Tuesday, 8 October 2013

বেপরোয়া দুর্নীতির উপাখ্যান-৭ : কুইক রেন্টালে কুইক ভাগাভাগি

রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের নামে বিদ্যুত্ খাতে দুর্নীতি ও লুটপাট সর্বকালের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। শাসকদলীয়দের লুটের রাজ্যে পরিণত করা হয়েছে গোটা বিদ্যুত্ খাতকে। এ পর্যন্ত কেবল সরকারি কোষাগার থেকেই ভর্তুকির মোড়কে লোপাট হয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর বাইরে গ্রাহকদের কাছ থেকে বাড়তি বিল বাবদ আরও হাজার হাজার কোটি টাকা যাচ্ছে একই খাতে। উচ্চ দরে বিদ্যুত্ কেনার মাধ্যমে মেয়াদান্তে কুইক রেন্টাল এবং রেন্টাল বিদ্যুত্ কেন্দ্রের মালিকানা সরকারের অধীনে স্থানান্তরিত হওয়ার কথা থাকলেও দুর্নীতির মাধ্যমে এসব কেন্দ্রের মেয়াদ ২০২০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এর ফলে কেবল রেন্টাল, কুইক রেন্টাল খাতেই রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাটের পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন বিদ্যুত্ খাতের বিশেষজ্ঞরা। সরকারি দলের নেতা ও সরকার সমর্থক ব্যবসায়ীদের এভাবে অবাধ লুটপাটের সুযোগ করে দেয়ার নজির বাংলাদেশের ইতিহাসে আর দেখা যায়নি।
একদিকে কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুত্ কিনে তার দায় দেশের অর্থনীতি ও গ্রাহকের ওপর চাপানো হচ্ছে। অন্যদিকে রেন্টাল ও কুইক রেন্টালে বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে হচ্ছে। এ খাতে সরকার ডিজেলে ২৫ টাকা ও ফার্নেস অয়েলে লিটারপ্রতি ১২ টাকা করে ভর্তুকি দিচ্ছে। আবার এসব বিদ্যুেকন্দ্রের যে পরিমাণ বিদ্যুত্ উত্পাদন করার শর্ত ছিল তা তারা করতে পারছে না। নিম্নমানের যন্ত্রপাতি এনে ব্যবহার করার কারণে শর্ত অনুযায়ী বিদ্যুত্ উত্পাদন হচ্ছে না। সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বাড়িয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে ভর্তুকির টাকা আদায়ের চেষ্টা করছে। ফলে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতে ব্যয় চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এ বাড়তি ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে সীমিত ও স্বল্প আয়ের গ্রাহকরা।
জানা গেছে, সরকারের তিন বছরে বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। লোকসানের এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার কোটিতে দাঁড়াবে। পক্ষান্তরে বিগত চারদলীয় জোট সরকারের চার বছরে এই দুই খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল মাত্র আড়াই হাজার কোটি টাকা। সাশ্রয়ী বড় বিদ্যুেকন্দ্রগুলো বাস্তবায়ন না করে ভাড়া কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভর করছে সরকার। এসব ভাড়া কেন্দ্র থেকে দেড় হাজার মেগাওয়ার বিদ্যুত্ পেতে গোটা অর্থনীতিকে দেউলিয়াত্বের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নাভিশ্বাস তোলা হয়েছে গ্রাহকদের। পিডিবির বিদ্যুেকন্দ্রগুলো থেকে যেখানে ইউনিটপ্রতি ২ টাকা উত্পাদন খরচে বিদ্যুত্ পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে রেন্টাল-কুইক রেন্টাল থেকে ১৫ থেকে ১৭ টাকা দরে বিদ্যুত্ কেনা হচ্ছে। আবার সময়মতো জ্বালানি সরবরাহ না করাসহ নানা আত্মঘাতী শর্তের বেড়াজালে আটকে যে জরিমানা দিতে হচ্ছে তাতে কোনো কোনো কেন্দ্রের বিদ্যুতের ইউনিট মূল্য ২৫ টাকা পর্যন্ত পড়ছে বলে জানা গেছে।
সরকার সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র চালু করেছিল। এজন্য প্রয়োজনীয় যে সমীক্ষা দরকার ছিল তা করেনি। কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল থেকে কী পরিমাণ বিদ্যুত্ পাওয়া যাবে, আর এর জন্য কত ব্যয় হবে, গ্রাহক কতটা উপকৃত হবে আর সরকারকে কত টাকা ভর্তুকি দিতে হবে—এসব বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই চুক্তি করেছে সরকার। বিদেশ থেকে কী পরিমাণ বাড়তি জ্বালানি আমদানি করতে হবে, এজন্য কত খরচ বেড়ে যাবে, তার হিসাবও করা হয়নি। উপরন্তু দায়মুক্তি আইন করে ফ্রি স্টাইল লুটপাটের লাইসেন্স দিয়ে দেয়া হয়েছে।
পিডিবি সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার তাদের মেয়াদের প্রথম বছর বিদ্যুত্ উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে উদাসীন ছিল। বছরান্তে বিদ্যুত্ সংকট যখন ভায়াবহ রূপ নেয় এবং সারা দেশে বিদ্যুতের দাবিতে গণ-অসন্তোষ চরম রূপ নেয় তখন তড়িঘড়ি করে কুইক রেন্টাল ও রেন্টালের মতো সর্বনাশা বিদ্যুত্ প্রকল্প বাস্তবায়নে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ২৮টি কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল কেন্দ্রের জন্য চুক্তি সই করে। এসব কেন্দ্রের বেশিরভাগই তেলভিত্তিক। তিনটি উত্পাদনে আসতে পারেনি।

কারা পেয়েছে কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল কেন্দ্র
বিনা টেন্ডারে দেয়া কুইক রেন্টাল ও রেন্টালের লুটেরা মালিকদের নাম-পরিচয় নিয়ে লুকোচাপা করছে বিদ্যুত্ মন্ত্রণালয় ও পিডিবি। সবকটি কেন্দ্র সরকার দলীয় নেতা কিংবা সরকার সমর্থক ব্যবসায়ীরা পেলেও বেনামে নেয়া হয়েছে অনেকগুলো কেন্দ্র। যে ১৮টি কুইক রেন্টাল কেন্দ্রের তালিকা পাওয়া গেছে সেগুলোর উদ্যোক্তা কোম্পানিগুলো হচ্ছে এগ্রিকো ইন্টারন্যাশনাল প্রজেক্টস লি. খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লি. সামিট নারায়ণগঞ্জ পাওয়ার লি. আইইএল কনসোর্টিয়াম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লি., ডাচ-বাংলা পাওয়ার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লি. ডিপিএ পাওয়ার জেনারেশন ইন্টারন্যাশনাল লি. পাওয়ারপ্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পওয়ার প্লান্ট লি., একর্ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার সার্ভিসেস লি. জেভি অফ সিনহা পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লি., নর্দার্ন পাওয়ার সল্যুশাল লি., খানজাহান আলী পাওয়ার কোম্পানি লি., ম্যাক্স পাওয়ার লি., ইউনাইটেড আশুগঞ্জ পাওয়ার লি. ও হাইপেরিয়ন পাওয়ার জেনারেশন লি.। এসব কোম্পানির বেশিরভাগই নতুন গজিয়ে ওঠা। বিদ্যুত্ খাতে কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না তাদের। উল্লিখিত কোম্পানিগুলোর মধ্যে এগ্রিকো একাই ৪টি কুইক রেন্টাল কেন্দ্র পেয়েছে। এ চারটি হচ্ছে ঘোড়াশাল ১৪৫ মেগাওয়াট, খুলনা ৫৫ মেগাওয়াট, বি-বাড়িয়া ৭০ মেগাওয়াট এবং আশুগঞ্জ ৮০ মেগাওয়াট। এ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নাম আছে মি. দেবজিত্ দাসের। শরাফত নামের এক ব্যক্তি কোম্পানিটির পক্ষে লবিং-তদবির করেছেন। তবে এ কোম্পানির কুইক রেন্টাল পাওয়ার নেপথ্যে শেখ পরিবারের এক প্রভাবশালী এমপির সংশ্লিষ্টটার কথা শোনা যায়।
সরকারের মন্ত্রী ফারুক খানের পারিবারিক ব্যবসায়ী গ্রুপ সামিট পৃথক নামে ৩টি কুইক রেন্টাল কেন্দ্র নিয়েছে। এর মধ্যে ১১৫ মেগাওয়াটের খুলনা কেন্দ্র খুলনা পাওয়ার কোম্পানির নামে, নারায়ণগঞ্জের মদনগঞ্জে ১০২ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটি সামিট নারায়ণগঞ্জ পাওয়ার লি.-এর নামে এবং পাগলা ৫০ মেগাওয়াট সামিটের নামে।
আওয়ামী ঘরানার ব্যবসায়ী নেতা, এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি আনিসুল হকের দেশ এনার্জি ৪টি কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল কেন্দ্র স্থাপন করে লুটের বড় অংশীদার। দেশের সব জ্বালানি বিশেষজ্ঞ যখন রেন্টাল, কুইক রেন্টালের তীব্র সমালোচনায় মুখর তখন একমাত্র ব্যবসায়ী আনিসুল হক বড়গলায় এর সমর্থন করেন। ওরিয়ন গ্রুপ পেয়েছে দুটি কুইক রেন্টাল কেন্দ্র। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা ফয়জুল আকবরের জিবিবি পাওয়ার, আনিসুর রহমান সিনহার সিনহা গ্রুপ, চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা মাহতাব, আওয়ামী ঘরানার ব্যবসায়ী গ্রুপ অটবি, এনার্জিপ্যাক রেন্টাল, কুইক রেন্টালের অন্যতম লুটেরা।

২০২০ সাল পর্যন্ত লোপাটের বন্দোবস্ত
স্থাপনের সময় মাত্র তিন বছরের জন্য সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুত্ কেনার কথা বলা হয়। চুক্তিও হয় সেভাবে। অবশ্য শেষ দিকে কয়েকটি ৫ বছর মেয়াদি চুক্তিও সই করা হয়। তখন বিদ্যুতের উচ্চ মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে যুক্তি হিসেবে বলা হয়, তিন বছরের মধ্যেই উদ্যোক্তাদের পুরো প্রকল্প ব্যয় লাভসহ তুলে নিতে হবে। মেয়াদ শেষে ওই কেন্দ্রগুলো সরকারের মালিকানায় চলে যাবে। কারণ ওই কেন্দ্রের জমিও সরকারই বিনা মূল্যে বরাদ্দ করেছে। চুক্তি অনুযায়ী ৩ বছর মেয়াদি কেন্দ্রগুলোর মেয়াদ ২০১৪ সালে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু সরকারের শেষ সময়ে এসে এখন আগাম মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল সব বিদ্যুেকন্দ্রের মেয়াদ ২০২০ সাল পর্যন্ত বাড়িয়ে চুক্তি নবায়ন করা হচ্ছে। আর তা বাড়ানো হচ্ছে আগের মতো সুবিধা দিয়েই, ফলে কেন্দ্র বন্ধ রাখার কারণে সরবরাহ বন্ধ থাকলেও কেন্দ্র ভাড়া ঠিকই পিডিবিকে গুনতে হবে। মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরই মধ্যে নীতিগত সায় দিয়েছেন বলে জানা যায়। সরকারের শেষ সময়ে এসে রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের সরকারি ঘরানার ব্যবসায়ীদের লোপাটের সুযোগ অব্যাহত রাখতেই এটা করা হচ্ছে। এ মেয়াদ বৃদ্ধির অন্তরালে বড় দাগের ভাগবাটোয়ারার কথাও শোনা যাচ্ছে বিদ্যুত্ মন্ত্রণালয় এবং এই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে।
এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার বলা হয়েছিল, নতুন করে আর কোনো রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্র করা হবে না, বাড়ানো হবে না বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর মেয়াদ। মহাজোট সরকারের তৃতীয় বছর থেকে এসব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুত্ কেনা বন্ধ করবে বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এমন আশ্বাসও ছিল।
বিদ্যুত্ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্রগুলোকে আইপিপিতে (ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার, ১৫ বছর পর পিডিবিতে চলে যায়) রূপান্তরের জন্য আবেদন করেছিলেন উদ্যোক্তারা। বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য বিদ্যুত্ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মোফাজ্জেল হোসেনকে প্রধান করে কমিটি গঠন করা হয়। সবকিছু বিবেচনা করে কমিটি ‘বিদ্যুত্ না দিলে বিল নয়’ (নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট) এমন শর্তে রেন্টাল কেন্দ্রগুলোর মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করে। তবে এ শর্তে রাজি হননি এ খাতের ব্যবসায়ীরা। তারা বিদ্যুত্ না দিলেও কেন্দ্র ভাড়ার অর্থ পাবেন—এমন শর্তে মেয়াদ বাড়ানোর জন্য লবিং শুরু করেন। সূত্রমতে, সরকার ব্যবসায়ীদের চাপে ও বিদ্যুত্ বিভাগের কর্মকর্তাদের পরামর্শে এ শর্তে রেন্টাল কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়াতে রাজি হয়েছে।
জানা গেছে, ‘বিদ্যুত্ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ সংশোধিত ২০১২’-এর অধীনে রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। এ আইনে বিদ্যুত্ রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র বিষয়ক কোনো দুর্নীতি বা অভিযোগ এনে দেশের আদালতে মামলা করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি লাভের সুযোগ দেয়ার কারণেই একটি মহল বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
এরই মধ্যে যে কেন্দ্রগুলোর মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে সেগুলো হচ্ছে ঠাকুরগাঁওয়ের ডিজেলচালিত আরজে পাওয়ারের ৪৭ মেগাওয়াট, আশুগঞ্জে প্রিসিশন এনার্জির গ্যাসভিত্তিক ৫৫ মেগাওয়াট, চট্টগ্রামের শিকলবাহায় তেলচালিত এনার্জি পাওয়ার করপোরেশনের ৫৫ মেগাওয়াট, নারায়ণগঞ্জের পাগলায় ডিপি পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ডিজেলচালিত ৫০ মেগাওয়াট ও খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের খুলনায় ডিজেলচালিত ৪০ মেগাওয়াট রেন্টাল কেন্দ্র।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ২০২০ সাল নাগাদ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহের জন্য রেন্টাল কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। কারণ সরকার গত চার বছরে উল্লেখযোগ্য বড় বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণে ব্যর্থ হয়েছে। এ যুক্তি দেখিয়ে ২০১২ সালে ছয়টি গ্যাসভিত্তিক রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানো হয়।
বিদ্যুত্ বিভাগ সূত্রমতে, ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মোট ১৪টি কুইক রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র অবসরে যাওয়ার কথা। আগামী বছর ভেড়ামারা ও সিদ্ধিরগঞ্জের দুটি কেন্দ্র অবসরে যাবে। ঘোড়াশালের দুটি কেন্দ্র ২০১৫ সালে অবসরে যাচ্ছে। এর পরের বছর ২০১৬ সালে অবসরে যাবে, এমন আরো ছয়টি কেন্দ্রের মধ্যে নওয়াপাড়ার দুটি, মেঘনাঘাট, খুলনা, মদনগঞ্জ এবং সিদ্ধিরগঞ্জে একটি করে কেন্দ্র রয়েছে। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এসব কেন্দ্রের মালিকরা মেয়াদ বাড়িয়ে নিচ্ছেন।
এ বিষয়ে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুত্-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, বিদ্যুত্ ব্যবসায়ীদের ব্যবসা দেয়ার জন্যই সরকার এটা করছে। এর সঙ্গে বিদ্যুত্ উত্পাদনের কোনো সম্পর্ক নেই। সরকার যদি বিদ্যুত্ উত্পাদন বাড়িয়ে সঙ্কট মোকাবিলা করতে চাইত তাহলে পিডিবির মালিকানায় বড় বড় বিদ্যুেকন্দ্র গত চার বছরের মধ্যে করতে পারত। কিন্তু সরকার বিদ্যুত্ সঙ্কটকে জিইয়ে রেখে কিছু ব্যবসায়ীকে মুনাফা করার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।
রেন্টাল কেন্দ্র থেকে বিদ্যুত্ কেনা বাবদ প্রতিবছর ভর্তুকি দিতে হচ্ছে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। ফলে বিদ্যুত্ খাতে দেয়া ভর্তুকির পুরো অর্থই ব্যয় হচ্ছে ২৮টি কেন্দ্র থেকে নেয়া ১৫০০ মেগাওয়াট রেন্টালের বিদ্যুত্ কিনতে গিয়ে। এ খাতের বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এ কেন্দ্রগুলোকে মেয়াদ বাড়ানোর অনুমতি দেয়ার ফলে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিদ্যুত্ খাতে ভর্তুকির নামে লোপাট করা অর্থের পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। দেশের অর্থনীতিতে সর্বগ্রাসী লোপাটের সুযোগ করে দেয়ার জন্য বিশেষজ্ঞরা প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীকে সবচেয়ে বেশি দায়ী করেছেন। তাদের অভিযোগ, মূলত তিনিই একটি সিন্ডিকেট বানিয়ে দেশজুড়ে জ্বালানি সঙ্কট তৈরি করে রেখেছেন।
রেন্টাল কেন্দ্র নির্মাণের অনুমতির সময় ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত ছাড় দেয়া হয়েছিল। এসব ছাড়ের মধ্যে রয়েছে শুল্কমুক্ত বিদ্যুেকন্দ্রের জন্য পুরনো যন্ত্রপাতি আমদানি করার সুযোগ। আবার শুল্কমুক্ত সুবিধায় এসব কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি বিদেশে রফতানি করারও সুযোগ রাখা হয় চুক্তিতে।
বিদ্যুত্ খাতের অন্যতম বিশেষজ্ঞ, পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমাতুল্লাহ আমার দেশকে বলেন, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল দেশের বিদ্যুত্ খাতই শুধু নয়, গোটা অর্থনীতি জন্য বিষফোঁড়া। এগুলো জিইয়ে রেখে সরকারেরই একটি সিন্ডিকেট হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে। জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুত্ উত্পাদনের কথা বলে সরকার তাদের দলীয় নেতাকর্মী ও প্রভাবশালীদের দিয়ে কুইক রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপন করিয়েছে। ৬-৭ টাকার বিদ্যুত্ ক্রয় করছে ১৭-১৮ টাকায়। ভর্তুকি দিয়ে তেল কিনে বিনা মূল্যে সেই তেল দেয়া হচ্ছে কুইক রেন্টালের মালিকদের। এসব রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে যাতে কেউ মামলা করতে না পারে, সেজন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার।
এক প্রশ্নের উত্তরে বিডি রহমতুল্লাহ বলেন, এই রেন্টাল খাতে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন করার জন্য সব মিলিয়ে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে বছরে ১৮ হাজার কোটি টাকা। জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে এসব রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, ভাড়ায় আনা তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে এক বছরে জ্বালানি খরচ বেড়েছে ৮৯ শতাংশ। ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুত্ উত্পাদন করতে খরচ হতো চার টাকা ২৬ পয়সা। কিন্তু ২০১০-১১ অর্থবছরে এসে এই খরচ বেড়ে হয়েছে আট টাকা পাঁচ পয়সা। ২০০৯-১০ অর্থবছরে ভাড়ায় আনা কেন্দ্র থেকে ৯৬৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা দিয়ে বিদ্যুত্ কেনা হয়েছে ২২৬ কোটি ১২ লাখ ৬৪ হাজার ৩৪৭ কিলোওয়াট আওয়ার। এই বিদ্যুতের জন্য পিডিবি তেল কিনেছে ৯৭ লাখ ৪০ হাজার লিটার ফার্নেস ওয়েল এবং ১২ কোটি ৪৬ লাখ ৯০ হাজার লিটার ডিজেল। আর পরের বছর ২০১০-১১ বছরে কেনা হয়েছে ৪ হাজার ৩৬৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা দিয়ে ৫৪২ কোটি ১৯ লাখ ২৮ হাজার ৭১৮ কিলোওয়াট আওয়ার বিদ্যুত্। আর এ সময়ে তেল কেনা হয়েছে ১১ কোটি ৮৭ লাখ ৩০ হাজার লিটার ফার্নেস অয়েল এবং ১৩ কোটি ৭৬ লাখ ৬০ হাজার লিটার ডিজেল। গত বছর এই অঙ্ক আরও বেড়ে গেছে।