Monday, 21 October 2013

কে এই এডিসি মেহেদী হাসান?

দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নজিরবিহীন তাণ্ডব চালানোর অভিযানে নেতৃত্বদানকারী কে এই এডিসি মেহেদী হাসান? সোমবার টেলিভিশনে তার এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ দেখে দেশের মানুষ হতবাক। বার বার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা দেশের জনপ্রিয় দল বিএনপিকে তিনি একাই যেন শেষ করে দিতে চান। এ দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা, বিরোধী দলের চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যে বেয়াদবি এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছেন মেহেদী হাসান, তাতে কর্তব্যরত সাংবাদিকরাও স্তম্ভিত হয়ে গেছেন। শুধু বিএনপিই নয়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অনেক নেতাও তার বাড়াবাড়িকে ভালো চোখে দেখেননি। আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, এভাবে দলীয় কার্যালয়ে ঢুকে নেতাদের আটক করা প্রত্যাশিত নয়।
মেহেদী হাসান সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। খোদ পুলিশ বাহিনীতেই মূর্তিমান আতঙ্ক মেহেদী হাসান। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মতিঝিল অঞ্চলের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার তিনি। পদের দিক থেকে তিনি অতিরিক্ত এসপি। পুলিশ বাহিনীতে এটি ছোট পদ হলেও ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছেন আইজিপিকেও ছাড়িয়ে। তার দাপটে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারাও থাকেন তটস্থ। হামলা, নির্যাতন, ধরপাকড়, রিমান্ডে নির্যাতন, গ্রেফতার—এসবের মাধ্যমে এরই মধ্যে মেহেদী হাসান অতিউত্সাহী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।
মেহেদী হাসানের বাবার নাম মো. আবদুল মজিদ। বাড়ি খুলনা জেলার তেরখাদা উপজেলার পানতিতা গ্রামে। সরকারি চাকরিজীবী আবদুল মজিদের ৮ ছেলের মধ্যে তৃতীয় মেহেদী হাসান। তার বড় ভাই মারুফ হাসান পুলিশ কর্মকর্তা। অপর ভাইদের মধ্যে একজন সেনাবাহিনীতে, অন্যরাও প্রতিষ্ঠিত। কট্টর আওয়ামী পরিবারের সন্তান মেদেহী হাসানকে পুলিশ বাহিনীতে সবাই জানেন বর্ণচোরা, অতিউত্সাহী ও বেপরোয়া পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে। তার এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, মেহেদী হাসান ও তার ভাইয়েরা এখন গ্রামের বাড়িতে যান না। এর নেপথ্য কারণ তার মায়ের মৃত্যুর পর বাবা আবদুল মজিদ গৃহকর্মীকে বিয়ে করেন। এ নিয়ে মেহেদী হাসানের ভাইয়েরা বাবার সঙ্গে সম্পর্ক অনেকটাই ছিন্ন করেছেন। মেহেদী হাসানের ঘনিষ্ঠ একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ছাত্রজীবনে মেহেদী হাসান ছিলেন ছাত্রলীগ ক্যাডার। সে সুবাদে শেখ হেলাল এমপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে তার। সে সুযোগে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের আঙুলের ইশারায় ঘোরাচ্ছেন এই মেহেদী হাসান।
বিগত এক বছর ধরে বাড়াবাড়ি করে বেশ বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন এই মেহেদী হাসান। বিরোধী দলের মিছিল-মিটিংয়ে গুলি, হামলা, রায়টকার নিয়ে হামলায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। পুলিশের আইন অনুযায়ী নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই নজিরবিহীন সব অ্যাকশনে যাচ্ছেন তিনি। জামায়াত-শিবিরসহ যেখানে বিরোধী দলের মিছিল, সেখানেই হামলা করতে উপস্থিত হচ্ছেন এই মেহেদী হাসান। গত ২২ ফেব্রুয়ারি বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটে এডিসি মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে হামলা, গুলি চালানো হয় আলেমদের মিছিলে। রাসুল (সা.) ও ইসলাম অবমাননার প্রতিবাদে ওইদিন বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেন দেশের প্রখ্যাত আলেমরা। জুমার নামাজের পর মিছিল শুরু হওয়া মাত্রই মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে হাজার হাজার রাউন্ড গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল নিক্ষেপ, রায়টকারের গুলি চালানোর অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন এই মেহেদী হাসান।
৬ মার্চ নয়াপল্টনে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল পণ্ড করার জন্য নজিরবিহীন অ্যাকশন চালান মেহেদী হাসান। তার নেতৃত্বে হামলা চালানো হয়েছিল বিএনপির জনসভার প্যান্ডেলে। ওইদিন মেহেদী হাসানের নির্দেশে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা নজরুল ইসলাম খান, আমানউল্লাহ আমান, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবদুস সালামসহ শত শত নেতাকর্মী। ওইদিন মেহেদী হাসানের অন্যায় নির্দেশমত গুলি না করায় তাত্ক্ষণিক প্রত্যাহার করা হয়েছিল দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল আরও ক’জনের বিরুদ্ধে।
গত শুক্রবার বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে ওলামা-মাশায়েখদের বিক্ষোভ মিছিল ছিল। ওইদিন মেহেদী হাসান পুরানা পল্টনের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হামলা করেন। তিনি পুরানা পল্টনে ‘ঠিকানা’ নামে একটি ভবনের ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে গিয়ে তল্লাশি চালান। সেই তল্লাশির সময় এক যুবককে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
পরে জানা গেছে, নিহত ওই ব্যক্তি শিবির নেতা ফয়জুল্লাহ। ওই হামলাতেও নেতৃত্ব দিয়েছেন মেহেদী হাসান। ওই সময় তিনি উচ্চকণ্ঠে অভিযানের বিষয়ে সাংবাদিকের বলেছেন। ঠিকানা নামের ওই ভবন থেকে বেশ কিছু শিয়া মুসলমানকেও গ্রেফতার করেন মেহেদী হাসান, যাদের কেউই জামায়াত-শিবির বা অন্য কোনো ইসলামি দলের সদস্য ছিলেন না। শুধু হয়রানি ও অর্থ আদায়ের জন্যই সেটি করা হয়েছিল বলে ওই ভবনের বাসিন্দারা জানান।
মেহেদী হাসান ঔদ্ধত্যের সীমা ছাড়িয়ে যান গত সোমবার রাতে—বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ভাংচুর ও টানা আড়াই ঘণ্টা অভিযান চালিয়েছেন তিনি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর, ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা, কেন্দ্রীয় নেতা রুহুল কবির রিজভীসহ উপস্থিত নেতাদের সঙ্গে বাজে ব্যবহার করেন তিনি। তাদের অনেককেই তিনি তুই-তুকারি সম্বোধন করেন এবং লাঞ্ছিত করেন মহিলা নেতাকর্মীদের। সারাদেশের মানুষ ওই দৃশ্য টেলিভিশনে সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন। বিএনপি অফিস থেকে এ সময় গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রসহ কাউন্সিলের কয়েক লাখ টাকা পুলিশ নিয়ে যায়।
পুলিশ কর্মকর্তা মেহেদী হাসান এর আগে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছেন। রায়ট কার থেকে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি ও বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে গুলি করার নেপথ্যেও ছিলেন এই মেহেদী হাসান।
এর আগেও মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানোর অভিযোগ করেছিলেন গ্রেফতারকৃত জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। ডিবি পুলিশের কার্যালয়ে বেশ কয়েকজন জামায়াত নেতাকে ব্যাপক নির্যাতন করেছিলেন এই মেহেদী হাসান ও তার সহযোগীরা।
পুলিশ কর্মকর্তা মেহেদী হাসানের অপকর্মের কাহিনী মিছিল-সমাবেশে হামলা আর গুলির মধ্যেই শেষ নয়। তিনি আগে ডিবি পুলিশে ছিলেন। গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ হাসান নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলায় ৯ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। মোহাম্মদ হাসানকে জঙ্গি সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য ডিবি কার্যালয়ের ছোট রুমে নিয়ে পুরুষাঙ্গে ইলেকট্রিক শক দেয়াসহ নানা কায়দায় তার ওপর নির্যাতন চালায় পুলিশ। এ নির্যাতনে তিনি আর কখনও সন্তানের বাবা হতে পারবেন না বলে চিকিত্সক তাকে জানিয়েছে। ওই সময় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এডিসি মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে আবেদন করেও কোনো প্রতিকার পাননি মোহাম্মদ। উল্টো মেহেদী হাসান তাকে আবার গ্রেফতার করে একই ভাবে নির্যাতন করবেন বলে হুমকি দেন। উপায়ন্তর না দেখে তিনি এখনও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। মোহাম্মদ হোসেন আক্ষেপ করে সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশ তার জীবনটা ধ্বংস করে দিয়েছে। নির্যাতনের পাশাপাশি তার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। মোহাম্মদের আফসোস, তিনি কখনও কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং এখনও নন। তার মতো শত শত নিরপরাধ ব্যক্তি এবং বিভিন্ন মামলার আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করতে নানা কায়দায় নির্যাতন করছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মেহেদী হাসানের আরেক ঘনিষ্ঠ সহচর পল্টন থানার ওসি সরোয়ার হোসেন। তাদের কাজ হলো মতিঝিল, ফকিরাপুল, পল্টন এলাকা থেকে হুন্ডি ব্যবসায়ী, আদম ব্যবসায়ী, এমএলএম ব্যবসায়ী ধরে নিয়ে নিয়ে নির্যাতনের মাধ্যমে অর্থ আদায় করা। নিজেদের সাজানো বাদী দিয়ে মামলা করে ওইসব ব্যক্তির কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মেহেদী সিন্ডিকেট। টাকা নেয়ার পরও মামলা দিয়ে এবং রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক নির্যাতন চালানোর কথা জানা গেছে। কিন্তু ফের হয়রানির ভয়ে কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলছে না।
ভুক্তভোগী একাধিক ব্যক্তি জানান, রিমান্ডের আসামিদের কাছে এক আতঙ্কের নাম মেহেদী হাসান। গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে লাখ লাখ টাকা আদায়, টাকার জন্য ক্রসফায়ারে দেয়ার হুমকি, নির্যাতনের কাহিনী ফাঁস করে দিলে আবার গ্রেফতার করে ক্রসফায়ারের হুমকিসহ হেন অপকর্ম নেই এ মেহেদী হাসান সিন্ডিকেট করেনি।
ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা জানান, মেহেদী হাসান গিরায় গিরায় পিটিয়ে নির্যাতন, বাদুড় ধোলাই নির্যাতন, ওয়াটার থেরাপি নির্যাতন, উলঙ্গ করে নির্যাতন, সারাদিন না খাইয়ে রেখে নির্যাতন, বোতল থেরাপি নির্যাতন, ডিম থেরাপি নির্যাতন, ডিস্কো ড্যান্স নির্যাতন, সিলাই নির্যাতন, ঝালমুড়ি নির্যাতন, টানা নির্যাতন, বাতাস নির্যাতন, ইলেকট্রিক শক এসব নির্যাতন করায় মেহেদী অত্যন্ত পারদর্শী। মূলত অর্থ আদায়ের জন্য ব্যবসায়ী ও ভিন্ন মতের লোকজনের ওপর এসব নির্যাতন চালিয়েছেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এসবের মাধ্যমে মেহেদী হাসান যেমন বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন, তেমনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন দলের নিপীড়ক ব্যক্তিদের আস্থাভাজন হয়েছেন। তাকে ডেকে নিয়ে প্রতিনিয়ত বিশেষ স্থান থেকে ইনস্ট্রাকশন দেয়া হচ্ছে, পাশাপাশি তার পারফরম্যান্সের প্রশংসা করা হচ্ছে।
পুলিশ বাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মেহেদী হাসানের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ির বিষয়ে বলেন, এসব কালপ্রিট পুলিশ কর্মকর্তাদের কারণে সাধারণ মানুষের কাছে গোটা বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়। মানুষ পুলিশের ওপর আস্থা হারায়। তিনি আরও বলেন, সরকারের উচিত এসব বেপরোয়া ও অতিউত্সাহী কর্মকর্তাদের প্রশ্রয় না দেয়া।
এসব বিষয়ে আমরা কয়েক দফা মেহেদী হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি হরতাল নিয়ে ব্যস্ত আছেন উল্লেখ করে পরে যোগাযোগ করতে বলেন।