রামের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, কলকাতার জনপ্রিয় ছাত্র নেতা হিসেবে আমার পিতার রাজনৈতিক অনুসারীদের মধ্যে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নিজের আত্মজীবনীর বহুস্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সে কথা বলেছেন। এ মামলা চলাকালীন সময়েই যে আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়েছে।
স্যামুয়েল জনসনকে স্মরণ করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, সত্য এমন এক গাভী যা প্রসিকিউশনকে দুধ দেয়নি যে কারণে ষাঁড়ের কাছে গেছে দুধ দেয়নি। আমার পিতা এবং আমাকে নিয়ে ফর্মাল চার্জে যে অকল্পনীয় কল্পকাহিনী তৈরি করা হয়েছে যা কল্পকাহিনীর লেখকদের কল্পনাকে হার মানায় তার জবাব দেয়ার মধ্যেই আমি আমার জবানবন্দি সীমাবদ্ধ রাখবো। দর্জিদের মতো নিজের ইচ্ছামত ইতিহাস তৈরির প্রবণতা মানুষের মধ্যে রয়েছে, তবে সুখের বিষয় হলো ইতিহাস তা অনুমোদন করে না। ১৯৭১ সালের ২৯শে মার্চ করাচির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছিলাম। সেসময় বিমানে আমার সঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন রাষ্ট্রদূত ওসমান সিদ্দিকী। যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ইয়ার মেট ছিলেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইশরাতও ওই বিমানে ছিলেন। এটা ঐতিহাসিক সত্য যে আমার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আইনজীবী ছিলেন। এ মামলার ফর্মাল চার্জে আমাকে মনোবিকারগ্রস্ত খুনি হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়নি। মানসিক প্রতিবন্ধীর অভিযোগও তারা আমার বিরুদ্ধে আনেনি। আমি আমার মরহুম পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর রাজনীতির অনুসারী ছিলাম এ সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করেই আমার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ আনা হয়েছে। ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম জেলা মুসলিম লীগের সেক্রেটারি হিসেবে আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন ফজলুল কাদের চৌধুরী। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সমর্থন সত্ত্বেও ১৯৪৬ সালে বেঙ্গল এসেম্বলির নির্বাচনে আমার পিতাকে মনোনয়ন দিতে মুসলিম লীগ ব্যর্থ হয়। মুসলিম লীগের অর্থের যোগানদাতাদের একজন খান বাহাদুরকে মনোনয়ন দেয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তরুণ মুসলিম লীগ নেতাদের মধ্যে ফরমান উল্লাহ খান, মাজহার কুদ্দুস এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে কলকাতায় মুসলিম লীগ অফিসের সামনে বিক্ষোভ হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর ফজলুল কাদের চৌধুরী একটি বিবৃতি দিয়ে ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন, যেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়। যে নির্বাচনে আমার পিতা পরাজিত হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের ক্র্যাকডাউনের পূর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ইয়াহিয়া খানের সমঝোতা প্রচেষ্টা চলাকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধু এবং আমার পিতা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পূর্ববর্তী সময়ে তার নিজের এবং তার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর ভূমিকার বিশদ বর্ণনা দেন সালাউদ্দিন চৌধুরী। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেসময় আমার ধানমন্ডির বাসায় নিয়মিত আসতেন শেখ কামাল, তোফায়েল আহমেদ, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, সিরাজুল আলম খান, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, সালমান এফ রহমান, শাহজান সিরাজসহ আরও অনেকে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে আসাদকে যখন হত্যা করা হয় তখন তার ১০ ফুট দূরত্বের মধ্যেই ছিলাম। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক সমাবেশেও অংশ নিয়েছিলাম। ওই সমাবেশে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাকে স্বাধীনতার ঘোষণা বলে দাবি করা হয়ে থাকে। যদি তাই হয় তবে আমি দাবি করতে পারি আমি মুক্তিযুদ্ধের একজন সমর্থক ছিলাম। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত আমি ঢাকায় বাস করতাম। যেহেতু ঢাকায় আমাদের কোন ড্রাইভার ছিল না, সেকারণে আমরা পিতার বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমিই গাড়ি ড্রাইভ করতাম। আমার ধানমন্ডির বাড়িটি আমার কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের আড্ডাখানা ছিল। আমার জানা মতে, আমিই একমাত্র ছাত্র ছিলাম যে  ধানমন্ডিতে একাকী একটি বাড়িতে বাস করতাম এবং আমার একটি গাড়ি ছিল। আমার পিতা চট্টগ্রামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। এমএলএ, এমএনএ, মন্ত্রিসভার সদস্য, স্পিকার এবং ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট থাকার সময় আমার পিতা চট্টগ্রামের জন্য যে অবদান রেখেছিলেন তার স্বাক্ষর আজও বহন করছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমী প্রভৃতি। ১৯৬০ সালে যখন আমি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম তখন থেকে আমি নিজস্ব পদ্ধতির জীবন যাপন করতাম যা আমার পুরো শিক্ষা জীবনেই বহাল ছিল। যার মধ্যে সাদিক পাবলিক স্কুল, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নের সময় অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৬৫ সালের শেষ এবং ’৬৬ সালের শুরুর চার মাস সময়, যখন আমি প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম সে সময় ছাড়া ’৬৬ সাল থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত আমি কখনওই চট্টগ্রামে আমার পারিবারিক বাসভবন গুডস হিলে বাস করিনি। চট্টগ্রামের সঙ্গে আমার সামাজিক যোগাযোগের পুরোটাই ১৯৭৪ সালের পরের। ১৯৭৯ সালের পূর্বে চট্টগ্রামের ভোটার তালিকায়ও আমার নাম ছিল না। ১৯৬৬ সালের শুরুর দিকে আমার পিতা যখন মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কার হন তখন থেকে ’৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি গণপরিষদের একজন স্বতন্ত্র সদস্য ছিলেন। এসময় তিনি আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন, যে আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে আইয়ুব শাসনের সমাপ্তি হয়। তখন সাধারণভাবেই তার যোগাযোগ ছিল মুসলিম লীগার নন এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিচারপতি মাহবুব মোর্শেদ, এয়ার ভাইস মার্শাল আসগার খান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান, নুরুল আমীন, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।
পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে তখন আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। যদিও আমি নিজে কখনও কোন ছাত্র সংগঠনের সদস্য ছিলাম না। আমার বন্ধুদের সঙ্গে ’৬৯ সালে আমি আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম। সে আন্দোলনের একটি ধানমন্ডি অধ্যায়ও ছিল। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা প্রায়শই আমার ধানমন্ডির বাসায় মিলিত হতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া আমার বন্ধুদের মধ্যে যারা ধানমন্ডিতে থাকতেন এবং যারা ধানমন্ডির বাইরে থাকতেন তারা আমার বাসায় আসতেন। তাদের মধ্যে যাদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ছিল তারা হলেন- তাওহিদ সামাদ, সালমান এফ রহমান, শেখ কামাল, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, নিজাম আহমেদ, খায়রুল বাশার, ইরফান খান, ইমরান আহমেদ, কাজী আনোয়ার, আবদুস সামাদ, কাইয়ুম রেজা চৌধুরীসহ আরও অনেকে। সিনিয়রদের মধ্যে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু তার সমসাময়িক যেমন আবদুর রউফ, তোফায়েল আহমেদ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, সিরাজুল আলম খান, আবদুল কুদ্দুস মাখন, শাজাহান সিরাজদের আমন্ত্রণ জানাতেন। আন্দোলনকে বেগবান করতে তারা আমার বাড়িতে মিলিত হতেন। সিনিয়রদের এসব মিটিংয়ে আতিথেয়তা দেয়াই ছিল আমার কাজ। এসব নেতার অনেকে আমার পিতার সঙ্গেও প্রায়শই দেখা করতেন। ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়নের বন্ধুদের সঙ্গে আমিও ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক সমাবেশে অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে ঐতিহাসিক বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণের আকাঙ্ক্ষাই ব্যক্ত করেছিলেন। এটা দাবি করা হয়ে থাকে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ কার্যত স্বাধীনতার ঘোষণা। ঐ ঐতিহাসিক সমাবেশে আমার উপস্থিতি সুনিশ্চিত করতে পারেন, এমন বহুসংখ্যক ব্যক্তির মধ্যে রয়েছেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম, তোফায়েল আহমেদ, মনিরুল হক চৌধুরী, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, সালমান এফ রহমান, খায়রুল বাশার, নিজাম আহমেদ, কাইয়ুম রেজা চৌধুরী, ড. বেলাল বাকী, তাওহিদ সামাদসহ আরও অনেকে। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ থেকে ২২শে মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আমার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর একাধিক বৈঠক হয়। ঐসব বৈঠকের খবর সে সময়কার সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস সময় বাংলাদেশে ছিলেন না বলে দাবি করেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৯শে মার্চ করাচির উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেছিলাম। প্রথম তিন সপ্তাহ ছিলাম করাচিতে। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত লাহোরে। যেখানে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করি। সেখানে একইসঙ্গে পড়তেন শামীম হাসনাইন (বর্তমানে হাইকোর্টের বিচারপতি)। অক্টোবরের ১০ তারিখে লাহোরে শেষ বারের মতো আমার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমার। অক্টোবরের ১২ তারিখে লন্ডনের উদ্দেশ্যে লাহোর ত্যাগ করি। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্র্যাকডাউন এবং নির্বিচার গণহত্যার পর ঢাকা পরিণত হয় এক আতঙ্কের নগরীতে। আমি এবং আমার বন্ধুরাও এর বাইরে ছিলাম না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তারের পর পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত গণপরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদের সব সদস্যরাও ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন। সাত কোটি নিরস্ত্র বেসামরিক জনগোষ্ঠীর জীবন পরিণত হয়েছিল পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর করুণার বিষয়ে। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ তাদের নিজেদের এবং তাদের আপনজনদের জীবন রক্ষার এবং টিকে থাকার পথ খুঁজেছিল। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৯শে মার্চ বিকালে আমি করাচির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছিলাম। আমাকে তেজগাঁও বিমানবন্দরে দিয়ে এসেছিলেন আমার কাজিন কাইয়ুম রেজা চৌধুরী। পিআইএল-এর ম্যানেজার হামিদ জং-এর সহযোগিতায় আমি ফ্লাইটে একটি সিটের ব্যবস্থা করেছিলাম। করাচি বিমানবন্দরে আমাকে নিতে এসেছিলেন আমার স্কুল জীবনের বন্ধু মুনীব আর্জুমান্দ এবং মাহমুদ হারুনের ব্যক্তিগত সহকারি। করাচির ভিক্টোরিয়া রোডে হারুনদের পারিবারিক বাসস্থানে আমি অবস্থান করেছিলাম। হারুনরা তিন ভাই ছিলেন। তারা হলেন- ইউসুফ এ হারুন, মাহমুদ এ হারুন এবং সাইয়েদ এ হারুন। তাদের পিতার নাম স্যার আব্দুল্লাহ হারুন। যিনি বৃটিশ শাসনামলে  আমার  পিতার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। হারুন ভাইয়েরা ৫০ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি তাদের মালিকানাধীন আলট্রা ইন্স্যুরেন্সের উপদেষ্টা ছিলেন। করাচিতে আমি মাহমুদ এ হারুন, তার স্ত্রী এবং তাদের দুই কন্যার অতিথি ছিলাম। আমি করাচিতে তিন সপ্তাহ অবস্থান করেছিলাম। সে সময় ইউসুফ এ হারুনের সঙ্গেও আমার কয়েক দফায় দেখা হয়েছে। তখন তিনি ঢাকায় বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ডন গ্রুপ অব পাবলিকেশন্সের মালিক হারুন ভাইয়েরা মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের পুরোটা সময়ই বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছিলেন। পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তির পর হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে বঙ্গবন্ধু প্রথম যার সঙ্গে কথা বলেছিলেন তিনি হলেন মাহমুদ এ হারুন। ১৯৯৮ সালে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় ইউসুফ এ হারুন ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি হয়ে এসেছিলেন। তিনি বলেন, সাদিক স্কুলে আমার ক্লাসমেট ও রুমমেট ছিলেন মোহাম্মদ মিয়া সুম্র। পরে তিনি ২০০৮ সালে পাকিস্তানে কেয়ারটেকার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। সুম্র এবং মুনীর আর্জুমান্দ-এর সঙ্গে করাচি অবস্থানকালে আমার সামাজিক যোগাযোগ ছিলো। তারা আমার করাচি অবস্থানের ব্যাপারে লিখিত এফিডেভিট দিয়ে আমাকে জানিয়েছেন। এ ট্রাইব্যুনালে তার সাক্ষী দিতেও আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের ভিসা দেয়া হয়নি। করাচিতে অবস্থানকালে ঢাকার বন্ধুদের মধ্যে সালমান এফ রহমান, নিজাম আহমেদ, কাউয়ুম রেজা চৌধুরী, ওসমান সিদ্দিকী, রেজাউর রহমানের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। আমি সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমার ছাড়পত্রের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আমার বন্ধু ওসমান সিদ্দিকী যা আমাকে সংগ্রহ করে দিয়েছিল, তার পিতা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তায় আমি লাহোরে চলে যাই। আমি সেখানে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাসে ভর্তি হই। রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের ফাইনাল ইয়ারে ভর্তি হই। সেখানে আমি দেখা পাই আমার বন্ধু শামীম হাসনাইনের। তাকে ১৯৬৬ সাল থেকে আমি চিনতাম। নটর ডেম কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েও আমরা বন্ধু ছিলাম। তিনি বলেন, জুন, জুলাই এবং আগস্ট মাসের পুরোটাই আমি লাহোরে ছিলাম। এসময় আমি ও শামীম হাসনাইন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে দীর্ঘ সময় কাটাই। আগস্টে আমার ফাইনাল পরীক্ষা হয়।
১৯৭১ সালের ১৩ই এপ্রিল রাউজানের কুণ্ডেশ্বরীতে আমার উপস্থিতির মিথ্যা গুজবের জন্মদাতাকে চিহ্নিত করতে এ ট্রাইব্যুনাল আমাকে সুযোগ দিয়েছে। প্রসিকিউশনের একজন সাক্ষী ওই দিন আমার কুণ্ডেশ্বরীতে উপস্থিত থাকার কথা বলেছেন। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন তিনি তা শুনেছেন ভারত থেকে ফিরে আসার পর। এ দাবি মিথ্যায় প্রতিপন্ন হয় এই কারণে যে, নতুন চন্দ্র সিংয়ের ছেলে সত্য রঞ্জন সিং ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে আমার মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রস্তাবক ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৩ই এপ্রিল আমি বাংলাদেশ থেকে ১২০০ মাইল দূরে ছিলাম। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ কল্পকাহিনী, আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যা তৈরি করেছে। রাউজানে তিনটি নির্বাচনে আমি পরীক্ষা দিয়েছি। প্রতিবারই আমি আমার প্রতিপক্ষকে পরাজিত করেছি। এ অভিযোগের প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেননি যে তিনি আমাকে অতীতে দেখেছেন। রাজনৈতিক কারণে আমাকে এ বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। এ নিয়ে আমার মনে কোন সন্দেহই নেই যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ব্যাপকমাত্রার গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। এ ভূমির এক সন্তান হিসেবে এবং যেহেতু আমি ভারত থেকে আসা উদ্বাস্তু নই তাই সামপ্রদায়িকতার ভিত্তিতে বিভক্ত সীমানায় সৃষ্ট বাংলাদেশের প্রতি আমার প্রেম এবং আনুগত্য শর্তহীন। অর্থনৈতিক এবং বস্তুগত সুবিধা দিয়ে আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকি। আমি এটা বিশ্বাস করি যে উদ্দেশ্য প্রণোদিত মিথ্যের কারণে আমরা ৩০ লাখ শহীদের নাম গোপন রেখেছি। আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর শহীদদের নাম ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ফটকে টানানো আছে। এটা দুঃখজনক যে ৪২ বছরে আমরা ৩০ লাখ শহীদের নাম চিহ্নিত করে তাদের স্বীকৃতি দিতে পারিনি। তবে এটা সুখের বিষয় যে আমার বিরুদ্ধে ফর্মাল চার্জে কিছু নতুন শহীদের নাম উন্মোচিত হয়েছে, ৪২ বছরে যাদের কথা বলা হয়নি। এদের বেশির ভাগই হিন্দু সমপ্রদায়ের। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং শত্রু সম্পত্তি অধ্যাদেশ জারির পর বহু হিন্দু পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করে ভারতে চলে গিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তারা আবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন। নতুন চন্দ্র সিং ছাড়া চার্জে উল্লিখিত মৃত ব্যক্তিদের কারও নামই ৭০’ সালের ভোটার তালিকা অথবা কোন ভূমি রেকর্ডে ছিল না। ট্রাইব্যুনালের প্রশ্নের জবাবে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমি এ কথা এ কারণে বলছি নিহত হয়েছেন বলে এমন অনেকের কথা বলা হয়েছে যারা ৭১’ সালে বাংলাদেশেই ছিলেন না। তিনি বলেন, উনসত্তরপাড়ার ঘটনা নিয়ে ১৯৭২ সালে মামলা হয়েছিল। যে মামলায় আমাকে আসামি করা হয়নি, এটা স্বীকার করে যে, ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে আমি বাংলাদেশে ছিলাম না। মধ্যগরিয়া, বণিকপাড়া এবং সুলতানপুরের ঘটনায় কোন থানায় কোন মামলা হয়নি, আবারও এটা স্বীকার করে যে, ১৯৭১ সালের এপ্রিলে আমি বাংলাদেশে ছিলাম না। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নিপীড়নের স্পন্সর হচ্ছেন ধর্মনিরপেক্ষতার ছায়ায় আশ্রয় নেয়া কিছু হতাশ সমাজতন্ত্র প্রেমিক। তারা জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ এবং বিপক্ষের শক্তিতে বিভক্ত করতে চান। এ অপচেষ্টার অংশ হিসেবেই মুসলিম উম্মাহার নেতাদের নানা অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ অপচেষ্টার শিকার হিসেবে আমি এ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়েছি। বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসীদের এই বিভক্তির সময়ে আমি প্রতিনিধিত্ব করি হুমকির মুখে থাকা বিশ্বাসীদের এবং আমি নিজেও বিশ্বাসী। এ জন্য আমি অবিশ্বাসীদের টার্গেট হয়েছি, যারা প্রথাগতভাবেই আমার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি বলেন, তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আবারও বলছি ১৯৭১ সালের ২৯শে মার্চ থেকে ১৯৭৪ সালের ২০শে এপ্রিল পর্যন্ত আমি বাংলাদেশে ছিলাম না। জবানবন্দি শেষে প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম জেরায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তিনি এতদিন যা বলেছেন তা জেনে বুঝে বলেছেন কিনা? জবাবে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আই অ্যাম সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী অব বাংলাদেশ। যখন যা বলি জেনে-বুঝে এবং অর্থপূর্ণতাসহ বলি। 

Monday, 30 September 2013

সত্যিই কি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন?

কথিত ‘জাতিসংঘের সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড’ নিয়ে ধাপ্পাবাজির চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। এবার দ্বিতীয় বারের মতো এই পুরস্কার ‘অর্জনের’ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গতকাল মহা ধুমধাম করে গণসংবর্ধনা দেয়া হলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিনি এই পুরস্কারটি পাননি। তাছাড়া সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড জাতিসংঘের কোনো পুরস্কারও নয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের তরফ থেকে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে সাফল্য পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এবারও জাতিসংঘের সাউথ সাউথ পুরস্কার দেয়া হয়েছে। নিউইয়র্কে পৌঁছেই গতকাল তিনি এই পুরস্কারটি গ্রহণ করেছেন।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর সরকার নিয়ন্ত্রিত বার্তা সংস্থা বাসস জানায়, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দারিদ্র্যবিমোচনে বাংলাদেশের অসামান্য অবদান এবং দারিদ্র্য হ্রাসে তার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সফলতার স্বীকৃতি হিসেবে’ সাউথ-সাউথ পুরস্কার পেয়েছেন। দেশের সব প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার খবরটি প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়। কিন্তু প্রকৃত তথ্য একেবারেই ভিন্ন।
সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড নামের সংগঠনটি ২০১৩ সালে যাদের পুরস্কৃত করেছে তাদের মধ্যে শেখ হাসিনার নাম নেই। তিনি পেয়েছেন সাউথ সাউথ নিউজের একটি পুরস্কার, যেটি সাউথ সাউথ পুরস্কারের একটি পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান এবং এমডিজির সাফল্য নিয়ে খবর ভাগাভাগির ওয়েবসাইট। সাইটটি এতটাই অবহেলিত যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এবার যে পুরস্কার দেয়া হয়েছে সেই খবরটিই তাদের সাইটে নেই।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড জাতিসংঘের কোনো পুরস্কারও নয়। জাতিসংঘের ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তাও পুরস্কারটি তুলে দেন না। সম্ভবত সাউথ সাউথ নামের এই অখ্যাত পুরস্কারটি নিয়ে বাংলাদেশেই বেশি মাতামাতি হচ্ছে।
সাউথ সাউথ পুরস্কার পাননি শেখ হাসিনা : সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড নামে সংগঠনটির একটি নিজস্ব ওয়েবসাইট রয়েছে (southsouthawards.com)। ২০১৩ সালে কারা এই পুরস্কার পেয়েছেন এখানে তার তালিকা দেয়া হয়েছে।
‘গ্লোবার গভর্ন্যান্স লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ নামে এই পুরস্কার দেয়া হয় গত ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ওয়ালডর্ফ অ্যাস্টোরিয়ায়। ১৯ সেপ্টেম্বর সংগঠনের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এবার এই পুরস্কার পেয়েছেন কোস্টারিকার প্রেসিডেন্ট লরা শিলশিলা মিরান্ডা, বাইরাইনের প্রধানমন্ত্রী খলিফা বিন সালমান আল খলিফা এবং জিফির প্রধানমন্ত্রী জোসাইয়া বরেক বাইনিমারামা।
এছাড়া টেকসই উন্নয়ন ও তথ্যপ্রযুক্তিতে অবদান রাখার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা, তার সাবেক স্ত্রী গ্রাসা ম্যাশেল এবং আমেরিকার সঙ্গীতশিল্পী ডেভিড পাইচকেও এই পুরস্কার দেয়া হয়।
লক্ষণীয় এবারের এই তালিকায় কোথাও শেখ হাসিনার নাম নেই।
পুরস্কারটি প্রদান করা হয়, ২২ সেপ্টেম্বর রোববার। প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে পৌঁছান সোমবার। সরকারের পক্ষ থেকে প্রচারণা চালানো হয়, তিনি পরে পুরস্কারটি গ্রহণ করেছেন।
সাউথ সাউথ পুরস্কার কী : এমডিজি অর্জনে সাফল্য দেখিয়েছে—এ রকম দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান, রাজনীতিক এবং বেসরকারি খাতের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে উত্সাহিত করার জন্যই এই সাউথ সাউথ পুরস্কার বা ‘গ্লোবার গভর্ন্যান্স লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ দেয়া হয়।
আফ্রিকার দেশ এন্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডার জাতিসংঘের স্থানীয় মিশন, আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন, জাতিসংঘের লোকপ্রশাসন নেটওয়ার্ক (ইউএনপ্যান), দ্য ইন্টারন্যাশনাল অরগানাইজেশন ফর সাউথ সাউথ কোঅপারেশন (আইওএসএসসি), জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থা এবং সাউথ সাউথ নিউজের আয়োজনে ২০১১ সাল থেকে সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড দেয়া হচ্ছে।
পুরস্কার প্রদানে সহায়তা করে থাকে জাতিসংঘে তৃতীয় বিশ্বের কয়েকটি দেশের স্থায়ী মিশন। এর মধ্যে রয়েছে মালাউই, ডমিনিকান প্রজাতন্ত্র, জাম্বিয়া, তাজিকিস্তান, এল সালভাদর ও হন্ডুরাস।
এটি কোনো উল্লেখ করার মতো কোনো পুরস্কারও নয়। ২০১১ সালেও শেখ হাসিনা এই পুরস্কার পান। এবারও যদি তিনি পুরস্কার পেতেন তাহলে তিন বার প্রদত্ত এই পুরস্কারের মধ্যে দু’বারই পেতেন শেখ হাসিনা। এটিই যদি সত্য হয়, তাহলে সেই পুরস্কারের মর্যাদা বলতে তো কিছু অবশিষ্ট থাকে না।
শেখ হাসিনা তাহলে কী পেয়েছেন : আওয়ামী লীগের ওয়েবসাইটে এ সংক্রান্ত একটি খবর প্রকাশ করে বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেলসন ম্যান্ডেলাসহ অন্য নেতাদের সঙ্গে এবার সাউথ সাউথ পুরস্কার গ্রহণ করেছেন (www.albd.org/index.php/en/updates/news/253-pm-receives-south-south-award)। কিন্তু এর সঙ্গে যে ছবিটি দেয়া হয়েছে, তাতে দেখা যায় সাউথ সাউথ নিউজ লেখা।
আগেই বলা হয়েছে, সাউথ সাউথ নিউজ ‘গ্লোবার গভর্ন্যান্স লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ বা সাউথ সাউথ পুরস্কারের একটি পৃষ্ঠপোষক।
কাজেই তারা এই পুরস্কার দিতে পারে না। কাজেই প্রধানমন্ত্রী যে পুরস্কারটি পেয়েছেন, তা সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড নয়, অন্য কোনো পুরস্কার।
কী ছিল সরকারি ভাষ্যে : সরকারনিয়ন্ত্রিত বার্তা সংস্থা বাসস গত ২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক থেকে জানায়, প্রধানমন্ত্রী এবারও সাউথ সাউথ পুরস্কার পেয়েছেন। ‘দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্যের স্বীকৃতি আইওএসএসসির’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দারিদ্র্যবিমোচনে বাংলাদেশের অসামান্য অবদান এবং দারিদ্র্য হ্রাসে তার সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সফলতার স্বীকৃতি হিসেবে এখানে পুরস্কার গ্রহণ করেছেন।
দ্য ইন্টারন্যাশনাল অরগানাইজেশন ফর সাউথ-সাউথ কো-অপারেশন (আইওএসএসসি) সোমবার সন্ধ্যায় তার সদর দফতরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে এ পুরস্কার তুলে দেয়।
দক্ষিণ-দক্ষিণ অঞ্চলের দেশগুলোর ত্রিমুখী সহযোগিতায় জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে আইওএসএসসি গঠিত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ জানান, সাউথ-সাউথ সদর দফতরের প্রেসিডেন্ট ও সাউথ-সাউথ নিউজ অ্যাম্বাসেডর ফ্রান্সিস লরেঞ্জো সংস্থাটির সদর দফতরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান এবং তার হাতে এ পুরস্কার তুলে দেন।
দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের জন্য এ পুরস্কার দেয়ায় প্রধানমন্ত্রী আইওএসএসসি এবং বিভিন্ন দেশের প্রধানমন্ত্রী, ফার্স্ট লেডি এবং আইওএসএসসিভুক্ত দেশগুলোর সরকারপ্রধানদের ধন্যবাদ জানান।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ সময় প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়, তার মেয়ে সায়মা হোসেন পুতুল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, আওয়ামী লীগের নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি, জাসদ নেতা মঈনুদ্দিন খান বাদল এমপি, পার্লামেন্ট সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি এ কে আবদুল মোমেন উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাসসের ওই সংবাদটি তথ্যনির্ভর নয় এবং এজন্য আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচারণাও নেহায়েতই মিথ্যাচার।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন কাভার করতে আমার দেশ-এর স্টাফ রিপোর্টার মাহাবুবুর রহমানসহ বহু বাংলাদেশী সাংবাদিক নিউইয়র্কে অবস্থান করলেও ওই অনুষ্ঠানে কোনো সাংবাদিকই ছিলেন না। বাসসসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে শুধু সরকারি ভাষ্য প্রচার করা হয়েছে। কোনো কোনো গণমাধ্যম সূত্র উল্লেখ না করেই খবরটি প্রচার করেছে।
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানার জন্য গত রাতে প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীর মোবাইলে ফোন দেয়া হলে তার মোবাইলটি বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদের মোবাইল ফোনে কল দেয়া হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তারা দু’জনই ওই পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। 

ব্রেকিং নিউজঃ সাকা চৌধুরীর রায় প্রকাশের আগেই কপি ফাস,রায় লিখেছে আইন মন্ত্রনালয়



বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলার রায় লেখা হয়েছে আইন মন্ত্রনালয়ে। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-১ থেকে যে রায় দেয়ার কথা রয়েছে সেই রায়ের কপি পাওয়া গেছে ভারপ্রাপ্ত আইন সচিব আবু সালেহ শেখ মোহাম্মদ জহিরুল হকের অফিসের একটি কম্পিউটারে। এতে আরো যে বিস্ময়কর তথ্য পাওয়া গেছে তা হল- বিচার শেষ হবার আগেই রায় লেখা শুরু হয়েছে। ফাইলের তথ্যে দেখা যায় ২৩ মে রায় লেখা শুরু হয়েছে, যখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরম্নদ্ধে প্রসিকিউশন স্বাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ চলছিল। এ তথ্যগুলো পাওয়া যায় বেলজিয়াম ভিত্তিক ওয়েবসাইট http://www.tribunalleaks.be/ । যেখানে রায়ের খসড়া এবং ফাইনাল কপি আপলোড করা হয়। 

১৯৭১ সালের মানবতা বিরোধী মোট ২৩ টি অভিযোগে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়েছিল। সেখান থেকে মোট ১৭টি অভিযোগের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইবুনালে সাক্ষী হাজির করে। যেহেতু রাষ্ট্রপড়্গ ১৭টি অভিযোগের পক্ষে সাক্ষী হাজির করেছে, তাই এ ১৭টি অভিযোগের বিষয়ে রায় লেখা হয়েছে মর্মে দেখা যায় আইন মন্ত্রনালয় থেকে পাওয়া রায়ের কপিতে। আইন মন্ত্রনালয় থেকে পাওয়া আজকের রায়ে দেখা যায়- ১৭টি অভিযোগের মধ্যে মোট ৯টি অভিযোগে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। আটটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে।

২৩টি অভিযোগের মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ ছয়টি অভিযোগের পড়্গে কোন সাড়্গী হাজির করেনি। সে ছয়টি অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ প্রমানে ব্যর্থ হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। 

১৭টি অভিযোগের মধ্যে যে ৯টি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্তô করা হয়েছে সেগুলো হলঃ



২ নং অভিযোগ ঃ মধ্য গহিরায় গণহত্যা। 

৩নং অভিযোগ ঃ নূতন চন্দ্র হিংস হত্যা।

৪নং অভিযোগ ঃ জগৎমলল পাড়া গণহত্যা।

৫ নং অভিযোগ ঃ সুলতানপুরে নেপাল চন্দ্র ও অপর তিনজনকে হত্যা।

৬ নং অভিযোগ ঃ ৬৯ পাড়া গণহত্যা।

৭ নং অভিযোগ ঃ সতিশ চন্দ্র পালিত হত্যা।

৮ নং অভিযোগ ঃ মোজাফফর ও তার ছেলে শেখ আলমগীর হত্যা।

১৭ নং অভিযোগ ঃ নিজাম উদ্দিন আহম্মদকে অপহরণ ও নির্যাতন।

; ১৮ নং অভিযোগঃ সালেহউদ্দিন আহমদকে অপহরণ ও নির্যাতন।




১৭টি অভিযোগের মধ্যে যে ৮টি অভিযোগ থেকে সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে খালাস দেয়া হয়েছে সেগুলো হলোঃ


১ নং অভিযোগ ঃ গুডস হিলে সাতজনকে অপহরণ করে ও নির্যাতন করে।

১০ নং অভিযোগ ঃ মানিক ধরের বাড়ি লুট।

১১ নং অভিযোগ ঃ বোয়াল খালী গণহত্যা।

১২ নং অভিযোগ ঃ বিজয় কৃঞ্চ ও দুইজনকে হত্যা।

১৪ নং অভিযোগ ঃ হানিফ হত্যা।

১৯ নং অভিযোগ ঃ মাহবুব আলম হত্যা।

২০ নং অভিযোগ ঃ এখলাস হত্যা।

২৩ নং অভিযোগ ঃ সলিমুল্লাহর উপর নির্যাতন।

যে ৬টি অভিযোগের বিরম্নদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করেননি সেগুলো হলোঃ ৯, ১৩, ১৫, ১৬, ২১ এবং ২২। রায়- এ লেখা হয়েছে এ ৬টি অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে।

যেখানে পাওয়া গেল ফাইলটিঃ

আইন মন্ত্রণালয়ের ষষ্ঠ তলার একটি কম্পিউটারের ডি-ড্রাইভে “Local Disk (DHappy” এই রায়ের কপি পাওয়া যায়। কম্পিউটারের প্রত্যেকটি ফাইল বা ডকুমেন্টের উৎস নির্ণয়ক তথ্য ঐ ফাইল/ডকুমেন্টে সংরক্ষিত থাকে। এই তথ্য ঐ ফাইল বা ডকুমেন্টের প্রপারেটিস অপশনে গেলে পাওয়া যায়। এই রায়ের কপিটি যে ফাইল পাওয়া গেছে তার প্রপারটিস পরীড়্গা করে নি্নোক্ত তথ্য পাওয়া যায়।

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিখ্যাত কিছু উক্তি

১) বাবু ওআইসি নিয়ে কথা বলার কে, উনাকে ওআইসি নিয়ে কথা বলতে হলে,আমি ছোট বেলায় যে জিনিসটা কেটে ফেলে দিয়েছি,আগে ওই জিনিসটা কেটে ফেলতে হবে। তারপর বাবুকে ওআইসি নিয়ে কথা বলতে বলেন "

ওআইসি-এর মহাসচিব পদের জন্যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরিকে বাংলাদেশের পক্ষ 
থেকে পাঠানো হয়েছিল। সাকা চৌধুরি সেই জন্যে দেশের বাহিরে ছিল।
আর সেই সময় সাংবাদিকদেরকে কালা বিলাই চুরুঞ্জিত বলেছিল-"সাকা চৌধুরিকে কেন
ওআইসি-এর মহাসচিব , উনি তো এর যোগ্য না।"

দেশে ফিরে এলে, সাংবাদিকরা বিমান বন্দরে সাকা চৌধুরিকে কালা বিলাই চুরুঞ্জিতের
এই কথা বলল, তা শুনে সাকা চৌধুরি উপরোক্ত বচ্চন ছাড়ে


২) আগে দেখতাম কুত্তা লেজ নাড়ে, এখন দেখি লেজেই কুত্তা নাড়ায়"

৩) সংবিধান পরিবর্তন নিয়ে....'সোনা মিয়া'-কে বানাইসে "লাল মিয়া" আর "লাল মিয়া"-রে বানাইসে 'সোনা মিয়া' ।
এখনে মিয়া-মিয়া কিন্তু ঠিকই আছে। 'সোনা' ডা শুধু "লাল" হইয়া গেছে।” 


৪) মাননীয় স্পিকার এদেশে নতুন একধরনের ডিজিটাল মেশিন আবিষ্কৃত হয়েছে,
যার একপাশ দিয়ে রাজাকার ঢুকিয়ে দিলে, অন্য পাশ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে বের হয়।
আর সেই মেশিনটির নাম ডিজিটাল আওয়ামীলিগ মেশিন। "


৫) "আংগুল দেখাবেন না,ওই আংগুল এ রিং পরানোর কথা ছিল"।
-সাকা চৌধুরী হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে 

সংসদে হাসিনা আঙ্গুল তুলে সা কা চৌধুরীকে কথা বললে, সাকা উপরুক্ত উক্তিটি করেন।

৬) আমি বুঝিনা এত সোনা থাকতে ওনার কেন আমার সোনা পছন্দ । ওয়াজেদ সাহেব তো উনার সোনার
চাহিদা পুরন করবে। এর মধ্যে আমি কেন আসব "-সাকা চৌধুরী (হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে) 

-তার কথা শুনে সাংবাদিকদের মধ্যে হাসির রোল পরে গেলে...

আবার সাকা চৌধুরী বলেন-"আমি কিন্তু সোনা বলতে এখানে অরনামেন্ট'স বুঝিয়েছি ।"


৭) সংসদে বক্তিতার এক পর্যায়ে সাকা চৌধুরী বলেছিলেনঃ

সাকা - ".....মাননীয় স্পিকার,আমিতো চোদনা হয়ে গেলাম।"
স্পিকার- "মাননীয় সংসদ সদস্য আপনি আপনার ভাষা সংযত করুন।"
সাকা -,"মাননীয় স্পিকার,আমি আবারও চোদনা হয়ে গেলাম।"


৮) ওই মহলটি কি জানে না যে তারা যে বিলের মাছ আমি সালাউদ্দিন ওই বিলের বক ৷" 
আওয়ামী লীগের একটি মহল প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তাকে উস্কে দিচ্ছে অভিযোগ করলে সাকা চৌধুরী উপরুক্ত কথাটা বলেন । 

-" ওরা কি জানেনা,আমি সালাউদ্দিন যদি গ্রেনেড মারতাম তাহলে সেটা মিস হত না ৷
শেখ হাসিনাকে নিজের ছেলের বিয়ের দাওয়াত দিতে গেলে হাসিনা গ্রেনেড মেরে তাকে হত্যা করতে যাওয়ার অপবাদ দেওয়ায় সাকা চৌধুরী এই কথা বলেন । 

৯) কামরুল যে কেরানীগজ্ঞের একজন প্রমোদ বালক এটা কি আমি কখনও বলেছি "
নারী নির্যাতন বিষয়ে আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুলের একটি বক্তব্যের জবাবে সাকা চৌধুরি এই কথা বলেন

১০) ছাত্রজীবনে শেখ মুজিব আমার বাবার শিষ্য ছিলেন"। 
প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ট যোগাযোগের কথা উল্লেখ করে তিনি এই কথা বলেন 



Sunday, 29 September 2013

যুক্তরাষ্ট্রে হাসিনা সরকারের কোটি টাকার লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ

 যুদ্ধাপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরির জন্য ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি লবিস্ট ফার্মকে নিয়োগ করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদও লবিস্ট ফার্ম নিয়োগের কথা স্বীকার করেছেন।

এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার বা ১ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।

ইংরেজি দৈনিক ‘নিউএজ’ পত্রিকার এক প্রতিবেদনে রবিবার এই তথ্য ফাঁস করা হয়েছে। ‘গভর্নমেন্ট অ্যাপয়েন্টস ইউএস লবিইং ফার্ম টু সাপোর্ট আইসিটি’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী ৫ মাসের জন্য যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে কাজ করবে বিজিআর পাবলিক রিলেশন্স নামের ওই প্রতিষ্ঠানটি।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া প্রতিবেদনে বিজিআর জানায়, গত ১৩ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে তাদের চুক্তি হয়েছে।

ওই চুক্তির চারদিন পরাই জামায়াতের ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে এক নজিরবিহীন রায়ে ফাঁসি দিয়েছেন সুপ্রিমকোর্ট।

চুক্তিতে বলা হয়, যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে লবিইং করার জন্য আগামী ৫ মাস বাংলাদেশ সরকার বিজিআরকে প্রতি মাসে ২০ হাজার ডলার করে মোট ১ লাখ ডলার বা প্রায় ৮০ লাখ টাকা দেবে।

এছাড়া ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের এ সংক্রান্ত কাজে কোনো ভ্রমণ প্রয়োজন হলে তার সমুদয় খরচ বহন করবে সরকার। প্রয়োজনে চুক্তির মেয়াদ আরও বাড়ানো হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৩৮ সালের আইন অনুসারে সেদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের দেশের বাইরের কারও পক্ষে লবিং করার জন্য চুক্তি করা হলে তার বিস্তারিত তথ্য বিচার মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হয়।

জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের এবং বিজিআরের প্রেসিডেন্ট জেফরি এইচ বার্নবাউম চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

কৌশলগত যোগাযোগ, জনমত গঠন, বিদেশি সরকারের প্রতিনিধিত্বসহ গণসংযোগের নানা কাজে নিজেকে বিশ্বমানের বলে দাবি করেছে বিজিআর।

বিজিআরের প্রেসিডেন্ট জেফরি এর আগে ফক্সনিউজ এবং ওয়াশিংটন পোস্টে কাজ করেছেন।

লবিস্ট ফার্ম নিয়োগের কথা স্বীকার করে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ শনিবার নিউএজ- কে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মত প্রভাবশালী দেশে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা সামাল দিতেই সরকারকে লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ দিতে হয়েছে।’

তিনি দাবি করেন, ‘এর আগে ট্রাইব্যুনালকে রাজনৈতিক রং দিতে জামায়াতে ইসলামী প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছে।’

নিউএজ জানায়, ২০১১ সালের অক্টোবরে তাদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ভাই যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাসিডি অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস নামের একটি লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ দেয়। তবে এজন্য আড়াই কোটি ডলার খরচ করা হয়েছে বলে যে তথ্য সরকার প্রচার করেছে প্রকৃত খরচ তার চেয়ে অনেক কম।

শফিক আহমেদ দাবি করেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার কোনো রাজনৈতিক জিঘাংসা নেই। তিনি বলেন, যখন অনেকগুলো রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে সেই মুহূর্তে লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ সময়োচিত হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, বিজিআরের অনুকূলে সম্প্রতি ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ সরকার যেসব তথ্য অতি গোপনীয় হিসেবে চিহ্নিত করত তা অতি গোপনীয় রাখবে বিজিআর।

উল্লেখ্য, যুদ্ধপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সরকারের তীব্র সমালোচনা হচ্ছে।

এ অবস্থায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভাষণেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই বিচারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন চেয়েছেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মত খ্যাতনামা মানবাধিকার সংগঠনগুলো সুপ্রিমকোর্টে কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়ের কড়া সমালোচনা করেছে।

যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিফেন জে র্যা পও বলেছেন, মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে অবশ্যই আপিল বা রিভিউ করার সুযোগ থাকতে হবে।
http://www.rtnn.net//newsdetail/detail/1/1/71010#.UkgLcIZ6ZVK

Saturday, 28 September 2013

গার্মেন্ট অস্থিরতায় ২০ হাজার ভারতীয় ম্যানেজারের ইন্ধন

জন্মসূত্রে ভারতীয় হলেও বাংলাদেশে তারা বসবাস করেন নিজ দেশের মতোই। ভিসা-টিকিটের বালাই নেই। ইচ্ছেমতো এ দেশে আসেন, ইচ্ছে হলেই ভারতে যান। বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিয়ত লাখ লাখ ডলার নিয়ে গেলেও সরকারকে কোনো ট্যাক্স দেন না। সরকারি বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যও তাদের ঘাটায় না। কারণ তারা বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পের ‘প্রাণ’. ...মার্চেন্ডাইজার, প্রোডাকশন ম্যানেজার, জেনারেল ম্যানেজার, ফাইন্যান্স ম্যানেজার, অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার, ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটিং ম্যানেজার, কোয়ালিটি কন্ট্রোলার প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তারা নিয়োজিত। অর্ডার আনা থেকে শুরু করে পণ্য প্রেরণ পর্যন্ত সব গুরুত্বপূর্ণ কাজই হয়ে থাকে অপেক্ষাকৃত অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন এসব কর্মকর্তার হাত দিয়ে। কারখানার মালিক ও সাধারণ শ্রমিকদের মাঝে সেতুবন্ধনের কাজটিও করে থাকেন তারা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রফতানি বাণিজ্যে ৮০ শতাংশ অবদান রক্ষাকারী বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্প খাতের বেশির ভাগ উদ্যোক্তারই শিক্ষা প্রয়োজনের তুলনায় কম। তাদের অনেকেই কারখানার মালিক হয়েছেন শ্রমিক থেকে। আবার এমন অনেক কারখানাও রয়েছে যেগুলোর মূল মালিকেরা এ ব্যবসায়ের সাথে সরাসরি যুক্ত নন। সামান্য মালিকানা নিয়ে যিনি কারখানা দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করছেন তিনি এক সময় শ্রমিক ছিলেন।

টাকাওয়ালা কিছু লোককে ম্যানেজ করে নিজে কিছু শেয়ার নিয়ে কারখানা গড়ে তুলেছেন। কারখানার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করছেন মধ্যম পর্যায়ের ম্যানেজারেরা, যাদের বেশির ভাগই ভারত কিংবা শ্রীলঙ্কা বংশোদ্ভূত। এরাই মন চাইলে কারখানার ভালো করছেন, আবার মনের মধ্যে কোনো দূরভিসন্ধি এলে মালিকপক্ষকে কৌশলে পথে বসিয়ে দিচ্ছেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত আট থেকে ১০ বছরে যেসব কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ হয়েছে তার বেশির ভাগই ছিল কমপ্লায়েন্ট। এসব কারখানায় কর্মপরিবেশ ভালো, নিয়মিত বেতন-ভাতা দেয়া হয়, ওভার টাইম দেয়া হয়, টিফিন থেকে শুরু করে বেশির ভাগ যুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রেই এসব কারখানার শ্রমিকেরা সন্তুষ্ট। অথচ কখনো রাস্তায় সড়ক দুর্ঘটনায় শ্রমিক মৃত্যুর অজুহাতে, কখনো শ্রমিক গুম কিংবা টয়লেটে ভূত থাকার মতো গুজব ছড়িয়ে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করানো হচ্ছে এসব কারখানায়। অপর দিকে যেসব কারখানায় নিয়মিত বেতন-ভাতা দেয়া হয় না, কাজের পরিবেশ নি¤œমানের এবং কথায় কথায় শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটছে শ্রমিক অসন্তোষ বা ভাঙচুরের ঘটনা এসব কারখানায় অনেক কম ক্ষেত্রেই ঘটছে।

এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তৈরী পোশাক শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল উদ্যোক্তা জানান, যেসব কারখানা বড় ও কমপ্লায়েন্ট সেগুলোর কাজের ভলিউমও বেশি। মোটা অঙ্কের বেতন দিয়ে বিদেশী কর্মকর্তাদের এখানে নিয়োগ করা হয়। তাদের অনেক সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়। কিন্তু কোনো কারণে মালিকের ওপর ুব্ধ হলে কিংবা কারখানার মালিক হওয়ার খায়েশ হলে তারা শ্রমিক অসন্তোষের মতো ঘটনা ঘটিয়ে কারখানা ধ্বংস করে দেন। স্থানীয় মাস্তান, রাজনৈতিক টাউট, ঝুট ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পক্ষকে লেলিয়ে দেয় কারখানার বিরুদ্ধে। অন্য দিকে ছোটখাটো কারখানাগুলো নিজেরা কোনো কাজ আনতে পারে না। অন্য কারখানার কাজ তারা সাব কন্ট্রাক্টে করে থাকে। এসব কারখানায় মোটা অঙ্কের বেতন দিয়ে বিদেশীদের পোষা হয় না। ফলে উসকানি দেয়া হয় না, ভাঙচুরও হয় না। অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্প খাতে বর্তমানে প্রায় ২৫ হাজার বিদেশী কর্মরত আছেন। এদের মধ্যে ২০ হাজারই ভারতীয়। একেক কারখানায় ১০ থেকে ২০ জন ভারতীয় মিলে গড়ে তুলেছেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট।

অপেক্ষকৃত অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন বলে দাবিদার এসব কর্মকর্তা এতটাই দাপুটে অবস্থানে রয়েছেন যে মালিকরা চাইলেও তাদের মাঝে বা তাদের ওপরে কোনো বাংলাদেশীকে বসাতে পারেন না। তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজের বিশ্বস্ত কোনো বাংলাদেশী বা আত্মীয়স্বজনকে বসাতে চাইলে একযোগে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তারা। পেশাগত কারণেই আমেরিকা-ইউরোপে অবস্থানরত ভারতীয় বংশোদ্ভূত ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সাথে তাদের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। তারপর কৌশলে নিজ কর্মস্থল কারখানাটি বিক্রি করে দেন ভারতীয়দের কাছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পের সাথে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করে যারা টিকতে পারছে না তারাও যুক্ত হয়েছে এই চক্রের সাথে। বিশেষ করে ইউরোপ-আমেরিকায় ভালো অবস্থানে থাকা ভারতীয়রা উঠেপড়ে লেগেছে এর বিরুদ্ধে। নিজেদের অস্থাভাজন এই মিড লেবেল ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে তারা একের পর এক নামকরা কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছেন, আবার কৌশলে কিনেও নিচ্ছেন।

 অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, একদা বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পের অহঙ্কার হিসেবে পরিচিত এসকিউ, ক্রিস্টাল, মাস্টার্ড, হলিউড, শান্তা, রোজ, ফরচুনা, ট্রাস্ট, এজাক্স, শাহরিয়ার, স্টারলি, ইউনিয়ন প্রমুখ দেশসেরা গার্মেন্ট কারখানার মালিক এখন ভারতীয়রা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিজ দেশের ওই ম্যানেজারদের যোগসাজশে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ, আমেরিকান, কানাডিয়ান নাগরিকেরা কিনে নিয়েছেন এসব কারখানা। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ নয়া দিগন্তকে বলেন, কারখানাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা এসব কর্মকর্তা এতটাই ক্ষমতাশালী যে, অনেক সময় স্বল্পশিক্ষিত মালিকদের তারাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। কৌশলে তারাই শ্রমিকদের সাথে মালিকদের সম্পর্ক তিক্ত করেন। একেক পক্ষকে একেক রকম বুঝিয়ে অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলেন। তবে শিল্পের জন্য তাদের অপরিহার্যতা আছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের এখানে অনেক শিক্ষিত বেকার আছে সত্য, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লেখাপড়া কর্মমুখী না হওয়ায় আমরা যখন লোক নিয়োগের উদ্যোগ নেই তখন যোগ্য লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি পোশাক শিল্প খাতে কর্মরত বিদেশীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
http://www.nowbdnews1.com/nayadiganta/2013/09/28/16851.htm

Friday, 27 September 2013

‘বঙ্গবন্ধু ৩ লাখ বলতে গিয়ে ৩০ লাখ বলেছিলেন’

jafrullahগণস্বাস্থ্য হাসপাতালের পরিচালক ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে নিহত হওয়া মানুষের সংখ্যা ৩ লাখ বলতে গিয়ে ভুল করে ৩০ লাখ বলেছিলেন।
বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা গণপরিষদ আয়োজিত ‘দেশপ্রেমিক অকুতোভয় সাংবাদিক মরহুম আতাউস সামাদের স্বপ্ন ও আজকের বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।
জাফরুল্লাহ বলেন, ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের মধ্যে ৩০ লাখ লোককে হত্যা করা সহজ কথা নয়। শেখ মুজিব ৩ লাখ বলতে গিয়ে ভুল করে ৩ মিলিয়ন অর্থাৎ ৩০ লাখ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে নিহত হওয়ার কথা বলে ফেলেন। কিন্তু তাঁর সে ভুল কেউ ধরিয়ে দেয় নাই।
http://www.newsevent24.com/?p=64075

তৌফিক এলাহীরা সরকারকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন

গোলাম মোর্তোজা : ‘প্রধানমন্ত্রী দেশে নাই। শুরু হয়েছে ভয়াবহ লোডশেডিং’Ñ এটা সরকার পক্ষের কারও কারও অভিযোগ। অভিযোগের ধরনটি এমন যে, বিদ্যুৎ সেক্টরের লোকজন সরকারকে বিপদে ফেলার জন্যে লোডশেডিং করছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ঠিকই আছে, সরকারকে বিব্রত করাই তাদের লক্ষ্য। এ বিষয়ে সরকারের কর্তাদের মেজাজ খারাপ করে দেওয়া কিছু তথ্য ও কয়েকটি অগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

১. প্রধানমন্ত্রী তো বিদ্যুৎ সঙ্গে নিয়ে আমেরিকায় যাননি। বিদ্যুৎ উৎপাদন যদি ঠিক থেকে থাকে, তবে সেই বিদ্যুৎ কোথায় গেল?

২. লোডশেডিং কেন হচ্ছে- সেই প্রশ্ন করবে জনগণ। সরকারের লোকজনও যদি প্রশ্ন করে, তবে কাজ করবে কে?

৩. বিদ্যুতের চাহিদা কত, উৎপাদন কত, চুরি কত- সবই ডিজিটাল। জানা খুব সহজ। যদি সত্যি স্যাবোটাজ হয়ে থাকে, তবে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?

৪. সরকারি তথ্য অনুযায়ী উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট। চাহিদা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। উৎপাদন হচ্ছে হঠাৎ দু’একদিন ৬ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। এছাড়া প্রতিদিন আসলে উৎপাদন হচ্ছে ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট।

ক. প্রতিদিন উৎপাদন ঘাটতি দেড় হাজার থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট।

খ. উৎপাদন ক্ষমতা যদি ৯ হাজার মেগাওয়াট হয়, উৎপাদন কেন ৫ হাজার বা ৬ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট?

৫. রেন্টাল বা কুইক রেন্টালে সরকার পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। উৎপাদন না হলেও কুইক রেন্টাল ব্যবসায়ীদের কোনো ক্ষতি নেই। ক্যাপাসিটি ট্যাক্স তারা ঠিকই পাচ্ছে। যেমন একটি কুইক রেন্টাল কোম্পানির গত এপ্রিল মাসের হিসাব থেকে দেখা যায় তারা ১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎও উৎপাদন করেনি। কারণ সরকার জ্বালানি সরবরাহ করতে পারেনি। কিন্তু তারা এপ্রিল মাসে বিল পেয়েছে ৯ কোটি টাকা।

৬. প্রায় সব রেন্টাল-কুইক রেন্টালের মালিকরা এভাবেই লাভবান হচ্ছে। মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ জনমানুষকে।

৭. চুক্তি অনুযায়ী সরকার জ্বালানি দিতে না পারলে ক্যাপাসিটি ট্যাক্স দেবে। জ্বালানি দেয়ার পরও কুইক রেন্টাল কোম্পানি বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারলে, সরকারকে ক্ষতিপূরণ দেবে। বা¯ত্মবে জেনারেটর অকেজো থাকার কারণে বিদ্যুৎ কেন্দ্র হয়ত চালু করতে পারছে না। ক্ষতিপূরণ যেখানে পাওয়ার কথা সরকারের, সেখানে ঘটছে উল্টো ঘটনা। কাগজে কলমে দেখানো হচ্ছে মেশিন ঠিকই আছে, সরকার জ্বালানি দিতে পারছে না। ফলে মেশিন চালু না করেও প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছে কুইক রেন্টাল কোম্পানিগুলো।

সরকার মাঝেমধ্যে কিছু ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে। তবে সবকিছু মিলিয়ে অর্থ লুটের এক অভিনব উপায় রেন্টাল-কুইক রেন্টাল ব্যবসা।

৮. অতিদ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যে কুইক রেন্টাল হতে পারত সর্বোচ্চ এক বা দুই বছরের জন্যে। কিন্তু সরকার চুক্তি করেছিল ৩ বছরের জন্যে। এখন আবার সেসব চুক্তির মেয়াদ আরও দুই তিন বছর করে বাড়ানো হচ্ছে। অর্থাৎ অস্থয়ী ব্যবস্থাকে স্থায়ী করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

৯. এখন উৎপাদন ক্ষমতা ৯ হাজার মেগাওয়াট। সেটাই উৎপাদন করা যাচ্ছে না। তবে কেন আরও নতুন কুইক রেন্টাল কোম্পানির অনুমোদন দেয়া হচ্ছে? অর্থ হরিলুট?

১০. বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানের জন্যে কুইক রেন্টাল কোনো সমাধান নয়। প্রয়োজন ছিল এই পাঁচ বছরে কয়েকটি বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করা। কিন্তু সেদিকে সরকারের নজর ছিল না। পিডিবির অকেজো হয়ে থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো মেরামতেরও কোনো উদ্যোগ সরকার নেয়নি।



১১. দুই থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা খরচ করলে পিডিবির বন্ধ হয়ে থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। মেরামতের দিকে দৃষ্টি ছিল না সরকারের।

১২. বর্তমান সরকার যেদিন দায়িত্ব নেয় সেদিন বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল প্রায় ৩ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট। এখন গড় উৎপাদন ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ধরলে উৎপাদন বেড়েছে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ উৎপাদন ৬ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ধরলে উৎপাদন বেড়েছে ২৭০০ মেগাওয়াট।

১৩. সব হিসেবের মারপ্যাঁচ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে কুইক রেন্টালের ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্যে বছরে মোট ভর্তুকি দিতে হয় প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। এগুলো অনুমান নির্ভর লেখা নয়। তথ্য-প্রমাণ যাচাই বাছাই করে লেখা। এবার হিসাব করে দেখেন, ২৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্যে কি পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে, হচ্ছে!

১৪. অথচ মাত্র ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা খরচ করলে ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। যার উৎপাদন খরচ হতো প্রতি ইউনিট ৩ থেকে সর্বোচ্চ ৫ টাকা। তেল দিয়ে উৎপাদন করলেও এই খরচ হতো। কুইক রেন্টাল থেকে যেখানে সরকার কিনছে ১৪ টাকা ইউনিট।

১৫. যত বেশি অর্থ ব্যয়, তত বেশি লাভ, তত বেশি আয়। জনগণের নয়, সরকার সংশ্লিষ্টদের!

১৬. সুন্দরবন ধ্বংস করে সরকার এখন ভারতীয় কোম্পানিকে দিয়ে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে চাইছে। এর বিরুদ্ধে চলছে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন, লংমার্চ। অথচ রামপালের পরিবর্তে লবণচড়ায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র করলে কোনো বিতর্ক উঠত না।

রামপাল থেকে সুন্দরবনের দূরত্ব সরকার বলছে ১৪ কি. মি.আসলে দূরত্ব ৯ কি. মি. লবণচড়ার দূরত্ব প্রায় ৩৫-৪০ কি. মি.।

১৭. বিতর্কিত জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক এলাহী চৌধুরী ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন আগামী ২২ অক্টোবর রামপালে ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করা হবে। যুক্তি নয়, একগুঁয়েমি আর গায়ের জোর সরকারের একমাত্র সম্বল।

১৮. ইতিহাস বলে, জনমানুষের বিপক্ষে গিয়ে কোনো কাজে সফল হওয়া যায় না। পশ্চিমবঙ্গের টাটার আলোচিত ন্যানো প্রকল্পের নন্দীগ্রাম ইস্যুতে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারের পতন ত্বরান্বিত হয়েছিল।

আড়িয়াল বিলের বিমানবন্দর পরিকল্পনা থেকে সরে এসে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে শেখ হাসিনা সরকার একবার রক্ষা পেয়েছে।

রামপাল ইস্যুতে তৌফিক এলাহীরা সরকারকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন, কে জানে! সুত্র : সাপ্তাহিক আজকাল, নিউইয়র্ক ।
http://www.amadershomoybd.com/content/2013/09/28/news0042.htm

হায়দ্রাবাদ, মুসলিম গণহত্যার এক অজানা কাহিনী


হায়দ্রাবাদ: ব্রিটিশ থেকে ভারত-পাকিস্তান ভাগের সময় ১৯৪৭ সালে হিন্দু ও মুসলিমদের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রায় ৫ লাখ লোক নিহত হয়। প্রধানত ভারত-পাকিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেই ওই হতাহতের ঘটনা ঘটে। খবর: বিবিসি’র।

কিন্তু এর এক বছর পরই মধ্য ভারতে আরেকটি নির্মম গণহত্যার ঘটনা ঘটে। ওই গণহত্যার ঘটনা আজও ইতিহাসে অস্পষ্ট রয়ে গেছে।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে মুক্ত হওয়ার পর ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবরে মধ্য ভারতে প্রায় আধা লাখ মুসলিমকে হত্যা করে নতুন ভারতীয় রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ। তাদের লাইন ধরিয়ে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে তৎকালীন ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যরা।

ওই ঘটনার ব্যাপারে ভারত সরকার কখনোই কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। ফলে খুব অল্পসংখ্যক ভারতীয়ই ওই গণহত্যার কথা জানে। সমালোচকরা দাবি করেন, ভারতের প্রতিটি সরকারই ওই ঘটনার তথ্য গোপন করে রেখেছে।

ভারত-পাকিস্তান ভাগের সময় যে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় তার এক বছর পর মধ্যভারতের হায়দ্রাবাদে ওই গণহত্যার ঘটনা ঘটে।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারত প্রায় ৫০০টি স্বায়ত্ত শাসিত রাজত্বে বিভক্ত ছিল। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় প্রায় সবগুলো রাজত্বই নতুন রাষ্ট্র ভারত ফেডারেশনে যোগ দেয়। কিন্তু হায়দ্রাবাদের নিজাম স্বাধীনতা দাবি করেন। এতে নয়াদিল্লির হিন্দু নেতারা খুবই অসন্তুষ্ট হন।

নয়াদিল্লি এবং হায়দ্রাবাদের মধ্যে এক দীর্ঘ তিক্ত অচলাবস্থার পর ভারত সরকার অবশেষে ধৈর্য্যহারা হয়ে পড়ে। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের কেন্দ্রে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে প্রস্তুত নন।

তারা আরও আতঙ্কিত হয়ে পড় যখন হায়দ্রাবাদের সবচেয়ে শক্তিশালি মুসলিম রাজনৈতিক দলের সশস্ত্র উইং কয়েকটি হিন্দু গ্রামে ত্রাস তৈরি করে। আর এ ঘটনাটিকেই অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু হায়দ্রাবাদে সামরিক অভিযান চালান। ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতীয় সেনাবাহিনী হায়দ্রাবাদ আক্রমণ করে।

ভারতের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী সহজেই নিজামের বাহিনীকে পরাজিত করে। কিন্তু এরপর ভারতের রাষ্ট্রীয় বাহিনী মুসলিমদের ওপর এক ভয়াবহ নিধনযজ্ঞ চালায়। তারা মুসলিমদের ঘরবাড়ি গণহারে আগুনে পুড়িয়ে দেয়, লুটপাট চালায় এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে গণহারে হত্যা ও গণধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটায়।

এসব ঘটনার খবর নয়াদিল্লিতে পৌঁছানেরা পর প্রধানমন্ত্রী নেহেরু একটি কমিশন প্রেরণ করেন এর তদন্ত করার জন্য। ওই তদন্ত দলে কয়েকজন মুসলিমও ছিলেন। এর নেতৃত্বে ছিলেন পণ্ডিত সুন্দরলাল নামে এক কংগ্রেস সদস্য। কিন্তু ওই তদন্ত প্রতিবেদন আর কোনো দিনই প্রকাশ করা হয়নি।

সুন্দরলালের নেতৃত্বাধীন দলটি হায়দ্রবাদের প্রায় সবগুলো গ্রামই পরিদর্শন করে। ওই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাওয়া প্রতিটি গ্রামের মুসলিমদের সাক্ষ্য থেকে তারা একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন। সেখানে বলা হয়, ‘আমরা এ ব্যাপারে অকাট্য সব তথ্য-প্রমাণ পেয়েছি যে, ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় পুলিশ সদস্যরাই হত্যাযজ্ঞ, লুটপাট এবং অন্যান্য অপরাধে অংশগ্রহণ করেছে।’

‘তদন্তে আমরা এও তথ্য পেয়েছি যে, সেনা সদস্যরা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের মুসলিমদের বাড়িঘর ও দোকানপাট লুটপাটে উৎসাহ যুগিয়েছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সেনা সদস্যরা হিন্দুদের এসব অপরাধ করতে বাধ্য করেছে।’

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মুসলিমদের নিরস্ত্র করে সেসব অস্ত্র হিন্দুদের মাঝে বিতরণ করা হয়। ফলে হিন্দুরা মুসলিমদের ওপর তাদের জিঘাংসা চরিতার্থ করার সুযোগ পেয়ে যায়।

এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ভারতীয় সেনারা নিজেরাই হত্যাযজ্ঞে অংশ নেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অসংখ্য স্থানে সেনা সদস্যরা গ্রাম এবং শহরগুলো থেকে অসংখ্য মুসলিম যুবকদের ধরে নিয়ে এসে তাদের ঠাণ্ডা মাথায় খুন করে।’

তবে তদন্তে এও বলা হয়, কয়েকটি স্থানে ভারতের সেনা সদস্যরা ভালো আচরণ করে এবং মুসলিমদের রক্ষা করে।

মুসলিমদের ওপর হিন্দুদের ওই হত্যাযজ্ঞকে অনেকে হায়দ্রাবাদের সশস্ত্র মুসলিম রাজনৈতিক সংগঠনগুলো কর্তৃক হিন্দুদের ওপর চালানো বহু বছরের নিপীড়নের প্রতিশোধ হিসেবেও ব্যাখ্যা করে থাকেন।

সুন্দরলালের নেতৃত্বাধীন নেহরু কমিশনের প্রতিবেদনের সঙ্গে যুক্ত এক গোপন নোটে হিন্দুদের ওই নির্মম জিঘাংসার বিবরণ দেয়া হয় এভাবে, ‘অসংখ্য স্থানে আমরা পঁচতে থাকা মৃতদেহেপূর্ণ কুয়ো দেখতে পেয়েছি। এ রকম একটি কুয়োতে আমরা একত্রে ১১টি মৃতদেহ দেখতে পেয়েছি, যার মধ্যে শিশু সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখা এক নারীর মৃতদেহও রয়েছে।’

‘আমরা অসংখ্য মৃতদেহের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের টুকরো গর্তের মধ্যে পুঁতে রাখতেও দেখেছি। অসংখ্য স্থানে মুসলিমদের মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলতেও দেখেছি আমরা। মৃতদেহ পোড়ানোর পর অবশিষ্ট হাড়গোড় এবং মাথার খুলিও পড়ে থাকতে দেখেছি আমরা।’

সুন্দরলালের প্রতিবেদনে ২৭ থেকে ৪০ হাজার মুসলিমকে হত্যার কথা বলা হয়। সুন্দরলালের ওই প্রতিবেদন প্রকাশ না করার সিদ্ধান্তের কারণ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী নেহেরু কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তবে ধারণা করা হয়, ভারত-পাকিস্তান ভাগের পর দেশব্যাপী হিন্দু ও মুসলিমদের মাঝে যে ব্যাপক হানাহানি শুরু হয় তা আরও বেড়ে যেতে পারে এই আশঙ্কায় সম্ভবত নেহেরু ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করেননি।

আর এটাও পরিষ্কার নয় যে, আজ কয়েক দশক পরে এসেও কেন ভারতের ইতিহাসের পাঠ্য পুস্তকগুলোতে ওই ঘটনার কোনো বিবরণ যুক্ত করা হয়নি। এমনকি আজও খুব অল্প সংখ্যক ভারতীয়ই সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল তা জানেন।

সুন্দরলালের রিপোর্ট আজও ধোয়াশাচ্ছন্ন রয়ে গেছে। যদিও সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে অবস্থিত নেহেরু স্মৃতি যাদুঘর এবং গ্রন্থাগারে ওই প্রতিবেদনের কপিটি প্রদর্শন এবং পাঠের জন্য উম্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে।