Sunday, 20 October 2013

বি ডি আর হত্যাকান্ডের সেই গোপনীয় অধ্যায়গুলো-১ম খন্ড

আমি এখন যেই লেখাটা আপনাদের দিতে যাচ্ছি তা আমি এর মধ্যেই পৃথিবীর অনেক দেশের বাংলা সংবাদ মাধ্যম ও ইংরেজী সংবাদ মাধ্যমে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমার লেখাটি অনেকেই বিশ্বাস করবেন আবার অনেকেই বিশ্বাস করবেন না। এই দুইটি সম্ভাবনার ফলাফল আমার ঘাড়েই বর্তায়। তারপরেও সে কথা বিবেচনায় রেখে আমি আমার গত দুই বছরের তদন্ত আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। পিল খানায় বিডি আর হত্যাকান্ড যারা কেবল একটি বিদ্রোহ ও হত্যার মধ্যে দেখেন, আমি সেই চিন্তাধারী নই। দীর্ঘ অনেক বছর বাংলাদেশ আর্মিতে আমার চাকুরীর সুবাদে আমার অনেক বন্ধু এখানে আছে, আছে শুভাকাংখী। আমি এমন সব সূত্র থেকে এসব খবর আজ আপনাদের দিতে যাচ্ছি যেসব সূত্র আমি আপনাদেরকে বলতে পারব না। এই একটা বড় দূর্বলতা আমার লেখাতে থেকেই যাবে। আমি তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।

যাদের থেকে আমি গত দুই বছরে সংবাদ সংগ্রহ করেছি তাদের সবাই সেই সংবাদ দেয়ার ক্ষেত্রে ছিলেন যোগ্য ও যোগ্যতর। যাদের মধ্যে আছেন সরকারের উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার, গোয়েন্দা অফিসার, রাজনীতিবিদ, রাজনীতি বিশ্লেষক। আমি আমার পরিচয় দিতেও আপনাদের কাছে অপারগ। আমার পারিবারিক জীবন ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করার ফলেই সেই অপারগতা। সে জন্যও আমি ক্ষমা প্রার্থী।

বি ডি আর হত্যাকান্ডে যাদের যাদের সম্পৃক্ততা আছে তাদের যাদের নামই তদন্তে এসেছে আমি কারো নামই লুকাইনি। আওয়ামীলীগের মির্জা আজম, নানক, তাপস রা এই ঘটনার মূল টুলস হিসেবে ব্যাবহার হয়েছে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা "র" এর পৃষ্ঠ পোষকতা এর সবচাইতে বড় অংশ।

নাগরিক ব্লগে এই লেখা প্রকাশের কারন একটি। তা হোলো রেফারেন্সের মাধ্যমে। আমার আরেক শুভাকাঙ্খীর মাধ্যমে আমি জানতে পারি বাংলা অন লাইন ব্লগের ভেতর রাজনৈতিক আলোচনার ব্লগ হিসেবে নাগরিক ব্লগ এখন পরিচিত। তাই এখানে এই লেখাট প্রকাশের ইচ্ছা প্রকাশ করেছি। আআমার এই তদন্ত রিপোর্টের কলেবর অনেক বৃহৎ। তাই কিছু খন্ডে এই রিপোর্টটি সমাপ্ত হবে বলে আশা করছি। আমার এই লেখা যদি আপনাদের ব্লগের প্রতি কোনো হুমকি বা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় তবে লেখাটি আপনারা মুছে দিতে পারেন। উল্লখ্য যে, পিলখানা হত্যাকান্ডের পর পরি আর্মির গোয়েন্দা বিভাগের মাধ্যমে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয় যা আলোর মুখ দেখতে পারে নাই। সরকারের উচ্চপদস্থ মন্ত্রী, এম্পিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনুমতি দেয় নি এবং চাকুরী হারিয়েছে শতাধিক সেনা অফিসার। রহস্য জনক বিমান দূর্ঘটনায় মারা গিয়েছে অনেক অফিসার। আজ আমি সেই কথাই বলতে এসেছি।

বিশ্বাস এবং অবিশ্বাসের ভারটুকু আপনাদের হাতে। আমি শুধু মনে করি, এই সত্য সবাই জানতে পারুক। আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি। একজন প্রাক্তন সেনা অফিসার হিসেবে আমি আমার দায় থেকে মুক্ত হতে চাই।

_________________________________________________

১ম খন্ড

নভেম্বর ২০০৮, অর্থাৎ সাধারণ নির্বাচন তথা শেখ হাসিনার ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দু' মাসের মাথায় পিলখানা বিদ্রোহ ও হত্যাযজ্ঞের প্রচারণা শুরু হয়েছিল। বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, তাঁর ও পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের সম্মতি ও সহায়তায় তা সংঘটিত হয়েছিল। স্মরণ করা যেতে পারে, শেখ হাসিনার নির্বাচিত সরকার সাবেক আমলা ও বিশ্বব্যাঙ্ক কর্মকর্তা ফখরুদ্দীন আহমেদের যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিল, ভারত, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্থটনীতিকদের সহায়তায় কমিশনে তার শপথ ও সংবিধান লঙ্ঘন করে তাকে ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন সেনাবহিনী প্রধান জেনারেল মইন ইউ. আহমদ। শেখ হাসিনার দুর্বার রাজনৈতিক আন্দোলন তথা তাঁর সম্মতিতেই তা হয়েছিল। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার হাসো্যাজ্জ্বল উপস্থিতিতে তিনি যাকে প্রকাশ্যে তার রাজনৈতিক প্রাপ্তি বলে আখ্যায়িত করেছেন।

অন্যদিকে জেনারেল মইন ও তার কতিপয় বিদেশী প্ররোচণাকারী এই বলে তাদের কর্মকান্ডের ফিরিস্তি দিতে থাকেন যে, একটি গৃহযুদ্ধ থেকে বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য তারা বদ্ধপরিকর ছিল। এর সবই ছিল পাগলামি। নিজেদের জাতীয় স্বার্থেই এ সকল ক্থটনীতিক বাংলাদেশে একটি দুর্বল পরাশ্রয়ী সরকার চেয়েছিল এবং তার মোক্ষম হাতিয়ার হিসাবে শেখ হাসিনার দুর্বার আন্দোলনকে ব্যবহার করেছিল। চূড়ান্ত পুরস্কারের প্রতিজ্ঞা করে তারা মইনের সেবা লাভ করেছিল যে সে নিজেই গণতান্ত্রিকভাবে অভিনন্দিত হতে পারবেন যার মানে হচ্ছে:

(১) শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া উভয়কে ধ্বংস করে ফেলা
(২) তাদের ঘনিষ্ঠ সমর্থকদেরকে বাগে আনা অথবা তাড়িয়ে দেয়া; এবং
(৩) নূতন কোন দল গঠনের দ্বারা তার উধর্্বারোহণের পথ তৈরি করা

রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে বহুল প্রচারিত দুর্নীতি দমন আন্দোলন দ্বারা এর পথ সুগম করা হয়েছিল। তবে এর কোনটি অর্জনেই তিনি সফল হতে পারেননি। ইতোমধ্যে যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আয়ুষ্কাল ২০০৮ এর অধিক প্রলম্বিত করা নিয়ে নানা মহলে ক্ষোভের বিসতৃতি ঝুকিঁবহূল হয়ে উঠেছিল, শেখ হাসিনা অথবা খালেদা জিয়াকে বেছে নেয়া ছাড়া অন্য কোন বিকল্প বাদেই বিদেশী শক্তিকে তা ত্যাগ করতে হয়েছিল। ভারতের চাপে অবশ্য তারা নমনীয় শেখ হাসিনার প্রতি ঝুঁকেছিল। এটি অবশ্য মইনের জন্যও একটি পরিত্রাণ ছিল কারণ খালেদা জিয়ার প্রতি তার অনেক ভীতির কারণ ছিল, যিনি তাকে সেনাবহিনী প্রধান করেছিলেন এবং যার দু'ছেলে তার লোকজনের দ্বারা শারীরিকভাবে নিগৃহীত হয়েছিল। এভাবে প্রকৃত নির্বাচনের দ্বারা সাধারণ নির্বাচনকে আড়াল করা হয়েছিল।

এই প্রেক্ষাপটে পিলখানা বিদ্রোহের প্রস্তুতি ভারতীয় র' এবং ইসরায়েলী মোস্যাদের আওতায় নিয়ে আসা হয়, যাতে মার্কিন সিআইএ'র সংশ্লিষ্টতা পর্যন্ত ছিল। নভেম্বর ২০০৮ এ সজীব ওয়াজেদ জয় ও জনৈক কার্ল সিভাকোর নামে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে জয় ও তার মাকে পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ নিয়ে এগিয়ে যাবার প্রস্তুতির ইঙ্গিতের কথা বলা হয়। হাজার হাজার ইসলামী মৌলবাদী জঙ্গী নিয়োগের জন্য ঐ নিবন্ধে জয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য সামরিক ও আধা- সামরিক বাহিনীকে অভিযুক্ত করেন। সাধারণ নির্বাচনের প্রচারণার মধ্যভাগে প্রতিশ্রুতিশীল একজন প্রধানমন্ত্রীর ছেলের এ জাতীয় রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা বহির্বিশ্বে দলটির নির্বাচনী ভাবমূর্তি ও তার নেতাদের ক্ষমতালাভের আশাকে ক্ষুণ্ন করেছিল। তবে বাংলাদেশে তা হয়নি, শেখ হাসিনা ও তাঁর আওয়ামী লীগ বরাবরই ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ তাদের নেতৃত্বে হয়েছে বলে দাবী করে আসছেন এবং সে কারণে দেশ শাসনে তাঁর ও তাঁর দলের অধিকারকে তারা যৌক্তিক মনে করছেন। প্রকৃতপক্ষে তাঁদের দাবীর জোরালো সমর্থনে তাঁরা তাঁদের বিরোধীদের দেশদ্রোহী ও স্বাধীনতাবিরোধী বলে অভিযুক্ত করেছেন। তাছাড়া, যখনই যুক্তরাষ্ট্র তথাকথিত ইসলামী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং ভারত ও ইসরায়েল সেই ক্রুসেডে যোগ দিয়েছে তারা তা অনুধাবন করতে পেরে তার একনিষ্ঠ সমর্থক বনে যান।

জেএমবির কুশীলবদের তৎপরতা বাংলাদেশে ইসলামী সন্ত্রাসবাদের নামে ভিত্তিহীন আশঙ্কা ও ভীতির সঞ্চার করে। বস্তুতপক্ষে জয় তার নিবন্ধে এ বিষয়টি পরিষ্কার করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য সামরিক ও আধা- সামরিক বাহিনীকে ইসলামী সন্ত্রাসবাদমুক্ত করে পুনর্বিন্যাস করার প্রতি জোর দিয়েছিলেন যাতে করে তারা স্বাধীনতাবিরোধীদের নিকট থেকে জাতিকে উদ্ধারে আওয়ামী লীগের প্রচেষ্টায় কখনও বাধা সৃষ্টি করতে না পারে এবং একটি অসামপ্রদায়িক পরিবেশ তৈরি করা যায়। সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ে মইনের প্রতিশ্রুতির কারণে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীকে ক্লীব বা জড় করতে শেখ হাসিনা ও তাঁর পুত্রের ইঙ্গিত প্রদানের পথ সুগম হয়েছিল। তার নিবন্ধে ইহুদী স্ত্রীর স্বামী জয় ভারত- ইসরায়েলী প্রকৃতিকে ব্যক্তিগত নিশ্চয়তা প্রদান করেছিলেন যে, অসামপ্রদায়িক বাংলাদেশে আগামী ২০ বছরে তিনি একজন হিন্দু প্রধানমন্ত্রী দেখতে চান। ক্ষমতার জন্য মরিয়া শেখ হাসিনার উদগ্র বাসনা এবং সেনাবাহিনীর প্রতি সর্বজনবিদিত ভীতি ও অবিশ্বাসের বদৌলতে তার সমর্থন পাওয়া গিয়েছিল। তবে তার বাস্তবায়নে র\' ও মোস্যাদ পরিকল্পনাকারীরা বাংলাদেশকে হেয় করতে সেনাবাহিনীকে ক্লীব বা জড় করতে চেয়েছিল । ১৯৯০ এর দশক থেকেই র\' এ লক্ষ্যে কাজ করে আসছে। এ সময়কালে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা গোয়েন্দা কর্মকর্তা প্রকাশ্যে এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন। মজার বিষয় হচ্ছে, সে সব সতর্কতায় কান না দিয়ে বর্তমান সেনা প্রধান ও তার কতিপয় লেফটেন্যান্ট আমাদের শত্রুদের সাথে এ ধ্বংসলীলায় মেতেছিলেন।

বাংলাদেশে জরুরি অবস্থার পর থেকে জেনারেল মইন ও তার লেফটেন্যান্টদের অসঙ্গত কর্মকান্ড সাধারণ মানুষের কাছে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করেছে। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় বসাতে সেনাবাহিনী প্রধান ও তার লেফটেন্যান্টদের তৎপরতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে তার অনুসারীরা নূতনভাবে সেনাবাহিনীকে গড়ে তোলার প্রচারণা জোরদার করার সুযোগ পায়। ফেব্রুয়ারিতে অকস্মাৎ জেএমবি'র নেতারা কয়েক স্থানে ধরা পড়লে কিছু মিডিয়া ইসলামী জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু করে যদিও তাদের লক্ষ্য ছিল সেনাবাহিনী। ভারতের সাথে দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট লন্ডনভিত্তিক আওয়ামী লীগপন্থী কলামিস্ট আব্দুল গাফফার চৌধুরী পর্যন্ত বলেছেন, সেনাবাহিনীতে যদি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হিন্দু নিয়োগ করা যায়, তাহলে কোন সমস্যা থাকবে না। এ বক্তব্যের অনুসরণ করে সাবেক সিভিল সার্ভিস সদস্য তথা ক্থটনীতিক ওয়ালিউল ইসলাম, যার স্ত্রী আওয়ামী লীগের একজন প্রাক্তন এমপি, তার গবেষণায় পেয়েছেন বলে দাবী করেছেন যে, গত ৭ বছরে সেনাবাহিনীর সব ধরনের নিয়োগে এক তৃতীয়াংশ মাদ্রাসা শিক্ষিতদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যা প্রতিষ্ঠা করা এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য তা ছিল:

(১) ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সন্ত্রাসবাদের সূতিকাগার;
(২) সেনাবাহিনী হচ্ছে তার গডফাদার; এবং
(৩) বাংলাদেশকে সন্ত্রাসমুক্ত রাখতে হলে উভয়কে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

২৪ ফেব্রুয়ারি এ প্রচারণা তুঙ্গে উঠে যে, বিদ্রোহের একদিনমাত্র আগে মহিউদ্দীন খান আলমগীরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যগণ সেনাবাহিনীর তীব্র নিন্দা করেন যে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে । বিদ্রোহের সময় আমাদের একদল পন্ডিত একই ধরনের প্রচারণা চালাতে থাকে এবং তার অব্যবহিত পরেই বাণিজ্য মন্ত্রী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবঃ) ফারুক খান সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন।

বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়লে বিডিআরে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য একজন নূতন ডিজি, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মইনুল ইসলাম অপেক্ষা করতে থাকেন। বিদ্রোহের পরপরই তার যোগদানের পরে তাকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি এবং বিদ্রোহের তদন্তে গঠিত সরকারি তদন্ত কমিশনের সদস্য নিয়োগ করা হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি প্রচার করতে থাকেন যে, তার নিরাপত্তা বহিনীকে নূতনভাবে নামকরণ করা হবে এবং নূতন পোশাক ও ব্যাজ বা প্রতীক দেয়া হবে। সেনাবাহিনী থেকে একে বিচ্ছিন্ন করা উচিৎ এবং সিএসসি নিযুক্ত একটি নূতন ক্যাডার কর্মকর্তাদের কমান্ডে তা পরিচালিত হবে। কমান্ডের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী থেকে পুনর্গঠিত সীমান্ত রক্ষী বাহিনীকে দূরে রাখার তার এ প্রস্তাব বিদ্রোহীদের অন্যতম দাবী ছিল; যাতে এক্ষেত্রে একটি নূতন যুক্তির অবতারণা করা হয়েছে; তদন্ত কমিশনের কাজ শুরুর পূর্বেই সরকার নিয়োজিত তদন্ত কমিশনের একজন সদস্য যা বলেছিল। অধিকন্তু, তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনির্দিষ্ট কালের জন্য বার্ষিক বিডিআর সপ্তাহ উদযাপন স্থগিত করেছিল। নূতন সরকার আরেকবার তাতে উৎসাহ যুগিয়েছে যখন হবু ডিজির নিয়োগ চূড়ান্তপ্রায় হয়েছিল এবং সেনাকর্মকর্তাদের হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে বিডিআর সপ্তাহ শেষ হয়েছিল। পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে বিডিআর বিদ্রোহ কোন সাধারণ বিদ্রোহ ছিল না; নূতন ডিজির আগাম নিয়োগ বা তার দ্রুত প্রেসক্রিপশন প্রদান তার সাথে বেমানান ছিল।

পিলখানা হত্যাযজ্ঞের পরিকল্পনা ছিল দ্বিমুখী; এক নং পরিকল্পনা ছিল প্রকাশ্য; যাতে বিডিআর সপ্তাহ' ২০০৯ উদযাপনকালে বিডিআর দরবার হলে জিম্মি পরিস্থিতির সৃষ্টি করা যায় । সে পরিকল্পনানুসারে বিক্ষুুব্ধ বিডিআর জওয়ানদের উপস্থিত সকল অফিসারকে ২৫ তারিখের জিম্মিদশায় রাখা এবং রেশন, বেতনভাতা, জাতিসংঘ কমিশন ইত্যাদিসহ কমান্ডিং অবস্থান থেকে সেনা কর্মকর্তাদের দূরে রাখার বিষয়ে তাদের ২২ দফা দাবী পেশ করার কথা ছিল । প্রধানমন্ত্রী তখন সেনাবাহিনী প্রধান মইন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন এবং এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর নানককে বিদ্রোহের নেতাদের সাথে আলাপ- আলোচনার জন্য পাঠাতেন যাতে জওয়ানদের দাবী- দাওয়ার সুরাহা হয়, তাদের মধ্যস্থতাকারীরা নেতা বনে যান।

এ পরিকল্পনার কিছুটা বর্তমান ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল জানতেন তবে ঝুঁকি নেয়া ছাড়া তার কোন গত্যন্তর ছিল না। অন্যথায় ২০০৮ সালের শেষ দিকে ৬ কোটি টাকাসহ তাকে তার স্ত্রীর দেশত্যাগের ব্যর্থ প্রচেষ্টার ঘটনায় বিচারের মুখোমুখী হতে হত। জেনারেল মইনের স্ত্রী নাজনীন মইন তাকে এবং তার স্বামীর স্টাফ অফিসার মেজর মাহবুবকে উদ্ধার করেছিলেন। মাহবুবকে পরে কমিশন থেকে অবসর তথা দেশত্যাগে অনুমতি প্রদান করা হয় । সে অর্থে মইনের অবশ্যই ভাগ ছিল এবং স্বামীর ক্ষমতার অপব্যবহারে তার স্ত্রীর ভূমিকা, দুষকৃতিকারীর উদ্ধারে তার তৎপরতা তথা এ অন্যায়কে ধামাচাপা দেয়া তাকে ও তার স্ত্রীকে ফৌজদারি বিধানে দন্ডিত করার যেত। বিডিআর ডিজির অজ্ঞাত এ পরিকল্পনার কুশলী দিকটি ছিল যে, অবিলম্বে জওয়ানদের দাবী মানা না হলে ডিডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী ও তার পায়ে গুলি করা হবে।

জেনারেল মইন, মেজর জেনারেল মোল্লা ফজলে আকবর ( ডিজি, ডিজিএফআই), মেজর জেনারেল মনির ( ডিজি এনএসআই), লেফটেন্যান্ট জেনারেল সিনা ইবনে জামালী (সিজিএস), লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুজ্জামান (কমিউনিকেশন ইন চার্জ বিডিআর), লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামস্ (সিও ৪৪ রাইফেলস্), লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুকিম এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল সালাম (প্যারা মিলিটারি শা্খা ডিজিএফআই) ১ নং পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতেন। পিলখানায় দায়িত্বরত অধিকাংশ বিডিআর জওয়ান এ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতেন। সেনা কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার এবং অন্য ২১ দফা দাবীর বাস্তবায়নে একটি জিম্মি পরিস্থিতির সৃষ্টিতে তারা প্রস্তুত ছিলেন। সেনাকর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ একটি কাগজে লিখে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুকিম ২৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে তা সেনাপ্রধানের সচিবালয়, ডিজি, ডিজিএফআই অফিস, প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে ফ্যাঙ্ করবেন তবে এ পরিকল্পনাটি প্রাথমিকভাবে ছিল একটি কৌশল।

মেজর জেনারেল শাকিল আগেই বুঝতে পেরেছিলেন যে ষড়যন্ত্র চলছে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমীন ( সিও রাইফেলস্ সিকিউরিটি ইউনিট), যিনি পরে শহীদ হয়েছিলেন, ২১ তারিখ সকালে জওয়ানদের লিফলেট পেয়েছিলেন। তিনি দ্রুত তার কাছে ছুটে যান এবং লিফলেটটি দেখান। তিনি তাকে দ্রুত একটি কাউন্টার লিফলেট তৈরি করে তা বিলি করার পরামর্শ দেন। ২৩ তারিখে জানা যায় যে, অস্ত্রাগার থেকে তিনটি এসএমজি খোয়া গেছে। এ কথা্ জানাজানির পরে কর্মকর্তাদেরকে অস্ত্রাগারের দায়িত্ব দেয়া হয় যাতে বোঝা যায় পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক না হলে কখনও সতর্কতা অবলম্বন করা হত না। তখনও পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ২৪ তারিখের পিলখানা পরিদর্শন করেননি ।

মানসম্মত ব্যবস্থা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী যখন কোন সামারিক বা আধা- সামরিক বাহিনী পরিদর্শন করেন যেথায় ব্যবহৃত সকল অস্ত্রের ফায়ারিং পিন সরিয়ে ফেলা এসএসএফ নিশ্চিত করবে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর গার্ড কমান্ডার হিসাবে দায়িত্বরত কর্মকর্তা এমন কোন অস্ত্র হাতে নিতে পারবেন না যা দিয়ে গুলি করা যায়। কেবলমাত্র পিজিআর এবং এসএসএফ কর্মকর্তাগণ সশস্ত্র অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনে এরূপ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রশ্ন জাগা স্বা্ভাবিক যে কিভাবে প্রধানমন্ত্রী পিলখানা পরিদর্শন করেছিলেন? সেই লিফলেটগুলো কোত্থেকে এসেছিল এবং তিনটি এসএমজি কিভাবে খোয়া গিয়েছিল? ২৪ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে মেজর জেনারেল শাকিলের উদ্বিগ্ন হবার প্রয়োজন ছিল না; তিনি জানতেন যে, প্রধানমন্ত্রী তার নিজের বিষয়ে সতর্ক থাকবেন এবং ২৬ তারিখে তার নির্ধারিত ডিনার বাতিল করবেন। তা তিনি করতে পারবেন কারণ অপেক্ষমাণ নাটকের আদ্যোপান্ত তার জানা।

নেপথ্যের কুশীলবদের নিজস্ব পরিকল্পনা ছিল; যে গুপ্ত পরিকল্পনাকে অনুধাবনের সুবিধার্থে আমি ২ নং পরিকল্পনা বলে অভিহিত করছি, তা ছিল র\' য়ের। জানা গেছে, পুরো কার্যক্রমের জন্য র\' ৬০ কোটি রুপী দিয়েছে, সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার জন্য প্রায় ১৫ জন বিদেশী বন্দুকধারী ভাড়া করা হয়েছিল। র\' পরিচালনাকারী ও তাদের বাংলাদেশী প্রতিপক্ষ যারা অর্থের যোগান দিয়েছিলেন, তারা শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসার পরপরই ঢাকার গুলশানের একটি আন্তর্জাতিক ক্লাবে সাক্ষাৎ করেছিল । সেই সভায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজের ছো্টভাইও উপস্থিত ছিলেন্ । ভাড়াকরা খুনীদের দাতা ও সংগঠকরা যাদের মধ্যে কয়েকজন ভারতীয় ও লাজার শিবাজান নামে রাশিয়ার অপরাধ জগতের এক নেতা ছিল যারা ১৯ তারিখ বা ঠিক তার আগে দুবাইয়ের হোটেল বাব- আল- শামসে বৈঠক করেছিল। সেখানে তারা ভাড়াকরা খুনীদের অপারেশন ও পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছিল।

ঢাকার কয়েকটি দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে অনুযায়ী ভাড়াকরা বন্দুকধারীরা ১১ তারিখে নয়, ১৯ তারিখের পরে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। উভয় দেশের মানুয়ের শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য যখন প্রায় ৫ ঘন্টা সীমা্ন্ত খোলা ছিল তখন তাদের কয়েকজন ২১ তারিখে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ঢুকেছিল; একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত ১,০০,০০০ মিষ্টির মধ্যে তারা ১৬,০০০ মিষ্টি ঢাকায় নিয়ে এসেছিল। তবে অন্যরা কিভাবে বা কোন সীমান্ত দিয়ে ঢুকেছিল তা এখনো অজ্ঞাত । পরিকল্পনাটি ভয়াবহ হলেও সহজ ছিল বৈকি। ভাড়াকরা বন্দুকধারীরা অপারেশনের পূর্বে বিডিআরের ইউনিফর্ম ও অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করবে; বিডিআর জওয়ানরা যখন ১ নং পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে, সেই ভীতি ও ত্রাসের সুযোগে খুনীরা তাড়াতাড়ি প্রেবশ করবে এবং লাল ফিতেধারীদের ( কর্নেল ও উপরস্থ) অর্ধেককে খতম করবে। তারপরে তারা অন্য বিদ্রোহীদেরকে তাদের সাথে হত্যালীলায় যোগ দেবার জন্য শক্তি প্রয়োগ করবে। তারা একটি বেডফোর্ড ট্রাক ব্যবহার করবে এবং ৪ নং গেট দিয়ে প্রবেশ করবে। একটি পিক-আপ দিয়ে তাদের ব্যবহার্য অস্ত্রশস্ত্র বহন করা হবে।

বিডিআরের কুশীলব, আওয়ামী লীগ এম.পি মির্জা আজম, হাজী সেলিম, জাহাঙ্গীর কবীর নানক, ফজলে নূর তাপস এবং মহীউদ্দীন খান আলমগীর বেশ কয়েকটি বৈঠকে মিলিত হন এবং তোরাব আরী বিডিআর জওয়ান ও তাপস, নানক, আজম ও সোহেল তাজের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করেন। 

Monday, 14 October 2013

এরশাদের প্রেমিকারা কে কোথায়??

যৌবন একটা গোল্ড লিফ সিগারেট। আমার যৌবন আর বেশি দিন নেই। কয়েক বছর পর আমি মধ্যবয়স্ক হয়ে যাব। তাই যতোদিন পারি, এই ক্ষণস্থায়ী যৌবনকে উপভোগ করতে চাই।’ কথাগুলো যুক্তরাজ্যে গিয়ে বলেছেন ৮২ বছরের সাবেক স্বৈরাচারী রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। তার এসব কথায় বোঝা যায়, তিনি কতোটা ‘রোমান্টিক’ ও ‘প্রেমিক পুরুষ’!
ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের অন্যতম শরীক জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ রাজনীতি নিয়ে সকালে বলেন এক কথা, বিকেলে আরেক কথা আর রাতে বলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। সকালে সরকারের সমালোচনা করেন, বিকেলে বিরোধী দলকে নানা উপদেশ দেন। রাতে হেফাজতে ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার খোয়াব দেখেন। তেমনি ক্ষমতায় থাকাকালে তার সকালে, বিকেল, রাতে পাল্টে যেত কথিত প্রেমিকার তালিকা। তার প্রেমিকার তালিকাও অনেক দীর্ঘ। ক্ষমতায় থাকাকালে ও গণঅভ্যুত্থানে পতনের পর তার প্রেম, পরকীয়া, সেক্স কাহিনী দেশ-বিদেশে আলোচনার ঝড় তোলে। কোথায় আছেন এরশাদের আলোচিত, সমালোচিত সেসব ‘প্রেমিকা’ ও ‘ফার্স্ট লেডি’রা? তারা এখন কেমন আছেন?
প্রেস ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত ‘নিরীক্ষা’ পত্রিকায় সম্প্রতি প্রকাশিত এক নিবন্ধে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস এরশাদের প্রেমিকাদের পক্ষ নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এরশাদ সরকারের পতনের পর দেশের গণমাধ্যমগুলো তার প্রেমিকাদের সঙ্গে সেক্স কাহিনী ছাপিয়ে নারীর প্রতি অবিচার করেছে বলে রোবায়েত ফেরদৌসের অভিযোগ। তার এ অভিযোগের পর অনেকের বক্তব্য, এরশাদের প্রেমিকারা উচ্চশিক্ষিতা, সামাজিক মর্যাদার দিক থেকেও অনেক উঁচুতে ছিলেন। সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ ভুলে গিয়ে তারা এরশাদের সঙ্গে প্রেম, পরকীয়া, সেক্সে মেতে উঠতে পারেন। আর তা লিখলেই তাদের প্রতি অবিচার? অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগের ভিত্তিতে প্রিয় দেশ’র এ প্রতিবেদন সাজানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শুধু সামরিক স্বৈরশাসক হিসেবেই নয়, রাজনৈতিক দাবাড়ু এরশাদ দুর্নীতিপরায়ণ হিসেবে, বহুবিবাহ, অসংখ্য প্রেমিকা, সন্তানসহ নানা দুর্ঘটনায় দেশ-বিদেশে আলোচিত, সমালোচিত। ক্ষমতা দখল করে একদিকে তিনি রাজনীতিতে ধর্মকে টেনেছেন, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষনা করেছেন, সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবারে করেছেন। এমনকি পরদিন কোন মসজিদে নামাজ পড়বেন, তা আগের রাতে স্বপ্নেও দেখেছেন। অন্যদিকে এদেশের কোনো নেতা বহুগামিতা নিয়ে রাজনীতিতে এমন সংযোজন-বিয়োগের দ্বিতীয় নজির তার মতো সৃষ্টি করতে পারেননি।
নারীদেরকে কথিত প্রেমের ফাঁদে ফেলতে এরশাদ ক্ষমতা দখল করে কবিতা লেখাও শুরু করেন। বলা হয়ে থাকে, রোমান্টিক কবিতা ও কবির প্রতি নারীরা দুর্বল। নারী, গোলাপফুল, সেক্স বিষয়ক এসব কবিতা ছাপাতে বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদকদেরকে বাধ্যও করেন রাষ্ট্রপতি এরশাদ। অভিযোগ আছে প্রয়াত বরেণ্য কবি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ শামসুল হক, ফজল শাহাবুদ্দীন প্রমুখ ভাড়ায় এরশাদের কবিতা লিখতেন। তাদের রোমান্টিক ও যৌন কবিতা পত্রিকায় ছাপা হতো এরশাদের নামে। এরশাদের পরকীয়া কাহিনী সাপ্তাহিক যায়যায়দিন এ ছেপে তখন দেশ ছাড়তে হয় পত্রিকাটির সম্পাদক শফিক রেহমানকে।
এরশাদের প্রেমিকার তালিকায় ছিলেন মেরি, শাকিলা জাফর, জিনাত মোশাররফ, নাশিদ কামাল, নীলা চৌধুরী, সালমা বীল হেনা, আমেনা বারী, বিদিশা প্রমুখ। এরশাদ ১৯৯৭ সালে জেল থেকে বের হওয়ার পর সাক্ষাৎকারে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমি একজনকে ভালোবাসতাম।’ সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, ‘তিনি কি জিনাত মোশাররফ?’ জবাবে এরশাদ বলেন, ‘অফকোর্স, তোমরা আমার ছেলের মতো। তার নামটা লিখো না প্লিজ!’
ক্ষমতায় থাকাকালে জিনাতের সঙ্গে এরশাদের পরকীয়া কাহিনী ছিল অনেকের মুখে মুখে। তার নামের সঙ্গে মিল রেখে জিনাত মোশাররফ নতুন নামকরন করেছিলেন জিনাত হুসেইন! তার সঙ্গে পরকীয়া নিয়ে দৈনিক সংবাদের সাংবাদিক রাশেদ আহমদের কাছে খোলামেলা সাক্ষাৎকার দেন এরশাদ। এতে ঘর ভাঙ্গে জিনাতের। ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় সাবেক মন্ত্রী মোশারফের সঙ্গে। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করলে এরশাদের ইচ্ছায় সংরক্ষিত আসনে মহিলা সংসদ সদস্য হন জিনাত।
এরশাদের আলোচিত আরেক প্রেমিকা কণ্ঠশিল্পী শাকিলা জাফর। এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালে এক পর্যায়ে বিটিভির পর্দা দখলে থাকত তার। এরশাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান শুরু হতো তার গান দিয়ে। ১৯৮৩ সালে বিটিভির ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানে ‘তুলা রাশির মেয়ে’ গানটির মাধ্যমে শাকিলার পরিচিতি ঘটে দর্শক, শ্রোতাদের সঙ্গে। এরশাদ সরকারের পতনের পর তিনি বেশ কয়েক বছর আত্মগোপনে ছিলেন। তিনি এখন ব্যস্ত থাকেন সঙ্গীতচর্চা নিয়ে।
এরশাদের আরেক প্রেমিকা নাশিদ কামাল সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামালের মেয়ে। এরশাদের সাথে সম্পর্কের অবনতির পর ক্যাপ্টেন মুসাকে বিয়ে করেন। তবে বিয়েটি টেকেনি। মুসা ও নাশিদ কামালের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায। নাশিদ কামাল এখন টিভি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন। তিনি নর্থ সাউথ ইউনির্ভিসিটিতে শিক্ষকতাও করেন।
এরশাদের আরেক প্রেমিকা মেরি। লন্ডনি এ সুন্দরী গতবছর লন্ডনে মারা গেছেন। প্রয়াত চিত্র নায়ক সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীও ছিলেন এরশাদের আলোচিত পরকীয়ার তালিকায়। বছর কয়েক আগে তার স্বামী কমল চৌধুরী মারা গেছেন। তিনি এখন সিলেটে থাকেন।
প্রেম করে এরশাদ তার নিজের বয়সী শিক্ষক আবুবকর সিদ্দিকের মেয়ে বিদিশাকে বিয়ে করেন। বিদিশার সঙ্গে তার ছাড়াছাড়িও হয়ে যায়। গত চারদলের জোট সরকারের আমলে আলোচিত নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে বিদিশার সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়।
তখন অভিযোগ উঠে, দুই বউকে দিয়ে এরশাদ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। রওশন রাখছিলেন ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে, আর বিদিশা রাখছিলেন তখনকার জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে। বিদিশা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে লন্ডনে বৈঠকও করেন।
বিষয়টি জানতে পারেন চার দলের জোট সরকারের নীতি নির্ধারকরা। এরপর সরকার থেকে এরশাদকে চাপ দেয়া হয়, তার দ্বিতীয় বউ বিদিশাকে তালাক দিতে। তখন এরশাদের দেয়া চুরির মামলায় জেলে যান বিদিশা, মুক্তিও পান। গত তিন বছর ধরে দেশে অবস্থান করছেন তিনি। এরশাদের সঙ্গে দাম্পত্য জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি ‘শত্রুর সঙ্গে বসবাস’ নামে একটা বইও লিখেছেন।
উল্লেখ্য, ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। পরের বছর জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেন। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তার সরকারের পতন ঘটে। এরপর তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি জেল থেকে অংশ নেন। ছয় বছর আবরুদ্ধ থাকার পর ১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি জামিনে মুক্তি পান।

Sunday, 13 October 2013

বাংলাদেশে যে জায়গায় খেতে পারেন

ঢাকার মধ্যের খাবার:-

১. বেচারাম দেউরীতে অবস্হিত নান্না বিরিয়ানি এর মোরগ-পোলাও
২. ঝিগাতলার সুনামী রেস্তোরা এর কাচ্চি বিরিয়ানী, গাউছিয়া হোটলের গ্রিল
৩. খিঁলগাও এর ভোলা ভাই বিরিয়ানী এর গরুর চাপ এবং মুক্তা বিরিয়ানী এর গরুর চাপ, খাসীর চাপ এবং ফুল কবুতর
৪. মতিঝিলের ঘরোয়া হোটেল এবং হীরাঝীলের ভূনা খিচুড়ী
৫. হোটেল আল-রাজ্জাকের কাচ্চি+গ্লাসি
৬. লালমাটিয়ার স্বাদ এর তেহারী
৭. নবাবপুর রোডে হোটেল স্টার এর খাসীর লেকুশ, চিংড়ি ,ফালুদা
৮. নয়াপল্টনে হোটেল ভিক্টোরীতে ৭০টি আইটেমের বুফে
৯. হাতিরপুল মোড়ে হেরিটেজ এর শর্মা
১০. শ্যামলী রিং রোডের আল-মাহবুব রেস্তোরার গ্রীল চিকেন
১১. মোহাম্মদপুর জেনেভা/বিহারী ক্যাম্পের গরু ও খাশির চাপ
১২. মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের সামনের বিহারী ক্যাম্পের "মান্জারের পুরি",কাবাব,গ্রীল চিকেন,গরুর চাপ,
১৩. চকবাজারের শাহ সাহেবের বিরিয়ানী
১৪. মিরপুর-১০-এর শওকতের কাবাব
১৫. নারিন্দার শাহ সাহেবের ঝুনার বিরিয়ানী
১৬. ইংলিশ রোডের মানিকের নাস্তা
১৭. গুলশানের কস্তুরির সরমা
১৮. সোবহানবাগের প্রিন্স রেস্টুরেন্ট এর কাকড়া
১৯. সাইন্স-ল্যাবের ছায়ানীড়ের গ্রীল-চিকেন
২০. নাজিরা বাজারের হাজীর বিরিয়ানী
২১. জেলখানা গেটের পাশে হোটেল নিরবের ব্রেন ফ্রাই
২২. নয়া বাজারের করিমের বিরিয়ানী
২৩. হাজি বিরিয়ানী এর উল্টা দিকের হানিফের বিরিয়ানী
২৪. লালবাগের ভাটের মসজিদের কাবাব বন
২৬. বংশালের শমসের আলীর ভূনা খিচুড়ী
২৭. খিলগাঁও বাজারের উল্টো পাশে আল রহমানিয়ার গ্রীল চিকেন আর তেহারী
২৮. মতিঝিল সিটি সেন্টারের পিছনের বালুর মাঠের পিছনের মামার খিচুড়ী
২৯. চানখারপুলের নীরব হোটেলের ভুনা গরু আর ভর্তার সাথে ভাত
৩০. ধানমন্ডী লায়লাতির খাসির ভুনা খিচুড়ী
৩১. হোসনী দালান রোডে রাতের বেলার পরটা আর কলিজা ভাজি
৩২. নাজিরা বাজার মোড়ে বিসমিল্লার বটি কাবাব আর গুরদার
৩৩. পুরানা পল্টনে খানা-বাসমতির চাইনিজ প্যাকেজ
৩৪. বনানীর বুমারস রেস্টুরেন্টের বুফে প্যাকেজ
৩৫. ধানমন্ডির কড়াই গোশত এর ইলিশ সস
৩৬. গুলশান ২ এর খাজানার মাটন দম বিরিয়ানী এবং হাইদ্রাবাদী বিরিয়ানী
৩৭. উত্তরার একুশে রেস্তোরার গ্রীল চিকেন
৩৮. ধানমন্ডি/বনানীর স্টার হোটেলের কাচ্চি এবং কাবাব
৩৯. মৌচাকের স্বাদ রেস্তোরার ভাতের সাথে ৩৬ রকমের ভর্তা
৪০. সাইন্স ল্যাবে মালঞ্চ রেস্তোরার কাচ্চি বিরিয়ানী, রেশমী কাবাব
৪১. সুবহানবাগের তেহারী ঘর এর তেহারী-ভুনা খিচুরী
৪২. ভূত এর কাকড়া, সিজলিং, সূপ
৪৩. শর্মা এন পিজ্জার বীফ শর্মা
৪৪. মিরপুর ঝুট পট্টির রাব্বানির চা
৪৫. চকের নূরানি ড্রিংস এর লাচ্ছি
৪৬. চকের বিসমিল্লাহ হোটেলের মোঘলাই পরটা
৪৭. সেন্ট ফ্রান্সিস স্কুলের সামনের মামার আলুর দম।
৪৮. সোহরয়ার্দী কলেজের সামনে জসিমের চটপটি ও ফুচকা।
৪৯. বাংলাবাজারে (সদরঘাট) চৌরঙ্গী হোটেলের সকালের নাস্তা।
৫০. অমূল্য মিষ্টান্ন ভান্ডারের (শাঁখারীবাজার) হালুয়া, পরোটা, সন্দেশ।
৫১. গোপীবাগের খাজা হালিম ও টিটির কাচ্চি
৫২. বাসাবোর হোটেল রাসেলের "শিককাবাব"
৫৩. বায়তুল মোকাররমে অলিম্পিয়া কনফেকশনারীর "চকলেট পেস্টি"
৫৪. কর্নফুলি গার্ডেন সিটির চার তালার "ফুচকা"
৫৫. কাঁটাবন ঢালে অষ্টব্যঞ্জনের বিফ খিচুড়ী
৫৬. পল্টনের (বিজয়নগর পানির ট্যাকিংর পেছনে) নোয়াখালী হোটেলের গরুর কালো ভুনা
৫৭. ডিসেন্ট (মতিঝিল, হাতিরপুল, বনশ্রী, ধানমন্ডি, চক, নওয়াব---এদের প্রচুর শাখা) এর ডেজার্ট আইটেমগুলা ভালো।
৫৮. ব্রাক ভার্সিটির কাছে নন্দন।এদের আইটেম ভালো।বিফ আইটেম চরম।আর ঢাকার বেস্ট চা।

ঢাকার বাইরের খাবার:-

১. স্পেশাল শাক ভাজি + ভেটকি মাছ--হোটেল সাজনা, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম
২. করাই মাটন+সাতকরা দিয়ে গরুর মাংস, কাবাব এবং নান, হাইদ্রাবাদী বিরিয়ানী-হোটেল উন্দাল, পূর্ব জিন্দাবাজার, সিলেট
৩. কালাই রুটি-- কোর্টের সামনে, রাজশাহী
৪. রুইমাছ ভাজি--কস্তুরি হোটেল, খুলনা
৫. মামুনের চাপ/জনি কাবাব এণ্ড চাপ--চার খাম্বার মোর, যশোর
৬. খুলনার হারুন ভাইয়ের ইলিশ ভাজা, বেজের ডাঙ্গার মুসলিম হোটেলের গরুর মাংস
৭. কক্সবাজারের পৌশির ভর্তা আইটেম, নিরিবিলির খিচুড়ি
৮. বিদ্যুতের কলিজার সিঙ্গারা ও খাসির সমুচা— সাহেব বাজার, রাজশাহী,
রাজশাহীর মিষ্টান্ন ভান্ডারের কমলা ভোগ,
রাজশাহী 'শামীম রেস্টুরেন্ট' এর টক দিয়ে সিঙারা,
রাজশাহীর বর্ণালীর মোড় এর তিলের জিলাপী
৯. চট্টগ্রামে - নিউ মার্কেট মোড়স্থ এ বি পি হোটেলের চা পরটা,
জি ই সি মোড়ের হান্ডিতে তেহেরী,
আগ্রাবাদস্থ সিরভার স্পুন এর ছোট জিলাপি ও দই,
হালিশহরস্থ গাউসিয়া হোটেল এর ফিরনী ও চা,
আন্দরকিল্লা মদিনা'র শাক।
১০. চট্টগ্রামের চকবাজার সবুজ হোটেলের- সিঙ্গারা,
রেয়াজউদ্দিন বাজারের- দইচিড়া,
তুলসিধাম বোস ব্রাদার্সের- মিস্টি
১১. রংপুরের সিঙ্গারা হাউজের সিঙ্গারা with সস্
১২. বগুড়ার দই
১৩. গাইবান্ধার রস মালাই,
১৪. নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার গরম গরম স্পন্জের মিস্টি।
১৫. নারায়ণগঞ্জের আমলাপাড়া এলাকায় আলম কেবিনের সকালের নাস্তা, দুই নাম্বার রেলগেট এলাকায় বোস কেবিনের চা ও কাটলেট।
১৬. কুমিল্লায় অরিজিনাল মাতৃভান্ডারের (কান্দিরপাড়ের মনোহরপুড়ে দোকান) রসমালাই।
১৭. সিরাজগঞ্জের ধানসিঁড়ির দই। বগুড়ার দই এইটার কাছে কিসুনা। এইখানে একটা ঘি পাওয়া যায়। সেইটাও মারাত্নক।
১৮. সেন্ট মার্টিনে কুমিল্লা হোটেলের (জাহাজ ঘাটের কাছে) মিক্সড শুটকী ভর্তা।
১৯. সিলেটের উন্দাল রেস্টুরেন্টের হায়দ্রাবাদী ও চিকেন বিরিয়ানী, তন্দুরী চিকেন-স্পেশাল নান, স্পেশাল সালাদ।
২০. তালাইমারীর বট-পরোটা ( রাজশাহী ), বাটার মোড়ের জিলাপী ( রাজশাহী )
২১. মুক্তাগাছার মণ্ডা ( ময়মনসিংহ ),
২৩. দয়াময়ী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের খেজুর গুরের সন্দেশ ( ময়মনসিংহ ),
২৪. জয়কালী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ছানার পোলাও ( ময়মনসিংহ ),
২৫. চুকনগরের খাসির মাংস ( খুলনা ),
২৬. বরিশালের শশী মিষ্টি
২৭. সিলেটের শাহপরান মাজার গেটের মালাই চা, পুরাই সি....রাম।
জিন্দাবাজারের পাঁচ ভাই হোটেলের কোয়েলের রোস্ট।
২৮. খুলনার চুকনগরের আব্বাসের খাসির মাংশ
২৯. চাঁপাই নবাবগন্জের নশীপুরের দই,
চাঁপাই নবাবগন্জের শিবগন্জের মনাকষা বাজারের স্পন্জ গোল্লা / দমমিস্টি,
চাঁপাই নবাবগন্জের কলাইয়ের রুটি ও ধনিয়া পাতার চাটনি
৩০. নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি

Saturday, 12 October 2013

সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড জাতিসংঘ পদক নয়’- জাতিসংঘ। সাউথ সাউথ পাননি হাসিনা

কাউসার মুমিন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে: সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড জাতিসংঘ প্রদত্ত পদক নয় কিংবা এটি জাতিসংঘের পক্ষ থেকে অন্য কোন সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত কোন পুরস্কারও নয় বলে নিশ্চিত করেছে জাতিসংঘ সদর দপ্তর। এছাড়া, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এ বছরের সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড পাননি বলেও জানিয়েছে এই পুরস্কারের দুই উদ্যোক্তা সংগঠন সাউথ সাউথ নিউজ ও ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর সাউথ সাউথ  কো-অপারেশন (আইওএসএসসি)। জাতিসংঘ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের গতি ত্বরান্বিত করার প্রয়াসে এমডিজি বাস্তবায়নে সাফল্য অর্জনকারী দেশগুলোকে উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে তাদের সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘের কয়েকটি অঙ্গ সংস্থার সহযোগিতায় সাউথ সাউথ নিউজ নামের নিউ ইয়র্কের একটি বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে এই পুরস্কারটি দেয়া হয় বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তিকে সরকারের অনেক বড় অর্জন বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের অব্যাহত প্রচারণা এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এ বছরের সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তি নিয়ে বাংলাদেশের প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় এমনকি ব্লগ টুইটার ও ফেসবুকে বিপুল উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনার পাশাপাশি এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল বিতর্ক ও আমূল সন্দেহ প্রকাশের প্রেক্ষিতে এ বিষয়ে মানবজমিন-এর পক্ষ থেকে গতকাল জাতিসংঘ সদর দপ্তর ও সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড-এর আয়োজক ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য জানা যায়।
‘সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড’-এর সঙ্গে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা কি? এটা কি জাতিসংঘ প্রদত্ত কোন পদক?’ Ñএমন প্রশ্নের জবাবে জাতিসংঘের মুখপাত্র  মোরানা সং গতকাল এক লিখিত বার্তায় এই প্রতিনিধিকে বলেন, ‘সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড জাতিসংঘ পদক নয় কিংবা এটি জাতিসংঘের পক্ষ থেকে প্রদত্ত কোন পুরস্কার নয়।’ উল্লেখ্য, জাতিসংঘ মহাসচিবের নিয়মিত মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মার্টিন নেসার্কি’র অনুপস্থিতিতে গতকাল প্রেস ব্রিফিংয়ে অংশ নেন পাঁচজন সহযোগী মুখপাত্রের মধ্যে সিনিয়র ফারহান হক। জাতিসংঘ মহাসচিবের অপর সহযোগী মুখপাত্র এবং এশিয়ার দেশগুলোর বিষয়ে দায়িত্ব পালনকারী মোরানা সং আরও বলেন, সাউথ সাউথ নিউজ এই পুরস্কার দিয়ে থাকে। এই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান আয়োজনে জাতিসংঘের একটি বিশেষায়িত সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) অন্য আরও কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গে মিলে সাউথ সাউথ নিউজকে সাহায্য করে থাকে।   এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল  টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ)-এর নিউ ইয়র্কস্থ লিয়াজোঁ অফিসের প্রধান গ্যারি ফাউলি গতকাল এক লিখিত বার্তায় এই প্রতিনিধিকে জানান, প্রথমেই বলে রাখা ভাল ‘সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড’ জাতিসংঘের কোন পদক নয়। এর উদ্যোক্তা সাউথ সাউথ নিউজ।  জাতিসংঘ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের গতি ত্বরান্বিত করার প্রয়াসে এমডিজি বাস্তবায়নে সাফল্য অর্জনকারী দেশগুলোকে উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে তাদের সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ সাউথ সাউথ নিউজের পক্ষ থেকে এই অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়। অন্য অনেক ক্যাটিগরির সঙ্গে এই পুরস্কার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অর্জনকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তাই নিউ ইয়র্কের অন্য অনেকগুলো সংগঠনের সঙ্গে মিলে জাতিসংঘের একটি বিশেষায়িত সংস্থা হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) এই পুরস্কার অনুষ্ঠান আয়োজনে সমর্থন দিয়ে থাকে।’
এদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বছরের সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড পাননি। ২০১৩ সালের সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হননি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এ বিষয়ে এ বছরের সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড আয়োজনকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে দুই উদোক্তা সংগঠন সাউথ সাউথ নিউজ এবং ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর সাউথ সাউথ কো-অপারেশন (আইওএসএসসি)-এর ডাইরেক্টর  জেনারেল অ্যাম্বাসেডর আলেকজান্দ্রার কুজবা এই প্রতিনিধিকে টেলিফোনে বলেন, এ বছর আনুষ্ঠানিকভাবে যাদেরকে সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়েছে সেই তালিকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। তাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড-২০১৩’ দেয়া হয়নি। তিনি সাউথ সাউথ নিউজের পক্ষ থেকে যে পুরস্কারটি গ্রহণ করেছেন তার  লোগোতে সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড কথাটি লেখা থাকলেও এটি এ বছরের মূল সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড নয়। এটি একটি লিডারশিপ রিকগ্নিশন ক্রেস্ট। ২০১১ সালে সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড গ্রহণের পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অব্যাহত প্রয়াসের স্বীকৃতিস্বরূপ সাউথ সাউথ নিউজের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে এই রিকগনিশন ক্রেস্ট দেয়া হয়, কিন্তু এটি এ বছরের মূল সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড নয়। এ বিষয়ে মানবজমিন প্রতিবেদকের পাঠানো কয়েকটি প্রশ্নের একটি লিখিত উত্তর পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হলে জবাবে অ্যাম্বাসেডর আলেকজান্দ্রার কুজবা এই প্রতিনিধিকে বলেন, জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বাংলাদেশের মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এছাড়া সাউথ সাউথ নিউজের প্রেসিডেন্ট  ফ্রান্সিস  লোরেঞ্জো এখন বিদেশ সফরে আছেন। তিনি ফিরে আসা পর্যন্ত আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে। এদিকে সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ডের এ বছরের মূল অনুষ্ঠানটি বিগত ২২শে  সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ম্যানহাটনের ওয়াল্ডরফ এস্টোরিয়া হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়। এর একদিন পর ২৩শে  সেপ্টেম্বর ফ্লাইট বিলম্বের কারণে নির্ধারিত সময়ের আড়াই ঘণ্টা দেরিতে স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টায় নিউ ইয়র্কে পৌঁছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেদিন রাত ৯টায়  ম্যানহাটনের সেকেন্ড এভিনিউতে অবস্থিত সাউথ সাউথ নিউজ ও ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর সাউথ সাউথ কো-অপারেশন (আইওএসএসসি)-এর যৌথ কার্যালয়  থেকে এচিভমেন্ট ইন ফাইটিং  পোভার্টি ক্যাটিগরিতে একটি রিকগনিশন ক্রেস্ট গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর হাতে এই রিকগনিশন  ক্রেস্ট তুলে দেন ওই দু’টি প্রতিষ্ঠানের  প্রেসিডেন্ট অ্যাম্বাসেডর ফ্রান্সিস  লোরেঞ্জ। সাউথ সাউথ নিউজের মতে ওই রাতের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও জাতিসংঘে  যোগদানকারী বাংলাদেশ  ডেলিগেশনের ৩৫ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘের হাইলেভেল কমিটি অন সাউথ সাউথ  কো-অপারেশন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একটি সাব-কমিটি। প্রতি দুই বছর অন্তর অন্তর জাতিসংঘ মহাসচিবের পক্ষে ইউএনডিপি’র প্রশাসক সাউথ সাউথ  কো-অপারেশনের বৈঠক আহ্বান করে থাকেন। এই কমিটি দক্ষিণের  দেশগুলোর জাতিসংঘ সিস্টেমের অধীন যত সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তার আন্তঃসরকার সহযোগিতার বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে থাকে।  জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন ত্বরান্বিতকরণের লক্ষ্যে জাতিসংঘের হাইলেভেল কমিটি অন সাউথ সাউথ কো-অপারেশনের ১৬তম বৈঠকে ২০১০ সালের  ফেব্রুয়ারি মাসে ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর সাউথ সাউথ  কো-অপারেশন (আইওএসএসসি) এবং সাউথ সাউথ নিউজ গঠিত হয় । আইওএসএসসি’র কাজ হলো সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন গতিশীল করতে সদস্য দেশগুলোর সরকার ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী সংস্থা সমূহের বহুপক্ষীয় উদ্যোগগুলোকে সমন্বিত করা। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দক্ষিণের  দেশগুলোর সরকার, প্রাইভেট সেক্টর, সিভিল সোসাইটি, বুদ্ধিজীবী সমাজ, এবং পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, পর্যটন, সংস্কৃতি, অধিক হারে প্রযুক্তি হস্তান্তর ইত্যাদি বিষয়ে কর্মসূচি প্রণয়ন এবং তা সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সরবরাহ করাও আইওএসএসসি’র কাজ।  এর বাইরে  আইওএসএসসি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে দক্ষিণের  দেশগুলোর মধ্যে ডিজিটাল ডিভাইড কমিয়ে আনার জন্যও একই সঙ্গে কাজ করে থাকে। অপরদিকে  সাউথ সাউথ নিউজ-এর কাজ হলো জাতিসংঘ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বিষয়ক দক্ষিণের দেশগুলোর সাফল্যের  সংবাদ এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পিছিয়ে পড়ার কারণ অতিগুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা।  আফ্রিকা, এশিয়া প্যাসিফিক, মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকা ও  ক্যারিবিয়া অঞ্চলের ডিজিটাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সাউথ সাউথ নিউজ কাজ করে থাকে। এছাড়া দক্ষিণের উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের জাতীয় উন্নয়ন নীতিমালায় প্রযুক্তিকে কিভাবে উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে সে বিষয়ে সাউথ সাউথ নিউজ এডভোকেসি করে। আইওএসএসসি সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড প্রদানের প্রধান সমন্বয়ক। আর ইভেন্ট বাস্তবায়নে গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট কাজগুলো করে থাকে এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান সাউথ সাউথ নিউজ। পুরস্কার প্রদানের অনুষ্ঠান আয়োজনে সহায়তা করে থাকে জাতিসংঘে তৃতীয় বিশ্বের কয়েকটি দেশের স্থায়ী মিশন। এর মধ্যে রয়েছে মালাউই, ডমিনিকান প্রজাতন্ত্র, জাম্বিয়া, তাজিকিস্তান, এল সালভাদর ও হন্ডুরাস।
এই পুরস্কার সূচনার বছর ২০১১ সালে। পুরস্কারের থিম সাবজেক্ট ছিল ‘ডিজিটাল হেলথ ফর ডিজিটাল  ডেভেলপমেন্ট’। এই থিমের আওতায় ২০১১ সালে বিভিন্ন ক্যাটিগরিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান এবং বেসরকারি সংস্থা প্রধান মিলিয়ে ১৫ জনকে সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়।  এ বছরই  ‘গ্লোবাল উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেনস  হেলথ’ ক্যাটিগরিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড’ দেয়া হয়। ওই বছর একই ক্যাটিগরিতে  ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট লিওনেল ফার্নান্দেজ রেইনাকেও সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়। ‘ইনোভেশন অ্যান্ড টেকনোলজি ফর সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ থিমে অনুষ্ঠিত ২০১৩ সালের সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড-এর মূল অনুষ্ঠানটি দুই উদ্যোক্তা সংগঠন সাউথ সাউথ নিউজ ও ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর সাউথ সাউথ  কো-অপারেশন (আইওএসএসসি)- এর সঙ্গে কো-অর্গানাইজার হিসেবে ছিল জাতিসংঘে এন্টিগুয়া ও বারমুদা’র স্থায়ী মিশন, ইন্টারন্যাশনাল  টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন এবং ইউনাইটেড নেশনস্ পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন নেটওয়ার্ক। এবারে পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ছিলেন দক্ষিণ  আফ্রিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান বিশ্বের জীবন্ত কিংবদন্তি  নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা, কোস্টারিকার  প্রেসিডেন্ট লোরা মিরান্ডা, বাহরাইনের প্রধানমন্ত্রী খলিফা বিন সালমান আল খলিফা ও ফিজির প্রধানমন্ত্রী হোসে  বোর্গে বাইনিমারামা। নেলসন ম্যান্ডেলার পক্ষে তার কন্যা জিন্দি ম্যান্ডেলা এ পুরস্কার গ্রহণ করেন। এ উপলক্ষে সাউথ সাউথ নিউজের প্রেস রিলিজ কিংবা পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকায় কোথাও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নাম নেই। অবশ্য মূল অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তৃতায় সাউথ সাউথ নিউজের প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সিস  লোরেনজো দারিদ্র্যবিমোচনে  ডোমিনিকান রিপাবলিকের ফার্স্ট  লেডি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অব্যাহত ভূমিকার প্রশংসা করেন।
সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তি নিয়ে ২০১১ সাল  থেকেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এই পুরস্কার প্রাপ্তিকে সরকারের বিরাট সাফল্য হিসেবে ব্যাপক প্রচারণা চালালেও এটি যে জাতিসংঘের নিজস্ব  কোন পদক নয় সে বিষয়টি তারা কখনওই জাতিকে খোলাসা করে বলেননি।

টুঁটিচাপা মিডিয়া

গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরেছে মহাজোট সরকার। তাদের পুরো ৫ বছরেই গেছে সাংবাদিক নির্যাতন আর মিডিয়া দলনের মাধ্যমে। সংবাদপত্র দলনে জঘন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে এই সরকার। চাঞ্চল্যকর সাগর-রুনিসহ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ১৯ সাংবাদিক। বিরোধী মতের সাংবাদিকদের শুধু হামলা-মামলা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, মধ্যরাতে শত শত পুলিশ পত্রিকা অফিস ঘেরাও করে সাংবাদিকদের মারধর, সম্পাদককে গ্রেফতার, রিমান্ডে নেয়া, মাসের পর মাস জেলে পুরে রাখা, পত্রিকা ও টেলিভিশন বন্ধ করে দেয়া এবং বিনা অজুহাতে প্রেস সিলগালা করাসহ হেন অপকর্ম নেই, যা এই সরকারের আমলে হয়নি। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিক আমার দেশ, দিগন্ত টেলিভিশন, ইসলামিক টেলিভিশন, চ্যানেল ওয়ান ও অনলাইন পত্রিকা শীর্ষ নিউজ ও শীর্ষ কাগজ। আসতে দেয়া হয়নি যমুনা টেলিভিশনকে। দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে দুই দফায় গ্রেফতার করে তার বিরুদ্ধে দেয়া হয়েছে ৬৮টি সাজানো ও মিথ্যা মামলা। প্রথম দফায় ১০ মাস এবং দ্বিতীয় দফায় বিগত ৬ মাসের বেশি সময় ধরে কারাগারে আছেন তিনি। দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক প্রবীণ সাংবাদিক আবুল আসাদকেও গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে শীর্ষ কাগজ ও শীর্ষ নিউজ ডটকম সম্পাদক একরামুল হককে। তার বিরুদ্ধেও দেয়া হয় বেশ কয়েকটি সাজানো মামলা। এছাড়া ফেসবুক বন্ধ করা, সরকারের সমালোচনা করে এমন ওয়েবসাইটগুলো বন্ধ করা কিংবা বিটিআরসির মাধ্যমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিসহ সাংবাদিক নির্যাতন এবং মিডিয়া দলনের নয়া রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের ক্যাডার বাহিনীর হামলার শিকার হয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে বহু সাংবাদিককে। এছাড়া পত্রিকা বিলি করতে না দেয়া, পত্রিকায় অগ্নিসংযোগ, এজেন্টদের দোকানে অগ্নিসংযোগ, পত্রিকা ছিনিয়ে নেয়া, এজেন্ট ও হকারদের মারধরসহ মিডিয়া দলনে অসংখ্য নিকৃষ্ট স্থাপন করেছে এই সরকার। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি অতি উত্সাহী পুলিশ সদস্যরাও এক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল না। তারা সরকরি দলের নেতাদের খুশি করার জন্য নিজেরাই বাদী খুঁজে খুঁজে এনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করিয়েছেন। মামলা করেছে মন্ত্রী-এমপিদের চেলা-চামুণ্ডারাও। সব মিলিয়ে এই পাঁচ বছর কঠিন সময় পার করেছে বাংলাদেশের গণমাধ্যম।
আওয়ামী লীগের সাংবাদিক নির্যাতন নতুন কিছু নয়। ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন বাকশাল কায়েমের সময় ১৬ জুন প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে সরকারের লিফলেট আকারে চারটি সংবাদপত্র রেখে সব জাতীয়, আঞ্চলিক দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। বেকার হয়েছিলেন হাজার হাজার সাংবাদিক। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ১০ সাংবাদিক খুন হন এবং বহু সাংবাদিক হামলা ও নির্যাতনের শিকার হন। ওই সময় বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল ট্রাস্ট পরিচালিত পত্রিকা দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ টাইমস, বিচিত্রা, আনন্দা বিচিত্রাসহ বহু কাগজ। এবারও ক্ষমতায় এসে একই ধরনের নজির স্থাপন করেছে আওয়ামী লীগ সরকার।

১৯ সাংবাদিক খুন
মহাজোট সরকারের শাসনামলে খুন হয়েছেন ১৯ সাংবাদিক। নির্মম হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে শুধু সাংবাদিক ফরহাদ খাঁ দম্পতির নামমাত্র বিচার হয়েছে। বহুল
আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডসহ ১৮টি হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার হয়নি। প্রকৃত আসামিরাও গ্রেফতার হয়নি।
২০১৩ সালের ১৯ জানুয়ারি টাঙ্গাইল থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক মূলস্রোত পত্রিকার সম্পাদক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমদকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদেরই দায়ী করেছেন নিহতের পরিবারের লোকজন। এর আগে ২০১৩ সালের ১৬ জানুয়ারি ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে পত্রিকার কার্যালয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে খুন হয়েছেন সাপ্তাহিক অপরাধ দমন পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক দুর্জয় চৌধুরী দীপু। ২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর নরসিংদীতে খুন হন দৈনিক নরসিংদীর বাণী পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার তালহাদ আহমেদ কাবিদ। গত ১১ ফেব্রুয়ারি নিজ ফ্ল্যাটে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন সাংবাদিক দম্পতি মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারোয়ার ও এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনি। বহুল আলোচিত সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও মামলার আসামিদের গ্রেফতারে এখনও কোনো সফলতা দেখাতে পারেনি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা। সারা দেশের মানুষ এখনও উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য জানতে চাইছে। কিন্তু তদন্ত সংস্থা পুলিশ, র্যাব, সিআইডি বরাবরই এ বিষয়ে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
২০১১ সালের ১৬ জুন সারা দেশের সাংবাদিক সমাজ যখন সংবাদপত্রের কালো দিবস পালন করছিল, ঠিক ওই সময়ে যশোরের শার্শা উপজেলায় দৈনিক গ্রামের কাগজের শার্শা প্রতিনিধি জামাল উদ্দিন খুন হন। সরকারি দল আশ্রিত মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সংবাদ লেখায় পুলিশের সহযোগিতায় খুন করা হয় জামাল উদ্দিনকে। তার হত্যাকারীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও এখনও গ্রেফতার করা যায়নি। ২০১১ সালের ১০ জুলাই খুন হয়েছেন হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে দৈনিক বিবিয়ানার স্টাফ রিপোর্টার জুনায়েদ আহমদ জুনেদ। তাকে নৃশংসভাবে খুনের পর লাশ রেললাইনে ফেলে রাখা হয়েছিল। একই বছরের ২৮ জানুয়ারি নয়াপল্টনের বাসায় খুন হওয়া প্রবীণ সাংবাদিক ও দৈনিক জনতার সহসম্পাদক ফরহাদ খাঁ (৬০) ও তার স্ত্রী রহিমা খাঁ (৫৫)। ২০১০ সালের ৭ ডিসেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কুকরাইল এলাকায় গলাকেটে হত্যা করা হয় দৈনিক ভোরের ডাকের গোবিন্দগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি ফরিদুল ইসলাম রঞ্জুকে। একই বছর ৭ এপ্রিল চট্টগ্রামের পোর্ট কলোনি এলাকায় দৈনিক আজকের প্রত্যাশা, সাপ্তাহিক সংবাদচিত্র ও আজকের সূর্যোদয় পত্রিকার সাংবাদিক মাহবুব টুটুলকে খুন করা হয়। একই দিন অর্থাত্ ২০১০ সালের ৭ এপ্রিল ঢাকার উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের সাপ্তাহিক বজ্রকণ্ঠের সাংবাদিক আলতাফ হোসেনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে ২০১০ সালের ৯ মে গুপ্তহত্যার শিকার হন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন বাংলার সিনিয়র ক্যামেরাম্যান শফিকুল ইসলাম টুটুল। যদিও পুলিশের দাবি টুটুল সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীদের হাতে খুন হয়েছে। তার হত্যার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল হামলার পর ২৮ এপ্রিল নিহত হন সাপ্তাহিক ২০০০-এর সিলেট প্রতিনিধি সাহসী সাংবাদিক ফতেহ ওসমানী। সরকারি দল-আশ্রিত হওয়ায় ফতেহ ওসমানীর খুনিরা গ্রেফতার হয়নি। ২০০৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হন বরিশালের মুলাদী প্রেস ক্লাবের সভাপতি মনির হোসেন রাঢ়ী। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকায় এনটিভির ভিডিও এডিটর আতিকুল ইসলাম আতিক, একই বছর জুলাই মাসে ঢাকার পাক্ষিক মুক্তমনের স্টাফ রিপোর্টার নুরুল ইসলাম ওরফে রানা, আগস্ট মাসে গাজীপুরে ঢাকার সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক সময়-এর নির্বাহী সম্পাদক এমএম আহসান হাবিব বারী, ডিসেম্বরে রূপগঞ্জে দৈনিক ইনকিলাব সংবাদদাতা ও রূপগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সহ-সভাপতি আবুল হাসান আসিফ খুন হন। যদিও পুলিশ দাবি করেছে আবুল হাসান আসিফ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।

আমার দেশ ও মাহমুদুর রহমান প্রসঙ্গ
মহাজোট সরকারের আমলে যে মিডিয়াটির সবচেয়ে বেশি টুঁটি চেপে ধরা হয়েছে যে মিডিয়াটি সর্বাধিক হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে সেটি হচ্ছে দৈনিক আমার দেশ। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই নিরপেক্ষ ও সাহসী সংবাদ প্রকাশের কারণে আমার দেশ সরকারের রোষানলে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক ইলাহীর বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণের খবর পত্রিকায় প্রকাশ হওয়ার পর থেকে সারা দেশে হামলা চলতে থাকে আমার দেশ-এর ওপর, হতে থাকে সিরিজ মামলা। দুর্নীতি রিপোর্ট করায় সাংবাদিক এম আবদুল্লাহর ওপর রাজধানীর বনানীতে হামলা চালানো হয়। এতে গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান। ওই রিপোর্টের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে ২৫টি মামলা দেয় সরকারি দল। ২০১০ সালের ১ জুন শত শত সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীর বিক্ষোভ বাধা উপেক্ষা করে সাংবাদিকদের মারধর করে আমার দেশ কার্যালয় থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ায় হয় আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে। তাকে গ্রেফতারের সময় শত শত পুলিশ ঘিরে ফেলে আমার দেশ কার্যালয়। বন্ধ করে দেয়া হয় খাবার পানি সরবরাহ ডিসলাইনসহ সবকিছু। পরদিনই সরকার আমার দেশ পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করায় পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ আমার দেশ পত্রিকার ছাপাখানা ওই দিনই রাত ১১টায় সিলগালা করে দেয়। ১০ জুন ২০১০ বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ও বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের ডিভিশন বেঞ্চ পত্রিকাটির প্রকাশনা অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন। কিন্তু হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশের পরও সরকার পত্রিকার ছাপাখানা খুলে দেয়নি। এরপর ১৫ জুন, ২০১০ আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশনা বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগের স্থগিতাদেশ অ্যাটর্নি জেনারেলের আবেদনের প্রেক্ষিতে আপিল বিভাগের চেম্বার জজ বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এসকে সিনহা) চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত করেন। বন্ধ করার সময় আমার দেশ পত্রিকায় সাত শতাধিক সাংবাদিক ও স্টাফ কর্মরত ছিল।
প্রথম দফায় গ্রেফতারের পর ২ জুন ভোররাত ৪টায় পুলিশ আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় হাসমত আলীর দায়ের করা কথিত মামলায় আমার দেশ পত্রিকা অফিস থেকে গ্রেফতার করে। মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতারের সময় পুলিশকে মারধর ও সরকারি কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে শতাধিক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়। মামলায় মাহমুদুর রহমান ছাড়াও আমার দেশ-এর নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ, বার্তা সম্পাদক জাহেদ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক সঞ্জীব চৌধুরী ও সিনিয়র রিপোর্টার আলাউদ্দিন আরিফসহ ৫ জনকে এজহারভুক্ত আসামি করে। পরে এই মামলায় আমার দেশ-এর সব সাংবাদিকের রিমান্ডে নেয়ার চেষ্টা করে পুলিশ। আমার দেশ সম্পাদককে গ্রেফতারের আগে ২০১০ সালের গত ১ জুন সকাল ৯টায় পত্রিকাটির প্রকাশক মো. হাসমত আলীকে তার শাহজাহানপুরের বাসা থেকে এনএসআই সদস্যরা আটক করে তাদের অফিসে নিয়ে কয়েকটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নেন। পরে জানা যায়, ওই কাগজপত্রে লেখা হয়েছে, তিনি কিছুদিন আগে মাহমুদুর রহমানের কাছে পত্রিকার শেয়ার হস্তান্তর করেছেন। তারপরও মাহমুদুর রহমান প্রকাশক হিসেবে তার নাম ছেপে আসছেন। এ কারণে পত্রিকাটিতে কিছু রিপোর্ট ছাপার অভিযোগে মাহমুদুর রহমানের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করা হচ্ছে। মাহমুদুর রহমান আমার দেশের প্রকাশক হিসেবে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ঢাকার জেলা প্রশাসকের কাছে ২০০৯ সালে একটি আবেদন করেছিলেন। কিন্তু জেলা প্রশাসন সরকারি নির্দেশে সেই আবেদনটি দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রেখে পরে বাতিল করে দেয়। পরে হাশমত আলী নিজেই ওই মামলা প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু পুলিশ এর পরও ওই মামলায় আদালতে চার্জশিট দিয়েছে।
প্রথম দফায় অফিস থেকে গ্রেফতারের পর মাহমুদুর রহমানকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে হাজির করার পর আদালত হাসমত আলীর স্বাক্ষর করা মামলায় তার জামিন মঞ্জুর করেন। তবে পুলিশকে মারধর ও সরকারি কাজে বাধাদানের মামলায় জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করেন। পুলিশ আদালতের কাছে ৫ দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত প্রয়োজনে তিন দিনের মধ্যে কারাফটকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন। ২ জুন, ২০১০ মাহমুদুর রহমানকে আদালতে হাজির করার সময় উপস্থিত লোকজন বিক্ষোভ প্রদর্শন করলে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে। ওই দিনই পুলিশকে মারধর করার জন্য কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয় এবং সেই মামলায় মাহমুদুর রহমানকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে ৭ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। আদালত সরকারি কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে তেজগাঁও থানার মামলায় ৩ দিন এবং কোতোয়ালি থানার মামলায় এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ২০১০ সালের ৬ জুন উত্তরা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে পুরনো মামলায় মাহমুদুর রহমানকে যুক্ত করা হয় এবং ৭ জুন ২০১০ বিমানবন্দর থানায় তার বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি না নিয়েই কথিত রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা দায়ের করে। উত্তরা থানা এবং বিমানবন্দর থানা পুলিশ মামলার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মোট ২০ দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত ৪ দিন করে আরো ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। এর ফলে মাহমুদুর রহমানকে প্রথম দফায় মোট ১২ দিনের রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালানো হয়। ২০১০ সালের ৮ জুন মাহমুদুর রহমানকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি আদালতে বলেন, ‘আমাকে নির্যাতন করা হয়েছে। আমি খেতে চেয়েছি। কিন্তু খাওয়া-দাওয়া তো দূরে থাক পুলিশ আমাকে এক ফোঁটা পানিও দেয়নি। এ সরকার আমাকে মেরে ফেলবে। আমি আর হয়তো জীবন নিয়ে ফিরে আসতে পারব না।’ ৮ জুন ২০১০-এ কোতোয়ালি থানার রিমান্ড শেষে ৯ জুন মাহমুদুর রহমানকে আদালতে হাজির করা হয় এবং তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় ৩ দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়। কিন্তু তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার রিমান্ডে নেয়া হলেও তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যান্টনমেন্ট থানা হাজতে। ১২ জুন, ২০১০ মাহমুদুর রহমানকে তেজগাঁও থানার মামলায় (২(৬)২০১০) ৩ দিনের রিমান্ড শেষে ম্যাজিস্ট্রেট কামরুন বাহার রুমীর আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে ১০ জুন ভোররাত পৌনে ২টায় ৫ জন লোক এসে আমার চোখ বেঁধে বিবস্ত্র করে ফেলে এবং অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে কনুই দিয়ে বুকে ও পিঠে জোরে আঘাত করলে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। জ্ঞান ফিরে এলে দেখি ক্যান্টনমেন্ট থানার সেকেন্ড অফিসারের রুমে শুয়ে আছি।’
পরে উত্তরা থানায় দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেফতার দেখানোর মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা ৯ জুন মঞ্জুর করা চার দিনের জন্য রিমান্ডে নেয়ার আবেদন পেশ করলে ম্যাজিস্ট্রেট রাশেদ কবীর কোর্ট হাজতখানা থেকে মাহমুদুর রহমানকে রিমান্ডে নেয়ার আদেশ দেন।
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে ডিবি অফিসে নেয়া হয় এবং জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গত ১৬ জুন, ২০১০ তাকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাকে জেলহাজতে পাঠায় এবং সুচিকিত্সার জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়। কারাগারে মাহমুদুর রহমান চরম অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২০ জুন, ২০১০ কারাগারে চিকিত্সাধীন মাহমুদুর রহমানকে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলায় রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। তখনও তার শরীরে ছিল ব্যাপক নির্যাতনের চিহ্ন। ২০১০ সালের ২৩ জুন সকালে নম্বরপ্লেটবিহীন দুটি গাড়িতে করে ডিবি অফিস থেকে বের করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। ২৪ জুন মাহমুদুর রহমানকে সিএমএম কোর্টে হাজির করা হলে তিনি আদালতে বলেন, তাকে র্যাব-১ কার্যালয়ে নিয়ে সকাল আনুমানিক ৭টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত চোখ বেঁধে কবরের মতো একটি ছোট সেলে হাতকড়া পড়িয়ে গ্রিলের সঙ্গে আটকিয়ে রাখা হয়।’ তিনি আদালতকে প্রশ্ন করে বলেন, ‘নির্যাতনের সংজ্ঞা কী?’ এ ছাড়া মাহমুদুর রহমান তার আইনজীবীর কাছে জানান, র্যাব-১ কার্যালয়ে নেয়ার পর তার কাছ থেকে সাদা কাগজে স্বাক্ষর এবং আঙুলের ছাপ নেয়া হয়। এরপর আদালত মাহমুদুর রহমানকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এছাড়া মাহমুদুর রহমানকে ২০১০ সালের ১৩ জুলাই দুদকের দায়ের করা একটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। পরে এসব মামলায় তিনি আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন।
২০১০ সালের ১৯ আগস্ট সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন নজির সৃষ্টি করে আদালত অবমাননার অভিযোগে আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ৬ মাসের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক মাসের কারাদণ্ড দেয়। এছাড়াও প্রতিবেদক অলিউল্লাহ নোমানকে এক মাসের কারাদণ্ড, দশ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৭ দিনের কারাদণ্ড এবং প্রকাশক মো. হাশমত আলীকে দশ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে ৭ দিনের কারাদণ্ড দেয়া হয়। ওই বছরের ২১ এপ্রিল আমার দেশ পত্রিকায় ‘চেম্বার জজ মানেই সরকার পক্ষের স্টে’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের জন্যে সুপ্রিমকোর্টের সরকারপন্থী দুই আইনজীবীর করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ ওই দণ্ড দেয়। মামলার শুনানিতে ‘আমার দেশ’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান নিজেই বক্তব্য উপস্থাপন করে বলেন, ‘আমার দেশ সত্য ঘটনা তুলে ধরেছে মাত্র। রাষ্ট্র, বিচার বিভাগ ও জনস্বার্থে নির্ভুলভাবে এ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়ে থাকলে সেটি ভুল তথ্য দিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসই করেছে। আদালত অবমাননার মামলা হলে তাদের বিরুদ্ধেই হওয়া উচিত ছিল।’ মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘আমি গর্ববোধ করি, আমার নেতৃত্বে আমার দেশ মানবাধিকার, আইনের শাসন ও জাতীয় স্বার্থের পক্ষে ভূমিকা পালন করছে। সত্যের জন্য লড়াই করতে হলে মূল্য দিতে হয়, আমি তা দিতে প্রস্তুত রয়েছি। হয়েছেও তাই। মাহমুদুর রহমান প্রথম দফায় দীর্ঘ ২৮৮ দিন কারাভোগের পর ২০১১ সালে ১৭ মার্চ গাজীপুর জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান। ওই সময় মামলার হাজিরার নামে তাকে নেয়া হয়েছিল দেশের বিভিন্ন কারাগারে। মাহমুদুর রহমান সেসব ঘটনার বর্ণনা করে ‘জেল থেকে জেলে’ নামক একটি সাড়াজাগানো বই লিখেছেন। একজন সম্পাদকের লেখা রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণধর্মী সেই বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ওই বইতে তিনি লিখেছেন কীভাবে সরকারের তাঁবেদার বাহিনী তাকে এক জেলখানা থেকে অন্য জেলখানায় নিয়ে হয়রানি ও নির্যাতন করেছে।

দ্বিতীয় দফায় গ্রেফতার
২০১১ সালের ১৭ মার্চ কারামুক্তির পর দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব মানবাধিকারের পক্ষে সরকারের গণহত্যা, গণগ্রেফতার, গণনির্যাতনের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে কলাম লিখতে থাকেন মজলুম সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। দৈনিক আমার দেশও অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী সংবাদ প্রকাশ করে পাঠক মহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়। পরিস্থিতি এমন হয় যে সর্বাধুনিক মেশিনে পত্রিকা ছাপিয়ে পাঠক চাহিদা পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সাহসী সংবাদ প্রকাশের ধারাবাহিকতায় কথিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম ও তার প্রবাসী বন্ধু আহমদ জিয়াউদ্দিনের স্কাইপে সংলাপ প্রকাশ করে। ওই সংবাদের সত্যতা স্বীকার করে পদত্যাগ করেন নিজামুল হক নাসিম। ধারাবাহিক ওই সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর আবারও চারদিক থেকে খাবলে ধরা হয় আমার দেশকে। স্কাইপে সংলাপ প্রকাশের অভিযোগে ২০১৩ সালের ১৩ এপ্রিল রাতে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর কর্তৃক সিএমএম আদালতে মামলা করা হয়। মামলা দায়েরের পর থেকে আমার দেশ কার্যালয়েই অবরুদ্ধ ছিলেন সাহসী সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। কয়েক দফা উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিতে চাইলেও আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেননি, বরং একটির পর একটি মামলা ও সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা টানা হুঙ্কার ছেড়েছেন মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে। শাহবাগের কথিত গণজাগরণ মঞ্চ থেকেও আমার দেশ সম্পাদককে গ্রেফতারের জন্য দফায় দফায় সারকারকে আল্টিমেটাম ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দেয়া হয়। একটানা ৪ মাস আমার দেশ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ ও গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিলেন মাহমদুর রহমান। পত্রিকা অফিসে আসা লোকজনকে তল্লাশি, ধরে নিয়ে যাওয়া, নজরদারিতে রাখাসহ নানাভাবে হয়রানি করা হয়।
স্কাইপে সংলাপ প্রকাশের জন্য আমার দেশ-এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন সরকারপন্থী আইনজীবী আহজার উল্লাহ ভূঁইয়া। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিতর্কিত বিচারপতি শামসুদ্দীন চৌধুরী মানিকের বেঞ্চ থেকে আমার দেশ ও মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে রুল জারি করা হয়। ওই রুল জারির কয়েক ঘণ্টা পর সন্ধ্যা ৭টায় ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন আদালতে ২০০৬ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এজাহার হিসেবে দায়ের করার নির্দেশ দেয়। ১৩ ডিসেম্বর মামলা দায়েরের পর থেকেই সারা দেশে খবর ছড়িয়ে পড়ে—যে কোনো সময় মাহমুদুর রহমান গ্রেফতার হতে পারেন। মাহমুদুর রহমান নিজেও সংবাদসম্মেলন ডেকে নিজের গ্রেফতারের আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেন। ১৪ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১০টায় তেজগাঁও থানায় মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড করেন। কিন্তু রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে মামলা করার ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব-অনুমোদন নেয়ার শর্ত থাকলেও ওই মামলার ক্ষেত্রে সেটি করা হয়নি। মাহমুদুর রহমানকে অবরুদ্ধ রেখে তাকে গ্রেফতারের জন্য নানারকম ফন্দিফিকির করতে থাকে সরকার। ওই সময় সরকারের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুসহ বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপি আমার দেশ ও মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে হঙ্কার দিতে থাকেন। টানা ১১৯ দিন অবরুদ্ধ থাকার পর ১১ এপ্রিল সকাল ৮টায় হঠাত্ আমার দেশ কার্যালয়ে হানা দেয় শতাধিক সশস্ত্র ডিবি পুলিশ সদস্য। তারা উপস্থিত নিরাপত্তা কর্মী ও সাংবাদিকরা মারধর করে আমার দেশ সম্পাদককে তুলে নিয়ে যান। ওই দিন রাতেই তেজগাঁওয়ে আমার দেশ-এর প্রেস সিলগালা করে দেয় পুলিশ।
অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় আমার দেশ সম্পাদকের বিরুদ্ধে তেজগাঁও, শাহবাগ ও রমনা থানায় ৮টি মামলা দেয়া হয়। এর মধ্যে তেজগাঁও থানার দুটি মামলা দেয়া হয়েছে সশরীরে উপস্থিত থেকে বাস ও ট্যাক্সিক্যাবে অগ্নিসংযোগের অভিযোগে। অপর ৬টি মামলা দেয়া হয়েছে সংবাদ লিখে শাহবাজের কথিত গণগাজরণ মঞ্চে হামলা চালানোর অভিযোগে। এসব মামলাতেও মাহমুদুর রহমানকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। ১১ এপ্রিল গ্রেফতারের পর থেকে মাহমুদুর রহমান কারাবন্দি রয়েছেন।

মাহমুদুর রহমানের মা ও আবুল আসাদের বিরুদ্ধে মামলা
কোনো কারণ ছাড়াই প্রেস সিলগালা করার পর সরকার আমার দেশ বন্ধ করার পর বিকল্প ব্যবস্থায় দৈনিক আমার দেশ প্রকাশ করায় মগবাজারে দৈনিক সংগ্রামের আল ফালাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে আমার দেশ-এর ১৯ সংবাদ কর্মীকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠায়। পত্রিকা ছাপানোর কারণে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের মা মাহমুদা বেগম ও দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক আবুল আসাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। এছাড়াও ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে বিনা কারণে দৈনিক সংগ্রাম সম্পাদক ও প্রবীণ সাংবাদিক আবুল আসাদকে আরেক দফায় গ্রেফতার করেছিল র্যাব। গ্রেফতারের পর তাকে রিমান্ডে নেয়া হয়। পরে জামিনে মুক্তি পান তিনি।

দিগন্ত ও ইসলামিক টেলিভিশন বন্ধ
ব্লগে ইসলাম ও রাসুল (স.)-এর সম্পর্কে অবমাননাকর লেখার প্রতিবাদে এবং ব্লগারদের শাস্তিসহ ১৩ দফা দাবিতে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি ও পরে ঢাকার শাপলা চত্বরে মহাবেশ করে। ওই সমাবেশে দুপুর থেকেই পুলিশ ও ক্ষমতাসীন জোটের ক্যাডাররা হামলা শুরু করে। চলতে থাকে সংঘর্ষ। এতে বিপুলসংখ্যক ধর্মপ্রাণ মানুষ প্রাণ হারান। দিগন্ত টেলিভিশন ও ইসলামিক টেলিভিশন এসব হামলা সংঘর্ষের খবর সরাসরি প্রচার করতে থাকে। রাত আড়াইটায় বৈদ্যুতিক লাইন বন্ধ করে চারদিকে পুলিশ, বিজিবি, র্যাবসহ যৌথবাহিনী ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ নামে অভিযান শুরু করে। রাতের অন্ধকারে ঝিকিররত তৌহিদি জনতার ওপর চারদিক থেকে বৃষ্টির মতো গুলি চালানো হয়। ওইসব গুলি, গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপের মাধ্যমে গণহত্যা ও লাশগুমের সরাসরি চিত্র বা কোনো ধরনের ভিডিও যাতে প্রচার করা সম্ভব না হয় সেজন্য অভিযানের সময় দিগন্ত টেলিভিশন ও ইসলামিক টেলিভিশন বন্ধ করে দেয়া হয়। হঠাত্ বন্ধ করে দেয়া চ্যানেল দুটি এখন পর্যন্ত খুলে দেয়া হয়নি। কর্তৃপক্ষ দফায় দফায় তথ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন মহলে ধরনা দিয়েও কোনো ফল হয়নি। চ্যানেল দুটির সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীরা বেকার অবস্থায় রয়েছেন। বন্ধ করার আগেও দিগন্ত টেলিভিশন কর্তৃপক্ষকে নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে। স্যাটেলাইট ভাড়া দেয়ার জন্য টাকা পাঠানোর অনুমতি না দেয়া, সরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠান কভার করতে না দেয়া, নানাভাবে হুমকি-ধমকির মধ্যেই কেটেছে চ্যানেলটির পুরো সময়কাল।

চ্যানেল ওয়ান বন্ধ
২০১০ সালের ১৭ এপ্রিল বন্ধ করে দেয়া হয় বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ওয়ান। সরকারের দাবি ছিল অনিয়মের কারণে চ্যানেলটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। মূলত চ্যানেল ওয়ানের মালিক প্রফেসর মাজেদুল ইসলাম জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী হওয়ায় তার চ্যানেল বন্ধ করে শত শত সাংবাদিককে বেকার করে দেয়া হয়েছে।

একুশে টেলিভিশনকে হয়রানি
কিছুটা নিরপেক্ষ সংবাদ প্রচার করায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কর্তৃপক্ষ বিটিআরসি ও এনবিআরের মাধ্যমে একুশে টেলিভিশন কর্তৃপক্ষকে দফায় দফায় হয়রানি করা হয়। তাদের তরঙ্গ স্থগিত রাখা, স্যাটেলাইট ভাড়া দেয়ার সুযোগ না দেয়াসহ নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়।

যমুনা টেলিভিশনকে আসতে দেয়া হয়নি
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সম্প্রচারের অনুমতি পায় যমুনা টেলিভিশন। মোটা অঙ্কের বাজেট নিয়ে ২০০৯ সালের ১৫ অক্টোবর চ্যানেলটি পরীক্ষামূলক সম্প্রচার শুরু করে। পরীক্ষামূলক সম্প্রচার শুরুর পর যমুনা কর্তৃপক্ষ যখন পূর্ণাঙ্গ সম্প্রচারের প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখনই চ্যানেলটির বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরীক্ষামূলক সম্প্রচার চালুর ৩৪ দিন পর যমুনা টেলিভিশন সরকারের নির্দেশে পরীক্ষামূলক সম্প্রচার বন্ধ করে দেয় বিটিআরসি। জব্দ করা হয় যন্ত্রপাতি। সম্প্রচার কক্ষ সিলগালা করে দেয়া হয় ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর। এর পর থেকে যমুনার সম্প্রচার বন্ধ রয়েছে। সম্প্রতি সুপ্রিমকোর্ট থেকে সম্প্রচারের অনুমতি পেয়েছে চ্যানেলটি।

শীর্ষ নিউজ বন্ধ ও সম্পাদককে গ্রেফতার
শীর্ষ নিজউ ডটকম নামে একটি অনলাইন পত্রিকা ২০০৯ সালের ১৭ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে অল্প দিনেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করায় ২০১১ সালে রোষানলে পড়ে অনলাইন শীর্ষ নিউজ ডটকম ও সহযোগী প্রতিষ্ঠান সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজ। শীর্ষ নিউজ ডটকম ও শীর্ষ কাগজের ১০ সাংবাদিকের সব অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করে সরকার। ২০১১ সালের ৩১ আগস্ট শীর্ষ কাগজ ও শীর্ষ নিউজ সম্পাদক ইকরামুল হককে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সাজানো মামলা দিয়ে চার দিনের রিমান্ডে এবং রিমান্ড শেষে জেলহাজতে পাঠানো হয়। অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে যায় জনপ্রিয় অনলাইন শীর্ষ নিউজ ডটকম ও সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজ। দীর্ঘ কারাভোগ শেষে শীর্ষকাগজ সম্পাদক ওই বছর ২৫ নভেম্বর মুক্তি পান। ২০১৩ সালে সীমিত পরিসরে শীর্ষ নিউজ ডটকম নতুন করে যাত্রা শুরু করে।

অন্যান্য
বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সরাসরি হুমকির শিকার হয়েছেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবীর ও আমাদের সময় সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খানসহ আরও বেশ কয়েকজন সম্পাদক। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদও পড়েছেন সরকারের রোষানলে। তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সিরিজ মামলা করা হয়েছে। এমপি রনির সরাসরি হামলার শিকার হয়েছে ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের দুই সাংবাদিক। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সরকারবিরোধী ব্যক্তিদের পরিচালিত কমপক্ষে এক ডজনের বেশি অনলাইন। এছাড়াও রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের শত শত সাংবাদিক হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন। এর যেন শেষ নেই। মূলত সরকারের দুর্নীতি অপকর্ম ধামাচাপা দিতেই দেশজুড়ে মিডিয়ার টুঁটি চেপে ধরে সরকার।