Sunday, 22 December 2013

নজিরবিহীন তাণ্ডব চলছেই সাতক্ষীরায় : পুলিশের বুলডোজারে বিরোধী নেতাদের বাড়ি ভাংচুর-লুট, নেতাকর্মীদের ধরে নিয়ে গুলি, পাঁচ দিনে ছাইয়ের স্তূপে পরিণত হয়েছে শতাধিক বাড়িঘর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান

পুলিশ বুলডোজার নিয়ে এসেছে বাড়ি ভাঙতে। বাড়িমালিক বিরোধী দলের একজন নেতা। এটাই অর্থাত্ বিরোধী দলের নেতা হওয়াটাই সুন্দর বসতবাড়িটি ভেঙে ফেলার একমাত্র কারণ! এদিকে পুলিশের সঙ্গে এসেছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী। পুলিশ বাড়ি ভাঙছে আর ক্যাডার বাহিনী মালপত্র লুটের উত্সবে মেতে উঠেছে! দু’পক্ষ মিলে কয়েক মিনিটে আস্ত পাকা একটা বাড়ি ধুলায় মিশিয়ে দিয়ে নারকীয় উল্লাস করতে করতে স্থান ত্যাগ করছে! আর একটু দূরে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছেন বাড়িটির মহিলা আর শিশু সদস্যরা! এটা বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার প্রতিদিনের বর্তমান চিত্র। এ রকম একাধিক ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে জেলাটিতে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সাধারণত মাঠে নামানো হয় কোথাও বিশৃঙ্খলা ঘটলে তা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য, মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য। এটা সর্বকালে সারা পৃথিবীতে স্বীকৃত হয়ে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান সরকার গড়ছে এক নজিরবিহীন ইতিহাস। দেশের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মাঠে নামানো হয়েছে মানুষ হত্যা এবং তাদের বাড়িঘর ও সম্পদ ধ্বংস করার জন্য! গত ক’দিন ধরে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরায় ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি সরকারি নির্দেশে সাধারণ মানুষের জানমাল ধ্বংসের জ্বলন্ত সাক্ষ্য হয়ে আছে।
গত ১৫ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন, তারা যেন ১৭ ডিসেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া যৌথ অভিযানে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের প্রতিহত করতে মাঠে থাকে। একই দিন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম মেম্বার মোহাম্মদ নাসিম তার দলের নেতাকর্মীদের একই রকম নির্দেশ দেন। এর আগে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে এক কর্মসূচিতে বলেন, ‘এখন থেকে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দেখলে তাদের মিষ্টি খাইয়ে দেবা। মানে ধরো আর মারো।’
এসবের পর গত ১৭ ডিসেম্বর সারা দেশে একযোগে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ধরতে অভিযানে নামে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবের বিশেষ বাহিনী। তখন থেকেই শুরু হয় ধরপাকড় এবং বিরোধীদের হত্যা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আন্তর্জাতিক আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে। এসব ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করলে যে কোনো আদালত সেটি আমলে নিতে বাধ্য।
আওয়ামী সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিয়ে এ ধরনের কর্মকাণ্ড সব ধরনের রেকর্ড ভঙ্গ করে সাতক্ষীরায়। এ জেলায় যৌথবাহিনী বুলডোজার দিয়ে বিএনপি-জামায়াতের একাধিক নেতার বাড়ি ভেঙে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। যৌথবাহিনীর অভিযানের নামে এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নজির বাংলাদেশে আর নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে দেশের প্রায় সব মিডিয়াই নীরবতা পালন করছে। গতকাল রোববারই ঘটেছে বুলডোজার দিয়ে জামায়াত নেতার বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা। এছাড়া শিবির কর্মীকে ধরে নিয়ে পুলিশের গুলি করার ঘটনাও ঘটেছে গতকাল।
বুলডোজার দিয়ে বাড়ি ভাঙচুর-লুট, ধরে নিয়ে গুলি, শতাধিক বাড়িঘর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন
সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের বসতবাড়ি ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেছে যৌথবাহিনী। শনিবার গভীর রাতে এ অভিযান চলানো হয়।
স্থানীয়রা জানান, রাত ১২টার দিকে যৌথবাহিনীর সদস্য ও মুখোশধারী আ.লীগ ক্যাডাররা সদর পূর্ব জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা শফিকুল ইসলামের বাড়িতে অভিযান চালায়। এ সময় তাকে বাড়িতে না পেয়ে যৌথবাহিনীর সদস্যরা বুলডোজার দিয়ে তার বিল্ডিং বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেয় এবং তার গোয়ালঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। একই এলাকার বিএনপি নেতা জুলফিকারের স্ত্রী নাছিমা জানান, তার ঘরে পুলিশ ও আ.লীগের লোকজন ঢুকে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে নাজেহাল করে। এমনকি তাকে গুলি করারও হুমকি দেয়া হয়।
অপরদিকে রাত ১টায় স্থানীয় বিএনপি সমর্থিত বার বার নির্বাচিত মেম্বার আনিছুর রহমানের বাড়িতে অভিযান চালায় যৌথবাহিনীর সদস্যরা। তাকে বাড়িতে না পেয়ে তার বিল্ডিং বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেয় তারা। পরে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। মহিলাদের লক্ষ করে ৩ রাউন্ড গুলি করা হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। একই সময় মেম্বারের ভাই সীমান্ত কলেজের অধ্যক্ষ আজিজুর রহমানের বাড়িও ভাঙচুর এবং লুটপাট করা হয়। তবে যৌথবাহিনীর সদস্যরা এসব ঘটনা অস্বীকার করে উত্তেজিত জনতা এসব ভাঙচুরের ঘটনা ঘটাতে পারে বলে মন্তব্য করেছে।
অপরদিকে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলায় কুশলিয়া বিষ্ণুপুর এলাকায় গভীর রাত হতে ভোর পর্যন্ত যৌথবাহিনী বিভিন্ন বাড়িতে তল্লাশি চালায়। এ সময় বিভিন্ন বাড়ি পুরুষশূন্য থাকায় যৌথবাহিনীর সদস্যরা গালিগালাজ করে অনেকের ঘরবাড়ির দরজায় আঘাত করে।
যৌথবাহিনীর সদস্যরা মুকন্দ মধুসূদনপুর এলাকার রুহুল আমিনের ছেলে শিবিরকর্মী আশরাফুল ইসলামকে আটক করে। পরে তাকে শ্রীপুর এলাকায় নিয়ে তার পায়ে গুলি করে। পরে যৌথবাহিনীর সদস্যরা আশরাফুল ইসলাম বাবুকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করে। এদিকে তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা থেকে ৩ জন, আশাশুনি থেকে একজন, কলারোয়া থেকে একজনসহ মোট ৬ জনকে আটক করে যৌথবাহিনী। আটকদের বিরুদ্ধে নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে বলে পুলিশ দাবি করেছে।
এদিকে জেলাব্যাপী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের সমন্বয়ে জামায়াত এবং বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে জেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে শনিবার সন্ধ্যায় সদর উপজেলা জামায়াত অফিসে এক সংবাদ সম্মেলন করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জেলা জামায়াত সেক্রেটারি নুরুল হুদার লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জেলা জামায়াতের প্রচার সম্পাদক মাওলানা আজিজুর রহমান। লিখিত বক্তব্যে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের আমিরসহ শতাধিক বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাংচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ খুন, গুম, হামলা এবং মামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে জেলা সেক্রেটারি নুরুল হুদার পক্ষে লিখিত বক্তব্যে সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আজিজুর রহমান বলেন, বর্তমান সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার সাতক্ষীরায় বিরোধী দল দমনে সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। তার নেতৃত্বে গোটা সাতক্ষীরাকে অশান্ত করে তোলা হয়েছে। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে বর্তমান সরকার ৯০ ভাগ মানুষের গণদাবি উপেক্ষা করে একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। এরই মধ্যে প্রহসনের নির্বাচনে ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। জাতিসংঘ, বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পরামর্শ উপেক্ষা করে ক্ষমতায় টিকে থাকতেই বিরোধী দলের ওপর নির্যাতনমূলক আচরণ করা হচ্ছে। যার কারণে জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি নিবন্ধিত গণতান্ত্রিক দলের নিবন্ধন বাতিল করেছে, যা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক।
লিখিত বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, সাতক্ষীরাবাসী সব সময় শান্তিপ্রিয় ও গণতান্ত্রিক রীতিনীতিতে বিশ্বাসী। শান্তিপূর্ণ এ আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য সরকার দলীয় ক্যাডার এবং যৌথবাহিনী নামে পেটুয়া বাহিনী দিয়ে নির্বিচারে গুলি করে গণহত্যা ও গণগ্রেফতার করে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিতে চায়।
স্বৈরাচারী সরকার শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং শত শত মিথ্যা মামলা দিয়ে লক্ষাধিক নেতাকর্মীকে ঘরবাড়িছাড়া করেছে। সাতক্ষীরা জেলাধীন ৮টি থানায় এ পর্যন্ত ২১৬টি মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে ৪ হাজার ৫০১ জন ও অজ্ঞাতনামা আসামি ৭৩ হাজার ৯৭৭ জন। এভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি অব্যাহত রেখেছে।
সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার বিরোধী দল দমনে সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন বলেও লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়। তার নেতৃত্বে গোটা সাতক্ষীরাকে তছনছ করে ফেলা হয়েছে।
সাতক্ষীরা জামায়াতে ইসলামীর ঘাঁটি বলে পরিচিত। এ এলাকাটি ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারলে ক্ষমতাসীনদের নীল নকশার নির্বাচন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। সে জন্য সরকারি দলের ছত্রছায়ায় সাতক্ষীরার বিভিন্ন স্থানে অমুসলিম সম্প্রদায়সহ আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মীর বাড়িঘর ও দোকানপাট পরিকল্পিতভাবে লুটপাট করানো হয়েছে। এছাড়া তাদের দলীয় কোন্দল, কালোবাজারি, জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্বসহ পূর্বশত্রুতার জের ধরে নিহত ব্যক্তিদের দায়ও জামায়াত-শিবিরের ওপর চাপিয়ে জামায়াত-শিবিরের ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় যেসব ঘরবাড়ি পোড়ানো হয়েছে, তার জন্য একটি মাত্র উদাহরণই যথেষ্ট—দেবহাটা উপজেলার সেকেন্দ্রা গ্রামের মৃত এলবার গাইনের ছেলে আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী আবদুল গফফার, স্থানীয় হিন্দু ধর্মের মৃত নরেন সরকারের ছেলে সুনীতি কুমার সরকার বাড়িঘরে আগুন দেয়।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, স্থানীয় প্রশাসন ও দেশবাসীকে জানাতে চাই—জামায়াতে ইসলামী একটি নিয়মতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। কোনোরকমের হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী জড়িত নয়। আমরা এ ধরনের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই এবং প্রতিটি ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তপূর্বক প্রকৃত দায়ী ও দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি। সঙ্গে সঙ্গে সরকারকে জনতার দাবি মেনে নিয়ে অবিলম্বে সব ধরনের জুলুম-নির্যাতন বন্ধ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
এদিকে সবশেষ খবরে জানা গেছে, কোনো কারণ ছাড়াই যৌথবাহিনী এক শিবিরকর্মীকে তুলে নিয়ে গিয়ে গুলি করেছে। গতকাল সন্ধ্যায় শহরের বাকাল ব্রিজের ওপর থেকে দেবহাটা উপজেলার দক্ষিণ কুলিয়া গ্রামের আবদুল কাদেরের ছেলে শিবিরকর্মী মাসুম বিল্লাহকে (২২) ধরে নিয়ে পার্শ্ববর্তী মেসার্স আলীপুর ফিলিং স্টেশনের পেছনে নিয়ে যৌথবাহিনী অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে। আহত অবস্থায় যৌথবাহিনী তাকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করেছে।