Thursday, 10 October 2013

মেয়াদজুড়ে হত্যা

গণহত্যার মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগ সরকার মেয়াদ শেষ করেছে। পাঁচ বছরে দেশে এমন বহু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে যার ভয়াবহতা বর্ণনা করলে শিউরে উঠতে হয়। পিলখানায় বিডিআর ট্র্যাজেডি থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গণহত্যার মতো নৃশংস ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে আর ঘটেনি। সরকারের শুরু থেকেই পুরো মেয়াদজুড়ে বিরোধী নেতাকর্মীদের দমন-পীড়নে নির্বিচারে চালানো হয় গুলি। গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধী মত দমনে স্বৈরতান্ত্রিক স্টাইলে ব্যবহার করা হয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে। বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ঠেকাতে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হয় মানুষ। প্রতিবাদ করলেই জেল-জুলুম-হুলিয়ার খড়গ নেমে এসেছে। বিরোধী দলের প্রথম, দ্বিতীয় সারি ছাড়াও তৃতীয় সারির নেতাদের পর্যন্ত জেলবন্দি করে রিমান্ডে এনে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে নির্যাতন চালানো হয়। মেয়াদজুড়েই দেশের মানচিত্র সিক্ত হয় মানুষের তাজা রক্তে।
পিলখানায় ৫৭ চৌকস সেনা কর্মকর্তাকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করা হয়। এদের অনেকের লাশ পচে-গলে বীভত্স হয়ে যায়। স্যুয়ারেজ লাইনে লাশ ভাসিয়ে দেয়া হয় বুড়িগঙ্গা নদীতে। গণকবর দেয়া হয় তখনকার বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ আরও অনেক পদস্থ সেনা কর্মকর্তাকে।
এদিকে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পর অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে সারাদেশ। সাঈদীর মুক্তির দাবিতে রাস্তায় নেমে আসা ইসলামপ্রিয় নারী-পুরুষসহ সাধারণ জনগণের ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস ও বর্বর কায়দায় হত্যাযজ্ঞ চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পাখির মতো গুলি করে মানুষ হত্যা করা হয়। আল্লামা সাঈদীর রায় ঘোষণার পর সারাদেশে একটানা ১৫ দিন ধরে চলতে থাকা গণবিস্ফোরণ ঠেকাতে বিজিবি ছাড়াও কোথাও কোথাও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে খুন হয়
দেড় শতাধিক মানুষ। অন্যদিকে পবিত্র ইসলাম ধর্মের অবমাননাকারী নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাদরাসা শিক্ষক, ছাত্র, মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন থেকে শুরু করে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ ইসলাম অবমানকারীদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এ সময় র্যাব-পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে আহত হয়েছে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ।
অন্যদিকে দেশের প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ, আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখদের সমন্বয়ে গঠিত ‘হেফাজতে ইসলাম’ নামে অরাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে আসেন মুসল্লিরা। ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি পালনের পর হেফাজতে ইসলামের মুসল্লিরা রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান করলে ঘুমন্ত মুসল্লিদের ওপর পৈশাচিক কায়দায় গুলি চালায় পুলিশ, র্যাব, বিডিআরের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী। গভীর রাতে পুরো মতিঝিল এলাকায় বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে যৌথবাহিনীর নির্বিচার গুলি ও বোমা বিস্ফোরণ এবং বেধড়ক পিটুনিতে প্রাণ হারান বহু ইসলামপ্রিয় মানুষ। হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাদের দুই থেকে আড়াই হাজার লোক নিহত হয়েছেন। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে হেফাজতের দাবি অস্বীকার করে বলা হয়েছে, সেদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে মাত্র ১৩ জন নিহত হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের মুসল্লিদের ওপর গুলি চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গণহত্যা চালানোর প্রতিবেদন প্রকাশ করায় দেশের শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থার সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমানকে গ্রেফতার করে কারারুদ্ধ করে রেখেছিল সরকার। অবশ্য এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী অনেক সমালোচনার পর সম্প্রতি তার জামিন মঞ্জুর করা হয়েছে।

বিডিআর হত্যাকাণ্ড
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বর্বর এবং বেদনাদায়ক ট্র্যাজেডি বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনা কর্মকর্তা হত্যাযজ্ঞ। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহে স্বজনহারা পরিবারগুলোর কান্না আজও থামেনি। তেমনি সেই দুঃখজনক স্মৃতি সাধারণ মানুষও ভুলতে পারছে না। কিন্তু কেন এই হত্যাযজ্ঞ, এর নেপথ্যে কারা ছিল—সেই প্রশ্নের জবাব ও ট্র্যাজেডির নেপথ্য রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি। জনসম্মুখে প্রকাশ হয়নি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনগুলোও। তেমনি এ ঘটনার বিচার নিয়েও চলছে অসন্তোষ। প্রকৃত হত্যাকারী এবং ষড়যন্ত্রের নায়করা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে। অনেকেই বর্তমান বিচার শ্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের ৫১ সামরিক কর্মকর্তা শহীদ হয়েছিলেন। আর এই স্বাধীন দেশে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি মাত্র দু’দিনের বিদ্রোহে পিলখানায় কর্মরত ৫৭ সেনা কর্মকর্তা, একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, দুজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী, ৯ বিডিআর জওয়ান, পিলখানার বাইরে সেনাবাহিনীর এক সিপাহি, এক পুলিশ কনস্টেবল ও তিন পথচারী নিহত হয়েছিলেন। ২৫ ফেব্রুয়ারিই পিলখানার স্যুয়ারেজ লাইন দিয়ে বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়েছিল ৩ সেনা কর্মকর্তার লাশ। ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বিদ্রোহীরা অস্ত্র সমর্পণের পর ২৭ ফেব্রুয়ারি মাটিচাপা অবস্থায় পাওয়া গেছে লাশের স্তূপ। অর্ধশত সাহসী ও নির্ভীক নিরস্ত্র সেনা কর্মকর্তার সারি সারি লাশ দেখে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল গোটা দেশের মানুষ। বর্বর ওই হত্যাকাণ্ড কারা ঘটিয়েছে, কারা এর অর্থের জোগান দিয়েছে, কারা পরিকল্পনা করেছে, কী তাদের উদ্দেশ্য ছিল—এসব বিষয় আজও রহস্যাবৃত। ঘটনার পর সেনাবাহিনী থেকে একটি এবং সরকারের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। কিন্তু ওইসব তদন্ত কমিটির দেয়া প্রতিবেদনগুলো আজও প্রকাশ করেনি সরকার।
পাঁচ বছর আগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের মাত্র দেড় মাসের মাথায় এ দিনই পিলখানায় বিডিআরের কথিত ‘সিপাহি’ পদের কিছু ব্যক্তির তপ্ত বুলেটে নিরস্ত্র ও অসহায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তার পাশাপাশি জীবন দিতে হয়েছে পিলখানার বাইরে রিকশাচালক, সবজি বিক্রেতা, ছাত্রসহ নিরীহ সাধারণ মানুষকেও। সেদিন সিপাহি মইন, সেলিম রেজা, ইকরাম, কাজল আলী, বাছেদ, জুয়েলসহ বিডিআরের কিছু ঘাতকের হিংস্র তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারগুলো। সেই পরিবারগুলো আজও শুধু কাঁদছেই। খুঁজে ফিরছে স্বজনদের। হত্যাকাণ্ডের আগে অবরুদ্ধ সেনা কর্মকর্তারা সরকারের কাছে সাহায্য চেয়ে আকুতি জানিয়েছিলেন। সেনা অভিযান চালিয়ে তাদের জীবিত অবস্থায় উদ্ধারের জন্য অনুনয়বিনয় করেছিলেন। কিন্তু সরকার তাতে কোনো সাহায্যের হাত বাড়ায়নি।
ঘটনা তদন্তে সরকার গঠিত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী পিলখানা হত্যাকাণ্ড, লুটতরাজ ও অন্যান্য অপরাধ পরিকল্পনার সঙ্গে বিডিআরের অনেক সদস্যসহ বিপুলসংখ্যক বেসামরিক ব্যক্তিও জড়িত ছিল। প্রায় দু’মাস ধরে এর পরিকল্পনা চলছিল। এমনকি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই পরিকল্পনার কিছু তথ্য-প্রমাণ মেলে। কারণ নির্বাচনের আগে বিডিআরের বেশকিছু সদস্য মহাজোট প্রার্থী ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের (বর্তমানে সংসদ সদস্য) অফিসে যান। তাদের মধ্যে হাবিলদার মনির, সিপাহি তারেক, সিপাহি আইয়ুব, ল্যান্স নায়েক সহকারী সাইদুরসহ ২৬ জওয়ানের নাম জানা গেছে। তারা লালবাগ থানা আওয়ামী লীগ ক্যাডার জাকিরের মধ্যস্থতায় তাপসের সঙ্গে কথা বলেন। প্রতিশ্রুতি দেন তার পক্ষে কাজ করার। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে শেখ সেলিম এমপির বাসায় দুজন ডিএডি এবং আওয়ামী লীগ কর্মী জাকিরের মধ্যস্থতায় ১০ থেকে ১২ বিডিআর জওয়ান সাক্ষাত্ করেন। এ মামলায় বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু ও বিএনপির স্থানীয় নেত্রী সুরাইয়া বেগমের নামও রয়েছে। এ মামলার ২০ আসামি এখনও পলাতক।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ঐতিহ্যের ধারক ও বাংলার সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী ছিল বিডিআর। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। দেশের সীমান্ত রক্ষা, বিদেশি আগ্রাসন ও চোরাচালান প্রতিরোধে বাংলাদেশ রাইফেলস বা বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) ছিল নির্ভীক। আইন অনুযায়ী সব সময় বিডিআরের মূল নেতৃত্ব ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে। সেনাবাহিনী থেকে প্রেষণে আসা সাহসী কর্মকর্তাদের দিয়ে পরিচালনা করা হতো বিডিআর। সেই বিডিআরকে সেনাবাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন করার দেশি-বিদেশি ঘৃণ্য চক্রান্তের মাধ্যমে ঘটানো হয়েছিল বিডিআর বিদ্রোহ। দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাদের টার্গেট করে হত্যা করা হয়েছিল সেদিন।

বিরোধী নেতাকর্মী খুন
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাঁচ বছরে দেশ ‘পলিটিক্যাল কিলিং জোনে’ পরিণত হয়। পুলিশ ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এ সময় সারাদেশে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী খুনের ঘটনা ঘটেছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার। বিএনপি দাবি করেছে, তাদের ৩০ হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ, তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত ঘটেছে। বর্তমান সরকারের আমলে সংঘটিত এসব হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশ ঘটনারই চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ; এমন কি এসব হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীদেরও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতেই দেশের বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে ৪৫ বিরোধী নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। গণতান্ত্রিক আন্দোলনসহ বিভিন্ন দাবিতে মাঠে নামলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নির্বিচারে চালানো গুলিতে তাদের মৃত্যু হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গু হয়েছেন অনেকেই।
অভিযোগ রয়েছে, নিহতদের পরিবার এসবের কোনো সুষ্ঠু বিচার পায়নি। অনেক ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বা পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরও করতে পারেনি। পুলিশ বাদী হয়ে উল্টো দলীয় নেতাকর্মী, ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনকে আসামি বানিয়ে মামলা করে হয়রানি করছে। দলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে রিমান্ডে এনে নির্যাতন চালিয়েছে। কিছু ঘটনায় তীব্র অভিযোগ ওঠায় গুলিবর্ষণকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। আর তদন্ত সংস্থা সেই পুলিশ বাহিনীর সদস্য অথবা সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় তাদের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অনেক ঘটনা পুলিশ দিয়ে তদন্তের নামে আইওয়াশ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, নিহতদের পরিবারের বক্তব্য এবং অনুসন্ধানে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত চার বছরেই রাজনৈতিক সহিংসতা ও দুর্বৃত্তায়নের ফলে ৭৭৫ জন নিহত হন। চলতি বছর সহিংসতা আরও বেড়েছে। অধিকার-এর তথ্য অনুযায়ী চলতি বছর জানুয়ারি মাসেই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে ১৭ জন নিহত এবং ১৬৪৩ জন আহত হয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে গত ৩১ জানুয়ারি জামায়াতের ডাকা হরতালে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বগুড়ায় জামায়াত-শিবির কর্মীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্রলীগ এবং পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণে ছাত্রশিবির নেতা আবু রুহানী ও কর্মী আবদুল্লাহ এবং মিজানুর রহমান নিহত হন। গত ৬ ফেব্রুয়ারি হরতাল চলাকালে চট্টগ্রামে জামায়াতের মিছিলে পুলিশ অতর্কিত গুলিবর্ষণ করলে চার নেতাকর্মী নিহত হন। গুলিবিদ্ধ হন দল দুটির অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী ও সমর্থক। পাঁচলাইশ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ একাধিক জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীকে ধরে নিয়ে হাতে-পায়ে গুলি করেন। ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি বিএনপির কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে মিছিল-সমাবেশকে কেন্দ্র করে চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরে পুলিশের গুলিতে চার ব্যক্তি নিহত হয়। লক্ষ্মীপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন যুবদল নেতা রুবেল এবং গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঢাকায় আনার পথে বিকালে আবুল কাশেম মারা যান। অপরদিকে পুলিশের গুলিতে চাঁদপুরে লিমন ও আবুল হোসেন নামে দু’জন নিহত হন। চাঁদপুরে বিএনপির সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় পুলিশের গুলিতে ২ জন নিহত হন।
বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী গুমের প্রতিবাদে গত বছর ২৫ এপ্রিল হরতাল চলাকালে সিলেটের বিশ্বনাথে পুলিশ-ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও সংগ্রাম পরিষদের মধ্যে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে গোলাগুলি ও ভয়াবহ সংঘর্ষে ছাত্রদল নেতা সেলিম আহমদ এবং যুবদল নেতা মনোয়ার হোসেন ও জাকির হোসেন নিহত হন। গত বছর ২৮ এপ্রিল লক্ষ্মীপুর সদর থানার পোদ্দার বাজারে হরতালের পক্ষে বিএনপির মিছিলে পুলিশের ছত্রছায়ায় আওয়ামী লীগ কর্মীরা গুলি চালালে একজন নিহত ও একজন আহত হয়েছে। গত বছর ৯ নভেম্বরে জয়পুরহাটে শিবির নেতা বদিউজ্জামান পুলিশের গুলিতে নিহত হন। গত বছর ৩০ জানুয়ারি বিকালে রাজশাহীতে বিএনপিসহ জোটের গণমিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণ ও অতর্কিত হামলায় শেখ শফিকুল ইসলাম শফিক নামে এক জামায়াত কর্মী নিহত হয়।
২০১০ সালের ২৩ অক্টোবর রূপগঞ্জে সেনাবাহিনীর নিজস্ব আবাসন প্রকল্পের জমি কেনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনতার সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ জামাল নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়।
২০১০ সালের ৮ অক্টোবর বিএনপির মিছিলে হামলা চালিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা সানাউলাহ নূর বাবুকে শত শত মানুষের সামনে কুপিয়ে এবং সাপ পেটানোর মতো নির্দয়ভাবে পিটিয়ে, দুই পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। এই মামলার ২৭ আসামিকেই জামিনে মুক্তি দেয়া হয়। ঠিক একই কায়দায় গত গত ৫ অক্টোবর রাতে বাবুর চাচা উপজেলা যুবদলের সহসভাপতি আবুল বাশার মাস্টারকেও হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয় দশজন। অপহরণের পর হত্যা করা হয় যশোর জেলার ঝিকরগাছা থানা বিএনপির সভাপতি নাজমুল ইসলামকে। ২০১১ সালের ১৪ ডিসেম্বর ঢাকার বাংলামোটরে নিজ ব্যবসায়িক কার্যালয় থেকে বের হয়ে তিনি আর বাসায় ফিরে আসেননি। পরদিন গাজীপুরের শালবনে তার লাশ পাওয়া যায়।

মতিঝিল হত্যাকাণ্ড
চলতি বছরের ৫ মে মধ্যরাতে মতিঝিল শাপলা চত্বরে অবস্থান করা ঘুমন্ত মুসল্লিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গণহত্যা চালায় র্যাব, বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী। যৌথবাহিনীর ‘অপারেশন ফ্লাশ আউট’ বা ‘অপারেশন শাপলা’ নামক গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা কত তা এখনো জানা যায়নি। হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের দুই থেকে হাজারের বেশি মুসল্লি মৃত্যু হয়েছেন। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ৬ মে ভোরে যৌথবাহিনীর অভিযানে কোনো মুসল্লি মারা যায়নি। হেফাজতের অবরোধ কর্মসূচিকে ঘিরে ১১ জন নিহত হয়েছে। কিন্তু হেফাজতে ইসলামের নেতারা বলেছেন, ঘুমন্ত ও ইবাদতরত মুসল্লিদের ওপর গুলি চালিয়ে ওই রাতে গণহত্যা চালানো হয়। এছাড়া অন্তত ১০ হাজার লোক আহত এবং বহু লোক এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। শুধু হেফাজত নেতারাই এই দাবি করেনি, দেশ-বিদেশের একাধিক মানবাধিকার সংগঠন এবং গণমাধ্যমও প্রায় একই দাবি করেছে। হংকংভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এশিয়ার হিউম্যান রাইটস কমিশন জানিয়েছে, শাপলা চত্বরে নিহতের সংখ্যা আড়াই হাজারেরও বেশি হতে পারে।
বাংলাদেশের খ্যাতনামা মানবাধিকার সংগঠন অধিকার বলেছে, শাপলা চত্বরে শত শত লোককে হত্যা করা হয়। এরপর ট্রাক ও কভার্ডভ্যানে করে লাশ সরিয়ে ফেলা হয়। বার্তা সংস্থা এপির বরাত দিয়ে মার্কিন টিভি স্টেশন সিএনএন জানায়, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা হয়তো কখনোই জানা যাবে না। প্রভাবশালী ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্ট ৫ ও ৬ মে’র হত্যাকাণ্ডকে ‘গণহত্যা বলেই মনে হচ্ছে’ বলে তাদের প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছে। পরে নিহত বেশ কিছু হেফাজত কর্মীর লাশ অজ্ঞাত হিসেবে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন রাজধানীর জুরাইনের স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা জানিয়েছেন, সাভারের রানা প্লাজার অজ্ঞাত লাশ বলে ব্যাপক নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে ৭ মে সকাল-সন্ধ্যায় ও ৮ মে ভোরে কিছু লাশ দাফন করা হয়েছে। এর প্রকৃত সংখ্যা কত, সেটা কেউ বলতে পারেননি। কিন্তু জুরাইন, ঢালকা নগর, ফরিদাবাদ এলাকার মানুষের মুখে মুখে শোনা যাচ্ছে, সাভারে বিধ্বস্ত রানা প্লাজা থেকে উদ্ধার করা অজ্ঞাত লাশের ছদ্মাবরণে মতিঝিল গণহত্যার বেশকিছু লাশ দাফন করা হয়েছে।
সেদিন ভোরের দৃশ্য বিভিন্ন মিডিয়ার ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মতিঝিলের আলিকো ভবনের সামনে টুপি-দাড়িওয়ালাদের বন্দুক দিয়ে পেটায় পুলিশ। একই সঙ্গে রাজপথে সাদা পাঞ্জাবি পরা বহু মানুষের রক্তাক্ত লাশ পড়ে ছিল। গুলিবিদ্ধ অনেককে মাটিতে ঢলে পড়তে দেখা যায়। অনেকের শরীর রক্তাক্ত। কেউ কেউ পুলিশের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অ্যাম্বুলেন্সে লাশ তুলতে দেখা যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকেও ওই রিপোর্টের কোনো প্রতিবাদ জানানো হয়নি। এছাড়াও ইসলামের অবমাননাকারী নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইসলামী সমমনা দলের হরতাল চলাকালে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে পুলিশের নির্বিচারে চালানো গুলিতে আলেম ও মহিলাসহ পাঁচজন নিহত হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী। এ ঘটনায় পরদিন জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করা হয়।

মাওলানা সাঈদীর রায়-পরবর্তী গণহত্যা
মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল দেশের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়ার পর প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে সারা দেশের মানুষ। ইসলামপ্রিয় মানুষ ছাড়াও সাঈদীভক্ত সর্বস্তরের লাখ লাখ জনতা রাস্তায় নেমে আসে। আল্লামা সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিল করে তার মুক্তির দাবিতে সারা দেশে গণবিক্ষোভ একপর্যায়ে গণবিস্ফোরণে রূপ নেয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে জনতা। তারা তাত্ক্ষণিকভাবে প্রতিবাদে নেমে আসে রাস্তায়। হরতাল, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, অবরোধসহ ঘোষিত এবং অঘোষিত কর্মসূচিতে অচল হয়ে পড়ে দেশ। বিক্ষোভে ফেটে পড়া নারী-পুরুষের ওপর নির্বিচারে চালানো হয় গুলি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুহুর্মুহু গুলিতে রক্তে রঞ্জিত হয় গোটা দেশের বহু জনপথ। একটানা ১৫ দিন ধরে চলতে থাকা প্রতিবাদ বিক্ষোভে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহত হয় দেড় শতাধিক মানুষ। নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী, কিশোর, কৃষক, দিনমজুর, মুসল্লিসহ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী। সারা দেশে একইসঙ্গে সাঈদী ভক্ত, অনুসারীদের আন্দোলন-বিক্ষোভ সামাল দিতে ব্যর্থ হয় র্যাব ও পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মোতায়েন করা হয় বিজিবি ও সেনাবাহিনী। বগুড়ায় সেনাবাহিনীর টহল দেখে তখন জনমনে এক ধরনের অজানা উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছিল।
সাঈদীর রায় ঘোষণার পর চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত এক সপ্তাহের মধ্যেই সারা দেশে পুলিশ-বিজিবি ও র্যাবের নির্বিচার গুলিবর্ষণে গণহত্যার শিকার ৯৭ জনের মধ্যে সাধারণ নাগরিকের সংখ্যাই ৩৩ জন। এর মধ্যে চারজন মহিলা ও চারটি শিশুসহ আলেম-ওলামাও রয়েছেন। সাধারণ নাগরিক ছাড়া নিহত হয়েছেন জামায়াত-শিবিরের ৪৬ জন, বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের ৬ জন, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ৫ জন, এলডিপির ১ জন এবং ৭ জন পুলিশ সদস্য।
সাতক্ষীরায় ৮ জামায়াত-শিবির, ১ আ.লীগ কর্মী ও ১০ সাধারণ নাগরিকসহ ১৯ জন, বগুড়ায় ৭ জামায়াত-শিবির, ৩ মহিলা ও ১ শিশুসহ ১৪ জন, রংপুরে ১ পুলিশ সদস্যসহ ৯ জন, গাইবান্ধায় চার পুলিশ সদস্যসহ ৮ জন, ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের ৩ জনসহ ৭ জন, জয়পুরহাটে ৬, নোয়াখালীতে বিএনপি ও যুবদলের ২ জনসহ ৪ জন, রাজশাহীর বাঘায় ১ ও গোদাগাড়ীতে ২ জনসহ মোট ৩, সিরাজগঞ্জে ২, কক্সবাজারে ৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১ যুবলীগ কর্মীসহ ৪ জন, লোহাগাড়ায় ১ পুলিশ সদস্যসহ ২ জন, সাতকানিয়ায় ১ এলডিপি কর্মীসহ ৩ এবং মৌলভীবাজার, নাটোর, রাজধানীর মিরপুর, দিনাজপুর, বাঁশখালী, সোনাইমুড়ী, সিলেট, চট্টগ্রাম, কেরানীগঞ্জ, নীলফামারী, হরিণাকুণ্ড, সেনবাগ ও উল্লাপাড়ায় ১ জন করে। এ সময়ের মধ্যে পাঁচ সহস্রাধিক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অন্তত আরও ২০ সহস্রাধিক ব্যক্তি।
রায় ঘোষণার পর দেশব্যাপী বিক্ষোভ ঠেকাতে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবের নির্বিচার গুলিবর্ষণে বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ড ঘটে। এছাড়া যুবলীগ-ছাত্রলীগের তাণ্ডবেও হত্যার শিকার হন অনেকে। স্বাধীনতার পর মাত্র ৭ দিনে এত হত্যাকাণ্ডের নজির নেই। মানবাধিকার সংস্থাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি একে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, স্বাধীনতার পর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ এটি। এ ঘটনায় সবার কাছে এটা স্পষ্ট নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।