Sunday, 29 December 2013

ঢাবি শিক্ষকদের ওপর আওয়ামী সন্ত্রাসীদের বর্বর হামলা, আহত ১০, রক্ষা পাননি নারী শিক্ষকরাও


এবার পুলিশের সহায়তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর বর্বর হামলা চালিয়েছে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও শিক্ষক সমিতির সদস্যসহ ১০ শিক্ষক আহত হন। লাঞ্ছিত করা হয় নারী শিক্ষকদেরও। গতকাল বেলা ২টায় হাইকোর্ট মোড়ে কদম ফোয়ারার কাছে এ হামলার ঘটনা ঘটে। সন্ত্রাসীদের এ হামলার প্রতিবাদে আজ বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে প্রতিবাদ সমাবেশ ডেকেছেন তারা। এছাড়া রাতে এ ঘটনা নিয়ে জরুরি সাধারণ সভা করেছেন শিক্ষক সমিতি। এ সময় আগামীকাল অনুষ্ঠেয় শিক্ষক সমিতির নির্বাচন বর্জনের দাবি জানান তারা। এরপর সন্ধ্যায় এক বিবৃতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সন্ত্রাসীদের বিচার দাবি করেন জাতীয়তাবাদী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের ডাকা ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’তে যোগ দিতে দুপুর দেড়টার দিকে কার্জন হল এলাকায় একত্র হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। এ সময় শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম এসে শিক্ষকদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে হুমকি দেন। শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, আমরা কোনো ধরনের মিছিল কিংবা সমাবেশ করার আগেই শাহবাগ থানার ওসি এসে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আপনাদের সমাবেশে ছাত্রলীগ যুবলীগ হামলা করলে তার দায়ভার পুলিশ নেবে না।’
এ সময় শিক্ষকরা তাকে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের আশ্বাস দেন। দুপুর পৌনে ২টার দিকে সচেতন শিক্ষকদের ব্যানারে তারা জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে মৌন মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি শিক্ষা ভবন হয়ে হাইকোর্ট মোড়ে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। পরে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষকদের কথা কাটাকাটি হয়। এ সময় প্রেস ক্লাবের সামনে আগে থেকে অবস্থান নেয়া মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম লীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা স্ট্যাম্প, ইট নিয়ে শিক্ষকদের দিকে তেড়ে গেলে পুলিশ তাদের ইশারা দিয়ে থামিয়ে দেয়। তবে থেমে গেলেও সন্ত্রাসীরা স্ট্যাম্প উঁচিয়ে শিক্ষকদের লক্ষ্য করে গালাগাল করে। এতক্ষণ পুলিশের অন্য কর্মীদের সঙ্গে শিক্ষকদের কথা কাটাকাটি হয়। পরে পুলিশ শিক্ষকদের হাইকোর্ট মোড়ে কদম ফোয়ারার কাছে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের অনুমতি দেয়। অনুমতি পেয়ে শিক্ষক সমিতির সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. আখতার হোসেন খান ও সিনেট সদস্য অধ্যাপক ড. তাজমেরী এস এ ইসলাম বক্তব্য শেষে করে অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান বক্তব্য শুরু করলে মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের কর্মীরা ও মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম লীগের সভাপতি আসাদুজ্জামান দুর্জয়ের নেতৃত্বে ২০-২৫ জনের লাঠিয়াল বাহিনী শিক্ষকদের ওপর পেছন দিক থেকে হামলা করে। এ সময় আসাদুজ্জামান, ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক আবদুর রশীদ, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ড. মো. গোলাম রব্বানী, জিন প্রকৌশল বিভাগের ড. শাহনুর হোসাইন এবং মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খানকে স্ট্যাম্প দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। এদের মধ্যে অধ্যাপক ড. আবদুর রশিদের দুই হাঁটু, ঘাড় ও দুই হাতে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। আহত হন প্রবীণ শিক্ষক অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া, অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়েদুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান, মো. ইসরাফিল রতনসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক।
লাঞ্ছিত করা হয় চারুকলা অনুষদের নারী শিক্ষক ড. সাবরিনা শাহনাজ, সিনেট সদস্য অধ্যাপক ড. তাজমেরী এস এ ইসলাম, ড. লায়লা নূরসহ আরও অনেককে।
এ সময় পুলিশ সরকার সমর্থক সন্ত্রাসীদের বাধা না দিয়ে পাল্টা সন্ত্রাসীদের সহায়তা দেন বলে অভিযোগ করেন শিক্ষকরা। তারা বলেন, আমাদের শান্তিপূর্ণ মৌন মিছিলে পুলিশ বাধা দিলেও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা আমাদের ওপর হামলা করে আহত করলেও তাদের বাধা দেয়নি পুলিশ। জনগণ মিছিল করতে গেলে পুলিশ বৃষ্টির মতো গুলি করে, ছাত্রলীগ যুবলীগ মানুষ খুন করলেও তাদের ধাওয়া কিংবা বাধা দেয় না পুলিশ। আমাদের লজ্জা হয় যে এই দেশের নাগরিক আমরা।
সন্ত্রাসীদের হামলায় আহত শিক্ষকদের একটি অংশ পুরনো হাইকোর্টের ভেতরে আবার কেউ কার্জন হলে গিয়ে আশ্রয় নেয়। এ সময় পুলিশের পাহারায় ছাত্রলীগ হাইকোর্ট মোড় পর্যন্ত লাঠি মিছিল করে।
তিনটার দিকে শিক্ষকরা কার্জন হলে একত্র হন। এ সময় সিনেট সদস্য অধ্যাপক ড. তাজমেরী এস এ ইসলাম তাত্ক্ষণিক সংবাদ ব্রিফিং করেন। তিনি বলেন, আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দেশের চলমান নৈরাজ্যকর, অগণতান্ত্রিক পরিস্থিতির মুক্তি চেয়ে ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’তে যোগ দিতে নয়াপল্টনের দিকে রওনা হই। কিন্তু পুলিশ আমাদের মিছিলে অন্যায়ভাবে বাধা দেয়। এরপর আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের দিয়ে আমাদের ওপর ন্যক্কারজনক হামলা চালায়। আমরা এ ফ্যাসিবাদী, বাকশালি আচরণের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। এ হামলার প্রতিবাদে আজ বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে প্রতিবাদ সমাবেশ করার ঘোষণা দেন তিনি।
এদিকে এ হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী সাদা দলের শিক্ষকরা। সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. সদরুল আমিন স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, ১৮ দলীয় জোট আহূত ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি বানচালের উদ্দেশ্যে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে নিজ বাসভবনে অবরুদ্ধ করে রাখা এবং কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সচেতন শিক্ষকদের জমায়েতে সন্ত্রাসীদের ন্যক্কারজনক হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
বিবৃতিতে বলা হয়, আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ আজ এক গভীর রাজনৈতিক সংকটে। অনিয়ন্ত্রিত সংঘাত-সহিংসতায় জনজীবন আজ বিপর্যস্ত। এ অবস্থায় দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা নিশ্চুপ বসে থাকতে পারি না। তাই বিবেকের তাড়নায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে আমরা আজ রাজপথে নেমে এসেছি। রাজপথে আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা ও সহায়তায় সন্ত্রাসীরা শিক্ষকদের ওপর হামলায় আমরা বাকরুদ্ধ। জাতি লজ্জিত। এ সময় সন্ত্রাসীরা চারুকলা অনুষদের মিসেস সাবরিনাসহ কয়েকজন মহিলা শিক্ষককেও লাঞ্ছিত করে। ঘটনার সময় বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উপস্থিত থাকলেও সন্ত্রাসীদের প্রতিহতে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখেনি। আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ ভূমিকায় তীব্র ক্ষোভ নিন্দা জানাচ্ছি। শিক্ষক, সাংবাদিক ও আইনজীবীদের ওপর হামলাকারী সন্ত্রাসীদের দ্রুত বিচারের দাবি জানাই।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন অধ্যাপক ড. আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, অধ্যাপক সৈয়দ আবুল কালাম আজাদ, অধ্যাপক ড. মো. আমিনুর রহমান মজুমদার, অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. তাজমেরী এস এ ইসলাম, অধ্যাপক ড. মো. আখতার হোসেন খান, অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ, অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. লায়লা নূর ইসলাম, ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান, অধ্যাপক ড. শামসুদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন, অধ্যাপক হোসনে আরা বেগম, অধ্যাপক ড. শাহিদা রফিক, অধ্যাপক ড. আবদুর রশিদ, অধ্যাপক, ড. মো. নুরুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান, অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত, অধ্যাপক লুত্ফুর রহমান, অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত, অধ্যাপক আ কা ফিরোজ আহমদ, অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. আবদুল আজিজ, অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া, মোহাম্মদ সফিউল্যাহ, অধ্যাপক তাহমিনা আখতার প্রমুখ।