Tuesday, 22 October 2013

বিডিআর বিদ্রোহ সেনাহত্যা \ একটি চাপাপড়া রক্তাক্ত বিয়োগান্ত আখ্যান-আজিজুল হক বান্না

ভাষা-শহীদদের মহান আত্মত্যাগ ও স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আজকের লেখা শুরু করছি। ভাষা-আন্দোলনের পথিকৃৎ সংগঠন-তমুদ্দুন মজলিশের জীবিত কুশীলবরা বলেছেন, ভাষা আন্দোলনের মূল লক্ষ্য এখনও অর্জিত হয়নি। ভাষা-আন্দোলনের চেতনাকে যারা স্বাধিকার ও স্বাধীনতার চেতনার সূতিকাগার বলে মনে করেন, তাদের কাছে ভাষা-সংস্কৃতির স্বকীয়তা সংরক্ষণের প্রশ্নটি কখনও গুরুত্ব পায়নি। ভারতীয় বাঙ্গালী হিন্দু জাতীয়তাবাদ, আওয়ামী লীগ নেতা-সাংবাদিক মরহুম আবুল মনসুর আহমদের ভাষায় ‘টাওয়ার বাংলার' সংস্কৃতি মাসে আমাদের ‘আমার বাংলাদেশের ভাষা-সংস্কৃতি-রেওয়াজ-রসমের অনতিক্রম ও অমোছনীয় একটা গভীর ব্যঞ্জনাময় স্বাতন্ত্র্য রয়েছে বলেই ১৯৭১-এর বাঙ্গালীর বিজয় উৎসবের' উচ্ছবাসে যোগ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ-শ্যামাপ্রসাদের খন্ডিত পশ্চিম বাংলা আমাদের সাথে মিশে যেতে এগিয়ে আসেনি।

 সুতরাং ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার সে সুড়সুড়িতে বিগত প্রায় এক শতাব্দীকাল ধরে বাঙ্গালী মুসলমানদের স্বকীয়তাকে হিন্দুত্বের আবাহনে ‘লীন' করার নানা কসরত চলেছে, তা ফলপ্রসূ হয়নি। কিন্তু তাতে কী? আওয়ামী লীগ-মহাজোট সরকারের যুগে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার বর্ণচোরা ক্যানভাসাররা আবার পুরনো সংগীতের মূর্ছনায় মায়াজাল সৃষ্টিতে তৎপর। বাংলাদেশের মানুষ সাহসী ও সংস্কারমুক্ত হয়ে ভারতভুক্ত পশ্চিম বাংলাকে মুক্ত করে বৃহৎ সার্বভৌম বাংলার অতীত স্বপ্নচারিতার বৃত্তে পদচারণা করতে মোটেই অনিচ্ছুক নন। সোহরাওয়ার্দী-শরৎ বসু-আবুল হাশিমদের অখন্ড-সার্বভৌম বাংলার স্বপ্ন নস্যাতের কারিগর শ্যামাপ্রসাদ, গান্ধী-নেহেরুদের বিরুদ্ধে ‘ওপাড়ের' বাঙ্গালী চেতনার ধারকদের কোন দ্রোহ বা ক্ষোভ নেই। দিল্লীর চাণক্য-ব্রাহ্মণ্যবাদী পন্ডিতদের সোহাগ-আদরে আত্মসমর্পিত নীরদ চৌধুরী-বর্ণিত ‘আত্মঘাতী বাঙ্গালীরা' পশ্চিম বাংলাকে হিন্দী ও মাড়োয়ারী সংস্কৃতি পুঁজিতন্ত্রের বিরুদ্ধে অসম লড়াই চালিয়ে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়েছেন। পশ্চিম বাংলার বাঙ্গালী ধরে রাখার ক্ষেত্রে বামপন্থী শেরপাদের সাড়ে তিনদশকে যুদ্ধ এবার হয়তো কংগ্রেস-তৃণমূলের কাছে পরাভূত হবার ক্লান্ত প্রতীক্ষা করেছে। পশ্চিম বাংলার কূটবুদ্ধির কংগ্রেসী ব্রাহ্মণ রাজনীতিক প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সাথে আর এক বাঙ্গালী ব্রাহ্মণ কন্যা তৃণমূল নেত্রী মমতা মুখোপাধ্যায় হাত মিলিয়ে যে নয়া সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন, তাতে তারা সফল হলে পশ্চিমবাংলার দাদা বাঙ্গালীদের পূর্ব পরিচয়ের গর্ব আর একবার আহত হবে।
আমাদের মনে পড়ে, গত বছরের একুশে ফেব্রুয়ারির প্রাক্কালে পশ্চিম বাংলা সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রতিবেশীদের জন্য কয়েক ট্রাক মিষ্টি পাঠানো হয়। ভারতবান্ধব সরকারের উদার আতিথেয়তায় ঐ সময় বেনাপোল সীমান্ত উন্মুক্ত করে বিডিআর-কাস্টমস-ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ মিষ্টি-উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন। এর কয়েকদিন পরেই পিলখানার বিডিআর সদর দফতরে শতাব্দীর ভয়াবহতম রক্তাক্ত বিয়োগান্ত ঘটনা ঘটে। সুতরাং ফেব্রুয়ারি যেমন ভাষা-শহীদদের রক্তাক্ত স্মৃতিচারণের মাস, তেমনি জাতীয় সেনাবাহিনীর অর্ধশতাধিক সদস্যের জীবনহানির ঘটনারও ধারক। একটি রহস্যজনক এবং রাজনীতি-তাড়িত বিডিআর-বিদ্রোহের নামে জাতীয় প্রতিরক্ষার অগ্রবাহিনীর সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানদের পরিকল্পিত হত্যা করা হয়েছে। বিদ্রোহের বাতাবরণে আমাদের ফার্স্ট লাইন অব ডিফেন্স বিডিআর বাহিনী এবং মূল সামরিক বাহিনীকে ধ্বংস করার মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই নিষ্ঠুর রক্তপাত ঘটানো হয়েছে। এতে প্রতিরক্ষার সহোদর দুটি সংস্থার মধ্যে যেমন দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস সন্দেহের বীজ ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে, তেমনি দুটি সংস্থার নেতৃত্ব কাঠামোই ধ্বংস করা হয়েছে। যারা বিদ্রোহে বিডিআর জওয়ান ও অফিসারদের উস্কে দিয়ে ঘটনার পূর্বাপরের বিষয়গুলো নিবিড় মনিটর করে বিদেশী প্রভুদের ভয়ংকর অন্তর্ঘাত বাস্তবায়ন করেছিল, তারা বিডিআর জওয়ানদের সাথেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সরকারী কাস্টোডিতে থাকা অবস্থায় এ পর্যন্ত ৭৩ জন বিডিআর সদস্য অস্বাভাবিক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। এসব মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জনমনে সন্দেহ রয়েছে। অনেক বিডিআর জওয়ান আদালতের কাছে তাদের পূর্ব প্রদত্ত জবানবন্দী প্রত্যাহার করেছেন। যেসব বিডিআর সদস্যকে বাঁচিয়ে রাখলে গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে অথবা যারা শিখিয়ে দেয়া বুলি তোতাপাখির মতো আওড়াতে রাজি হননি, তাদেরকে ‘আত্মহত্যা' বা ‘হৃদরোগে' মৃত্যুর সার্টিফিকেট ধরিয়ে চিরবিদায় নিশ্চিত করা হয়েছে কিনা, জনমতে এ ধরনের সন্দেহ প্রবল হয়ে উঠেছে। বিডিআর বিদ্রোহের নেতা-সংগঠকদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর নিঃশর্ত বৈঠক এবং বিদ্রোহীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর ডিএডি তৌহিদকে ভারপ্রাপ্ত বিডিআর ডিজি হিসেবে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। এরপর ডিএডি তৌহিদ সহযোগী বিদ্রোহী নেতাদের সাথে নিয়ে পিলখানায় ফিরে গিয়ে ঘোষণা দেন যে, তাদের মিশন সফল হয়েছে। এ ঘোষণা ঢাকার বাইরের বিডিআর সেক্টর কমান্ডারদের কাছে পৌঁছে এবং এ খবর দেশের সকল বিডিআর-ক্যাম্পে ছড়িয়ে পড়লে ঢাকার বাইরের বিডিআর সদস্যরা দ্বিতীয় পর্বে বিদ্রোহমূলক তৎপরতায় জড়িয়ে পড়েন। তবে এসব অনুপ্রাণিত বিদ্রোহী বিডিআর সৈনিকদের হাতে সেনাবাহিনীর কোন সদস্যের মৃত্যু ঘটেনি। অথচ বিলম্বিত প্রক্রিয়ায় বিডিআর বিদ্রোহের যে বিচার হচ্ছে, তাতে ঢাকার বাইরে লঘু অপরাধীদের আসামীর কাঠগড়ায় দেখা যাচ্ছে। অথচ পিলখানার বিডিআর সদর দফতরের দৃশ্যমান বিদ্রোহী, লুটেরা ও নারী নির্যাতনকারীদের বিচারকে বিলম্বিত করা হচ্ছে। সেনা হত্যার বিচার কবে হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এমনকি পূর্ণাঙ্গ তদন্তও এখন পর্যন্ত হয়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। তদন্তকারী প্রধান পুলিশ অফিসারের রাজনৈতিক স্তাবকতা তার পেশাগত সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সেনাবাহিনীর তথা বিএনপি-জামায়াতের ওপর কলংক লেপনের নোংরা রাজনীতি শুরুর পাঁয়তারা করছে। রাজশাহীতে নিহত ছাত্রলীগ কর্মী ফারুকের লাশ ম্যানহোল থেকে উদ্ধারের রহস্যজনক ঘটনাকে টেনে এনে প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পিলখানা হত্যার সাথে বিএনপি-জামায়াতের সংশ্রব আবিষ্কারের পরিত্যক্ত ও প্রত্যাখ্যাত গল্পটি আবার চালু করতে শুরু করেছেন। এ থেকে সরকারের আর একটি জঘন্য ষড়যন্ত্রের নীলনকশা উন্মোচিত হয়। সত্যকে কবর দিয়ে নিজেদের অপরাধ-ব্যর্থতা আড়াল করে বিরোধী দলকে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশে সরকার ও তদানীন্তন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন বাধা দিয়ে তাকে হিমাগারে পাঠিয়ে দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্তকারীরা বলেছেন, বিদ্রোহের উদ্দেশ্য এবং এর পেছনের সংগঠক মদদদাতাদের চিহ্নিত করতে পরিপূর্ণ তদন্ত দরকার। কিন্তু সরকার শুধু পূর্ণাঙ্গ তদন্তই ধামাচাপা দেয়নি, বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়েও সময়ক্ষেপণ করে সরকারের অবস্থানকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। দ্বিতীয়ত বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনাহত্যার মতো জঘন্য ও রাষ্ট্রঘাতী হত্যাকান্ডে বিরোধীদল স্কেপগোট বানানোর দুষ্টুবুদ্ধিতে পারঙ্গম আওয়ামী লীগ এবার প্রতিবেশী দেশটির গোয়েন্দাদের হুইপিং-এ ভয়ংকর শঠ ও নিষ্ঠুরতার প্রমাণ দিতে শুরু করেছে। এই পটভূমিতে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে অথবা বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনা হত্যার সামগ্রিক বিষয়কে গণতদন্তের আওতায় এনে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করা জরুরী হয়ে পড়েছে। এই গণতদন্ত রিপোর্ট জাতির কাছে উপস্থাপন করে জনমত গঠন করা ঐতিহাসিক জাতীয় দায়িত্ব হবে বলে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করেন। যদিও এই দায়িত্ব পালনে দেশপ্রেমিক নাগরিক সমাজের আরও আগে এগিয়ে আসা উচিত ছিল। তবে বিলম্বে উদ্যোগ নেয়া না নেয়ার চেয়ে উত্তম। কেননা, বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনা হত্যার বিচার সরকার কিভাবে, কবে করবে, তা নিয়ে আশাবাদী হবার কোনো কারণ নেই।
এখানে আরও কিছু কথা উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি। বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা নিয়ে যেসব আলোচনা-বিশ্লেষণ হয়েছে এবং তাতে যেসব চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে এসেছে তাতে একটি সূত্র দাবি করেছে যে, ভারত থেকে বিগত বছরের ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে যে এক কোটি মিষ্টিবাহী ট্রাক পাঠানো হয়েছিল, তার সাথে বিডিআরের পোশাক পরিহিত ভারতীয় বেশ কিছু নাগরিক বাংলাদেশে ঢুকেছিল। এসব নাগরিকরা ২৫ ফেব্রুয়ারির পিলখানার সেনা হত্যার মিশনে অংশ নিয়েছে। নি্রদীপ মহড়ার নামে এসব কিলার গ্রুপকে পিলখানা থেকে রেড ক্রিসেন্টের এ্যাম্বুলেন্সে চড়িয়ে সরিয়ে দিয়ে সরাসরি বিমানবন্দর দিয়ে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার গুজবও ব্যাপকভাবে প্রচারিত আছে। এসব কিলার গ্রুপের সাথে বাংলাদেশের একটি প্রভাবশালী মহল দেশের বাইরে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে গোপন বৈঠক করেছে বলেও প্রচারিত আছে। তবে সরকারের স্বচ্ছতা ও আন্তরিকতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থাকায় সরকার এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটন করবে না বলেই ধরে নেয়া যায়। এ জন্য প্রাইভেট ডিটেকটিভ বা আন্তর্জাতিক কোনো গোষ্ঠীকে এ কাজে সম্পৃক্ত করা দরকার ছিল। তবে দুঃখজনকভাবে আরও অনেক বিষয়ের মতো এ বিষয়টিও জাতীয় রাজনীতিক, সামরিক-অসামরিক বুদ্ধিজীবীদের কাছে উপেক্ষিত হয়ে আছে। তবে বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনাহত্যার দায় বিরোধীদলের ওপর চাপানোর যে অশুভ প্রবণতা সরকারের নীতি নির্ধারকদের কথাবার্তায় প্রতিফলিত হয়েছে, তাতে এই ভয়ঙ্কর জাতীয় ট্রাজেডী নিয়ে বিরোধী দলকে জাতীয় দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতেই হবে। বিডিআর বিদ্রোহ সেনাহত্যার বিচার না হওয়া বা বিলম্বিত বিচারের নামে মূল অপরাধীদের রক্ষা করার যে অভিযোগ অনুচ্চকণ্ঠে নানা স্তর থেকে উঠেছে, জাতীয় প্রতিরক্ষার চেতনা জাগ্রত করা এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থেই তাকে বুলন্দ করা দরকার।
প্রধানমন্ত্রী সরাসরি বলেছেন, বিরোধীদল বিডিআর বিদ্রোহ সংঘঠিত করে সরকার উৎখাত করতে চেয়েছে। বিরোধীদলের বিরুদ্ধে দেশকে গৃহযুদ্ধে ঠেলে দেবার ষড়যন্ত্রের অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে। সেনা অফিসারদের জীবন রক্ষায় সেনাবাহিনীর ঝটিকা অভিযান চালানোর দাবি করায় প্রধানমন্ত্রী তাদের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, সেনা অভিযান চালিয়ে যারা দেশে গৃহযুদ্ধের সূচনা করতে পারেনি, তারাই সরকারের ‘রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের' সমালোচনা করছে। কয়েকদিন আগেও প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বলেছেন, বিরোধীদলীয় নেত্রী বিডিআর বিদ্রোহের দিন কেন ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি ছেড়েছিলেন? তবে এ প্রশ্নের জবাব প্রধানমন্ত্রীরই ভালো জানা থাকার কথা। বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং দেশের দু'বারের প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা দেয়া সরকারের দায়িত্ব। বেগম খালেদা জিয়া একজন সাবেক সেনাপ্রধান ও প্রেসিডেন্টের স্ত্রী হিসেবে সেনা কর্তৃপক্ষের কাছেও নিরাপত্তা পাবার অধিকারী। তদানীন্তন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ১/১১তে পরোক্ষ ক্ষমতা দখল করে যে বিশ্বাসঘাতকতা করেন, তারই ধারাবাহিকতায় ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি বিরোধীদলীয় নেত্রীর জন্য অনিরাপদ করা হয়েছিল। তাকে ঐ বাড়ি থেকে উচ্ছেদের প্রক্রিয়া এখনও অব্যাহত রয়েছে। বিরোধীদলীয় নেত্রী নিরাপত্তা সংকটে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি ছাড়লেও বিডিআর বিদ্রোহের সময় প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির সামনে সেনাবাহিনীর ট্যাংক বিধ্বংসী কামান বসানো হয়েছিল। জাতীয় সেনাবাহিনীর ট্যাংক বাহিনীর ওপর বিশ্বাস হারানোর তাৎপর্য এখনও অনেকের কাছে দুর্বোধ্য। সেখানে ভারত সরকার প্রকাশ্যে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় সম্ভাব্য সকল পদক্ষেপ নেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেখানে প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির সামনে ট্যাংক বিধ্বংসী কামান বসানো হলেও সেনাবাহিনীর ট্যাংক-বাহিনীকে পিলখানায় ঢুকতে দেয়া হয়নি কেন? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছেন, ওগুলো ট্যাংক নয়, ট্যাংক সদৃশ অন্যকিছু। এতে বিদ্রোহীরা নিশ্চিন্ত ও বেপরোয়া হয়ে নির্বিচারে সেনাহত্যার নিষ্ঠুরতা চালাতে সুযোগ পেয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। এমনকি, সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া বহরকে পিলখানা থেকে ধানমন্ডি মাঠের দিকে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী যখন বিরোধীদলের ওপর পিলখানার বিদ্রোহকে কাজে লাগিয়ে দেশে গৃহযুদ্ধ সংঘটিত করে সরকার উৎখাতের কল্পিত অভিযোগ আনেন, তখন তার নিজের বুদ্ধির স্থূলতা ও বক্তব্যের যুক্তিগ্রাহ্যতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠতে পারে, তা তিনি ভুলে যান। সরকার পক্ষ যদি বিডিআর বিদ্রোহে বিএনপি ও সেনা হত্যায় মৌলবাদী জঙ্গি-জামায়াতকে নিশ্চিতভাবেই সন্দেহ করে থাকেন, তাহলে তো সেনা অভিযান চালানো তাদের জন্য আরো জরুরি হয়ে পড়ে। বরং বিরোধী দলের দাবিকে পাশ কাটিয়ে সরকার ‘গৃহযুদ্ধ' এড়ানো ও অধিক রক্তপাত ঠেকাতে ‘রাজনৈতিক নিত্তি' করার দাবি করেছে। তবে এটাকে অনেকে প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দেবার গভীর ষড়যন্ত্র বলে মনে করেন।
এ প্রসঙ্গে হলিডে'-তে (১৯ ফেব্রুয়ারি-২০১০) সাদেক খান লিখেছেন: "Brigadiar general Mahmud Hossain,Director of military Intelligence told reporters that Bangladesh Army was ready to storm the headquarters of the BDR soon after the militray erupted, but obeyed Primier Sheikh Hasina's advice at the last minute to resolve the issue politically.Terming if 'possibly the worst massacre of Army officers in Bangladesh history.' (Portents of Deep Trouble: Blame game, unsolved mystery of BDR massacre, Holiday, 12 Feb-2010)
এই লেখার এক সপ্তাহ পর ‘দৈনিক সংবাদ' ২০ ফেব্রুয়ারি/১০ সরকারি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে এক রিপোর্টে উল্লেখ করেছে: ‘‘বিডিআর বিদ্রোহের-চার্জশিট চলতি মাসের মধ্যেই।’’ তবে চার্জশিট দেবার আগেই সরকার প্রধান যেভাবে বিডিয়ার বিদ্রোহ ও সেনাহত্যা নিয়ে উচ্চমাত্রার রাজনীতি করছেন, তাতে এই চার্জশিটের রাজনীতিকীকরণ নিয়ে আরো সন্দেহ বাড়ে। প্রধানমন্ত্রী মীরপুরে সেনা বাহিনীর স্টাফ কলেজের ডিগ্রি প্রদান এক অনুষ্ঠানে সেনা অফিসারদের সাধারণ সৈনিকদের সাথে অধিকতর মতবিনিময় করার পরামর্শ দিয়ে বিডিআর বিদ্রোহের মতো ঘটনা এড়াতে বলেছেন। তবে পিলখানার বিডিআর বিদ্রোহের ধরন, প্রকৃতি, সেনা হত্যার নৃশংসতা, লাশ বিকৃত ও গুম করাসহ সেনা অফিসারদের স্ত্রী-কন্যা-মহিলা আত্মীয়াদের নির্যাতনের ঘটনাবলী বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা এটাকে সেনা অফিসারদের বিরুদ্ধে সাধারণ জওয়ানদের ক্ষোভের পরিণতি বলতে নারাজ। বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনাহত্যার বিলম্বিত বিচারকে কেন্দ্র করে জনবিক্ষোভ ধামাচাপা দেয়া এবং ভারতের সাথে সম্পাদিত জাতীয় স্বার্থ বিরোধী চুক্তি বাস্তবায়নের তাড়না থেকে প্ররোচিত হয়ে সরকার জামায়াত-শিবির উৎখাতে ‘চিরুনী অভিযান' চালাচ্ছে।
এই মাসে বিরোধীদলের গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমনে দলীয় ক্যাডারদের সহযোগী হিসেবে পুলিশবাহিনী মাঠে নামিয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের স্টীম রোলার চালানো হচ্ছে। সরকার আনুষ্ঠানিক বাকশাল-ধাঁচের একদলীয় ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা না করে অঘোষিত বাকশালী দুঃশাসন চালিয়ে যাচ্ছে। জেনারেল জিয়ার ক্ষমতা গ্রহণ অবৈধ ঘোষণা, সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল এবং বাকশাল-মুক্তির নেতৃত্বদানকারী সামরিক বাহিনীর সদসদের ‘মুজিব হত্যার' মামলায় ফাঁসী কার্যকর করে কার্যত: ১৯৭৫-এর ২৫ জানুয়ারির বাকশাল পর্বে দেশকে টেনে নিয়ে গেছে। এর আলামত স্পষ্ট। হাইকোর্টের জামিনের পরও ৩৫১ মামলার অভিযুক্ত-আসামীর জামিন ঠেকে-আছে সরকারের তাঁবেদার এটর্নী জেনারেলের অফিসের সবুজ সংকেতের জন্য। হাইকোর্টের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায় কার্যকর করার আতিশয্য এবং হাইকোর্টের জামিন সংক্রান্ত আদেশ প্রতিপালনের টালবাহানায় সরকারের দ্বৈততা স্পষ্ট। একইসাথে আইনের শাসন ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে সরকার ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্বের আওতায় নিয়ে যাচ্ছে। এতে গণতন্ত্র, বহুদলীয় রাজনীতি, বিচার বিভাগ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অপমৃত্যু ঘটা সময়ের ব্যাপারমাত্র।