Friday, 20 December 2013

জিতবে আওয়ামী লীগ হারবে বাংলাদেশ

 বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে প্রক্রিয়ায় তার ক্ষমতার মেয়াদ বাড়াতে চাইছেন, তাকে একজন ইউরোপীয় কূটনৈতিক ধাপে ধাপে সংঘটিত অভ্যুত্থান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রধান বিরোধী দল ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করছে। সুতরাং এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত। বৈধতার বিষয়টি অবশ্য আলাদা।
লন্ডনের বিখ্যাত ম্যাগাজিন দি ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। শুক্রবারের মুদ্রণ সংস্করণে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হবে। তা এরই মধ্যে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনটির শিরোনাম করা হয়েছে- ‘দ্য ক্যাম্পেন ট্রেল: দ্য রুলিং পার্টি উইল উইন বাংলাদেশ’স্‌ ইলেকশন, দ্য কান্ট্রি উইল লুজ’।

এ প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার অজনপ্রিয় সরকার দেশের বৃহৎ অংশের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে বলেও মন্তব্য করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন, জামায়াতের সব নেতার ফাঁসি কার্যকর করতে শেখ হাসিনা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি-মুন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ফাঁসি কার্যকর না করতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সমঝোতা শেখ হাসিনার স্টাইল নয়। 
তিনি ৫ বছর আগের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছিলেন। ২০১১ সালে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধান থেকে ছেঁটে ফেলা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবিশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৬ সালে নির্বাচনকালীন সরকারের এ ব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল। এ সংশোধনী বাংলাদেশে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছে। আগামী নির্বাচনের সবচেয়ে বড় অসুবিধার দিক হচ্ছে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৪ আসনেই কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। বিএনপি এবং তাদের জোটের ১৭টি দল নির্বাচন বয়কট করেছে। নির্বাচন বয়কট করায় দেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে হাসপাতালে বন্দি করে রাখা হয়েছে। দেশের এর পরের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল জামায়াতের নির্বাচনে অংশ নেয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। দলটির গঠনতন্ত্রের ধর্মীয় বিধান বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে দলটির ওপর এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ হয়তো নির্বাচনে জিতবে। ৫ই জানুয়ারি যা-ই হোক না কেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনাকে বরণ করার সংসদ সদস্যের অভাব হবে না। দেশে ও বিদেশে এ নির্বাচন বৈধতার সঙ্কটে পড়বে। যদিও বাংলাদেশের বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতই একমাত্র বিদেশী শক্তি যারা একদলীয় নির্বাচন সমর্থন করছে। নির্বাচনের আগেই ফল নিশ্চিতের (হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করেন) নির্বাচনী ব্যবস্থার পৃষ্ঠপোষকতার ভারতীয় সিদ্ধান্ত অপরিণামদর্শী প্রমাণ হতে পারে। বাংলাদেশে এরই মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব জোরদার হয়েছে। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা দখলে ভারতীয় পৃষ্ঠপোষকতা ভারতবিরোধীরা যা চায় সে সুযোগ করে দিতে পারে। এতে অধিক কট্টর এবং কম ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের উদ্ভব হতে পারে। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী কোন পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নয়। নির্বাচনকে নিজের পক্ষে নিতে ২০০৭ সালে চেষ্টা করেছিলেন খালেদা জিয়া। তখন সেনা সমর্থনে অনির্বাচিত টেকনোক্র্যাট সরকার ক্ষমতায় আসে। তারা দু’বছর ক্ষমতায় থাকে। তখন বিদেশী যেসব দেশ কৌশলগতভাবে তাদেরকে সমর্থন দিয়েছিল, এবার তেমনটা হবে না। ফলে মাসের পর মাস সংঘাত চলতে থাকবে। এক জনমত জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের শতকরা মাত্র ৩০ ভাগ মানুষ চায় সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করুক। উল্লেখ্য, যদি তারা তা করে এবং আরেকটি নির্বাচন করে, এক্ষেত্রে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মানুষ চায় সংঘাতে লিপ্ত দু’ নেত্রী মুক্ত রাজনীতি। কিন্তু তারা যেভাবে দেশ শাসন করুন না কেন দৃশ্যত তাদেরকে বাদ দিয়ে রাজনীতি হবে না।
ভোট নিয়ে সামপ্রতিক সহিংসতায় ১০০-এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। ১২ই ডিসেম্বর ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীর নেতা আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর সর্বশেষ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। শেখ হাসিনার প্রতিদ্বন্দ্বী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি রাজপথে তার রাজনীতি পরিচালনা করছে। তারা একের পর এক অবরোধ কর্মসূচি আহ্বান করছে। এতে পরিবহন ব্যবস্থা এবং অর্থনীতি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বিএনপির জোট সঙ্গী জামায়াত তাদের অস্তিত্বের জন্য লড়াই করছে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের রগকাটার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এখন হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে দলটি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রকাশ্য গুলি করে তাদের জবাব দিচ্ছে। ১৬ই ডিসেম্বর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাতক্ষীরায় গুলি করে জামায়াতের ৫ কর্মীকে হত্যা করেছে। যেসব জেলায় জামায়াতের শক্ত অবস্থান রয়েছে তার মধ্যে সাতক্ষীরা অন্যতম। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে জামায়াতের তরুণ কর্মীরা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়ি এবং দোকানে হামলা চালিয়েছে। আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা প্রত্যন্ত অঞ্চল ছেড়ে রাজধানী ঢাকায় আশ্রয় নিয়েছে।
http://mzamin.com/detailsarchive.php?mzamin=MzY2Mg==&s=Mg==