Sunday, 20 October 2013

বি ডি আর হত্যাকান্ডের সেই গোপনীয় অধ্যায়গুলো-৩য় খন্ড

১ম খন্ড ও ২য় খন্ডের পর-সমগ্র পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয় অতি বিস্ময়কর চালাকী ও নিষ্ঠুরতার সাথে। বাংলাদেশকে দীর্ঘসময় ধরে এহেন ভ্রাতৃঘাতী ঘটনার বেদনাদায়ক মর্মবেদনায় ভুগতে হবে। আমাদের ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে সর্বসাকুল্যে সেনাবাহিনীর ৫৫ জন অফিসার শহীদ হয়। তাদের মধ্যে সবাই যুদ্ধে নিহত হয়নি; কেউ কেউ সড়ক দূর্ঘটনা সহ অন্যবিধ কারনেও মৃতু্যবরণ করে। সেনা বাহিনীর কোন সেক্টর কমান্ডার এই মৃতু্য তালিকায় ছিল না। অথচ বিডিআর বিদ্রোহে মাত্র দুই দিনের মধ্যে হত্যা করা হলো ২ জন মেজর জেনারেল, ২ জন ব্রিগেডিআর জেনারেল, ১৬ জন কর্ণেল, ১০ জন লেন্ট্যানান্ট কর্ণেল, ২৩ জন মেজর, ২ জন ক্যাপ্টেন, মেডিক্যাল কোরের ৩ জন অফিসার। বিদ্রোহে উপস্থিত সেনা অফিসারদের দুই তৃতীয়াংশই নিহত হলো। এই পৈশাচিক উপখ্যানের সূদুরপ্রসারী পরিণতি নিয়ে ভাববার আগে দেখা যাক বাংলাদেশী ষড়যন্ত্রকারী ও তাদের সাঙ্গাতরা কে কিভাবে এই হত্যাযজ্ঞ সংঘটনে ভূমিকা রেখেছে।

২৪শে ফেব্রম্নয়ারী রাত ১০টা থেকে ১১ টার মধ্যে ঢাকার ঝিকাতলাস্ত একটি ফিলিং ষ্টেশনের মালিক আতাউর তার মোবাইল থেকে বিডিআর এর ডিজিকে একটি ফোন করে বিডিআর এর ডিজি শাকিলকে এই মর্মে জানায় যে, স্যার আপনাকে কালকে পীলখানায় মেরে ফেলবে। আপনি কালকের অনুষ্ঠানে যাবেননা্ তার এই ফোন কল, র্যাব হেড কোয়াটার আড়িপেতে শুনে এবং কিছু সময়ের মধ্যে আতাউরকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনার পর তাকে অবশ্য ছেড়ে দেয়া হয়। র্যাব এবং এডিজি কর্ণেল রেজা নুর অনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য টিএফআই সেলকে প্রদান করে। এতদসত্বেও আমার জানা মতে এমন একটি তথ্য কোন তদনত্দ রিপোটেই উল্লেখ করা হয়নি। এটা মেনে রীতিমত অবিশ্বাস্য যে টি এফ আই সেল এমন একটি গুরম্নত্বপূর্ন তথ্য ধর্তব্যের মধ্যে তথা তাদের বিবেচনায় আনেনি। কিভাবে এমন একটি তাৎপর্যময় তথ্য গোপন করা হলো তা নির্ণয় করা সম্ভব না হলেও এটা সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় যে, কোন একটি ফন্দি-ফিকির করে সেই তথ্যটিকে চাপিয়ে ফেলা হয়েছে। আমরা দেখব যে সরকারের ভিতর থেকে কিভাবে এমনি ধরনের ছল-চাতুরী পূর্ন ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে অপরাধীদের রক্ষা ও দেশকে প্রতারিত করা হয়েছে।

২৫ তারিখ সকাল পৌনে নয়টার সময় গোয়েন্দা সংস্থা এন এস আই এই মর্মে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করে যে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পীলখানায় বিদ্রোহ শুরু হবে। একই তথ্য সেনাবাহিনী প্রধানকেও দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী কোনরম্নপ পাল্টা ব্যবস্থা প্রহন করেনি। সেনাপ্রধানও বিষয়টাতে নীরবতা অবলম্বন করে। তাদের পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের নিবৃত্ত থাকা ও নীরবতা অবলম্বন থেকে এটা ষ্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে বিদ্রোহ পরিকল্পনামাফিক বাস্তবায়িত হবার ব্যাপারে তারা আগ্রহী ছিলেন। পীলখানায় বিদ্রোহের শুরুতেই বিডিআর এর ডিজি প্রধানমন্ত্রী, সেনাপ্রধান ও ডিজিএফআই এর ডিজিকে ফোন করলে তারা অবিলম্বে তাকে সাহায্য করার অঙ্গীকার করে। কর্ণেল গুলজার (?) সেনাবাহিনীর সিজিএস এবং ডিএমও'র সাথে কথা বলে এবং র্যাব-২ এর কমান্ডিং অফিসার লে: ক: জামান এর সাথে কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে অবিলম্বে সেনাবাহিনী প্রেরনের অনুরোধ জানায়। তারা বিডিআর এর ডিজির সাথে ধোঁকাবাজি করে এবং ঢাকা সেক্টরের কমান্ডার মজিব ৩৬ রাইফেল ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে: কর্ণেল এনায়েত ও লে: কর্ণেল বদরুল ও অন্যান্য সিনিয়র অফিসারদের তাদেও ইউনিট এ গিয়ে জওয়ানদের শানত্দ করার নির্দেশ জ্ঞাপন করে।

বিডিআর এর মহাপরিচালক যদিও জানতো যে একটা গন্ডগোল হবে; কিন্তু এটা যদি জানতো যে তাদেরকে উপর মহলের প্রদত্ত আশ্বাস হবে স্রেফ ধোঁকাবাজি এবং তাদেরকে বলির পাঁঠা বানানো হবে তাহলে অবশ্যই তারা ভিন্ন ভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সচেষ্ট হতো। তাদের মধ্যে অনেক নাম করা কমান্ডো অফিসার ছিল। তারা সহজেই কিছু এসএমজি ছিনিয়ে নিয়ে ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে পাল্টা আক্রমন চালিয়ে বিদ্রোহ সর্বাত্বকভাবে দমন করতে না পারলেও অনত্দত বিদ্রোহীদের বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারতো। ভাগ্যাহত অফিসারদের অনেকের স্ত্রী বিদ্রোহ শুরু হলে সেনা প্রধান মঈনের স্ত্রীকে সাহায্যের জন্যে ফোন করলে মঈনের স্ত্রী এ মর্মে ফোনে বকবকনো করতে থাকেন যে, ইনকামিং কল তিনি কিছুই শুনতে পারছেননা। তার এই চাতুর্যপূর্ণ ভূমিকা থেকে এটা আরো একটু বুঝা যায় যে বিদ্রোহে তার স্বামীর ভূমিকা ছিল সন্দেহজনক।

সকাল সাড়ে দশটায় র্যাব ১০ এর অফিসাররা পীলখানার ৫নং গেট সংলগ্ন নিচু উচ্চতার দেয়ালের নিকটে পেঁৗছে যে দেয়াল দ্বারা সনি্নহিত বেসামরিক এলাকা থেকে বিডিআর সদর দফতরকে আলাদা করা হয়েছে। ঐ জায়গাটা ছিল বিদ্রোহ দমনে ঝটিকা অভিযান শুরু করে সদর দফতরকে মুক্ত করার সবচাইতে উপযুক্ত জায়গা। কিন্তু সাড়ে এগারটার দিকে র্যাব এর এডিজি কর্ণেল রেজা নূর র্যাব-১০ অফিসারদের অধিনায়ককে পীলখানা থেকে ৩ মাইল দূরে বেড়ী বাঁধ এলাকায় গিয়ে অবস্থান গ্রহনের নির্দেশ জ্ঞাপন করে। এটা স্বভাবতই জিজ্ঞাস্য যে কার নির্দেশে কিংবা পরামর্শে এবং কেন কর্ণেল রেজা সে নির্দেশ প্রদান করেছিল? বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে তদনত্দ কর্যক্রমে এই সব দিক মোটেই আমলে নেয়া হয়নি। কর্ণেল রেজা নূর এর চাচাতো ভাই হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ট সহকারী বাহউদ্দীন নাসিম। সে কারনে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চিনে। যথাসম্ভব হয় প্রধানমন্ত্রী নিজে অথবা তাঁর ঘনিষ্ট মহলের কেউ রেজা নূরকে দিয়ে ঐ কাজটি করিয়ে থাকবে। র্যাব -১০ কে ওখান থেকে সরিয়ে নেয়ায় বিদ্রোহ পরিকল্পনা বাসত্দবায়নে অনেক অনুকুল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

ঐ পথ দিয়েই বিদ্রোহীরা সদর দফতরের অস্ত্রাগার লুন্ঠন করে তার আওয়ামীলীগের কমিশনার তোরাব আলীর বাসভবনে স্থানানত্দর করে যা ছাত্রলীগের ক্যাডারদের মধ্যে বিতরন করা হয় এবং তার চাইতেও বড় সুবিধা যে সে পথ দিয়ে বিডিআর এর হত্যাকারীরা নিরাপদে হাজারীবাগ ও ঝিকাতলা এলাকা দিয়ে বিনা বাধায় পালিয়ে যায়। র্যাব-১০ এর মোতায়েনকে পুন বিন্যস্থ করা ছিল স্পষ্টতই বিদ্রোহীদের অনুকুলে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। আরো উল্লেখ্য যে, র্যাব ১০ এর পাশাপাশি র্যাব ২ এবং ৩ কে ধানমন্ডি এলাকায় মোতায়েন করা হলেও তাদেরকে দিয়ে বিদ্রোহ দমনে কোন উদ্যেগই নেয়া হয়নি। তাদেরকে নড়চড়হীন করে রাখা হয়।

বিডিআর এর ডিজি নিহত হয় সকাল সাড়ে দশটায়। ভারতীয় টিভি চ্যানেল 'চবি্বশ ঘন্টা' বিষ্ময়করভাবে অতি অল্পসময়ের মধ্যে বিডিআর ডিজি ও তার স্ত্রী নিহত হবার সংবাদপ্রচার করে সকাল এগারটায়। ভারতের আর একটি চ্যানেল এনডি টিভি সংবাদ শিরোনামে দেখায় ১২টার সময় এবং আরও সংবাদ প্রচার করে ১২.১৫ মি: এর সময়ে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে এই বিদ্রোহের সংবাদ চাপা রাখা হয় ২৬ তারিখ অপরাহ্ন পর্যনত্দ। অথচ কর্ণেল মজিব ও লে: ক: এনায়েত এর লাশ উদ্ধার করা হয় ২৫ তারিখ বিকেল আড়াইটার সময়। এদিকে বিকেল ৩.৩০মি: এর সময় বাংলাদেশের মিডিয়া ঘটা করে নানক কতর্ৃক নিয়ে আসা ১৪ জন বিডিআর বিদ্রোহীর সাথে চা বিস্কুট খেতে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারী বাসভবনে বৈঠক করার খবর প্রচার করা হয়। উক্ত সভা চলে ১৫০ মিনিট। মাঝপথে প্রধানমন্ত্রী একটি টেলিফোন কল রিসিভ করার পর তিনি বিডিআর বিদ্রোহীদের প্রতিনিধিদলকে বলেন, তোমরাতো বিডিআর এর ডিজিকে মেরে ফেলেছো, এই সময় বিডিআর এর ডিএডি তৌহিদ বলে উঠে যে, তাহলে সম্ভবত ডিজি মারা গেছেন এটা রীতিমত অবিশ্বাস্য যে তখন পর্যনত্দ প্রধানমন্ত্রী ও তার মেহমান হিসাবে আসা বিদ্রোহীরা জানতোনা বিডিআর এর ডিজির হত্যাকান্ডের খবর অথচ সকাল ১১ টা থেকে ভারতীয় টেলিভিশনের পর্দায় বিডিআর কর্মকর্তাদের হত্যাকান্ডের খবর অবিরত প্রচার করা হচ্ছিল আর ইতিমধ্যে সমগ্র রাজধানীতে এটা নিয়ে ব্যপক আলাপ আলোচনা হচ্ছিল অথবা এটা কি সত্যিই বিশ্বাস করা যায় যে বিদ্রোহীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর তেমন জিজ্ঞাসা নিতানত্দই উদাসীনতা বশত করা হয়েছিল? সম্ভবত প্রধানমন্ত্রীর তেমন অজ্ঞতাসূলভ (?) জিজ্ঞাসার মধ্যে বিদ্রোহীদের প্রতিনিধি দলের জন্য একটি বার্তা নিহিত ছিল।

উক্ত ফোন কলের বার্তা লাভের পরও বিদ্রোহীদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক থেকে এটা স্পষ্টতই মনে হয় যে আসলে তেমন কোন ঘটনাই তথা হত্যাকান্ড বা রক্তপাত তখন পর্যনত্দ ঘটেনি। সভার বাকী সময় অতি শানত্দভাবে কেটে গেলেও একবারের জন্যও প্রধানমন্ত্রী ডিজির স্ত্রী ও তাদের ছেলে মেয়ে ও অন্যান্য অফিসার ও তাদের ছেলে মেয়েদের ভাগ্য সম্পর্কে কোন খোঁজ খবর নেয়নি। অথবা সে তাদের নিরাপত্তা বিধানের কোন আহবানও বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী রাখেননি। অথচ দরবার হলে হত্যাকান্ড শুরুর পর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষনে নিয়োজিত ন্যাশনাল মনিটরিং সেল থেকে অফিসারদের পরিবার পরিজনদের নির্যাতনের কথা প্রধানমন্ত্রীকে বহু বার জানানো হয়। সেনা প্রধানকে বিডিআর বিদ্রোহীদের সাথে বাইরের লোকজনের কথাবার্তার বিষয়ে জানানো হয়। কিভাবে বিদ্রোহীরা অফিসারদের হত্যা করছে এবং তাদের পরিবার পরিবার পরিজনদের উপর অত্যাচার নির্যাতন চালাচ্ছে সেই সব কথাবার্তায় তার বিবরণ শুনা যায়। সেনাপ্রধান এহেন বর্বরতা মোকাবেলা করার মত কোন পদক্ষেপ গ্রহনের বদলে ন্যাশনাল মনিটরিং সেল এর অফিসারদের শানত্দ থাকার এবং কোনরুপ আবেগ তাড়িত হতে নিবৃত্ত থাকার নির্দেশ জ্ঞাপন করেন।

বিদ্রোহের সাতে প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের মৌন সম্মতির সাথে সঙ্গতি রেখে বিডিআর হত্যাকারীদের জন্য সাধারন ক্ষমা ঘোষনা ও তাদের দাবী দাওয়া মেনে নেয়ার আশ্বাস প্রদান করা হয়। রাত নেমে আসার সাথে সাথে আত্মতৃপ্তিতে বলিয়ান বিডিআর বিদ্রোহীদের প্রতিনিধি দল নানককে সাথে নিয়ে বিডিআর সদর দফতরে প্রত্যাবর্তন করেন। নানক একজন সাহসী নেতা ও বিদ্রোহীদের কাজকে সমর্থন জ্ঞাপনে সাফল্য অর্জনকারী হিসেবে বিদ্রোহীদের দ্বারা সমাদৃত হন। কিছু সময় পরই সাংসদ তাপস সংবাদ মাধ্যমকে জানায় যে ডি এডি তৌহিদ এখন থেকে বিডিআর এর মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর নাতির এমন ঘোষনা টিভির পর্দায় ভাসতে থাকে হত্যাকারী ও তাদের দুষ্কর্মের সহায়তাকারীরা বুঝতে পারলো যে সেনা অভিযানের আশংকা দূরীভূত হয়ে গেছে। পরবর্তীতে তাপস বিডিআর সদর দপ্তরের অভ্যনত্দরে গিয়ে বিদ্রোহেিদর সবকিছু ধুয়েমুছে সাফ করে ফেলার নির্দেশ জ্ঞাপন করে। কার্যক্ষেত্রে এটা ছিল হত্যাকান্ডের জন্য লাইসেন্স প্রদান করা। সেই লাইসেন্স সে অর্থহীন ছিলনা পরবর্তীতে তা সবাই বুঝতে পারে।

দরবার হলের একটি টয়লেট এ কর্ণেল এমদাদ জীবিত ছিলেন। সেখানে সে জোহর এর নামায আদায়ের পর তার স্ত্রীরর সাথে মোবাইলে কথা বলেন। রংপুরের সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল আফতাব তার সহকর্মী একজন ব্রিগেডিয়ার ও দুইজন কর্ণেল এর নিকট বিকেল সাড়ে চারটার সময় এই মর্মে তিনটি এসএমএস প্রেরণ করেন যে আমি দরবার হলে বেঁচে আছি। আমাদের দয়া করে বাচাঁও। গুরম্নতর ভাবে আহত মেজর মোসাদ্দেকের অতি উদ্বেগজনক ও অব্যাহত ফোন কল এ তাঁকে বাঁচানোর আশ্বাস প্রদান করা হলেও কার্যক্ষেত্রে কিছুই করা হয়নি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরনে সে সাড়ে ৫টার দিকে ইনত্দেকাল করে। সেনা অফিসারদের বাচাঁনোর কোন উদ্যোগই গ্রহন করা হয়নি। তাদেরকে বাঁচানোর দ্বায়িত্ব যাদের ছিল তারা অন্যদের পৃষ্টপোষকতায় ব্যাসত্দ ছিল।
সন্ধ্যা রাত্রির দিকে পীলখানা থেকে এ্যাম্বুলেন্স যোগে আহতদের স্থানানত্দরের কাজ শুরু হয়। কিন্তু এটা ছিল একটা বাহানা। ঐ এ্যাম্বুলেন্স এ করে ভাড়াটে খুনীদের বধ্যভূমি থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। পীলখানা থেকে এ্যাম্বুলেন্স এ বের করে তাদেরকে পূর্ব নির্ধারিত পয়েন্ট এ অপেক্ষমান মাইক্রোবাসে উঠিয়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশ বিমানের বিজি০৫৯ নং বিমানে তাদেরকে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গনত্দব্যে পেঁৗছিয়ে দেয়া হয়।
ঐ দিন বিকেলে পুলিশের আইজি নূর মোহাম্মদ পীলখানা থেকে তার সদ্য বিবাহিত কন্যাকে উদ্ধারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। সে পীলখানা প্রবেশের জন্য কয়েকবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের অনুমতি প্রার্থনা করে। কিন্তু তার প্রার্থনা না মঞ্জুর করা হয়। বিক্ষুদ্ধ আইজি মরীয়া হয়ে একাই যাওয়ার সিদ্ধানত্দ গ্রহন করে। এমতাবস্থায় সাহারা অস্ত্র সমর্পন ও অফিসারদের পরিবার পরিজনদের উদ্ধারের নাটক শুরু করে। সাহারা কেবলমাত্র ওটোশী ভবন থেকে আইজির কন্যা ও বিদ্রোহের ষড়যন্ত্রে জড়িত কর্ণেল কামরুজ্জামানের স্ত্রী ও মিসেস আকবরকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। এমনকি উক্ত ভবনের দোতালার উপরে তিনি যাননি। উক্ত ভবনের উপরের দিকে অবস্থানকারীরা সহ অন্যান্য আবাসিক ভবনের সবাইকে তাদের ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে আসা হয়।

সাহারা খাতুন পীলখানা ত্যাগ করার পর পরই কর্ণেল আফতাবকে হত্যা করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর আগমনে তার মনে হয়তো এই বিশ্বাস হয়েছিল যে বিদ্রোহের নিষ্পত্তি হয়েছে এবং তাই তিনি তার গোপন স্থান থেকে বের হয়ে এসে তার স্ত্রী ও কন্যার সাথে সাক্ষাত করতে যায়। সে জানতো যে তারা অফিসারস মেসে আছে। কোয়াটার গার্ড অভিমুখে যাওয়ার পথেই তাকে গুলি করা হয়। কর্ণেল রেজাকে হত্যা করা হয় রাত ৩টার পরে। সাহারা খাতুনের প্রত্যাবর্তনের পর কর্ণেল এলাহীকেও হত্যা করা হয়। সে একটি ম্যানহোলে পালিয়ে ছিল। সেখান থেকে বের হলেই তাকে হত্যা করা হয়। এই ভাবে বেশ কয়েকজন অফিসারকে রাতে হত্যা করা হয়। সরকার প্রধান ও নিজেদের সেনাপ্রধানের বিশ্বাসঘাতকতায় জাতীর নিরাপত্তা বিধানে নিবেদিতপ্রাণ এইসব অফিসারদের জীবন প্রদীপ অতি অল্প সময়ে নিভে যায়। সেনাবাহিনীতে কর্মরত তাদের অসহায় ও অবমানিত সহকর্মীদের পক্ষে তাদের বাঁচানোর কোন ফুরসতই ছিলনা।