Friday, 11 October 2013

ভূলুণ্ঠিত মানবাধিকার : মেয়াদজুড়েই গুম খুন গুপ্তহত্যা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড : বিরোধী দল ও মত দমনে রিমান্ডে নির্মম নির্যাতন : মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর ওপর আক্রমণ

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে ভুয়া মামলা, শ্যোন অ্যারেস্ট, রিমান্ড, গুম, খুন, গুপ্তহত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং মানবাধিকার সংস্থার ওপর আক্রমণের মধ্য দিয়েই বর্তমান ফ্যাসিবাদী সরকার মেয়াদ শেষ করতে যাচ্ছে। স্বৈরাচারী মহাজোট সরকারের এসব মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে আজ দেশে মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত এবং বিপন্ন। পাঁচ বছরে দেশে এমন বহু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার ভয়াবহতা বর্ণনা করলে শিউরে উঠতে হয়। সরকারের শুরু থেকেই পুরো মেয়াদজুড়ে বিরোধী নেতাকর্মীদের দমন-পীড়নে মিছিল-সমাবেশে নির্বিচারে চালানো হয় গুলি। গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধী মত দমনে স্বৈরতান্ত্রিক স্টাইলে ব্যবহার করা হয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে। বিরোধী দল ও মতের নাগরিকদের দমনে রিমান্ডের যথেচ্ছ ব্যবহার করছে সরকার। কোনো ধরনের অভিযোগ বা সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া কিংবা মামলা থাকলেও তদন্ত ও অনুসন্ধানের আগেই মাসের পর মাস রিমান্ডে রেখে নির্যাতন চালানো হচ্ছে বিরোধী মতের লোকদের ওপর। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশবরেণ্য আইনজীবীরা।
এ ব্যাপারে দেশবরেণ্য আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেছেন, আসামি গ্রেফতার ও রিমান্ডে নেয়ার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন করা হচ্ছে। একইসঙ্গে দেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইনও মানা হয়নি। এগুলো অন্যায় হচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মেনে চলা সরকার ও অধস্তন আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক। সরকার একজনকে গ্রেফতার করে নিম্ন আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাইছে আর আদালতও রিমান্ড মঞ্জুর করছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। এটা উচ্চ আদালতের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন। এতে আইনের শাসন ও মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, রিমান্ড মঞ্জুরের ক্ষেত্রে নিম্ন আদালত স্পষ্টভাবেই উচ্চ আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে চলেছে। নিম্ন আদালত উচ্চ আদালতের নির্দেশনাকে অবমূল্যায়ন করে মূলত সরকারের জুলুমের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন
করছে। স্বাধীন বিচার বিভাগের জন্য এটা বড়ই লজ্জার বিষয় এবং জাতির জন্য দুর্ভাগ্যের কারণ। রিমান্ড অস্ত্রটি সরকার এখন বিরোধী দল ও মতের নাগরিকদের দমনে ইচ্ছেমত ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেন খ্যাতিমান এ আইনজ্ঞ।
সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, রিমান্ড গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি চরম হুমকি। আগে মারাত্মক অপরাধীদেরই কেবল রিমান্ডে নেয়া হতো। এভাবে রাজনৈতিক কর্মীদের রিমান্ডে নেয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। এসব রিমান্ডের ঘটনা সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনার পরিপন্থী। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, সংবিধানে ৩৫(৪) অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে তার বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য বা সাক্ষী প্রদান করতে বলপ্রয়োগ করা যাবে না। এছাড়া হাইকোর্টের একটি জাজমেন্টে রিমান্ড নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। রায়ে বলা আছে, রিমান্ডে নিয়ে কাউকে বলপ্রয়োগ করা যাবে না। শারীরিক নির্যাতন করা তো দূরে থাক, আসামির কাছ থেকে জোর করে কোনো কিছু আদায় করা যাবে না। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় অনুমোদন করেছে। কিন্তু এখন রিমান্ডের নামে যা হচ্ছে, তা অনভিপ্রেত।
গুপ্তহত্যা ও গুমের কয়েকটি ঘটনা : ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের আমলে নতুন মাত্রায় প্রত্যাবর্তন ঘটেছে গুম এবং গুপ্তহত্যার। সরকারের যাত্রা শুরুর পর থেকেই গুপ্তহত্যা ও গুমের মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের সাড়ে চার বছরে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমসহ দেশে দেড় শতাধিক ব্যক্তি গুম-গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর গুম-হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলছে। কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। এখনও গুম হচ্ছে মানুষ। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনরা অসহায় হয়ে পথ চেয়ে আছেন। আদালত-আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মানবাধিকার সংস্থা, রাজনৈতিক নেতা, পত্রিকার অফিস থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে ধরনা দিয়েও স্বজনের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না। জানতে পারছেন না তাদের স্বজন বেঁচে আছেন, না মরে গেছেন। গুম হওয়া ব্যক্তিরা জীবিত না থাকলে তাদের অন্তত লাশ ফেরত চাইছেন স্বজনরা সংবাদ সম্মেলন করে। সে অধিকারটুকু থেকেও তারা আজ বঞ্চিত। আওয়ামী লীগ সরকারের পৌনে চার বছরে বিএনপির কেন্দ্রীয় দুই নেতাসহ দেড় শতাধিক ব্যক্তি গুম-গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছেন। দুবছর পার হলেও বিএনপি নেতা ও ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমের খোঁজ মেলেনি। একইভাবে গুম হলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক এমপি এম ইলিয়াস আলী। গুম হয়েছেন তার গাড়িচালক আনসার আলীও। শ্রমিক নেতা আমিনুল গুম হওয়ার ক’দিন পর তার লাশ উদ্ধার হয়েছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রশিবির নেতা ও সিলেট ছাত্রদলের দুই নেতাও গুম হয়েছেন। একের পর এক গুমের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। এছাড়াও গুমের তালিকায় রয়েছেন ছাত্রদল, যুবদল, শিবির নেতা, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও বিরোধী মতের মানুষ। এ তালিকায় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের কয়েকজন নেতাও রয়েছেন। গুম হওয়ার পর কারও লাশ পাওয়া যায় নদীতে, ডোবায়, জঙ্গলে ও ঝোপের মাঝে। তবে অনেকেরই খোঁজ পাওয়া যায়নি।
উল্লেখযোগ্য গুমের মধ্যে গত বছরের ১৭ এপ্রিল রাতে বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালক আনসার আলী বনানীর সিলেট হাউসের বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। গভীর রাতে বনানী ২ নম্বর রোডে সাউথ পয়েন্ট স্কুলের সামনে থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় তার গাড়ি উদ্ধার করে বনানী থানার পুলিশ। এ ব্যাপারে আদালতে একটি রিট করা হয়। ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর ইলিয়াস আলীকে খুঁজে বের করার আশ্বাস দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাস ও আদালতের নির্দেশের পরও ইলিয়াস আলীকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারেনি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা। অভিযোগ রয়েছে, ইলিয়াস আলীর ঘটনাটি এখন আর তদন্তই করছে না র্যাব-পুলিশ বা গোয়েন্দারা।
এদিকে বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম তিন বছরের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ।
গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি র্যাব পরিচয়ে আটক করে নেয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই মেধাবী ছাত্র আল-মোকাদ্দাস ও ওয়ালিউল্লাহর খোঁজ মেলেনি ৭ মাসেও। ঢাকায় ব্যক্তিগত কাজ শেষে হানিফ এন্টারপ্রাইজের গাড়িতে করে ক্যাম্পাসে ফিরছিলেন তারা। রাত সাড়ে ১১টায় রাজধানীর কল্যাণপুর বাস কাউন্টার থেকে ঝিনাইদহ-৩৭৫০ নম্বর গাড়ির সি-১ ও সি-২ সিটে বসে ক্যাম্পাসে আসার পথে রাত সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মাঝামাঝি সময়ে সাভারের নবীনগর পৌঁছালে র্যাব-৪-এর সদস্য পরিচয় দিয়ে গাড়িটি থামানো হয়। এ সময় র্যাবের পোশাক ও সাদা পোশাকধারী ৮-১০ ব্যক্তি গাড়িতে উঠে আল-মোকাদ্দাস ও ওয়ালিউল্লাহকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে যায় বলে তাদের আত্মীয়-স্বজনকে নিশ্চিত করেন গাড়িতে অবস্থানকারী যাত্রী এবং সুপারভাইজার সুমন। এরপর থেকে র্যাবের হাতে আটক দুই ছাত্রের কোনো সন্ধান পাচ্ছে না তাদের পরিবার। র্যাব তাদের আটকের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। সিলেট জেলা ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার আহমদ দিনারকে গত বছর ১ এপ্রিল র্যাব আটক করে গুম করেছে বলে অভিযোগ করেছে সিলেট জেলা বিএনপি। অন্যদিকে গত ১৩ আগস্ট সাভারের হেমায়েতপুর থেকে ৪ যুবককে র্যাব পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরা হলো—তুষার, মোহন, মিঠু ও মোস্তফা। আজও তাদের খোঁজ মেলেনি। এছাড়া বরিশাল নগরীর ২০ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি ফিরোজ খান কালুর খোঁজও মেলেনি। চট্টগ্রাম নগরীর ঈদগাহ এলাকার ভাড়া বাসার কাছ থেকে কালুকে জোরপূর্বক কে বা কারা একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন তার স্ত্রী আমেনা আক্তার দীপ্তি।
অপহরণের পর গুপ্তহত্যার শিকার যশোর জেলার ঝিকরগাছা থানা বিএনপি সভাপতি নাজমুল ইসলামের ঘটনায় দায়ের করা মামলাটিও পুলিশ সঠিকভাবে তদন্ত করছে না; উল্টো তদন্তের নামে পরিবারের সদস্যদের হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত বছর ১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকার বাংলামোটরে নিজ ব্যবসায়িক কার্যালয় থেকে বের হয়ে আর বাসায় ফিরে যাননি তিনি। পরে গাজীপুরের দক্ষিণ সালনা নামক স্থানে ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডের পাশে তার লাশ পাওয়া যায়। জানা গেছে, এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের করা মামলা এখন গোয়েন্দা বিভাগে স্থানান্তর করা হয়েছে। বরিশালের উজিরপুরের বিএনপি নেতা হুমায়ুন খান ঢাকার মলিবাগ থেকে সাদা পোশাকধারীদের হাতে আটকের পর দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে নিখোঁজ। ২০১০ সালের ২৩ নভেম্বর সকালে হুমায়ুন তার ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ঢাকার সূত্রাপুরের ৪৫/ক, ঢালকানগর ফরিদাবাদের নিজ বাসা থেকে মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় এক বাসায় যান। সেখান থেকে সাদা পোশাকের একদল লোক নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাকে আটক করে। এছাড়াও রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে আটক করে নেয়া তিন যুবকের লাশ পাওয়া যায় গাজীপুর ও মুন্সীগঞ্জে। অন্যদিকে ধলেশ্বরী নদী থেকে উদ্ধার করা হয় ছাত্রদল নেতাসহ ৮ জনের লাশ।
অপরদিকে ২০১০ সালের ৮ নভেম্বর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানা বিএনপি সভাপতি ও করলডেঙ্গা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামকে র্যাব সদস্যরা গাজীপুর থেকে তুলে নিয়ে যায় বলে তার পরিবার অভিযোগ করেছে। গাজীপুর-জয়দেবপুর বাইপাস রোডের চৌরাস্তা এলাকা থেকে সাদা পোশাকধারী ৪-৫ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে তার গাড়ি থেকে জোর করে অন্য একটি গাড়িতে তুলে নেয়। এখন পর্যন্ত তার খোঁজ নেই। রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের আগারগাঁও এলাকার ৪১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি, তার মেয়েজামাই ও তার বন্ধু নিখোঁজ রহস্যের জট খোলেনি আজও। রাজধানীতে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা শামিম ও একইসঙ্গে চার বন্ধুর নিখোঁজ হওয়ার ৮ মাসেও খোঁজ মেলেনি। নিখোঁজ চারজন হলেন—পল্লবী এলাকার আবুল কালাম শেখ, আবুল বাশার শেখ, মিরপুরের আবদুর রহিম ও যাত্রাবাড়ীর ইস্রাফিল।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ১৫৬ জন গুম হয়েছে; যার মধ্যে ২৮ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে।
রিমান্ড : বিরোধী দল ও মতের নাগরিকদের দমনে রিমান্ডের যথেচ্ছ ব্যবহার করছে সরকার। কোনো ধরনের অভিযোগ বা সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া কিংবা মামলা থাকলেও তদন্ত ও অনুসন্ধানের আগেই দিনের পর দিন রিমান্ডে রেখে নির্যাতন চালানো হচ্ছে বিরোধী মতের লোকদের ওপর। রিমান্ড মঞ্জুর ও জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনাকে আমলেই নিচ্ছে না নিম্ন আদালতগুলো। রিমান্ড মঞ্জুরের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও অধস্তন আদালত তা প্রতিনিয়তই লঙ্ঘন করে চলেছে বলে অভিযোগ করেন মানবাধিকার সংগঠক ও বিশিষ্ট আইনজীবীরা। বর্তমান আমলে সাম্প্রতিককালে রিমান্ডে নির্যাতনের ঘটনায় আলোচনায় উঠে আসেন আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম, হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী, বিএনপি নেতা জয়নুল আবদীন ফারুক, আমান উল্লাহ আমান, বরকত উল্লাহ বুলু, শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসেনসহ আরও অনেকে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় শামীম রেজা নামের এক তরুণকে ৫ লাখ টাকা ঘুষ না পেয়ে রিমান্ডের নামে এক পুলিশ কর্মকর্তার বাসায় নিয়ে নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ করে তার পরিবার। একইভাবে বর্তমান সরকারের শাসনামলের শুরুতে সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এম ইউ আহমেদকেও গোয়েন্দা পুলিশ সেগুনবাগিচা থেকে আটক করে নিয়ে যায়। পরে ডিবি কার্যালয়ে নির্যাতনের ফলে তার মৃত্যুর অভিযোগ করে পরিবার।
বাবুনগরীর মতো একজন ধর্মীয় নেতাকে এত লম্বা সময়ের রিমান্ড এই প্রথম। অপরদিকে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেনের রিমান্ডের ঘটনা অনেকটা বিরল। ৫৩ দিনের এত দীর্ঘ রিমান্ডে অতীতে এভাবে কোনো ছাত্রসংগঠনের নেতাকে নিতে দেখা যায়নি। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ২০১০ সালে ১ জুন প্রথম গ্রেফতার করা হয় এবং রিমান্ডে নিয়ে পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়। এরপর গত ১১ এপ্রিল তাকে দ্বিতীয়বার গ্রেফতারের পর প্রথম দফায় দুটি মামলায় ১৩ দিনের রিমান্ডে আনে পুলিশ। রিমান্ডে নির্যাতন ও অনশনে তার অবস্থা খারাপ হলে তাকে রিমান্ড শেষ হওয়ার আগেই তড়িঘড়ি আদালতে হাজির করা হলে তিনি আদালতকে জানান, তাকে ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়েছে এবং তার হাত-পা ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। আদালত তাকে জেলে পাঠালে জেল কর্তৃপক্ষ তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে স্থানান্তর করে। সেখানে তাকে সিসিইউতে রাখা হয়। পরে সুস্থ হলে আবার কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এ বছর গ্রেফতারের পর গত রমজান মাসে তাকে দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে নেয়া হয়। একটি পত্রিকার সম্পাদককে নির্যাতনের এই নজির বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার সম্পাদক আদিলুর রহমানকে গত রোজার ঈদের পর ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে রিমান্ডে পাঠানো হয়। পরে হাইকোর্ট রিমান্ড বাতিল করে জেলগেটে বিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেনকে গ্রেফতার করে ৫৩ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। রিমান্ডে তার ওপর নির্যাতনের কারণে তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছেন না। পত্রিকায় প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, পুলিশ তাকে ডাণ্ডাবেড়ি পরানো অবস্থায় কোলে করে আদালতের এজলাসে নিয়েছে। দেলাওয়ারের স্বাস্থ্যের এ অবস্থায়ও পুলিশ পুনরায় রিমান্ড চাইলে আদালত রিমান্ড মঞ্জুর না করে চিকিত্সার নির্দেশ দেয়। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক মাওলানা শেখ নূরে আলম হামিদী জানান, নিউমার্কেট যাওয়ার পথে কাঁটাবন মসজিদে যান জুমার নামাজ আদায় করতে। নামাজের পর পুলিশ তাকে আটক করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের জঙ্গি আখ্যায়িত করে। রিমান্ডে নিয়ে চালায় নির্যাতন। ২৫ দিন কারাভোগের পর অবশেষে ব্রিটিশ সরকারসহ বিভিন্ন মহলের হস্তক্ষেপে মুক্তি পান তিনি।
সম্প্রতি বিএনপি কার্যালয় থেকে আটক ১৫১ নেতাকে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাদের একযোগে ৮ দিনের রিমান্ডে পাঠায়। ৫৪ ধারায় গ্রেফতারের পর কোনো মামলা বা অভিযোগ ছাড়াই ২০ নারীকে রিমান্ডে পাঠায় আদালত।
হাঁটুতে গুলি : ক্রসফায়ারে বুকে গুলিবিদ্ধ হলে নির্ঘাত মৃত্যু, আর হাঁটুতে কিংবা পায়ে গুলি লাগলে হয়তো বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রাণে বেঁচে গেলেও ক্ষতচিহ্ন নিয়ে কাটাতে হয় সারাটি জীবন। অনেকে পঙ্গুও হয়ে যায় চিরতরে। র্যাব ও পুলিশের ক্রসফায়ার নিয়ে আদালত ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো সোচ্চার হওয়ায় ভিন্ন কৌশল নিয়েছেন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। অভিযানের নামে সন্দেহজনক ব্যক্তিকে আটকের পর বৈধ অস্ত্র দিয়ে ছোড়া হয় গুলি। হাঁটুর নিচে অথবা পায়ে গুলি চালিয়ে তাকে অপরাধী বলে প্রচার করা হয়। র্যাব ও পুলিশের এই নতুন কৌশলে অপরাধী নিধন হবে বলে তাদের ধারণা। বর্তমান সরকারের আমলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের গুলিতে আহত ও পঙ্গু হয়েছেন কয়েকশ’ মানুষ। এসব গুলিবিদ্ধের মধ্যে বেশিরভাগই বয়সে কিশোর-তরুণ। তবে আটককৃত বা গুলিবিদ্ধ ভিকটিম পরিবারের দাবি, অভিযানের নামে নিরপরাধ ব্যক্তিকে আটকের পর অপরাধী সন্দেহে তাদের চোখ বেঁধে নির্জন স্থানে নিয়ে গুলি করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় আহতদের আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের সদস্যরা এ ধরনের বহু অভিযোগ করেছেন, যার প্রমাণ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সন্ত্রাসীদের দমনে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। বেপরোয়া অপরাধীদের গ্রেফতারে অভিযানে নেমে গোলাগুলি এবং গুলিবিদ্ধ হওয়ার অহরহ ঘটনা ঘটছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, সন্দেহ হলেই রাস্তা থেকে কোনো ব্যক্তিকে আটক করে পায়ে গুলি করে আহত করা হয়। সম্প্রতি এ ধরনের অনেক অভিযোগ আসছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গুলি করে ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজ বলেও চালিয়ে দেয়া হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে। তবে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিদের স্বজনরা আটক হওয়া ব্যক্তিকে নিরপরাধ বলে দাবি করেন। অনেক সময় পুলিশের হেফাজতে থাকাকালে ভিকটিম নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ করারও সুযোগ পায় না। তবে কয়েকটি ঘটনায় জানা গেছে, পুলিশ যাদের আটক করে ছিনতাইকারী বলে গুলি করেছে এর মধ্যে নিরপরাধ লোকের সংখ্যাই বেশি।
বিচারবহির্ভূত হত্যা : অধিকারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বছরে (২০১২) ৭০ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নামে অপহরণের পর ২৪ জনকে গুম করা হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও তথ্য কমিশন তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। মানবাধিকার কর্মীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে। অভিযুক্ত দুর্বৃত্তদের রাজনৈতিকভাবে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ২১ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ মওকুফ করেছেন রাষ্ট্রপতি। অধিকার জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে ২০১২ সালে দেশে ২৪ জনকে গুম করা হয়েছে। গুম হওয়ার পর কারো কারো ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায়। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদেরও অভিযোগ রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে। কিছু কিছুক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ধরে নিয়ে যাওয়ার পর প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে আটক ব্যক্তিকে জনসমক্ষে হাজির ও থানায় হস্তান্তর করেছে। গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে এম ইলিয়াস আলী ও গার্মেন্ট শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামও রয়েছেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৭০ জন। গুমের শিকার ব্যক্তিরাও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অধিকার জানায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি ২০০৯-এর ফেব্রুয়ারিতে জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের বৈঠকে বাংলাদেশে সব ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের অঙ্গীকার করেছিলেন। এ অঙ্গীকারের পরও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়নি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ফলে ৫৩ জন ক্রসফায়ারে, সাতজন নির্যাতনে ও আটজন গুলিতে নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে র্যাবের ক্রসফায়ারেই ৪০ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।
হেফাজতে নির্যাতন : দেশে ২০১২ সালে ৭২ ব্যক্তি বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে সাতজন নিহত হয়েছেন।
জেল হেফাজতে মৃত্যু : একই সময়ে জেল হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ৬৩ জনের। দেশের ৬৮ কারাগারের ধারণক্ষমতা রয়েছে ৩৩ হাজার ৫৭০ জনের। কিন্তু এসব কারাগারে বন্দি রয়েছে ৬৮ হাজার ৭০০ জন। বিনা চিকিত্সা, নিম্নমানের খাবার ও পানির অসুবিধাসহ বিভিন্ন কারণে বন্দিদের মানবাধিকার প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে।
অন্যদিকে ২০১১ সালে প্রকাশিত অধিকার-এর রিপোর্টে বলা হয়, বর্তমান সরকারের প্রথম তিন বছরে বিচারবহির্ভূত হত্যা অর্থাত্ ক্রসফায়ারে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ৩৬৫টি। এর মধ্যে রয়েছে ২০০৯ সালে ১৫৪টি, ২০১০ সালে ১২৭টি ও ২০১১ সালে ৮৪টি।
অধিকারের ওপর আক্রমণ : মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ গুম ও গুপ্তহত্যা নিয়ে তত্পর ছিল। এ বিষয়ে তারা প্রতিমাসেই অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করত। কিন্তু তাদের তত্পরতাও থামিয়ে দেয়া হয়েছে। সংগঠনের সম্পাদক অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান খানকে ডিবি পুলিশ হঠাত্ তুলে নিয়ে যায় বাসার সামনে থেকে। অনেকটা গুম হওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল। চারদিকে হৈচৈ পড়ে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চিত করে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এমনই এক পরিস্থিতি চলছে এখন দেশে।
গত ১০ আগস্ট পুলিশ কোনো পরোয়ানা ছাড়াই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগে অধিকার সম্পাদক আদিলুরকে আটক করে। নিম্ন আদালতে তার জামিনের আবেদন করা হলে আদালত তা নামঞ্জুর করে। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ গত মঙ্গলবার তাকে জামিন দেয়। সরকার তার জামিন ঠেকানোর জন্য আপিল বিভাগের চেম্বার জজের কাছে গেলে সেখানে অ্যাটর্নি জেনারেল উত্থাপিত জামিন বাতিলের আবেদন নাকচ হয়। গতকাল আদিলুর রহমান খান মুক্তি পান। তবে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হয়নি।