Wednesday, 23 October 2013

সৌদি গেজেটের প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারে অনুসন্ধানী সক্ষমতা নেই বাংলাদেশের

মানবজমিন ডেস্ক: আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করার ক্ষেত্রে অনুসন্ধানী সক্ষমতা নেই বাংলাদেশের। এখানে নেই স্বাধীন বিচার বিভাগ। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধে যে আদালতে বিচার হচ্ছে তাতে যে আইন ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে না। সিয়েরা লিয়নে যে স্পেশাল কোর্ট গঠন করা হয়েছিল এবং এমন আরও যেসব আদালত গঠন করা হয়েছিল তার মতোও নয় এটা। এতে পরিষ্কার যে, বাংলাদেশ সরকার নির্যাতিতদের কাছে ন্যায়বিচার দেয়ার লক্ষ্যে এই আদালত গঠন করেনি। তারা এটা করেছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে টার্গেট করে। গতকাল সৌদি আরবে রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র সৌদি গেজেটে প্রকাশিত এক মন্তব্য প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। ‘ইন্টারন্যাশনালাইজিং দ্য ওয়্যার ক্রাইমস ট্রাইবুনাল অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি লিখেছেন ড. আলী আল গামদি। তিনি সৌদি আরবের একজন সাবেক কূটনীতিক। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুপরিচিত। তিনি বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে উল্লিখিত প্রতিবেদনে লিখেছেন, এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘের উচিত বাংলাদেশের বিচারকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।
বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইবুন্যালকে পুনর্গঠন করা উচিত এবং এরই মধ্যে যেসব মামলার শুনানি হয়ে গেছে তা পর্যালোচনা করা উচিত। ওই প্রতিবেদনে আলী গামদি লিখেছেন, সিয়েরা লিয়নের স্পেশাল কোর্টের প্রধান প্রসিকিউটর ছিলেন স্যার ডেসমন্ড ডি সিলভা। তিনি একটি গবেষণাপত্র প্রস্তুত করেছেন। তাতে ডি সিলভা বলেছেন, সহিংস ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম। অনেকের হিসাব মতে, প্রায় ৩০ লাখ মানুষ নিহত হন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে। রুয়ান্ডায় গণহত্যা, ১৯৯০-এর দশকে বসনিয়া যুদ্ধ, সিয়েরা লিয়নে গৃহযুদ্ধ এবং লাইবেরিয়ায় গৃহযুদ্ধে সব মিলিয়ে যে পরিমাণ মানুষ নিহত হয়েছে তার চেয়েও বাংলাদেশে নিহতের ওই সংখ্যা অনেক বেশি। ডি সিলভা তার গবেষণায় বলেছেন, বাংলাদেশে গণহত্যা চালানো হয়েছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। নির্যাতিত ও ঘাতকরা এখনও বেঁচে আছে। তিনি লিখেছেন, সিয়েরা লিয়নে স্পেশাল কোর্টে বিচার হয়েছে লাইবেরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট চার্লস টেলরের। সেই বিচারে ডি সিলভা ছিলেন প্রধান প্রসিকিউটর। চার্লস টেলরের বিচার থেকেই প্রমাণিত হয়েছে, যে ব্যক্তি, তিনি যত বড়ই হন না কেন, মারাত্মক অপরাধ সংঘটিত করেছেন তার বিচার করতে আন্তর্জাতিক আইন মানতে হবে। তবে সেখানে বিচারক হতে হবে পক্ষপাতহীন ও স্বাধীন। স্যার ডেসমন্ড ডি সিলভা একজন সুপরিচিত প্রসিকিউটর। তিনি বলেছেন, ২০১০ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক রাষ্ট্রদূত স্টিফেন র‌্যাপ-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তার কাছে তিনি জানতে চান বালাদেশে স্থানীয়ভাবে যে  ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করা হয়েছে তা কি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে কিনা। জবাবে আইন ও নতুন এই আদালতের বিধিমালা পর্যালোচনা করে তিনি বললেন, হয়নি। এ কথাটি বলে আসছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা। এ ঘটনায় গভীর হতাশা প্রকাশ করেন ডি সিলভা। স্বাধীনতার বিরোধীদের যখন বিচার চলছে তখন বাংলাদেশের ক্ষমতায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। এ সরকারে যারা রয়েছেন তারা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন এমন ব্যক্তিদের উত্তরাধিকারী। ডি সিলভা জোর দিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশের ভেতরে ও বাইরে অনেক মানুষের কাছে এটা পরিষ্কার যে, বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধাপরাধ আদালত গঠন করেছে নির্যাতিতদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নয়, বিরোধী রাজনৈতিক দলকে টার্গেট করে। এক্ষেত্রে তিনি গত ডিসেম্বরে বৃটিশ ম্যাগাজিন ইকোনমিস্টে স্কাইপ কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। এ ক্ষেত্রে ডি সিলভা সুষ্ঠু বিচারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের মতো বিশ্বশক্তি ও জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানান। বলা হয়, তাদের উচিত বাংলাদেশের এ বিচারকে আন্তর্জাতিকীকরণের জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। এ বিচার পর্যালোচনার প্রয়োজন। যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পুনঃবিচার করার নির্দেশ দেয়া উচিত। আন্তর্জাতিকীকরণ করা আদালতে নিশ্চিত করা হবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, যথাযথ তদন্ত করতে হবে এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ হাজির করা হবে। এতে উভয় পক্ষই ন্যায়বিচার পাবে। যদি তা করা না হয় তাহলে বর্তমানে যে রাজনৈতিক আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আছে তাতে আরও সহিংসতা বাড়বে, বিভক্তি বাড়বে। বাংলাদেশ যদি তার ক্ষত সারিয়ে উঠতে চায় তবে দুই পক্ষের জন্যই ন্যায়বিচার করতে হবে। তাদেরকে বেদনাদায়ক অতীত থেকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে সরে আসা উচিত। আলী আল গামদি লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। তার প্রতি আমার আহ্বান কেউই বিচারের এই বিষয়টিকে যেহেতু বিশ্বাসযোগ্য মনে করে না তাই এর পুনর্বিবেচনা করা দরকার। কারণ, এ বিচারে অনেকে বিশ্বাস স্থাপন করে না। এটা পরিষ্কার যে, এতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে না।