Thursday, 10 October 2013

বেপরোয়া দুর্নীতির উপাখ্যান- ৮ : টেলিফোনের রাঘব-বোয়াল

বর্তমান সরকারের আমলে দুর্নীতির সবচাইতে বড় সেক্টর হয়ে পড়েছে টেলিযোগাযোগ খাত। এই খাতে দুর্নীতির কোনো অন্ত নেই। খোদ প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের প্রভাবশালী সদস্য থেকে শুরু করে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, এমপি, আওয়ামী লীগ ও মহাজোট এবং অঙ্গসংগঠনের নেতা, উপনেতা, পাতিনেতা সবাই এই সেক্টরকে যেন খাবলে খাচ্ছেন। টেলিযোগাযোগের অধীন মন্ত্রণালয় ও দফতরের অসাধু কর্মকর্তারাও লুটপাটের ভাগ নিতে সরকারের প্রভাবশালীদের বেশুমার সুবিধা দিয়ে যাচ্ছেন। টেলিফোন সেক্টর থেকে গত চার বছরে যে কত হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। সংশ্লিষ্টরা শুধু এটুকু বলছেন যে, টেলিযোগাযোগ সেক্টরের লুটপাট বন্ধ করা গেলে ওই টাকা দিয়ে কমপক্ষে দুটি পদ্মা সেতু করা সম্ভব ছিল। আর ওই টাকার পুরোটাই গেছে রাঘব-বোয়ালদের হাতে। এসব রাঘব-বোয়াল এতই প্রভাবশালী যে বিটিআরসি, বিটিসিএল, টেলিটক বা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ কর্মকর্তারাও তাদের সম্পর্কে মুখ খুলতে চান না। এরপরও বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় প্রকাশিত খবর ও টেলিকম সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে টেলিযোগাযোগ সেক্টরে লুটপাট ও দুর্নীতির কিছু নমুনা পাওয়া গেছে। দুর্নীতির কারণে টেলিযোগাযোগ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

ভিওআইপি
টেলিযোগাযোগ খাতে লুটপাটের সবচাইতে বড় মাধ্যম ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল বা ভিওআইপি। সংশ্লিষ্টদের হিসাবমতে, অবৈধ ভিওআইপির কারণে প্রতিদিন কমপক্ষে ১২ কোটি টাকা এবং মাসে কমপক্ষে ৩৭৫ কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মিনিট আইএসডি ইনকামিং কলে তিন সেন্ট রাজস্ব পায় সরকার। প্রতিদিন দেশে আসা ১০ কোটি মিনিটের বেশি কলের মধ্যে ৭ কোটিই আনা হচ্ছে চোরাপথে ভিওআইপির মাধ্যমে, যার পুরো টাকাই চলে যাচ্ছে রাঘব-বোয়ালদের পকেটে। খোদ রাষ্ট্রীয়
মালিনাকাধীন বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড বা বিটিসিএলের কর্মকর্তারাও ভিওআইপি ব্যবসায় জড়িত। তারা হাজার হাজার কোটি টাকার ভিওআইপির ব্যবসা করলেও বিটিসিএলে ভিওআইপির দায়ে ২২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নামে মাত্র ৭টি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর বাইরে ভিওআইপির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, ভিওআইপি ব্যবসা জায়েজ করতে সরকারি দলআশ্রিত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ৮৪৪টি লাইসেন্স দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। গত ১৬ জানুয়ারি ভিওআইপি বা ভিএসপি লাইসেন্সের জন্য ১ হাজার ৪টি প্রতিষ্ঠানের নাম চূড়ান্ত করে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়। প্রতিটি লাইসেন্সের জন্য ফি হিসেবে ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করে নিয়েছে বিটিআরসি।

ছয় আইটিসি লাইসেন্সে ব্যাপক অনিয়ম
৬ মাসের মধ্যে অপারেশনে যাওয়ার শর্ত দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল টেরেসট্রিয়াল কেবল (আইটিসি) লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল ৬টি প্রতিষ্ঠানকে। এর মধ্যে নভোকম লিমিটেড নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের অপারেশন শুরু করে। ওয়ান এশিয়া-এএইচএলজেভি, বিডিলিংক কমিউনিকেশন লিমিটেড, ম্যাংগো টেলিসার্ভিসেস লিমিটেড, সামিট কমিউনিকেশন লিমিটেড এবং ফাইবার অ্যাট হোম লিমিটেড নির্ধারিত সময়ে তাদের অপারেশন শুরু করতে পারেনি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আইটিসি লাইসেন্স নিয়ে ব্যাপক রাজনীতি হয়েছে। লাইসেন্সের গাইডলাইনের শর্ত ভঙ্গ করে সরকার ৩টির জায়গায় ৬টি আইটিসি লাইসেন্স দিয়েছে। কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে দেশ-বিদেশের প্রভাবশালী মহলের চাপে সরকার অধিকসংখ্যক লাইসেন্স দিয়েছে। তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির চাপে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী এক সিদ্ধান্তে মার্কিং সিস্টেমকে প্রভাবিত করে ৩টির জায়গায় ৬টি লাইসেন্স দিয়েছে। ৬টি কোম্পানির সঙ্গেই ক্ষমতাসীন দলের কোনো কোনো রাজনীতিবিদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। শোনা যাচ্ছে, সামিট কমিউনিকেশনকে এই লাইসেন্স দেয়ার জন্য ৩টির স্থলে ৬টি লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। আইটিসি লাইসেন্স পাওয়া ওয়ান এশিয়া নামের কোম্পানির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভীর ছোট ভাই সরাসরি জড়িত আছেন। বিডিলিংক নামের কোম্পানির সঙ্গে ডাক ও টেলিযোগ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কয়েকজন জড়িত।
ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) অপারেটর ম্যাংগো টেলিসার্ভিসও একটি আইটিসি লাইসেন্স পেয়েছে। জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানের দুই শীর্ষব্যক্তি মীর মাসুদ ও আবদুল মান্নান ঢাকা ক্লাবে মন্ত্রীর প্রতিদিনের আড্ডার সঙ্গী এবং মন্ত্রীর সব সফরে সঙ্গী থাকতেন। মন্ত্রীর বহু অপকর্মের সঙ্গী মাসুদ ও মান্নানের প্রতিষ্ঠান ম্যাংগোকে এনটিটিএন ও ওয়াইম্যাক্স লাইসেন্সও দেয়া হয়েছে।

লাইসেন্স আর লাইসেন্স
বিটিআরসির বার্ষিক প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত টেলিযোগাযোগ খাতের ২৬টি সেক্টরে ৯৩৯টি লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। অনেকটা মাছের বাজারের মতো পানির দামে সরকারি দলআশ্রিত ব্যক্তি ও সরকারি প্রভাবশালীদের তদবিরে লাইসেন্স বিলি করা হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে পছন্দের ব্যক্তিকে লাইসেন্স দেয়ার জন্য শর্তও শিথিল করা হয়েছে। আবার অনেক সময় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে লাইসেন্স সংখ্যা বাড়ানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। বিটিআরসির তথ্যমতে, ২৬টি সেক্টরে যেসব লাইসেন্স দেয়া হয়েছে সেগুলো হচ্ছে— ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে সার্ভিসেস (আইজিডব্লিউ) ২৯টি, ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ সার্ভিসেস (আইসিএক্স) ২৬টি, ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে সার্ভিসেস (আইআইজি) ৩৬টি, ব্রডব্যান্ড ওয়্যারলেস এক্সেস (বিডব্লিউএ) ২টি, সেলুলার মোবাইল টেলিকম অপারেটর ৬টি, ইন্টারন্যাশনাল টেরেসট্রিয়াল কেবল ৬টি, পাবলিক সুইস টেলিফোন নেটওয়ার্ক অপারেটর (পিএসটিএন) ১২টি, ন্যাশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) ২টি, ন্যাশনওয়াইড অপটিক্যাল ফাইবার টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক ১টি, ভেহিকেল ট্রাকিং সার্ভিসেস ১৪টি, ইন্টারনেট প্রটোকল টেলিফোনি সার্ভিস প্রোভাইডার-ন্যাশনওয়াইড ২৯টি, ইন্টারনেট প্রটোকল টেলিফোনি সার্ভিস প্রোভাইডার সেন্ট্রাল জোন ৭টি, ইন্টারনেট প্রটোকল টেলিফোনি সার্ভিস প্রোভাইডার জোনাল ৩টি, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার- ন্যাশনওয়াইড ১১৬টি, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার- সেন্ট্রাল জোন ৯১টি, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার- জোনাল ৬৩টি, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার- ক্যাটাগরি-এ ১২৬টি, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার, ক্যাটাগরি-বি ২৬টি, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার ক্যাটাগরি-সি ১০টি, ভিস্যাট-ইউজার ৪৪টি, ভিস্যাট- প্রোভাইডার ১২টি, ভিস্যাট প্রোভাইডার উইথ হাব ৫টি, কল সেন্টার ১৯৪টি, হোস্টেড কল সেন্টার ৪১টি, হোস্টেড কল সেন্টার সার্ভিস প্রোভাইডার ৩৬টি এবং ইন্টারন্যাশনাল কল সেন্টার ২টি।
লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ছেলের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘সেনগুপ্ত টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেডে’র নামে আইসিএক্স লাইসেন্স দেয়া হয় ২০১২ সালের এপ্রিলে। লাইসেন্স ইস্যুর মাত্র ৬ মাস আগেও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আইটি ইঞ্জিনিয়ার সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ছেলে সৌমেন সেনগুপ্ত রাতারাতি একটি (আইসিএক্স) ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জের কর্ণধার বনে যান। লাইসেন্স ফি হিসেবে বিটিআরসিকে দেয়া ৫ কোটি টাকার উত্স নিয়েও সৌমেন সেনগুপ্তের বিরুদ্ধে নানা প্রশ্ন ওঠে। নির্বাচনী হলফনামায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বার্ষিক আয় দেখিয়েছিলেন মাত্র ৭ লাখ টাকা। আর ওই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকাকালীন তার ছেলে সৌমেন সেনগুপ্তের বেতন ছিল মাসে সাকল্যে ৫০ হাজার টাকা। সেখানে হঠাত্ কোনো ধরনের ব্যাংক লোন ছাড়া সংশ্লিষ্টদের মতে তাদের দু’জনের আয়ের সঙ্গে লাইসেন্সের জন্য ৫ কোটি টাকা ফি পরিশোধ সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। একজন সাধারণ চাকরিজীবী সৌমেন এত টাকা কোথায় পেলেন? কীভাবে পরিশোধ করলেন আইসিএক্স লাইসেন্স ফি’র ৫ কোটি টাকা? তাছাড়া আইসিএক্স অবকাঠামো তৈরিতে আরও অন্তত ৩০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। সেক্ষেত্রে ওই টাকা কীভাবে আসবে, এসব নিয়েও রয়েছে নানা রহস্য।
এছাড়া ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সদস্য সুনামগঞ্জের একজন এমপি, কেরানীগঞ্জ এলাকার একজন এমপি, ঢাকার তেজগাঁও এলাকার একজন এমপি, আওয়ামী লীগের সাবেক একজন মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা টেলিযোগাযোগ খাতের লাভজনক লাইসেন্সগুলো নিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের মেয়ে টেলিযোগাযোগ খাতের দুটি লাইসেন্সের মালিক হয়েছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর তালুকদার তার নিজ নামে গেটওয়ে লাইসেন্স নিয়েছেন। সংসদ সদস্য গাজী গোলাম দস্তগীর তার নামে একটি লাইসেন্স নিয়েছেন। টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন একাধিক ক্যাটাগরির টেলিযোগাযোগ লাইসেন্স নিয়েছেন। বিডিলিংক নামে আইটিসি লাইসেন্স, ইন্টারনেট গেটওয়ে আইআইজির লাইসেন্স তার নামে সরাসরি রয়েছে। আইটিসি এবং আইআইজি লাইসেন্সের ক্ষেত্রে তিনি ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন নাম ব্যবহার করেন। ওই দুটি লাইসেন্স নিজের নামে রাখলেও অন্য দুটি লাইসেন্সের মালিকানা পরিবর্তন করেন। বাংলাটেল লিমিটেড আইজিডব্লিউ এবং জীবনধারা সলিউশন লিমিটেড আইসিএক্সের মালিকানাও ছিল তার। সেখানে পরে তিনি তার ভাইয়ের নাম লেখান। নিজের নামে একাধিক লাইসেন্স নেয়ার বিধান না থাকায় তিনি এই কৌশলের আশ্রয় নেন। তিনি পরে যে নাম পরিবর্তন করার জন্য আবেদন করেছেন, সেটিও এখন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।
এছাড়া স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের মেয়ে সৈয়দা আমরিন রাখি ও নানকের স্ত্রী সৈয়দা আরজুমান বানু, আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান, মহাজোটের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক মন্ত্রী জিয়াউদ্দিন বাবলু, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-হানিফ, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর দুই ছেলে এবং ছেলের বউদের নামসহ সরকারের মন্ত্রী ও এমপি এবং আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে বিপুল সংখ্যক লাইসেন্স নেয়া হয়েছে।

পানির দরে থ্রিজি লাইসেন্স
মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে থ্রিজি নিলামকে প্রতিযোগিতামুক্ত করে অতি অল্প মূল্যে জনগণের সম্পত্তি হাতিয়ে নিয়েছে। এর ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এর নেপথ্যেও বড় ধরনের বাণিজ্য হয়েছে বলে অনেকেই সন্দেহ করছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিটিআরসির থ্রিজি নিলামে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে সরকারের নতি স্বীকার করেছে। এতে সরকারের প্রভাবশালী কোনো কোনো ব্যক্তি বিশাল লাভবান হয়েছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। সমালোচকরা বলেন, ভারতে থ্রিজি নিলামে সময় লেগেছে ৩৪ দিন এবং সেখানে তুমুল প্রতিযোগিতার কারণে সরকারের প্রত্যাশিত আয় সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলার হলেও প্রকৃতপক্ষে আয় হয়েছে ১১ বিলিয়ন ডলার। অথচ বাংলাদেশে থ্রিজি নিলামে সময় লেগেছে মাত্র এক ঘণ্টা। ভিত্তিমূল্য হিসাবে থ্রিজি তরঙ্গ থেকে বাংলাদেশ সরকারের ৮০০ মিলিয়ন ডলার আয় করার প্রত্যাশা থাকলেও কোম্পানিগুলোর যোগসাজশ, বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে অংশ নিতে না দেয়া ও প্রতিযোগিতাবিহীন নিলামের কারণে আয় হয়েছে মাত্র ৫১৫ মিলিয়ন ডলার।

মাত্র ৭০ লাখ টাকায় এয়ারটেলকে ওয়ারিদের শেয়ার
প্রভাবশালী পরিবারের এক ব্যক্তির মধ্যস্থতায় নজিরবিহীনভাবে মাত্র ৭০ লাখ টাকায় ওয়ারিদ টেলিকমের ৭০ শতাংশ শেয়ার কিনে নিয়েছে ভারতী এয়ারটেল। একই ব্যক্তির তদবিরে ওই সময়ে প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকার ৫ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম ফ্রি দেয়া, সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বিটিসিএল ও টেলিটকের অবকাঠামো ব্যবহার করে দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের সুবিধা দেয়া, ভিওআইপির অভিযোগ এনে দেশীয় ল্যান্ডফোন অপারেটরগুলো বন্ধ করে তাদের বিটিএস ও জিএসএম ফ্রিকোয়েন্সিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয় এয়ারটেলকে। ওই সময় সারা দেশে বিদ্যুত্ সংযোগ বন্ধ থাকা সত্ত্বেও এয়ারটেলের বিটিএসের জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুত্ সংযোগ দেয়া, মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি, বিটিআরসির নিয়ম না মেনে রাস্তাঘাটে রেজিস্ট্রেশন বিহীন সিমকার্ড বিক্রি করাসহ অসংখ্য প্রশ্নবিদ্ধ সুবিধা দেয়া হয়েছে এয়ারটেলকে। ২০০৬ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ধাবি গ্রুপকে চারদলীয় জোট সরকার দেশের ষষ্ঠ মোবাইল অপারেটর হিসেবে ওয়ারিদের লাইসেন্স দেয়। এ জন্য ওয়ারিদের কাছ থেকে ফি আদায় করা হয় ৫০ মিলিয়ন ডলার। ওয়ারিদের ৭০ শতাংশ শেয়ার কিনে ২০১০ সালের ২০ ডিসেম্বর এয়ারটেল যাত্রা শুরু করে। ২০১১ সালের ৪ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকার একটি হোটেলে ওয়ারিদের শেয়ার ভারতী এয়ারটেলকে হস্তান্তর করা হয়। ওই সময় আবুধাবিতে ধাবি গ্রুপের একজন মুখপাত্র জানান, তারা এক বিলিয়ন ডলারে ওয়ারিদের ৭০ শতাংশ শেয়ার ভারতী এয়ারটেলের কাছে হস্তান্তর করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে তথাকথিত লোকসানি প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে নজিরবিহীন জালিয়াতির মাধ্যমে ধাবি গ্রুপের কাছ থেকে ওয়ারিদের শেয়ার মাত্র ৭০ লাখ দেখানো হয়। নিয়ম অনুযায়ী শেয়ার মূল্যের ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বিটিআরসিকে দিতে হয়। সে হিসেবে দাবি গ্রুপ ওয়ারিদের ৭০ শতাংশ শেয়ার এক বিলিয়ন ডলারে বিক্রি করলে বিটিআরসি পাওনা হওয়ার কথা ছিল ৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার বা ৫৫ লাখ ডলার। টাকার হিসেবে প্রায় ৩৮৫ কোটি টাকা। মাত্র এক লাখ ডলার দাম দেখানোর কারণে ৭০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করলে রাজস্ব পাওয়া গেছে ৫ হাজার ডলার বা ৩ লাখ ৮০ হাজার ৫০ টাকা। ওই সময় বিটিআরসির বিরোধিতা সত্ত্বেও ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি, সরকারের উপদেষ্টা ও কয়েকজন প্রভাবশালী প্রবাসী ব্যক্তির কারণে বিটিআরসি টোকেন মূল্যে ওয়ারিদের শেয়ার হস্তান্তর দেখাতে বাধ্য হয়। ওই সময় বিটিআরসির চেয়ারম্যান বলেন, ভারতীয় এয়ারটেল মাত্র ৭০ লাখ টাকায় অর্থাত্ একশ টাকার প্রতিটি শেয়ার ৬ পয়সা দরে ক্রয় করেছে। অথচ এর আগে মোবাইল অপারেটর একটেলে এ কে খান গ্রুপের ৩০ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে। ওই শেয়ার ৩৫০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে কিনে নিয়েছিল জাপানের এনটিটি ডকুমো। ওই শেয়ার বিক্রি থেকে তখনকার সরকার প্রায় ১৩২ কোটি টাকা ফি আদায় করেছিল। তারও আগে সিটিসেল প্যাসিফিক টেলিকমের শেয়ার সিং টেলের কাছে হস্তান্তর থেকে সরকার শত কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে।
এছাড়া নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বিটিআরসি এয়ারটেলকে প্রায় বিনা মূল্যে ৫ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম (তরঙ্গ) বরাদ্দ দেয়। যার মাধ্যমে সরকারের ক্ষতি হয়েছে প্রায় সাড়ে সাতশ’ কোটি টাকা। অক্টোবরে বিটিআরসি এয়ারটেলের ১৮শ’ ব্যান্ডের ৫ মেগাহার্টজের বদলে ৯শ’ ব্যান্ডের ৫ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেয়। ২০২০ সাল পর্যন্ত এই স্পেকট্রাম ব্যবহার করতে পারবে তারা। অথচ ১৮শ’ ব্যান্ডের স্পেকট্রামের চেয়ে ৯শ’ ব্যান্ডের স্পেকট্রামের দাম দ্বিগুণ। তাছাড়া এয়ারটেলকে নতুন করে স্পেকট্রাম দিতে গিয়ে আইএসটিএন নামে একটি দেশি কোম্পানির কাছ থেকেও কিছু স্পেকট্রাম নিয়ে নেয়া হয়েছিল। নতুন প্রস্তাবিত টেলিফোন নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি মেগাহার্টজ স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪২ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সে হিসেবে হিসেবে ৫ মেগাহার্টজ স্পেকট্রামের মূল্য ২১৪ দশমিক ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

দোয়েল ল্যাপটপে লুটপাট
সরকারি মালিনাকাধীন দোয়েল ল্যাপটপ প্রকল্পে বড় ধরনের পুকুর চুরির প্রমাণ মিলেছে। পুরো প্রকল্প ভেস্তে গেছে। প্রকল্প ফ্লপ করলেও এর থেকে লুটে নেয়া হয়েছে শত শত কোটি টাকা। ল্যাপটপ উত্পাদনের যন্ত্রপাতি আমদানি ও ক্রয়ে দুর্নীতি যেন কল্পকাহিনীকেও হার মানিয়েছে। দেড় লাখ ডলারের পণ্যমূল্য দেখানো হয়েছে ১০ লাখ ৬ হাজার ৫৪০ ডলার। নিম্নমানের এসব পণ্যক্রয়ে ৩০০ শতাংশ বেশি দাম দেখানো হয়েছে। অর্থের ভাগবাটোয়ারা হয়েছে মালয়েশিয়ার পেনাং ও নিউইয়র্কে। বাড়তি দাম দেখানো ও লুটপাটের অর্থ সাবেক টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজিউদ্দিন রাজুসহ বিশাল সিন্ডিকেটের পকেটে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দোয়েল ল্যাপটপ তৈরির মালয়েশিয়ান অংশীদার টিএফটি টেকনোলজি গ্রুপও মন্ত্রী ও তার সহযোগীদের দুর্নীতির কথা স্বীকার করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির ওই সময়কার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইকেল ওয়াং নিজেই স্বীকার করেছেন মন্ত্রীর দুর্নীতির কথা।
জানা গেছে, টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস) ও মন্ত্রণালয়ের একটি একটি বিশাল সিন্ডিকেটে ওই অর্থ আত্মসাত্ করে। মিডিয়াকে মাইকেল ওয়াংয়ের পাঠানো ই-মেইলের তথ্যমতে টাকার ভাগ মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু, টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রফিকুল ইসলামসহ কয়েকজন পেয়েছেন। ওই তালিকায় দোয়েল ল্যাপটপ কোম্পানির প্রধান নির্বাহীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) নাজিম হাসানসহ বড় একটি সিন্ডিকেট। টেশিসের সাধারণ কর্মকর্তারা জানান, ৩০০ শতাংশ বেশি দাম দেখিয়ে যেসব পণ্য আমাদানি করা হয়েছে যার অধিকাংশই ছিল অকেজো। ল্যপটপ উত্পাদন করতে গিয়ে দেখা গেছে সেগুলো কোনো কাজেই আসেনি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি যাচাই করতে গিয়ে দেখতে পান মূলত ল্যাপটপের সরঞ্জামের নামে এলসিডি টিভির সরঞ্জাম আমাদানি করা হয়েছে। সেগুলোও চোরাইপথে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে টেশিসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ল্যাপটপের নামে ৩০০ শতাংশ দাম বেশি দেখিয়ে টেলিভিশনের যন্ত্রপাতি আমদানি করাসহ পুরো প্রকল্পটি ছিল লুটপাটের মচ্ছব। আমরা বিষয়টি জেনেও চাকরি বাঁচানোর জন্য চুপ করে আছি। কারণ এই সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার পরিবর্তন হওয়ার আগ পর্যন্ত কথা বলা মানে চাকরি খোয়ানো।

টেলিটকে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি
রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটকে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অডিট অধিদফতর ২০১২ সালেই টেলিটকে ৬০০ কোটি টাকার দুর্নীতি চিহ্নিত করে। কাগজপত্রে উল্লেখ থাকলেও টেলিটকের ভাণ্ডারে কোটি কোটি টাকার সিমকার্ড ও স্ক্র্যাচ কার্ডের কোনো হদিস পায়নি অডিট দফতর। প্রতিষ্ঠানটির লেজার ও অন্যান্য হিসেবে মজুত দুই ধাপে ৩১ কোটি টাকার স্ক্র্যাচকার্ড ও ক্যাশকার্ড খাতটি ছিল। সিমকার্ড খাতটি ছিল প্রায় ৫০ কোটি টাকার। দরপত্র ছাড়াই দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারের প্রভাবশালীদের মাধ্যমে টেলিটকের যন্ত্রপাতি আমদানির সুযোগ করে দেয়া হয়েছিল। টেলিটকের সরকারি দল আশ্রিত বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিয়মবহির্ভূতভাবে উচ্চবেতনে নিয়োগ দিয়ে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। শুধু বেতনভাতার মাধ্যমে কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকার বেশি লুটপাট হয়েছে বলে টেলিযোগাযোগ খাতসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে বোর্ড অনুমোদিত ২৫৬ জনবলের বিপরীতে ৫০০ জনের বেশি জনবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির অরগানোগ্রামে অ্যাসোসিয়েট, মার্কেট কো-অর্ডিনেটর, মার্কেট প্রমোটর, অপারেটর কাম অ্যাসিট্যান্ট পদ না থাকলেও এসব পদ তৈরি করে উচ্চ বেতনে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আউটসোর্সিংয়ের কোনো সুযোগ না থাকার পরও সরকারি দল আশ্রিত ব্যক্তিদের তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সাতটি পড়ে ১৬৫ জন নিয়োগ করে আউটসোর্সিংয়ের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত্ করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিনাকাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিটিআরসি থেকে বাড়তি সুবিধা নিয়ে থ্রিজি সেবা দেয়ার নামেও বড় ধরনের অনিয়ম করেছে টেলিটক।

বিটিসিএলে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি
বিটিসিএলে দুর্নীতির শেষ নেই। ঘাটে ঘাটে অনিয়ম আর দুর্নীতিই বিটিসিএলে নিয়ম। টেন্ডারে অনিয়ম ও লুটপাট, ইন্টারন্যাশনাল ট্রাঙ্ক এক্সচেঞ্জের রেকর্ড বা সিডিআর থেকে তথ্য মুছে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আত্মসাত্ করা হয়েছে। টেন্ডার কারচুপির মাধ্যমে আত্মসাত্ করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির শত শত কোটি টাকা। বিভিন্ন এলাকায় এক হাজার ৪৩১ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার লাইন, ১১টি মাইক্রোওয়েব লিঙ্ক বসানো, ৪০০ কোটি টাকার এক্সচেঞ্জ স্থাপনে অনিয়ম, বিলে অনিয়ম, রাজস্ব ফাঁকিসহ বিভিন্নভাবে হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়েছে সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বিটিসিএলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা।

টাকা দিচ্ছে না ক্ষমতাসীনরা
সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে আটকে রয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) হাজার কোটি টাকা। বারবার তাগাদা দেয়ার পরও তারা টাকা পরিশোধ করেনি। টাকা তো দিচ্ছেনই না বরং বিটিআরসির শর্ত ভঙ্গ করে চলেছে। শর্ত খেলাপ করার কারণে চারটি আন্তর্জাতিক গেটওয়ে অপারেটরের (আইজিডব্লিউ) কল আদান-প্রদান স্থগিত করেছে বিটিআরসি। বিটিআরসি সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক গেটওয়ে রাতুল টেলিকমের কাছে বিটিআরসির পাওনা ৭০ কোটি টাকারও বেশি। এই প্রতিষ্ঠানের ৫০ শতাংশের মালিক স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের মেয়ে সৈয়দা আমরিন রাখি। আরও ২০ শতাংশের মালিক নানকের স্ত্রী সৈয়দা আরজুমান বানু। গত দুই প্রান্তিকে অর্থাত্ জানুয়ারি থেকে তারা রেভিনিউ শেয়ারিং হিসেবে বিটিআরসিকে কোনো টাকা দেয়নি। এমন পরিস্থিতিতে তাদের চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয়া হয়, তারা মাসে ১০ লাখ মিনিটের বেশি কল আনা-নেয়া করতে পারবে না। কিন্তু তারা বিটিআরসির আদেশ না মেনে বেশি কল আনা-নেয়া করেছে।
সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনের মেয়ের কোম্পানি ক্লাউড টেলের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান ভিশন টেল লিমিটেড। গত জুন পর্যন্ত ভিশন টেলের কাছে বিটিআরসির পাওনা ৯০ কোটি টাকা। এ কারণে মাসে ১০ লাখ মিনিটের বেশি কল আনা-নেয়া করতে পারবে না বলে তাদের চিঠি দেয় বিটিআরসি। কিন্তু তারা বিটিআরসির আদেশ না মেনে বেশি কল আনা-নেয়া করেছে। সম্প্রতি তাদের সব ধরনের কল আদান-প্রদান স্থগিত করে বিটিআরসি। যদিও আবুল হোসেনের আগে সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন তার মেয়ে ভিশন টেলের মালিকানা ছেড়ে দিয়েছেন।
ডিজিকম টেলিকম ও কে টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেডও বিটিআরসির মোটা অঙ্কের অর্থ ফাঁকি দিয়েছে। ডিজিকম টেলিকমের কাছে প্রায় ৪০ কোটি টাকা পাওনা থাকায় তাদের কল আদান-প্রদান আগেই স্থগিত করা হয়। গত মার্চ পর্যন্ত পাওনা পরিশোধের পর গতকাল তাদের কল আদান-প্রদান চালু করা হয়েছে। আর কে টেলিকমের অন্যতম মালিক আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমান। পাওনা না দেয়ায় তাদেরও কল আদান-প্রদান স্থগিত করেছে বিটিআরসি।
মহাজোটের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাবেক মন্ত্রী জিয়াউদ্দিন বাবলুর কোম্পানি ফার্স্ট কমিউনিকেশন্স লিমিটেডের কাছে বিটিআরসির পাওনা ছিল প্রায় ৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অবশ্য কিছু টাকা তারা পরিশোধ করেছেন।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল হানিফের মালিকানাধীন টেলেক্স লিমিটেডের কাছেও বিটিআরসির পাওনা প্রায় ৪০ কোটি টাকা। প্রথমে তার নামে লাইসেন্স না হলেও পরে কোম্পানিটি কিনে নেন তিনি। যদিও টেলেক্সের মালিকানার বিষয়ে অস্বীকার করেছেন মাহবুব উল আলম হানিফ।
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর দুই ছেলে এবং ছেলের বউদের নামে নেয়া হয়েছে ওয়ান এশিয়া অ্যালায়েন্স গেটওয়ের লাইসেন্স। এই কোম্পানির কাছেও পাওনা প্রায় ৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সম্প্রতি কিছু টাকা পরিশোধ করেছেন তারা। অবৈধ কল টার্মিনেশনের জন্য বিটিআরসি এই তিনটি কোম্পানির সব সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল। পরে আবার চালু করা হয়।

অন্যান্য
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ প্রকল্পে অনিয়ম ও এই প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ফলে এই প্রকল্প অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ভিওআইপির অভিযোগ এনে দেশীয় ৫টি পিএসটিএন ঢাকা ফোন, ওয়ার্ল্ডটেল, র্যাংকস টেল, পিপলস টেল ও ন্যাশনাল টেল বন্ধ করে দেয়া, তাদের তরঙ্গ ও লাইসেন্স বাতিল করা, এসব প্রতিষ্ঠানের শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়া, পরে অনুমোদন দিতে আবার কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে। মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে একাধিক মোবাইল অপারেটরকে পণ্য আমদানির সুযোগ দেয়া হয়েছে। বাজারে নিম্নমানের মোবাইল সেট আমদানি ও বিক্রির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। চোরাইপথে অবাধে শত শত কোটি টাকার মোবাইল সেট আনার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। যারা বৈধ পথে মোবাইল সেট এনেছে তাদেরও দুর্নীতি করে আন্ডার ইনভয়েসের মাধ্যমে মোবাইল সেট আমদানির সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। ফোন কোম্পানিগুলোর টুজি লাইসেন্স নবায়ন নিয়েও দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ সাবমেরিন কোম্পানিতে বিদেশি ঠিকাদার নিয়োগ, মুনাফার টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে বাড়তি সুবিধা নেয়া, একই কাজের নামে একাধিক বিল ভাউচার দেয়াসহ অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব দুর্নীতি ও অনিয়ম প্রতিরোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারেনি সরকার।
http://www.amardeshonline.com/pages/details/2013/10/09/220080#.UlccfFDryth

Tuesday, 8 October 2013

মোল্লার মামলার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর সাক্ষ্যে গরমিল

নিজস্ব প্রতিবেদক আরটিএনএন ঢাকা: আপিল বিভাগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর দেয়া সাক্ষ্য তার আগের দুটি বক্তব্যের বিরোধী। ট্রাইব্যুনালে দেয়া সাক্ষ্যের আগে দুটি বর্ণনায় এই নারী সাক্ষী তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার সময় ঘটনাস্থলে কাদের মোল্লার উপস্থিত থাকার বিষয়টি বলেননি। সোমবার ইংরজি দৈনিক নিউ এইজ-এর অনলাইন ভার্সনে পত্রিকাটির বিশেষ প্রতিবেদন সম্পাদক ডেভিড বার্গম্যানের ‘সোল উইটনেস ইন মোল্লা ডেথ পেনাল্টি কেস গেভ কন্ট্রাডিক্টরি অ্যাকাউন্টস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘প্রথমত. গত ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের এক গবেষককে দেয়া সাক্ষাৎকারে সাক্ষী মোমেনা বেগম এটাও বলেছেন- যখন তার পরিবারের সদস্যদের গণহারে হত্যা করা হয়, তখন তিনি সেখানে ছিলেন না। ঘটনার দুদিন আগেই তিনি ওই এলাকা ত্যাগ করেন।’ দ্বিতীয়ত. গত ২০১০ সালে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তাকে দেয়া জবানবন্দিততে মোমেনা, ১৯৭১ সালে যার বয়স ছিল ১৩ বছর, বলেন- ওই দিন তাদের বাসায় যারা প্রবেশ করেছিল, তারা সবাই ছিল বিহারী এবং পাকিস্তানি সেনা সদস্য। সেখানে কোনো বাঙালির উপস্থিতির কথা বলা হয়নি। আদালতে দেয়া মোমেনার মৌখিক সাক্ষ্য আগের দেয়া সাক্ষাৎকার এবং জবানবন্দির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রায় ৪০ বছর আগে মোমেনার পরিবারকে হত্যার অভিযোগে সাক্ষী হিসেবে রাষ্ট্রপক্ষ একমাত্র তাকে আদালতে হাজির করে, যেখানে তিনি কাদের মোল্লাকে হত্যাযজ্ঞের স্থানে দেখেছিলেন বলে দাবি করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল দুটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ বক্তব্যের বিষয়ে সতর্ক ছিল বলেই মনে হয়। রায়ে ট্রাইব্যুনাল তদন্ত কর্মকর্তাকে দেয়া জবানবন্দি এবং জাদুঘরের গবেষককে দেয়া বক্তব্যের ক্ষেত্রে মোমেনার অবস্থানের বিষয়টি এই বলে উল্লেখ করেননি যে, সাক্ষীর ‘বিশ্বস্ততার’ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার ক্ষেত্রে এটি বিবেচনায় আনা উচিত হবে না। এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আলী নিউ এইজ-কে বলেন, ‘আবদুল কাদের মোল্লা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বিষয়টি তদন্ত কর্মকর্তা ভুলক্রমে রেকর্ড করতে পারেননি।’ দুটি বক্তব্যের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যখন কোনো ভুক্তভোগী এ ধরনের সহিংসতার শিকার হন, তিনি সম্পূর্ণ বিষয়টি প্রকাশ করতে (ভয়ের কারণে) চান না, কিন্তু তিনি ট্রাইব্যুনালের সামনে যা বলবেন, সেটাই পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য। অন্য কোনো বক্তব্য নির্ভরযোগ্য নয়।’ প্রসঙ্গত, গত ২০১২ সালে মোমেনা বেগম কেবল বিচারক এবং আইনজীবীদের উপস্থিতিতে (ক্যামেরা ট্রায়াল) মৌখিক সাক্ষ্য দেন। হিজাব পরিহিত মোমেনা আদালতকে বলেন, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ একদল লোক তাদের বাসায় প্রবেশ করে এবং পরিবারের ছয় সদস্যকে হত্যা করে। তিনি বলেন, ঘটনার সময় তার বাবা বাসার দিকে দৌড়াতে দৌড়াতে বলতে থাকেন- ‘কাদের মোল্লা আমাকে মেরে ফেলবে।’ এরপর ওই লোকগুলো কক্ষে ঢুকে আর ‘কাদের মোল্লা আমার বাবার জামার কলার ধরে টেনে-হিঁচড়ে বাসার বাইরে নিয়ে যায়’। এরপর তারা তার মা এবং তিন বোনকে হত্যা করে, যাদের একজনকে আগে ধর্ষণ করা হয় এবং ছোট ভাইকেও হত্যা করা হয়, যোগ করেন মোমেনা। তিনি বলেন, ‘এই ঘটনার পর মুক্তযোদ্ধাদের চা খাওয়াতেন এক ব্যক্তি, যিনি কামাল খান হিসেবে পরিচিত, আমাকে বলেছেন- কাদের মোল্লা আমার বাবা-মাকে হত্যা করেছে। আমার উকিল বাবা (বিয়ের সাক্ষী) আক্কাস মোল্লাও আমাকে একই কথা বলেছে...’ রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, এখানে (মোমেনাকে) অবিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই...বরং তাকে স্বাভাবিক প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীই মনে হয়েছে...’ প্রসঙ্গত, মানবতাবিরোধী অপরাধে গত ৫ ফেব্রুয়ারি কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর গত ১৭ সেপ্টেম্বর সাজা বাড়িয়ে একই পরিবারের ছয়জনকে হত্যার অভিযোগে সাজা বাড়িয়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন আপিল বিভাগ।
http://www.rtnn.net//newsdetail/detail/1/1/71426#.UlQluNKbOgE

বেপরোয়া দুর্নীতির উপাখ্যান-৭ : কুইক রেন্টালে কুইক ভাগাভাগি

রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের নামে বিদ্যুত্ খাতে দুর্নীতি ও লুটপাট সর্বকালের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। শাসকদলীয়দের লুটের রাজ্যে পরিণত করা হয়েছে গোটা বিদ্যুত্ খাতকে। এ পর্যন্ত কেবল সরকারি কোষাগার থেকেই ভর্তুকির মোড়কে লোপাট হয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর বাইরে গ্রাহকদের কাছ থেকে বাড়তি বিল বাবদ আরও হাজার হাজার কোটি টাকা যাচ্ছে একই খাতে। উচ্চ দরে বিদ্যুত্ কেনার মাধ্যমে মেয়াদান্তে কুইক রেন্টাল এবং রেন্টাল বিদ্যুত্ কেন্দ্রের মালিকানা সরকারের অধীনে স্থানান্তরিত হওয়ার কথা থাকলেও দুর্নীতির মাধ্যমে এসব কেন্দ্রের মেয়াদ ২০২০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এর ফলে কেবল রেন্টাল, কুইক রেন্টাল খাতেই রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাটের পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন বিদ্যুত্ খাতের বিশেষজ্ঞরা। সরকারি দলের নেতা ও সরকার সমর্থক ব্যবসায়ীদের এভাবে অবাধ লুটপাটের সুযোগ করে দেয়ার নজির বাংলাদেশের ইতিহাসে আর দেখা যায়নি।
একদিকে কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুত্ কিনে তার দায় দেশের অর্থনীতি ও গ্রাহকের ওপর চাপানো হচ্ছে। অন্যদিকে রেন্টাল ও কুইক রেন্টালে বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে হচ্ছে। এ খাতে সরকার ডিজেলে ২৫ টাকা ও ফার্নেস অয়েলে লিটারপ্রতি ১২ টাকা করে ভর্তুকি দিচ্ছে। আবার এসব বিদ্যুেকন্দ্রের যে পরিমাণ বিদ্যুত্ উত্পাদন করার শর্ত ছিল তা তারা করতে পারছে না। নিম্নমানের যন্ত্রপাতি এনে ব্যবহার করার কারণে শর্ত অনুযায়ী বিদ্যুত্ উত্পাদন হচ্ছে না। সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বাড়িয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে ভর্তুকির টাকা আদায়ের চেষ্টা করছে। ফলে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতে ব্যয় চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এ বাড়তি ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে সীমিত ও স্বল্প আয়ের গ্রাহকরা।
জানা গেছে, সরকারের তিন বছরে বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। লোকসানের এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার কোটিতে দাঁড়াবে। পক্ষান্তরে বিগত চারদলীয় জোট সরকারের চার বছরে এই দুই খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল মাত্র আড়াই হাজার কোটি টাকা। সাশ্রয়ী বড় বিদ্যুেকন্দ্রগুলো বাস্তবায়ন না করে ভাড়া কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভর করছে সরকার। এসব ভাড়া কেন্দ্র থেকে দেড় হাজার মেগাওয়ার বিদ্যুত্ পেতে গোটা অর্থনীতিকে দেউলিয়াত্বের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নাভিশ্বাস তোলা হয়েছে গ্রাহকদের। পিডিবির বিদ্যুেকন্দ্রগুলো থেকে যেখানে ইউনিটপ্রতি ২ টাকা উত্পাদন খরচে বিদ্যুত্ পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে রেন্টাল-কুইক রেন্টাল থেকে ১৫ থেকে ১৭ টাকা দরে বিদ্যুত্ কেনা হচ্ছে। আবার সময়মতো জ্বালানি সরবরাহ না করাসহ নানা আত্মঘাতী শর্তের বেড়াজালে আটকে যে জরিমানা দিতে হচ্ছে তাতে কোনো কোনো কেন্দ্রের বিদ্যুতের ইউনিট মূল্য ২৫ টাকা পর্যন্ত পড়ছে বলে জানা গেছে।
সরকার সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র চালু করেছিল। এজন্য প্রয়োজনীয় যে সমীক্ষা দরকার ছিল তা করেনি। কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল থেকে কী পরিমাণ বিদ্যুত্ পাওয়া যাবে, আর এর জন্য কত ব্যয় হবে, গ্রাহক কতটা উপকৃত হবে আর সরকারকে কত টাকা ভর্তুকি দিতে হবে—এসব বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই চুক্তি করেছে সরকার। বিদেশ থেকে কী পরিমাণ বাড়তি জ্বালানি আমদানি করতে হবে, এজন্য কত খরচ বেড়ে যাবে, তার হিসাবও করা হয়নি। উপরন্তু দায়মুক্তি আইন করে ফ্রি স্টাইল লুটপাটের লাইসেন্স দিয়ে দেয়া হয়েছে।
পিডিবি সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার তাদের মেয়াদের প্রথম বছর বিদ্যুত্ উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে উদাসীন ছিল। বছরান্তে বিদ্যুত্ সংকট যখন ভায়াবহ রূপ নেয় এবং সারা দেশে বিদ্যুতের দাবিতে গণ-অসন্তোষ চরম রূপ নেয় তখন তড়িঘড়ি করে কুইক রেন্টাল ও রেন্টালের মতো সর্বনাশা বিদ্যুত্ প্রকল্প বাস্তবায়নে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ২৮টি কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল কেন্দ্রের জন্য চুক্তি সই করে। এসব কেন্দ্রের বেশিরভাগই তেলভিত্তিক। তিনটি উত্পাদনে আসতে পারেনি।

কারা পেয়েছে কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল কেন্দ্র
বিনা টেন্ডারে দেয়া কুইক রেন্টাল ও রেন্টালের লুটেরা মালিকদের নাম-পরিচয় নিয়ে লুকোচাপা করছে বিদ্যুত্ মন্ত্রণালয় ও পিডিবি। সবকটি কেন্দ্র সরকার দলীয় নেতা কিংবা সরকার সমর্থক ব্যবসায়ীরা পেলেও বেনামে নেয়া হয়েছে অনেকগুলো কেন্দ্র। যে ১৮টি কুইক রেন্টাল কেন্দ্রের তালিকা পাওয়া গেছে সেগুলোর উদ্যোক্তা কোম্পানিগুলো হচ্ছে এগ্রিকো ইন্টারন্যাশনাল প্রজেক্টস লি. খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লি. সামিট নারায়ণগঞ্জ পাওয়ার লি. আইইএল কনসোর্টিয়াম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লি., ডাচ-বাংলা পাওয়ার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লি. ডিপিএ পাওয়ার জেনারেশন ইন্টারন্যাশনাল লি. পাওয়ারপ্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ পওয়ার প্লান্ট লি., একর্ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার সার্ভিসেস লি. জেভি অফ সিনহা পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লি., নর্দার্ন পাওয়ার সল্যুশাল লি., খানজাহান আলী পাওয়ার কোম্পানি লি., ম্যাক্স পাওয়ার লি., ইউনাইটেড আশুগঞ্জ পাওয়ার লি. ও হাইপেরিয়ন পাওয়ার জেনারেশন লি.। এসব কোম্পানির বেশিরভাগই নতুন গজিয়ে ওঠা। বিদ্যুত্ খাতে কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না তাদের। উল্লিখিত কোম্পানিগুলোর মধ্যে এগ্রিকো একাই ৪টি কুইক রেন্টাল কেন্দ্র পেয়েছে। এ চারটি হচ্ছে ঘোড়াশাল ১৪৫ মেগাওয়াট, খুলনা ৫৫ মেগাওয়াট, বি-বাড়িয়া ৭০ মেগাওয়াট এবং আশুগঞ্জ ৮০ মেগাওয়াট। এ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নাম আছে মি. দেবজিত্ দাসের। শরাফত নামের এক ব্যক্তি কোম্পানিটির পক্ষে লবিং-তদবির করেছেন। তবে এ কোম্পানির কুইক রেন্টাল পাওয়ার নেপথ্যে শেখ পরিবারের এক প্রভাবশালী এমপির সংশ্লিষ্টটার কথা শোনা যায়।
সরকারের মন্ত্রী ফারুক খানের পারিবারিক ব্যবসায়ী গ্রুপ সামিট পৃথক নামে ৩টি কুইক রেন্টাল কেন্দ্র নিয়েছে। এর মধ্যে ১১৫ মেগাওয়াটের খুলনা কেন্দ্র খুলনা পাওয়ার কোম্পানির নামে, নারায়ণগঞ্জের মদনগঞ্জে ১০২ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটি সামিট নারায়ণগঞ্জ পাওয়ার লি.-এর নামে এবং পাগলা ৫০ মেগাওয়াট সামিটের নামে।
আওয়ামী ঘরানার ব্যবসায়ী নেতা, এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি আনিসুল হকের দেশ এনার্জি ৪টি কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল কেন্দ্র স্থাপন করে লুটের বড় অংশীদার। দেশের সব জ্বালানি বিশেষজ্ঞ যখন রেন্টাল, কুইক রেন্টালের তীব্র সমালোচনায় মুখর তখন একমাত্র ব্যবসায়ী আনিসুল হক বড়গলায় এর সমর্থন করেন। ওরিয়ন গ্রুপ পেয়েছে দুটি কুইক রেন্টাল কেন্দ্র। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা ফয়জুল আকবরের জিবিবি পাওয়ার, আনিসুর রহমান সিনহার সিনহা গ্রুপ, চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা মাহতাব, আওয়ামী ঘরানার ব্যবসায়ী গ্রুপ অটবি, এনার্জিপ্যাক রেন্টাল, কুইক রেন্টালের অন্যতম লুটেরা।

২০২০ সাল পর্যন্ত লোপাটের বন্দোবস্ত
স্থাপনের সময় মাত্র তিন বছরের জন্য সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুত্ কেনার কথা বলা হয়। চুক্তিও হয় সেভাবে। অবশ্য শেষ দিকে কয়েকটি ৫ বছর মেয়াদি চুক্তিও সই করা হয়। তখন বিদ্যুতের উচ্চ মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে যুক্তি হিসেবে বলা হয়, তিন বছরের মধ্যেই উদ্যোক্তাদের পুরো প্রকল্প ব্যয় লাভসহ তুলে নিতে হবে। মেয়াদ শেষে ওই কেন্দ্রগুলো সরকারের মালিকানায় চলে যাবে। কারণ ওই কেন্দ্রের জমিও সরকারই বিনা মূল্যে বরাদ্দ করেছে। চুক্তি অনুযায়ী ৩ বছর মেয়াদি কেন্দ্রগুলোর মেয়াদ ২০১৪ সালে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু সরকারের শেষ সময়ে এসে এখন আগাম মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল সব বিদ্যুেকন্দ্রের মেয়াদ ২০২০ সাল পর্যন্ত বাড়িয়ে চুক্তি নবায়ন করা হচ্ছে। আর তা বাড়ানো হচ্ছে আগের মতো সুবিধা দিয়েই, ফলে কেন্দ্র বন্ধ রাখার কারণে সরবরাহ বন্ধ থাকলেও কেন্দ্র ভাড়া ঠিকই পিডিবিকে গুনতে হবে। মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরই মধ্যে নীতিগত সায় দিয়েছেন বলে জানা যায়। সরকারের শেষ সময়ে এসে রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের সরকারি ঘরানার ব্যবসায়ীদের লোপাটের সুযোগ অব্যাহত রাখতেই এটা করা হচ্ছে। এ মেয়াদ বৃদ্ধির অন্তরালে বড় দাগের ভাগবাটোয়ারার কথাও শোনা যাচ্ছে বিদ্যুত্ মন্ত্রণালয় এবং এই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে।
এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার বলা হয়েছিল, নতুন করে আর কোনো রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্র করা হবে না, বাড়ানো হবে না বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর মেয়াদ। মহাজোট সরকারের তৃতীয় বছর থেকে এসব কেন্দ্র থেকে বিদ্যুত্ কেনা বন্ধ করবে বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এমন আশ্বাসও ছিল।
বিদ্যুত্ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্রগুলোকে আইপিপিতে (ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার, ১৫ বছর পর পিডিবিতে চলে যায়) রূপান্তরের জন্য আবেদন করেছিলেন উদ্যোক্তারা। বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য বিদ্যুত্ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মোফাজ্জেল হোসেনকে প্রধান করে কমিটি গঠন করা হয়। সবকিছু বিবেচনা করে কমিটি ‘বিদ্যুত্ না দিলে বিল নয়’ (নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট) এমন শর্তে রেন্টাল কেন্দ্রগুলোর মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করে। তবে এ শর্তে রাজি হননি এ খাতের ব্যবসায়ীরা। তারা বিদ্যুত্ না দিলেও কেন্দ্র ভাড়ার অর্থ পাবেন—এমন শর্তে মেয়াদ বাড়ানোর জন্য লবিং শুরু করেন। সূত্রমতে, সরকার ব্যবসায়ীদের চাপে ও বিদ্যুত্ বিভাগের কর্মকর্তাদের পরামর্শে এ শর্তে রেন্টাল কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়াতে রাজি হয়েছে।
জানা গেছে, ‘বিদ্যুত্ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ সংশোধিত ২০১২’-এর অধীনে রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। এ আইনে বিদ্যুত্ রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র বিষয়ক কোনো দুর্নীতি বা অভিযোগ এনে দেশের আদালতে মামলা করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি লাভের সুযোগ দেয়ার কারণেই একটি মহল বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
এরই মধ্যে যে কেন্দ্রগুলোর মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে সেগুলো হচ্ছে ঠাকুরগাঁওয়ের ডিজেলচালিত আরজে পাওয়ারের ৪৭ মেগাওয়াট, আশুগঞ্জে প্রিসিশন এনার্জির গ্যাসভিত্তিক ৫৫ মেগাওয়াট, চট্টগ্রামের শিকলবাহায় তেলচালিত এনার্জি পাওয়ার করপোরেশনের ৫৫ মেগাওয়াট, নারায়ণগঞ্জের পাগলায় ডিপি পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির ডিজেলচালিত ৫০ মেগাওয়াট ও খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের খুলনায় ডিজেলচালিত ৪০ মেগাওয়াট রেন্টাল কেন্দ্র।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ২০২০ সাল নাগাদ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহের জন্য রেন্টাল কেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানো ছাড়া কোনো উপায় নেই। কারণ সরকার গত চার বছরে উল্লেখযোগ্য বড় বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণে ব্যর্থ হয়েছে। এ যুক্তি দেখিয়ে ২০১২ সালে ছয়টি গ্যাসভিত্তিক রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানো হয়।
বিদ্যুত্ বিভাগ সূত্রমতে, ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মোট ১৪টি কুইক রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র অবসরে যাওয়ার কথা। আগামী বছর ভেড়ামারা ও সিদ্ধিরগঞ্জের দুটি কেন্দ্র অবসরে যাবে। ঘোড়াশালের দুটি কেন্দ্র ২০১৫ সালে অবসরে যাচ্ছে। এর পরের বছর ২০১৬ সালে অবসরে যাবে, এমন আরো ছয়টি কেন্দ্রের মধ্যে নওয়াপাড়ার দুটি, মেঘনাঘাট, খুলনা, মদনগঞ্জ এবং সিদ্ধিরগঞ্জে একটি করে কেন্দ্র রয়েছে। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এসব কেন্দ্রের মালিকরা মেয়াদ বাড়িয়ে নিচ্ছেন।
এ বিষয়ে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুত্-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, বিদ্যুত্ ব্যবসায়ীদের ব্যবসা দেয়ার জন্যই সরকার এটা করছে। এর সঙ্গে বিদ্যুত্ উত্পাদনের কোনো সম্পর্ক নেই। সরকার যদি বিদ্যুত্ উত্পাদন বাড়িয়ে সঙ্কট মোকাবিলা করতে চাইত তাহলে পিডিবির মালিকানায় বড় বড় বিদ্যুেকন্দ্র গত চার বছরের মধ্যে করতে পারত। কিন্তু সরকার বিদ্যুত্ সঙ্কটকে জিইয়ে রেখে কিছু ব্যবসায়ীকে মুনাফা করার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।
রেন্টাল কেন্দ্র থেকে বিদ্যুত্ কেনা বাবদ প্রতিবছর ভর্তুকি দিতে হচ্ছে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। ফলে বিদ্যুত্ খাতে দেয়া ভর্তুকির পুরো অর্থই ব্যয় হচ্ছে ২৮টি কেন্দ্র থেকে নেয়া ১৫০০ মেগাওয়াট রেন্টালের বিদ্যুত্ কিনতে গিয়ে। এ খাতের বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এ কেন্দ্রগুলোকে মেয়াদ বাড়ানোর অনুমতি দেয়ার ফলে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিদ্যুত্ খাতে ভর্তুকির নামে লোপাট করা অর্থের পরিমাণ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। দেশের অর্থনীতিতে সর্বগ্রাসী লোপাটের সুযোগ করে দেয়ার জন্য বিশেষজ্ঞরা প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীকে সবচেয়ে বেশি দায়ী করেছেন। তাদের অভিযোগ, মূলত তিনিই একটি সিন্ডিকেট বানিয়ে দেশজুড়ে জ্বালানি সঙ্কট তৈরি করে রেখেছেন।
রেন্টাল কেন্দ্র নির্মাণের অনুমতির সময় ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত ছাড় দেয়া হয়েছিল। এসব ছাড়ের মধ্যে রয়েছে শুল্কমুক্ত বিদ্যুেকন্দ্রের জন্য পুরনো যন্ত্রপাতি আমদানি করার সুযোগ। আবার শুল্কমুক্ত সুবিধায় এসব কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি বিদেশে রফতানি করারও সুযোগ রাখা হয় চুক্তিতে।
বিদ্যুত্ খাতের অন্যতম বিশেষজ্ঞ, পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমাতুল্লাহ আমার দেশকে বলেন, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল দেশের বিদ্যুত্ খাতই শুধু নয়, গোটা অর্থনীতি জন্য বিষফোঁড়া। এগুলো জিইয়ে রেখে সরকারেরই একটি সিন্ডিকেট হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে। জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুত্ উত্পাদনের কথা বলে সরকার তাদের দলীয় নেতাকর্মী ও প্রভাবশালীদের দিয়ে কুইক রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপন করিয়েছে। ৬-৭ টাকার বিদ্যুত্ ক্রয় করছে ১৭-১৮ টাকায়। ভর্তুকি দিয়ে তেল কিনে বিনা মূল্যে সেই তেল দেয়া হচ্ছে কুইক রেন্টালের মালিকদের। এসব রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে যাতে কেউ মামলা করতে না পারে, সেজন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার।
এক প্রশ্নের উত্তরে বিডি রহমতুল্লাহ বলেন, এই রেন্টাল খাতে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন করার জন্য সব মিলিয়ে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে বছরে ১৮ হাজার কোটি টাকা। জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে এসব রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, ভাড়ায় আনা তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে এক বছরে জ্বালানি খরচ বেড়েছে ৮৯ শতাংশ। ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুত্ উত্পাদন করতে খরচ হতো চার টাকা ২৬ পয়সা। কিন্তু ২০১০-১১ অর্থবছরে এসে এই খরচ বেড়ে হয়েছে আট টাকা পাঁচ পয়সা। ২০০৯-১০ অর্থবছরে ভাড়ায় আনা কেন্দ্র থেকে ৯৬৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা দিয়ে বিদ্যুত্ কেনা হয়েছে ২২৬ কোটি ১২ লাখ ৬৪ হাজার ৩৪৭ কিলোওয়াট আওয়ার। এই বিদ্যুতের জন্য পিডিবি তেল কিনেছে ৯৭ লাখ ৪০ হাজার লিটার ফার্নেস ওয়েল এবং ১২ কোটি ৪৬ লাখ ৯০ হাজার লিটার ডিজেল। আর পরের বছর ২০১০-১১ বছরে কেনা হয়েছে ৪ হাজার ৩৬৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা দিয়ে ৫৪২ কোটি ১৯ লাখ ২৮ হাজার ৭১৮ কিলোওয়াট আওয়ার বিদ্যুত্। আর এ সময়ে তেল কেনা হয়েছে ১১ কোটি ৮৭ লাখ ৩০ হাজার লিটার ফার্নেস অয়েল এবং ১৩ কোটি ৭৬ লাখ ৬০ হাজার লিটার ডিজেল। গত বছর এই অঙ্ক আরও বেড়ে গেছে।

Sunday, 6 October 2013

Sole witness in Molla death penalty case gave contradictory accounts

David Bergman 

The sole witness in the 1971 war crimes case where the Appellate Division ruled that Jamaat leader Quader Molla should receive the death penalty had given two previous accounts in which she did not mention Molla’s presence at the scene of her family’s murder.
In one of the accounts, given in September 2007 to a Liberation War Museum researcher, Momena Begum even told the interviewer that she had not been present when her family was massacred, having left the area two days before it happened.
In the second account, given in July 2010 to a tribunal investigation officer, Momena, who was 13 years old in 1971, stated that the men who entered her family house ‘were Biharis’ and Pakistani soldiers. There was no mention of the presence of any Bengali.
Both of Momena’s previous accounts were inconsistent with the oral evidence she subsequently gave in the court — the only evidence that the prosecution adduced in support of its allegation — in which she placed Molla at the scene of her family’s massacre more than 40 years ago.
The International Crimes Tribunal appears to have been aware of both inconsistent statements.
In its judgement, the tribunal did not mention Momena’s statement to the investigation officer and, in relation to the statement given to the museum researcher, ruled that it should not be considered in determining the witness’s ‘credibility.’
Mohammad Ali, the prosecutor in the case, told New Age that Molla’s presence at the scene was ‘inadvertently not recorded by the investigation officer.’
About both statements, he added, ‘When a victim is involved in an atrocity, he or she is not prepared to make entire disclosure [due to fear] but whatever she states in oath before the tribunal that is wholly to be relied on. All other statements should not be relied on.’
In July 2012, Momena Begum gave an oral testimony to the tribunal with only the judges and lawyers present.
Whilst wearing a hijab, Momena told the court that on March 26, 1971, a group of men had come to her father’s house and killed six members of the family.
‘My father was running towards the house and said “Qader Molla will kill me”,’ she said.
When the men entered the room ‘Quader Molla pulled my father by the collar,’ and dragged him out of the house, she said. The men then killed her mother, three sisters (one of whom was first raped) and baby brother.
After the incident, she said, ‘A person called Kamal Khan who served tea to freedom fighters told me, “Quader Molla killed my parents.” My Ukil Baba [marriage witness] Akkas Molla also told me the same thing ...’
In its judgement, the tribunal stated that there was ‘no earthly reason to disbelieve [Momena].… Rather, she seems to be a natural live witness ….’
However, before she gave her evidence in court, Momena had given two interviews which contradict her testimony that she knew that Molla was present at the scene.
The first was on September 28, 2007 when she was interviewed by a researcher, working at Jallad Khana, the annexe of the Liberation War Museum at Mirpur.
In the statement, there is no mention of Molla. ‘Biharis surrounded [Momena’s father’s house] house and took [her father] away,’ the statement reads.
It also states that Momena had told the researcher that she was not present during the incident: ‘Because the elder daughter of Hazrat Ali, Momena Begum, left for her father-in-law’s house two days earlier, she remained alive.’
It went on: ‘After a few days, the elder daughter of Hazrat Ali, Momena Begum, came to know everything about what happened but as the situation in Mirpur was still problematic, she was not able to come to Mirpur.’
Momena’s statement to the researcher only became known to Molla’s defence lawyers near the end of the trial.
In January 2013, at the time of closing arguments, the defence requested that the tribunal obtain the original document from the museum.
The tribunal rejected the request saying that the ‘photographed copy’ of the document would ‘be taken into due notice at the time of passing our final verdict.’
In its judgement, the tribunal ruled that the statement could not be used to consider Momena’s credibility as there was no authenticated copy, that the statement had not been given to the court earlier in the proceedings, and it had not been subject to judicial questioning.
‘Inaccuracies or inconsistencies between the content of testimony made under solemn declaration to the tribunal and their earlier statement made to any person, non-judicial body or organisation alone is not a ground for believing that the witnesses have given false testimony,’ the tribunal stated in the judgement.
The second inconsistent account given by Momena was to Mohana Begum, the deputy investigating officer assigned to investigate the case against Molla.
Whilst in this statement, Momena said that on March 26, 1971, she was in the house when her family was killed, there is, again, no mention of Molla’s presence.
Instead, Momena told the investigation officer, as she had previously told the museum researcher, that the men who came ‘were Biharis. They entered along with the Pakistani soldiers.’
Momena specifically told the officer that one person was present. ‘I know all the Biharis. Aktar Gunda was with them. He was known as a gunda (criminal) in our locality,’ she stated.
Molla’s name is mentioned twice in the investigation officer’s report.
Momena is quoted as saying: ‘When the war broke out, [Akter Gunda] joined with Quader Molla of Duaripara and started to kill people in Mirpur’ and subsequently, ‘I heard about Quader Molla and Aktar Gunda and their force from people around.’
However, the statement contains no allegation that Molla was present at the time of this offence.
In its cross-examination of Momena in July 2012, the defence failed to ask her about her previous statement to the investigation officer.
In November, the lawyers made an application to the tribunal requesting that the witness return to court so they could do so.
The tribunal rejected the application stating that it was ‘a tactic to cause unreasonable delay’ and there was no legal provision to recall a witness for ‘cross-examination.’
During her testimony in court, Momena acknowledged that she had not previously told anyone that Molla was involved in the offence.
‘Many people came to me and took my photograph but, out of fear, I did not tell  anybody the name of Quader Molla and Aktar Gunda,’ she said.
The Appellate Division of the Supreme Court has not yet published its written judgement on the appeal.

যশোরের শার্শা সীমান্তে বিএসএফের নির্যাতনে বাংলাদেশী তরুণের মৃত্যু

যশোরের শার্শা সীমান্তে বিএসএফের নির্যাতনে তৌহিদুর রহমান শিকদার নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে তার মৃত্যু যে বিএসএফের নির্যাতনে হয়েছে, বিজিবি কর্মকর্তারা তা নিশ্চিত করতে পারেননি।
নিহত তৌহিদুর রহমান শার্শা উপজেলার গোগা গ্রামের লিয়াকত আলী শিকদারের ছেলে। তার স্বজনরা জানায়, শনিবার রাতে তৌহিদুরসহ একদল ব্যবসায়ী ভারতে যায় গরু আনতে। গভীর রাতে দলটি ফিরে আসার সময় ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ঝাউডাঙ্গা ক্যাম্পের সদস্যরা তাদের তাড়া করে। অন্যরা নিরাপদে দেশে ফিরতে পারলেও তৌহিদকে ধরে ফেলে বিএসএফ সদস্যরা। তারা তৌহিদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালিয়ে মৃতপ্রায় অবস্থায় ফেলে যায় বাংলাদেশ ভূখণ্ডে। পরে গ্রামবাসী তাকে উদ্ধার করে প্রথমে বাগআঁচড়ার একটি ক্লিনিকে এবং পরে রাত সোয়া ২টায় যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। গতকাল রোববার বিকালে তৌহিদ চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যায়।
বিজিবি ২৩ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল তায়েফ উল হক তৌহিদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করলেও কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে সে ব্যাপারে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি। তিনি বলেন, তৌহিদ নামে এক তরুণের মৃত্যুর খবর জেনে তিনি বিজিবি ২৬ ব্যাটালিয়নের অপারেশনাল অফিসার এ কে এম রায়হান হাফিজকে গতকাল সন্ধ্যায় যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। কর্নেল তায়েফ জানান, মৃত তৌহিদের মুখমণ্ডলসহ শরীরের অন্যান্য স্থানে আঘাত রয়েছে। এগুলো যদি ছররা গুলির দাগ হয়, তাহলে তার জন্য বিএসএফ দায়ী।
বিজিবি ২৬ ব্যাটালিয়নের অপারেশনাল অফিসার মেজর রায়হানও একই ধরনের তথ্য দেন। তিনি বলেন, তৌহিদের মৃত্যু কীভাবে হয়েছে ময়নাতদন্ত রিপোর্টের পরই তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।
নিহতের স্বজনদের দাবি, তৌহিদের মুখে কলম বা অন্য কোনো সুচালো বস্তু দিয়ে আঘাত করেছে বিএসএফ। এছাড়া তার সারা শরীর পিটিয়ে থেঁতলে দেয়া হয়েছে বলে তাদের দাবি।

গোবিন্দগঞ্জে ৫ পুলিশের বিরুদ্ধে থানায় কিশোরী ধর্ষণের অভিযোগ

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থানা হেফাজতে এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে পাঁচ কনস্টেবলের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ১৭ বছর বয়সী মেয়েটির বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায়। তাকে গাইবান্ধা জেলা কারাগারে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখা হয়েছে।
আদালতের নির্দেশে গত শুক্রবার রাতে মেয়েটিকে বাদী করে গোবিন্দগঞ্জ থানায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়। তবে মেয়েটি ওই পুলিশ সদস্যদের নাম বলতে পারেনি। এ ঘটনা তদন্তে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি শেখ দেলোয়ার হোসেন বলেন, গোবিন্দগঞ্জের সিনিয়র বিচারিক হাকিম আদালতের আদেশে এ মামলা করা হয়েছে। মামলাটির তদন্তের ভার দেয়া হয়েছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি আহসানকে।
এছাড়া আদালত ওই কিশোরীর ডাক্তারি পরীক্ষা করে রিপোর্ট দেয়ার নির্দেশ দিয়েছে গাইবান্ধার সিভিল সার্জনকে।
ওসি আরও জানান, ২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় স্থানীয় লোকজন ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা শহরের অদূরে মাস্তা এলাকায় ওই কিশোরীকে কান্নাকাটি করতে দেখে থানায় খবর দেয়। খবর পেয়ে গোবিন্দগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক আকমল হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ওইদিন রাতেই তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। পর দিন সকালে এ বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
তিনি বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর পুলিশ ওই কিশোরীকে গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র বিচারিক হাকিম মো. তারিক হোসেনের আদালতে হাজির করে। আদালত ওইদিন তাকে গাইবান্ধা জেলা কারাগারে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেয়। কারাগারের যাওয়ার পর মেয়েটি জেল সুপার শহীদুল ইসলামকে থানা হেফাজতে ধর্ষিত হওয়ার কথা জানায়। তবে ধর্ষণকারী পাঁচ পুলিশের নাম জানাতে পারেনি।
জেল সুপার শহীদুল ইসলাম জানান, মেয়েটি তাকে ধর্ষিত হওয়ার বিষয়টি জানানোর পর এবং কিছুটা অসুস্থ লাগায় তাকে ২ অক্টোবর আবার গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র বিচারিক হাকিম আদালতে হাজির করে তার জবানবন্দি নেয়া হয়। এ জবানবন্দি এজাহার হিসেবে গণ্য করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ৩ অক্টোবর পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়। ওই কিশোরীকে গাইবান্ধা জেলা কারাগারে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখা হয়েছে।
গোয়েন্দা পুলিশের ওসি আহসান হাবিব বলেন, গতকাল রোববার তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছি। তদন্ত কাজও শুরু করা হয়েছে।
গাইবান্ধা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) হানিফ বলেন, আদালতের নির্দেশ পাওয়ার পর গতকাল রোববার কিশোরীর ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে। দ্রুত প্রতিবেদন দেয়া হবে। তবে পরীক্ষায় কী পাওয়া গেছে তা বলতে রাজি হননি তিনি।
জেলা পুলিশ সুপার সাজিদ হোসেন বলেন, এ ঘটনা তদন্তের জন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোশারফ হোসেনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য দু’জন হলেন এএসপি (হেড কোর্য়াটার) আব্দুল কুদ্দুস ও এএসপি (বি সার্কেল) মাহবুব হোসেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোশারফ বলেন, কিশোরীর জবানবন্দিতে পাঁচ পুলিশ সদস্যের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সে পাঁচ পুলিশ কনস্টেবলের নাম জানাতে পারেনি। তাই আদালতের অনুমতি নিয়ে কিশোরীর মাধ্যমে অভিযুক্তদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে।
মানববন্ধন পালিত : গোবিন্দগঞ্জ থানায় আশ্রিত কিশোরী সীমা ধর্ষণকারী পুলিশ সদস্যদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল বিকালে এক মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা সামাজিক বিপ্লবী পরিষদ ও নাগরিক কমিটির যৌথ উদ্যোগে উপজেলা পরিষদ চত্বরে মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। বেলা ৩টা থেকে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী পালিত এ মানববন্ধন কর্মসূচি চলাকালে বক্তব্য রাখেন সামাজিক বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আ.ফ.ম মজিবুর রহমান সরকার ফুলমিয়া, নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক এম.এ মতিন মোল্লা, মুক্তিযোদ্ধা এন্তাজুর রহমান প্রধান, অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ, ওয়ার্কার্স পার্টির সম্পাদক আব্দুল ওয়ারেছ প্রধান, এম মোজাম্মেল হক, রফিকুল ইসলাম রফিক, মোয়াজ্জেম হোসেন প্রমুখ।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, উপজেলার ফাঁসিতলা বাজার থেকে পরিচয়হীন সীমা নামের এক কিশোরীকে ক্রন্দনরত অবস্থায় গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাত ৩টার দিকে গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। পরে সুযোগ বুঝে থানা হেফাজতে থাকা সীমাকে কয়েক পুলিশ সদস্য রাতভর ধর্ষণ করে বলে বক্তারা অভিযোগ করেন। বর্তমানে সীমা গাইবান্ধা জেলহাজতে নিরাপত্তা হেফাজতে রয়েছে।

বেপরোয়া দুর্নীতির উপাখ্যান- ৬ : টেন্ডার লুটের সরকার

বর্তমান সরকারের পুরো মেয়াদে টেন্ডারসন্ত্রাস ছিল অপ্রতিরোধ্য। টেন্ডারবাজদের থামানোর কোনো উদ্যোগই ছিল না সরকারের। ফলে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রায় সব টেন্ডারই লুট করেছে। টেন্ডার লুট করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এতে সরকারি দলের ক্যাডার ছাড়াও অনেক নিরীহ মানুষকেও জীবন দিতে হয়েছে।
বর্তমান সরকারের সময়ে গোয়েন্দা সংস্থার ভবন নির্মাণ থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ ভবনের টেন্ডারও লুট হয়েছে। এসব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া করার কিছুই ছিল না।
টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঘিরে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী বাহিনী। যেখানে টেন্ডার, সেখানেই হামলে পড়েছে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ ক্যাডাররা। মন্ত্রী-এমপিরাও কম যান না। ফলে প্রকৃত ঠিকাদাররা ছিলেন একেবারেই অসহায়। কাজ না পেয়ে অনেক পেশাদার ঠিকাদার অফিস পর্যন্ত চালাতে পারছেন না। কোনো কোনো ঠিকাদার আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ অগ্রিম ঘুষ দিয়ে কাজ কিনে নিচ্ছেন। ফলে তারা অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ করে ঘুষের টাকা তুলে নিচ্ছেন।
সরকারের শেষ সময়ে অনেকটা মরিয়া হয়েই সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে পেশি আর অস্ত্রের শক্তি প্রদর্শন করছে। এতে প্রাণহানির ঘটনাও বেড়ে গেছে । গত ২৪ জুন চট্টগ্রামে রেলওয়ের টেন্ডার নিয়ে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে শিশুসহ দুজন নিহত হয়। এ ঘটনায় ৫২ জনকে গ্রেফতার করা হলেও কিছুদিন পর তারা পার পেয়ে যায়।

সংসদে দরপত্র কেলেঙ্কারি
সংসদের অধিবেশন কক্ষের জন্য কার্পেট কেনার দরপত্র জমা দিতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন আইনমন্ত্রীর ছেলে। গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সাত-আট যুবকের হুমকির কারণে আরও কয়েকজন ঠিকাদার দরপত্র জমা দিতে পারেননি। বিদেশি এই কার্পেটের দাম প্রায় পাঁচ কোটি টাকা।
২০১১ সালের ৩১ অক্টোবরের এ ঘটনায় জড়িত থাকায় দুই কর্মকর্তাকে তাত্ক্ষণিক বদলি করা হয়েছে। তারা হলেন গণপূর্ত সার্কেল-৪-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির চৌধুরী এবং নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদ মোহাম্মদ কবির। বাধা দেয়া যুবকদের নাম-পরিচয় পাওয়া যায়নি। স্পিকার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এদের পরিচয় জানতে চেয়েছেন। আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদের ছেলে মাহফুজ শফিক অবশ্য স্পিকারের হস্তক্ষেপে পরে দরপত্র জমা দিতে সক্ষম হন।

সিআইডির ভবন নির্মাণের দরপত্রও ছিনতাই
মাগুরায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কার্যালয় নির্মাণ কাজের দরপত্রও ছিনতাই করেছে ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা। অবশ্যই ওই ঘটনার পর দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল করেছে গণপূর্ত বিভাগ।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত ৭ জানুয়ারি ছিল মাগুরা পুলিশ সুপারের কার্যালয় ভবনের ওপরে প্রায় ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে সিআইডির কার্যালয় নির্মাণের জন্য দরপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন।
মাগুরার শ্রমিক লীগ সাধারণ সম্পাদক ও ঠিকাদার মকবুল হোসেন সকালে ওই কাজের জন্য একটি দরপত্র জমা দেন। আরেকজন ঠিকাদারও ওই সময় দরপত্র জমা দেন। সকাল ১০টার দিকে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ঠিকাদার মীর সুমনের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী পুলিশের সামনেই নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষে ঢুকে তাদের দুটি দরপত্র বাক্স থেকে ছিনতাই করে নিয়ে যায়।

রূপসা সেতুর টোল দরপত্র জমাদানে প্রধানমন্ত্রীর চাচাত ভাইয়ের বাধা
শেখ সোহেলের বাধার কারণে ঠিকাদাররা সম্প্রতি খুলনায় রূপসা খানজাহান আলী সেতুর টোল আদায়ের সার্ভিস চার্জের দরপত্র জমা দিতে পারেননি। শেখ সোহেল বাগেরহাট-১ আসনের (মোল্লাহাট-ফকিরহাট) সংসদ সদস্য শেখ হেলালের ভাই। তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই।
নগরের বয়রা সড়ক ভবন সূত্রের বিবরণ অনুযায়ী, খানজাহান আলী সেতুর টোল আদায়ের পাঁচ বছরের সার্ভিস চার্জের দরপত্র জমা দেয়ার শেষ সময় ছিল ২০১১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বেলা ২টা। মোট ৯টি ফরম (শিডিউল) বিক্রি হলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মাত্র তিনটি জমা পড়ে।
শেখ সোহেলের লোকজন সকাল থেকে সড়ক ভবনে অবস্থান নিয়ে তাদের পছন্দের তিনটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকজনকে দরপত্র জমা দিতে বাধা দেয়।

সরকারি ভবনে যুবলীগের আধিপত্য
যুবলীগের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর নেতারা প্রায় সবাই কোনো না কোনো সরকারি ভবনে তত্পর। শিক্ষা ভবন, সড়ক ভবন, মত্স্য ভবন, বিদ্যুত্ ভবন, ঢাকা সিটি করপোরেশন—সর্বত্রই তাদের আনাগোনা। এসব ভবন থেকে সারাদেশের বিভিন্ন খাতের উন্নয়ন কাজ ও কেনাকাটা সরকারি সিদ্ধান্তে বাস্তবায়ন করা হয়। আর যুবলীগ নেতাদের মাধ্যমেই সবরকম ঠিকাদারি কাজের বিলিবণ্টন হয়। আপস-মীমাংসার মাধ্যমে দরপত্র ফেলা হয়। আবার আপস না হলে ঘটে অস্ত্রের মহড়া।
মহানগর যুবলীগের সাবেক নেতা বর্তমান সংসদ সদস্য (বৃহত্তর বরিশালের একটি আসনের) পুরো রাজধানীর টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন। বিশেষ করে ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রায় সব টেন্ডারই বণ্টন হয় তার ইশারায়। টেন্ডার ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের কারণে দলের এক নেতাকে হত্যার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ক্রীড়া ভবনের টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণ করত সদ্য নিহত রিয়াজুল হক খান মিল্কি, ক্রসফায়ারে নিহত জাহিদ সিদ্দিকী তারেক, মিল্কি হত্যা মামলার আসামি সাখাওয়াত হোসেন ওরফে চঞ্চল ও মতিঝিল যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম ওরফে টিপু।
মত্স্য ভবনের টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণ করে মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান ওরফে বকুলসহ শাহবাগ থানা যুবলীগ সভাপতি প্রার্থী নাজির, শিমুল ও স্বপন।
পূর্ত ভবনের টেন্ডারবাজি (পিডব্লিউডি) নিয়ন্ত্রণ করে মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ওরফে সম্রাট ও কাউসার মোল্লা নামে এক যুবলীগ নেতা।
খাদ্য ভবনের টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণ করে ইসমাইল চৌধুরী, শফিকুল ইসলাম ও মিজানুর রহমান বকুল।
পিডিবির পরীবাগ কার্যালয়ে ইসমাইল, মিজানুর ও শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের অনুসারীদের আধিপত্য বিস্তৃত। ইমন কারাগারে বসেই এখানকার টেন্ডারবাজির টাকার ভাগ পায় বলে জানা গেছে।
মতিঝিলের বিদ্যুত্ ভবনের টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণ করে মিজানুর রহমান আর আবদুল গনি রোডের পিডিবি কার্যালয়ে চঞ্চলের আধিপত্য।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ হয় যুবলীগের সাবেক নেতা বাউফল পৌরসভার মেয়র জিয়াউল হক জুয়েলের মাধ্যমে। গত ১৯ জানুয়ারি রাতে একদল দুর্বৃত্ত জিয়াউলকে শাহবাগ জাতীয় টেনিস কমপ্লেক্সের নিচতলার কার্যালয়ে গুলি চালায়।
গত বছরের ১২ জুন সড়ক ভবনে ঠিকাদারির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গোলাগুলিতে কয়েকজন আহত হয়। সড়ক ভবন সূত্র জানায়, গোলাগুলিতে নেতৃত্ব দেয় যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম, ক্রসফায়ারে নিহত মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক এসএম জাহিদ সিদ্দিকী তারেক ও মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন।
২০১১ সালের ২৬ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুহসীন হলে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অন্তত ৬০ জন আহত হন। এক পক্ষের নেতাকর্মীরা আরেক পক্ষকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে-পিটিয়ে জখম করে। গুলি ও ককটেলের বিস্ফোরণও ঘটানো হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, যুবলীগের বিজ্ঞান সম্পাদক শফিকুল টেন্ডারবাজিতে আধিপত্য বজায় রাখতে তাঁর অনুসারী নেতাদের দিয়ে অবাধ্যদের শায়েস্তা করতে গেলে এই রক্তপাত ঘটে। সেই ঘটনায় শফিকুলকে প্রধান আসামি করে মামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে আইসিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার প্রচলন প্রকল্পের জন্য ২০ হাজার ৫০০টি মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর সরবরাহের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। সেই দরপত্রে অংশ নিতে গিয়ে যুবলীগ ক্যাডারদের দ্বারা হেনস্থা হন সরকারি টেলিফোন শিল্প সংস্থার (টেশিস) কর্মকর্তারা। বিষয়টি টেশিসের পক্ষ থেকে প্রকল্প পরিচালককে ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে চিঠি দিয়ে জানানো হয়।
পুরান ঢাকার যুবলীগ নেতা সাগর আহমেদ শাহীন গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা থেকে অস্ত্র কিনতে গিয়ে ধরা পড়েন। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলা হয়। ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তাকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দেয় ঢাকা মহানগর গোযেন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে অভিযোগপত্র দেয়ার আগেই তিনি জামিনে বের হয়ে আসেন। এরপর থেকে সাগর আহমেদ ঢাকা মেডিকেল, শিক্ষা বোর্ডসহ আশপাশের কার্যালয়গুলোর টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে চলেছেন।
গত ৭ এপ্রিল বাড্ডা থানা যুবলীগের আহ্বায়ক কায়সার মাহমুদকে (৩৮) ও তাঁর পরদিন একই এলাকার (৮ এপ্রিল) স্থানীয় ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেনকে (৩৫) একই কায়দায় গুলি করে দুর্বৃত্তরা। এরপর ১৬ জুন গুলিবিদ্ধ হন ২০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের নেতা ইমরুল হোসেন।
যোগ্য ঠিকাদাররা দরপত্রে অংশ নিতে পারেন না সড়ক ভবনের টেন্ডারে : বর্তমান সরকারের সময় সড়ক ভবনের কোনো টেন্ডারে যোগ্য ঠিকাদাররা অংশ নিতে পারেননি। এখানে লোক দেখানো দরপত্র আহ্বান করাও হয় বটে কিন্তু কাজ ভাগ করা হয় গোপনে।
সওজের প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের কাছ থেকে জানা গেছে, লিমিটেড টেন্ডারিং মেথড সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের জরুরি ভিত্তিতে দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া। জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার কিংবা নির্মাণের প্রয়োজনে এই প্রক্রিয়ায় দরপত্র আহ্বান করা হয়ে থাকে। কিন্তু এখন লুটপাটের উদ্দেশ্যে গোপনে এই ধরনের দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে। গত বছরের আগস্ট মাসে গাজীপুর-মাওনা সড়কের জরুরি সংস্কার কাজের জন্য ১৮ কোটি টাকার কাজ ভাগ করে দেয়া হয় কোনো ধরনের দরপত্র আহ্বান ছাড়াই। ওই সময়ে একইভাবে ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-আরিচাসহ বিভিন্ন মহাসড়ক সংস্কারে ৩০০ কোটি টাকার কাজ দেয়া হয়। সড়ক ভবনের প্রকৌশলীদের কাছ থেকে জানা গেছে, এই পদ্ধতিতে এখন দুর্নীতি হচ্ছে অতি কৌশলে। জানা গেছে, উন্মুক্ত দরপত্র এড়াতে সওজের ঢাকা জোন ব্যয় ৫০ লাখ টাকার নিচে রেখে গোপনে এ কার্যাদেশগুলো দিচ্ছে। বর্তমান সরকারের প্রথম বছরের প্রায় চার মাসেই ১৪ কোটি টাকার দুর্নীতি ধরা পড়েছিল।
গত বছরের শুরুর দিকে সওজের ঢাকা জোনে এলটিএম পদ্ধতিতে ২৮৫ কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয় জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে। কার্যাদেশও দেয়া হয়েছিল। সওজের সদ্য সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আবদুল কুদ্দুস অবসর নেয়ার আগে তাড়াহুড়ো করে গোপনে এই দরপত্র আহ্বান করেন। অবসর নেয়ার পরও তিনি কার্যাদেশপত্রে স্বাক্ষর করেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রধান প্রকৌশলীর দফতরের রেজিস্টারে ওইসব কার্যাদেশ লিপিবদ্ধ করার কথা। কিন্তু তা করা হয়নি। ওইসব কার্যাদেশপত্রে স্মারক নম্বরও দেয়া হয়নি। ঢাকা জোনের ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, শেরপুর, নরসিংদী ও মুন্সীগঞ্জ—এই আট জেলার সড়ক সংস্কারের জন্য ২৮৫ কোটি টাকার এই কাজ গোপনে ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়। তিনটি গ্রুপে গোপনে দরপত্র আহ্বান করা হয়। জানা গেছে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিআর) ২০০৬ ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা-০৮ অনুযায়ী, সরকারি কাজে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দরপত্র দেয়ার ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ও সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) ওয়েবসাইটে নোটিশ প্রকাশ এবং পাঁচ কোটি টাকার বেশি কাজের দরপত্র কেনা ও জমা দেয়ার জন্য অন্তত ২৮ দিন সময়সীমা দেয়ার বিধান আছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়নি। দরপত্র বিক্রির শেষ দিন ছিল গত ৮ জানুয়ারি। দরপত্র জমা ও খোলার দিন ছিল গত ৯ জানুয়ারি। দরপত্র জমা দেয়ার সময় পার হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে এসব কাজের নোটিশ সিপিটিইউয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। পিপিআরের শর্ত অনুযায়ী একই কাজকে একাধিক ভাগে ভাগ করার কোনো নিয়ম নেই। অথচ প্রতিবছর সওজে জরুরি ভিত্তিতে গোপন দরপত্র হিসেবে পরিচিত লিমিটেড টেন্ডারিং মেথডের মাধ্যমে রাস্তা সংস্কারের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়।
এদিকে গত বছর ২৮৫ কোটি টাকার ১৬টি ঠিকাদারি কাজ অনিয়মের মাধ্যমে ভাটোয়ারা করে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অনুসন্ধানে অনিয়ম ধরা পড়লে কাজগুলো বাতিল করা হয়।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্র জানায়, সওজের কাজগুলো বেশি টাকার হওয়ায় এদিকে সরকারের সব মহলের নজর থাকে। সূত্র জানায়, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ ও রেলের ওয়াগন ক্রয়সহ প্রতিটি টেন্ডারে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। এরই মধ্যে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার নামে ৩২৯ কোটি টাকার টেন্ডারে মহাজালিয়াতি ধরা পড়ে। বিদেশি কোম্পানির নাম দিয়ে এ কাজটি বাগিয়ে নেয় সরকারি দলের নেতারা। সমপ্রতি দরপত্র গোপন রেখে নারায়ণগঞ্জে সরকার দলীয় ঠিকাদারদের মধ্যে ৫০ কোটি টাকার কাজ ভাগাভাগি করে দেয়া হয়।
স্বরূপকাঠি পৌরসভার সোয়া ৩ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ ভাগাভাগি করে নেয় আওয়ামী লীগ নেতারা। ৩৯টি প্রতিষ্ঠান ওই কাজের দরপত্র দাখিল করলেও আগেই ভাগাভাগি চূড়ান্ত করে ফেলেন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীরা। সাতক্ষীরায় টেন্ডারবাজির টাকা ভাগাভাগি নিয়ে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসানসহ উভয় পক্ষের ২০ জন নেতাকর্মী আহত হয়।

রাজউক ভবনে পুলিশের সামনেই ৮৫ কোটি টাকার টেন্ডার ছিনতাই
গত ২৯ মে পুলিশের উপস্থিতিতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ভবনে এবার ৮৫ কোটি টাকার টেন্ডার ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। মেসার্স আতাউর রহমান খান ট্রেডার্স, এম আর কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, নিয়াজ আবুলজভি লিমিটেড এবং রফিক কনস্ট্রাকশন লিমিটেডসহ বেশ কয়েকটি নামি প্রতিষ্ঠানের এসব টেন্ডার ডকুমেন্ট ছিনতাই করা হয়েছে। ‘রয়েল ইকুইপমেন্ট অ্যান্ড কন্সট্রাকশন লিমিটেড’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভাড়া করা সন্ত্রাসীরা এই দুঃসাহসিক কাজটি করেছেন বলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন। এসব টেন্ডার ডকুমেন্ট ছিনতাইয়ে নেতৃত্ব দেন গোপালগঞ্জের ক্ষমতাসীন দলের এক সংসদ সদস্যের পিএ টোয়েল। তাকে সহায়তা করেন যুবলীগ কর্মী রাজ ও সুমনসহ শতাধিক বহিরাগতের নেতৃত্বে একটি সশস্ত্র গ্রুপ। তারা সকাল থেকেই টেন্ডার পাহারা দিয়ে এ কর্মকাণ্ড ঘটায়। সাধারণ ঠিকাদাররা সশস্ত্র গ্রুপের কাছে থাকা অস্ত্রের কারণে সামনে এগুতে সাহস পাননি।
এর আগে গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর রাজউক ভবনে প্রকাশ্যে ২৫ কোটি টাকার টেন্ডার ডকুমেন্ট ছিনতাই হয়েছে। পুলিশের উপস্থিতিতেই ওইদিন দেশের শীর্ষস্থানীয় নির্মাণ প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম লিমিটেডের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে টেন্ডার ডকুমেন্ট ছিনতাই করে দুর্বৃত্তরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, পদ্মা ট্রেডার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান আবদুস সালাম খানের ভাড়া করা দুর্বৃত্তরা টেন্ডার ছিনতাই করে। সালাম খান গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দিয়ে রাজউকে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে জানায় রাজউকের একাধিক সূত্র। শেষ পর্যন্ত মোনেম লিমিটেডসহ আরও একাধিক প্রতিষ্ঠান সিডিউল জমা দিতে ব্যর্থ হলেও দুপুর আড়াইটায় টেন্ডার খোলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রাজউকের সংশ্লিষ্ট শাখা।
সম্প্রতি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক উন্নয়ন ও বিউটিফিকেশন কাজের ৯ কোটি টাকার টেন্ডার শিডিউল আওয়ামী লীগ ক্যাডাররা ছিনিয়ে নিয়েছে। এ সময় বাধা দেয়ায় ঠিকাদারদের ওপর হামলাও চালানো হয়।
সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, গতকাল রাজউক কেন্দ্রীয় বিভাগ উত্তর (গুলশান-বনানী) সেন্ট্রাল পার্ক (ওয়ান্ডার ল্যান্ড) উন্নয়ন ও বিউটিফিকেশনের জন্য প্রায় নয় কোটি টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। সকাল নয়টার দিকে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শিডিউল জমা দিতে এলে তাদের ওপর হামলা চালায় এবং শিডিউল ছিনতাই করে স্বেচ্ছাসেবক লীগের ক্যাডার মানিক ও রাজু গ্রুপ। চার-পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসব আওয়ামী ক্যাডারদের হামলার শিকার হয়েছে বলে জানা গেছে।
এলজিইডিতে সরকারি দলের ক্যাডার ও ঠিকাদার ছাড়া অন্যদের প্রবেশ নিষেধ : এলজিইডির একটি সূত্র জানায়, সরকারি দলের লোক ছাড়া আর কেউ এখানকার টেন্ডারে অংশ পর্যন্ত নিতে পারেনি। যেখানে টেন্ডার আহ্বান করা হয় সেখানে সরকারি দলের বিভিন্ন গ্রুপ নিজেদের মধ্যে কাজ ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। আবার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে নিজেদের মধ্যেও সংঘর্ষ হচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় টেন্ডার দখলে নেয়াকে কেন্দ্র করে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গত বছর ৪ গ্রুপের দেড় কোটি টাকার কাজে ৪নং গ্রুপের ৩২ লাখ টাকার কাজসহ অন্যান্য কাজ নিতে শহর আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। দিনাজপুরে ১৪ কোটি টাকার টেন্ডার নিয়ে গত ৮ এপ্রিল ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এ সন্ত্রাসী ঘটনায় জড়িত ১২ জনের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে মামলাও করা হয়। পরবর্তী সময়ে অবশ্য এদের সবাই বেকসুর খালাস পেয়েছে। লক্ষ্মীপুরে টেন্ডারবাজি করতে গিয়ে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের কম্পিউটারসহ আসবাবপত্র ভাংচুর করায় আওয়ামী লীগের তিন নেতাকে জেল দেয়া হয়। ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু এলজিইডি ও পৌরসভার প্রায় ৪ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। সাধারণ ঠিকাদাররা শিডিউল কিনে জমা দিতে না পারায় হরিণাকুণ্ডু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল বাশারের কাছে রি-টেন্ডারের জন্য আবেদন করেছেন।

পিডিবি ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নিয়ন্ত্রণে
বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সব টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ। গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মতিঝিল পিডিবিতে ছাত্রলীগ সমর্থিত ঠিকাদারদের প্রায় তিন কোটি টাকার টেন্ডার (দরপত্র) ছিনিয়ে নিয়েছে যুবলীগ ক্যাডাররা। ওই দিন এ ঘটনার জের ধরে পুলিশের উপস্থিতিতেই পিডিবি ভবনে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে সাধারণ ঠিকাদাররা আতঙ্কে তাদের দরপত্র জমা না দিয়েই প্রাণ ভয়ে পালিয়ে যান। কুমিল্লায় বিদ্যুত্ ভবন নির্মাণের জন্য ২ কোটি ৯০ লাখ টাকার পুনর্দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল ওই দিন।
গত বছরের ৭ মার্চ ২৩ কোটি টাকার টেন্ডার ভাগাভাগি নিয়ে গণপূর্ত ভবনে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। সেগুনবাগিচা গণপূর্ত বিভাগের অধীনে বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিভিন্ন ভবন নির্মাণ ও সংস্কারে প্রায় ২৩ কোটি টাকার টেন্ডার শিডিউল জমা দেয়ার তারিখ ছিল ওই দিন। এজন্য সকাল ১০টা থেকে শিডিউল জমা দেয়া শুরু হয়। এ সময় সাধারণ ঠিকাদাররা শিডিউল জমা দিতে গেলে সরকারদলীয় একাধিক ক্যাডার তাদের বাধা দেয়। একপর্যায়ে গণপূর্ত ভবনের সামনে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীদের মধ্যে তর্কবিতর্ক ও হাতাহাতি শুরু হয়। এতে গণপূর্ত ভবনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে টেন্ডার শিডিউল জমা দেয়া বন্ধ হয়ে যায়। গণপূর্ত বিভাগের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ দলীয় ক্যাডাররা ১৭ জানুয়ারি ঠিকাদারদের অবরুদ্ধ করে রাখে। তারা সকাল সাড়ে ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দফায় দফায় ঠিকাদারদের ওপর হামলা চালায়। ক্যাডাররা টেন্ডার ডকুমেন্টস ফেলে দিয়ে ঠিকাদারদেরও বের করে দেয়। বিতর্কিত এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের ক্যাডাররা এ তাণ্ডব চালায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেগুনবাগিচার সরকারি ১২ তলার ২নং ভবনের গণপূর্তের ডিভিশন-৪-এর কার্যালয়ে এসব ঘটনা ঘটে।
স্বাস্থ্য টেন্ডার ছাড়াই কোটি কোটি টাকার কাজ পাচ্ছে পছন্দের প্রতিষ্ঠান : স্বাস্থ্য সেক্টরে দুর্নীতির নতুন অপকৌশল ‘স্পট কোটেশন’। পছন্দসই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সহজে কাজ পাইয়ে দিতে কিংবা ব্যবসায়িকভাবে লাখ লাখ টাকা মুনাফার সুযোগ করে দিতে বর্তমানে স্বাস্থ্য সেক্টরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ‘স্পট কোটেশন’-এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালামাল কেনাকাটার ধুম পড়েছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রেগুলেশনস (পিপিআর) নির্দেশিত নিয়মনীতি লঙ্ঘনের মাধ্যমে অবৈধভাবে স্পট কোটেশনে কার্যাদেশ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানপ্রধান টেন্ডারযোগ্য কেনাকাটাকে অপকৌশলে স্পট কোটেশন দেখিয়ে বিশেষ ব্যক্তি বা সংস্থাকে কার্যাদেশ পাইয়ে দিচ্ছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা যায়, বর্তমানে রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল, ৩২টি অপারেশন প্ল্যান (ওপি) ও নানা ধরনের প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্পট কোটেশনে নিম্নমানের এমএসআর সামগ্রী, যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন দ্রব্যাদি উচ্চমূল্যে কেনা হচ্ছে।

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর
এখানে টেন্ডারে কাজ পাওয়া তো দূরে থাক, সরকারি দলের সঙ্গে আপসরফা ছাড়া কেউ টেন্ডার দাখিল পর্যন্ত করতে পারেন না। সকাল থেকেই ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ ক্যাডাররা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতর দখল করে রাখে। গত বছরের ২৯ জুন রাজধানীর শিক্ষা ভবনে ২১ কোটি টাকার টেন্ডার দখল নিয়ে ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ৮ জন আহত হয়। ইইডি সূত্র জানায়, ১৮২৯ কোটি টাকার টেন্ডার বাগিয়ে নিতে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরে গত ক’মাস ধরে শুরু হয়েছে মহড়া-পাল্টা মহড়া। টেন্ডার বাগিয়ে নিতে মাস তিনেক আগে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের মধ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে। একাধিকবার সংঘর্ষও হয়েছে এ দু’পক্ষের মধ্যে।
গত বছরের ২৭ এপ্রিল মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (শিক্ষা ভবন) প্রায় ২১ কোটি টাকার টেন্ডার দখল নিয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে ছাত্রলীগের দু’গ্রুপে সংঘর্ষ ও গোলাগুলি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৩ মে ছিল শিক্ষা ভবনে ৬টি সরকারি কলেজের নতুন ভবন নির্মাণের টেন্ডার শিডিউল জমা দেয়ার তারিখ। প্রতিটি কলেজের নতুন ভবনের জন্য বাজেট প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা করে।
ফেব্রুয়ারি মাসে টাঙ্গাইল জেলা পরিষদ ও শিক্ষা প্রকৌশল অফিসের ৪ কোটি ১৯ লাখ টাকার টেন্ডার সরকারদলীয় লোকজন ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকারের শুধু দরপত্র বিক্রি থেকে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৩০ লাখ টাকারও বেশি। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির (আইসিটি) ভবন নির্মাণ কাজের জন্য ৩৪ কোটি টাকার কাজ সরকারি দলের নেতারা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়। কাজের জন্য ৪৫টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র কিনলেও টেন্ডার জমা দেয়ার শেষ দিনে মাত্র ৬টি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিতে পেরেছে। এগুলোর মধ্যে ৫টি আওয়ামী লীগ সমর্থিত নেতাকর্মীদের।
গত বছর ৪৪ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ কব্জা করার জন্য চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনে নামে। সংগঠনটির কিছু নেতাকর্মী উপাচার্যের অপসারণসহ যে ২১ দফা দাবি উত্থাপন করেছে, এর মধ্যে ১০টি দাবিই নির্মাণ ও ক্রয়সংক্রান্ত।
সম্প্রতি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের সাড়ে ১০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের দরপত্র জমা দিতে পারেননি মাগুরার সাধারণ ঠিকাদাররা। অন্যদিকে ঝিনাইদহে একই অধিদফতরের পৌনে ১২ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের শিডিউল সাধারণ ঠিকাদারদের কাছে বিক্রি করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ও নেতারা এই দুটি দরপত্রের কাজ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। তাদের পক্ষে ঝিনাইদহের সন্ত্রাসীরা দরপত্র জমাদানে বাধা দিয়েছে।
এ ব্যাপারে মাগুরার ১১ জন প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। তাদের অভিযোগ, দরপত্র জমাদানের শেষ দিনে গতকাল সন্ত্রাসীরা অস্ত্রের মুখে তাদের দরপত্র জমা দিতে দেয়নি।

মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদফতর
এখানেও সরকারি দলের বাইরে কাজ পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সিন্ডিকেটের বাইরে কেউ এখানে টেন্ডার জমা পর্যন্ত দিতে পারে না। সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকার টেন্ডারকে কেন্দ্র করে তেজগাঁওয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সংলগ্ন সরকারি মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদফতরে (বিজি প্রেস) হামলা এবং কর্মচারীদের মারধরের ঘটনা ঘটেছে। ছাত্র নামধারী ঠিকাদার রফিকুল ইসলাম ও শরফুল ইসলামের নেতৃত্বে যুবলীগ পরিচয় দেয়া একদল সন্ত্রাসী এ হামলা চালায়। গত বছরের ১৬ জুন সকাল ১০টায় তেজগাঁও মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ে রফিকুল ইসলাম ও শরফুল ইসলামের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী হামলা চালায়। সন্ত্রাসীরা অধিদফতরের কর্মচারী মুহিবুল ওয়াহাব জাফরিকে বেধড়ক মারধর করে। শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে সহকারী পরিচালক আইয়ুবকে। ওইদিনই তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। এজাহারে বলা হয়েছে, মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদফতর কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি কাগজ ও কম্পিউটার কেনার জন্য ৩৫০ কোটি ১৮ লাখ টাকার টেন্ডার আহ্বান করে। দরপত্র অনুযায়ী ঠিকাদারদের শিডিউল গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় কর্তৃপক্ষ ১৫ জুন তা বাতিল করে দেয়। দরপত্র বাতিলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই দুই নামধারী ঠিকাদার প্রকাশনা অধিদফতরে হামলা চালায়।

ডিসিসি
ঢাকা সিটি করপোরেশনে সাড়ে আট কোটি টাকার দুটি ঠিকাদারির কাজ নিয়ে গত বছর তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে। টেন্ডার শিডিউল জমা দেয়া নিয়ে সরকারদলীয় দুই গ্রুপের মধ্যে প্রায় এক ঘণ্টা সংঘর্ষ চলে। সংঘর্ষে একজন আহত হন। আহত ফজর আলী শাহবাগ ইউনিট আওয়ামী লীগের সভাপতি। সংঘর্ষের সময় দু’পক্ষই ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে নগর ভবনের পরিবেশ উত্তপ্ত করে তোলে।

কেসিসিতে টেন্ডারবাজি, ফের ২৫ কোটি টাকার কাজ ভাগবাটোয়ারা
এডিপির অর্থায়নে খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) খাল খনন প্রকল্পের প্রায় ২৫ কোটি টাকার কাজ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করা হয়। এই কাজে শিডিউল জমা দিতে গিয়ে উভয় গ্রুপের ঠিকাদারদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। একই দিন খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) রাস্তা ও ফুটপাত সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার কাজ কেসিসি ঠিকাদার কল্যাণ সমিতি ও মহানগর যুবলীগের নেতারা কাজ ভাগবাটোয়ারা করে নেয়। এর আগে গত ১৪ আগস্ট কেসিসির বৈদ্যুতিক তার, এনার্জি বাল্ব সরবরাহ ও ওয়াসার নলকূপের মালামাল ক্রয়, পাম্প মেরামত, ওয়াটার ফিল্টার ক্রয় করার জন্য এক কোটি টাকার কাজ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারার অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে মাসে চলতি অর্ধশত কোটি টাকার কাজ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভাগবাটোয়ারা করে নেয়া হয়েছে। এটাকে সরকারের শেষ মুহূর্তে নগর ভবনে টেন্ডারবাজির মহোত্সব মনে করা হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডে টেন্ডারবাজি
কলাপাড়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে জলবায়ু ট্রাস্ট ও সরকারি তহবিলের প্রায় সাত কোটি টাকার কাজ নির্বাহী প্রকৌশলীর যোগসাজশে একটি বিশেষ মহলসহ সরকারি দলের কিছু ঠিকাদারকে হাতিয়ে নেয়। টেন্ডারের ফরম কিনতে না পেরে ক্ষুব্ধ অন্য ঠিকাদারেরা নির্বাহী প্রকৌশলীকে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছে। এদিকে নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) খালকাটা ও বেড়িবাঁধ মেরামত কাজের টেন্ডারের কাগজপত্র জমা দিতে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীদের হামলায় ঠিকাদার জাহাঙ্গীর মোল্লা (৫৫) আহত হয়েছেন। তাকে নড়াইল সদর হাসপাতালে ভর্তি করা করেছে।
গতকাল বুধবার (১৯ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ৯টায় পানি উন্নয়ন বোর্ড চত্বরে ছাত্রলীগ নড়াইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সৌমেন চন্দ্র বসু, শ্রমিক লীগ নেতা খন্দকার মাশরুর বিল্লাহ নেনু ও যুবলীগের বুরহানের নেতৃত্বে প্রায় ৫০ জন ছাত্র ও যুবলীগ নেতাকর্মী ঠিকাদার জাহাঙ্গীর মোল্লার কাগজপত্র ছিনিয়ে নিয়ে তাকে ধাওয়া করেন। ঠিকাদার জাহাঙ্গীর মোল্লা পাউবো অফিসসংলগ্ন নড়াইল প্রেসক্লাব চত্বরে এসে আত্মরক্ষা করেন।
সম্প্রতি লালমনিরহাটে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩ কোটি টাকার কাজে টেন্ডারবাজির ঘটনা ঘটেছে। জানা যায়, লালমনিরহাট জেলার তিস্তা নদীর চন্ডিমারী স্পার বাঁধের সংস্কার কাজের জন্য প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে একটি কাজ রাজস্ব খাত থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড করার উদ্যোগ নেয়। কাজটির জন্য চলতি বছর প্রাথমিক বরাদ্দ পাওয়া গেছে প্রায় ৪৩ লাখ টাকা। ফলে পানি উন্নয়ন বোর্ড গত বুধবার চন্ডিমারী বাঁধের সংস্কার কাজের জন্য টেন্ডার ড্রপিংয়ের দিন ধার্য করে। এ উপলক্ষে সকাল ৯টা থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অফিস চত্বরে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকলেও একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের সুবিধাভোগী টেন্ডারবাজদের কাছে যেন তারা অনেকটাই ছিল অসহায়। আর এ অবস্থার মুখে সাধারণ ঠিকাদাররা শিডিউল কিনেও ড্রপিংয়ের নির্ধারিত দিন তারা তাদের শিডিউল ড্রপিং করতে পারেনি।

বিদ্যুত্ ভবনে টেন্ডারবাজি, প্রবেশ করতে দেয়নি অনেক কোম্পানিকে
সম্প্রতি রাজধানীর আবদুল গণি রোডের বিদ্যুত্ ভবনে বিদ্যুত্ বিতরণ কর্তৃপক্ষের (ডিপিডিসি) প্রি-প্রিন্টার্স বিল ফর্ম এক কোটি ৪৪ লাখ টাকার টেন্ডারে মাত্র দুটি কোম্পানি ছাড়া আর কোনো কোম্পানিকে টেন্ডার জমা দিতে দেয়নি সরকারি দলের ক্যাডাররা।
টেন্ডারে অংশ নিতে অনেক কোম্পানির প্রতিনিধি এলেও এ দিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত টেন্ডার জমা দেওয়ার সময় থাকলেও দুষ্কৃতকারীদের বাধার মুখে ফিরে যায় সবাই।
কেবল মাস্টার্স সিমেক্স পেপারস লিমিটেড ও ইউনিসন পেপার প্রডাক্ট অ্যান্ড প্যাকেজিং নামক দুই কোম্পানি ছাড়া সকাল ১০টার পরে আর কোনো কোম্পানিকে ভেতরে প্রবেশই করতে দেয়া হয়নি।

রেলের টেন্ডার পেতে হলে ছাত্রলীগ-যুবলীগকে চাই
ছাত্রলীগ ও যুবলীগকে ম্যানেজ না করলে কোনো টেন্ডারে অংশ নেয়ার কথা কল্পনাও করা যায় না। গত পাঁচ বছর ধরে এমনই অবস্থা বিরাজ করছে রেলভবনে। সম্প্রতি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক শিশু ও এক যুবলীগ নেতা নিহত হয়েছেন। ওই দিন দুপুর পৌনে ১২টায় নগরীর কোতোয়ালি থানার সিআরবি এলাকায় সাত রাস্তার মোড়ে এই ঘটনা ঘটে। রেলের প্রায় দেড় কোটি টাকার তিনটি প্রকল্পের টেন্ডার জমা দেয়াকে কেন্দ্র করে এই সংঘর্ষ হয়। কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের অনুসারী ক্যাডারদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক সাইফুল আলম লিমন ও তার অনুসারী ক্যাডারদের মধ্যে ঘণ্টাব্যাপী এই সংঘর্ষে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
এদিকে দায়মুক্তি আইনকে ব্যবহার করে টেন্ডার ছাড়াই জ্বালানি ও বিদ্যুত্ খাতের বড় প্রকল্পগুলোর কাজ দেয়া হচ্ছে বিদেশি কোম্পানিকে। গত বছরের ৯ জানুয়ারি ভারতীয় কোম্পানি মান ইন্ড্রাস্ট্রিকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার গ্যাস সঞ্চালন পাইপ সরবরাহের কাজ দেয়া হয়।

টেন্ডারবাজরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে
বিভিন্ন সময় টেন্ডার সন্ত্রাসের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও পরে কার্যক্রম থেমে যায়। গত পাঁচ বছরে ক্ষমতাসীন দলের শুধু ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা খুনোখুনি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সংঘর্ষসহ একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ সময়ে ছাত্রলীগের সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনায় ১৭ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন দেড় হাজারের বেশি। এসব ঘটনার কয়েকটির বিচারকাজ চলছে, বাকি ঘটনার তদন্ত অদৃশ্য কারণেই হয়নি। এভাবে অধিকাংশের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে যাচ্ছে পর্দার অন্তরালে। এ কারণে পুলিশের সামনেই টেন্ডারবাজ অপরাধীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের ক্ষমতার কাছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও অনেকটা অসহায়। আবার কিছু দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তা তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদত দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এতে পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়া সরকারদলীয় ক্যাডারদের দখলেই থাকছে।


মোহাম্মদপুরে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথের নিরাপত্তা প্রহরী খুন

স্টাফ রিপোর্টার

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথের নিরাপত্তা প্রহরী এনামুল হককে (২১) কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। শনিবার রাতে এ ঘটনা ঘটে। গতকাল ভোরে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে। তবে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বুথ থেকে কোনো টাকা খোয়া যায়নি। কী কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, এনামুল হক মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের একটি এটিএম বুথে নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে চাকরি করতেন। তিনি এক বছর ধরে এই বুথের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। গতকাল ভোর ৬টার দিকে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের একটি টহল দল বুথের সামনের রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে পড়ে থাকতে দেখে। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে জরুরি বিভাগের চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিত্সকরা জানান, নিহত এনামুলের মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাত রয়েছে।
মোহাম্মদপুর থানার সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) রতন সরকার জানান, কী কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ব্যাংকের বুথ থেকে টাকা খোয়া যায়নি। বুথটিও অক্ষত অবস্থায় রয়েছে। এসআই রতন সরকার বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, রাত ২টা থেকে ভোর ৬টার মধ্যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। বুথে কোনো চক্র লুটতরাজ চালাতে এলে এনামুলের বাধা পেয়ে তাকে ছুরি মেরে হত্যা করতে পারে। তিনি বলেন, এ এলাকায় কয়েকটি ছিনতাইকারী চক্র রয়েছে। তারা কোনো অপরাধমূলক কাজ করতে গেলে এনামুলের বাধা পেয়ে তাকে আঘাত করে হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে। এছাড়া এনামুল হকের সঙ্গে কারও বিরোধের কারণেও এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে এ ব্যাপারে কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি। ময়না তদন্তের পর দুপুরে তার লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এনামুলের বাবার নাম আবদুর রশিদ। গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের তারাইল উপজেলার বাওলাবাড়ি এলাকায়। মোহাম্মদপুরে নবোদয় হাউজিং এলাকার একটি বস্তিতে সপরিবারে থাকতেন তিনি। এ ব্যাপারে থানায় একটি হত্যামামলা দায়ের করা হয়েছে।

Saturday, 5 October 2013

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসবেন বলে...

স্টাফ রিপোর্টার, খুলনা থেকে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে স্বাগত জানাতে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত প্রখর রোদের মধ্যে রাস্তার দু’ধারে দাঁড়িয়েছিল স্কুলপড়ুয়া কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। প্রচণ্ড গরমে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে শিক্ষার্থীরা। অনেককে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় শিক্ষক ও অভিভাবকরা কানাঘুষা করলেও কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পাননি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ উপেক্ষা করে পরীক্ষার সময় পরিবর্তন করে এবং ক্লাস বাদ দিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রখর রোদে দাঁড়িয়ে রেখে এভাবে মন্ত্রীকে স্বাগত জানানোর ফলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। গতকাল দুপুরে খুলনার বয়রাস্থ মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইনে এ ঘটনাটি ঘটে। আয়োজকরা জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের আগমনকে কেন্দ্র করে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইনে ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড ও রং-বেরঙের পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছিল। কেএমপির নতুন তিন থানা লবণচরা, হরিণটানা ও আড়ংঘাটার উদ্বোধন অনুষ্ঠানের জন্য। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর বয়রা পুলিশ লাইনে সকাল ১১টায় ওই তিন থানার ফলক উন্মোচন করার কথা থাকলেও তিনি উপস্থিত হন ১২টা ৪০ মিনিটে। তার আগমন উপলক্ষে মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইন স্কুলের মিডটার্ম পরীক্ষার সময় পরিবর্তন করে সকাল সাড়ে আটটা থেকে দশটায় করা হয়। পরীক্ষা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই শিক্ষার্থীদের পুলিশ লাইনের রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রাখা হয়। এদের মধ্যে দুপুর ১২টায় সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী রাবেয়া আক্তার ঝুমা প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে কেএমপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় সহপাঠীরা অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়ে। এ ব্যাপারে স্কুলের প্রধান শিক্ষক তরিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, মিডটার্ম পরীক্ষা থাকার কারণে বাচ্চারা অনেকেই সকালে না খেয়ে আসছে। তাই দুর্বলতায় সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র ঝুমা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। মেট্রোপলিটন পুলিশের পরিচালিত স্কুল হওয়ার কারণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকা আমাদের নির্দেশ ছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর খুলনার বয়রা পুলিশ লাইনে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ আয়োজিত নবগঠিত লবণচরা, হরিণটানা এবং আড়ংঘাটা থানার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে। কেএমপি কমিশনার মো. সফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে সুধী সমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান। বক্তৃতা করেন খুলনা চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রি-এর সভাপতি কাজী আমিনুল হক ও পুলিশিং কমিটির সভাপতি লিয়াকত আলী। এ সময় অন্যদের মধ্যে সংসদ সদস্য ননী গোপাল মণ্ডল, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. ফায়েকুজ্জামান, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আলমগীর, খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক শেখ হারুনুর রশিদ, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা রশিদী সুজা, পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (ফাইন্যান্স) আবুল কাশেম, খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি, বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি, খুলনা জেলা প্রশাসক এবং খুলনা পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বেপরোয়া দুর্নীতির উপাখ্যান- ৫ : কালো বিড়ালের পাঁচালি

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েই বলেছিলেন, ‘ভাঙা রেলের চাঙ্গা মন্ত্রী আমি; আমি রেলওয়ের কালো বেড়াল খুঁজে বের করবো।’ ২০১১ সালের ২৮ নভেম্বর মন্ত্রী হওয়ার পর মাত্র ১৪১ দিনের মাথায় সেই ‘কালো বিড়াল’ কলঙ্কের দায় নিয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এর নেপথ্যে ছিল রেলওয়েতে জনবল নিয়োগে বড় ধরনের বাণিজ্য। ২০১২ সালের ৯ এপ্রিল রাতে সুরঞ্জিত সেনের বাসায় যাওয়ার পথে ৭০ লাখ টাকা ভর্তি বস্তাসহ মন্ত্রীর এপিএস ওমর ফারুক তালুকদার ও রেলওয়ের দুই কর্মকর্তা আটক হওয়ার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পদত্যাগে বাধ্য হন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। একই সময় প্রকাশ হয়ে পড়ে ৫ কোটি টাকায় ছেলের মালিনাকানাধীন সেনগুপ্ত টেলিকমের নামে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি থেকে আইসিএক্স লাইসেন্স নেয়ার খবর। সব মিলিয়ে কালো বিড়ালের পাঁচালি চলছে প্রায় দু’বছর জুড়ে। এত সমালোচনা ও রেলপথ মন্ত্রণালয় ছেড়ে যাওয়ার পরও দমে যাননি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। বিভিন্ন ব্যক্তি ও দলের সমালোচনায় প্রায় প্রতিদিনই উপদেশ ঝেড়ে চলেছেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১২ সালের ১১ এপ্রিল রেলওয়ের নিয়োগবাণিজ্যের কমিশন হিসেবে মন্ত্রীর বাসায় যাওয়ার পথে ৭০ লাখ বা তারও বেশি টাকাসহ গভীর রাতে ঢাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) হাতে ধরা পড়েছে মন্ত্রীর এপিএস ওমর ফারুকের গাড়ি। যাতে জাতীয় সংসদের স্টিকার সাঁটা ছিল। এ সময় ওই গাড়িতে ফারুকের সঙ্গে ছিলেন রেলওয়ের জিএম (পূর্বাঞ্চল) ইউসুফ আলী মৃধা এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তা রেলওয়ের কমান্ডেন্ট এনামুল হক।
মন্ত্রীর এপিএস ওমর ফারুক তালুকদার ও রেলের জিএম বিজিবির কাছ থেকে সুরঞ্জিতের তদবিরে ছাড়া পান। এর কিছুক্ষণ পরই সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সংবাদ সম্মেলন করে জানান, ওই টাকার মালিক তার এপিএস। তিনি এপিএসের গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-চ-১৩-৭৯৯২) চালককে এ ঘটনার জন্য দায়ী করে বলেন, ওমর ফারুক ব্যক্তিগত টাকা নিয়ে বাসায় যাওয়ার সময় চালক আজম খান তাকে অপহরণ করে।
টাকা আটকের সময়কালে রেলওয়েতে ওয়েম্যান, নাম্বার টিকার, খালাসি, জুনিয়র অডিটরসহ বিভিন্ন পদে সাড়ে ৭ হাজার পদে নিয়োগবাণিজ্য চলতে থাকে। প্রত্যেক চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে এক থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেয়া হয়। এ ঘুষের টাকা বণ্টন চলছিল সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে। ঘুষের টাকা সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার ইউসুফ আলী মৃধা ও পশ্চিমাঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার তোফাজ্জেল হোসেন। কিন্তু মন্ত্রী ও এপিএসের বেশুমার দুর্নীতি পছন্দ করেননি চালক আজম খান। তিনি ঘুষের টাকা বহনে অস্বীকৃতি জানান। ঘটনার দিন আজম খান ঘুষের টাকা বহনকারী গাড়ি নিয়ে পিলখানায় ঢুকে পড়েন। প্রবেশের পরই গেটে দায়িত্ব পালনকারী বিজিবি সদস্যরা অস্ত্র তাক করে গাড়িটি ঘিরে ফেলে পিলখানার ভেতরে নিয়ে যায়। ওমর ফারুক ও ইউসুফ আলী ও এনামুল হককে সদর দফতরের মূল গেটেই আটক রাখা হয়। গভীর রাতে আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার জন্য জব্দ করা মোবাইল ফেরত দেয়া হলে ওমর ফারুক ও ইউসুফ আলী মৃধা বিষয়টি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানান। একই সঙ্গে তাদের ছেড়ে দেয়ার জন্য বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে আপস মীমাংসার চেষ্টা চালান। কিন্তু ঘটনাস্থলে বিজিবির নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা ‘ফিল্ড সিকিউরিটি’সহ অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য উপস্থিত থাকায় মীমাংসা করা সম্ভব হয়নি। সারারাত তাদের পিলখানায় আটক রাখা হয়। কর্মরত বিজিবি সদস্যরা বিষয়টি তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান। তারা আটকদের সংশ্লিষ্ট থানায় সোপর্দ করার প্রাথমিক সিদ্ধান্তও নেন। কিন্তু রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপে তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হন বিজিবি সদস্যরা।
ঘটনার পরই রেলমন্ত্রীর এপিএস ওমর ফারুক নাটক সাজিয়ে বলেন, ওই টাকা তার শ্যালক লন্ডন থেকে পাঠিয়েছে। চালক আলী আজম তাদের অপহরণ করার উদ্দেশ্যে বিজিবি সদর দফতরে প্রবেশ করেছে। ১০ এপ্রিল দুপুরে রেল ভবনে সংবাদ সম্মেলন করেন রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি বিজিবির হাতে দুই কর্মকর্তা রাতভর আটক থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ওই টাকার মালিক এপিএস ওমর ফারুক। যদিও এর কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি বলেছেন, কিসের টাকা, তা আমি জানি না। সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেন, সোমবার গভীর রাতে টাকা নিয়ে বাসায় যাওয়ার সময় ওমর ফারুকের চালক তাকে অপহরণের চেষ্টা করে। এ সময় ভয়ে জীবন বাঁচাতে তিনি বিজিবি সদর দফতরের ভেতরে প্রবেশ করেন।
ঘুষের টাকার অংক নিয়ে শুরুতেই ধূম্রজাল তৈরি হয়। আটক হওয়া গাড়ি থেকে ৭০ লাখ, নাকি ৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে—তা নিয়ে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়। ওমর ফারুক বলেন, গাড়িতে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা ছিল। তবে বিজিবির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ওই গাড়ি থেকে ৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু মুচলেকা দিয়ে পিলখানা থেকে ছাড়া পাওয়ার সময় ৭০ লাখ টাকার কথা প্রকাশ করা হয়। বাকি ৪ কোটি টাকা কোথায় গেছে—তার হদিস পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে ৭০ লাখ টাকা এপিএস ওমর ফারুকের মার্কেন্টাইল ব্যাংক ধানমন্ডি শাখায় জমা রাখা হয়। পরে ওই টাকা একই ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় স্থানান্তর করা হয়।
শেষবেলায় মন্ত্রী হলেও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ঘুষ ও কমিশনবাণিজ্যে অত্যন্ত পারদর্শিতার পরিচয় দেন। তার সময় রেলওয়েতে অন্তত দেড়শ’ কোটি টাকা নিয়োগবাণিজ্য চলে। বড় অংকের জনবল নিয়োগ দিতে দিয়ে বিশাল অঙ্কের টাকার ঘুষ লেনদেন হয়। রেল মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পদ থেকে মধ্যমসারির কর্মকর্তাদের অনেকেই ওই টাকার কমিশন পেয়েছেন। বহু চাকরিপ্রার্থী মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দিয়েও চাকরি পাননি। সারাদেশে ৬৫ ক্যাটাগরিতে ৭ হাজার ২৭৫ শূন্যপদে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছিল। কালো বেড়াল কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার আগে এক হাজার ৭৭৬ জনকে নিয়োগপত্র দেয়া হয়েছে।
পরবর্তীতে ইউসুফ আলী মৃধার গাড়িচালকসহ অন্যরা স্বীকার করেছেন, চট্টগ্রাম থেকে দুটি চটের বস্তায় করে ওই টাকা এনেছিলেন পূর্বাঞ্চলীয় জিএম ইউসুফ আলী মৃধা। কিন্তু টাকার বিষয়টি তিনি গোপন করে বলেছিলেন বস্তায় কাঁঠাল এনেছেন। বিজিবির হাতে টাকাসহ আটক হওয়ার পর প্রথমে রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত তার এপিএস ফারুকের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন। কিন্তু পরে অবস্থা বেগতিক দেখে ওই অবস্থান থেকে সরে গিয়ে ঘটনার পরদিন ২০১২ সালের ১২ এপ্রিল তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। রেলের অর্থ কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পর ২০১২ সালের ১৬ এপ্রিল বহুল ‘কালো বিড়াল’ কেলেঙ্কারির দায় মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেন রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। কিন্তু অর্থ কেলেঙ্কারির দায় মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করার পরও মন্ত্রীর পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে তাকে শুধু রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। পরদিনই তাকে দফতরবিহীন মন্ত্রী করার ঘোষণা দেয়া হয়। রেলমন্ত্রী পদত্যাগের পর ২০১২ সালের ১৩ মে সুরঞ্জিতকে ‘নির্দোষ’ ঘোষণা করে রেলওয়ের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি। ওই ঘোষণার ৩ দিনের মাথায় ১৬ মে মন্ত্রী তার ঝিগাতলার বাসায় সংবাদ সম্মেলন করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার ঘোষণা দেন এবং ওইদিনই পতাকাবাহী গাড়িতে নির্বাচনী এলাকা সিলেটে যান। তারপর থেকেই সুরঞ্জিত দফতরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং ভূঁইফোঁড় সংগঠনের সভা-সমাবেশ ও আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে আসছেন।

শিরোনামে সুরঞ্জিত
১১ থেকে ১৮ এপ্রিল টানা এক সপ্তাহের বেশি দেশের সবকটি জাতীয় দৈনিকের শিরোনামে ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও রেলওয়ের নিয়োগ কেলেঙ্কারির খবর। নিয়োগ কেলেঙ্কারি প্রকাশ করে ১১ এপ্রিল ২০১২ দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ছিল—‘কালো বিড়াল এখন জিপে’। একইদিন দৈনিক আমার দেশ-এর শিরোনাম ছিল ‘রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিতের এপিএস ৭০ লাখ টাকাসহ আটক, মন্ত্রীর চাপে দুপুরে বিজিবি ছেড়ে দেয়, গভীর রাতে মন্ত্রীর বাসায় যাচ্ছিলেন, মন্ত্রী বললেন টাকার মালিক এপিএস, এপিএস বললেন, তার শ্যালক।’ একই তারিখে দৈনিক প্রথম আলোর শিরোনাম ছিল ‘রেলমন্ত্রীর এপিএসের গাড়ি হঠাত্ পিলখানায়’। ওই তারিখে কালের কণ্ঠর শিরোনাম ছিল—‘টাকার বস্তাসহ সুরঞ্জিতের এপিএস ধরা’। একই পত্রিকার অপর শিরোনাম ছিল—‘চট্টগ্রাম থেকে ঘুরে ওই টাকা এনেছিলেন জিএম’। একই পত্রিকার অপর একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘এপিএস কোথায় কী করেছে, জানার দায়িত্ব আমার নয়’। এভাবে দেশের সবগুলো জাতীয় দৈনিকের প্রধান শিরোনাম ছিল সুরঞ্জিতের বাসায় যাওয়ার সময় মোটা অংকের টাকাসহ এপিএস ফারুক ও রেলওয়ের দুই কর্মকর্তার আটক হওয়ার খবর।
পরদিন দৈনিক প্রথম আলোর শিরোনাম ছিল—‘অভিযোগের তীর সুরঞ্জিতের দিকে, টাকার থলে নিয়ে মন্ত্রীর বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা, এপিএস বরখাস্ত’। ১২ এপ্রিল ২০১২ দৈনিক প্রথম আলো তাদের সম্পাদকীয়তে—‘রেলমন্ত্রীর এপিএসের গাড়িতে টাকা, বিচার বিভাগীয় তদন্ত হোক’ শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। ওইদিন আমার দেশ-এর সম্পাদকীয় ছিল—‘রেলমন্ত্রীর এপিএসের গাড়িতে বস্তাভর্তি টাকা, ‘কালো বেড়াল’ বেরিয়ে পড়েছে’। ১২ এপ্রিল কালের কণ্ঠর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—‘রেলওয়ের নিয়োগবাণিজ্য, ঘুষের টাকা পৌঁছে দিতে ৯ সদস্যের টিম’। অপর শিরোনাম ছিল—‘টাকার বস্তা যাচ্ছিল সুরঞ্জিতের বাসায়’। ওই সংবাদে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে সাড়ে তিন হাজার পদে নিয়োগের ১৫০ কোটি টাকার ঘুষবাণিজ্যের বিশদ তথ্য তুলে ধরা হয়। ১৩ এপ্রিল ২০১৩ দৈনিক আমার দেশ-এর প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘বিপদে পড়েছি, তীর আমার দিকে’। ওইদিন প্রথম আলোর শিরোনাম ছিল—‘তিনজনই (মন্ত্রীর এপিএস ওমর ফারুক তালুকদার, রেলওয়ের জিএম (পূর্বাঞ্চল) ইউসুফ আলী মৃধা এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তা রেলওয়ের কমান্ডেন্ট এনামুল হক) বলেন, গাড়িটি মন্ত্রীর বাসায় যাচ্ছিল’। একইদিন প্রথম আলোর অপর শিরোনাম ছিল—‘বিপদে আছি, এটা গণতন্ত্রের বিপদ’। একই তারিখে দৈনিক সমকাল জানায়—‘৭০ লাখ টাকা ফারুকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকে জানানো হয়েছে’। ওইদিন মানবজমিন-এর শিরোনাম ছিল—‘স্যার আর ১০ মিনিট লাগবে’। ওই খবরে বলা হয়েছে, টাকার জন্য অপেক্ষমাণ মন্ত্রী রাত ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিটের মধ্যে ১০ বার ফোনে কথা বলেন। ১৩ এপ্রিল দৈনিক আমার দেশ-এর শিরোনাম ছিল—‘সুরঞ্জিতপুত্র সৌমেনের নামে ৫ কোটি টাকার আইসিএক্স লাইসেন্স’। পরদিন একই পত্রিকার শিরোনাম ছিল—‘সেনগুপ্ত টেলিকমের টাকার উত্স নিয়ে প্রশ্ন’। ১৫ এপ্রিল ২০১২ দৈনিক আমার দেশ-এর শিরোনাম ছিল—‘সুরঞ্জিতের অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেন! এপিএস ফারুক চাকরিচ্যুত, অ্যাকাউন্ট জব্দ, জিএম মৃধা ও কমান্ড্যান্ট এনামুল সাসপেন্ড, রেলের সাড়ে সাত হাজার নিয়োগ স্থগিত’। ওইদিন প্রথম আলোর শিরোনাম ছিল—‘রেলের অর্থ কেলেঙ্কারি : চাকরি গেল দুই কর্মকর্তার, তদন্ত কমিটির সামনে জিএম, তারা সেদিন মন্ত্রীর বাসাতেই যাচ্ছিলেন’। ১৬ এপ্রিল ২০১২ দেশের প্রায় সবকটি দৈনিকের শিরোনাম ছিল মন্ত্রী সুরঞ্জিতের পদত্যাগ। ওইদিন আমার দেশ-এর শিরোনাম ছিল—‘সুরঞ্জিতের পদত্যাগ, সরকার ও দলের বোঝা হতে চাই না, বিষ খেয়ে আমি নীলকণ্ঠ হতে চাই’। ওইদিন প্রথম আলোর শিরোনাম ছিল—‘মন্ত্রিত্ব ছাড়লেন সুরঞ্জিত, রাজনীতিতেও যাত্রাবিরতি’। ১৮ এপ্রিল প্রথম আলোর শিরোনাম ছিল—‘পদত্যাগের পর সুরঞ্জিত এখন দফতরবিহীন মন্ত্রী’। ওই তারিখে ইত্তেফাক-এর শিরোনাম ছিল—‘সুরঞ্জিত দফতরবিহীন মন্ত্রী, চাপ সামলাতে পারল না সরকার’। ওই তারিখে দৈনিক যুগান্তর-এর শিরোনাম ছিল—‘পদত্যাগের ত্রিশ ঘণ্টা পার, সুরঞ্জিত দফতরবিহীন মন্ত্রী’। ওই তারিখে দৈনিক আমার দেশ-এর শিরোনাম ছিল—‘সুরঞ্জিতের মন্ত্রিত্ব নিয়ে সার্কাস, দফতরবিহীন মন্ত্রী করলেন শেখ হাসিনা, প্রতিবেশী দেশের হস্তক্ষেপের খবরে তদন্তে জনগণের আস্থা থাকবে না’।
এরপরও ধারাবাহিকভাবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও রেলের নিয়োগ কেলেঙ্কারি জাতীয় দৈনিকগুলোর শিরোনাম হতে থাকে। ২৫ এপ্রিল (২০১২) দৈনিক আমার দেশ-এর শিরোনাম ছিল—‘চট্টগ্রাম থেকে টাকা নিয়ে আসেন জিএম মৃধা, ৭০ লাখ টাকার বস্তা সুরঞ্জিতকে দিতেই তার বাসায় যাচ্ছিলেন’। ২৬ এপ্রিলের শিরোনাম ছি—‘দুদকে মৃধার গাড়িচালক মোখলেসকে জিজ্ঞাসাবাদ, কাঁঠালের কথা বলে টাকার বস্তা নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পৌঁছান জিএম মৃধা’। একই তারিখে সমকাল-এর শিরোনাম ছিল—‘রেলের অর্থ কেলেঙ্কারি, কাঁঠালের বস্তায় কি ছিল’? ২৭ এপ্রিল আমার দেশ-এর শিরোনাম ছিল—‘দুদকের জবানবন্দি শেষে স্বীকারোক্তি, ৫ কোটি টাকার আইসিএক্স লাইসেন্সে সৌমেনের বিনিয়োগ মাত্র ৬০ হাজার’! ৩০ এপ্রিলের (২০১২) শিরোনাম ছিল—‘সুরঞ্জিতের ঘুষ কেলেঙ্কারি, এপিএসসহ তিন কর্মকর্তার অবৈধ সম্পদের প্রমাণ পেয়েছে দুদক’। ওইদিন ইত্তেফাক-এর শিরোনাম ছিল—‘মৃধা, ফারুক ও এনামুলের বক্তব্যে গরমিল’। ১৪ মে (২০১২) মানবজমিন-এর শিরোনাম ছিল—‘রেলওয়েগেট কেলেঙ্কারি অসম্পূর্ণ প্রতিবেদন’। একই তারিখে আমার দেশ-এর শিরোনাম—‘ঘুষ কেলেঙ্কারি : সুরঞ্জিতকে নির্দোষ ঘোষণা করল রেলওয়ের তদন্ত কমিটি, নির্দোষ সার্টিফিকেট দিতে যাচ্ছে দুদকও’। ওই তারিখে যুগান্তর-এর শিরোনাম—‘রেলওয়ের অর্থ কেলেঙ্কারি, সুরঞ্জিতের সংশ্লিষ্টতা পায়নি তার গঠন করা তদন্ত কমিটি’। ১৭ মে কালের কণ্ঠর শিরোনাম—‘তদন্ত চলাকালেই নিজেকে নির্দোষ দাবি সুরঞ্জিতের, আবার রাজনীতিতে ফিরে যাব’। ১৭ মে দৈনিক আমার দেশ-এর শিরোনাম—‘রেল মন্ত্রণালয়ে ফেরার চেষ্টায় কালো বিড়াল, গণমাধ্যমকে দুষলেন সুরঞ্জিত’।

ঘুষের টাকায় আইসিএক্স লাইসেন্স
রেলমন্ত্রী থাকাকালে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ছেলের মালিকানাধীন সেনগুপ্ত টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেডের নামে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি একটি আইসিএক্স লাইসেন্স ইস্যু করে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী রেলওয়ের নিয়োগবাণিজ্যের ঘুষের টাকা দিয়েই ওই লাইসেন্স নিয়েছে সেনগুপ্ত টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেড। তারা বিটিআরসি থেকে একটি ইন্টারকানেকশন এক্সচেঞ্জ বা আইসিএক্স লাইসেন্স নেন। সেনগুপ্ত টেলিকমিউনিকেশনের মালিক সুরঞ্জিতের ছেলে সৌমেন সেনগুপ্ত। লাইসেন্সের জন্য সৌমেনকে বিটিআরসিতে জমা দিতে হয়েছে ৫ কোটি টাকা। রেলওয়ের ঘুষ কেলেঙ্কারি প্রকাশের দু’দিন পর সুরঞ্জিতের ছেলের প্রতিষ্ঠান সেনগুপ্ত টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেডের নামে এই লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। নতুন ইস্যু করা অত্যন্ত লাভজনক এই লাইসেন্স ও এর ফি বাবদ পরিশোধিত টাকার উত্স নিয়ে তৈরি হয় নানা প্রশ্ন। ওই সময় সুরঞ্জিত বলেন, ‘তার ছেলে একজন আইটি ইঞ্জিনিয়ার (প্রকৌশলী)। তিনি লাইসেন্স নিয়েছেন—এটা অনরেকর্ড, এতে লুকানোর কিছু নেই। বিটিআরসি অনেককেই লাইসেন্স দিয়েছে, সঙ্গে তার ছেলেকেও দিয়েছে। এতে দোষের কি আছে।’
ওই সময় লাইসেন্সের জন্য প্রদেয় ৫ কোটি টাকার উত্স নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। নির্বাচনী হলফনামায় তার বাত্সরিক আয়ের পরিমাণ ৫ কোটি টাকা পরিশোধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। নির্বাচনী হলফনামায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বার্ষিক আয় দেখিয়েছিলেন মাত্র ৭ লাখ টাকা। এর আগে সৌমেনস ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান অগ্নি সিস্টেম লিমিটেডে আইটি এক্সপার্ট হিসেবে কাজ করতেন। সৌমেন অগ্নি সিস্টেমে কাজ করার আগে আরও দুটি আইটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। তার সর্বশেষ বেতন ছিল মাসে সাকুল্যে ৫০ হাজার টাকা। গত ২০ অক্টোবর বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি আইজিডব্লিউ, আইআইজি, আইসিএক্সসহ বিভিন্ন লাইসেন্সের জন্য বিজ্ঞপ্তি জারি করে। ওই সময় সৌমেন চাকরি ছেড়ে দিয়ে ‘সেনগুপ্ত টেলিকমিউনিকেশন’ গঠন করেন। ওই প্রতিষ্ঠানটি বিটিআরসিতে একটি ‘আইসিএক্স’ লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে। লাইসেন্সের নির্ধারিত ফি বাবদ ৫ কোটি টাকা পরিশোধের পর গত বৃহস্পতিবার বিটিআরসি তার প্রতিষ্ঠানের নামে নতুন একটি লাইসেন্স ইস্যু করে। একজন সাধারণ চাকরিজীবী সৌমেন এত টাকা কোথায় পেলেন? কীভাবে পরিশোধ করলেন আইসিএক্স লাইসেন্স ফি’র ৫ কোটি টাকা? তাছাড়া আইসিএক্স অবকাঠামো তৈরিতে আরও অন্তত ৩০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। সেক্ষেত্রে ওই টাকা কীভাবে আসবে—এসব নিয়েও রয়েছে নানা রহস্য।
সেনগুপ্ত টেলিকমের নামে ৫ কোটি টাকার আইসিএক্স লাইসেন্সের টাকার উত্স সম্পর্কে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত শেষে অর্থ কেলেঙ্কারির দায় মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করা দফতরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ছেলে সৌমেন সেনগুপ্তকে নির্দোষ সনদ নিয়ে ওই অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়। অর্থ কেলেঙ্কারির ওই ঘটনায় সুরঞ্জিতের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে তদন্তের বিষয়টি আমলেই নেয়নি দুদক। ফলে অর্থ কেলেঙ্কারি প্রসঙ্গে দুদকের কাছ থেকে ‘বেকসুর খালাস’ পায় সুরঞ্জিত পরিবার। ওই সময় দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান জানান, নোটিশের প্রেক্ষিতে সৌমেন সেনগুপ্তের জবাব সন্তোজজনক হওয়ায় তার সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ পাঠানো হয়নি। তার জবাব সন্তোষজনক না হলে সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ দেয়া হতো। তাছাড়া সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় সৌমেনের বিষয়ে তদন্তে ইতি টানার বিষয়টি ইতোমধ্যে নথিভুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি সৌমেনকে চিঠির মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হবে।

আমলে নেয়নি দুদক
৯ এপ্রিল মধ্যরাতে অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনা অনুসন্ধান আমলে নিলেও সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সংশ্লিষ্টতা আমলে নেয়নি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের দাবি ছিল—সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সংশ্লিষ্ট থাকার বিষয়ে কোনো তথ্য-প্রমাণ না থাকায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের তদন্ত শুরু হয়নি। ৭০ লাখ টাকা উদ্ধারের বিষয়ে প্রাথমিক যে তদন্ত হয়েছে, তাতে সুরঞ্জিত জড়িত থাকার প্রমাণ নেই। এর নেপথ্য কারণ হিসেবে জানা গেছে, ওই সময় দুর্নীতি দমন কমিশনে আওয়ামীপন্থী হিসেবে পরিচিত একজন কমিশনার তার অভিযোগ আমলে নিতে দেননি। তারা দায়সারাভাবে নিয়োগ কেলেঙ্কারির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ৩ কর্মকর্তা মন্ত্রীর এপিএস ওমর ফারুক তালুকদার, রেলের পূর্বাঞ্চলের বরখাস্ত করা মহাব্যবস্থাপক ইউসুফ আলী মৃধা এবং রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ড্যান্ট এনামুল হক লিখিত ও মৌখিক জবানবন্দি এবং তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ আয়ের মামলা করেই দায়িত্ব শেষ করেছে।

চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন আজম খান
ঘটনার প্রায় ৬ মাস পর ২০১২ সালের ৬ অক্টোবর আরটিভিতে ড্রাইভার আলী আজমের একটি সাক্ষাত্কার প্রচার করা হয়। ওই সাক্ষাত্কারে আলী আজম বলেন, টাকা যাচ্ছিল সুরঞ্জিতের বাড়িতে। তার বক্তব্য—শুধু ওইদিনই নয়, এর আগেও বেশ কয়েকবার তার গাড়িতে করে মন্ত্রীর বাড়িতে ঘুষের টাকা নেয়া হয়েছে। বিষয়টি অপরাধ মনে করে দেন তিনি টাকাসহ গাড়ি বিজিবি সদর দফতরে ঢুকিয়ে ঘুষের টাকা বিজিবি সদস্যদের কাছে ধরিয়ে দিয়েছেন। সাবেক রেলমন্ত্রী ও বর্তমানের দফতরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএস ওমর ফারুকের গাড়িচালক আজম খান দাবি করেছেন, মাস ছয়েক আগে উদ্ধার হওয়া সেই ৭০ লাখ টাকা মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বাড়িতেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। রেলে নিয়োগের জন্য ঘুষ হিসেবে নেয়া হয়েছিল সেই টাকা। আজম খান জানান, রেলের জিএম ইউসুফ আলী মৃধা ও মন্ত্রীর এপিএস ফারুকের মধ্যে কন্টাক্ট হয়েছিল তারা মন্ত্রীকে ১০ কোটি টাকা দেবে। আর রেলে ৬০০০ লোক ঢোকাবে। আলী আজমের ভাষ্য, মেজর মশিউর রহমান নামে এক ব্যক্তি রেলের নিয়োগবাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। মেজর মশিউর ৩ কোটি টাকার চেক ফারুকের কাছে হ্যান্ডওভার করেছে বলে জানায়। ফারুক আরটিভির সাক্ষাত্কারে জানান, ‘আমি যখন গাড়িটা বিজিবির গেটের ভেতর ঢুকাইয়া ফেলি, তখন ফারুক সাহেব আমাকে টাকার লোভ দেখান। তিনি প্রথমে আমাকে ৫ লাখ টাকা, তারপর অর্ধেক টাকা দেয়ার কথা বলেন আমাদের ছাইড়া দাও। আমি রাজি না হওয়ায় বলেন, সব টাকা নিয়ে আমাদের ছাইড়া দাও। আমি বললাম, না, তাহলে তো আমি দুর্নীতি করতাছি। আমি এটাতে রাজি হই নাই।’
রেলের নিয়োগবাণিজ্যের মাধ্যমে পাওয়া ভাগের টাকাই সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ছেলে সৌমেন সেনগুপ্ত টেলিকম ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন বলে জানিয়েছেন এপিএস ওমর ফারুকের গাড়িচালক আজম খান। তিনি বলেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ছেলে সৌমেন সেনগুপ্তের টেলিকম ব্যবসার আলাপ তো আমার সামনেই হয়েছে। রেলের টাকা থেকে টাকাগুলো ওখানে দেয়া হয়েছে। সুরঞ্জিত সেন শুধু মন্ত্রী হিসেবে নন, সংসদীয় কমিটির সভাপতি থাকাকালে ব্যাপক দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন বলেও আজম খান দাবি করেন।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে বড় দুর্নীতিবাজ আখ্যায়িত করে আজম খান বলেন, ‘মেইন হচ্ছেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি প্রথমেই বলেছেন রেলের কালো বিড়াল ধরা হবে। আমি দেখছিলাম যে, তিনি নিজেই কালো বিড়াল বনে গেছেন। তিনি নিজেই বড় দুর্নীতিবাজ। আজম জোর দিয়ে আবারও বলেন, ‘সবচেয়ে বড় দুর্নীতিবাজ তো তিনিই। তিনি মন্ত্রী হয়ে একটি মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসেবে দুর্নীতি করলে দেশটা কীভাবে ভালো চলবে?’
সুরঞ্জিতের কালো বিড়াল কেলেঙ্কারি নিয়ে এখনও ব্যাপক সমালোচনা চলছে রাজনীতিসচেতন মানুষের মধ্যে। কালো বিড়াল প্যাঁচালি তাদের আলোচনার খোরাকও হয়েছে বটে!