Sunday, 22 December 2013

সে রাতে মেহেরপুরের রাজনগর আচমকা অশান্ত হয়

ভোরের আলো ফুটতে আরও অন্তত ঘণ্টা দুয়েক বাকি।। মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা আঞ্চলিক মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী নিরিবিলি গ্রাম রাজনগরের বেশির ভাগ মানুষ তখনও গভীর ঘুমে। হঠাৎ দুনিয়া কাঁপানো আওয়াজ। বিস্ফোরণের এমন ভয়ঙ্কর আওয়াজের সঙ্গে একেবারেই অপরিচিত গ্রামটির বাসিন্দারা। মুহুর্মুহু সেই আওয়াজ যেন কিছুতেই থামতে চায় না। ক্রমশ কাছাকাছি আসতে থাকে বিকট সেই শব্দ। এভাবেই একটানা গুলি করতে করতে রাজনগর গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করে যৌথবাহিনীর সদস্যরা। শুরু হয় ঘরে ঘরে তল্লাশি। কিন্তু বেশির ভাগ বাড়িতেই পাওয়া যায়নি পুরুষ তথা কর্তাব্যক্তিদেরকে। তাতে আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে যৌথবাহিনীর সদস্যরা। তারা ঘরের আসবাবপত্র টেনেহিঁচড়ে বাড়ির উঠানে জড়ো করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। বেদম পিটুনি দেয় নারী ও শিশুদেরকে। ৭০ বছরের বৃদ্ধও বাদ যায়নি তাদের অত্যাচার থেকে। এভাবেই চলে সকাল ৮টা পর্যন্ত। 

গত বৃহস্পতিবার ভোর রাতের সেই অভিযানের ভয়াবহতার বিবরণ দিতে গিয়ে নবম শ্রেণীর ছাত্রী রেশমা আক্তার কিছু বলার আগেই বারবার শুধু কেঁপে ওঠে। কথা বের হচ্ছিল না তার মুখ দিয়ে। এক সময় ডুকরে কেঁদে ওঠে। তারপর কান্না থামিয়ে শুধু এইটুকু বলে, আমি কিচ্ছু বলতে পারবো না, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। গ্রামের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেহেরপুর জেলা শহর থেকে ৯ কিলোমিটার দূরের এই গ্রামের মানুষদের অপরাধ, চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা সড়কের রাজনগর অংশে তারা প্রতিদিনই শক্ত অবরোধ গড়ে তুলেছিল। মূলত এই গ্রামবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত অবরোধের কারণেই গুরুত্বপূর্ণ এই আঞ্চলিক মহাসড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ থাকে। তবে গ্রামটিতে কোন সহিংসতা ছিল না। গ্রামের আওয়ামী লীগ পরিবারগুলোরও কোন অভিযোগ নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও গত বৃহস্পতিবার যৌথবাহিনীর অভিযানের সময় গ্রামটির বাসিন্দাদের ওপর রীতিমতো তাণ্ডব চালানো হয়। অভিযানের খবর আগেভাগেই জানাজানি হয়ে যাওয়ার কারণে রাজনগর গ্রামের বেশির ভাগ পুরুষ আগের দিনই এলাকা ছেড়ে অন্যগ্রামে পালিয়ে যায়। এ কারণে অভিযানে নেমে যৌথবাহিনীর সদস্যরা বিএনপি-জামায়াতের উল্লেখযোগ্য কোন নেতাকর্মীকে ধরতে পারেনি। আর এতেই প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে গ্রামের নিরীহ নারী, পুরুষ ও বৃদ্ধদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালায়। বাড়িঘর ভাঙচুর, আসবাবপত্রে অগ্নিসংযোগ ইত্যাদির পাশাপাশি সুযোগসন্ধানী কিছু মানুষ দেদার লুটপাটও চালায় গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে। হতবিহ্বল গ্রামবাসী নিজেদের বাড়িঘর ও সম্পদ রক্ষার চিন্তা বাদ দিয়ে আত্মরক্ষার্থে দিগ্বিদিক ছুটে পালানোর চেষ্টা করে। নির্বিচার গুলি ও বেদম পিটুনিতে বহু মানুষ আহত হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে অনেকে পড়ে থাকে বাড়ির উঠানে। চিকিৎসার জন্য তাদেরকে হাসপাতালে নেয়ারও মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুরো অভিযানে সাংবাদিকদের উপস্থিতি ছিল সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। জেলার পুলিশ সুপার নাহিদুল ইসলাম অভিযানের সময় সাংবাদিকদের উপস্থিতির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। তার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করায় এর আগে দু’জন সাংবাদিককে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ কারণে জেলার সাংবাদিক সমাজও এখন আতঙ্কে রয়েছেন। বৃহস্পতিবার ভোরের অভিযানে রাজনগর গ্রাম থেকে নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ মোট ৩৭ জনকে আটক করে নিয়ে যায় যৌথবাহিনী। পরে মেহেরপুর সদর থানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাদেরকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়ে জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। এর মধ্যে আলিহিম নামের এক অভিযুক্ত ব্যক্তির স্ত্রী হওয়ার অপরাধে সোহাগী খাতুন (৪৫)-কে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাদের স্কুলপড়ুয়া মেয়ে ১৯ বছর বয়সী লতিফাকেও সাজা দিয়ে কারাগারের বাসিন্দা বানানো হয়েছে। পুরো ঘটনায় জেলার সাধারণ মানুষ তো বটেই, এমনকি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও বিস্ময়ে হতবাক। তাদের অনেকেই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এ ধরনের ঘটনার ফলে জেলার মানুষের মধ্যে দীর্ঘকালের সম্প্রীতি নষ্ট হয়ে যাবে। এ ধরনের অমানবিক ঘটনার জন্য তারা প্রধানত জেলার পুলিশ সুপারের উগ্রতাকেই দায়ী করেন। সম্প্রতি বদলি হয়ে মেহেরপুরে আসা এই কর্মকর্তা ইতিমধ্যেই জেলার বিভিন্ন গ্রামে সহিংসতা উস্কে দিয়েছেন বলে তাদের অভিযোগ। এমনকি প্রথমবারের মতো জেলার সাংবাদিকরাও পুলিশ সুপারের কাছে অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েছেন।  সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অর্ধশতাধিক গাড়িবহর নিয়ে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর কয়েক শ’ সদস্য আকস্মিক বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৪টায় রাজনগর গ্রামের চতুর্দিকে ফসলি জমিতে অবস্থান নেয়। হঠাৎ একযোগে গুলি চালাতে শুরু করে তারা। এভাবে বিকট শব্দে গুলি চালাতে চালাতে ধীরে ধীরে তারা গ্রামের দিকে অগ্রসর হয়। গুলির শব্দে ঘুমন্ত মানুষ হুড়মুড়িয়ে বিছানা ছেড়ে দিগ্বিদিক ছুটোছুটি ও কান্নাকাটি শুরু করে। যৌথবাহিনীর নির্বিচার গুলিতে গুরুতর আহত হয় গ্রামের উজির আলীসহ অনেকেই। বেশ কিছুক্ষণ একটানা মুহুর্মুহু গুলির পর তারা গ্রামে ঢুকে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি শুরু করে। এ সময় তাদের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী অংশ নেয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যৌথবাহিনীর সদস্যরা  গ্রামের নেতৃস্থানীয়দের বাড়িতে প্রথমে হানা দেয়। কিন্তু বাড়ির পুরুষ তথা কর্তাব্যক্তিকে না পেয়ে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয় তারা। এরপর ঘরের ফ্রিজ, টিভি, খাট, আলমারি ইত্যাদি আসবাবপত্র বাড়ির উঠানে জড়ো করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। লুটপাট করা হয় স্বর্ণালঙ্কারসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী। বেদম মারপিট করা হয় মহিলা ও শিশুদের। এই পদ্ধতিতে ২-৩ ঘণ্টা অভিযান পরিচালনার পর রাজনগর গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে মোট ৩৭ ব্যক্তিকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় মেহেরপুর সদর থানায়। আটককৃতদের মধ্যে ৭৫ বছরের বৃদ্ধ শামসুদ্দিন আলী যেমন আছেন, তেমনি রয়েছে ১৬ বছরের কিশোর সেলিম এবং ১৯ বছরের কিশোরী লতিফা, ২৩ বছরের তরুণী হাফিজা এবং ৫০ বছর বয়সী গৃহবধূ সোনাভানুসহ অনেকেই।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাণ্ড: যৌথবাহিনীর রাজনগর অভিযানে আটককৃত ৩৭ ব্যক্তিকে মেহেরপুর সদর থানায় কয়েক ঘণ্টা আটক রাখার পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অথচ আইনানুযায়ী থানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে শাস্তি দেয়ার সুযোগ নেই। ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক ভূমি সহকারী কমিশনার (এসি ল্যান্ড) ফরিদুল আলম সাংবাদিকদের বলেছেন, সড়ক অবরোধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টির দায় স্বীকার করায় আটককৃতদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মেহেরপুর জজকোর্টের একজন আইনজীবী জানিয়েছেন, আইন অনুযায়ী ঘটনাস্থলে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসবে। সেখানে অভিযুক্তরা অপরাধ স্বীকার করলেই কেবল আদালত তাৎক্ষণিক তাদের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড দেবেন।  কিন্তু এ বিচারে উল্টো ঘটনা ঘটেছে। প্রথমত, যেদিন সাজা দেয়া হয়েছে সেদিন মেহেরপুর জেলার কোথাও কোন সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেনি। দ্বিতীয়ত, যৌথবাহিনী সকালে ৩৭ জনকে আটক করে রাজনগর গ্রাম থেকে। আর বিচারক বিকালে সদর থানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে তাদের সাজা দেয়। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, এটাকে বিচারের নামে অবিচার ছাড়া আর কি বলা যায়। 

শান্ত মেহেরপুর কেন অশান্ত: সীমান্তবর্তী জেলা মেহেরপুর বরাবরই শান্ত জনপদ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের একপর্যায়ে হঠাৎ করেই হয়ে উঠেছে অশান্ত। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এ অবস্থার জন্য জেলার নতুন পুলিশ সুপার ও বিজিবির মেজর আনিছের উগ্র ভূমিকাকেই প্রধানত দায়ী করেছেন। তারা দু’জন শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি চালিয়ে প্রথমবারের মতো উত্তপ্ত করে তোলেন পরিস্থিতি। তারপর থেকে অবস্থার ক্রমশ অবনতি ঘটেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে মেহেরপুরে বিএনপি-জামায়াতের অবরোধকারীরা মূলত ভোরে ও বিকালে দু’দফা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সড়ক অবরোধ করতো। এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর তারা আবার সড়ক ছেড়ে চলে যেতো। কিন্তু এটুকুও সহ্য করতে রাজি হননি পুলিশ সুপার ও বিজিবির মেজর আনিছ। তাদের নির্দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ক্রমশ কঠোর ভূমিকা নেন। তাতেই পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। যেমন রাজনগরে বিজিবির কমান্ডার মেজর আনিছ ক্ষুব্ধ হয়ে অবরোধকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে অবরোধকারীরাও তাকে লক্ষ্য করে বোমা ছোড়ে। এর জবাবে বিজিবি পাল্টা শতাধিক গুলি ছোড়ে। গুলিবিদ্ধ হয় তিনজন। এরপর গত ১২ই ডিসেম্বর মেহেরপুর সদর উপজেলার বন্দর গ্রামে অবরোধকারীদের উদ্দেশে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল ছোড়ে। জবাবে অবরোধকারীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটের টুকরা ছোড়ে। পরে সেখানে পুলিশ সুপার ও বিজিবির মেজর উপস্থিত হয়ে নিজেরাই অস্ত্র উঁচিয়ে বৃষ্টির মতো প্রায় ২০০ রাউন্ড গুলি ছোড়েন। তাদের গুলি করার এই দৃশ্য উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও বিস্মিত করেছে। এসপি ও মেজরের গুলি করার দৃশ্য ধারণ করে টেলিভিশনে প্রচার করায় স্থানীয় সাংবাদিকদের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন পুলিশ সুপার। ওই রাতেই আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় চ্যানেল আই ও মোহনা টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধিকে। এমনকি তাদের ব্যবহৃত কম্পিউটারও জব্দ করে নিয়ে যায় পুলিশ। খবর পেয়ে জেলার সব সাংবাদিক একসঙ্গে ছুটে যান থানায়। কিন্তু এসপির অনুমতি ছাড়া আটককৃত সাংবাদিকদের কিছুতেই ছাড়তে রাজি হননি থানার কর্মকর্তারা। এভাবে গভীর রাত পর্যন্ত নানাভাবে অনুনয়-বিনয় করেও কাজ হয়নি। পরে এসপির কাছে মুচলেকা দিয়ে রাত সাড়ে তিনটায় তাদের দু’জনকে ছাড়িয়ে আনা হয় এবং ২৪ ঘণ্টা পর ফেরত দেয়া হয় তাদের কম্পিউটার। এই ঘটনার পর থেকে মেহেরপুরের সাংবাদিকরাও রয়েছেন তটস্থ অবস্থায়। 
http://mzamin.com/details.php?mzamin=NDA1MA==&s=MTA=