Sunday, 27 October 2013

বসুন্ধরার হাজার কোটি টাকার লেনদেনে অবশেষে ভূমিমন্ত্রীও ম্যানেজ

শীর্ষ নিউজ ডটকম, ঢাকা:  বসুন্ধরা গ্রুপের বারিধারা প্রকল্পের অবৈধ অনুমোদন ও এ সংক্রান্ত জালিয়াতিতে অবশেষে ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরাও ম্যানেজ হলেন। আজ দুপুরে বসুন্ধরার ফাইলটি অনুমোদন করেছেন তিনি। এর আগে গত ৬ অক্টোবর পূর্ত প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খান এ ফাইলটি অনুমোদন করে ভূমিমন্ত্রীর কাছে পাঠিয়েছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সর্বশেষ ভূমিমন্ত্রীর এই অনুমোদনের মধ্য দিয়ে নজিরবিহীন জালিয়াতির মাধ্যমে বসুন্ধরা গ্রুপ কমপক্ষে ৫০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ লাভ করলো। অভিযোগ রয়েছে, বসুন্ধরা এই প্রকল্পটির অনুমোদন পেতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার লেনদেন করেছে। সূত্রমতে, ভূমি, পূর্ত ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-সচিবসহ রাজউক এবং পরিবেশ অধিদফতরের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় বসুন্ধরা এই নজিরবিহীন অবৈধ কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। 
 জানা গেছে, বসুন্ধরাকে অবৈধ সুবিধা দিতে মন্ত্রী, সচিবসহ দুর্নীতিবাজ একটি মহল অনেকদিন ধরেই তৎপর ছিল। বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্পের অনুমোদন সম্পর্কিত ২০১২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সভায় ১৯টি শর্ত আরোপ করেছিল পূর্ত প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন বেসরকারি আবাসন অনুমোদন কমিটি। ওই বৈঠকেও অনিয়মের মাধ্যমে বসুন্ধরাকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়েছিলো। সূত্রমতে, ড্যাপ লংঘন, সরকারি জমি আত্মসাতসহ নানা কারণে নিয়ম অনুযায়ী বসুন্ধরা প্রকল্পের অনুমোদন পাবারই কথা নয়। কিন্তু, তারপরও বসুন্ধরাকে বিশেষ সুবিধা দিতে গিয়ে এক বছরের জন্য অবৈধভাবে প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। তবে তাতে ১৯টি শর্ত দেয়া হয়।
এতে বলা হয়েছিল-‘শর্তসমূহ পরবর্তী ১ বছরের মধ্যে প্রতিপালন সাপেক্ষে প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন করা হল। প্রকল্পভুক্ত জমির মালিকানা শতভাগ অর্জিত হলে এবং কমিটি কর্তৃক প্রকল্প লে-আউট প্ল্যান অনুমোদিত ও চূড়ান্ত হওয়ার পর এই অনুমোদন কার্যকর হবে।’ কমিটির দেয়া শর্তসমূহ পূরনের সময়সীমা নির্ধারিত ছিল চলতি বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩ পর্যন্ত।২০১২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সভার শর্তে আরো বলা হয়েছিলো, প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত শতভাগ জমির মালিকানা অর্জনের জন্য কোম্পানিকে ক্রয় বহির্ভুত জমি ক্রয় করে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের দপ্তর হতে প্রত্যয়ন গ্রহণ করতে হবে।


শর্তে আরো বলা হয়, প্রকল্পের অভ্যন্তরে সরকারী স্বার্থ সংশ্লিষ্ট জমি (খাস/অর্পিত/ পরিত্যক্ত) কোনক্রমেই সরকারের অনুমোদন ব্যতীত ক্রয়/বিক্রয়/ব্যবহার করা যাবে না এবং প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত সরকারী স্বার্থ সংশ্লিষ্ট জমি জেলা প্রশাসক, ঢাকা কর্তৃক চিহ্নিত করে তফসিল সম্বলিত সাইন বোর্ড স্থাপন করে সংরক্ষণ করতে হবে।
জানা যায়, বসুন্ধরা গ্রুপ এসব শর্তের একটিও পূরণ করতে পারেনি। বিধি অনুযায়ী শর্ত পূরণ না করায় বসুন্ধরার প্রকল্প বাতিল এবং প্রকল্প উদ্যোক্তাদের শাস্তি হবার কথা। কিন্তু শাস্তি তো দূরের কথা, দুর্নীতিবাজরা বসুন্ধরাকে হাজার হাজার কোটির টাকার সম্পত্তি প্রদান করে পুরস্কৃত করেছে। শর্ত পূরণের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই বসুন্ধরার স্বার্থ রক্ষায় চলতি বছরের ৪ সেপ্টেস্বর ড্যাপ সংক্রান্ত উপ-কমিটির বৈঠকের আয়োজন করা হয়। আগের অনিয়মের পথ ধরে এবার আরো বড় ধরনের অনিয়মের আশ্রয় নেয়া হয়।
জানা গেছে, চলতি বছরের ৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সভায় ড্যাপ নিদের্শিত নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ড্যাপ সংক্রান্ত উপ-কমিটি সম্পূর্ণ অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে বসুন্ধরা প্রকল্পের ‘ই’ ব্লক থেকে ‘কে’ ব্লক পর্যন্ত অনুমোদনের লক্ষ্যে ১১টি শর্ত দেয়, যার অধিকাংশ শর্তই ড্যাপ নীতিমালার পরিপন্থী এবং বসুন্ধরার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট।জানা যায়, উপকমিটির দেয়া এই ১১টি সিদ্ধান্তের মধ্যেও বেশ ক’টি সিদ্ধান্ত বসুন্ধরা গ্রুপের প্রভাবে গণপূর্ত সচিব, এ মন্ত্রণালয় এবং রাজউকের কিছু কর্মকর্তা জালিয়াতির মাধ্যমে পাল্টে দিয়েছেন।  


বসুন্ধরা প্রকল্পের বাড্ডা, ক্যান্টনমেন্ট ও গুলশান থানাধীন প্রকল্পের ‘ই’ থেকে ‘কে’ ব্লকের অনুমোদন দেয়ার ক্ষেত্রে ড্যাপ সাব-কমিটির সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিলো ৩০০ ফুট চওড়া কুড়িল ও পূর্বাচল লিংক রোডের উত্তর পাশে ড্যাপ প্রস্তাবিত ১০০ ফুট চওড়া জলাধার সরেজমিনে সীমানা নির্ধারণপূর্বক সংরক্ষণ করতে হবে। যদিও ড্যাপের প্রস্তাবনায় ছিল কুড়িল-পূর্বাচল লিংক রোডের উভয় পাশে (উত্তর ও দক্ষিণ) ১০০ ফুট চওড়া জলাধার সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু সাব কমিটির বৈঠকে দক্ষিণ দিক বাদ দিয়ে কেবলমাত্র উত্তর পাশে জলাধার সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল।সূত্রমতে, বসুন্ধরাকে আরও অবৈধ সুবিধা দিতে গিয়ে জালিয়াতচক্র সাব কমিটির এ সিদ্ধান্তকে জালিয়াতির মাধ্যমে পাল্টিয়ে ১০০ ফুটের পরিবর্তে মাত্র ৫০ ফুট চওড়া জলাধার সংরক্ষণের কথা সভার কার্যবিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

কমিটির সিদ্ধান্তে আরো বলা হয়েছিল, আবেদনকৃত প্রকল্প এলাকার উত্তর ও দক্ষিণ প্রান্তকে সংযোগকারী ড্যাপে প্রস্তাবিত  ৮০ ফুট, ১৩০ ফুট এবং ২০০ ফুট চওড়া সড়ক তিনটির এ্যালাইনমেন্ট অনুসরণ করে আবেদনকৃত প্রকল্পের লে-আউট প্ল্যান সংশোধন করতে হবে। এছাড়া ৩০০ ফুট চওড়া কুড়িল-পূর্বাচল লিংক রোড এবং  উক্ত ৩টি রাস্তার উচ্চতা এক না হওয়ায় উক্ত লিংক রোড ও রাস্তা ৩টির সংযোগ স্থলে ক্লোভারলিফ (ঘাস) এবং প্রয়োজনীয় জায়গা সংরক্ষণ করতে হবে। এ ৩টি রাস্তা ব্যতীত অন্য কোন রাস্তা দিয়ে সরাসরি ৩০০ ফুট চওড়া রোডে প্রবেশ করা যাবে না।
জানা গেছে, বসুন্ধরা হাউজিং পূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউকের জালিয়াত চক্রটির সহায়তায় সাব-কমিটির দেয়া এ সিদ্ধান্তটি পাল্টিয়ে ৩০০ ফুট চওড়া রোডে প্রবেশের এ ৩টি ছাড়াও আরো রাস্তা নির্মাণ ও ব্যবহারের কথা কার্যবিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করেছে।ড্যাপ-এর সাব-কমিটির সিদ্ধান্তে আরো বলা হয়েছিল বালু নদীর পশ্চিম পাশে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর ড্যাপ প্রস্তাবিত ৩০০ ফুট চওড়া ইস্টার্ন বেড়িবাঁধ এবং টঙ্গি ও ডিএনডিকে সংযোগকারী ড্যাপ প্রস্তাবিত ১৩০ ফুট চওড়া সড়কের মধ্যবর্তী এলাকায় ড্যাপে চিহ্নিত জলাধার এলাকা সংরক্ষণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউক যৌথভাবে স্থানীয় জনগণ, ডেভেলপার এবং বিভিন্ন স্টেক হোল্ডারদের সাথে নিয়ে সমগ্র এলাকার জন্য ল্যান্ড রিডজাজমেন্ট প্রকল্পের প্রস্তাবনা দাখিল করতে হবে।


জানা গেছে, জালিয়াতচক্র এ বিষয়টিকে পাত্তা দেয়নি। বরং বর্তমানে এলাকাটি যে অবস্থায় রয়েছে সেভাবেই রাখার উদ্যোগ নিয়েছে। কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিলো যে, আবেদনকৃত প্রকল্প এলাকায় বুয়েট-এর মাধ্যমে ওয়াটার মডেলিং করে বসুন্ধরাকে অভ্যন্তরীণ ড্রেনেজের ব্যবস্থা করতে হবে এবং এ ব্যাপারে ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতামত গ্রহণ করতে হবে। বাস্তবে এ শর্তের তোয়াক্কা না করে বসুন্ধরা হাউজিং নিজেরাই ওয়াটার মডেলিং এবং ডেনেজ নির্মাণ করে উল্লিখিত সংস্থাগুলোকে অবহিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। অর্থাৎ বুয়েট, ওয়াসা ও পাউবোকে পাশ কাটিয়ে বসুন্ধরা গ্রুপ জালিয়াতচক্রের সহযোগিতায় নিজেদের সুবিধামত নিয়মনীতি তেরি করে ৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বৈঠকের কার্যবিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
জানা যায়, সভার কার্যবিবরণীতে বৈঠকে নেয়া সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ না করে পরবর্তীতে কৌশলে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে কার্যবিবরণীতে ‘এল’ ব্লক থেকে ‘পি’ ব্লক পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর বসুন্ধরা গ্রুপ মন্ত্রী-সচিবসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও রাজউকের দুর্নীতিবাজদের সহযোগিতায় ফাইলটি অনুমোদন করিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠে।শীর্ষ নিউজ ডটকমে ৬ অক্টোবর এ সম্পর্কে প্রতিবেদন ছাপা হলে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে তোলপাড় হয়। তারপরই কিছুটা থেমে যায় এই প্রক্রিয়া। অবশ্য, এর আগে সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজে বসুন্ধরা প্রকল্পের এই জালিয়াতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। শীর্ষ কাগজের ওই রিপোর্ট লেখার সময় ফাইলটি পূর্ত প্রতিমন্ত্রীর টেবিলে ছিলো।পূর্তসচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেন স্বাক্ষরের পর গত ২ অক্টোবর প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান খানের স্বাক্ষরের জন্য পাঠিয়েছিলেন। ২ অক্টোবরই এ নিয়ে শীর্ষ নিউজে প্রথম প্রতিবেদন ছাপা হয়। প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খান ফাইলে তাৎক্ষণিক স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকেন, যদিও এর জন্য তদবির চলছিলো। ফাইলটিতে তিনি ৩ অক্টোবর বিকেল পর্যন্ত স্বাক্ষর করেননি। কিন্তু, তাতে বসুন্ধরা গ্রুপ হাল ছেড়ে দেয়নি।


সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ফাইলটি যে কোনোভাবে অনুমোদন করিয়ে নেয়ার জন্য বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষ থেকে বড় অংকের অফারসহ ব্যাপক তদবির অব্যাহত ছিলো। কারণ, একদিকে সরকারের শেষ সময়। এখনই অনুমোদন করিয়ে না নিতে পারলে সামনে দেশের পরিস্থিতি কী ঘটে বলা যায় না। অথচ ফাইলটি এ পর্যন্ত আনতে গিয়ে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে, ইতিমধ্যে বড় অংকের টাকা খরচ হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে অন্য কোনো সরকার এসে পড়লে এতো জালিয়াতি অনুমোদন করানো কোনো ক্রমেই সম্ভব হবে না।ফাইলটি অনুমোদনের অর্থ হলো সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে সরকারি জমি, ডোবা, নদী-নালা বিক্রি করার অনুমতি দেয়া। এখন বসুন্ধরা গ্রুপ প্রকল্পের আওতাধীন জলাশয়, সরকারি জমি, ডোবা, নদী-নালা এবং অন্য সাধারণ মানুষের মালিকানাধীন জমিও দেদারছে বিক্রি করতে পারবে। এসব জমি বসুন্ধরার প্লট হিসেবে বিক্রির সুযোগ তৈরি হলো এবং এ থেকে বসুন্ধরার অন্তত ৫০ হাজার কোটি টাকা অবৈধ আয় হবে।  


জানা গেছে, ৪ ও ৫ অক্টোবর বন্ধের দিনে পূর্ত প্রতিমন্ত্রী বড় অংকের অফারে ম্যানেজ হয়েছেন। সে কারণেই ৬ অক্টোবর রোববার সকালে অফিসে এসেই প্রথম এই ফাইলে স্বাক্ষর করেন। অন্যদিকে, বসুন্ধরা গ্রুপের একজন প্রতিনিধি এবং পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের পিএস রতন চন্দ্র পন্ডিত এদিন ফাইলটির সঙ্গে বরাবরই থাকেন। পূর্ত প্রতিমন্ত্রী স্বাক্ষরের পর পরই খাতায় এন্ট্রি করে তারা ফাইলটি হাতে হাতে ভূমি মন্ত্রণালয়ে নিয়ে যান। ভূমিমন্ত্রীর দফতরের কর্মচারীদের এরা আগেই ম্যানেজ করে রাখেন। ভূমিমন্ত্রীর দফতরে এ ফাইল রিসিভ হওয়ার আগে যাতে আর কোনো ফাইল রিসিভ না হয় সেই ব্যবস্থা এরা করেন। পূর্ত মন্ত্রণালয়ের এই ফাইলটি ভূমি মন্ত্রণালয়ে ব্যাকডেটে রিসিভ হবার পর অন্যান্য ফাইল রিসিভ হয়। ফাইলটি ভূমি মন্ত্রণালয়ে আসার পরও পূর্ত সচিবের পিএস এবং বসুন্ধরা গ্রুপের একজন প্রতিনিধি এই ফাইলের পেছনে লেগে ছিলেন। কিন্তু, ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা এদিন অফিসেই আসেননি।মন্ত্রী অফিসে না আসায় ভূমি মন্ত্রণালয়ে অবস্থান নেয়া বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিনিধি সমস্যায় পড়েন। তাকে বার বার মোবাইল ফোনে বসুন্ধরা গ্রুপের হেড অফিসে যোগাযোগ করতে দেখা যায়। অবশেষে তিনি ভূমিমন্ত্রীর পিএস সত্যব্রত সাহাকে ম্যানেজ করে ফাইলটি মন্ত্রীর বাসায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। দুপুর আড়াইটার দিকে মন্ত্রীর পিএস সত্যব্রত সাহা এবং পিও মো. হুমায়ুন কবীর এই ফাইল নিয়ে মন্ত্রীর বাসায় যান।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বসুন্ধরা গ্রুপের শীর্ষ মহল থেকে এ সময় মন্ত্রীর ওপর ফাইলটি অনুমোদন করার জন্য ফোনে চাপ প্রয়োগ করা হয় এবং বড় অংকের অফারও দেয়া হয়। কিন্তু, ফাইলে এতো বেশি অনিয়ম ও জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে, তাতে মন্ত্রী অবাক হন। তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এক রকমের, আর এই ফাইলে বৈঠকের যে কার্যবিবরণী অনুমোদনের জন্য দেয়া হয়েছে তাতে সিদ্ধান্তগুলো সম্পূর্ণ অন্য রকমের। জালিয়াতির মাধ্যমে সেসব সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলা হয়েছে। এসব কারণে ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা ফাইলটি স্বাক্ষরের সাহস পাননি। ফলে ফাইলটি এখানে থেকে যায়।


সূত্রমতে, এরপর দফায় দফায় ভূমিমন্ত্রীর কাছে আরো বড় অংকের অফার নিয়ে হাজির হয়েছেন বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতিনিধি। ইতিমধ্যে শীর্ষ নিউজের প্রতিবেদনের কারণে আসল ঘটনা জানাজানি হয়ে যাওয়ায় ভূমিমন্ত্রী এটা নিশ্চিত হয়েছেন যে, এই ফাইলে বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষে ব্যাপক জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। এই ফাইলে স্বাক্ষর করলে তাকে ভবিষ্যতে নিশ্চিতভাবেই দুর্নীতির মামলার মুখোমুখি হতে হবে। এ কারণে, ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা ফাইলটিতে স্বাক্ষর না করে গড়িমসি করতে থাকেন। তবে বসুন্ধরা গ্রুপও তাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখে। শেষঅব্দি তারা মন্ত্রীকে ম্যানেজ করতে সক্ষম হয়। অভিযোগ আছে যে, ভূমিমন্ত্রীও বড় অংকের সুবিধা নেয়ার পর আজ রোববার দুপুরে বসুন্ধরার প্রকল্পে অনুমোদন দেন।উল্লেখ্য, বারিধারাস্থ বসুন্ধরার প্রকল্পে এই দফায় অনুমোদন দেয়া হলো ৪ হাজার ৩০২ বিঘা জমি, যার অধিকাংশই সরকারি এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন। রাজধানীর জোয়ারসাহারা, কাঁঠালদিয়াসহ সংশ্লিষ্ট মৌজার এসব জমি বর্তমানে ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি টাকায় কাঠা বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কাঠা জমির গড় মূল্য ন্যূনতম ৫০ লাখ টাকা ধরলেও জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া বসুন্ধরার এই সম্পত্তির দাম প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। বেআইনীভাবে অনুমোদন করিয়ে নেয়া এই জমির মধ্যে সরকারের খাস, নালা ও নদী-খালসহ জমি রয়েছে ৮০০ একর (২ হাজার ৪০০ বিঘা) এবং ভাওয়াল রাজ এস্টেটের জমির পরিমাণ ২১৬ একর (৬৭৮ বিঘা)... বসুন্ধরার দখলকৃত সরকারি ও ভাওয়াল এস্টেটের জমি উদ্ধারে ভূমি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভার সিদ্ধান্ত থাকলেও ড্যাপ উপ-কমিটির সদস্যরা নিজেদের স্বার্থে এসবের পাত্তা না দিয়ে একতরফাভাবে বসুন্ধরাকে অনুমোদন দিয়েছে।

http://www.sheershanews.com/2013/10/27/9107