Tuesday, 3 December 2013

পেলেন না কিন্তু কিনে বিতর্কিত হলেন


সাক্ষী অপহরণ, স্কাইপে কেলেঙ্কারি, রায় ফাঁস ইত্যাদি ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে বিতর্ক সমালোচনার মাঝে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করলেন ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রধানসহ প্রসিকিউশনের নয় কর্মকর্তা। এরা আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র কিনেছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত তালিকায় তারা স্থান পাননি। কিন্তু দলীয় আনুগত্য দেখিয়ে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে ঠিকই প্রশ্নের জন্ম দিলেন।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই নয় কর্মকর্তার মনোনয়নপত্র সংগ্রহ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা- সমালোচনার ঝড় বইছে।
কর্মকর্তাদের অনেকেই অফ দ্য রেকর্ডে বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরোধের বিচার করার জন্য ট্রাইব্যুনালে দলীয় কর্মীদের নিয়োগ দিয়েছে সরকার।জানা গেছে, ট্রাইব্যুনালের বিচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১০ জন সরকারি দল আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র কিনেছেন। প্রসিকিউশন টিমের সদস্যরা ছাত্রজীবনে বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগের নেতৃত্বে, পরে পর্যায়ক্রমে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। অপরদিকে তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা পুলিশ বহিনী থেকে অবসরে গিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। তাদের দ্বারা পরিচালিত বিচার পক্ষপাত দুষ্ট হচ্ছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম বলেন, 'আমার মতামত নোট করা যাবে না। শুধু আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন তাদেরকেই ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা এবং প্রসিকিউশন টিমে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।'

প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ বলেন, 'আমি মনে করি, যদি কেউ দায়িত্ব নিয়ে দেশের সেবা করতে চায় তাহলে তারা ট্রাইব্যুনাল থেকে পদত্যাগ করে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। এখানে পদে থেকে নির্বাচন করাটা সঠিক নয়।'

আসামিপক্ষের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম বলেন, 'নির্বাচন করার বিধান আছে। তবে সে ক্ষেত্রে সরকারের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু যদি কোনো কর্মকর্তা একটি আদালতের প্রসিকিউটরের দায়িত্ব পালনের সাথে কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন (নমিনেশন) নেয়, তাহলে বুঝতে হবে তারা রাজনৈতিক দলের আনুগত্য করে। যাতে সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে এবং নিরপেক্ষতা হারাবে।'

আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, 'আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি যে, এটা দলীয় বিচারালয়। কর্মকর্তাদের দলীয় মনোনয়ন ক্রয়ের মাধ্যমে তা আরো স্পষ্ট হয়ে গেলো। এসবের পরে, এ ট্রাইব্যুনালের কোন গ্রহণযোগ্যতা থাকলো না।'

সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিকও মনে করেন কর্মকর্তারা দলীয় মনোয়ন পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা দেখিয়ে ট্রাইব্যুনাল নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টির সুযোগ করে দিলেন। তিনি বলেন, 'এমনিতে ট্রাইব্যুনাল গঠন, বিচারপতি ও বিচার কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক চলছে। আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নপত্র ক্রয় করার মাধ্যমে নতুন বিতর্ক সৃষ্টির ক্ষেত্রে আরেকটি সুযোগ তৈরি হলো।'

তবে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ মনে করেন, এতে বিচার নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার কিছু নেই। বিচার করবেন বিচারক, আইনজীবী নন।

আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র বিতরণের প্রথম দিন গত ১০ নভেম্বর তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক মো. আবদুল হান্নান খান নেত্রকোনা-৫ (পূর্বধলা) আসন, সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এম সানাউল হক কিশোরগঞ্জ-৩ (তাড়াইল-করিমগঞ্জ) এবং অপর কর্মকর্তা আব্দুর রহিম ময়মনসিংহ-৮ ইশ্বরগঞ্জ আসনের জন্য মনোনয়নপত্র কেনেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা আবদুল হান্নান খান ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন। তবে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে  তিনি নেত্রকোনা-৫ আসন থেকে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে ১৮ হাজার ভোট পেয়ে পরাজিত হন। ২০০০ সালে ঢাকা বিভাগের পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি পদ থেকে তিনি অবসরে গেলেও ২০১১ সালে তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারে তদন্ত সংস্থার প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

অপর কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহিম ডিআইজি পদ মর্যাদায় ট্রাইব্যুনালে তদন্ত সংস্থায় কাজ করছেন বলে জানান। ছাত্র জীবনে তিনি ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

একইদিনে রাষ্ট্রপক্ষের পাঁচ জন প্রসিকিউটর মনোনয়নপত্র কিনেছেন এবং গত ১৪ নভেম্বর বৃহস্পতিবার প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী  ঢাকা-২০ (ধামরাই) আসনের জন্য মনোনয়ন কিনেন। গত রোববার সুলতান মাহমুদ সীমন শরীয়তপুর-২ (নড়িয়া-সখীপুর) আসন, মোখলেছুর রহমান বাদল কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসন, নূরজাহান বেগম মুক্তা চাঁদপুর-৫ (হাজীগঞ্জ-শাহরাস্তি) আসন এবং সৈয়দ সায়েদুল হক হবিগঞ্জ-৪ (চুনারঘাট-মাধবপুর) আসনের জন্য মনোনয়নপত্র কিনেছেন।

অপরদিকে পলাতক ও ট্রাইব্যুনালের বিচারে অনুপস্থিত আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী সালমা হাই টুনি মুন্সিগঞ্জ-৩ গজারিয়া আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী।

রাষ্ট্র নিয়োগপ্রাপ্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী হয়ে সালমা হাই টুনি মনোনয়ন চাওয়ায় ট্রাইব্যুনালের কোনো কর্মকর্তাই আওয়ামী লীগ সমর্থনের বাইরে নয় বলেও প্রশ্ন ওঠে।

তবে আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত মনোনয়ন প্রাপ্তদের তালিকায় ট্রাইব্যুনালের এসব কোনো কর্মকর্তার নামই শোভা পায়নি।

মনোয়নপত্র সংগ্রহ করা প্রসিকিউটরদের অতীত ইতিহাস ঘেঁটে জানা গেছে-

বাংলাদেশ কৃষক লীগের সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ আলী বর্তমানে আওয়াামী আইনজীবী পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য। নড়িয়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান সুলতান মাহমুদ শরীয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি পরাজিত হন।

আনন্দমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মোকলেছুর রহমান পাকুন্দিয়া আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। তিনি ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

নূরজাহান মুক্তা বর্তমানে মহিলা আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক। সৈয়দ সায়েদুল হক ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক ছিলেন। অপরদিকে সালামা হাই টুনির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাবার পরিচিতির সুবাধে তিনি তার মনোনয়ন পাওয়ার আশা করেছিলেন। তিনি মুন্সিগঞ্জ জেলা কৃষকলীগের সম্পাদিকা, ঢাকা বারের সাবেক সাংস্কৃতিক সম্পদিকা, সুপ্রিমকোর্ট আওয়ামী আইনজীবী প্রচার সম্পাদক, মুন্সিগঞ্জ জেলা আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রক কমিটির সদস্য এবং সুপ্রিমকোর্ট আওয়ামী মহিলা আইনজীবীর সেক্রেটারি।

প্রতিবেদকে সঙ্গে তারা সবাই বলেছেন, নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন পেলে তারা ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর টিম থেকে পদত্যাগ করবেন। কিন্তু মনোনয়ন না পাওয়ায় পদত্যাগ করতে হলো না।

তবে তাদেরকে মনোনয়ন দেয়ার পর পদত্যাগ করলে ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। কারণ, অনেক মামলা মাঝামাঝি থাকাকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রসিকিউটররা চলে গেলে নতুন কেউ এসে শুরু করতে ঝামেলায় পড়তে হতো।
http://www.banglamail24.com/index.php?ref=ZGV0YWlscy0yMDEzXzEyXzAzLTY0LTY1MTc0