Sunday, 6 October 2013

বেপরোয়া দুর্নীতির উপাখ্যান- ৬ : টেন্ডার লুটের সরকার

বর্তমান সরকারের পুরো মেয়াদে টেন্ডারসন্ত্রাস ছিল অপ্রতিরোধ্য। টেন্ডারবাজদের থামানোর কোনো উদ্যোগই ছিল না সরকারের। ফলে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রায় সব টেন্ডারই লুট করেছে। টেন্ডার লুট করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এতে সরকারি দলের ক্যাডার ছাড়াও অনেক নিরীহ মানুষকেও জীবন দিতে হয়েছে।
বর্তমান সরকারের সময়ে গোয়েন্দা সংস্থার ভবন নির্মাণ থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ ভবনের টেন্ডারও লুট হয়েছে। এসব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া করার কিছুই ছিল না।
টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঘিরে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী বাহিনী। যেখানে টেন্ডার, সেখানেই হামলে পড়েছে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ ক্যাডাররা। মন্ত্রী-এমপিরাও কম যান না। ফলে প্রকৃত ঠিকাদাররা ছিলেন একেবারেই অসহায়। কাজ না পেয়ে অনেক পেশাদার ঠিকাদার অফিস পর্যন্ত চালাতে পারছেন না। কোনো কোনো ঠিকাদার আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ অগ্রিম ঘুষ দিয়ে কাজ কিনে নিচ্ছেন। ফলে তারা অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ করে ঘুষের টাকা তুলে নিচ্ছেন।
সরকারের শেষ সময়ে অনেকটা মরিয়া হয়েই সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে পেশি আর অস্ত্রের শক্তি প্রদর্শন করছে। এতে প্রাণহানির ঘটনাও বেড়ে গেছে । গত ২৪ জুন চট্টগ্রামে রেলওয়ের টেন্ডার নিয়ে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে শিশুসহ দুজন নিহত হয়। এ ঘটনায় ৫২ জনকে গ্রেফতার করা হলেও কিছুদিন পর তারা পার পেয়ে যায়।

সংসদে দরপত্র কেলেঙ্কারি
সংসদের অধিবেশন কক্ষের জন্য কার্পেট কেনার দরপত্র জমা দিতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন আইনমন্ত্রীর ছেলে। গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সাত-আট যুবকের হুমকির কারণে আরও কয়েকজন ঠিকাদার দরপত্র জমা দিতে পারেননি। বিদেশি এই কার্পেটের দাম প্রায় পাঁচ কোটি টাকা।
২০১১ সালের ৩১ অক্টোবরের এ ঘটনায় জড়িত থাকায় দুই কর্মকর্তাকে তাত্ক্ষণিক বদলি করা হয়েছে। তারা হলেন গণপূর্ত সার্কেল-৪-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির চৌধুরী এবং নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদ মোহাম্মদ কবির। বাধা দেয়া যুবকদের নাম-পরিচয় পাওয়া যায়নি। স্পিকার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এদের পরিচয় জানতে চেয়েছেন। আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদের ছেলে মাহফুজ শফিক অবশ্য স্পিকারের হস্তক্ষেপে পরে দরপত্র জমা দিতে সক্ষম হন।

সিআইডির ভবন নির্মাণের দরপত্রও ছিনতাই
মাগুরায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কার্যালয় নির্মাণ কাজের দরপত্রও ছিনতাই করেছে ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা। অবশ্যই ওই ঘটনার পর দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল করেছে গণপূর্ত বিভাগ।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত ৭ জানুয়ারি ছিল মাগুরা পুলিশ সুপারের কার্যালয় ভবনের ওপরে প্রায় ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে সিআইডির কার্যালয় নির্মাণের জন্য দরপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন।
মাগুরার শ্রমিক লীগ সাধারণ সম্পাদক ও ঠিকাদার মকবুল হোসেন সকালে ওই কাজের জন্য একটি দরপত্র জমা দেন। আরেকজন ঠিকাদারও ওই সময় দরপত্র জমা দেন। সকাল ১০টার দিকে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ঠিকাদার মীর সুমনের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী পুলিশের সামনেই নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষে ঢুকে তাদের দুটি দরপত্র বাক্স থেকে ছিনতাই করে নিয়ে যায়।

রূপসা সেতুর টোল দরপত্র জমাদানে প্রধানমন্ত্রীর চাচাত ভাইয়ের বাধা
শেখ সোহেলের বাধার কারণে ঠিকাদাররা সম্প্রতি খুলনায় রূপসা খানজাহান আলী সেতুর টোল আদায়ের সার্ভিস চার্জের দরপত্র জমা দিতে পারেননি। শেখ সোহেল বাগেরহাট-১ আসনের (মোল্লাহাট-ফকিরহাট) সংসদ সদস্য শেখ হেলালের ভাই। তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই।
নগরের বয়রা সড়ক ভবন সূত্রের বিবরণ অনুযায়ী, খানজাহান আলী সেতুর টোল আদায়ের পাঁচ বছরের সার্ভিস চার্জের দরপত্র জমা দেয়ার শেষ সময় ছিল ২০১১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বেলা ২টা। মোট ৯টি ফরম (শিডিউল) বিক্রি হলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মাত্র তিনটি জমা পড়ে।
শেখ সোহেলের লোকজন সকাল থেকে সড়ক ভবনে অবস্থান নিয়ে তাদের পছন্দের তিনটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকজনকে দরপত্র জমা দিতে বাধা দেয়।

সরকারি ভবনে যুবলীগের আধিপত্য
যুবলীগের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর নেতারা প্রায় সবাই কোনো না কোনো সরকারি ভবনে তত্পর। শিক্ষা ভবন, সড়ক ভবন, মত্স্য ভবন, বিদ্যুত্ ভবন, ঢাকা সিটি করপোরেশন—সর্বত্রই তাদের আনাগোনা। এসব ভবন থেকে সারাদেশের বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন কাজ ও কেনাকাটা সরকারি সিদ্ধান্তে বাস্তবায়ন করা হয়। আর যুবলীগ নেতাদের মাধ্যমেই সবরকম ঠিকাদারি কাজের বিলিবণ্টন হয়। আপস-মীমাংসার মাধ্যমে দরপত্র ফেলা হয়। আবার আপস না হলে ঘটে অস্ত্রের মহড়া।
মহানগর যুবলীগের সাবেক নেতা বর্তমান সংসদ সদস্য (বৃহত্তর বরিশালের একটি আসনের) পুরো রাজধানীর টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন। বিশেষ করে ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রায় সব টেন্ডারই বণ্টন হয় তার ইশারায়। টেন্ডার ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের কারণে দলের এক নেতাকে হত্যার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ক্রীড়া ভবনের টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণ করত সদ্য নিহত রিয়াজুল হক খান মিল্কি, ক্রসফায়ারে নিহত জাহিদ সিদ্দিকী তারেক, মিল্কি হত্যা মামলার আসামি সাখাওয়াত হোসেন ওরফে চঞ্চল ও মতিঝিল যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম ওরফে টিপু।
মত্স্য ভবনের টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণ করে মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান ওরফে বকুলসহ শাহবাগ থানা যুবলীগ সভাপতি প্রার্থী নাজির, শিমুল ও স্বপন।
পূর্ত ভবনের টেন্ডারবাজি (পিডব্লিউডি) নিয়ন্ত্রণ করে মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ওরফে সম্রাট ও কাউসার মোল্লা নামে এক যুবলীগ নেতা।
খাদ্য ভবনের টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণ করে ইসমাইল চৌধুরী, শফিকুল ইসলাম ও মিজানুর রহমান বকুল।
পিডিবির পরীবাগ কার্যালয়ে ইসমাইল, মিজানুর ও শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের অনুসারীদের আধিপত্য বিস্তৃত। ইমন কারাগারে বসেই এখানকার টেন্ডারবাজির টাকার ভাগ পায় বলে জানা গেছে।
মতিঝিলের বিদ্যুত্ ভবনের টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণ করে মিজানুর রহমান আর আবদুল গনি রোডের পিডিবি কার্যালয়ে চঞ্চলের আধিপত্য।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ হয় যুবলীগের সাবেক নেতা বাউফল পৌরসভার মেয়র জিয়াউল হক জুয়েলের মাধ্যমে। গত ১৯ জানুয়ারি রাতে একদল দুর্বৃত্ত জিয়াউলকে শাহবাগ জাতীয় টেনিস কমপ্লেক্সের নিচতলার কার্যালয়ে গুলি চালায়।
গত বছরের ১২ জুন সড়ক ভবনে ঠিকাদারির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গোলাগুলিতে কয়েকজন আহত হয়। সড়ক ভবন সূত্র জানায়, গোলাগুলিতে নেতৃত্ব দেয় যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম, ক্রসফায়ারে নিহত মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক এসএম জাহিদ সিদ্দিকী তারেক ও মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন।
২০১১ সালের ২৬ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুহসীন হলে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত ৬০ জন আহত হন। এক পক্ষের নেতাকর্মীরা আরেক পক্ষকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে-পিটিয়ে জখম করে। গুলি ও ককটেলের বিস্ফোরণও ঘটানো হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, যুবলীগের বিজ্ঞান সম্পাদক শফিকুল টেন্ডারবাজিতে আধিপত্য বজায় রাখতে তাঁর অনুসারী নেতাদের দিয়ে অবাধ্যদের শায়েস্তা করতে গেলে এই রক্তপাত ঘটে। সেই ঘটনায় শফিকুলকে প্রধান আসামি করে মামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে আইসিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার প্রচলন প্রকল্পের জন্য ২০ হাজার ৫০০টি মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর সরবরাহের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। সেই দরপত্রে অংশ নিতে গিয়ে যুবলীগ ক্যাডারদের দ্বারা হেনস্থা হন সরকারি টেলিফোন শিল্প সংস্থার (টেশিস) কর্মকর্তারা। বিষয়টি টেশিসের পক্ষ থেকে প্রকল্প পরিচালককে ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে চিঠি দিয়ে জানানো হয়।
পুরান ঢাকার যুবলীগ নেতা সাগর আহমেদ শাহীন গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা থেকে অস্ত্র কিনতে গিয়ে ধরা পড়েন। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলা হয়। ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তাকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দেয় ঢাকা মহানগর গোযেন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে অভিযোগপত্র দেয়ার আগেই তিনি জামিনে বের হয়ে আসেন। এরপর থেকে সাগর আহমেদ ঢাকা মেডিকেল, শিক্ষা বোর্ডসহ আশপাশের কার্যালয়গুলোর টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে চলেছেন।
গত ৭ এপ্রিল বাড্ডা থানা যুবলীগের আহ্বায়ক কায়সার মাহমুদকে (৩৮) ও তাঁর পরদিন একই এলাকার (৮ এপ্রিল) স্থানীয় ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেনকে (৩৫) একই কায়দায় গুলি করে দুর্বৃত্তরা। এরপর ১৬ জুন গুলিবিদ্ধ হন ২০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের নেতা ইমরুল হোসেন।
যোগ্য ঠিকাদাররা দরপত্রে অংশ নিতে পারেন না সড়ক ভবনের টেন্ডারে : বর্তমান সরকারের সময় সড়ক ভবনের কোনো টেন্ডারে যোগ্য ঠিকাদাররা অংশ নিতে পারেননি। এখানে লোক দেখানো দরপত্র আহ্বান করাও হয় বটে কিন্তু কাজ ভাগ করা হয় গোপনে।
সওজের প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের কাছ থেকে জানা গেছে, লিমিটেড টেন্ডারিং মেথড সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের জরুরি ভিত্তিতে দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া। জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার কিংবা নির্মাণের প্রয়োজনে এই প্রক্রিয়ায় দরপত্র আহ্বান করা হয়ে থাকে। কিন্তু এখন লুটপাটের উদ্দেশ্যে গোপনে এই ধরনের দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে। গত বছরের আগস্ট মাসে গাজীপুর-মাওনা সড়কের জরুরি সংস্কার কাজের জন্য ১৮ কোটি টাকার কাজ ভাগ করে দেয়া হয় কোনো ধরনের দরপত্র আহ্বান ছাড়াই। ওই সময়ে একইভাবে ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-আরিচাসহ বিভিন্ন মহাসড়ক সংস্কারে ৩০০ কোটি টাকার কাজ দেয়া হয়। সড়ক ভবনের প্রকৌশলীদের কাছ থেকে জানা গেছে, এই পদ্ধতিতে এখন দুর্নীতি হচ্ছে অতি কৌশলে। জানা গেছে, উন্মুক্ত দরপত্র এড়াতে সওজের ঢাকা জোন ব্যয় ৫০ লাখ টাকার নিচে রেখে গোপনে এ কার্যাদেশগুলো দিচ্ছে। বর্তমান সরকারের প্রথম বছরের প্রায় চার মাসেই ১৪ কোটি টাকার দুর্নীতি ধরা পড়েছিল।
গত বছরের শুরুর দিকে সওজের ঢাকা জোনে এলটিএম পদ্ধতিতে ২৮৫ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয় জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে। কার্যাদেশও দেয়া হয়েছিল। সওজের সদ্য সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আবদুল কুদ্দুস অবসর নেয়ার আগে তাড়াহুড়ো করে গোপনে এই দরপত্র আহ্বান করেন। অবসর নেয়ার পরও তিনি কার্যাদেশপত্রে স্বাক্ষর করেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রধান প্রকৌশলীর দফতরের রেজিস্টারে ওইসব কার্যাদেশ লিপিবদ্ধ করার কথা। কিন্তু তা করা হয়নি। ওইসব কার্যাদেশপত্রে স্মারক নম্বরও দেয়া হয়নি। ঢাকা জোনের ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, শেরপুর, নরসিংদী ও মুন্সীগঞ্জ—এই আট জেলার সড়ক সংস্কারের জন্য ২৮৫ কোটি টাকার এই কাজ গোপনে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়। তিনটি গ্রুপে গোপনে দরপত্র আহ্বান করা হয়। জানা গেছে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিআর) ২০০৬ ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা-০৮ অনুযায়ী, সরকারি কাজে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দরপত্র দেয়ার ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ও সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) ওয়েবসাইটে নোটিশ প্রকাশ এবং পাঁচ কোটি টাকার বেশি কাজের দরপত্র কেনা ও জমা দেয়ার জন্য অন্তত ২৮ দিন সময়সীমা দেয়ার বিধান আছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়নি। দরপত্র বিক্রির শেষ দিন ছিল গত ৮ জানুয়ারি। দরপত্র জমা ও খোলার দিন ছিল গত ৯ জানুয়ারি। দরপত্র জমা দেয়ার সময় পার হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে এসব কাজের নোটিশ সিপিটিইউয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। পিপিআরের শর্ত অনুযায়ী একই কাজকে একাধিক ভাগে ভাগ করার কোনো নিয়ম নেই। অথচ প্রতিবছর সওজে জরুরি ভিত্তিতে গোপন দরপত্র হিসেবে পরিচিত লিমিটেড টেন্ডারিং মেথডের মাধ্যমে রাস্তা সংস্কারের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়।
এদিকে গত বছর ২৮৫ কোটি টাকার ১৬টি ঠিকাদারি কাজ অনিয়মের মাধ্যমে ভাটোয়ারা করে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অনুসন্ধানে অনিয়ম ধরা পড়লে কাজগুলো বাতিল করা হয়।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্র জানায়, সওজের কাজগুলো বেশি টাকার হওয়ায় এদিকে সরকারের সব মহলের নজর থাকে। সূত্র জানায়, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ ও রেলের ওয়াগন ক্রয়সহ প্রতিটি টেন্ডারে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। এরই মধ্যে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার নামে ৩২৯ কোটি টাকার টেন্ডারে মহাজালিয়াতি ধরা পড়ে। বিদেশি কোম্পানির নাম দিয়ে এ কাজটি বাগিয়ে নেয় সরকারি দলের নেতারা। সমপ্রতি দরপত্র গোপন রেখে নারায়ণগঞ্জে সরকার দলীয় ঠিকাদারদের মধ্যে ৫০ কোটি টাকার কাজ ভাগাভাগি করে দেয়া হয়।
স্বরূপকাঠি পৌরসভার সোয়া ৩ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ ভাগাভাগি করে নেয় আওয়ামী লীগ নেতারা। ৩৯টি প্রতিষ্ঠান ওই কাজের দরপত্র দাখিল করলেও আগেই ভাগাভাগি চূড়ান্ত করে ফেলেন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীরা। সাতক্ষীরায় টেন্ডারবাজির টাকা ভাগাভাগি নিয়ে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসানসহ উভয় পক্ষের ২০ জন নেতাকর্মী আহত হয়।

রাজউক ভবনে পুলিশের সামনেই ৮৫ কোটি টাকার টেন্ডার ছিনতাই
গত ২৯ মে পুলিশের উপস্থিতিতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ভবনে এবার ৮৫ কোটি টাকার টেন্ডার ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। মেসার্স আতাউর রহমান খান ট্রেডার্স, এম আর কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, নিয়াজ আবুলজভি লিমিটেড এবং রফিক কনস্ট্রাকশন লিমিটেডসহ বেশ কয়েকটি নামি প্রতিষ্ঠানের এসব টেন্ডার ডকুমেন্ট ছিনতাই করা হয়েছে। ‘রয়েল ইকুইপমেন্ট অ্যান্ড কন্সট্রাকশন লিমিটেড’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভাড়া করা সন্ত্রাসীরা এই দুঃসাহসিক কাজটি করেছেন বলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন। এসব টেন্ডার ডকুমেন্ট ছিনতাইয়ে নেতৃত্ব দেন গোপালগঞ্জের ক্ষমতাসীন দলের এক সংসদ সদস্যের পিএ টোয়েল। তাকে সহায়তা করেন যুবলীগ কর্মী রাজ ও সুমনসহ শতাধিক বহিরাগতের নেতৃত্বে একটি সশস্ত্র গ্রুপ। তারা সকাল থেকেই টেন্ডার পাহারা দিয়ে এ কর্মকাণ্ড ঘটায়। সাধারণ ঠিকাদাররা সশস্ত্র গ্রুপের কাছে থাকা অস্ত্রের কারণে সামনে এগুতে সাহস পাননি।
এর আগে গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর রাজউক ভবনে প্রকাশ্যে ২৫ কোটি টাকার টেন্ডার ডকুমেন্ট ছিনতাই হয়েছে। পুলিশের উপস্থিতিতেই ওইদিন দেশের শীর্ষস্থানীয় নির্মাণ প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম লিমিটেডের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে টেন্ডার ডকুমেন্ট ছিনতাই করে দুর্বৃত্তরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, পদ্মা ট্রেডার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান আবদুস সালাম খানের ভাড়া করা দুর্বৃত্তরা টেন্ডার ছিনতাই করে। সালাম খান গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দিয়ে রাজউকে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে জানায় রাজউকের একাধিক সূত্র। শেষ পর্যন্ত মোনেম লিমিটেডসহ আরও একাধিক প্রতিষ্ঠান সিডিউল জমা দিতে ব্যর্থ হলেও দুপুর আড়াইটায় টেন্ডার খোলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রাজউকের সংশ্লিষ্ট শাখা।
সম্প্রতি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক উন্নয়ন ও বিউটিফিকেশন কাজের ৯ কোটি টাকার টেন্ডার শিডিউল আওয়ামী লীগ ক্যাডাররা ছিনিয়ে নিয়েছে। এ সময় বাধা দেয়ায় ঠিকাদারদের ওপর হামলাও চালানো হয়।
সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, গতকাল রাজউক কেন্দ্রীয় বিভাগ উত্তর (গুলশান-বনানী) সেন্ট্রাল পার্ক (ওয়ান্ডার ল্যান্ড) উন্নয়ন ও বিউটিফিকেশনের জন্য প্রায় নয় কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। সকাল নয়টার দিকে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শিডিউল জমা দিতে এলে তাদের ওপর হামলা চালায় এবং শিডিউল ছিনতাই করে স্বেচ্ছাসেবক লীগের ক্যাডার মানিক ও রাজু গ্রুপ। চার-পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসব আওয়ামী ক্যাডারদের হামলার শিকার হয়েছে বলে জানা গেছে।
এলজিইডিতে সরকারি দলের ক্যাডার ও ঠিকাদার ছাড়া অন্যদের প্রবেশ নিষেধ : এলজিইডির একটি সূত্র জানায়, সরকারি দলের লোক ছাড়া আর কেউ এখানকার টেন্ডারে অংশ পর্যন্ত নিতে পারেনি। যেখানে টেন্ডার আহ্বান করা হয় সেখানে সরকারি দলের বিভিন্ন গ্রুপ নিজেদের মধ্যে কাজ ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। আবার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে নিজেদের মধ্যেও সংঘর্ষ হচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় টেন্ডার দখলে নেয়াকে কেন্দ্র করে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গত বছর ৪ গ্রুপের দেড় কোটি টাকার কাজে ৪নং গ্রুপের ৩২ লাখ টাকার কাজসহ অন্যান্য কাজ নিতে শহর আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। দিনাজপুরে ১৪ কোটি টাকার টেন্ডার নিয়ে গত ৮ এপ্রিল ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এ সন্ত্রাসী ঘটনায় জড়িত ১২ জনের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে মামলাও করা হয়। পরবর্তী সময়ে অবশ্য এদের সবাই বেকসুর খালাস পেয়েছে। লক্ষ্মীপুরে টেন্ডারবাজি করতে গিয়ে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের কম্পিউটারসহ আসবাবপত্র ভাংচুর করায় আওয়ামী লীগের তিন নেতাকে জেল দেয়া হয়। ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু এলজিইডি ও পৌরসভার প্রায় ৪ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। সাধারণ ঠিকাদাররা শিডিউল কিনে জমা দিতে না পারায় হরিণাকুণ্ডু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল বাশারের কাছে রি-টেন্ডারের জন্য আবেদন করেছেন।

পিডিবি ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নিয়ন্ত্রণে
বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সব টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ। গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মতিঝিল পিডিবিতে ছাত্রলীগ সমর্থিত ঠিকাদারদের প্রায় তিন কোটি টাকার টেন্ডার (দরপত্র) ছিনিয়ে নিয়েছে যুবলীগ ক্যাডাররা। ওই দিন এ ঘটনার জের ধরে পুলিশের উপস্থিতিতেই পিডিবি ভবনে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে সাধারণ ঠিকাদাররা আতঙ্কে তাদের দরপত্র জমা না দিয়েই প্রাণ ভয়ে পালিয়ে যান। কুমিল্লায় বিদ্যুত্ ভবন নির্মাণের জন্য ২ কোটি ৯০ লাখ টাকার পুনর্দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল ওই দিন।
গত বছরের ৭ মার্চ ২৩ কোটি টাকার টেন্ডার ভাগাভাগি নিয়ে গণপূর্ত ভবনে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। সেগুনবাগিচা গণপূর্ত বিভাগের অধীনে বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিভিন্ন ভবন নির্মাণ ও সংস্কারে প্রায় ২৩ কোটি টাকার টেন্ডার শিডিউল জমা দেয়ার তারিখ ছিল ওই দিন। এজন্য সকাল ১০টা থেকে শিডিউল জমা দেয়া শুরু হয়। এ সময় সাধারণ ঠিকাদাররা শিডিউল জমা দিতে গেলে সরকারদলীয় একাধিক ক্যাডার তাদের বাধা দেয়। একপর্যায়ে গণপূর্ত ভবনের সামনে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীদের মধ্যে তর্কবিতর্ক ও হাতাহাতি শুরু হয়। এতে গণপূর্ত ভবনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে টেন্ডার শিডিউল জমা দেয়া বন্ধ হয়ে যায়। গণপূর্ত বিভাগের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ দলীয় ক্যাডাররা ১৭ জানুয়ারি ঠিকাদারদের অবরুদ্ধ করে রাখে। তারা সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দফায় দফায় ঠিকাদারদের ওপর হামলা চালায়। ক্যাডাররা টেন্ডার ডকুমেন্টস ফেলে দিয়ে ঠিকাদারদেরও বের করে দেয়। বিতর্কিত এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের ক্যাডাররা এ তাণ্ডব চালায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেগুনবাগিচার সরকারি ১২ তলার ২নং ভবনের গণপূর্তের ডিভিশন-৪-এর কার্যালয়ে এসব ঘটনা ঘটে।
স্বাস্থ্য টেন্ডার ছাড়াই কোটি কোটি টাকার কাজ পাচ্ছে পছন্দের প্রতিষ্ঠান : স্বাস্থ্য সেক্টরে দুর্নীতির নতুন অপকৌশল ‘স্পট কোটেশন’। পছন্দসই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সহজে কাজ পাইয়ে দিতে কিংবা ব্যবসায়িকভাবে লাখ লাখ টাকা মুনাফার সুযোগ করে দিতে বর্তমানে স্বাস্থ্য সেক্টরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ‘স্পট কোটেশন’-এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালামাল কেনাকাটার ধুম পড়েছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রেগুলেশনস (পিপিআর) নির্দেশিত নিয়মনীতি লঙ্ঘনের মাধ্যমে অবৈধভাবে স্পট কোটেশনে কার্যাদেশ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানপ্রধান টেন্ডারযোগ্য কেনাকাটাকে অপকৌশলে স্পট কোটেশন দেখিয়ে বিশেষ ব্যক্তি বা সংস্থাকে কার্যাদেশ পাইয়ে দিচ্ছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা যায়, বর্তমানে রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল, ৩২টি অপারেশন প্ল্যান (ওপি) ও নানা ধরনের প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্পট কোটেশনে নিম্নমানের এমএসআর সামগ্রী, যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন দ্রব্যাদি উচ্চমূল্যে কেনা হচ্ছে।

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর
এখানে টেন্ডারে কাজ পাওয়া তো দূরে থাক, সরকারি দলের সঙ্গে আপসরফা ছাড়া কেউ টেন্ডার দাখিল পর্যন্ত করতে পারেন না। সকাল থেকেই ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ ক্যাডাররা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর দখল করে রাখে। গত বছরের ২৯ জুন রাজধানীর শিক্ষা ভবনে ২১ কোটি টাকার টেন্ডার দখল নিয়ে ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ৮ জন আহত হয়। ইইডি সূত্র জানায়, ১৮২৯ কোটি টাকার টেন্ডার বাগিয়ে নিতে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরে গত ক’মাস ধরে শুরু হয়েছে মহড়া-পাল্টা মহড়া। টেন্ডার বাগিয়ে নিতে মাস তিনেক আগে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে। একাধিকবার সংঘর্ষও হয়েছে এ দু’পক্ষের মধ্যে।
গত বছরের ২৭ এপ্রিল মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (শিক্ষা ভবন) প্রায় ২১ কোটি টাকার টেন্ডার দখল নিয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপে সংঘর্ষ ও গোলাগুলি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৩ মে ছিল শিক্ষা ভবনে ৬টি সরকারি কলেজের নতুন ভবন নির্মাণের টেন্ডার শিডিউল জমা দেয়ার তারিখ। প্রতিটি কলেজের নতুন ভবনের জন্য বাজেট প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা করে।
ফেব্রুয়ারি মাসে টাঙ্গাইল জেলা পরিষদ ও শিক্ষা প্রকৌশল অফিসের ৪ কোটি ১৯ লাখ টাকার টেন্ডার সরকারদলীয় লোকজন ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকারের শুধু দরপত্র বিক্রি থেকে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৩০ লাখ টাকারও বেশি। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির (আইসিটি) ভবন নির্মাণ কাজের জন্য ৩৪ কোটি টাকার কাজ সরকারি দলের নেতারা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়। কাজের জন্য ৪৫টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র কিনলেও টেন্ডার জমা দেয়ার শেষ দিনে মাত্র ৬টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিতে পেরেছে। এগুলোর মধ্যে ৫টি আওয়ামী লীগ সমর্থিত নেতাকর্মীদের।
গত বছর ৪৪ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ কব্জা করার জন্য চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনে নামে। সংগঠনটির কিছু নেতাকর্মী উপাচার্যের অপসারণসহ যে ২১ দফা দাবি উত্থাপন করেছে, এর মধ্যে ১০টি দাবিই নির্মাণ ও ক্রয়সংক্রান্ত।
সম্প্রতি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের সাড়ে ১০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের দরপত্র জমা দিতে পারেননি মাগুরার সাধারণ ঠিকাদাররা। অন্যদিকে ঝিনাইদহে একই অধিদফতরের পৌনে ১২ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের শিডিউল সাধারণ ঠিকাদারদের কাছে বিক্রি করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ও নেতারা এই দুটি দরপত্রের কাজ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। তাদের পক্ষে ঝিনাইদহের সন্ত্রাসীরা দরপত্র জমাদানে বাধা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে মাগুরার ১১ জন প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। তাদের অভিযোগ, দরপত্র জমাদানের শেষ দিনে গতকাল সন্ত্রাসীরা অস্ত্রের মুখে তাদের দরপত্র জমা দিতে দেয়নি।

মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদফতর
এখানেও সরকারি দলের বাইরে কাজ পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সিন্ডিকেটের বাইরে কেউ এখানে টেন্ডার জমা পর্যন্ত দিতে পারে না। সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকার টেন্ডারকে কেন্দ্র করে তেজগাঁওয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সংলগ্ন সরকারি মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদফতরে (বিজি প্রেস) হামলা এবং কর্মচারীদের মারধরের ঘটনা ঘটেছে। ছাত্র নামধারী ঠিকাদার রফিকুল ইসলাম ও শরফুল ইসলামের নেতৃত্বে যুবলীগ পরিচয় দেয়া একদল সন্ত্রাসী এ হামলা চালায়। গত বছরের ১৬ জুন সকাল ১০টায় তেজগাঁও মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ে রফিকুল ইসলাম ও শরফুল ইসলামের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী হামলা চালায়। সন্ত্রাসীরা অধিদফতরের কর্মচারী মুহিবুল ওয়াহাব জাফরিকে বেধড়ক মারধর করে। শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে সহকারী পরিচালক আইয়ুবকে। ওইদিনই তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। এজাহারে বলা হয়েছে, মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদফতর কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি কাগজ ও কম্পিউটার কেনার জন্য ৩৫০ কোটি ১৮ লাখ টাকার টেন্ডার আহ্বান করে। দরপত্র অনুযায়ী ঠিকাদারদের শিডিউল গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় কর্তৃপক্ষ ১৫ জুন তা বাতিল করে দেয়। দরপত্র বাতিলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই দুই নামধারী ঠিকাদার প্রকাশনা অধিদফতরে হামলা চালায়।

ডিসিসি
ঢাকা সিটি করপোরেশনে সাড়ে আট কোটি টাকার দুটি ঠিকাদারির কাজ নিয়ে গত বছর তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে। টেন্ডার শিডিউল জমা দেয়া নিয়ে সরকারদলীয় দুই গ্রুপের মধ্যে প্রায় এক ঘণ্টা সংঘর্ষ চলে। সংঘর্ষে একজন আহত হন। আহত ফজর আলী শাহবাগ ইউনিট আওয়ামী লীগের সভাপতি। সংঘর্ষের সময় দু’পক্ষই ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে নগর ভবনের পরিবেশ উত্তপ্ত করে তোলে।

কেসিসিতে টেন্ডারবাজি, ফের ২৫ কোটি টাকার কাজ ভাগবাটোয়ারা
এডিপির অর্থায়নে খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) খাল খনন প্রকল্পের প্রায় ২৫ কোটি টাকার কাজ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করা হয়। এই কাজে শিডিউল জমা দিতে গিয়ে উভয় গ্রুপের ঠিকাদারদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। একই দিন খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) রাস্তা ও ফুটপাত সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার কাজ কেসিসি ঠিকাদার কল্যাণ সমিতি ও মহানগর যুবলীগের নেতারা কাজ ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। এর আগে গত ১৪ আগস্ট কেসিসির বৈদ্যুতিক তার, এনার্জি বাল্ব সরবরাহ ও ওয়াসার নলকূপের মালামাল ক্রয়, পাম্প মেরামত, ওয়াটার ফিল্টার ক্রয় করার জন্য এক কোটি টাকার কাজ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারার অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে মাসে চলতি অর্ধশত কোটি টাকার কাজ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভাগবাটোয়ারা করে নেয়া হয়েছে। এটাকে সরকারের শেষ মুহূর্তে নগর ভবনে টেন্ডারবাজির মহোত্সব মনে করা হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডে টেন্ডারবাজি
কলাপাড়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে জলবায়ু ট্রাস্ট ও সরকারি তহবিলের প্রায় সাত কোটি টাকার কাজ নির্বাহী প্রকৌশলীর যোগসাজশে একটি বিশেষ মহলসহ সরকারি দলের কিছু ঠিকাদারকে হাতিয়ে নেয়। টেন্ডারের ফরম কিনতে না পেরে ক্ষুব্ধ অন্য ঠিকাদারেরা নির্বাহী প্রকৌশলীকে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছে। এদিকে নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) খালকাটা ও বেড়িবাঁধ মেরামত কাজের টেন্ডারের কাগজপত্র জমা দিতে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীদের হামলায় ঠিকাদার জাহাঙ্গীর মোল্লা (৫৫) আহত হয়েছেন। তাকে নড়াইল সদর হাসপাতালে ভর্তি করা করেছে।
গতকাল বুধবার (১৯ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টায় পানি উন্নয়ন বোর্ড চত্বরে ছাত্রলীগ নড়াইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সৌমেন চন্দ্র বসু, শ্রমিক লীগ নেতা খন্দকার মাশরুর বিল্লাহ নেনু ও যুবলীগের বুরহানের নেতৃত্বে প্রায় ৫০ জন ছাত্র ও যুবলীগ নেতাকর্মী ঠিকাদার জাহাঙ্গীর মোল্লার কাগজপত্র ছিনিয়ে নিয়ে তাকে ধাওয়া করেন। ঠিকাদার জাহাঙ্গীর মোল্লা পাউবো অফিসসংলগ্ন নড়াইল প্রেসক্লাব চত্বরে এসে আত্মরক্ষা করেন।
সম্প্রতি লালমনিরহাটে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩ কোটি টাকার কাজে টেন্ডারবাজির ঘটনা ঘটেছে। জানা যায়, লালমনিরহাট জেলার তিস্তা নদীর চন্ডিমারী স্পার বাঁধের সংস্কার কাজের জন্য প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে একটি কাজ রাজস্ব খাত থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড করার উদ্যোগ নেয়। কাজটির জন্য চলতি বছর প্রাথমিক বরাদ্দ পাওয়া গেছে প্রায় ৪৩ লাখ টাকা। ফলে পানি উন্নয়ন বোর্ড গত বুধবার চন্ডিমারী বাঁধের সংস্কার কাজের জন্য টেন্ডার ড্রপিংয়ের দিন ধার্য করে। এ উপলক্ষে সকাল ৯টা থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অফিস চত্বরে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকলেও একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের সুবিধাভোগী টেন্ডারবাজদের কাছে যেন তারা অনেকটাই ছিল অসহায়। আর এ অবস্থার মুখে সাধারণ ঠিকাদাররা শিডিউল কিনেও ড্রপিংয়ের নির্ধারিত দিন তারা তাদের শিডিউল ড্রপিং করতে পারেনি।

বিদ্যুত্ ভবনে টেন্ডারবাজি, প্রবেশ করতে দেয়নি অনেক কোম্পানিকে
সম্প্রতি রাজধানীর আবদুল গণি রোডের বিদ্যুত্ ভবনে বিদ্যুত্ বিতরণ কর্তৃপক্ষের (ডিপিডিসি) প্রি-প্রিন্টার্স বিল ফর্ম এক কোটি ৪৪ লাখ টাকার টেন্ডারে মাত্র দুটি কোম্পানি ছাড়া আর কোনো কোম্পানিকে টেন্ডার জমা দিতে দেয়নি সরকারি দলের ক্যাডাররা।
টেন্ডারে অংশ নিতে অনেক কোম্পানির প্রতিনিধি এলেও এ দিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত টেন্ডার জমা দেওয়ার সময় থাকলেও দুষ্কৃতকারীদের বাধার মুখে ফিরে যায় সবাই।
কেবল মাস্টার্স সিমেক্স পেপারস লিমিটেড ও ইউনিসন পেপার প্রডাক্ট অ্যান্ড প্যাকেজিং নামক দুই কোম্পানি ছাড়া সকাল ১০টার পরে আর কোনো কোম্পানিকে ভেতরে প্রবেশই করতে দেয়া হয়নি।

রেলের টেন্ডার পেতে হলে ছাত্রলীগ-যুবলীগকে চাই
ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে ম্যানেজ না করলে কোনো টেন্ডারে অংশ নেয়ার কথা কল্পনাও করা যায় না। গত পাঁচ বছর ধরে এমনই অবস্থা বিরাজ করছে রেলভবনে। সম্প্রতি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক শিশু ও এক যুবলীগ নেতা নিহত হয়েছেন। ওই দিন দুপুর পৌনে ১২টায় নগরীর কোতোয়ালি থানার সিআরবি এলাকায় সাত রাস্তার মোড়ে এই ঘটনা ঘটে। রেলের প্রায় দেড় কোটি টাকার তিনটি প্রকল্পের টেন্ডার জমা দেয়াকে কেন্দ্র করে এই সংঘর্ষ হয়। কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের অনুসারী ক্যাডারদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সাইফুল আলম লিমন ও তার অনুসারী ক্যাডারদের মধ্যে ঘণ্টাব্যাপী এই সংঘর্ষে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
এদিকে দায়মুক্তি আইনকে ব্যবহার করে টেন্ডার ছাড়াই জ্বালানি ও বিদ্যুত্ খাতের বড় প্রকল্পগুলোর কাজ দেয়া হচ্ছে বিদেশি কোম্পানিকে। গত বছরের ৯ জানুয়ারি ভারতীয় কোম্পানি মান ইন্ড্রাস্ট্রিকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার গ্যাস সঞ্চালন পাইপ সরবরাহের কাজ দেয়া হয়।

টেন্ডারবাজরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে
বিভিন্ন সময় টেন্ডার সন্ত্রাসের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও পরে কার্যক্রম থেমে যায়। গত পাঁচ বছরে ক্ষমতাসীন দলের শুধু ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা খুনোখুনি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সংঘর্ষসহ একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ সময়ে ছাত্রলীগের সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনায় ১৭ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন দেড় হাজারের বেশি। এসব ঘটনার কয়েকটির বিচারকাজ চলছে, বাকি ঘটনার তদন্ত অদৃশ্য কারণেই হয়নি। এভাবে অধিকাংশের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে যাচ্ছে পর্দার অন্তরালে। এ কারণে পুলিশের সামনেই টেন্ডারবাজ অপরাধীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের ক্ষমতার কাছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও অনেকটা অসহায়। আবার কিছু দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তা তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদত দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এতে পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়া সরকারদলীয় ক্যাডারদের দখলেই থাকছে।


মোহাম্মদপুরে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথের নিরাপত্তা প্রহরী খুন

স্টাফ রিপোর্টার

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথের নিরাপত্তা প্রহরী এনামুল হককে (২১) কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। শনিবার রাতে এ ঘটনা ঘটে। গতকাল ভোরে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে। তবে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বুথ থেকে কোনো টাকা খোয়া যায়নি। কী কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, এনামুল হক মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের একটি এটিএম বুথে নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে চাকরি করতেন। তিনি এক বছর ধরে এই বুথের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। গতকাল ভোর ৬টার দিকে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের একটি টহল দল বুথের সামনের রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে পড়ে থাকতে দেখে। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিত্সকরা জানান, নিহত এনামুলের মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে।
মোহাম্মদপুর থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) রতন সরকার জানান, কী কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ব্যাংকের বুথ থেকে টাকা খোয়া যায়নি। বুথটিও অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। এসআই রতন সরকার বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, রাত ২টা থেকে ভোর ৬টার মধ্যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। বুথে কোনো চক্র লুটতরাজ চালাতে এলে এনামুলের বাধা পেয়ে তাকে ছুরি মেরে হত্যা করতে পারে। তিনি বলেন, এ এলাকায় কয়েকটি ছিনতাইকারী চক্র রয়েছে। তারা কোনো অপরাধমূলক কাজ করতে গেলে এনামুলের বাধা পেয়ে তাকে আঘাত করে হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে। এছাড়া এনামুল হকের সঙ্গে কারও বিরোধের কারণেও এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে এ ব্যাপারে কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি। ময়না তদন্তের পর দুপুরে তার লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এনামুলের বাবার নাম আবদুর রশিদ। গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের তারাইল উপজেলার বাওলাবাড়ি এলাকায়। মোহাম্মদপুরে নবোদয় হাউজিং এলাকার একটি বস্তিতে সপরিবারে থাকতেন তিনি। এ ব্যাপারে থানায় একটি হত্যামামলা দায়ের করা হয়েছে।