Thursday, 10 October 2013

বেপরোয়া দুর্নীতির উপাখ্যান- ৯ : চাঁদাবাজির মহোত্সব : পরিবহন ও নৌ সেক্টরে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ খোদ মন্ত্রীর হাতে

বেপরোয়া চাঁদাবাজদের কবলে রাজধানীসহ সারাদেশ। হাট-ঘাট, ফুটপাথ, শহর-বন্দর কিংবা গ্রাম-গঞ্জ সর্বত্রই ক্ষমতাসীন দল আশ্রিত মাস্তানদের নামে চাঁদাবাজি চলছে। নিয়ন্ত্রণও করছেন সরকারি দলের মন্ত্রী ও এমপিরা। খোদ নৌপরিহন মন্ত্রীই চাঁদাবাজদের গডফাদারে পরিণত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিনিয়ত চাঁদা দিতে হয় সড়কে, বাসে, লঞ্চে, রেল স্টেশনেও। প্রতিটি বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল চাঁদাবাজদের কাছে যেনো সোনার খনি। প্রত্যেকটি সড়কে রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামে প্রকাশ্যেই চলে চাঁদা আদায়। বাস, ট্রাক, টেম্পো, রিকশা, অটোরিকশা, প্রাইভেটগাড়ি যে কোনো বাহনের চালক ও মালিকদেরই প্রতি ট্রিপেই পয়েন্টে পয়েন্টে মাস্তানদের চাঁদা দিতে হয়। দিন কিংবা মাস হিসেবে চাঁদা দিতে হচ্ছে সবাইকে। চাঁদা না পেলেই হামলা, মামলা, হুমকি এমনকি খুন যখম হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। চাঁদাবাজদের হাত থেকে কেউই রেহাই পাচ্ছে না। কখনো বড় ভাইয়ের নামে, কখনো নেতার নামে, কখনো পুলিশের নামে, কখনো বিভিন্ন সংগঠন বা অুনষ্ঠানের নামে চাঁদাবাজি চলছে। পালাতক ও আত্মগোপনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে চাঁদাবাজি চলে বড় শহর কিংবা বন্দরে। চাঁদা না দিলেই লাশ হতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কিংবা তার পরিবারের লোকজনকে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে ‘হয় চাঁদা না হয় মৃত্যু।’ চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় প্রাণহানিও হয়েছে বহু মানুষের। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে চাঁদাবাজির কারণে দেশের মানুষ চরম উদ্বেগ উত্কণ্ঠা ও আতঙ্কে দিন পার করতে হয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজি হচ্ছে মোবাইল ফোনে। সন্ত্রাসীরা অদৃশ্যে থেকেই ভয়ভীতি দেখিয়ে আতঙ্ক তৈরি করে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের কাছে চাঁদাদাবি করছে। এই চাঁদাবাজি থেকে রেহাই পাচ্ছে না খোদ পুলিশ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। চাঁদা চেয়ে হুমকি হিসেবে আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য মিষ্টির বক্সে করে পাঠানো হচ্ছে কাফনের
কাপড়, ককটেল ও হাত বোমা। সন্ত্রাসীরা চাঁদা দাবিকৃত ব্যক্তি কিংবা তার সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের চলাফেরার পথ অনুসরণ করে ফোনে তা জানিয়ে গুলি করার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজি করছে কারাগারে বসেই। চাঁদাবাজিতে পিছিয়ে নেই পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশের দুর্বৃত্ত সদস্যরাও। র্যাবেরও কতিপয় অসাধু সদস্য ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজি কিংবা অর্থ আদায়ের বেশুমার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে প্রতি বছর গড়ে ১৩ হাজার পুলিশকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। যার অধিকাংশই ছিল চাঁদাবাজি কিংবা অর্থ আদায়ের মতো অপরাধ। টাকার জন্য নির্যাতন করে হত্যা, নির্মম নির্যাতন করে পঙ্গু করে দেয়া, সংবেদনশীল মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে চালান করার মতো অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে খোদ পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। পুলিশের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারারা দেশজুড়ে চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না।
এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে রাজধানী ঢাকার ফুটপাথ ও মার্কেটে প্রতিদিন কমপক্ষে ৭ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হচ্ছে। কমপক্ষে ঢাকার ২ লাখ ৬০ হাজার হকারকে জনপ্রতি দৈনিক চাঁদা দিতে হয় ৩০০ টাকা করে। এসব টাকা চলে যায় রাজনৈতিক নেতা মাস্তান এবং পুলিশদের হাতে।

চাঁদার নিয়ন্ত্রণ নৌমন্ত্রীর হাতে
নৌপরিবহনমন্ত্রী মন্ত্রী হলেও মাদারিপুরের এমপি শাজাহান খান নিয়ন্ত্রণ করেন সড়ক পরিবহন ও লঞ্চ ঘাট এবং নৌবন্দরের চাঁদাবাজি। শাজাহান খান একদিকে শ্রমিক নেতা, অন্যদিকে পরিবহন কোম্পানির মালিকও তিনি। শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা হয়ে পরিবহনে চাঁদার হার নির্ধারণ করেন। এজন্য একবার সরকারি প্রজ্ঞাপনও জারির চেষ্টা করেছিলেন। আবার এই শাজাহান খানই সরকারের সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। যে উপদেষ্টার প্রধান কাজ পরিবহন চাঁদাবাজি বন্ধ করা। তিনি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলেরও সদস্য, এই পদের ব্যক্তিরও প্রধান কাজ সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অথচ তিনি সড়কের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার কাজে নিয়োজিত। তিনিই ঘাতক গাড়ি চালকদের পক্ষ নিয়ে বলেছিলেন, গাড়ি চালকদের শিক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার জন্য গরু ছাগল চিনলেই হলো।
চাঁদাবাজির লাইসেন্স নেয়ার জন্য শাজাহান খান বর্তমান সরকারের সময় চাঁদার হার ঠিক করার চেষ্টা করেন। ঢাকায় মালিক-শ্রমিকের জন্য ৭০ টাকা এবং শুধু ঢাকার বাইরে শ্রমিকদের জন্য ২০ টাকা প্রস্তাব করে তা সরকারিভাবে প্রজ্ঞাপনের চাপ তৈরি করেন। ২০০৯ সাল থেকে ওই চেষ্টা চালান তিনি। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে উপত্তি ওঠায় ওই উদ্যোগ সফল হয়নি।
শ্রমিক নেতারা জানান, মালিক শ্রমিক ফেডারেশনের নামে যে চাঁদা তোলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অবৈধ। কারণ, সংগঠন পরিচালনায় খরচের জন্য শ্রম আইনে যে চাঁদার কথা বলা হয়েছে, তা দৈনিক নয়, মাসিক কিংবা বার্ষিক। এ ছাড়া ফেডারেশন সারা দেশের শ্রমিক সংগঠনের সমন্বয়কারী বা কেন্দ্রীয় সংস্থা। তাই ফেডারেশন সরাসরি প্রতিটি বাস থেকে চাঁদা তুলতে পারে না। কেবল শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে মাসে বা বছরে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা নিতে পারে ফেডারেশন। এখন ফেডারেশন ও শ্রমিক ইউনিয়ন আলাদাভাবে চাঁদা আদায় করে যাচ্ছে। বিআরটিএর সূত্র জানায়, সারা দেশে বর্তমানে প্রায় চার লাখ বাণিজ্যিক যানবাহনের নিবন্ধন রয়েছে। এর মধ্যে বাস-মিনিবাস ও ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। ১০ টাকা করে চাঁদা আদায় করলে এ তিন পরিবহন থেকেই দৈনিক ১৫ লাখ টাকার বেশি চাঁদা তোলা হয়। মাসে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা এর বাইরে অটোরিকশা, হিউম্যান হলার, ট্যাংক লরি থেকেও নিয়মিত চাঁদা তোলা হয়।
শাজাহানা খানের বাহিনী মাওয়া-কাওড়াকান্দি ঘাটে প্রতিদিন অর্ধকোটি টাকা চাঁদা নেয়। মাদারিপুর জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির একাধিক বৈঠকে খোদ পুলিশ সুপার ও মন্ত্রীর নামে বা তার নিয়োজিত ব্যক্তিদের চাঁদা আদায়ের কথা জানান। কিন্তু মন্ত্রী এসব বন্ধে কোনো প্রতিকার নেননি।
শাজাহান খানের নামে সদরঘাট টার্মিনালে চলে বেশুমার চাঁদাবাজি। ঘাটে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য প্রসিদ্ধ লালবাহিনীও তার নিয়ন্ত্রিত। মূলত তিনি নৌ ও সড়ক পরিবহনের চাঁদাবাজদের গডফাদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
শাজাহান খানের নিয়োজিত ব্যক্তিরা বা তার অনুমোদন দেয়া সংগঠনের নামে ঢাকা মুন্সীগঞ্জ, ঢাকা-মাওয়া, ঢাকা-মাদারিপুরসহ বিভিন্ন রুটের বাসে নিয়মিত চাঁদা আদায় হয়। যার সিংহভাগ যাচ্ছে শাহজাহান খানের হাতে। এছাড়া সড়ক পরিবহন সমিতি, সড়ক পরিবহন ফেডারেশসহ চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন সংগঠনেরও প্রধান তিনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, সর্ষের মধ্যেই ভূত দেখা দিয়েছে।

পণ্যবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি
বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. রুস্তম আলী জানান, দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতকারী প্রতিটি পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান থেকে গড়ে এক কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে পুলিশ। তিনি বলেন, এসব কথা মিডিয়ায় জানিয়েও লাভ নেই। কোনো উচ্চবাচ্য করলে হয়রানি আরো বেড়ে যায়। তিনি আরও জানান বাংলাদেশে প্রতিদিন ৯০ হাজার পণ্যবাহী ট্রাক এবং কাভার্ড ভ্যান চলাচল করে। যতই কাগজপত্র সঠিক থাকুক এর কোনোটিই পুলিশকে চাঁদা না দিয়ে চলতে পারে না? তার হিসাব সড়ক বা মহাসড়কে এই ট্রাক চলাচল করতে গিয়ে একেকটি স্পটে ৫০ টাকা থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। এই চাঁদা নেয় হাইওয়ে পুলিশ, টহল পুলিশ কিংবা থানা পুলিশ। আবার মালিক ও শ্রমিক সমিতির নামেও চলে চাঁদাবাজি। যুবলীগ, ছাত্রলীগ কিংবা আওয়ামী লীগের নামেও আদায় হয় চাঁদা। রুস্তম আলী খান জানান, বগুড়া থেকে ঢাকা পৌঁছাতে প্রতিটি ট্রাককে অন্তত ১২ জায়গায় চাঁদা দিতে হয়। এগুলো নির্দিষ্ট চাঁদা। এর বাইরে হঠাত্ গাড়ি আটকে চাঁদা নেয়া হয়। গড়ে একটি ট্রাককে কমপক্ষে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা চাঁদা গুনতে হয়।
গাড়ি চালকরা জানান, চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করে লাভ নেই। পুলিশ ১,০০০ টাকা চাঁদা চাইলো। কোনো ট্রাক ড্রাইভার যদি তা না দেন, পুলিশ তাহলে ১৫১ ধারায় ট্রাকের রঙ চটে গেছে বলে একটি মামলা করে দেয়। যার জন্য জরিমানা গুনতে হয় প্রায় ৫,০০০ টাকা। আবার পচনশীল পণ্যের ট্রাক চাঁদা না দিতে চাইলে অবৈধ পণ্য আছে বলে সব পণ্য রাস্তার পাশে নামাতে বলা হয়। তখন কয়েক লাখ টাকার পণ্য রাস্তাতেই পচে। এছাড়া বডি পরীক্ষা, রঙ পরীক্ষা, ইঞ্জিন পরীক্ষা, ওজন পরীক্ষা, ট্রাফিক আইন অমান্য ইত্যাদি বহু অভিযোগে পুলিশ ট্রাক থেকে চাঁদা নেয়।

বাস রুটে রুটে চাঁদাবাজি
সম্প্রতি ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী আনন্দ পরিবহনের বাস মালিকেরা প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়ে বলেছেন, আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানের ছত্রছায়ায় তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মুক্তার হোসেন ও দিদার এবং তার সহযোগীদের গত সাড়ে চার বছরে শুধু আনন্দ পরিবহন থেকে ২৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা চাঁদা দিয়েছেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর শামীম ওসমানের খলিফা হিসেবে পরিচিত মুক্তার হোসেন, সাইফুল উদ্দিন, জয়নাল আবেদীন, মোস্তফা কামাল, সুলতান ড্রাইভার ও আহাম্মদ আলী অস্ত্রের মুখে আনন্দ পরিবহনের কার্যালয় দখল করেন এবং পরিবহনটির কাছ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা চাঁদা নেন। পরিবহনে প্রতিটি নতুন বাস অন্তর্ভুক্ত করার জন্য গড়ে দুই লাখ টাকা করে চাঁদা নেয় এই সিন্ডিকেট। এভাবে তারা হাতিয়ে নিয়ে যায় আরও এক কোটি টাকা। মুক্তারের সহযোগী দিদারের ভাই কাজল কোনো বাসের মালিক না হয়েও প্রতিদিন গাড়ি প্রতি ৩০০ টাকা করে নিয়েছে আরো ৩৬ লাখ টাকা। চালক ও সহকারীর বেতন থেকে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে এই চক্র। এই হিসেবে মুক্তার, দিদার ও কাজল চালক ও সহকারীদের কাছ থেকে কমপক্ষে এক কোটি ২০ লাখ ২০ হাজার টাকা লুটপাট করেন। এই মুক্তার আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ। শামীমের ভাই এমপি নাসিম ওসমানের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও মুক্তারকে দেখা যায়। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির বিভিন্ন কর্মসূচিতে লোক পরিবহনের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে বাস সরবরাহ করেন তারা।
একই রুটের বন্ধন পরিবহনও প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়ে বলেছে, শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী চেঙ্গিস খান গংরা বন্ধন পরিবহন সাড়ে চার বছরে কমপক্ষে সাত কোটি নয় লাখ ৫২ হাজার টাকা চাঁদা নিয়েছে। এর আগে ২৩ আগস্ট নসিব পরিবহনের মালিকরা সংবাদ সম্মেলন করে জানান, শামীমের ছত্রচ্ছায়ায় তার শ্যালক এহসানুল হাসান নসিব পরিবহন থেকে একই সময়ে কমপক্ষে ৬ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেছে। নারায়ণগঞ্জের যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ ফোরামের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি বলেন, নাসিম- সেলিম-শামীম ওসমান ও তাদের সহযোগীরা গত সাড়ে চার বছরে নারায়ণগঞ্জের পরিবহন খাত থেকে ২০০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেছে।
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের রুটে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজির উদাহরণ থেকেই বোঝা যায় সারাদেশে পরিহন সেক্টরের অবস্থা। দেশের প্রতিটি জেলা উপজেলা এবং অঞ্চলে এভাবে প্রতিনিয়ত রাজনৈতি প্রভাবশালীরা শত শত কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে নিচ্ছে। পুলিশ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করার সাহস পায় না।

বাস টার্মিনালে চাঁদাবাজি
রাজধানী ঢাকার তিনটি বাস টার্মিনাল থেকে দৈনিক কোটি টাকা চাঁদা তোলা হয়। তিনটি মালিক সমিতি ও দুটো শ্রমিক ফেডারেশনের প্রতিটির একাধিক কমিটির নামে এ চাঁদাবাজি চলছে। দিনরাত চাঁদা আদায়ের কাজটি করে থাকে ‘লাঠি বাহিনী’, ‘যানজট বাহিনী’ ও ‘লাইন বাহিনী’। চাঁদাবাজদের হাতে অসহায় ২০ লাখ পরিবহন শ্রমিক। ঢাকার ৩ টার্মিনালে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পরিবহন শ্রমিকরা জানান, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ও ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতি নিয়ন্ত্রণ করছে চাঁদাবাজি। ঢাকা-নোয়াখালী রুটে চলাচলরত একটি মিনিবাসের চালক বাবুল হোসেন জানান, সায়েদাবাদ টার্মিনালে ৭০ টাকার একটি স্লিপ দিয়ে তাঁর কাছ থেকে ৫৫০ টাকা চাঁদা নিয়েছে একটি বাহিনীর লোকজন। সরকারি দল সমর্থিত ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘আমরা যে টাকা তুলছি তা পরিবহন খাতের উন্নয়নেই ব্যয় করা হচ্ছে। সরকার আমাদের সমিতির নামে অর্থ তোলার জন্য হার নির্ধারণ করে দিয়েছে। নগরীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে প্রতিদিন ৬০ লাখ টাকা তোলা হয়। টার্মিনাল থেকে যাত্রী ওঠানোর আগেই পরিবহন ও রুট অনুযায়ী নির্ধারিত ‘জিপি’ অর্থাত্ চাঁদা দিতে হয়। এর পরিমাণ ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত। এটি আদায় করে লাঠিবাহিনী। টার্মিনাল থেকে গাড়ি বের করার সময় যানজট বাহিনীকে দিতে হয় ২০ টাকা ‘কাঙালি চাঁদা’। এরপর লাইনম্যানের পালা। এ ক্ষেত্রে দিতে হয় ২০ টাকা। এক্ষেত্রে প্রত্যেকটি রুটের জন্য আলাদা বাহিনী রয়েছে। এর বাইরে রয়েছে টার্মিনালে ডিসিসির নির্ধারিত ফি।
গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে উত্তর, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৫১টি রুটের গাড়ি থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি হয়। টার্মিনালে গাড়ি পার্কিং বাবদ সিটি করপোরেশনের নামে নির্ধারিত পার্কিং ফি পরিবহন প্রতি ৪০ টাকা। আদায় হচ্ছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। এরপরই দিতে হচ্ছে ‘জিপি’ বাবদ ১০০ টাকা। এছাড়া মালিক সমিতির নামে ২০ এবং শ্রমিক ইউনিয়নের নামে ২০ টাকা করে নেয়া হয়।
মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন চাঁদা আদায় হয় ১৫ লাখ টাকা। এই টার্মিনালে ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির তিনটি কমিটির নামে চলছে চাঁদাবাজি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা সাজেদুর রহমান হিরু ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির নেতা দাবিদার মনির চৌধুরী ও কাজী আলাউদ্দিন ও এনায়েতউল্লাহ গ্রুপ, আবুল হাশেম দেওয়ান গ্রুপসহ বিভিন্ন গ্রুপ এই টাকা আদায় করে। ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির নামে ২০ টাকা, শ্রমিক ইউনিয়নের নামে ১৫, মালিক সমিতির নামে ২০ এবং শ্রমিক ফেডারেশনের নামে ৫০ টাকা করে প্রত্যেক গাড়ি থেকে আদায় করা হয়। কিন্তু শ্রমিকরা জানান, বাস্তবে গাড়িপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা চাঁদা নেয়া হয়। এভাবেই ঢাকাসহ সারাদেশের প্রতিটি বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল থেকে বিভিন্ন সমিতি, ব্যক্তি কিংবা শ্রমিক ইউনিয়নের নামে শত শত কোটি টাকা চাঁদা আদায় চলছে। যার কোনো হিসাব খোদ পুলিশ কিংবা পরিবহন সমিতির নেতাদের কাছেও নেই।
বেশুমার চাঁদাবাজি হচ্ছে বাসা-বাড়ি কিংবা এলাকায়। রাজধানী ঢাকার যে কোনো মহল্লায় নির্মাণ কাজ শুরু করলেই বাড়ির মালিক কিংবা ঠিকাদারদের কাছে প্রথমে ‘মিস্টি খাওয়া’র টাকা চায় সন্ত্রাসীরা। নির্মাণ কাজ শুরুর প্রতিটি ধাপে ধাপে বিশাল অংকের চাঁদা দিতে হয় মহল্লার মাস্তান, পাড়ার বড়ভাই কিংবা রাজনৈতিক গডফাদারদের। ঢাকার শাহাজানপুরে বাড়ি করছিলেন কুষ্টিয়ার প্রবাসী আওলাদ হোসেন। তিনি জানান, সন্ত্রাসীরা ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। মাত্র আড়াই কাঠা জমিতে বাড়ি করার জন্য ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দেয়া অসম্ভব। কয়েক দফায় তিনি ১৫ লাখ টাকা চাঁদা দিয়েছেন। এরপরও সন্ত্রাসীদের হুমকিতে তিনি বাড়ির কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। গত ২৮ সেপ্টেম্বর মিরপুরে নিজ বেডরুমে খুন হন হোমস টেক নামক আবাসন কোম্পানির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাফরুল হক মোক্তার। সন্ত্রাসীরা চাঁদা চেয়ে না পেয়ে নির্মমভাবে খুন করে তাকে। এভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চাঁদাবাজদের হাতে খুন-যখম হচ্ছে নিরীহ মানুষ।

চাঁদাবাজির শিকার ঠিকাদাররা
রাজনৈতিক দল আশ্রিত মাস্তানদের হাতে সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজির শিকার হন ঠিকাদাররা। সড়ক, ব্রিজ, কালভার্ট, স্কুল কলেজ, হাসপাতালসহ যে কোনো উন্নয়নমূলক কাজ শুরু করতে গেলে ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গদলের সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা দিতে হয় পাড়ার মাস্তানদেরকেও। পুলিশের কাছে সহযোগিতা চেয়েও আশানূরূপ ফল হয় না। কারণ চাঁদাবাজদের পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দিলে তাদের সহযোগীরা নানান ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। সাম্প্রতিক সময়েও চাঁদা না দেয়ায় বেশ কয়েকজন ঠিকাদার হামলার সরকারি দল আশ্রিত মাস্তানদের হামলার শিকার হয়েছেন। এছাড়া শ্রমিকদের মারধর, হুমকি দেয়া, অপহরণ করাসহ হেন অপকর্ম নেই যা চাঁদাবাজদের পক্ষে সম্ভব নয়। দেখা যায় অনেক ঠিকাদার চাঁদাবাজদের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়ে নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।

ফোনে ও এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজি
বর্তমান সরকারের সময়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়েছে মোবাইল ফোনে চাঁদাবাজি। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ মোবাইল ফোনে সন্ত্রাসীদের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আতঙ্কিত মানুষ থানা পুলিশকে না জানিয়েই চাঁদা দিয়ে যাচ্ছেন। ঈদ মৌসুমসহ বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ীদের কাছে মোটা অংকের টাকা দিতে হয়। কয়েকটি নমুনা তুলে ধরলেই ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীদের নামে চাঁদাবাজির ভয়াবহতা বোঝা যাবে।
মিরপুর রোডের ফার্নিচার ব্যবসায়ী আলমাস জানান, সম্প্রতি ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী শাহাদত কলকাতা থেকে তাকে ফোন করে বলেছে, ‘ছোট ভাইরা ৮ তারিখ দেখা করবে, ওদের পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে দিবেন। না হলে বউ, ছেলেমেয়ে নিয়ে ঈদ করতে পারবেন না। দেশের বাড়িতে সবার লাশ প্যাকেট করে পাঠিয়ে দিব। আর আমার লোক ছাড়া অন্য কেউ চাঁদা দাবি করলে আমার ছেলেদের জানাবেন। ওরা সব ম্যানেজ করে দিবে।’
শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও জানান ভিন্ন কথা। তারা বলেন, এখন শুধু তাদের নামের ওপর চাঁদা আদায় চলে না। কলকাঠি নাড়েন প্রভাবশালীরা। তাদের নাম শুনে মানুষ ভীত হলেও মূল চাবি থাকে রাজনৈতিক উপর মহলের হাতে। ফলে তারা যে টাকা পায়, এর সিংহভাগ দিতে হয় ওদের। এই নিয়ম আগেও ছিল, কিন্তু এখন অনেক বেশি বেড়ে গেছে। বিভিন্ন সময় ক্রসফায়ারসহ নানা ঘটনায় যেসব সদস্য মারা গেছে, তাদের পরিবারের সদস্যদেরও টাকার একটা অংশ দিতে হয়। এ ছাড়া আদায় হওয়া চাঁদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশই চলে যায় দেশের বাইরে আত্মপোগনে থাকা বড় ভাইদের হাতে। আর এর বাইরে পুলিশ ম্যানেজ খরচ তো আছেই।
জানা গেছে, শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ছদ্মবেশে প্রায়ই চাঁদার জন্য বেরিয়ে পড়ে। তাদের একজন কিলার খোরশেদ। সে চাঁদাবাজির জন্য কয়েক দফায় ভারত থেকে ঢাকায় আসে। মতিঝিল এলাকায় একটি রেস্টুরেন্টে তাকে কয়েক দিন আগে দেখা গেছে বাবুল তালুকদার নামে এক প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিরপুরের কাফরুলে শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীরের সহযোগী অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার আব্বাস কাশিমপুর কারাগারে বসেই মোবাইল ফোনে চাঁদাবাজি ও খুন খারাবি নিয়ন্ত্রণ করছে। তার সহযোগীদের মধ্যে রয়েছে চামাইরা বাবু, চৌধুরী বাবু, ভায়রা মাসুম, পুরনো কচু ক্ষেতে রাজু, লিটন, পল্লবীতে চামাইরা বাবু, রাসেল, চাকমা রাসেল, হাসান, সেনপাড়ায় নূরু, ১৩ নম্বরে আজাদ ও শাহীন চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ করে।
পুলিশের নথিতে রামপুরা এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহজাদা। সে বর্তমানে কারাগারে থাকায় এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য এখন খায়ের ও শাহিন নামে দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর হাতে। এই দলে আছে সন্ত্রাসী ঘাতক স্বপনের (মালয়েশিয়ায় পলাতক) বড় ভাই রিপন, পিচ্চি সোহেল, জহির ও ফয়সাল। এলাকায় এখন এই সন্ত্রাসী গ্রুপের প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসী হচ্ছে কারারুদ্ধ শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা পলাশের সহযোগী গুঁজা বাদশাহ, তপু, কিলার পলাশ, রাজীব, শাওন ও জাভেদ। বাদশাহ ও তপু তাদের দলনেতা। এ ছাড়া পিয়াস-ডিজিটাল কামাল গ্রুপ নামে আরো এক সন্ত্রাসী দল আছে এ এলাকায়। তিনটি গ্রুপই এখন গার্মেন্টসহ বিভিন্ন সেক্টরে চাঁদাবাজি করছে।
পাশের হাজীপাড়া, মালিবাগ ও চৌধুরীপাড়ার গার্মেন্ট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করছে শীর্ষ সন্ত্রাসী টুনু ও মনি। তাদের একজনের সঙ্গে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার সখ্য রয়েছে। শান্তিনগর এলাকায় চাঁদাবাজি করছে পিচ্চি শামিম ও তার সহযোগীরা। সিদ্ধেশ্বরীর ফ্রিডম রাসু কারাগারে। তার হয়ে চাঁদাবাজি করছে তার ছোট ভাই বাচ্চু এবং শিমুল ও শিশির।
মতিঝিল ও ফকিরাপুল এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এবং বিভিন্ন মার্কেটে চাঁদাবাজি করছে শোভন, মিন্টু, শাহিন, কামাল, শর্টগান সোহেল, রিয়াজ ওরফে মিল্কি ও কিলার তারেক। তারেক আগে শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিল। ইতোমধ্যে চাঁদাবাজির ভাগাভাগি নিয়ে মিল্কিকে খুন করেছে তারেক। তারেক আবার র্যাবের রহস্যজনক ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে। কিন্তু শোভন, মিন্টু, শাহীন, কামাল, শর্টগানসোহেল ও রাজাসহ অন্যান্য বাহিনীর চাঁদাবাজি অব্যহত আছে। স্টেডিয়াম এলাকার একজন ব্যাবসায়ী জানান, ‘রাজা বাহিনীকে মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা না দিলে ব্যবসা গুটিয়ে চলে যেতে হবে কিংবা জীবন দিতে হবে। তাই বাধ্য হয়েই প্রতিমাসে রাজা ভাইয়ের লোকজনকে টাকা দেই।’
পুরান ঢাকার ত্রাস ডাকাত শহীদ কয়েক দিন আগে ক্রসফায়ারে মারা গেছে। তবে চাঁদাবাজি বন্ধ নেই। সন্ত্রাসী বাঙ্গাল মামুন, দাঙ্গা লিটন, আরমান, এরফান, রাসেল, ভাগ্নে রনি, শাহজাহান, কালা মিন্টু, মুহিদ (ডাকাত শহীদের ডান হাত ছিল), চশমা নাসির, টিপু, লাবলু, সোহেল, রাসেল, মাহবুব, মুন্না, সোর্স আজমল এই এলাকায় চাঁদাবাজি করছে।
রাজধানীর তেজগাঁও-ফার্মগেট-কারওয়ান বাজার এখনো শীর্ষ সন্ত্রাসী এল. রহমান, ইরান, কিলার আশিক, চিটার জিল্লুর, মামু শাহজাহান, বাবুল ওরফে টাওয়ার বাবুল, আনোয়ার, লেংড়া শাহিন, বাচ্চু, মোশারফ, নবী সোলায়মান ও পলাতক জাকিরের (সুইডেন আসলামের ভাই) নিয়ন্ত্রণে। কারারুদ্ধ সুইডেন আসলামের স্ত্রী আয়েশাও একটি সন্ত্রাসী দল পরিচালনা করে চাঁদাবাজি করছে।
মোহাম্মদপুর, আগারগাঁও, ধানমণ্ডি আর লালমাটিয়ায় চাঁদাবাজি করছে কালা ফিরোজ, সেভেন স্টার গ্রুপের কালা খলিল, ফ্রিডম সবুজ, পিচ্চি তুহিন ওরফে মাতবর তুহিন, মজিবর, শামিম ও ডিশ শাকিল। ডিশ শাকিলের বাসা ধানমণ্ডির মধুবাজারে। তার ছিনতাইকারী বাহিনীও রয়েছে। তাদের নেতৃত্বে চলে লাখ লাখ টাকার চাঁদার খেলা।
মোহাম্মদপুর এলাকার চাঁদাবাজিতে শীর্ষ অবস্থানে আছে সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার সাইদ ব্যাপারীর ছেলে শামিম, আরেক সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার সলুর ভাতিজা মনির আর সন্ত্রাসী তুহিন। শামিম ও মনির একে অপরের প্রতিপক্ষ। দু’জনই বেশিরভাগ সময় দেশের বাইরে থাকে। মনিরের একটি সন্ত্রাসী বাহিনী আছে। মনির গ্রুপ প্রায়ই আসাদগেট ও টাউন হল এলাকায় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা নেয়।
রাজধানীর মগবাজার এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত, মুকুল, মোল্লা মাসুদ ও রনি দেশের বাইরে আত্মগোপনে। তাদের অবর্তমানে মগবাজারের চাঁদাবাজি এখন সন্ত্রাসী ফখরুলের নিয়ন্ত্রণে। কাঁঠালবাগান, কলাবাগান আর গ্রীন রোড এলাকায় চাঁদাবাজি করছে সাগর হত্যা মামলার অন্যতম আসামি নীরু ও তার সহযোগীরা।
মহাখালী, বাড্ডা ও গুলশান-বনানী এলাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে শীর্ষ সন্ত্রাসী আলমগীর-জাহাঙ্গীর। জাহাঙ্গীর যুক্তরাষ্ট্রে ছিল দীর্ঘদিন। মাঝে মাঝে দেশে আসে। তারা দুই ভাই একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী বাহিনী পরিচালনা করে। এছাড়া ওই এলাকার আরো কয়েকজন প্রভাবশালী চাঁদাবাজ হচ্ছে মিলু, কালা নাসির, আসলাম, হাসিফ, আলম, পনু, সাইদ, মনির, ইন্ডিয়ান বাবু, স্টেন রাজিব, জঙ্গি ও হাজারী মিলন। মূলত ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ই তাদের প্রধান পেশা।
খিলগাঁও তালতলা এলাকায় চাঁদাবাজি করে আওলাদ, জুয়েল, মোস্তাক ও রানা। পাশের গোড়ানে হান্নান, সবুজবাগ বাসাবোতে আজাদ, গোপীবাগে নান্নু, ইলিয়াস ও কালা নাসির। ফুলবাড়িয়া এলাকায় চাঁদাবাজি করছে বাচ্চু ও তার শ্যালক আউয়াল। এসব বাহিনী প্রতি মাসে ব্যবসায়ী, বাড়ির মালিক, চাকুরিজীবী বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে।
এভাবেই রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সাধারণ মানুষ চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন। চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করা মানে নিজের নিশ্চত বিপদ ডেকে আনা। তাই মুখ বুঝে আতঙ্কিত হয়ে চাঁদা দিয়ে যান সাধারণ মানুষ।

চাঁদাবাজিতে দ্রব্যমূল্য বাড়ে—এফবিসিসিআই
চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইয়ের সহ-সভাপতি হেলাল উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশ ও রাজনৈতিক দল আশ্রিত মাস্তানদের চাঁদাবাজির কারণে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়। এতে পরিবহন ভাড়া বাড়ছে। মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে। এসব প্রতিকারের তিনি সরকারের কাছে অসংখ্য প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। চাঁদাবাজি প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য মনিটরিং কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন বলে জানান। নগরীর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও বলেছেন, ‘ক্ষমতাসীন দলের নেতা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং সিটি কর্পোরেশনের লোকেরাই যেখানে চাঁদাবাজি করছে সেখানে অভিযোগ করে লাভ নেই। তাই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাড়ি দিতে হবে ঈদের বাজার।’

মন্ত্রী বললেন পুলিশকে জানান
দেশের সর্বত্র চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু বলেন, চাঁদাবাজি বন্ধ ও আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে। যখনই কেউ চাঁদা চাইবে পুলিশকে জানান। তিনি বলেন, চাঁদাবাজি আগের চাইতে অনেক কমে গেছে। আর সড়ক-মহাসড়কে বাস ট্রাকে চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুলিশ গাড়ি থামায় ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক উদ্ধারের জন্য। চাঁদাবাজির জন্য। বিচ্ছিন্নভাবে কোনো কোনো পুলিশ গাড়ি থেকে টাকা আদায় করে থাকতে পারে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে পুলিশ সদর দফতর দায়ীদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে বলে জানান তিনি।