Sunday, 22 December 2013

সাতক্ষীরা বিধ্বস্ত এক জনপদ


সাতক্ষীরায় যৌথবাহিনীর ৩ দিনের অভিযানে সাতক্ষীরা বলতে গেলে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি এমনই যে, দেখলে মনে হয় কোন ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত জনপদ। স্বচক্ষে এ দৃশ্য না দেখলে বিশ্বাস হওয়ার নয়। এখানে-ওখানে জ্বলছে আগুন। বাতাসে বইছে কান্নার শব্দ। চারদিকে চিৎকার আর হাহাকার। সহায়-সম্বল হারিয়ে মানুষ পাগলপ্রায়। তাদের আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠেছে গোটা জেলার পরিবেশ। আশ্রয় ও গৃহহীন হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার মানুষ। যৌথবাহিনীকে দেখলেই মানুষ পালাচ্ছে। রক্ষা পায়নি নারী-শিশু ও বৃদ্ধরাও। রাত শুরু হলেই আতঙ্কে বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছে বাড়ির পুরুষ ও যুবক ছেলেরা। প্রতি রাতেই ঘটছে অগ্নিসংযোগের ঘটনা। জেলার কোথাও না কোথাও ঘটছে ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট। বিপদ আছে আরও।

বর্তমান সরকারের আমলে বিভিন্ন সময় জামায়াত-ছাত্রশিবির, বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে ২১৬টি মামলা। এসব মামলায় ৪৫০০ নেতাকর্মীকে এজহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে। এছাড়া ৭৩,৯৭৭ জনকে করা হয়েছে অজ্ঞাতনামা আসামি। এসব মামলায় বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১,৪৪৯ জন নেতাকর্মীকে।
গত ১৬ই ডিসেম্বর থেকে ১৯শে ডিসেম্বর পর্যন্ত সাতক্ষীরায় যৌথবাহিনী ও আওয়ামী কর্মী-সমর্থকদের তাণ্ডবে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু হারিয়ে সাতক্ষীরা অঞ্চলের মানুষ দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। একদিকে নিজেরা থাকছেন পালিয়ে, অন্যদিকে বিন্দু বিন্দু করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে গড়ে তোলা বাড়িঘর, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান হারিয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে খোলা আকাশের নিচে প্রচণ্ড শীতে মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতায় মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। এদের কোন আত্মীয়স্বজন পর্যন্ত দেখা করতে যেতে পারছে না। দিতে পারছে না খাবারও। স্বজনদের সন্ধান নিতে গিয়ে পুলিশ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের রোষানলে পড়তে হয়েছে বহু নারী ও শিশুকে। সবমিলিয়ে দেশের সীমান্তবর্তী এ জেলায় আইনের রক্ষকরাই ভক্ষকের ভূমিকায় ব্যস্ত রয়েছে। দেশের মানবাধিকার কর্মীরাও এ নির্যাতন ও নিপীড়নের চিত্র ধারণ করতে পারছেন না। আর সাংবাাদিকরাও জীবনের নিরাপত্তার অভাবে সঠিক তথ্য তুলে ধরছেন না। 
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৯ সালের ২৫শে মে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আইলা দেশের উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার সুন্দরবন ঘেঁষা উপজেলা শ্যামনগর, আশাশুনি ও তালায় আঘাত হানে। এতে শ্যামনগরের গাবুরা ও পদ্মপুকুর ইউনিয়ন লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। বৃত্তাকারে ঘেরা এ দু’টি এলাকার বেড়িবাঁধ ভাঙনের কবলে পড়ে নদীর সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। ফলে সারা বছরই পানিতে ডুবে থাকে এসব এলাকার বসতবাড়ি ও ক্ষেত-খামার। খাদ্যাভাব, খাবার পানির সঙ্কট, কাজ না থাকা ও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া বন্ধ হওয়াসহ নানা সঙ্কটে পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে এখানকার জনগণ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এবার শুরু হয়েছে যৌথবাহিনী ও আওয়ামী কর্মী-সমর্থকদের তাণ্ডব। গত ১৫ই ডিসেম্বর রাত থেকে এ পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অভিযান চালিয়ে বিএনপি ও জামায়াত-ছাত্রশিবিরের ৫৭ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় তাদের হাতে নিহত হয়েছেন জামায়াতের জাহাঙ্গীর মোড়ল, সাহেব বাবুসহ ৭ জন। এছাড়া সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের আমীর সাবেক এমপি অধ্যক্ষ মাওলানা আবদুল খালেক, নায়েবে আমীর রফিকুল ইসলাম, বিএনপি নেতা ও আগড়দাঁড়ি ইউপি চেয়ারম্যান আনারুল ইসলামসহ শতাধিক নেতাকর্মীর বাড়িঘর, দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বুলডোজার দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে এবং আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। 
সম্প্রতি জেলার ৭টি উপজেলার মানুষ ১৮ দলের কেন্দ্র ঘোষিত সকল কর্মসূচি বাস্তবায়নে রাজপথে নেমে আসে। এতে গত ১১ মাসে সাতক্ষীরা জেলায় বিএনপি-জামায়াতের ৩৩ জন ও আওয়ামী লীগের ২৭ জন নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের বদলা নিতে আওয়ামী লীগের লোকজন জেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। পিছিয়ে ছিল না বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীরাও। তারপরও ১৮ দলের ডাকা অবরোধ কর্মসূচি সফল করতে তারা জেলা সদর থেকে শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, দেবহাটা, আশাশুনি, তালা ও কলারোয়া উপজেলা জেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। ফলে সরকার এ অঞ্চলে যৌথবাহিনীর অভিযান শুরু করে। জামায়াত অধ্যুষিত এ অঞ্চলে ১৮ দলের কর্মসূচি যাতে বাস্তবায়ন না হয় সে লক্ষ্যে নেতাকর্মীশূন্য করতে এ অভিযান চালানো হয় বলে দাবি করেছেন জেলা জামায়াতের প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের লোকজন হামলা অব্যাহত রেখেছে। অনেক স্থানে জনতার প্রতিরোধে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। তবে তারা সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতায় যৌথভাবে হামলা চালাচ্ছে। পুলিশের সঙ্গে তারা সহযোগী হয়ে এসব হামলায় যোগ দিচ্ছে। কোন কোন অপারেশনে পুলিশের অস্ত্রও বহন করতে দেখা যাচ্ছে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের।
সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের প্রচার সম্পাদক আজিজুর রহমান জানান, বর্তমান সরকারের আমলে বিভিন্ন সময় ২১৬টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৪,৫০০ জনের নাম উল্লেখ করে এজাহারে এবং ৭৩,৯৭৭ জন অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এসব মামলায় ১,৪৪৯ জন নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। বর্তমানে ২৮২ জন জেলহাজতে রয়েছেন।
এলাকাবাসী জানায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত কালিগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণুপুর ইফনিয়নের চৌমুহনী, মকন্দুপর, ফরিদপুর, শ্রীধরকাঠি, হোগলা ও কুশলিয়া ইউনিয়নের গোবিন্দপুর ও ভদ্রখালী গ্রামে যৌথবাহিনীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র লোকজন জগদীশ, তাপস, বিশ্বনাথ, ইন্দ্রজিৎসহ ৫ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বীর দোকানপাট জ্বালিয়ে দিয়েছে। এতে প্রায় ২০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো জানিয়েছে। অগ্নিসংযোগের সময় এলাকায় ফায়ার ব্রিগেডের কোন সদস্যকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিষ্ণুপুর ইউনিয়নে ১২টি বসতবাড়ি ও ২৭টি দোকানপাট এবং কুশলিয়া ইউনিয়নের গোবিন্দপুর ও ভদ্রখালি গ্রামের ১৯টি বাড়িঘর ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়েছে। এর মধ্যে বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের চৌমুহনী গ্রামের বাহারুল ইসলাম, মোশাররফ হোসেন, মাওলানা মিজানুর রহমান, মাওলানা আবদুল কাদের হেলালী, সিদ্দিকুল ইসলামের বাড়ি, শ্রীধরকাটি গ্রামের আবদুস সালাম ও আবদুস সবুরের বাড়ি, ফরিদপুর গ্রামের প্রফেসর আবদুল আজিজ, কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের রামনগরের প্রফেসর মোশাররফ এবং মুকন্দপুর গ্রামের আব্দুল করিমের বসতবাড়ি ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এছাড়া বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের চৌমুহনী এলাকার বাহারুলের দোকান, মোশারফের অ্যালুুমিনিয়ামের দোকান, সাইফুলের ওষুধের ফার্মেসি, আবদুল কালামের ৬টি দোকানঘর, শামসুর আলার মুদি দোকান, দাউদের মিষ্টির দোকান, আবদুল্লার দোকানঘর, জগদীশের দোকান, ময়নার ফলের দোকান, মুকুল, সালাম, হানিফ, তাপস, শহর আলী, শহিদুল, মাউত আলী, মিজান, বিশ্বনাথ  ও মাহবুবের দোকানপাট লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এছাড়া হোগলা গ্রামের মাহবুব ও সাইফুলের দোকানপাট পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কালিগঞ্জ উপজেলার কুশলিয়া ইউনিয়নের ভদ্রখালি বাজারের বেশির ভাগ দোকানপাট পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে সিরাজুল ইসলামের ওষুধের দোকান, মোজামের লুঙ্গির দোকান, বেলালের সেলুনের দোকান, হান্নানের মুদির দোকান, মনিরুল ইসলামের চায়ের দোকান, বনি আদম, মাইউদ্দীনের দোকানপাট ভাঙচুর করে জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। 
এলাকাবাসী আরও অভিযোগ করেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওহেদুজ্জামানের নেতৃত্বে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সাইদ মেহেদী, আবু তালেবের নির্দেশে আওয়ামী লীগের লোকজন যৌথবাহিনীর সঙ্গে থেকে এসব তাণ্ডলীলা চালায়। অভিযোগে আরও জানা যায়, মঙ্গলবার রাতভর একইভাবে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটলেও যৌথবাহিনীর সদস্যরা গ্রামবাসীদের এলাকায় ঢুকতে দেয়নি। এমন দুরবস্থার মধ্যেও আগুনের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে আসতে চাইলেও তাদের এলাকায় ঢুকতে দেয়া হয়নি। এ গ্রামে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে মিজানুর রহমান, আবদুর রাশেদ, আবদুল হাকিম, বাবু ও লিলি বেগমের একমাত্র আশ্রয়স্থলটুকু। তবে এসব কর্মকাণ্ড চালানোর সময় সাংবাদিকরা যৌথবাহিনীর কাছে ফোন দিয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, বিক্ষুব্ধ জনতা এসব ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে।
এদিকে গত মঙ্গলবার হরতাল ও অবরোধ চলাকালে দুপুর আড়াইটার দিকে কালিগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের চৌমুহনী এলাকায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দিন (৬৫)-কে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ সময় তার সহযোগী হাশেম আলী ও দিদার আলী নামের আরও দু’জন গুরুতর জখম হয়। তাদের স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী আফরোজা খাতুন বাদী হয়ে ২৪ জনের নাম উল্লেখপূর্বক অজ্ঞাতনামা আরও ১৫-২০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। 
এ ঘটনায় কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলী আযম খান বলেন, এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে চারজনকে আটক করা হলেও প্রভাষক আবদুল আজিজ, সাব্বির আহমেদ ও বাবর আলীকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আর আবদুল জলিলকে অন্য মামলায় আদালতে পাঠানো হয়েছে। 
আশাশুনির বাটরা গ্রামের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছাত্রী শেফালী বেগম জানান, যৌথবাহিনী ও আওয়ামী লীগের লোকজন অভিনব কায়দায় ‘নারায়ে তাকবির-আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে লোকালয়ে ঢোকে। তাদের আওয়াজ শুনে মুসল্লিরা বেরিয়ে আসলে তাদের চতুর্দিক থেকে ঘেরাও করে কখনও লাঠিচার্জ আবার কখনও গুলি করে ফেলে রেখে হচ্ছে। কাউকে কাউকে চোখ মুখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জানি না তাদের ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কি ঘটে। আবার আহত অনেকে গ্রেপ্তারের ভয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেন না। উঠতি বয়সী মেয়েরা নিজেদের সম্ভ্রম রক্ষার্থে গ্রাম ছেড়ে শহরে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। আর যাদের কোন আশ্রয় নেই তারা জীবন বাঁচাতে দেহ বিলিয়ে দিচ্ছে ওইসব নরপশুদের। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, একাত্তরে পাক-হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের কাহিনী শুনেছি। আর এবার দেখছি নিজ দেশের সরকারি বাহিনী আর সরকারি দলের লোকেরা সাধারণ মানুষের উপর কিভাবে পৈশাচিক নির্যাতন চালায়। আমরা আগামী প্রজন্মের কাছে এ নির্যাতনের চিত্র যখন তুলে ধরবো তখন তারাই বলবে, তোমরা বর্বর যুগের বাসিন্দা ছিলে। 
অপরদিকে সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সুপার মঞ্জুরুল আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, গত ১৫ই ডিসেম্বর রাত থেকে সাতক্ষীরা জেলার ৭টি উপজেলা শ্যামনগর, আশাশুনি, কালিগঞ্জ, দেবহাটা, পাটেকেলঘাটা, তালা, কলারোয়া ও সদরে বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর অভিযান শুরু হয়। গতকাল পর্যন্ত তালা উপজেলা থেকে আজহারুল ইসলাম, মোল্লা সানা, সুলতান আহমেদ, রিয়াজুল ইসলাম, আবদুল মজিদ মোড়ল, ইমরান সরদার, আবদুল মোতালেব সরদার, কালিগঞ্জ উপজেলা থেকে আজিজুর রহমান, সাব্বির আহমেদ সবুজ, মো. আব্দুল জলিল, বাবর আলী মোড়ল, পাটকেলঘাটা থেকে মোস্তাফিজুর রহমান, মহিদুল ইসলাম ও আশাশুনি উপজেলা থেকে মেহেদী হাসান, শফিউল আযম সুজন, আরশাদ আলী, আনিসুর রহমান, আকতার হোসেন, আহামিদ, মহাসিন, জেলা শহরের রইচপুর এলাকার নুরুল আমিনের ছেলে আলমগীর হোসেন (৩০), সিরাজুল সরদারের ছেলে আশরাফুল সরদার (২৫), মনির উদ্দীন সরদারের ছেলে শাহিন সরদার (২৫), মৃত সুরাত আলীর ছেলে আবুল হোসেন (২৬), শুকুর আলী সরদারের ছেলে শওকত আলী সরদার (৩৩), রেজাউল ইসলামের ছেলে আমিনুর রহমান লাভলু (৪০)সহ ৫৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এলাকায় অভিযান অব্যাহত রয়েছে। 
সাতক্ষীরা জেলায় যৌথবাহিনীর অভিযানের মধ্যে কিভাবে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবে হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় ও সহায় সম্বলহীন হয়ে পড়ছে, কিভাবে মানুষ খুন হচ্ছে, কিভাবে মানুষের বাড়িঘরে লুটপাট আর অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে- এমন সব প্রশ্নের জবাব সাতক্ষীরার এসপি মঞ্জুরুল কবির এড়িয়ে যান। 
তবে কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলী আযম খান বলেন, যাদের বাড়িঘর, দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও আগুন দেয়া হয়েছে তারা দীর্ঘদিন ধরে এ এলাকায় শাসন করতো। বিক্ষুব্ধ জনতা উত্তেজিত হয়ে তাদের বাড়িঘর, দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও আগুন দিয়েছে। তবে যৌথবাহিনী ও বিক্ষুব্ধ এসব জনতার সঙ্গে আওয়ামী লীগের কেউ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং বলেন, এতদিন যারা এলাকা শাসন করতো এখন সময় এসেছে তাদের শোষণ করার। তাই করছে। এর বেশি কিছুই নয়। গতকাল রাতে চৌমুহনীতে হিন্দু ধর্মালম্বীদের দোকানপাট ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন এটা জামায়াত-শিবিরের কাজ। এ কারণেই উত্তেজিত জনতা তাদের বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছে। এতে আমাদের কি করার আছে? 
শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি জাহিদ সুমন জানান, সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার কুশলিয়া ইউনিয়নের গড়ের মাঠ গ্রামে গতকাল যৌথবাহিনীর সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের সংঘর্ষে ওসি ও এক কনস্টেবলসহ ১০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষে আশরাফুল ইসলাম বাবু (২২) নামের এক শিবিরকর্মীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটক করা হয়। 
কালিগঞ্জ থানার ওসি আলী আজম জানান, গতকাল দুপুরের পর থেকে বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দিন হত্যা মামলার আসামি ধরতে যৌথবাহিনী অভিযান শুরু করে। একপর্যায়ে তারা গড়ের মাঠে পৌঁছলে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা যৌথবাহিনীর ওপর ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। এ সময় যৌথবাহিনী গুলি চালালে শিবিরকর্মী আশরাফুল ইসলাম বাবু গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেলে পুলিশ তাকে আটক করে হাসপাতালে ভর্তি করে। সংঘর্ষে ওসি আলী আজম এবং পুিলশ সদস্য শরিফুল ইসলামও ইটের আঘাতে আহত হয়েছেন। তবে স্থানীয়রা বলছেন, ওসির এই বক্তব্য হাস্যকর। তারা দাবি করেন, গতকাল বিকালে অভিযানের নামে যৌথবাহিনীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এলাকার বেশ কিছু নিরীহ লোকের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর শুরু করে। একই সঙ্গে যৌথবাহিনীর সদস্যরা এলাকার নিরীহ লোকজনকে বেধড়ক মারপিট শুরু করে। তাদের লাঠিপেটা থেকে রেহাই পায়নি বাড়ির বউ-ঝিরাও। এরই ধারাবাহিকতায় এলাকাবাসী প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তারা ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। যৌথবাহিনী পাল্টা গুলি চালিয়ে গ্রামবাসীকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়। http://mzamin.com/details.php?mzamin=+NDA3Ng%3D%3D&s=Mw%3D%3D