Tuesday, 8 October 2013

মোল্লার মামলার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর সাক্ষ্যে গরমিল

নিজস্ব প্রতিবেদক আরটিএনএন ঢাকা: আপিল বিভাগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর দেয়া সাক্ষ্য তার আগের দুটি বক্তব্যের বিরোধী। ট্রাইব্যুনালে দেয়া সাক্ষ্যের আগে দুটি বর্ণনায় এই নারী সাক্ষী তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার সময় ঘটনাস্থলে কাদের মোল্লার উপস্থিত থাকার বিষয়টি বলেননি। সোমবার ইংরজি দৈনিক নিউ এইজ-এর অনলাইন ভার্সনে পত্রিকাটির বিশেষ প্রতিবেদন সম্পাদক ডেভিড বার্গম্যানের ‘সোল উইটনেস ইন মোল্লা ডেথ পেনাল্টি কেস গেভ কন্ট্রাডিক্টরি অ্যাকাউন্টস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘প্রথমত. গত ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের এক গবেষককে দেয়া সাক্ষাৎকারে সাক্ষী মোমেনা বেগম এটাও বলেছেন- যখন তার পরিবারের সদস্যদের গণহারে হত্যা করা হয়, তখন তিনি সেখানে ছিলেন না। ঘটনার দুদিন আগেই তিনি ওই এলাকা ত্যাগ করেন।’ দ্বিতীয়ত. গত ২০১০ সালে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তাকে দেয়া জবানবন্দিততে মোমেনা, ১৯৭১ সালে যার বয়স ছিল ১৩ বছর, বলেন- ওই দিন তাদের বাসায় যারা প্রবেশ করেছিল, তারা সবাই ছিল বিহারী এবং পাকিস্তানি সেনা সদস্য। সেখানে কোনো বাঙালির উপস্থিতির কথা বলা হয়নি। আদালতে দেয়া মোমেনার মৌখিক সাক্ষ্য আগের দেয়া সাক্ষাৎকার এবং জবানবন্দির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রায় ৪০ বছর আগে মোমেনার পরিবারকে হত্যার অভিযোগে সাক্ষী হিসেবে রাষ্ট্রপক্ষ একমাত্র তাকে আদালতে হাজির করে, যেখানে তিনি কাদের মোল্লাকে হত্যাযজ্ঞের স্থানে দেখেছিলেন বলে দাবি করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল দুটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তব্যের বিষয়ে সতর্ক ছিল বলেই মনে হয়। রায়ে ট্রাইব্যুনাল তদন্ত কর্মকর্তাকে দেয়া জবানবন্দি এবং জাদুঘরের গবেষককে দেয়া বক্তব্যের ক্ষেত্রে মোমেনার অবস্থানের বিষয়টি এই বলে উল্লেখ করেননি যে, সাক্ষীর ‘বিশ্বস্ততার’ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার ক্ষেত্রে এটি বিবেচনায় আনা উচিত হবে না। এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী নিউ এইজ-কে বলেন, ‘আবদুল কাদের মোল্লা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তা ভুলক্রমে রেকর্ড করতে পারেননি।’ দুটি বক্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যখন কোনো ভুক্তভোগী এ ধরনের সহিংসতার শিকার হন, তিনি সম্পূর্ণ বিষয়টি প্রকাশ করতে (ভয়ের কারণে) চান না, কিন্তু তিনি ট্রাইব্যুনালের সামনে যা বলবেন, সেটাই পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য। অন্য কোনো বক্তব্য নির্ভরযোগ্য নয়।’ প্রসঙ্গত, গত ২০১২ সালে মোমেনা বেগম কেবল বিচারক এবং আইনজীবীদের উপস্থিতিতে (ক্যামেরা ট্রায়াল) মৌখিক সাক্ষ্য দেন। হিজাব পরিহিত মোমেনা আদালতকে বলেন, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ একদল লোক তাদের বাসায় প্রবেশ করে এবং পরিবারের ছয় সদস্যকে হত্যা করে। তিনি বলেন, ঘটনার সময় তার বাবা বাসার দিকে দৌড়াতে দৌড়াতে বলতে থাকেন- ‘কাদের মোল্লা আমাকে মেরে ফেলবে।’ এরপর ওই লোকগুলো কক্ষে ঢুকে আর ‘কাদের মোল্লা আমার বাবার জামার কলার ধরে টেনে-হিঁচড়ে বাসার বাইরে নিয়ে যায়’। এরপর তারা তার মা এবং তিন বোনকে হত্যা করে, যাদের একজনকে আগে ধর্ষণ করা হয় এবং ছোট ভাইকেও হত্যা করা হয়, যোগ করেন মোমেনা। তিনি বলেন, ‘এই ঘটনার পর মুক্তযোদ্ধাদের চা খাওয়াতেন এক ব্যক্তি, যিনি কামাল খান হিসেবে পরিচিত, আমাকে বলেছেন- কাদের মোল্লা আমার বাবা-মাকে হত্যা করেছে। আমার উকিল বাবা (বিয়ের সাক্ষী) আক্কাস মোল্লাও আমাকে একই কথা বলেছে...’ রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, এখানে (মোমেনাকে) অবিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই...বরং তাকে স্বাভাবিক প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীই মনে হয়েছে...’ প্রসঙ্গত, মানবতাবিরোধী অপরাধে গত ৫ ফেব্রুয়ারি কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর গত ১৭ সেপ্টেম্বর সাজা বাড়িয়ে একই পরিবারের ছয়জনকে হত্যার অভিযোগে সাজা বাড়িয়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন আপিল বিভাগ।
http://www.rtnn.net//newsdetail/detail/1/1/71426#.UlQluNKbOgE