Tuesday, 29 October 2013

গার্ডিয়ানের রিপোর্ট: বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত দক্ষিণ এশিয়ার বধ্যভূমি



মানবজমিন ডেস্ক: বাংলাদেশ সীমান্তে ভারত গুলি করে হত্যার নীতি নিয়েছে। শুধু তাই-ই নয়। এই সীমান্তকে দক্ষিণ এশিয়ার এক বধ্যভূমি বানানো হয়েছে। ২৩শে জানুয়ারি অনলাইন গার্ডিয়ানে প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়াস শুট-টু-কিল পলিসি অন দ্য বাংলাদেশ বর্ডার’ শীর্ষক এক রিপোর্টে এসব কথা বলা হয়েছে।
এর লেখক ব্রাড এডামস। তিনি লিখেছেন, সীমান্তে গত ১০ বছরে ভারতীয় নিরাপত্তারক্ষীরা প্রায় ১০০০ মানুষ হত্যা করেছে। এর বেশির ভাগই বাংলাদেশী। কিন্তু এসব হত্যায় যারা জড়িত তাদের কারও কোন বিচার হয়নি। ওই রিপোর্টে প্রশ্ন তোলা হয়েছে- ভাল কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করলেই কি ভাল প্রতিবেশী হওয়া যায়?
এ কথা অন্তত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের জন্য প্রযোজ্য নয়। ভারত তার সীমান্তে এরই মধ্যে ২০০০ কিলোমিটার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শেষ করেছে। এক সময় যেখানে দুই দেশের মানুষই বৃহত্তর বঙ্গের অংশ ছিলেন, সেখানে ভারত এখন অনুপ্রবেশ, পাচার, সরকারবিরোধী সন্ত্রাসীদের প্রবেশ ঠেকাতে ‘দূরে থাকুন’ চিহ্ন ব্যবহার করছে। যেখানে অভিবাসনের প্রশ্নে বৈরিতা বাড়ছে সেখানে এমন ঘটনা অবশ্য ব্যতিক্রমী নয়।  কিন্তু সীমান্তে মোতায়েন করা পুলিশ, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) নিরপরাধ স্থানীয় গ্রামবাসীর ওপর গুলি করে হত্যার নীতি গ্রহণ করেছে।

এভাবে নিহতের সংখ্যা বিরাট। নিরস্ত্র ও প্রতিরোধ শক্তিহীন স্থানীয় গ্রামবাসীকে হত্যার অনেক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও এর জন্য কারও বিচার হচ্ছে না। বিস্ময়কর হলো- অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টাকারীকে, যদি সে নিরস্ত্রও হয় তাহলেও গুলি করে হত্যার নীতিকে অনুমোদন দিয়েছেন ভারতীয় কিছু কর্মকর্তা।  মানবাধিকার নিয়ে যেসব বিদেশী সরকার সোচ্চার তারাও এ বিষয়ে কোন ভ্রুক্ষেপ করছে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোন ব্যক্তি যদি মেক্সিকো সীমান্তে একটিমাত্র হত্যাকাণ্ডও ঘটায় তবে তা সংবাদ শিরোনাম হয়। কিন্তু ভারতীয় বাহিনীর হাতে গ্রামের এতগুলো মানুষকে হত্যার বিষয়টি বেমালুম এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই সহিংসতা নিয়মিত ঘটছে এবং তা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হচ্ছে। মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর কাছে আলাউদ্দিন বিশ্বাস বলেছেন তার ২৪ বছর বয়সী ভাইপো হত্যার কথা। তিনি বলেছেন- ২০১০ সালের মার্চে গরুচোর সন্দেহে তার ভাইপোকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা হত্যা করে। তারা তার কপালে গুলি করে। যদি সে দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করতো তাহলে গুলি তার পিঠে বা পেছনে লাগতো। এতে স্পষ্ট- বিএসএফ তাকে হত্যা করেছে। বিএসএফ দাবি করেছে, তারা আত্মরক্ষার জন্য গুলি করেছে। কিন্তু ঘটনাস্থল থেকে কোন অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। আরেক বাংলাদেশী নজরুল ইসলাম একজন ভাগ্যবান। তিনি বলেন- রাত তিনটার দিকে আমরা ভারত সীমান্ত অতিক্রমের সিদ্ধান্ত নিই। ভারত থেকে গরু পাচার করে সে বাংলাদেশে আনতে চেষ্টা করছিল বলে বিএসএফ-এর সন্দেহ।
নজরুল বলেন, বিএসএফ আমাদেরকে দেখামাত্র কোন সতর্কতা না দিয়েই গুলি করতে থাকে। এতে নজরুল ইসলামের বাহুতে গুলি লাগে। তিনি বেঁচে যান। ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়, ঘটনার শিকার যারা হয়েছেন তাদের মধ্যে আছে বেশ কিছু শিশুও। তাদের একজনকে কিভাবে বিএসএফ প্রহার করেছে সে সম্পর্কে বর্ণনা দিয়েছে তার পিতা। তিনি বলেছেন- কোন কারণ ছাড়াই একদল শিশুকে বিএসএফ ঘিরে ফেলে। তারা ওই শিশুদের রাইফেলের বাঁট দিয়ে মারতে শুরু করে। লাথি মারে। থাপ্পড় মারে। তিনি বলেন- ওই দলে ছিল ৯ জন বিএসএফ সদস্য। তারা আমার ছেলেকে নির্দয়ভাবে প্রহার করেছে। যখন সে মাটিতে পড়ে গেছে তখন বিএসএফ সদস্যরা তাকে নির্মমভাবে তার বুকে ও স্পর্শকাতর অঙ্গে লাথি মারে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সীমান্তের কাছাকাছি বসবাসকারী লোকজন দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তের এপার-ওপার যাওয়া-আসা করেন।  ১৯৪৭ সালে বৃটিশদের দেশবিভাগের সময় যে সীমান্তরেখা টেনে দেয়া হয়েছে তাতে অনেকের অনেক বন্ধু, আত্মীয়স্বজন সীমারেখার কারণে আলাদা হয়ে পড়েছেন। তারাই এপার-ওপার হয়ে থাকেন। মেক্সিকো সীমান্ত যেমন যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথার কারণ তেমনি বাংলাদেশ সীমান্ত ভারতীয় রাজনীতিতে মানসিক অস্থিরতার বিষয় হয়ে উঠেছে। সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপের অধিকার ভারতের আছে। তবে প্রাণ রক্ষার প্রয়োজন ছাড়া ভারতের মারণাস্ত্র ব্যবহারের কোন অধিকার নেই। এমনকি ভারতীয় অনেক কর্মকর্তা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। বিএসএফ প্রধান রমণ শ্রীবাস্তব বলেছেন- ঘটনার শিকারদের নিয়ে কারও দুঃখিত হওয়া উচিত নয়। তার দাবি ওইসব মানুষ অবৈধভাবে, এমনকি রাতেও ভারতীয় সীমান্তে প্রবেশের চেষ্টা করেছিল। তারা ‘নিরপরাধ’ নয়। তাই তাদেরকে বৈধ টার্গেটে পরিণত করা হয়। ভারত এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে কার্যকর আদালত আছে। তার পরও শ্রীবাস্তব বিশ্বাস করেন বিচারক, জুরি ও জল্লাদের ভূমিকা পালন করতে পারে বিএসএফ। এই প্রবণতার কারণেই হত্যাকাণ্ডের শিকার অনেকের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়। যেমন ১৩ বছর বয়সী আবদুর রকিব।

সে কোন আইন ভঙ্গ করেনি। সে কাঁটাতারের বেড়ার কাছে গিয়েছিল শুধু এজন্যই তাকে হত্যা করা হয়েছে। দুঃখজনক ব্যাপার হলো- বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী কর্মকর্তারা যুক্তি দেখান- এমন হত্যাকাণ্ড মেনে নেয়া যায়। কারণ নিহত ব্যক্তি চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কাশ্মীরে ভয়াবহ নির্যাতনের ঘটনাটিকে খাটো করে দেখা হচ্ছে। এ সম্পর্কে সমপ্রতি উইকিলিকস বলেছে- সেখানে প্রতিনিয়ত ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্য ও পুলিশ মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। কিন্তু তাদের বিচার হচ্ছে না। বিএসএফ-এর মতো নিরাপত্তা রক্ষাকারী কোন বাহিনীর সদস্যের দ্বারা সংঘটিত কোন অপরাধের তদন্তের জন্য ভারতের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের অনুমোদন লাগে। কিন্তু সে অনুমোদনের ব্যাপারটা সচরাচর দেখা যায় না। গুলি করে হত্যার নীতিতে ভারতীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করেছেন। তাদের কেউ বলেছেন- সীমান্ত অতিক্রমকারীরা আইন ভঙ্গকারী বলে আমরা তাদেরকে গুলি করি। কেউ বলেন- আমরা সীমান্ত অতিক্রমকারীদের গুলি করি না। কেউ বলেন- আমরা শুধুমাত্র আত্মরক্ষার জন্য গুলি করি। কেউ বলেন- আমরা হত্যা করার জন্য গুলি করি না। তারপরও আশার কিছু কারণ আছে। চাপের মুখে, ভারতের সিনিয়র নেতারা বিএসএফ-এর আচরণ নিয়ে তাদের মত পাল্টে ফেলছেন। সঙ্গে সঙ্গে সীমান্তে গুলি করে হত্যার নীতি বন্ধে তারা নতুন নির্দেশ পাঠানোরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যেসব ক্ষেত্রে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম ও চোরাচালানের চেষ্টাকারী জীবনের প্রতি ঝুঁকি না হবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত অহিংস আচরণ দেখানোরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারা। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই প্রতিশ্রুতি কি কার্যক্ষেত্রে পরিবর্তিত হয়ে বাস্তবে রূপ নেবে? একইভাবে কাশ্মীরেও ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি  গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু তার বাস্তবায়ন হয়নি।
ভারতের অর্থনীতির উন্নতি হয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ঝাঁকে ঝাঁকে আসছেন। ফলে সামপ্রতিক বছরগুলোতে এর মানবাধিকার রেকর্ড যাচাই করা হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে বিশ্বের উদীয়মান শক্তি হিসেবে ভারতের আবির্ভাব ঘটছে। তাদের বোঝা উচিত, তাদের সার্বিক আচরণ খুঁটিয়ে দেখা হবে। সেই সঙ্গে তাদের বুঝতে হবে- গরিব, নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে গুলি করে নিয়মিতভাবে হত্যা করা বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশের আচরণ হতে পারে না।