Monday, 21 October 2013

প্রশাসনের আষ্টেপৃষ্ঠে দলীয়করণ : চাকরিচ্যুতি ওএসডিতে রেকর্ড

মহাজোট সরকারের পাঁচ বছর পার হতে চলেছে। সরকারের পুরো সময়টি কেটেছে দলীয়করণ, ভিন্নমতের কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুতি ও বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান, সব যোগ্যতা থাকার পরও দফায় দফায় পদোন্নতিবঞ্চিত করা, শাস্তিমূলক ওএসডি এবং দলীয় লোকদের পুরস্কারস্বরূপ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মধ্য দিয়ে। প্রশাসনকে দলীয়করণের মধ্য দিয়ে চেইন অব কমান্ড পুরোপুরি ভেঙে দেয়া হয়েছে। এমন দলীয়করণের কঠোর সমালোচনা করে প্রশাসনের এক সময়ের শীর্ষ দুই কর্মকর্তা ড. আকবর আলি খান ও এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, এর ফলে প্রশাসন নিরপেক্ষতা হারিয়ে বিতর্কিত হয়ে পড়েছে। এটা দেশের জন্য অমঙ্গল ডেকে আনবে।

চাকরিচ্যুতি ও বাধ্যতামূলক অবসর
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথমে ভিন্নমতের সরকারি কর্মকর্তাদের ওএসডি করে। এরপর শুরু করে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান। কথায় কথায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচ্যুতির ঘটনা ঘটছে অহরহ।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, শেখ মুজিব বা শেখ হাসিনার সমালোচনা করার অজুহাতে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের। এমনি একজন হলেন তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আ.ত.ম. ফজলুল করিম। ‘বাগানে ফুটে আছে অসংখ্য গোলাপ’ নামে তার লেখা কবিতার বইয়ে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ইঙ্গিত করে আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করেছেন অভিযোগ এনে ২০০৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ফজলুল করিমকে (আবু করিম) বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
সম্প্রতি অবসর দেয়া হয়েছে গত সাড়ে চার বছর ওএসডিতে থাকা যুগ্ম সচিব ড. আবদুল মোমেনকে। তার আগে অবসর দেয়া হয় অতিরিক্ত সচিব নাসিমুল গনি ও যুগ্ম সচিব শফিক উল্লাহকে। গণকর্মচারী অবসর আইন ১৯৪৭ ধারার ক্ষমতাবলে চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার অজুহাতে সরকার প্রজাতন্ত্রের চৌকস এসব কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।
অতিরিক্ত সচিব নাসিমুল গনিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয় গত ২৯ মে। ওই রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে এ আদেশ জারি করা হয়। গণকর্মচারী (অবসর) আইন ১৯৭৪-এর ৯(২) ধারা অনুযায়ী তাকে এ অবসর দেয়া হয়। প্রজ্ঞাপন জারির দিনে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে রাত ৮টায় আদেশটি জারি করা হয়। গণকর্মচারী (অবসর) আইন ১৯৭৪-এর ৯(২) ধারায় বলা আছে, চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পর সরকার চাইলে জনস্বার্থে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই যে কোনো কর্মচারীকে চাকরি থেকে অবসর দিতে পারবে। প্রশাসন ক্যাডারের এ কর্মকর্তা সাবেক চারদলীয় জোট সরকারের সময় স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের একান্ত সচিব ছিলেন। স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার বিদায় নেয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এ পদে কর্মরত ছিলেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তাকে ওএসডি করা হয়। এরপর তাকে আর কোনো পোস্টিং দেয়া হয়নি। ২০১৬ সালের ৭ মার্চ তার স্বাভাবিক অবসরে যাওয়ার কথা ছিল।
নাসিমুল গনিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর তিন দিনের মাথায় গত ১ মে যুগ্ম সচিব মো. শফিউল্লাহর ভাগ্যেও একই পরিণতি ঘটে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে রোববার রাতে তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, চাকরি থেকে বিদায় দেয়ার আদেশ জারির আগ পর্যন্ত শফিউল্লাহ একটানা সাড়ে চার বছর ওএসডি ছিলেন। তাকে ২০০৯ সালের ২১ জানুয়ারি ওএসডি করার পর আর কোনো পোস্টিং দেয়া হয়নি। প্রশাসন ক্যাডারের ৮২ ব্যাচের (গ্রুপ-৭৭) এ কর্মকর্তার নিজ জেলা নরসিংদী। তিনি চাকরিতে যোগ দেন ১৯৮৪ সালের ১ নভেম্বর। চাকরির মেয়াদ ছিল ২০১৭ সালের ২৯ জুন পর্যন্ত। কিন্তু চার বছর বাকি থাকতেই তাকে অবসর দেয়া হয়েছে। তাকেও গণকর্মচারী (অবসর) আইন ১৯৭৪-এর ৯(২) ধারাবলে চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় বাধ্যতামূলক অবসর দেয়া হয়েছে। ওএসডি হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ২০০৬ সালের ১ জুন থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলেন। এর আগে দুর্নীতি দমন কমিশন ও প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
বাংলাদেশ পুলিশের দুজন উপ-মহাপরিদর্শককে (ডিআইজি) সম্প্রতি বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এরা হলেন একেএম মাহফুজুল হক এবং মাজেদুল হক।
এর মধ্যে মাহফুজুল হককে গত ২০ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে অবসর দেয়া হয়। তাকে ২০০৯ সালের ১৫ মার্চ থেকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করে রাখা হয়েছিল। গত ১২ জুন মাজেদুল হককে অবসর দেয়া হয়। এই দুই পুলিশ কর্মকর্তার চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় গণকর্মচারী (অবসর) আইনের ১৯৭৪ অনুসারে অবসর দেয়া হয়। সূত্র জানায়, অবসরপ্রাপ্ত এই দুই কর্মকর্তা বিএনপি সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কর্মরত ছিলেন। এ কারণে তাদের বিএনপির ঘনিষ্ঠ লোক বলে ধরে নেয়া হয়। এর আগে ডিআইজি খান সাঈদ হাসান ও ফারুক আহমেদ, পুলিশ সুপার কোহিনুর মিয়া এবং সহকারী পুলিশ সুপার গিয়াস উদ্দিনকে বিভিন্ন অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হয়।
এছাড়াও সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) খোদা বখশ চৌধুরী, অতিরিক্ত আইজিপি বজলুর রহমান, মিজানুর রহমান এবং ডিআইজি আনিসুর রহমান ওএসডি থাকাবস্থায় অবসরে যান।
এদিকে অতিসম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তিন ক্যাডার কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
অবসরে পাঠানো এই তিন কর্মকর্তা হলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব মারুফ জামান, মহাপরিচালক আশরাফ উদ্দিন এবং মহাপরিচালক মো. হাসিব আজিজ। তারা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে ছিলেন। আদেশে বলা হয়, চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় জনস্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
এর আগে সরকারের ইচ্ছায় চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিতে হয়েছে সাবেক কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়াসহ আরও কয়েকজনকে। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর শত শত কর্মচারীর চাকরি গেছে গত সাড়ে চার বছরে। সরকারের রোষানলের শিকার হয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী সমন্বয় পরিষদের মহাসচিব মো. সালেউদ্দিন সেলিমকে চাকরি হারাতে হয়। ক্ষোভে-দুঃখে অসুস্থ হয়ে এক পর্যায়ে তিনি মারা যান। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলায় গত বছরের ৩ জুলাই তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এর আগে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এ ট্রেড ইউনিয়ন নেতাকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতর থেকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয় শরীয়তপুর সরকারি কলেজে। সেখানে যোগদানও করেন তিনি। এরপর কিছুদিন ছুটি কাটিয়ে আবার কাজে যোগদান করতে গেলে তাকে আর যোগদান করতে দেয়া হয়নি। বলা হয়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তাকে যোগদানের অনুমতি প্রদানে নিষেধ করা রয়েছে।
জানা যায়, ২০০৩ সালে বিজয় দিবস উপলক্ষে বন মিনিস্ট্রিয়াল কর্মচারী সমিতির একটি সঙ্কলনে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে সম্বোধন করে একটি বাণী দিয়েছিলেন। এটাকে ইস্যু করে শিক্ষা অফিসার মু. আবুল কাসেম ডিজির পক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন মহলে চিঠি দেন। তখন প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে সালেউদ্দিন সেলিমকে চাকরিচ্যুত করার নির্দেশ দেয়া হয়।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগের ওপর ভর করে আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. শাহাব উদ্দিন খানকে ২০০৯ সালের ২৪ আগস্ট চাকরিচ্যুত করা হয়। তার বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অভিযোগ করেন, শেখ মুজিবুর রহমানের ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী ও জাতীয় শোকদিবস উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিতব্য প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে তিনি বাধা প্রদান করেছেন। ২০০৯ সালের ২৩ নভেম্বর সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব আবদুল ওয়াহাব খানকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তদন্ত কমিটি দীর্ঘ তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দেয়, আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. শাহাব উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদফতরের নতুন পরিচালকও জানান, শাহাব উদ্দিন খানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটি সত্য নয়। অভিযোগের সত্যতা না পেয়ে এক বছর পর আবার তার চাকরি ফিরিয়ে দেয়া হয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমান সরকারের আমলে ৫০ জনেরও বেশি বিসিএস অফিসারকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

মেধাবীরা ওএসডি থেকেই বিদায়
সরকারের রোষানলে পড়ে ওএসডি অবস্থায় বিদায় নিতে হয়েছে অনেক মেধাবী কর্মকর্তাকে। আনুষ্ঠানিক বিদায়ও ভাগ্যে জোটেনি তাদের। এদের মধ্যে অনেকেই আবার বিদায় নিয়েছেন ন্যায্য পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত অবস্থায়। বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে এ পর্যন্ত ১৮৭ জন মেধাবী কর্মকর্তাকে অতি নীরবে চাকরি থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। সরকারি চাকরির বয়সসীমা ২ বছর না বাড়ালে আরও শতাধিক কর্মকর্তাকে ওএসডি অবস্থায় এরই মধ্যে বিদায় নিতে হতো।
শুধু তাই-ই নয়, ওএসডি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে কর্মরত কর্মকর্তারা কথা বলতেও সাহস পান না। এলপিআর ভোগরত সরকারের সাবেক এক সচিব সম্প্রতি তার তিন ব্যাচ জুনিয়র এক সচিবের কাছে গিয়েছিলেন তিনি যে সরকারি বাড়িতে থাকছেন, সেখানে আরও দু’মাস বেশি সময় থাকার অনুমতি চাওয়ার জন্য। সরকারের প্রভাবশালী ওই সচিব এক কাপ চা খাইয়ে মিটিংয়ের দোহাই দিয়ে তাকে তড়িঘড়ি বিদায় করে দেন। সপ্তাহখানেক পর আবার ওই সচিবের কাছে ফলোআপ জানতে গেলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, আপনি বিএনপিপন্থী অফিসার, তাই আমার পক্ষে এটা করা সম্ভব নয়। আপনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চেষ্টা করে দেখুন পারমিশন আনতে পারেন কি-না।
ওএসডিতে থাকা এক যুগ্ম সচিব তার ব্যাচেরই এক সহকর্মীর (অতিরিক্ত সচিব) কাছে দেখা করতে গিয়েছিলেন মন্ত্রণালয়ে। ওই অতিরিক্ত সচিব তার সঙ্গে দেখা না করে ফোনে রাতে বাসায় আসার অনুরোধ জানান। সহকর্মীর এমন আচরণে অপমানবোধ করেন ওই ওএসডি কর্মকর্তা।
বিএনপি সরকারের সময় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন জাফর আহমেদ চৌধুরী। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই তাকে ওএসডি করা হয়। প্রায় দু’বছর ওএসডি থাকার পর গত ৩১ ডিসেম্বর এলপিআরে গেছেন তিনি। ৩১ বছরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের ইতি টানতে হলো তাকে একেবারেই নীরবে-নিভৃতে। ১৯৭৯ সালে বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে তিনি জনপ্রশাসনে যোগ দেন। ৩১ বছরের কর্মময় জীবনে অনেক সহকর্মী রয়েছেন তার। কারও কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নিতে পারলেন না তিনি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আবদুল মজিদ এলপিআরে যান ওএসডি অবস্থায়ই। যাওয়ার প্রাক্কালে একরাশ ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি একটি পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাত্কারে বলেন, ‘৩০ বছর সরকারি চাকরি করলাম। কিন্তু আজ বিদায়ের সময় নিজের কোনো অফিস নেই। দীর্ঘ চাকরি জীবনে অনেককে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় দিয়েছি। আজ আমাকে বিদায় জানানোর কেউ নেই। কারও কাছ থেকে যে বিদায় নেব, তেমনও কেউ নেই।’ বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ২০০৯ সালের ৮ এপ্রিল অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। মেধাবী এ অফিসারের আর কোনো সেবাই নিল না সরকার। এক পর্যায়ে ওএসডি অবস্থায়ই সরকারি চাকরিতে তিন দশকের ইতি টানলেন তিনি।
অত্যন্ত মেধাবী ও দক্ষ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন এহসান-উল ফাত্তাহ। ৭৯ ব্যাচের এ কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয় ২০০৯ সালের ১০ ডিসেম্বর। ওএসডি অবস্থায় গত বছরের ১১ জানুয়ারি তিনি এলপিআরে গেছেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার ১২ দিনের মাথায় সচিব আবদুর রশিদ সরকারকে ওএসডি করা হয়। কর্মহীন অবস্থায় বিদায় নিতে হয় তাকেও। সচিব মোমতাজুল ইসলাম, ওয়াহিদুন্নবী চৌধুরী, ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, ইসমাইল হোসাইন, আবদুল হাকিম মণ্ডল, আবদুস সালাম খান, মো. শাহজাহান, আবদুস সবুর, এএমএম নাসির উদ্দিন, শরফুল আলম, মোস্তাক উদ্দিন আহমেদ, নুরুজ্জামান ভূঁইয়া, শাহ আলম, কামাল উদ্দিন আহমেদ, ইলিয়াস আহমেদ, এসএম জহুরুল ইসলাম খান, মোহাম্মদ ইব্রাহিম হোসেন, মনিরুজ্জামান খান, কামরুল হাসান, আবদুস সাত্তার, এটিএম আতাউর রহমান, এটিএম ইসমাইল, সৈয়দ নকীব মুসলিম, অতিরিক্ত সচিব মো. জাহাঙ্গীর, তাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. মাহফুজুল হক, ড. খন্দকার রাশিদুল হক, ফিরোজ কিবরিয়া, একেএম আজিজুল হক, ইসমাইল হোসেন, আবুল কাসেম, খোরশেদ আলম, ফরহাদ খান, ফজলুর রহমান, মোহাম্মদ মুসা, ইকরাম আহমেদ, এসএম শাজাহান আলী, ড. মো. মোস্তফা, আবুল কাশেম, জাহিদ হোসেন, একেএম হেলালুজ্জামান, বদরুল আলম তরফদার, আলীমুশ্বান, আবদুস সাত্তার, ওয়াজেদ আলী খান, হাফিজুল ইসলাম মিয়া এবং আবদুল বারী খানকেও একইভাবে বিদায় নিতে হয়েছে। অতিরিক্ত সচিব হিসেবে যারা বিদায় নিয়েছেন, তাদের সবারই সচিব হিসেবে বিদায় নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের রোষানলে পড়ে এদের সবাই পদোন্নতিবঞ্চিত হন। এতে বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত হয়েছেন।

সরকারি কর্মকমিশনে বেপরোয়া দলীয়করণ
এদিকে সরকারি কর্মকমিশনে (পাবলিক সার্ভিস কমিশন-পিএসসি) চলছে বেপরোয়া দলীয়করণ। বর্তমান মহাজোট সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠজনদের অথবা সরকারদলীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত লোকজনকে পিএসসির চেয়ারম্যান ও সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এতে গতি হারিয়েছে সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটি। পিএসসির বর্তমান চেয়ারম্যান ২০১১ সালের ২৩ নভেম্বর নিয়োগ পান। তিনি বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের সদস্য ছিলেন। ’৯৬ সালে তত্কালীন বিএনপি সরকারবিরোধী জনতার মঞ্চে অংশগ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পিএসসিতে তার বর্তমান আমলে বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। এ কারণে পিএসসি ওই পরীক্ষা স্থগিত করে।
এছাড়া দলীয় বিবেচনায় পিএসসিতে সদস্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়া যুবলীগের আন্তর্জাতিক সম্পাদক ইমরান কবীর চৌধুরীর বাসভবন ভাংচুর করেছে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। অভিযোগ ওঠে, তাদের কাছ থেকে অর্থ নিয়েও নিয়োগ দেননি তিনি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পিএসসিতে পূর্ণ প্যানেলের ১৫ সদস্যের মধ্যে ১৩ জনই সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপির আত্মীয় ও দলীয় অনুগত। এদের মধ্যে পিএসসি সদস্য মোহাম্মদ হোসেন সেরনিয়াবাত আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ও সাবেক চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর চাচাতো ভাই। সদস্য অধ্যাপক এমরান কবির চৌধুরী যুবলীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক। ২০০৯ সালের ১৫ এপ্রিল তিনি যোগদান করেন। সদস্য সৈয়দ হাসিনুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমামের ভাগ্নে। তিনি ২০০৯ সালের ২৯ জুলাই যোগদান করেন। এর আগে তিনি অতিরিক্ত সচিব ছিলেন। সদস্য ইকরাম আহমেদ সংরক্ষিত মহিলা আসনে আওয়ামী লীগ এমপি তারানা হালিমের আত্মীয়। ২০০৯ সালের ২৯ জুলাই তিনি যোগদান করেন। সদস্য অধ্যাপক ডা. ফরিদা আদিব খানম আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের আত্মীয়। তিনিও ২০০৯ সালের ২৯ জুলাই যোগদান করেন। সদস্য মুহম্মদ লিয়াকত আলী খান ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ এবং জনতার মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০০৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর যোগদান করেন তিনি। এর আগে তিনি কারা মহাপরিদর্শক ছিলেন। সদস্য হিসেবে রয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের বোন অধ্যাপিকা রাশিদা বেগম।

বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারি চিঠি
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোকে (ইপিবি) বিরোধী দলমুক্ত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চিঠি দেয়। এতে বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব সাকিউন নাহার বেগম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে ইপিবিতে বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং বিসিএস কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ফেল করেও পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরে ১৪৪ জনের চাকরি
লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়েও পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরে বিভিন্ন পদে ১৪৪ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়। পরীক্ষার ফল জালিয়াতি করে এদের নিয়োগ দেয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মৌখিক পরীক্ষার জন্য তালিকা তৈরির সময় এই জালিয়াতি করা হয়।

বিএসএমএমইউতে রাজনৈতিক আক্রোশে চাকরিচ্যুতি
রাজনৈতিক আক্রোশের শিকার হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ৪৫ শিক্ষক-কর্মকর্তাকে চাকরি হারাতে হয়েছে। নিয়োগ ও পদোন্নতি সংক্রান্ত অনিয়মে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ৪৫ শিক্ষক-কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে চাকরিচ্যুত করে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। চাকরিচ্যুতরা চারদলীয় জোট সরকারের আমলে নিয়োগ পান।
চাকরিচ্যুতদের মধ্যে রয়েছেন—বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরো মেডিসিন বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. জুবায়ের, অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন, সার্জারির অধ্যাপক ডা. শহিদুর রহমান, ডা. নিয়াজ আহমেদ চৌধুরী, ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. শহিদুল আলম খান, রেডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. ইকবাল হোসেন, ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলো-ফেসিয়াল সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মতিউর রহমান মোল্লা, কলোরেক্টাল সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসান ইমাম আল হাদী, ইএনটি বিভাগের ডা. হোসেন ইমাম আল হাদী, চক্ষু বিভাগের ডা. আবদুল কুদ্দুস, অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের ডা. জেরজিনা রহমান, ডা. ইকবাল হোসেন চৌধুরী, ডা. আসিয়া আলী, নেফ্রোলজি বিভাগের ডা. নজরুল ইসলাম, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের ডা. মুজিবুর রহমান ভূঁঁইয়া, সার্জারি বিভাগের ডা. কামরুজ্জামান, ডা. আতিয়ার রহমান, ডা. মহিবুল আজিজ, ডা. আবদুল ওহাব খান, মেডিসিন বিভাগের ডা. শাহিদুল ইসলাম, ইউরোলজি বিভাগের ডা. সাইফুল ইসলাম, চর্ম ও যৌন বিভাগের লে. কর্নেল ডা. আবদুল ওয়াহাব, গাইনি অ্যান্ড অবস্টেট্রিক বিভাগের ডা. নুরুন নাহার খানম, ডেন্টিস্ট্রি বিভাগের ডা. মজিবুর রহমান, প্রস্থোডন্টিকস বিভাগের ডা. আলিয়া সুলতানা ও সহকারী অধ্যাপক চক্ষু বিভাগের ডা. খন্দকার জিয়াউল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক গাইনি বিভাগের ডা. সাঈদা সুলতানা, ডা. হামিদা বেগম, ইএনটির এএফএম একরামুদৌলা, মেডিসিন বিভাগের ডা. আবদুল কাদের, নিউনেটোলজি বিভাগের ডা. খালেদ নূর, পেডিয়াট্রিক বিভাগের ডা. হেলেনা বেগম, পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজি বিভাগের ডা. সালমা জাহান, গাইনি বিভাগের ডা. হুমায়রা আলম ও ডা. রিয়া হুমায়রা।

এছাড়া কর্মকর্তাদের মধ্যে সাময়িক বরখাস্তরা হলেন
উপ-রেজিস্ট্রার ডা. এসএম রফিকুল ইসলাম, ডা. সাইফ উদ্দিন নিসার, সহকারী গ্রন্থাগারিক মার্জিয়া বেগম, সহকারী লাইব্রেরিয়ান সুফিয়া বেগম, উপ-পরিচালক মাসুদ আলম, সহকারী পরিচালক খন্দকার শফিকুল হাসান, সহকারী পরিচালক নাছির উদ্দিন ভূঁইয়া, সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আখতারুজ্জামান, সহকারী পরিচালক বদরুল হুদা, সহকারী রেজিস্ট্রার ফেরদৌসী বেগম ও আশরাফ-উস-সালেহীন।

সংসদ সচিবালয়ে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম
আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে ২১ জনকে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা হিসেবে আত্তীকরণ করে। এবার ক্ষমতায় এসে তাদের পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। আত্তীকৃতদের মধ্যে ১৩ জন প্রথম শ্রেণীর ও আটজন দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে চাকরিপ্রাপ্তদের বঞ্চিত করে এদের পদোন্নতি দেয়ায় সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, ওই ২১ জনকে নিয়োগ দিতে গিয়ে নিয়োগবিধির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। আর পদোন্নতি দিতে নিয়োগবিধিতে সংশোধনী আনা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সরকারের কর্মচারী নন—এমন ব্যক্তিদের স্পিকারের ক্ষমতাবলে নিয়োগ দিয়ে ২০০০ সালের ৯ আগস্ট সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সম্মতি চেয়ে চিঠি দেয়া হয়। ১১ সেপ্টেম্বর সংস্থাপন মন্ত্রণালয় জানায়, সরকারের কর্মচারী নন—এমন ব্যক্তিদের সরকারি প্রতিষ্ঠানে আত্তীকরণের সুযোগ নেই।
প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী, সাবেক স্পিকার আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেট, সাবেক চিফ হুইপ আবদুস শহিদ ও হুইপ মিজানুর রহমানের সহকারী একান্ত সচিবরা (এপিএস) রয়েছেন। এপিএস নিয়োগে ব্যক্তির পছন্দই গুরুত্ব পায়।
সূত্র জানায়, অমলেন্দু সিংহ হুইপ আবদুস শহিদের এপিএস ছিলেন। তাকে লেজিসলেটিভ ড্রাফটসম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এর আগে তিনি সমাজসেবা অধিদফতরের একটি প্রকল্পে অনিয়মিত কর্মকর্তা হিসেবে সুনামগঞ্জে কর্মরত ছিলেন। এবার পদোন্নতি পেয়ে তিনি সিনিয়র লেজিসলেটিভ ড্রাফটসম্যান হয়েছেন। সামিয়া হোসাইন সাবেক স্পিকারের এপিএস-২ ছিলেন। তিনি সহকারী সচিব পদে নিয়োগ পান। পদোন্নতির পর সিনিয়র সহকারী সচিব হয়েছেন। সিরাজুল ইসলাম বাদশা স্পিকারের এপিএস-১ ছিলেন। সেখান থেকে কমিটি কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। এখন তিনি সিনিয়র কমিটি কর্মকর্তা। চৌধুরী আশরাফ আলী স্পিকারের এপিএস-২ ছিলেন। তিনি নিয়োগ পান গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে। আবদুল হাই সাবেক স্পিকার আবদুল হামিদের ভাই ও আগের আমলে তার এপিএস ছিলেন। সেখান থেকে তাকে সহকারী পরিচালক পদে নিয়োগ দেয়া হয়। এখন তিনি উপ-পরিচালক হয়েছেন। সাবেক হুইপ মিজানুর রহমানের এপিএস এমএ মাসুম প্রটোকল কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। পদোন্নতি পেয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব হয়েছেন তিনি। মালেকা পারভীন সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর এপিএস থেকে কম্পিউটার প্রোগ্রামার পদে নিয়োগ পান। অগ্রণী ব্যাংকের জুনিয়র কর্মকর্তা একেএম জি কিবরিয়া মজুমদার সংযুক্তির মাধ্যমে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির সভাপতির একান্ত সচিব (পিএস) হন। আত্তীকরণ করে তাকে কমিটি কর্মকর্তা করা হয়। এখন তিনি সিনিয়র কমিটি কর্মকর্তা হয়েছেন।

দলবাজদের দৌরাত্ম্যে প্রশাসন তছনছ
মহাজোট সরকারের চার বছরে নিস্পিষ্ট হতে হয়েছে জনপ্রশাসনের বেশিরভাগ কর্মকর্তাকে। তবে দলবাজ কর্মকর্তাদের ছিল পোয়াবারো। একটানা পাঁচ বছর শাস্তিমূলক ওএসডি রাখা যেমন হয়েছে, তেমনি দেড় বছরের মাথায় সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে সচিব পদোন্নতি পাওয়ার মতো তুঘলকি কাণ্ডও ঘটেছে। ব্যাচের সবচেয়ে মেধাবী অফিসারটি পদোন্নতিবঞ্চিত হয়ে যখন উপসচিব হিসেবে কাজ করছেন, তখন তার দলবাজ বন্ধুটি অতিরিক্ত সচিব হিসেবে ক্ষমতা এনজয় করছেন। এভাবে একচক্ষু প্রশাসনের কারণে হতাশা ও স্থবিরতা বিরাজ করছে জনপ্রশাসনে।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে দলীয়করণমুক্ত, অরাজনৈতিক ও গণমুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে বলা হয়েছিল—যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা এবং মেধার ভিত্তিতে সব নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা হবে। গত চার বছরে এসব প্রতিশ্রুতির কোনোটিই রক্ষা হয়নি। বরং জনপ্রশাসনের দলীয়করণ ও পদোন্নতিবঞ্চনা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
সরকারের পাঁচ বছরের আলোচিত ছিল প্রশাসনের গতি বাড়াতে সরকারের ঊর্ধ্বতনদের দফায় দফায় তাগাদা, সিনিয়র সচিবের পদ সৃষ্টি, রেকর্ড পদোন্নতি ও সুপারসিডবঞ্চনা, নিয়োগ নিয়ে হাঙ্গামা, কর্মকর্তাদের নতুন সংগঠন, সিভিল সার্ভিস আইন বাতিল, সাবেক ৫০ আমলাকে সচিবালয়ে নিষিদ্ধ, ওএসডি ন্যস্ত’র নামে বেতন বন্ধ করে দেয়া এবং মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিদের প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের ঘটনা। এর মধ্যে ২০১০ সালে পাবনায় নিয়োগ নিয়ে হাঙ্গামার ঘটনা সারাদেশে আলোড়ন তোলে।

পদের চেয়ে পদোন্নতি বেশি
পদোন্নতিবঞ্চনা এবং ওএসডি যাতনায় ভুগছেন প্রশাসনের দলনিরপেক্ষ অনেক দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তা। পদের চেয়ে পদোন্নতি বেশি হওয়ায় শত শত দক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তা পোস্টিং পাচ্ছেন না। বিএনপি-জামায়াতপন্থী কর্মকর্তারা তো বছরের পর বছর ধরে ওএসডি। সরকারি চাকরি করেও তারা কোনো কাজ করতে পারছেন না। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন হাজার হাজার কর্মকর্তা। এদের মধ্যে অনেকে তৃতীয় ও চতুর্থবারের মতো বঞ্চিত হয়েছেন। দলনিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের ওএসডি করার প্রবণতাও দিন দিন বাড়ছে। ওএসডি এখন ভিন্ন মতাদর্শের কর্মকর্তাদের শাস্তির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভিন্নমতের কারণে এই শাস্তি কার্যক্রম এখন চরম। ওএসডির যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে এরই মধ্যে দুই কর্মকর্তা আত্মহত্যাও করেছেন।

ওএসডি থেকে মুক্তি পেতে দুই কর্মকর্তার আত্মহত্যা
পদোন্নতি বঞ্চনা ও দীর্ঘদিন ওএসডি থাকা যুগ্ম সচিব মো. মনোয়ার হোসেন যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে গত বছরের ১২ জুলাই নিজ বাসায় আত্মহত্যা করেন। তার ছেলে সাজ্জাদ হোসেন জানান, বাবা প্রায় আমাদের বলতেন তাকে অহেতুক ওএসডি করে রাখা হয়েছে। কিন্তু জুনিয়রদের পদোন্নতি দিয়ে করা হচ্ছে সচিব। জুনিয়র হওয়ার পরও তাদের স্যার বলতে হচ্ছে। এটা চরম অপমানের। যুগ্ম সচিব মনোয়ার হোসেন সর্বশেষ ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের পরিচালক ছিলেন। ’৮৩ স্পেশাল ব্যাচের এ কর্মকর্তার ব্যাচমেট ড. খোন্দকার শওকত হোসেন, নজরুল ইসলাম খান ও নিয়াজ উদ্দিন মিয়া এখন সচিব পদে কর্মরত আছেন। তার জুনিয়র অনেক কর্মকর্তাই এখন অতিরিক্ত সচিব। বর্তমান সরকারের আমলে দুই-দুইবার তিনি পদোন্নতি বঞ্চিত হন। বর্তমান সরকারের আমলে গত জানুয়ারিতে তাকে ওএসডি করা হয়। এর আগে ২০১০ সালের ১৬ আগস্ট একই কারণে ডিসিসির কর্মকর্তা শহিদুর রহমান আত্মহননের একই পথ বেছে নেন। তার পারিবারিক সূত্রে বলা হয়, ২০০৮ সালের শেষের দিকে শহিদুর রহমান গুরুতর অসুস্থ হন। কর্তৃপক্ষ তার পাশে এসে না দাঁড়িয়ে তাকে ওএসডি করে। তিনি সুস্থ হলেও ওএসডি আদেশ বলবত্ রাখা হয়। ২২ মাস ধরে তিনি ওএসডি থাকেন। সারাজীবন কাজের মধ্যে থাকায় এ কর্মকর্তা কোনোভাবেই এটা মানতে পারছিলেন না। ঠিকমত খাওয়া-দাওয়া করতেন না। অসংলগ্ন কথা বলতেন। এক রকম মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন তিনি। ১৬ আগস্ট রাতে বনানীর বাসভবনে নিজের লাইসেন্স করা পিস্তলের গুলিতে তিনি আত্মহত্যা করেন।

দীর্ঘ হচ্ছে বঞ্চিতদের তালিকা
বর্তমান সরকারের সময় প্রতিটি পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যাচের মেধাক্রমে প্রথম দিকে থাকা অসংখ্য কর্মকর্তাকে পদোন্নতির তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। পদোন্নতির সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কয়েকশ’ কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করে দীর্ঘ করা হয়েছে বঞ্চিতদের তালিকা। এছাড়া বিগত সময়ে বিভিন্ন জনকে বিভিন্ন পর্যায়ে পদোন্নতি দেয়া হলেও বঞ্চিতরা বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছেন। ফলে বঞ্চিত এসব কর্মকর্তা কোনোভাবেই এটি মেনে নিতে পারছেন না। তাত্ক্ষণিকভাবে তারা সাংবাদিকদের কাছে ক্ষোভের কথাও জানিয়েছেন। তারা দাবি করেন, পদোন্নতির ক্ষেত্রে যেসব দিক বিবেচনা করা হয়, সব দিকে তারা পরিপূর্ণ থাকলেও তাদের অযথা বঞ্চিত করা হয়েছে। মেধাবী কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে যারা দলবাজি করেন, তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেন। আর পদোন্নতির ক্ষেত্রে বঞ্চিত প্রথা প্রশাসনকে দুর্বল করার হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন সাবেক আমলারা। তারা মনে করছেন, প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বঞ্চিত করার প্রথাই প্রশাসনিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়ার অন্যতম কারণ। এতে বঞ্চিতদের মনোবল ভেঙে যায়। তাদের কাজকর্মে দেখা দেয় অনীহা। বেড়ে যায় প্রশাসনে অস্থিরতা। ফলে পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেয়া উচিত বলে তারা মনে করেন।
বর্তমান সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত প্রশাসনে মোট ১ হাজার ৯০৬ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়। এর মধ্যে ৬০ জন সচিব, ২৯৩ জন অতিরিক্ত সচিব, ৬৮৮ জন যুগ্ম সচিব এবং ৮৬৫ জন উপসচিব হিসেবে পদোন্নতি পান।
সরকার দায়িত্ব নেয়ার এক মাসের মধ্যেই ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি সচিব পদে সাতজন পদোন্নতি পান। পছন্দের সাত কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিতে গিয়ে বেশ কয়েকজন মেধাবী অফিসারকে বাদ দেয়া হয়। ওই পদোন্নতির দু’দিন পর ২৭ জানুয়ারি অতিরিক্ত সচিব পদে ৭২ জনকে পদোন্নতি দেয়ার সময়ও অর্ধশতাধিক কর্মকর্তাকে বঞ্চিত করা হয়। তখনও দলীয়করণের অভিযোগ ওঠে। ২০১১ সালে উপসচিব, যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদে ৫০৩ জনকে পদোন্নতি দিতে গিয়ে ৫৫৩ জনকে বঞ্চিত করা হয়। বঞ্চিত কর্মকর্তারা বেশিরভাগই পদোন্নতির যোগ্য ও মেধা তালিকায় এগিয়ে ছিলেন। একই বছরের অক্টোবরে সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন জনপ্রশাসনের ৪৩ জন কর্মকর্তা। এদের মধ্যে সচিব হন অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের ১২ জন ও অতিরিক্ত সচিব হন যুগ্ম সচিব পর্যায়ের ৩১ জন কর্মকর্তা। এ পদোন্নতিতেও আগের মতোই বঞ্চিত হন বেশকিছু কর্মকর্তা। সর্বশেষ গত বছরের প্রশাসনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল প্রশাসন কাঁপানো পদোন্নতি ও বঞ্চনা। পদ ছাড়াই পদোন্নতি দেয়া হয় অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিব পদে ৬৪৯ কর্মকর্তাকে। পাশাপাশি যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বঞ্চিত করা হয় প্রায় হাজার খানেক কর্মকর্তাকে। এ পদোন্নতিতে ১২৭ জন যুগ্ম সচিবকে অতিরিক্ত সচিব, ২৬৪ জন উপসচিবকে যুগ্ম সচিব এবং ২৫৮ জন সিনিয়র সহকারী সচিবকে উপসচিব করা হয়। এ পদোন্নতিতে সব ধরনের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বঞ্চিত করা হয় ৯০০’র বেশি কর্মকর্তাকে। এদের মধ্যে অনেকে তৃতীয় ও চতুর্থবারের মতো বঞ্চিত হন।
গত মার্চে জনপ্রশাসনে ২০৪ জন কর্মকর্তাকে উপসচিব পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এ দফায় বঞ্চিত করা হয়েছে অর্ধশতাধিক মেধাবী কর্মকর্তাকে। অতিসম্প্রতি যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন ৭২ জন। এর আগে গত ১৮ জুলাই যুগ্ম সচিব পদে ৩৪৫ জনকে পদোন্নতি দেয়া হয়। কিন্তু উদারভাবে বিপুল সংখ্যায় এ পদোন্নতি দিলেও যোগ্য কর্মকর্তাদের অনেকে বাদ পড়ে যান। যাদের অনেকে দলমত-নিরপেক্ষ নিরীহ মেধাবী অফিসার। এ দফায় যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেয়ার সময় দু’শতাধিক কর্মকর্তা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বঞ্চিত হন বলে অভিযোগ ওঠে।

২৪ বছরের সিনিয়র-জুনিয়র একই পদে
সরকারের একচোখা নীতির কারণে জনপ্রশাসনে পদোন্নতিবন্ধ্যাত্ব সৃষ্টি হয়েছে। শুধু সিনিয়র সহকারী সচিব পদে কাজ করছেন ১৬টি ব্যাচের কর্মকর্তারা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ২৪ বছরের সিনিয়র ও জুনিয়র কর্মকর্তারা একই পদে কাজ করছেন। একই ব্যাচের কোনো কোনো কর্মকর্তা যখন সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তখন সিনিয়র সহকারী সচিব পদে কাজ করছেন ওই ব্যাচেরই অনেকে। দলীয় পরিচয় না থাকায় এসব কর্মকর্তা বারবার পদোন্নতিবঞ্চিত হন বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। সিভিল সার্ভিসের ইতিহাসে বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও এমন নজির নেই।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ওএসডির বেহাল চিত্র : জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রশাসন ক্যাডারের প্রায় ৬০০ কর্মকর্তা ওএসডি হয়ে আছেন। তাদের কোনো দফতর নেই, কাজও নেই। অথচ তাদের বেতন-ভাতা বাবদ মাসে রাষ্ট্রের খরচ হচ্ছে প্রায় তিন কোটি টাকা।
এদিকে নিয়মিত কর্মকর্তারা পদ না পেলেও প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক ও সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। পাঁচ বছরে সবসময়ই কম-বেশি ২৫০ কর্মকর্তা চুক্তিতে ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় ১০০ কর্মকর্তা প্রেষণে ছিলেন।

পদের চেয়ে কর্মকর্তা দ্বিগুণ
পদ নেই, তারপরও প্রশাসনে রেকর্ডসংখ্যক পদোন্নতি দেয়ার ফলে নানামুখী সঙ্কট তৈরি হয়েছে। পদ খালি না থাকায় পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা উন্নীত পদে পোস্টিং পাচ্ছেন না। এর ফলে তাদের পদোন্নতি-পূর্ব ক্ষেত্রে (এক ধাপ নিচের পদ) কাজ করতে হচ্ছে।

সরকারি চাকরি নিয়ে দুর্নীতির মহোত্সব
মহাজোট সরকারের শেষ সময়ে সরকারি অফিসে জনবল নিয়োগে ধুম পড়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় প্রথম হয়েও চাকরি মিলছে না—এমনও অভিযোগ রয়েছে। দলীয় পরিচয় অথবা অর্থ নিয়োগ চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সব নিয়োগের ক্ষেত্রে মন্ত্রী-এমপিদের সুপারিশকেই প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। তাদের সুপারিশ ছাড়া কোনো চাকরি হচ্ছে না বললেই চলে। বর্তমান সরকারের আমলে নিয়োগকে কেন্দ্র করে পাবনায় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মারধরের ঘটনা দেশে সমালোচনার ঝড় তোলে। ওই কর্মকর্তাদের অপরাধ ছিল এমপির নির্দেশ অনুযায়ী তার পছন্দসই চাকরিপ্রার্থীদের নিয়োগ না দেয়া।
ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকার আড়াই লাখ শূন্যপদে নিয়োগের উদ্যোগ নেয়। এরই মধ্যে এসব নিয়োগ প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছে। চাকরিপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, প্রতিটি নিয়োগের ক্ষেত্রে চলছে দলীয়করণ ও আর্থিক বাণিজ্য।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুলিশ বাহিনীতে ৩০ হাজার লোক নিয়োগ দেয়া হয়। এর পুরোটাই নিয়োগ দেয়া হয়েছে দলীয় বিবেচনায়। এমপিদের তালিকার বাইরে থেকে কাউকেই নিয়োগ দেয়া হয়নি। এমপিরা এসপিদের কাছে যে তালিকা দিয়েছেন, তা থেকেই নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়েছেন এসপিরা। শুধু এসপিদের কাছে তালিকা দিয়েই ক্ষান্ত হননি এমপিরা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও দিয়েছেন এ তালিকা। নামমাত্র পরীক্ষা নিয়ে এমপিদের দেয়া তালিকা থেকেই নিয়োগ দেয়া হয়েছে পুলিশ সদস্যপদে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নিয়োগ দেয়া হয় হাজার হাজার লোককে। এর সবই হয়েছে দলীয় বিবেচনায়।
সচিবালয় সূত্র জানায়, গত বছরের জুলাইয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণীর পাঁচটি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিভিন্ন পদে প্রায় সাড়ে পাঁচশ’ চাকরিপ্রার্থী আবেদন করেন। ২৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের ব্যবহারিক পরীক্ষাও নেয়া হয়। মৌখিক পরীক্ষা নেয়ার আগেই ওই নিয়োগ অনিবার্য কারণ দেখিয়ে প্রথমে স্থগিত ও পরে তা বাতিল করা হয়। এর কারণ হিসেবে মন্ত্রণালয়ের নিয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, ওই মন্ত্রণালয়ের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের এক ব্যক্তি ওই পদে দুইপ্র্রার্থীকে নেয়ার সুপারিশ করেন। তাদের দু’জনেরই বাড়ি ওই ব্যক্তির নিজ জেলা খুলনায়। কিন্তু খুলনা জেলায় কোনো কোটা না থাকায় তারা পিরোজপুর জেলার নাগরিক হিসেবে আবেদন করেন। ঊর্ধ্বতন কর্তার সুপারিশ অনুযায়ী তাদের লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেয়া হয়। লিখিত পরীক্ষায় তারা অকৃতকার্য হলে তাদের কৃতকার্য দেখিয়ে ব্যবহারিক পরীক্ষা নেয়ার নির্দেশ দেন ওই ব্যক্তি। এটি কোনোভাবে সম্ভব নয় বলে তাকে জানিয়ে দেয়া হলে তিনি পরীক্ষা স্থগিত করে দেন। ফলে ব্যবহারিক পরীক্ষা চলাকালে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
একইভাবে বস্ত্র অধিদফতর, রেল মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোয় কয়েকটি পদে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা হলেও পছন্দসই লোক নিয়োগ দিতে না পারায় পরে তা স্থগিত করা হয়েছে।
সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীনে বিভিন্ন কর বিভাগে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণী পদে ২ হাজার ২০০ লোককে তড়িঘড়ি করে নিয়োগ দিয়ে বিতর্কের জন্ম দেয়া হয়েছে। যেদিন লিখিত পরীক্ষা হয়েছে, তার পর দিন মৌখিক পরীক্ষা নিয়েই চূড়ান্ত ফল দেয়া হয়েছে। লিখিত পরীক্ষায় একটি পদের বিপরীতে শত শত প্রার্থী অংশগ্রহণ করলে কীভাবে মাত্র একদিনে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হলো, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। চূড়ান্ত ফলে দেখা গেছে, লিখিত পরীক্ষায় প্রথম হয়েও তার নাম স্থান পায়নি ওই তালিকায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষার ফলে নাম না থাকলেও চূড়ান্ত ফলাফলে নাম আসার মতো ঘটনাও ঘটেছে বিভিন্ন কর অঞ্চলের কয়েকটি পদের ক্ষেত্রে।
এ প্রসঙ্গে কর বিভাগের একাধিক সূত্র জানায়, বিভিন্ন কর অঞ্চলে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণী পদে যে পরীক্ষা নেয়া হয়, তা লোক দেখানো। চাকরি যাদের দেয়া হবে, তাদের তালিকা আগেই তৈরি করা হয়। নিয়ম রক্ষায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে ওই তালিকাই টানিয়ে দেয়া হয়েছে।

সীমাহীন দলীয়করণে গতিহীন প্রশাসন
সীমাহীন দলীয়করণে গতিহীন হয়ে পড়েছে প্রশাসন। এ নিয়ে শুধু আমলাদের মধ্যেই নয়, সুশীল সমাজেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে কঠোর সমালোচনা হলেও সরকারের কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়নি। আন্তর্জাতিক জনপ্রশাসন দিবস উপলক্ষে বিবিসির সঙ্গে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক দুই উপদেষ্টা ও এক সময়ের প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা ড. আকবর আলি খান ও এম হাফিজউদ্দিন খান প্রশাসনে দলীয়করণের কঠোর সমালোচনা করেন। সরকারের সাবেক এ শীর্ষ কর্মকর্তাদ্বয় বিবিসিকে বলেন, বাংলাদেশের প্রশাসনের সব ক্ষেত্রেই এখন রাজনীতিকরণ হয়েছে। প্রশাসনের এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে দলীয়করণ হচ্ছে না। নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি এমনকি চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও দলীয়করণ হচ্ছে। এক কথায় প্রশাসন এখন সম্পূর্ণরূপে দলীয়করণ করা হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর প্রেসিডেন্ট সাবেক সচিব এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, আমি মনে করি বাংলাদেশের প্রশাসনের সব ক্ষেত্রেই রাজনীতিকীকরণ হয়েছে। এখন প্রশাসন সম্পূর্ণরূপে দলীয়করণ করা হয়ে গেছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক মাত্রায় প্রশাসনে দলীয়করণ শুরু করে। পরের মেয়াদে বিএনপি ক্ষমতায় এসে এই দলীয়করণ আরও বাড়িয়ে দেয়। আওয়ামী লীগের বর্তমান শাসনামলে দলীয়করণ সীমাহীন বেড়ে গেছে। এ দলীয়করণ যেমন সিভিল প্রশাসন, পুলিশ, জুডিশিয়ারির ক্ষেত্রে হচ্ছে, এমনকি ডাক্তারদের ব্যাপারেও হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের নিয়োগ থেকে শুরু করে এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে দলীয়করণ হয়নি।
সাবেক কেবিনেট সেক্রেটারি ড. আকবর আলি খান বলেন, প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় এখন রাজনীতি ছড়িয়ে পড়েছে। জনপ্রশাসনে রাজনীতিকীকরণের ক্ষেত্রে নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন এমনকি চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও রাজনীতিকরণ হচ্ছে। এতে জনগণের কাছে সরকারি কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। প্রশাসন দলীয়করণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ক্ষতিকর যে দিকটি, তা নিয়োগের ক্ষেত্রে। দলীয় লোক একচ্ছত্রভাবে নিয়োগ হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের যে আত্মসম্মানবোধ ছিল অর্থাত্ তারা বলতেন, আমি কারও দয়ায় নয়,প্র্রতিযোগিতা করে এখানে এসেছি। এটা অনেকাংশে ম্লান হয়ে গেছে। আর অন্যদিকে জনসাধারণের কাছে তাদের সে ভাবমূর্তিটা আর আগের মতো নেই।
তিনি আরও বলেন, নিয়োগের ক্ষেত্রে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) ভাবমূর্তিতে ধস নেমেছে। পিএসসিকে এখন সম্পূর্ণ রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে। বিশেষ করে ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের পিএসসিতে নিয়োগ দেয়ায় পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। তিনি এ পরিস্থিতির উন্নয়নে পিএসসির চেয়ারম্যান ও কমিশনের সদস্যসহ কর্মকর্তা পদে শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়ার পরামর্শ দেন।