Thursday, 3 October 2013

বেপরোয়া দুর্নীতির উপাখ্যান- ২ : ব্যাংক ডাকাতদের কাহিনী

ডাকাতদের কবলে পড়েছে গোটা ব্যাংকিং খাত। সরকারি আর বেসরকারি দুই খাতের ব্যাংকেই চলছে সমানতালে লুটপাট। তবে বেসরকারি ব্যাংকে লুটপাট কিছুটা আড়ালে-আবডালে হলেও সরকারি ব্যাংকে লুটপাট এখন ডাকাতির পর্যায়ে চলে গেছে। ব্যাংক ডাকাতরা প্রকাশ্যেই রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো লুটেপুটে গিলে খাচ্ছে। ব্যাংক লুটপাটের এক নজির সৃষ্টি হয়েছে বর্তমান সরকারের আমলে। লুটপাটের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, বেসিক, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের অবস্থা চরম নাজুক পর্যায়ে চলে গেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ও বেসিক ব্যাংকের ব্যবসা এখন প্রায় বন্ধ। লুটপাটের কারণে সাধারণ গ্রাহক যেমন মিলছে না, তেমনি ব্যাংক দুটি থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠান বা বিভিন্ন সংস্থার আমানতও পুরোপুরি উঠিয়ে নেয়া হচ্ছে। ফলে এ দুটি ব্যাংক বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির জন্ম হয় বর্তমান মহাজোট সরকারের সময়ে। সরকারের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালীদের সরাসরি যোগসাজশে এই খাত থেকে বিগত ৫ বছরে লুটে নেয়া হয়েছে প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা। হলমার্ক, বিসমিল্লাহ্ গ্রুপসহ বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় ব্যাংক ডাকাতির মতো ঘটনার কবলে পড়ে গোটা ব্যাংকিং খাতকে টালমাটাল অবস্থায় ফেলে দিয়েছে।

যেভাবে লুটপাটের আয়োজন
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরই সরকারের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালীদের নজরে পড়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। আর এসব ব্যাংক টার্গেটে নিয়ে বসানো হয় দলীয় লোক। ব্যাংকিং রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে অদক্ষ ও নন-ব্যাংকারদের হাতে তুলে দেয়া হয় রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, বেসিক, জনতা, রূপালী ও অগ্রণী ব্যাংকের দায়িত্ব। এতে সহজ হয় ঋণের নামে লুটপাটের পথ।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেশি লুটপাটের শিকার হয়েছে সোনালী, বেসিক ও জনতা ব্যাংক। এ তিনটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান-এমডিসহ পরিচালনা পর্ষদে অধিকাংশই দলীয় লোকদের বসানো হয়। বেসিক ব্যাংকের দায়িত্ব দেয়া হয় মহাজোটের অংশীদার জাতীয় পার্টির নেতা শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর হাতে। তিনি আবার শেখ হেলালের ঘনিষ্ঠ বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিচালকদের মধ্যে সরকারি ব্যাংকে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সাবেক ভিপি ছাত্রলীগ নেতা শুভাষ সিংহ রায়, সবুজ কানন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং মহিলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক জান্নাত আরা হেনরী, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও আইনজীবী বলরাম পোদ্দার, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও নির্মাণ ব্যবসায়ী শাহজাদা মহিউদ্দিন, যুক্তরাজ্য আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকির আহমেদ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য, বুয়েট ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক আবদুস সবুর, কলামিস্ট ও মণি সিংহ-ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্টের সম্পাদক শেখর দত্ত, নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া, কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য খন্দকার জাহাঙ্গীর কবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের সাবেক ভিপি কেএমএন মঞ্জুরুল হক প্রমুখ।

হলমার্কের কবলে সোনালী ব্যাংক
দেশের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী ব্যাংক হিসেবে খ্যাত সোনালী ব্যাংকের ব্যবসা সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। এরই মধ্যে এ ব্যাংকটির সঙ্গে লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছে বিশ্বের নামি-দামি সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় ব্যাংক মে ব্যাংক জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা আর সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা করবে না। একইভাবে চীন-জাপানসহ পৃথিবীর দেড় শতাধিক বড় ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একইভাবে দেশের ভেতরকার সব ব্যাংক একযোগে সোনালী ব্যাংকের এলসি নেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এরই মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালীসহ কয়েকটি ব্যাংক পাওনা টাকা ফেরত চেয়ে সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে লিগ্যাল নোটিশও পাঠিয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আমদানি-রফতানিতেও। শুধু তাই-ই নয়, বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও সোনালী ব্যাংকের এলসি গ্যারান্টি গ্রহণ করছে না বিদেশি রফতানিকারকরা।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরই হঠাত্ করে নাম-ডাক আসে হলমার্ক গ্রুপের। গত দু’বছরে প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে নানা ফন্দিফিকির ও জালিয়াতির মাধ্যমে ৩ হাজার ৮৬৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা লুট করে। গণমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। পরে সোনালী ব্যাংকের জড়িত কর্মকর্তা এবং হলমার্কের এমডি, চেয়ারম্যান ও মহাব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে হলমার্কের নামে লুটপাটে জড়িত আওয়ামী লীগের দলীয় লোকজন ও প্রভাবশালীদের সবাই এখন পর্যন্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে। ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর উল্টো স্বয়ং অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তদবির করেছেন হোতাদের রেহাই দিতে। শুধু তাই নয়, এত বড় লুটপাটের পর একই প্রতিষ্ঠানকে আরও ঋণ দেয়ার চেষ্টা-তদবিরও করেছিলেন অর্থমন্ত্রী।
মহাজোট সরকারের শীর্ষ মহলের সরাসরি হস্তক্ষেপে হলমার্ক গ্রুপ সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে। প্রতিষ্ঠানটি ঋণের বিপরীতে যে সম্পত্তি দেখিয়েছে, তা ভৌতিক। যেমন হলমার্ক গ্রুপ সোনালী ব্যাংকের কাছে যেসব জমি বন্ধক রেখেছে, তার বেশিরভাগই দেখানো হয়েছে সাভারের হেমায়েতপুরে। বন্ধক হিসেবে সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় ২১৪৩ শতাংশ জমির কাগজপত্র জমা দেয়া হয় ব্যাংকের কাছে। যার বাজারমূল্য ধরা হয়েছিল ২ হাজার কোটি টাকা। সে হিসেবে প্রতি শতাংশ জমির দাম ধরা হয়েছে ৯৩ লাখ ৩২ হাজার টাকা। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ এলাকার উঁচু জমির দাম সর্বোচ্চ শতাংশপ্রতি ৫ লাখ টাকা। ফলে সোনালী ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা জমির মূল্য বাজারদরের চেয়ে ১৯ গুন বেশি দেখিয়েছে হলমার্ক গ্রুপ। সোনালী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় দেখা যায়, হলমার্ক গ্রুপের কাছে ফান্ডেড ও ননফান্ডেড ১৫৫ কোটি টাকা বকেয়া থাকার পরও ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল পর্ষদের বৈঠকে ৬৫ কোটি টাকার মেয়াদি ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। আর এটি হয়েছিল সরাসরি আওয়ামী লীগের কয়েক প্রভাবশালী নেতার সহযোগিতায়। জানা গেছে, সোনালী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের সাড়ে ৩ গুন অর্থ আত্মসাত্ করেছে হলমার্কসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
জেল থেকে হলমার্কের শীর্ষ কর্তাদের ছাড়িয়ে আনতে সরকারের ভেতর থেকেই একটি মহল সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও এতে ওকালতি করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ২৮ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়ে হঠাত্ এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকেন অর্থমন্ত্রী। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের হলমার্ক বিষয়ে তার অবস্থান অনেকটা স্পষ্ট করেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৮২ সালে ১০ জন বড় ঋণখেলাপি ছিলেন। একেকজন পয়সা নিয়েছিলেন সাত থেকে আটটি ব্যাংক থেকে। কিন্তু তখন তা ফেরত দেওয়ার অবস্থা ছিল না তাঁদের। ঋণখেলাপিদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও দায় হিসাব করে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। হলমার্কের ক্ষেত্রে এরকম কিছু একটা হবে।’ ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, ‘হলমার্ক যে টাকা নিয়ে গেছে, তা জনগণের টাকা। এই টাকা উদ্ধার করতে হবে। উদ্ধারের জন্য দরকার কারখানা চালু। আর সেজন্যই ওদের দরকার আরও ঋণ।’ হলমার্ক নিয়ে যারা কথা বলছেন, তাদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার রয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
সোনালী ব্যাংকে লুটপাটের ঘটনায় কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে জানতে চাইলে দুদকের একটি সূত্র বলেছে, ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান কাজী বাহারুল ইসলামসহ ১০ জনের ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে। অন্যরা হলেন—সাবেক পরিচালক জান্নাত আরা হেনরী, শুভাষ সিংহ রায়, কাশেম হুমায়ুন, আনোয়ার শহিদ, এএসএম নায়েম, কেএম জামান রোমেল, সত্যেন্দ্র চন্দ্র ভক্ত, মো. শহিদুল্লাহ মিয়া ও সাইমুম সারোয়ার কমল।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, সোনালী ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় হলমার্ক ও সোনালী ব্যাংকের মোট ৭৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। গত বছর ৪ অক্টোবর এ জালিয়াতির প্রেক্ষিতে হলমার্কের তানভীর মাহমুদসহ ২৭ জনের বিরুদ্ধে ১১টি মামলা করে দুদক।
দুই এমপিপুত্রের সহযোগিতায় বিসমিল্লাহ্ গ্রুপ লুট করেছে ১২শ’ কোটি টাকা : হলমার্কের পর মহাজোট সরকারের আমলে ব্যাংকিং খাতে লুটপাটের ঘটনায় এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ‘বিসমিল্লাহ্ গ্রুপ’। প্রতিষ্ঠানটির দুই অবৈতনিক পরিচালক জামিল হাসান দুর্জয় ও মোহাম্মদ আলীর সহায়তায় ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণের নামে ১২০০ কোটি টাকা লুট করা হয়। এরই মধ্যে দুদক এই দুর্নীতির তদন্ত শুরু করেছে।
সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির কাছে এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন সাজ্জাদ হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী। তার অভিযোগে বলা হয়, হলমার্ক গ্রুপের পর বড় ধরনের ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত বিসমিল্লাহ্ গ্রুপ। এই গ্রুপটি জালিয়াতির মাধ্যমে ৬টি ব্যাংক থেকে ১২শ’ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এই কেলেঙ্কারির ঘটনার তদন্ত শুরু করলেও বর্তমান সরকারের আমলে তা শেষ হবে কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ওই ব্যবসায়ী।
জানা গেছে, বিসমিল্লাহ্ গ্রুপকে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ১২শ’ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ পেতে সহযোগিতা করেছে প্রতিষ্ঠানটির দুই অবৈতনিক পরিচালক গাজীপুরের শ্রীপুর এলাকার আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট রহমত আলীর ছেলে জামিল হাসান দুর্জয় ও আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত কুমিল্লার এক এমপির ছেলে মোহাম্মদ আলী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তদন্তে দেখা গেছে, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন পক্ষের যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বিসমিল্লাহ্ গ্রুপের মালিক খাজা সোলায়মান আনোয়ার চৌধুরী। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের প্রাইম ব্যাংক থেকেই বিসমিল্লাহ্ গ্রুপ হাতিয়ে নিয়েছে ৪১১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে জনতা ব্যাংকের শীর্ষ ব্যক্তিরাও জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ড. আবুল বারকাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমপি পুত্রদ্বয়ের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকার কথা জানিয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। ফলে বিসমিল্লাহ্ গ্রুপ সহজেই জনতা ব্যাংক থেকে এই বিপুল অঙ্কের অর্থ লুটে নেয়।
জনতা ব্যাংকে অভিনব জালিয়াতি : সরকারি জনতা ব্যাংকে লুটপাট শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবন্ধ থাকেনি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে জনতা ব্যাংকের শাখায় অভিনব উপায়ে অর্থ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। ব্যাংকটির দুবাই শাখায় কোনো হিসাব খোলার আগেই মেসার্স স্টিভেন ফ্রন্স গ্রোসারির নামে হিসাব নম্বর ব্যবহার করে ৯ লাখ ৫১ হাজার ডলারের (প্রায় ৯ কোটি টাকা) এলসি জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেবল কোম্পানিটির মৌখিক প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ওই এলসি খোলেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। পরে কোম্পানিটির রফতানি মূল্য বাবদ জমা হওয়া পাঁচ লাখ ১৮ হাজার ডলার আদায়ের সুযোগ থাকলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, ব্যাংকে স্টিভেন ফ্রন্সের কোনো সহায়ক জামানত না থাকায় ওই অর্থ আদায়ের আর কোনো সুযোগ নেই। এ অবস্থায় পুরোটাই জনতা ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রমাণ পেয়েছে, আমিরাতে জনতা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী এসব এলসি খোলা ও শিপিং ডকুমেন্ট পাঠাতে ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করেছেন। ওইসব জাল ডকুমেন্ট ইরানের ব্যাংক মিলিতে পাঠানো হয়। সেগুলো ভুয়া শনাক্ত হওয়ার পর ব্যাংকটি তা ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ফেরত পাঠায়। পরে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়টি তদন্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি দল সরেজমিন পরিদর্শনকালে অনিয়মের প্রমাণ পায়। এসব অনিয়মের তথ্য-্রপ্রমাণসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
প্রতিবেদনে এই অনিয়মকে ‘গুরুতর ও নজিরবিহীন আর্থিক অনিয়ম’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একইসঙ্গে ঘটনার জন্য জনতা ব্যাংকের আমিরাতের প্রধান নির্বাহী শফিকুল ইসলাম, দুবাই শাখার তত্কালীন শাখা ব্যবস্থাপক আবদুল মোমেন ও কর্মকর্তা শাহাবুদ্দিনকে দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে জনতা ব্যাংকের পৃথক তদন্তে শফিকুল ইসলামকে অভিযোগ থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আবুল বারকাতের মৌখিক নির্দেশে অভিযুক্ত এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে তদন্ত থেকে বাদ দেয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এই অনিয়মের সঙ্গে শফিকুল ইসলামের সম্পৃক্ত থাকার যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। আর জনতা ব্যাংকের তদন্ত দল প্রকৃত ঘটনার উল্লেখ না করে মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে অনিয়মের হোতাকে বাঁচানোর অপচেষ্টা করেছে।

বেসিক ব্যাংক
রাষ্ট্র খাতের বেসিক ব্যাংকে লুটপাট চলছে। কোনো নিয়মনীতি, বিধিবিধানের তোয়াক্কা করছে না ব্যাংকটির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। অন্তত সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা এই ব্যাংক থেকে জাল-জালিয়াতি, অনিয়ম করে বের করে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব কাজে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার যোগসাজশের বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনেও একাধিকবার উঠে এসেছে। যেমন গ্রাহক সম্পর্কে শাখা থেকে প্রধান কার্যালয়ে চিঠি দিয়ে লেখা হয়েছে, ‘তাদের ঋণ বা ক্রেডিট কমিটি ঋণ দিতে সম্মত নয়।’ তারপরও পরিচালনা পর্ষদ ঋণ অনুমোদন করেছে। আবার ঋণ প্রস্তাব শাখা থেকে পাঠানোর আগেই ঋণের অনুমোদন দেয়ারও উদাহরণ রয়েছে। এমনকি অনেক অস্তিত্বহীন, ভুয়া অর্থাত্ কাগুজে বা বেনামি প্রতিষ্ঠানকেও ঋণ দিয়েছে ব্যাংকের পর্ষদ। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর জাতীয় পার্টির নেতা শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে এই ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে বসানো হয়।
বছর পাঁচেক আগেও বেসিক ব্যাংক ছিল দেশের অন্যতম ভালো মানের ব্যাংক। কিন্তু নানা ধরনের অনিয়মের কারণে এখন ব্যাংকটির পরিস্থিতি নাজুক। বেসিক ব্যাংকের পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে আলোচনা চলছিল সেখানে প্রশাসক নিয়োগের। কিন্তু শীর্ষ পর্যায় থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বেসিক ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চে তা দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। অর্থাত্ চার বছর তিন মাসে ব্যাংকটি ছয় হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে, যার প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকাই নিয়ম ভেঙে দেয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে। এর মধ্যে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার অনিয়ম তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সার্বিক বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কাজী ফখরুল ইসলাম তাদের ব্যাংকের পরিস্থিতি ধারাবাহিকভাবে ভালো হচ্ছে বলে মত দেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ঋণ-আমানতের অনুপাত ৯০ শতাংশ থেকে কমে ৮১ শতাংশে চলে এসেছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের ভিত্তিতে বেসিক ব্যাংকে একটা বিশদ পরিদর্শন চালায়। সে সময় ব্যাংকের শান্তিনগর শাখায় ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঋণ হিসাব পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজের কম্পোজিট ঋণসীমা ১৫১ কোটি ৭৫ লাখ টাকার সহায়ক জামানত খুবই অপ্রতুল। লেনদেন অসন্তোষজনক হওয়া সত্ত্বেও অল্প সময়ের মধ্যে গ্রাহকের অনুকূলে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল ঋণ ছাড় করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণ ঋণ (এলটিআর) পুনঃ পুনঃ মেয়াদ বৃদ্ধির পরও অনাদায়ে মেয়াদি ঋণে পরিণত করা হয়েছে (৫০ কোটি টাকা), যার সন্তোষজনক মালামাল মজুত নেই। এরই মধ্যে মেয়াদি ঋণের কিস্তিও খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।’ ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজের মালিক ওয়াহিদুর রহমান।
পরবর্তী সময়ে জানা যায়, একই মালিকের অটো ডিফাইনের ঋণসীমা ১৬৩ কোটি টাকা। এই কোম্পানির ঋণ যেদিন (২০১০ সালের ২ নভেম্বর) অনুমোদন করা হয়, তার পরদিনই (৩ নভেম্বর) মালিকানা পরিবর্তন করা হয়। নতুন মালিক হন জনৈক আসমা খাতুন। এর কারণ হলো, দুই কোম্পানির মালিক একই ব্যক্তি হলে তাদের ঋণসীমা একক ব্যক্তি বা গ্রুপ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে। ফলে ব্যাংকের কর্মকর্তারা কৌশল শিখিয়ে এভাবে ঋণ দেন ওয়াহিদুর রহমানকে। দুটি ঋণই এখন খেলাপি।
পরে আবার গুলশান শাখা থেকেও ওয়াহিদুর রহমানকে ঋণ দেয়া হয়েছে নানা অনিয়ম করে। ওয়াহিদুর রহমানের বেনামি প্রতিষ্ঠান এবি ট্রেড লিঙ্ককে শাখা থেকে প্রস্তাব পাঠানোর আগেই প্রধান কার্যালয় থেকে ঋণের অনুমোদন দেয়া হয়। শাখা থেকে এবি ট্রেডের ঋণ প্রস্তাব পাঠানো হয় ২০১১ সালের ১২ সেপ্টেম্বরে আর পরিচালনা পর্ষদ ঋণটি অনুমোদন দেয় ৬ সেপ্টেম্বর।
গুলশান শাখায় মা টেক্স, এসপিএন ও ইএফএস এন্টারপ্রাইজের নামে মঞ্জুর করা ঋণের পরিমাণ ১৭২ কোটি টাকা। কাগুজে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী হচ্ছেন জনৈক শামীম চিশতি। ব্যাংক সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানগুলো ও তাদের হিসাব খুলতে যারা পরিচয়কারী ছিলেন, তাদের মধ্যে যোগসাজশ রয়েছে। এক ব্যক্তির ছবি একাধিক নাম দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিক বানানো হয়েছে। যেমন একই ব্যক্তির ছবি রয়েছে রেজকা শিপিং লাইন্সের মালিক জনৈক আবদুর রহমান ও এসপিএন এন্টারপ্রাইজের মালিক আবদুর রবের নামে। এরাই আবার একে অপরের পরিচয়কারী। এই প্রতিষ্ঠান তিনটিকে ঋণ দিতে ব্যাংকের গুলশান শাখা কোনো সুপারিশ করেনি। শুধু প্রস্তাবটি পাঠিয়ে দিলেই পরদিন পর্ষদ ঋণ অনুমোদন করে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৩ সালের শুরুতে ব্যাংকটির শান্তিনগর, দিলকুশা, গুলশান ও রাজশাহী শাখায় বিশেষ পরিদর্শন চালিয়েছিল। তারও আগে প্রধান কার্যালয়ে পরিদর্শন হয়েছে। আর নিয়মিত বিশদ পরিদর্শন চলেছে বছর বছর। সব ক্ষেত্রেই বড় বড় অনিয়ম ধরা পড়েছে। ব্যাংকটির অনিয়ম-দুর্নীতির পরিস্থিতি শুরুতেই সামাল দিতে না পেরে বছর তিনেক আগে তত্কালীন এমডি একেএম সাজেদুর রহমান ব্যক্তিগত ও শারীরিক অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে পদত্যাগ করেন।
বেসিক ব্যাংকের সংঘ স্মারকের ৪(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে ৫০ শতাংশ ঋণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে বিতরণের কথা। কিন্তু বেশিরভাগ ঋণই হচ্ছে বড় অঙ্কের। বেসিক ব্যাংকের গুলশান শাখা সূত্র জানায়, অনেকগুলো কোম্পানির চলতি হিসাব খোলার পর অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে ঋণ অনুমোদন করে পরিচালনা পর্ষদ। যেমন ২০১২ সালের ২ এপ্রিল শিফান শিপিং লাইন্স শাখায় চলতি হিসাব খোলে, ৪ এপ্রিল ঋণ প্রস্তাব দিলে পর্ষদ ৫ এপ্রিল তা অনুমোদন করে। শিফান শিপিং লাইন্সের ডিসেম্বরভিত্তিক স্থিতি ছিল ৫৮ কোটি দুই লাখ টাকা। এস সুহি শিপিং লাইন্স, ব্রাদার্স এন্টারপ্রাইজ, দিয়াজ হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ও এসজিএফ শিপিং লাইন্সের ঋণ প্রস্তাব যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ দেয়া হয়নি। শাখা সূত্রটি বলছে, তারা আসলে প্রধান কার্যালয়ের চাহিদা অনুসারে ঋণগুলোর প্রস্তাব তৈরি করে পাঠিয়ে দিয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক অদ্ভুত আচরণে সব ধরনের অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে বেসিক ব্যাংক। ব্যাংকের দিলকুশা, শান্তিনগর, গুলশান ও রাজশাহী শাখায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ধরা পড়েছে। এসব অনিয়মে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন দলকে কোনো ধরনের সহযোগিতা না করায় মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেছে তদন্ত। অবশেষে অনেকটা দায়সারা গোছের একটি চিঠি বেসিক ব্যাংকের অডিট কমিটির চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়েছে। এরপরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাড়া দেয়নি ব্যাংকটি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা গেছে, এ ব্যাংকের অধিকাংশ ঋণ বিতরণে বড় ধরনের অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। এসব অনিয়মের সঙ্গে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকার প্রমাণও পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এমনকি ঋণের একটি অংশ বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যম হয়ে চেয়ারম্যানের অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল ঘুষের টাকা স্থানান্তরে যেসব হাতবদল হয়েছে, সে চক্রের অনুসন্ধানে নামলে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে বাধা দেয়া হয়। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাকে একটি গোয়েন্দা সংস্থা ফোন করে বেসিক ব্যাংকের অনিয়মের অগ্রসর প্রতিবেদন দাখিল না করার জন্য সতর্ক করেছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এ প্রসঙ্গে বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফখরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ঋণ বিতরণে অনিয়মের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে আমরা একটি টিম গঠন করেছি। টিমটি এরই মধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে।
সূত্র জানায়, ব্যাংকের মাত্র তিনটি শাখা থেকে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। আর এসব ঋণের বেশিরভাগই অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে। গুলশান শাখা থেকে অনিয়মের মাধ্যমে এক হাজার ৬০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৬টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান, ৯টি প্রতিষ্ঠানের নামে অনুমোদনহীন ঋণসীমা প্রদান, ছয়টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এলসি না খুলে বিদেশে অর্থ পাচার, এলসির অর্থ ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পে-অর্ডার করে স্থানান্তর ও ভুয়া জামানতের মাধ্যমে ঋণ প্রদান। আর যেসব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণ দেয়া হয়েছে, তার বেশিরভাগই নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে দেয়া। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দিলকুশা শাখার মাধ্যমে ১৪০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণে অনিয়ম পেয়েছে। এসব ঋণ প্রদানে ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান, মর্টগেজ ছাড়াই ঋণ এবং উেকাচ গ্রহণের মাধ্যমে ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে।
এদিকে সরকারি ৫ ব্যাংকের কাছে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের দুই-তৃতীয়াংশ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, তহবিল ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ঋণ বিতরণের কারণে ব্যাংকগুলোর এই উদ্বেগজনক চিত্র। প্রতিবেদন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী, জনতা, অগ্রণী এবং বিশেষায়িত কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে রয়েছে সর্বাধিক খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিসেম্বর ২০১২ শেষে সামগ্রিক ব্যাংক খাতে ৪২ হাজার ৭২৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানার তিনটি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত দুটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৬২ দশমিক ৭০ শতাংশ।
এক বছরে ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি বেড়েছে ৭০ শতাংশ : ব্যাংকিং খাতে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি বৃদ্ধির হার অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবেই গত এক বছরে ব্যাংক সেক্টরে দুর্নীতি বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে অনিয়ম-দুর্নীতি জেঁকে বসেছে। ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও হয়রানির জন্য গ্রাহকদের অভিযোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে। গ্রাহকদের অভিযোগের শীর্ষে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক। এ তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে হলমার্ক কেলেঙ্কারির জননী সোনালী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাস্টমার সার্ভিসেস ডিভিশনের ২০১২-১৩ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১-১২ অর্থবছরে গ্রাহকরা মোট ২ হাজার ৫২৬টি অভিযোগ করেছিলেন। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছিল ২ হাজার ৩৭০টি। অর্থাত্ নিষ্পত্তির হার ছিল ৯৩ দশমিক ৮২ শতাংশ। আর বিদায়ী ২০১২-১৩ অর্থবছরে গ্রাহকদের মোট অভিযোগ এসেছে ৪ হাজার ২৯৬টি। যার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ২ হাজর ৯৪১টি। অর্থাত্ মোট নিষ্পত্তির হার ৬৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
হিসাবমতে, গত অর্থবছরের আগের অর্থবছরের তুলনায় অভিযোগ বেড়েছে ১ হাজার ৭৭০টি। কিন্তু অভিযোগ নিষ্পত্তির হার কমেছে। গত বছরে তার আগের তুলনায় অভিযোগ নিষ্পত্তির হার ২৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ কমেছে।
এছাড়া ২০১১ সালের ২৮ মার্চ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে সর্বমোট ৭ হাজার ১৪৪টি অভিযোগ এসেছে। যার মধ্যে এখনও ১ হাজার ৫৪৭টি অভিযোগের কোনো সুরাহা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে। যা মোট অভিযোগের ৪৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ। তার পরের অবস্থানে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ৪ বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৩৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ। এছাড়া বিশেষায়িত ৪ ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১৪ দশমিক ০৫ শতাংশ, বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৩ দশমিক ০২ শতাংশ এবং ব্যাংক ব্যতীত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দশমিক ১৫ শতাংশ অভিযোগ এসেছে।
তবে প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৩০টি বেসরকারি ব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ৪৪.৮৩ শতাংশ; কিন্তু সরকারি মাত্র ৪টি ব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রায় ৩৮ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির শীর্ষে রয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংক। ব্যাংটির বিরুদ্ধে অভিযোগের সংখ্যা ৫৯৪টি। এর মধ্যে ২৯২টি অনিষ্পন্ন রয়েছে। ব্যাংকটির অভিযোগ নিষ্পন্নের হার মাত্র ৫০.৮৪ শতাংশ। অভিযোগের দ্বিতীয় স্থানে থাকা জনতা ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৩২৮টি ও তৃতীয় থাকা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের বিরুদ্ধে ২৯৬টি অভিযোগ রয়েছে।
বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর শীর্ষে রয়েছে প্রাইম ব্যাংক এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের বিরুদ্ধে অধিক পরিমাণ অভিযোগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা পড়েছে। প্রাইম ব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে ১৩৩টি, যার মধ্যে ৯৩টি এখনও অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে।
গ্রাহকদের অভিযোগের শীর্ষ ১০ ব্যাংকের মধ্যে ৬টিই সরকারি ব্যাংক। ৪টি বেসরকারি ব্যাংক হচ্ছে—প্রাইম, যমুনা, ইসলামী ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, ব্যাংকের প্রকৃত মালিক হলেন গ্রাহকরা। সুতরাং তাদের অভিযোগ ব্যাংকগুলোকে শুনতে হবে। তাদের দিকে নজর দিতে হবে। ব্যাংকগুলোকে গ্রাহক সেবার মান বাড়াতে হবে।
তিনি আরও বলেন, গত চার বছরে ৫৬ শতাংশ ব্যাংক হিসাব বেড়েছে। বাকি ৪৪ শতাংশ ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার জন্য তিনি ব্যাংকারদের প্রতি আহ্বান জানান। এছাড়া ব্যাংকের গ্রাহক সন্তুষ্টিকে ক্যামেলস রেটিংয়ে অন্তর্ভুক্ত করে ব্যাংকগুলোর মান নির্ধারণ করার কথা বলেন তিনি।