Thursday, 3 October 2013

বেপরোয়া দুর্নীতির উপাখ্যান- ১ : শেয়ারবাজার লুটপাট

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের বেপোরোয়া দুর্নীতির এক নিষ্ঠুর উপাখ্যান শেয়ারবাজার লুটপাট। ক্ষমতাসীন দলের লুটেরারা শেয়ারবাজারে কারসাজি করে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা গ্রাস করে নিয়ে গেছে। এই টাকার বেশিরভাগই পাচার হয়ে গেছে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারের ৩৩ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী তাদের পু্ঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। তাদের হাহাকারে সারাদেশ স্তম্ভিত। তবে লুটেরারা নির্বিকার। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার ঠিক দুই বছরের মাথায় শেয়ারবাজারে লুটপাটের এ ঘটনা ঘটে। লুটপাটের সঙ্গে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা সালমান এফ রহমান, মন্ত্রী ফারুক খান, লোটাস কামালসহ সরকারের ঘনিষ্ঠজন জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। দেশের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে দু’বার কেলেঙ্কারি আর লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। আর দুটি ঘটনাই ঘটেছে আওয়ামী লীগের শাসনামালে। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে নিয়ে গেছে আওয়ামী লীগের লুটেরা গোষ্ঠী। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর তারা লুটপাটের কলঙ্কের দাগ মোছনের কোনো চেষ্টা তো করেইনি; বরং ১৯৯৬ সালের চেয়ে আরও বড় ধরনের কেলেঙ্কারি আর লুটপাটের রেকর্ড গড়েছে আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬ সালের মতো এবারও লুটপাটকারীদের কোনো ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি। তারা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। দেশের শেয়ারবাজারে এতো বড় লুটপাট ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটলেও আওয়ামী লীগের আজ্ঞাবাহী দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করেছে।

আওয়ামী লীগের লোকেরাই শেয়ারবাজারে লুটপাটের সঙ্গে জড়িত :
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে শেয়ারবাজারে সাধারণ মানুষকে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করা হয়। সাধারণ মানুষ না বুঝেই এ পাতা ফাঁদে পা দেয়। শেষ পর্যন্ত লুটপাটকারীরা নানা উপায়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুঁজির সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যায়। এ লুটপাটে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা জড়িত ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। তারা বলেন, ১৯৯৬ সালে যারা লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ছিল, এবারও তারা এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এবার নতুন করে আরও অনেকে যুক্ত হয়েছেন। তবে লুটপাটের সঙ্গে যারাই যুক্ত ছিলেন তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। লুটপাটের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততার বিষয়টি দলটির অনেক নেতাও স্বীকার করেছেন।
২০১১ সালের ২৩ মে সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য শেখ সেলিম বলেন, আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার জন্য আওয়ামী লীগ নামধারী কিছু লোক এ কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছে। দু’-একজনের জন্য সরকার বা আওয়ামী লীগ তার দায় নেবে না।’ তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ নামধারী কিছু লোক শেয়ারবাজারের এ অবস্থা করেছে। ১৯৯৬ সালেও এমন হয়েছিল। তখনও ব্যবস্থা নেবো-নিচ্ছি করতে করতে পুরো দায় আওয়ামী লীগের ওপর পড়েছিল।’ আওয়ামী লীগের আরেক সংদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একই আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘শেয়ারবাজার কারসাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ধরতে হলে অর্থমন্ত্রীকে সর্ষের মধ্যেই ভূত খুঁজতে হবে। শেয়ারবাজার ঘটনায় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সর্ষ দিয়ে ভূত তাড়ানো যাবে না। কারণ, ‘ভূত সর্ষেতেই আছে। তিনি আরও বলেন, শেয়ারবাজার কারসাজির ঘটনায় কোথায় দরবেশ, কোথায় ইমাম, কোথায় মোয়াজ্জেম আছে খুঁজে বের করুন।’
বহুল আলোচিত, সমালোচিত সালমান এফ রহমান শেয়ারবাজারে ‘দরবেশ’ নামেই পরিচিত। তার শ্বেতশুভ্র দাড়ি এবং ধবধবে সাদা পোশাক-পরিচ্ছদের কারণে তিনি এ নামে পরিচিত। সালমান এফ রহমান আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা।
অবশ্য শেয়ারবাজার লুটপাটে বিএনপির লোকেরা জড়িত বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অভিযোগ করে বক্তব্য দিলেও আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য আ হ ম মোস্তফা কামাল প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যটি রাজনৈতিক।’ অর্থাত্ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের বিরোধিতা করে আ হ ম মোস্তফা কামাল প্রকারান্তে বলে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের লোকেরাই শেয়ারবাজার লুটপাটের সঙ্গে জড়িত। আর এ কারণেই লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের কোনো ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

আওয়ামী লীগ নেতাদের কয়েকটি কোম্পানির দুর্নীতি ও লুটপাটের চিত্র :
শেয়ারবাজার লুটপাটে আওয়ামী লীগের লুটেরাগোষ্ঠীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতার কোম্পানি নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে গেছে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া তো দূরেই থাকুক; বরং নানা আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে সেসব অনিয়মগুলোকে বৈধতা দিয়েছে। বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী ফারুক খানদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপ, সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো, অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য আ হ ম মোস্তফা কামালের মালিকানাধীন সিএমসি কামাল টেক্সটাইল মিলস নানা অনিয়ম আর কারসাজির মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বলে বড় ধরনের অভিযোগ রয়েছে।
‘সরাসরি তালিকাভুক্তি’র মাধ্যমে বেসরকারি কোম্পানির পরিচালকরা শেয়ারবাজার থেকে অর্থ তুলে নিজেদের পকেট ভারি করে থাকেন বিধায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে বিএসইসি এ পদ্ধতিটি বাতিল করে দেয়। কিন্তু এরপরও নিয়ম বহির্ভূতভাবে তত্কালীন বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খানের (পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী) পারিবারিক প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপের কেপিসিএল এবং ওসিএলকে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ দেয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বিএসইসিকে সুপারিশ করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশক্রমে কোনো ধরনের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই কোম্পানি দুটিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেয় বিএসইসি। শেয়ারের প্রিমিয়াম নির্ধারণে ব্যবহার করা হয় বুকবিল্ডিং পদ্ধতি। এ পদ্ধতিটি ব্যবহার করে মূলত কারসাজির মাধ্যমে অযৌক্তিক প্রিমিয়াম নির্ধারণ করে কোম্পানি দুটো। আর অযৌক্তিক দরেই কোম্পানি দুটিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেয় বিএসইসি। ১০ টাকা অভিহিত দরের কেপিসিএলের শেয়ারের প্রিমিয়াম ধরা হয় ১৮৪ টাকা। সে হিসাবে প্রতিটি শেয়ারের ওসিএলের ১০ টাকার শেয়ারের দর নির্ধারণ করা হয় ১৪৫ টাকায়। এর মাধ্যমে কেপিসিএল এবং ওসিএলের পরিচালকরা শেয়ারবাজার থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।
ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর করার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের টাকা হাতিয়ে নেয় সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপের বেক্সটেক্স কোম্পানি। কোম্পানির ২০০৮ সালের ব্যালেন্সশিট অনুযায়ী ৪৫৩ কোটি টাকার ঋণ ছিল। পরবর্তীতে ঋণের বিপরীতে ৬৫৩ কোটি টাকার নতুন শেয়ার ইস্যু করা হয়। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ২২ টাকা প্রিমিয়াম ধরা হয়। ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর করে আবার সেই শেয়ারকে প্রিমিয়ামে বিক্রি করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে কোম্পানিটি। এ অনিয়মের বিষয়ে যাতে ভবিষ্যতে প্রশ্ন তোলা না যায় তারই অংশ হিসেবে বেক্সটেক্স কোম্পানিকে বেক্সিমকোর সঙ্গে মার্জ করা হয়েছে।
হিসাব জালিয়াতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য আ হ ম মোস্তফা কামালের মালিকানাধীন সিএমসি কামাল টেক্সটাইল মিলস। এ কোম্পানিটি প্রিমিয়াম মূল্যে রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ৬৬ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা এ কোম্পানিটিকে হঠাত্ করেই ২০০৯ সালে লাভজনক কোম্পানি হিসেবে দেখানো হয়। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে হিসাব জালিয়াতির মাধ্যমে কোম্পানির আর্থিক হিসাব বিবরণী পাল্টে দিয়ে প্রিমিয়াম মূল্যে রাইট শেয়ার ইস্যুর অনুমোদনে আবেদন করে। কিন্তু হিসাব জালিয়াতি করেও প্রিমিয়াম মূল্যে রাইট শেয়ার ইস্যুর শর্ত পূরণ করতে পারেনি সিএমসি কামাল টেক্সটাইলস মিলস। পূর্ববর্তী ৩ বছরে কোনো কোম্পানি লোকসানে থাকলে প্রিমিয়াম মূল্যে রাইট শেয়ার ইস্যু করতে পারে না। কিন্তু সিএমসি কামাল টেক্সটাইলস মিলস ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে সাড়ে ৭ টাকা প্রিমিয়ামে বাজার থেকে অর্থ তুলে নিয়েছে। অর্থমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে রাইট শেয়ার ইস্যুর অনুমোদন করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া পরিকল্পিতভাবে সিএমসি কামাল টেক্সটাইলস মিলসের মূল্য সংবেদনশীল নানা ধরনের তথ্য প্রচার করে কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়িয়ে অত্যন্ত চড়া দরে বোনাস শেয়ার বিক্রি করে আ হ ম মোস্তফা কামাল এবং তার পরিবারের সদস্যরা কোটি কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নিয়ে গেছেন।
এছাড়া কোনো নিয়মনীতি না থাকা সত্ত্বেও বিএসইসি ২০১০ সালে ৮টি কোম্পানিকে অগ্রাধিকার শেয়ার ছাড়ার অনুমোদন দেয়। এসব কোম্পানি অগ্রাধিকার শেয়ারের মাধ্যমেও হাজার কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নেয়। অগ্রাধিকার শেয়ার ছেড়ে অর্থ সংগ্রহকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে শেখ হাসিনার অন্যতম উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন কোম্পানি বেক্সিমকো ফার্মা। ফারুক খানদের পাবিরাবিক কোম্পানি সামিট পাওয়ার। এভাবে শেখ হাসিনার আমলে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে জড়িতরা শেয়ারবাজার থেকে নানা উপায়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এসব অপকর্মের হোতারা রয়ে গেছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

লুটপাটের নানা উপায় :
শেয়ারবাজারকে পরিকল্পিতভাবে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলার পর নানা উপায়ে শেয়ারবাজারে লুটপাটের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। শেয়ারের প্রচুর চাহিদা থাকার কারণে মাত্রাতিরিক্ত প্রিমিয়ামের মাধ্যমে কোম্পানির আইপিও, রাইট শেয়ারের অনুমোদন, কোনো ধরনের নিয়মনীতি ছাড়াই অগ্রাধিকার শেয়ার, মূলধন বাড়ানোর নামে প্রাইভেট প্লেসমেন্ট শেয়ারের বাণিজ্য গড়ে ওঠে। প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রির শক্তিশালী কয়েকটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়। সিন্ডিকেট চক্রগুলোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুরু করে সামরিক, আধা-সামরিক, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জড়িয়ে পড়েন। সারাদেশে প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রির কার্ব মার্কেট গড়ে ওঠে। নাম সর্বস্ব অনেক কোম্পানির শেয়ারও প্লেসমেন্টের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে। প্লেসমেন্টের মাধ্যমে শেয়ার বিক্রি করে সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন জিএমজি এয়ার লাইন্স সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এরই মধ্যে জিএমজি এয়ার লাইন্স তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে। এ কোম্পানিটি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের টাকা নিয়ে সটকে পড়েছে। এভাবে আরও অনেক কোম্পানি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্লেসমেন্টের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। কিন্তু যারা এভাবে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে তাদের কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শুরু হয় লুটপাটের আয়োজন :
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই ১৯৯৬ সালে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতরা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রেসিডেন্ট হন শেয়ারবাজারে বহুল বিতর্কিত ও আলোচিত রকিবুর রহমান। ১৯৯৬ সালের কেলেঙ্কারির ঘটনার অন্যতম অভিযুক্ত হিসেবে তিনি ব্যাপকভাবে আলোচিত। শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ ও শেখ হাসিনার বিশেষ আস্থাভাজন রকিবুর রহমান ডিএসইর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। রকিবুর রহমান ‘শেখ রাসেল শিশু-কিশোর’ নামে একটি সংগঠনের প্রেসিডেন্টও বটে। আর তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরই শুরু হয় শেয়ারবাজার ঘিরে নানা পরিকল্পনা। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথম বছর (২০০৯ সালে) সাধারণ মানুষদের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগী আগ্রহী করে তুলতে নেয়া হয় নানা উদ্যোগ এবং তার পরের বছর অর্থাত্ ২০১০ সালে শুরু হয় শেয়ারবাজার লুটের ঘটনা। নানা উপায়ে, আইনের দুর্বলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ও কারসাজির মাধ্যমে লুটপাট করা হয় শেয়ারবাজার। আর এ জন্য পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসির) চেয়ারম্যান পদে বসানো হয় ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল হক খন্দকারকে। রকিবুর রহমানসহ শেয়ারবাজারে আওয়ামী লীগের কারসাজির সিন্ডিকেটের তদবিরের জোরে তিনি এসইসি (বর্তমানে বিএসইসি) চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পান। এসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে তার দক্ষতা ও যোগ্যতা ছিল প্রশ্নসাপেক্ষ। মূলত জিয়াউল হক খোন্দকারের এসইসি চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ ছিল শেয়ারবাজারে কারসাজির পরিকল্পনারই একটি অংশ।
শেয়ারবাজারে ভয়াবহ ধসের পর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি শেয়ারবাজারে নানা অনিয়মের জন্য এসইসি চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খোন্দকারকে দায়ী করে তার অপসারণের সুপারিশ করে। অপরদিকে রকিবুর রহমান ও সালমান এফ রহমান পুঁজিবাজার লেনদেন ও প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে। এ থেকে স্পষ্ট আওয়ামী লীগের একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী শেয়ারবাজার থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ লুট করে নিয়েছে।

শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী বিনিয়োগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা :
সাধারণ বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বেড়ে যাওয়ায় শেয়ারবাজারে তারল্য প্রবাহ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। তবে শেয়ারবাজারে তারল্য বৃদ্ধিতে ব্যাংকগুলোর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজারে তার আমানতের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারে। কিন্তু ব্যাংকগুলো সে নিয়মের তোয়াক্কা না করে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত অর্থ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে। নির্ধারিত সীমার দুই থেকে ৩ গুণ বেশি অর্থও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে। এমনকি কলমানি মার্কেটের টাকাও শেয়ারবাজারে খাটাতে থাকে ব্যাংকগুলো। ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত বিনিয়োগের বিষয়টি জানা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। আওয়ামী লীগের মদতপুষ্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান রাজনৈতিক কারণেই ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেননি। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত বিনিয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক শুরু থেকেই কঠোর অবস্থান নিলে শেয়ারবাজারে এত তারল্য প্রবাহ তৈরি হতো না এবং বাজারেও ধস নামতো না। শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত বিনিয়োগ কারসাজির একটি অংশ বলে অনেকে ধারণা করছেন।
শুধু বাণিজ্যিক ব্যাংকই নয়, মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলো শেয়ার ক্রয়ে আগ্রাসী অর্থায়ন শুরু করে। একই সঙ্গে একের পর এক মিউচুয়াল ফান্ডের অনুমোদন দিয়ে বাজারে তারল্যের জোয়ার বইয়ে দেয়ার বিষয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও (বিএসইসি) বিশেষ ভূমিকা পালন করে। গ্যাস, বিদ্যুত্ ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে শিল্প বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে শিল্পোদ্যোক্তারাও পুঁজিবাজারে অর্থ বিনিয়োগ শুরু করে। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে শিল্পঋণ, এসএমই ঋণের একটি বড় অংশ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেন তারা। ফলে শেয়ারবাজারে তারল্যের স্রোত বয়ে যায়।

চাহিদা ও সরবরাহে ভারসাম্যহীনতা তৈরির মাধ্যমে লুটপাট :
মূলত শেয়ারের লুটপাটের আয়োজনটি হয়েছে শেয়ারের চাহিদা এবং জোগানের মধ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করার মাধ্যমে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি ব্যাংকের মাত্রাতিরিক্ত বিনিয়োগের ফলে শেয়ারবাজারে যখন তারল্য প্রবাহ বেড়ে যায় তখন স্বাভাবিকভাবেই শেয়ারের চাহিদাও তৈরি হয়। কিন্তু এ চাহিদা অনুযায়ী শেয়ার সরবরাহ না বাড়িয়ে বরং কোম্পানির তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে নানা ধরনের শর্তজুড়ে দেয় বিএসইসি। ৪০ কোটি টাকা কমমূল্যের পরিশোধিত মূল্যের কোম্পানির শেয়ার বাজারে তালিকভুক্ত না করার বিষয়ে বিএসইসি সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে অনেক কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারেনি। অপরদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ২৬টি কোম্পানির শেয়ার ছাড়ার জন্য সময়সীমা বেধে দিয়েও একটি কোম্পানির শেয়ারও বাজারে ছাড়া হয়নি। ফলে বাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে কিছু কিছু কোম্পানির শেয়ারের দর ৫০০ থেকে ৮০০ শতাংশ বেড়ে যায়। এর মধ্যে স্বল্পমূলধনী, দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলো ছিল মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায়। মূলত কারসাজিচক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বাজার। নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বরং কারসাজিচক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। বিএসইসির তত্কালীন চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খোন্দকারসহ আরও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্লেসমেন্টের শেয়ার বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে।
বাজার অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে শেয়ারবাজার থেকে অতিরিক্ত বিনিয়োগ সরিয়ে নেয়ার জন্য ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের সময়সীমা বেধে দেয়। এছাড়া একক গ্রাহক হিসেবে অতিরিক্ত ঋণ সমন্বয়েরও সময় বেধে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ফলে ২০১০ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে ব্যাংকগুলো তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার শুরু করলে কারসাজিচক্রের হোতারাও শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে সরে যেতে থাকে। এতে শুরু হয় শেয়ারাবাজারে ধস। গত আড়াই বছরে নানা উদ্যোগ নিয়েও ধসে ঠেকানো যায়নি। শেয়ারবাজার এখন তলানিতে এসে দাঁড়িয়েছে।

শেয়ারবাজারে লুটপাটে নিঃস্ব বিনিয়োগকারীরা :
শেয়ারবাজারে লুটপাটে নিঃস্ব হয়ে গেছে শেয়ারবাজারের ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারী। ১৯৯৬ সালের পুনরাবৃত্তি হবে না, এমন আশ্বাস দিয়ে সাধারণ মানুষকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করে অবশেষে তার চেয়ে আরও বড় কেলেঙ্কারির মাধ্যমে তাদের সব পুঁজি লুটে নিয়েছে আওয়ামী লীগের লুটেরা গোষ্ঠী। লাভের আশায় সাধারণ মানুষ সঞ্চিত অর্থের পাশাপাশি, বিভিন্ন উত্স থেকে ধার করে, জায়গা জমি বিক্রি কিংবা লিজ দিয়ে, স্ত্রীর অলঙ্কার বিক্রি করে, ব্যবসার মূলধন ভাঙিয়ে শেয়ারাবাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু লাভ তো দূরেই থাকুক পুঁজিটুকুও তারা ফিরে পাননি। আর পুঁজি হারিয়ে মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন রনি জামান, হাবিবুর রহমান যুবরাজ, দিলদার হোসেন নামে কয়েকজন বিনিয়োগকারী। হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন মিল্লাত হোসেন, রতন চৌধুরীসহ নামা না জানা আরও কয়েকজন বিনিয়োগকারী। শেয়ারবাজারে সর্বস্ব খুইয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন অনেক বিনিয়োগকারী। এক কথায় বিনিয়োগকারীদের পারিবারিক জীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে