Saturday, 5 October 2013

বেপরোয়া দুর্নীতির উপাখ্যান- ৫ : কালো বিড়ালের পাঁচালি

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েই বলেছিলেন, ‘ভাঙা রেলের চাঙ্গা মন্ত্রী আমি; আমি রেলওয়ের কালো বেড়াল খুঁজে বের করবো।’ ২০১১ সালের ২৮ নভেম্বর মন্ত্রী হওয়ার পর মাত্র ১৪১ দিনের মাথায় সেই ‘কালো বিড়াল’ কলঙ্কের দায় নিয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এর নেপথ্যে ছিল রেলওয়েতে জনবল নিয়োগে বড় ধরনের বাণিজ্য। ২০১২ সালের ৯ এপ্রিল রাতে সুরঞ্জিত সেনের বাসায় যাওয়ার পথে ৭০ লাখ টাকা ভর্তি বস্তাসহ মন্ত্রীর এপিএস ওমর ফারুক তালুকদার ও রেলওয়ের দুই কর্মকর্তা আটক হওয়ার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পদত্যাগে বাধ্য হন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। একই সময় প্রকাশ হয়ে পড়ে ৫ কোটি টাকায় ছেলের মালিনাকানাধীন সেনগুপ্ত টেলিকমের নামে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি থেকে আইসিএক্স লাইসেন্স নেয়ার খবর। সব মিলিয়ে কালো বিড়ালের পাঁচালি চলছে প্রায় দু’বছর জুড়ে। এত সমালোচনা ও রেলপথ মন্ত্রণালয় ছেড়ে যাওয়ার পরও দমে যাননি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। বিভিন্ন ব্যক্তি ও দলের সমালোচনায় প্রায় প্রতিদিনই উপদেশ ঝেড়ে চলেছেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১২ সালের ১১ এপ্রিল রেলওয়ের নিয়োগবাণিজ্যের কমিশন হিসেবে মন্ত্রীর বাসায় যাওয়ার পথে ৭০ লাখ বা তারও বেশি টাকাসহ গভীর রাতে ঢাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) হাতে ধরা পড়েছে মন্ত্রীর এপিএস ওমর ফারুকের গাড়ি। যাতে জাতীয় সংসদের স্টিকার সাঁটা ছিল। এ সময় ওই গাড়িতে ফারুকের সঙ্গে ছিলেন রেলওয়ের জিএম (পূর্বাঞ্চল) ইউসুফ আলী মৃধা এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তা রেলওয়ের কমান্ডেন্ট এনামুল হক।
মন্ত্রীর এপিএস ওমর ফারুক তালুকদার ও রেলের জিএম বিজিবির কাছ থেকে সুরঞ্জিতের তদবিরে ছাড়া পান। এর কিছুক্ষণ পরই সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সংবাদ সম্মেলন করে জানান, ওই টাকার মালিক তার এপিএস। তিনি এপিএসের গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-চ-১৩-৭৯৯২) চালককে এ ঘটনার জন্য দায়ী করে বলেন, ওমর ফারুক ব্যক্তিগত টাকা নিয়ে বাসায় যাওয়ার সময় চালক আজম খান তাকে অপহরণ করে।
টাকা আটকের সময়কালে রেলওয়েতে ওয়েম্যান, নাম্বার টিকার, খালাসি, জুনিয়র অডিটরসহ বিভিন্ন পদে সাড়ে ৭ হাজার পদে নিয়োগবাণিজ্য চলতে থাকে। প্রত্যেক চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে এক থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেয়া হয়। এ ঘুষের টাকা বণ্টন চলছিল সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে। ঘুষের টাকা সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার ইউসুফ আলী মৃধা ও পশ্চিমাঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার তোফাজ্জেল হোসেন। কিন্তু মন্ত্রী ও এপিএসের বেশুমার দুর্নীতি পছন্দ করেননি চালক আজম খান। তিনি ঘুষের টাকা বহনে অস্বীকৃতি জানান। ঘটনার দিন আজম খান ঘুষের টাকা বহনকারী গাড়ি নিয়ে পিলখানায় ঢুকে পড়েন। প্রবেশের পরই গেটে দায়িত্ব পালনকারী বিজিবি সদস্যরা অস্ত্র তাক করে গাড়িটি ঘিরে ফেলে পিলখানার ভেতরে নিয়ে যায়। ওমর ফারুক ও ইউসুফ আলী ও এনামুল হককে সদর দফতরের মূল গেটেই আটক রাখা হয়। গভীর রাতে আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার জন্য জব্দ করা মোবাইল ফেরত দেয়া হলে ওমর ফারুক ও ইউসুফ আলী মৃধা বিষয়টি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানান। একই সঙ্গে তাদের ছেড়ে দেয়ার জন্য বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে আপস মীমাংসার চেষ্টা চালান। কিন্তু ঘটনাস্থলে বিজিবির নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা ‘ফিল্ড সিকিউরিটি’সহ অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য উপস্থিত থাকায় মীমাংসা করা সম্ভব হয়নি। সারারাত তাদের পিলখানায় আটক রাখা হয়। কর্মরত বিজিবি সদস্যরা বিষয়টি তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান। তারা আটকদের সংশ্লিষ্ট থানায় সোপর্দ করার প্রাথমিক সিদ্ধান্তও নেন। কিন্তু রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপে তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হন বিজিবি সদস্যরা।
ঘটনার পরই রেলমন্ত্রীর এপিএস ওমর ফারুক নাটক সাজিয়ে বলেন, ওই টাকা তার শ্যালক লন্ডন থেকে পাঠিয়েছে। চালক আলী আজম তাদের অপহরণ করার উদ্দেশ্যে বিজিবি সদর দফতরে প্রবেশ করেছে। ১০ এপ্রিল দুপুরে রেল ভবনে সংবাদ সম্মেলন করেন রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি বিজিবির হাতে দুই কর্মকর্তা রাতভর আটক থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ওই টাকার মালিক এপিএস ওমর ফারুক। যদিও এর কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি বলেছেন, কিসের টাকা, তা আমি জানি না। সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেন, সোমবার গভীর রাতে টাকা নিয়ে বাসায় যাওয়ার সময় ওমর ফারুকের চালক তাকে অপহরণের চেষ্টা করে। এ সময় ভয়ে জীবন বাঁচাতে তিনি বিজিবি সদর দফতরের ভেতরে প্রবেশ করেন।
ঘুষের টাকার অংক নিয়ে শুরুতেই ধূম্রজাল তৈরি হয়। আটক হওয়া গাড়ি থেকে ৭০ লাখ, নাকি ৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে—তা নিয়ে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়। ওমর ফারুক বলেন, গাড়িতে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা ছিল। তবে বিজিবির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ওই গাড়ি থেকে ৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু মুচলেকা দিয়ে পিলখানা থেকে ছাড়া পাওয়ার সময় ৭০ লাখ টাকার কথা প্রকাশ করা হয়। বাকি ৪ কোটি টাকা কোথায় গেছে—তার হদিস পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে ৭০ লাখ টাকা এপিএস ওমর ফারুকের মার্কেন্টাইল ব্যাংক ধানমন্ডি শাখায় জমা রাখা হয়। পরে ওই টাকা একই ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় স্থানান্তর করা হয়।
শেষবেলায় মন্ত্রী হলেও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ঘুষ ও কমিশনবাণিজ্যে অত্যন্ত পারদর্শিতার পরিচয় দেন। তার সময় রেলওয়েতে অন্তত দেড়শ’ কোটি টাকা নিয়োগবাণিজ্য চলে। বড় অংকের জনবল নিয়োগ দিতে দিয়ে বিশাল অঙ্কের টাকার ঘুষ লেনদেন হয়। রেল মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পদ থেকে মধ্যমসারির কর্মকর্তাদের অনেকেই ওই টাকার কমিশন পেয়েছেন। বহু চাকরিপ্রার্থী মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দিয়েও চাকরি পাননি। সারাদেশে ৬৫ ক্যাটাগরিতে ৭ হাজার ২৭৫ শূন্যপদে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছিল। কালো বেড়াল কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার আগে এক হাজার ৭৭৬ জনকে নিয়োগপত্র দেয়া হয়েছে।
পরবর্তীতে ইউসুফ আলী মৃধার গাড়িচালকসহ অন্যরা স্বীকার করেছেন, চট্টগ্রাম থেকে দুটি চটের বস্তায় করে ওই টাকা এনেছিলেন পূর্বাঞ্চলীয় জিএম ইউসুফ আলী মৃধা। কিন্তু টাকার বিষয়টি তিনি গোপন করে বলেছিলেন বস্তায় কাঁঠাল এনেছেন। বিজিবির হাতে টাকাসহ আটক হওয়ার পর প্রথমে রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত তার এপিএস ফারুকের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন। কিন্তু পরে অবস্থা বেগতিক দেখে ওই অবস্থান থেকে সরে গিয়ে ঘটনার পরদিন ২০১২ সালের ১২ এপ্রিল তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। রেলের অর্থ কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পর ২০১২ সালের ১৬ এপ্রিল বহুল ‘কালো বিড়াল’ কেলেঙ্কারির দায় মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেন রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। কিন্তু অর্থ কেলেঙ্কারির দায় মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করার পরও মন্ত্রীর পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে তাকে শুধু রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। পরদিনই তাকে দফতরবিহীন মন্ত্রী করার ঘোষণা দেয়া হয়। রেলমন্ত্রী পদত্যাগের পর ২০১২ সালের ১৩ মে সুরঞ্জিতকে ‘নির্দোষ’ ঘোষণা করে রেলওয়ের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি। ওই ঘোষণার ৩ দিনের মাথায় ১৬ মে মন্ত্রী তার ঝিগাতলার বাসায় সংবাদ সম্মেলন করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার ঘোষণা দেন এবং ওইদিনই পতাকাবাহী গাড়িতে নির্বাচনী এলাকা সিলেটে যান। তারপর থেকেই সুরঞ্জিত দফতরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং ভূঁইফোঁড় সংগঠনের সভা-সমাবেশ ও আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে আসছেন।

শিরোনামে সুরঞ্জিত
১১ থেকে ১৮ এপ্রিল টানা এক সপ্তাহের বেশি দেশের সবকটি জাতীয় দৈনিকের শিরোনামে ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও রেলওয়ের নিয়োগ কেলেঙ্কারির খবর। নিয়োগ কেলেঙ্কারি প্রকাশ করে ১১ এপ্রিল ২০১২ দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ছিল—‘কালো বিড়াল এখন জিপে’। একইদিন দৈনিক আমার দেশ-এর শিরোনাম ছিল ‘রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিতের এপিএস ৭০ লাখ টাকাসহ আটক, মন্ত্রীর চাপে দুপুরে বিজিবি ছেড়ে দেয়, গভীর রাতে মন্ত্রীর বাসায় যাচ্ছিলেন, মন্ত্রী বললেন টাকার মালিক এপিএস, এপিএস বললেন, তার শ্যালক।’ একই তারিখে দৈনিক প্রথম আলোর শিরোনাম ছিল ‘রেলমন্ত্রীর এপিএসের গাড়ি হঠাত্ পিলখানায়’। ওই তারিখে কালের কণ্ঠর শিরোনাম ছিল—‘টাকার বস্তাসহ সুরঞ্জিতের এপিএস ধরা’। একই পত্রিকার অপর শিরোনাম ছিল—‘চট্টগ্রাম থেকে ঘুরে ওই টাকা এনেছিলেন জিএম’। একই পত্রিকার অপর একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘এপিএস কোথায় কী করেছে, জানার দায়িত্ব আমার নয়’। এভাবে দেশের সবগুলো জাতীয় দৈনিকের প্রধান শিরোনাম ছিল সুরঞ্জিতের বাসায় যাওয়ার সময় মোটা অংকের টাকাসহ এপিএস ফারুক ও রেলওয়ের দুই কর্মকর্তার আটক হওয়ার খবর।
পরদিন দৈনিক প্রথম আলোর শিরোনাম ছিল—‘অভিযোগের তীর সুরঞ্জিতের দিকে, টাকার থলে নিয়ে মন্ত্রীর বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা, এপিএস বরখাস্ত’। ১২ এপ্রিল ২০১২ দৈনিক প্রথম আলো তাদের সম্পাদকীয়তে—‘রেলমন্ত্রীর এপিএসের গাড়িতে টাকা, বিচার বিভাগীয় তদন্ত হোক’ শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। ওইদিন আমার দেশ-এর সম্পাদকীয় ছিল—‘রেলমন্ত্রীর এপিএসের গাড়িতে বস্তাভর্তি টাকা, ‘কালো বেড়াল’ বেরিয়ে পড়েছে’। ১২ এপ্রিল কালের কণ্ঠর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—‘রেলওয়ের নিয়োগবাণিজ্য, ঘুষের টাকা পৌঁছে দিতে ৯ সদস্যের টিম’। অপর শিরোনাম ছিল—‘টাকার বস্তা যাচ্ছিল সুরঞ্জিতের বাসায়’। ওই সংবাদে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে সাড়ে তিন হাজার পদে নিয়োগের ১৫০ কোটি টাকার ঘুষবাণিজ্যের বিশদ তথ্য তুলে ধরা হয়। ১৩ এপ্রিল ২০১৩ দৈনিক আমার দেশ-এর প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘বিপদে পড়েছি, তীর আমার দিকে’। ওইদিন প্রথম আলোর শিরোনাম ছিল—‘তিনজনই (মন্ত্রীর এপিএস ওমর ফারুক তালুকদার, রেলওয়ের জিএম (পূর্বাঞ্চল) ইউসুফ আলী মৃধা এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তা রেলওয়ের কমান্ডেন্ট এনামুল হক) বলেন, গাড়িটি মন্ত্রীর বাসায় যাচ্ছিল’। একইদিন প্রথম আলোর অপর শিরোনাম ছিল—‘বিপদে আছি, এটা গণতন্ত্রের বিপদ’। একই তারিখে দৈনিক সমকাল জানায়—‘৭০ লাখ টাকা ফারুকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকে জানানো হয়েছে’। ওইদিন মানবজমিন-এর শিরোনাম ছিল—‘স্যার আর ১০ মিনিট লাগবে’। ওই খবরে বলা হয়েছে, টাকার জন্য অপেক্ষমাণ মন্ত্রী রাত ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিটের মধ্যে ১০ বার ফোনে কথা বলেন। ১৩ এপ্রিল দৈনিক আমার দেশ-এর শিরোনাম ছিল—‘সুরঞ্জিতপুত্র সৌমেনের নামে ৫ কোটি টাকার আইসিএক্স লাইসেন্স’। পরদিন একই পত্রিকার শিরোনাম ছিল—‘সেনগুপ্ত টেলিকমের টাকার উত্স নিয়ে প্রশ্ন’। ১৫ এপ্রিল ২০১২ দৈনিক আমার দেশ-এর শিরোনাম ছিল—‘সুরঞ্জিতের অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেন! এপিএস ফারুক চাকরিচ্যুত, অ্যাকাউন্ট জব্দ, জিএম মৃধা ও কমান্ড্যান্ট এনামুল সাসপেন্ড, রেলের সাড়ে সাত হাজার নিয়োগ স্থগিত’। ওইদিন প্রথম আলোর শিরোনাম ছিল—‘রেলের অর্থ কেলেঙ্কারি : চাকরি গেল দুই কর্মকর্তার, তদন্ত কমিটির সামনে জিএম, তারা সেদিন মন্ত্রীর বাসাতেই যাচ্ছিলেন’। ১৬ এপ্রিল ২০১২ দেশের প্রায় সবকটি দৈনিকের শিরোনাম ছিল মন্ত্রী সুরঞ্জিতের পদত্যাগ। ওইদিন আমার দেশ-এর শিরোনাম ছিল—‘সুরঞ্জিতের পদত্যাগ, সরকার ও দলের বোঝা হতে চাই না, বিষ খেয়ে আমি নীলকণ্ঠ হতে চাই’। ওইদিন প্রথম আলোর শিরোনাম ছিল—‘মন্ত্রিত্ব ছাড়লেন সুরঞ্জিত, রাজনীতিতেও যাত্রাবিরতি’। ১৮ এপ্রিল প্রথম আলোর শিরোনাম ছিল—‘পদত্যাগের পর সুরঞ্জিত এখন দফতরবিহীন মন্ত্রী’। ওই তারিখে ইত্তেফাক-এর শিরোনাম ছিল—‘সুরঞ্জিত দফতরবিহীন মন্ত্রী, চাপ সামলাতে পারল না সরকার’। ওই তারিখে দৈনিক যুগান্তর-এর শিরোনাম ছিল—‘পদত্যাগের ত্রিশ ঘণ্টা পার, সুরঞ্জিত দফতরবিহীন মন্ত্রী’। ওই তারিখে দৈনিক আমার দেশ-এর শিরোনাম ছিল—‘সুরঞ্জিতের মন্ত্রিত্ব নিয়ে সার্কাস, দফতরবিহীন মন্ত্রী করলেন শেখ হাসিনা, প্রতিবেশী দেশের হস্তক্ষেপের খবরে তদন্তে জনগণের আস্থা থাকবে না’।
এরপরও ধারাবাহিকভাবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও রেলের নিয়োগ কেলেঙ্কারি জাতীয় দৈনিকগুলোর শিরোনাম হতে থাকে। ২৫ এপ্রিল (২০১২) দৈনিক আমার দেশ-এর শিরোনাম ছিল—‘চট্টগ্রাম থেকে টাকা নিয়ে আসেন জিএম মৃধা, ৭০ লাখ টাকার বস্তা সুরঞ্জিতকে দিতেই তার বাসায় যাচ্ছিলেন’। ২৬ এপ্রিলের শিরোনাম ছি—‘দুদকে মৃধার গাড়িচালক মোখলেসকে জিজ্ঞাসাবাদ, কাঁঠালের কথা বলে টাকার বস্তা নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পৌঁছান জিএম মৃধা’। একই তারিখে সমকাল-এর শিরোনাম ছিল—‘রেলের অর্থ কেলেঙ্কারি, কাঁঠালের বস্তায় কি ছিল’? ২৭ এপ্রিল আমার দেশ-এর শিরোনাম ছিল—‘দুদকের জবানবন্দি শেষে স্বীকারোক্তি, ৫ কোটি টাকার আইসিএক্স লাইসেন্সে সৌমেনের বিনিয়োগ মাত্র ৬০ হাজার’! ৩০ এপ্রিলের (২০১২) শিরোনাম ছিল—‘সুরঞ্জিতের ঘুষ কেলেঙ্কারি, এপিএসসহ তিন কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পেয়েছে দুদক’। ওইদিন ইত্তেফাক-এর শিরোনাম ছিল—‘মৃধা, ফারুক ও এনামুলের বক্তব্যে গরমিল’। ১৪ মে (২০১২) মানবজমিন-এর শিরোনাম ছিল—‘রেলওয়েগেট কেলেঙ্কারি অসম্পূর্ণ প্রতিবেদন’। একই তারিখে আমার দেশ-এর শিরোনাম—‘ঘুষ কেলেঙ্কারি : সুরঞ্জিতকে নির্দোষ ঘোষণা করল রেলওয়ের তদন্ত কমিটি, নির্দোষ সার্টিফিকেট দিতে যাচ্ছে দুদকও’। ওই তারিখে যুগান্তর-এর শিরোনাম—‘রেলওয়ের অর্থ কেলেঙ্কারি, সুরঞ্জিতের সংশ্লিষ্টতা পায়নি তার গঠন করা তদন্ত কমিটি’। ১৭ মে কালের কণ্ঠর শিরোনাম—‘তদন্ত চলাকালেই নিজেকে নির্দোষ দাবি সুরঞ্জিতের, আবার রাজনীতিতে ফিরে যাব’। ১৭ মে দৈনিক আমার দেশ-এর শিরোনাম—‘রেল মন্ত্রণালয়ে ফেরার চেষ্টায় কালো বিড়াল, গণমাধ্যমকে দুষলেন সুরঞ্জিত’।

ঘুষের টাকায় আইসিএক্স লাইসেন্স
রেলমন্ত্রী থাকাকালে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ছেলের মালিকানাধীন সেনগুপ্ত টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেডের নামে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি একটি আইসিএক্স লাইসেন্স ইস্যু করে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী রেলওয়ের নিয়োগবাণিজ্যের ঘুষের টাকা দিয়েই ওই লাইসেন্স নিয়েছে সেনগুপ্ত টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেড। তারা বিটিআরসি থেকে একটি ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ বা আইসিএক্স লাইসেন্স নেন। সেনগুপ্ত টেলিকমিউনিকেশনের মালিক সুরঞ্জিতের ছেলে সৌমেন সেনগুপ্ত। লাইসেন্সের জন্য সৌমেনকে বিটিআরসিতে জমা দিতে হয়েছে ৫ কোটি টাকা। রেলওয়ের ঘুষ কেলেঙ্কারি প্রকাশের দু’দিন পর সুরঞ্জিতের ছেলের প্রতিষ্ঠান সেনগুপ্ত টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেডের নামে এই লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। নতুন ইস্যু করা অত্যন্ত লাভজনক এই লাইসেন্স ও এর ফি বাবদ পরিশোধিত টাকার উত্স নিয়ে তৈরি হয় নানা প্রশ্ন। ওই সময় সুরঞ্জিত বলেন, ‘তার ছেলে একজন আইটি ইঞ্জিনিয়ার (প্রকৌশলী)। তিনি লাইসেন্স নিয়েছেন—এটা অনরেকর্ড, এতে লুকানোর কিছু নেই। বিটিআরসি অনেককেই লাইসেন্স দিয়েছে, সঙ্গে তার ছেলেকেও দিয়েছে। এতে দোষের কি আছে।’
ওই সময় লাইসেন্সের জন্য প্রদেয় ৫ কোটি টাকার উত্স নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। নির্বাচনী হলফনামায় তার বাত্সরিক আয়ের পরিমাণ ৫ কোটি টাকা পরিশোধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। নির্বাচনী হলফনামায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বার্ষিক আয় দেখিয়েছিলেন মাত্র ৭ লাখ টাকা। এর আগে সৌমেনস ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান অগ্নি সিস্টেম লিমিটেডে আইটি এক্সপার্ট হিসেবে কাজ করতেন। সৌমেন অগ্নি সিস্টেমে কাজ করার আগে আরও দুটি আইটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। তার সর্বশেষ বেতন ছিল মাসে সাকুল্যে ৫০ হাজার টাকা। গত ২০ অক্টোবর বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি আইজিডব্লিউ, আইআইজি, আইসিএক্সসহ বিভিন্ন লাইসেন্সের জন্য বিজ্ঞপ্তি জারি করে। ওই সময় সৌমেন চাকরি ছেড়ে দিয়ে ‘সেনগুপ্ত টেলিকমিউনিকেশন’ গঠন করেন। ওই প্রতিষ্ঠানটি বিটিআরসিতে একটি ‘আইসিএক্স’ লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে। লাইসেন্সের নির্ধারিত ফি বাবদ ৫ কোটি টাকা পরিশোধের পর গত বৃহস্পতিবার বিটিআরসি তার প্রতিষ্ঠানের নামে নতুন একটি লাইসেন্স ইস্যু করে। একজন সাধারণ চাকরিজীবী সৌমেন এত টাকা কোথায় পেলেন? কীভাবে পরিশোধ করলেন আইসিএক্স লাইসেন্স ফি’র ৫ কোটি টাকা? তাছাড়া আইসিএক্স অবকাঠামো তৈরিতে আরও অন্তত ৩০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। সেক্ষেত্রে ওই টাকা কীভাবে আসবে—এসব নিয়েও রয়েছে নানা রহস্য।
সেনগুপ্ত টেলিকমের নামে ৫ কোটি টাকার আইসিএক্স লাইসেন্সের টাকার উত্স সম্পর্কে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত শেষে অর্থ কেলেঙ্কারির দায় মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করা দফতরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ছেলে সৌমেন সেনগুপ্তকে নির্দোষ সনদ নিয়ে ওই অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়। অর্থ কেলেঙ্কারির ওই ঘটনায় সুরঞ্জিতের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে তদন্তের বিষয়টি আমলেই নেয়নি দুদক। ফলে অর্থ কেলেঙ্কারি প্রসঙ্গে দুদকের কাছ থেকে ‘বেকসুর খালাস’ পায় সুরঞ্জিত পরিবার। ওই সময় দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান জানান, নোটিশের প্রেক্ষিতে সৌমেন সেনগুপ্তের জবাব সন্তোজজনক হওয়ায় তার সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ পাঠানো হয়নি। তার জবাব সন্তোষজনক না হলে সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ দেয়া হতো। তাছাড়া সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় সৌমেনের বিষয়ে তদন্তে ইতি টানার বিষয়টি ইতোমধ্যে নথিভুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি সৌমেনকে চিঠির মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হবে।

আমলে নেয়নি দুদক
৯ এপ্রিল মধ্যরাতে অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনা অনুসন্ধান আমলে নিলেও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সংশ্লিষ্টতা আমলে নেয়নি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের দাবি ছিল—সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সংশ্লিষ্ট থাকার বিষয়ে কোনো তথ্য-প্রমাণ না থাকায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের তদন্ত শুরু হয়নি। ৭০ লাখ টাকা উদ্ধারের বিষয়ে প্রাথমিক যে তদন্ত হয়েছে, তাতে সুরঞ্জিত জড়িত থাকার প্রমাণ নেই। এর নেপথ্য কারণ হিসেবে জানা গেছে, ওই সময় দুর্নীতি দমন কমিশনে আওয়ামীপন্থী হিসেবে পরিচিত একজন কমিশনার তার অভিযোগ আমলে নিতে দেননি। তারা দায়সারাভাবে নিয়োগ কেলেঙ্কারির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ৩ কর্মকর্তা মন্ত্রীর এপিএস ওমর ফারুক তালুকদার, রেলের পূর্বাঞ্চলের বরখাস্ত করা মহাব্যবস্থাপক ইউসুফ আলী মৃধা এবং রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ড্যান্ট এনামুল হক লিখিত ও মৌখিক জবানবন্দি এবং তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ আয়ের মামলা করেই দায়িত্ব শেষ করেছে।

চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন আজম খান
ঘটনার প্রায় ৬ মাস পর ২০১২ সালের ৬ অক্টোবর আরটিভিতে ড্রাইভার আলী আজমের একটি সাক্ষাত্কার প্রচার করা হয়। ওই সাক্ষাত্কারে আলী আজম বলেন, টাকা যাচ্ছিল সুরঞ্জিতের বাড়িতে। তার বক্তব্য—শুধু ওইদিনই নয়, এর আগেও বেশ কয়েকবার তার গাড়িতে করে মন্ত্রীর বাড়িতে ঘুষের টাকা নেয়া হয়েছে। বিষয়টি অপরাধ মনে করে দেন তিনি টাকাসহ গাড়ি বিজিবি সদর দফতরে ঢুকিয়ে ঘুষের টাকা বিজিবি সদস্যদের কাছে ধরিয়ে দিয়েছেন। সাবেক রেলমন্ত্রী ও বর্তমানের দফতরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএস ওমর ফারুকের গাড়িচালক আজম খান দাবি করেছেন, মাস ছয়েক আগে উদ্ধার হওয়া সেই ৭০ লাখ টাকা মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বাড়িতেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। রেলে নিয়োগের জন্য ঘুষ হিসেবে নেয়া হয়েছিল সেই টাকা। আজম খান জানান, রেলের জিএম ইউসুফ আলী মৃধা ও মন্ত্রীর এপিএস ফারুকের মধ্যে কন্টাক্ট হয়েছিল তারা মন্ত্রীকে ১০ কোটি টাকা দেবে। আর রেলে ৬০০০ লোক ঢোকাবে। আলী আজমের ভাষ্য, মেজর মশিউর রহমান নামে এক ব্যক্তি রেলের নিয়োগবাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। মেজর মশিউর ৩ কোটি টাকার চেক ফারুকের কাছে হ্যান্ডওভার করেছে বলে জানায়। ফারুক আরটিভির সাক্ষাত্কারে জানান, ‘আমি যখন গাড়িটা বিজিবির গেটের ভেতর ঢুকাইয়া ফেলি, তখন ফারুক সাহেব আমাকে টাকার লোভ দেখান। তিনি প্রথমে আমাকে ৫ লাখ টাকা, তারপর অর্ধেক টাকা দেয়ার কথা বলেন আমাদের ছাইড়া দাও। আমি রাজি না হওয়ায় বলেন, সব টাকা নিয়ে আমাদের ছাইড়া দাও। আমি বললাম, না, তাহলে তো আমি দুর্নীতি করতাছি। আমি এটাতে রাজি হই নাই।’
রেলের নিয়োগবাণিজ্যের মাধ্যমে পাওয়া ভাগের টাকাই সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ছেলে সৌমেন সেনগুপ্ত টেলিকম ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন বলে জানিয়েছেন এপিএস ওমর ফারুকের গাড়িচালক আজম খান। তিনি বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ছেলে সৌমেন সেনগুপ্তের টেলিকম ব্যবসার আলাপ তো আমার সামনেই হয়েছে। রেলের টাকা থেকে টাকাগুলো ওখানে দেয়া হয়েছে। সুরঞ্জিত সেন শুধু মন্ত্রী হিসেবে নন, সংসদীয় কমিটির সভাপতি থাকাকালে ব্যাপক দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন বলেও আজম খান দাবি করেন।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে বড় দুর্নীতিবাজ আখ্যায়িত করে আজম খান বলেন, ‘মেইন হচ্ছেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি প্রথমেই বলেছেন রেলের কালো বিড়াল ধরা হবে। আমি দেখছিলাম যে, তিনি নিজেই কালো বিড়াল বনে গেছেন। তিনি নিজেই বড় দুর্নীতিবাজ। আজম জোর দিয়ে আবারও বলেন, ‘সবচেয়ে বড় দুর্নীতিবাজ তো তিনিই। তিনি মন্ত্রী হয়ে একটি মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে দুর্নীতি করলে দেশটা কীভাবে ভালো চলবে?’
সুরঞ্জিতের কালো বিড়াল কেলেঙ্কারি নিয়ে এখনও ব্যাপক সমালোচনা চলছে রাজনীতিসচেতন মানুষের মধ্যে। কালো বিড়াল প্যাঁচালি তাদের আলোচনার খোরাকও হয়েছে বটে!