Friday, 11 October 2013

ভূলুণ্ঠিত মানবাধিকার : মেয়াদজুড়েই গুম খুন গুপ্তহত্যা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড : বিরোধী দল ও মত দমনে রিমান্ডে নির্মম নির্যাতন : মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর ওপর আক্রমণ

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে ভুয়া মামলা, শ্যোন অ্যারেস্ট, রিমান্ড, গুম, খুন, গুপ্তহত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং মানবাধিকার সংস্থার ওপর আক্রমণের মধ্য দিয়েই বর্তমান ফ্যাসিবাদী সরকার মেয়াদ শেষ করতে যাচ্ছে। স্বৈরাচারী মহাজোট সরকারের এসব মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে আজ দেশে মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত এবং বিপন্ন। পাঁচ বছরে দেশে এমন বহু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার ভয়াবহতা বর্ণনা করলে শিউরে উঠতে হয়। সরকারের শুরু থেকেই পুরো মেয়াদজুড়ে বিরোধী নেতাকর্মীদের দমন-পীড়নে মিছিল-সমাবেশে নির্বিচারে চালানো হয় গুলি। গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধী মত দমনে স্বৈরতান্ত্রিক স্টাইলে ব্যবহার করা হয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে। বিরোধী দল ও মতের নাগরিকদের দমনে রিমান্ডের যথেচ্ছ ব্যবহার করছে সরকার। কোনো ধরনের অভিযোগ বা সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া কিংবা মামলা থাকলেও তদন্ত ও অনুসন্ধানের আগেই মাসের পর মাস রিমান্ডে রেখে নির্যাতন চালানো হচ্ছে বিরোধী মতের লোকদের ওপর। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশবরেণ্য আইনজীবীরা।
এ ব্যাপারে দেশবরেণ্য আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেছেন, আসামি গ্রেফতার ও রিমান্ডে নেয়ার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন করা হচ্ছে। একইসঙ্গে দেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইনও মানা হয়নি। এগুলো অন্যায় হচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মেনে চলা সরকার ও অধস্তন আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক। সরকার একজনকে গ্রেফতার করে নিম্ন আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাইছে আর আদালতও রিমান্ড মঞ্জুর করছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। এটা উচ্চ আদালতের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন। এতে আইনের শাসন ও মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, রিমান্ড মঞ্জুরের ক্ষেত্রে নিম্ন আদালত স্পষ্টভাবেই উচ্চ আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে চলেছে। নিম্ন আদালত উচ্চ আদালতের নির্দেশনাকে অবমূল্যায়ন করে মূলত সরকারের জুলুমের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন
করছে। স্বাধীন বিচার বিভাগের জন্য এটা বড়ই লজ্জার বিষয় এবং জাতির জন্য দুর্ভাগ্যের কারণ। রিমান্ড অস্ত্রটি সরকার এখন বিরোধী দল ও মতের নাগরিকদের দমনে ইচ্ছেমত ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেন খ্যাতিমান এ আইনজ্ঞ।
সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, রিমান্ড গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি চরম হুমকি। আগে মারাত্মক অপরাধীদেরই কেবল রিমান্ডে নেয়া হতো। এভাবে রাজনৈতিক কর্মীদের রিমান্ডে নেয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। এসব রিমান্ডের ঘটনা সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনার পরিপন্থী। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, সংবিধানে ৩৫(৪) অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে তার বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য বা সাক্ষী প্রদান করতে বলপ্রয়োগ করা যাবে না। এছাড়া হাইকোর্টের একটি জাজমেন্টে রিমান্ড নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। রায়ে বলা আছে, রিমান্ডে নিয়ে কাউকে বলপ্রয়োগ করা যাবে না। শারীরিক নির্যাতন করা তো দূরে থাক, আসামির কাছ থেকে জোর করে কোনো কিছু আদায় করা যাবে না। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় অনুমোদন করেছে। কিন্তু এখন রিমান্ডের নামে যা হচ্ছে, তা অনভিপ্রেত।
গুপ্তহত্যা ও গুমের কয়েকটি ঘটনা : ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের আমলে নতুন মাত্রায় প্রত্যাবর্তন ঘটেছে গুম এবং গুপ্তহত্যার। সরকারের যাত্রা শুরুর পর থেকেই গুপ্তহত্যা ও গুমের মিছিল ক্রমেই দীর্ঘ হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের সাড়ে চার বছরে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমসহ দেশে দেড় শতাধিক ব্যক্তি গুম-গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর গুম-হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলছে। কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। এখনও গুম হচ্ছে মানুষ। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনরা অসহায় হয়ে পথ চেয়ে আছেন। আদালত-আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মানবাধিকার সংস্থা, রাজনৈতিক নেতা, পত্রিকার অফিস থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে ধরনা দিয়েও স্বজনের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না। জানতে পারছেন না তাদের স্বজন বেঁচে আছেন, না মরে গেছেন। গুম হওয়া ব্যক্তিরা জীবিত না থাকলে তাদের অন্তত লাশ ফেরত চাইছেন স্বজনরা সংবাদ সম্মেলন করে। সে অধিকারটুকু থেকেও তারা আজ বঞ্চিত। আওয়ামী লীগ সরকারের পৌনে চার বছরে বিএনপির কেন্দ্রীয় দুই নেতাসহ দেড় শতাধিক ব্যক্তি গুম-গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছেন। দুবছর পার হলেও বিএনপি নেতা ও ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমের খোঁজ মেলেনি। একইভাবে গুম হলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক এমপি এম ইলিয়াস আলী। গুম হয়েছেন তার গাড়িচালক আনসার আলীও। শ্রমিক নেতা আমিনুল গুম হওয়ার ক’দিন পর তার লাশ উদ্ধার হয়েছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রশিবির নেতা ও সিলেট ছাত্রদলের দুই নেতাও গুম হয়েছেন। একের পর এক গুমের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। এছাড়াও গুমের তালিকায় রয়েছেন ছাত্রদল, যুবদল, শিবির নেতা, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও বিরোধী মতের মানুষ। এ তালিকায় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের কয়েকজন নেতাও রয়েছেন। গুম হওয়ার পর কারও লাশ পাওয়া যায় নদীতে, ডোবায়, জঙ্গলে ও ঝোপের মাঝে। তবে অনেকেরই খোঁজ পাওয়া যায়নি।
উল্লেখযোগ্য গুমের মধ্যে গত বছরের ১৭ এপ্রিল রাতে বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালক আনসার আলী বনানীর সিলেট হাউসের বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। গভীর রাতে বনানী ২ নম্বর রোডে সাউথ পয়েন্ট স্কুলের সামনে থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় তার গাড়ি উদ্ধার করে বনানী থানার পুলিশ। এ ব্যাপারে আদালতে একটি রিট করা হয়। ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর ইলিয়াস আলীকে খুঁজে বের করার আশ্বাস দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাস ও আদালতের নির্দেশের পরও ইলিয়াস আলীকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারেনি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা। অভিযোগ রয়েছে, ইলিয়াস আলীর ঘটনাটি এখন আর তদন্তই করছে না র্যাব-পুলিশ বা গোয়েন্দারা।
এদিকে বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম তিন বছরের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ।
গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি র্যাব পরিচয়ে আটক করে নেয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই মেধাবী ছাত্র আল-মোকাদ্দাস ও ওয়ালিউল্লাহর খোঁজ মেলেনি ৭ মাসেও। ঢাকায় ব্যক্তিগত কাজ শেষে হানিফ এন্টারপ্রাইজের গাড়িতে করে ক্যাম্পাসে ফিরছিলেন তারা। রাত সাড়ে ১১টায় রাজধানীর কল্যাণপুর বাস কাউন্টার থেকে ঝিনাইদহ-৩৭৫০ নম্বর গাড়ির সি-১ ও সি-২ সিটে বসে ক্যাম্পাসে আসার পথে রাত সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মাঝামাঝি সময়ে সাভারের নবীনগর পৌঁছালে র্যাব-৪-এর সদস্য পরিচয় দিয়ে গাড়িটি থামানো হয়। এ সময় র্যাবের পোশাক ও সাদা পোশাকধারী ৮-১০ ব্যক্তি গাড়িতে উঠে আল-মোকাদ্দাস ও ওয়ালিউল্লাহকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিয়ে যায় বলে তাদের আত্মীয়-স্বজনকে নিশ্চিত করেন গাড়িতে অবস্থানকারী যাত্রী এবং সুপারভাইজার সুমন। এরপর থেকে র্যাবের হাতে আটক দুই ছাত্রের কোনো সন্ধান পাচ্ছে না তাদের পরিবার। র্যাব তাদের আটকের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। সিলেট জেলা ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার আহমদ দিনারকে গত বছর ১ এপ্রিল র্যাব আটক করে গুম করেছে বলে অভিযোগ করেছে সিলেট জেলা বিএনপি। অন্যদিকে গত ১৩ আগস্ট সাভারের হেমায়েতপুর থেকে ৪ যুবককে র্যাব পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরা হলো—তুষার, মোহন, মিঠু ও মোস্তফা। আজও তাদের খোঁজ মেলেনি। এছাড়া বরিশাল নগরীর ২০ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি ফিরোজ খান কালুর খোঁজও মেলেনি। চট্টগ্রাম নগরীর ঈদগাহ এলাকার ভাড়া বাসার কাছ থেকে কালুকে জোরপূর্বক কে বা কারা একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন তার স্ত্রী আমেনা আক্তার দীপ্তি।
অপহরণের পর গুপ্তহত্যার শিকার যশোর জেলার ঝিকরগাছা থানা বিএনপি সভাপতি নাজমুল ইসলামের ঘটনায় দায়ের করা মামলাটিও পুলিশ সঠিকভাবে তদন্ত করছে না; উল্টো তদন্তের নামে পরিবারের সদস্যদের হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত বছর ১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকার বাংলামোটরে নিজ ব্যবসায়িক কার্যালয় থেকে বের হয়ে আর বাসায় ফিরে যাননি তিনি। পরে গাজীপুরের দক্ষিণ সালনা নামক স্থানে ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডের পাশে তার লাশ পাওয়া যায়। জানা গেছে, এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের করা মামলা এখন গোয়েন্দা বিভাগে স্থানান্তর করা হয়েছে। বরিশালের উজিরপুরের বিএনপি নেতা হুমায়ুন খান ঢাকার মলিবাগ থেকে সাদা পোশাকধারীদের হাতে আটকের পর দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে নিখোঁজ। ২০১০ সালের ২৩ নভেম্বর সকালে হুমায়ুন তার ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ঢাকার সূত্রাপুরের ৪৫/ক, ঢালকানগর ফরিদাবাদের নিজ বাসা থেকে মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় এক বাসায় যান। সেখান থেকে সাদা পোশাকের একদল লোক নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাকে আটক করে। এছাড়াও রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থেকে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে আটক করে নেয়া তিন যুবকের লাশ পাওয়া যায় গাজীপুর ও মুন্সীগঞ্জে। অন্যদিকে ধলেশ্বরী নদী থেকে উদ্ধার করা হয় ছাত্রদল নেতাসহ ৮ জনের লাশ।
অপরদিকে ২০১০ সালের ৮ নভেম্বর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানা বিএনপি সভাপতি ও করলডেঙ্গা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামকে র্যাব সদস্যরা গাজীপুর থেকে তুলে নিয়ে যায় বলে তার পরিবার অভিযোগ করেছে। গাজীপুর-জয়দেবপুর বাইপাস রোডের চৌরাস্তা এলাকা থেকে সাদা পোশাকধারী ৪-৫ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে তার গাড়ি থেকে জোর করে অন্য একটি গাড়িতে তুলে নেয়। এখন পর্যন্ত তার খোঁজ নেই। রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের আগারগাঁও এলাকার ৪১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি, তার মেয়েজামাই ও তার বন্ধু নিখোঁজ রহস্যের জট খোলেনি আজও। রাজধানীতে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা শামিম ও একইসঙ্গে চার বন্ধুর নিখোঁজ হওয়ার ৮ মাসেও খোঁজ মেলেনি। নিখোঁজ চারজন হলেন—পল্লবী এলাকার আবুল কালাম শেখ, আবুল বাশার শেখ, মিরপুরের আবদুর রহিম ও যাত্রাবাড়ীর ইস্রাফিল।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ১৫৬ জন গুম হয়েছে; যার মধ্যে ২৮ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে।
রিমান্ড : বিরোধী দল ও মতের নাগরিকদের দমনে রিমান্ডের যথেচ্ছ ব্যবহার করছে সরকার। কোনো ধরনের অভিযোগ বা সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া কিংবা মামলা থাকলেও তদন্ত ও অনুসন্ধানের আগেই দিনের পর দিন রিমান্ডে রেখে নির্যাতন চালানো হচ্ছে বিরোধী মতের লোকদের ওপর। রিমান্ড মঞ্জুর ও জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনাকে আমলেই নিচ্ছে না নিম্ন আদালতগুলো। রিমান্ড মঞ্জুরের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও অধস্তন আদালত তা প্রতিনিয়তই লঙ্ঘন করে চলেছে বলে অভিযোগ করেন মানবাধিকার সংগঠক ও বিশিষ্ট আইনজীবীরা। বর্তমান আমলে সাম্প্রতিককালে রিমান্ডে নির্যাতনের ঘটনায় আলোচনায় উঠে আসেন আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম, হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী, বিএনপি নেতা জয়নুল আবদীন ফারুক, আমান উল্লাহ আমান, বরকত উল্লাহ বুলু, শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসেনসহ আরও অনেকে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় শামীম রেজা নামের এক তরুণকে ৫ লাখ টাকা ঘুষ না পেয়ে রিমান্ডের নামে এক পুলিশ কর্মকর্তার বাসায় নিয়ে নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ করে তার পরিবার। একইভাবে বর্তমান সরকারের শাসনামলের শুরুতে সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এম ইউ আহমেদকেও গোয়েন্দা পুলিশ সেগুনবাগিচা থেকে আটক করে নিয়ে যায়। পরে ডিবি কার্যালয়ে নির্যাতনের ফলে তার মৃত্যুর অভিযোগ করে পরিবার।
বাবুনগরীর মতো একজন ধর্মীয় নেতাকে এত লম্বা সময়ের রিমান্ড এই প্রথম। অপরদিকে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেনের রিমান্ডের ঘটনা অনেকটা বিরল। ৫৩ দিনের এত দীর্ঘ রিমান্ডে অতীতে এভাবে কোনো ছাত্রসংগঠনের নেতাকে নিতে দেখা যায়নি। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ২০১০ সালে ১ জুন প্রথম গ্রেফতার করা হয় এবং রিমান্ডে নিয়ে পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়। এরপর গত ১১ এপ্রিল তাকে দ্বিতীয়বার গ্রেফতারের পর প্রথম দফায় দুটি মামলায় ১৩ দিনের রিমান্ডে আনে পুলিশ। রিমান্ডে নির্যাতন ও অনশনে তার অবস্থা খারাপ হলে তাকে রিমান্ড শেষ হওয়ার আগেই তড়িঘড়ি আদালতে হাজির করা হলে তিনি আদালতকে জানান, তাকে ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়েছে এবং তার হাত-পা ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। আদালত তাকে জেলে পাঠালে জেল কর্তৃপক্ষ তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে স্থানান্তর করে। সেখানে তাকে সিসিইউতে রাখা হয়। পরে সুস্থ হলে আবার কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এ বছর গ্রেফতারের পর গত রমজান মাসে তাকে দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে নেয়া হয়। একটি পত্রিকার সম্পাদককে নির্যাতনের এই নজির বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার সম্পাদক আদিলুর রহমানকে গত রোজার ঈদের পর ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে রিমান্ডে পাঠানো হয়। পরে হাইকোর্ট রিমান্ড বাতিল করে জেলগেটে বিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেনকে গ্রেফতার করে ৫৩ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। রিমান্ডে তার ওপর নির্যাতনের কারণে তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছেন না। পত্রিকায় প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, পুলিশ তাকে ডাণ্ডাবেড়ি পরানো অবস্থায় কোলে করে আদালতের এজলাসে নিয়েছে। দেলাওয়ারের স্বাস্থ্যের এ অবস্থায়ও পুলিশ পুনরায় রিমান্ড চাইলে আদালত রিমান্ড মঞ্জুর না করে চিকিত্সার নির্দেশ দেয়। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক মাওলানা শেখ নূরে আলম হামিদী জানান, নিউমার্কেট যাওয়ার পথে কাঁটাবন মসজিদে যান জুমার নামাজ আদায় করতে। নামাজের পর পুলিশ তাকে আটক করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের জঙ্গি আখ্যায়িত করে। রিমান্ডে নিয়ে চালায় নির্যাতন। ২৫ দিন কারাভোগের পর অবশেষে ব্রিটিশ সরকারসহ বিভিন্ন মহলের হস্তক্ষেপে মুক্তি পান তিনি।
সম্প্রতি বিএনপি কার্যালয় থেকে আটক ১৫১ নেতাকে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাদের একযোগে ৮ দিনের রিমান্ডে পাঠায়। ৫৪ ধারায় গ্রেফতারের পর কোনো মামলা বা অভিযোগ ছাড়াই ২০ নারীকে রিমান্ডে পাঠায় আদালত।
হাঁটুতে গুলি : ক্রসফায়ারে বুকে গুলিবিদ্ধ হলে নির্ঘাত মৃত্যু, আর হাঁটুতে কিংবা পায়ে গুলি লাগলে হয়তো বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রাণে বেঁচে গেলেও ক্ষতচিহ্ন নিয়ে কাটাতে হয় সারাটি জীবন। অনেকে পঙ্গুও হয়ে যায় চিরতরে। র্যাব ও পুলিশের ক্রসফায়ার নিয়ে আদালত ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো সোচ্চার হওয়ায় ভিন্ন কৌশল নিয়েছেন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। অভিযানের নামে সন্দেহজনক ব্যক্তিকে আটকের পর বৈধ অস্ত্র দিয়ে ছোড়া হয় গুলি। হাঁটুর নিচে অথবা পায়ে গুলি চালিয়ে তাকে অপরাধী বলে প্রচার করা হয়। র্যাব ও পুলিশের এই নতুন কৌশলে অপরাধী নিধন হবে বলে তাদের ধারণা। বর্তমান সরকারের আমলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের গুলিতে আহত ও পঙ্গু হয়েছেন কয়েকশ’ মানুষ। এসব গুলিবিদ্ধের মধ্যে বেশিরভাগই বয়সে কিশোর-তরুণ। তবে আটককৃত বা গুলিবিদ্ধ ভিকটিম পরিবারের দাবি, অভিযানের নামে নিরপরাধ ব্যক্তিকে আটকের পর অপরাধী সন্দেহে তাদের চোখ বেঁধে নির্জন স্থানে নিয়ে গুলি করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় আহতদের আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের সদস্যরা এ ধরনের বহু অভিযোগ করেছেন, যার প্রমাণ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সন্ত্রাসীদের দমনে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। বেপরোয়া অপরাধীদের গ্রেফতারে অভিযানে নেমে গোলাগুলি এবং গুলিবিদ্ধ হওয়ার অহরহ ঘটনা ঘটছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, সন্দেহ হলেই রাস্তা থেকে কোনো ব্যক্তিকে আটক করে পায়ে গুলি করে আহত করা হয়। সম্প্রতি এ ধরনের অনেক অভিযোগ আসছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গুলি করে ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজ বলেও চালিয়ে দেয়া হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে। তবে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিদের স্বজনরা আটক হওয়া ব্যক্তিকে নিরপরাধ বলে দাবি করেন। অনেক সময় পুলিশের হেফাজতে থাকাকালে ভিকটিম নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ করারও সুযোগ পায় না। তবে কয়েকটি ঘটনায় জানা গেছে, পুলিশ যাদের আটক করে ছিনতাইকারী বলে গুলি করেছে এর মধ্যে নিরপরাধ লোকের সংখ্যাই বেশি।
বিচারবহির্ভূত হত্যা : অধিকারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বছরে (২০১২) ৭০ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নামে অপহরণের পর ২৪ জনকে গুম করা হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও তথ্য কমিশন তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। মানবাধিকার কর্মীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে। অভিযুক্ত দুর্বৃত্তদের রাজনৈতিকভাবে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ২১ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ মওকুফ করেছেন রাষ্ট্রপতি। অধিকার জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে ২০১২ সালে দেশে ২৪ জনকে গুম করা হয়েছে। গুম হওয়ার পর কারো কারো ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায়। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদেরও অভিযোগ রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে। কিছু কিছুক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ধরে নিয়ে যাওয়ার পর প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে আটক ব্যক্তিকে জনসমক্ষে হাজির ও থানায় হস্তান্তর করেছে। গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে এম ইলিয়াস আলী ও গার্মেন্ট শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামও রয়েছেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৭০ জন। গুমের শিকার ব্যক্তিরাও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অধিকার জানায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি ২০০৯-এর ফেব্রুয়ারিতে জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের বৈঠকে বাংলাদেশে সব ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের অঙ্গীকার করেছিলেন। এ অঙ্গীকারের পরও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়নি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ফলে ৫৩ জন ক্রসফায়ারে, সাতজন নির্যাতনে ও আটজন গুলিতে নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে র্যাবের ক্রসফায়ারেই ৪০ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।
হেফাজতে নির্যাতন : দেশে ২০১২ সালে ৭২ ব্যক্তি বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে সাতজন নিহত হয়েছেন।
জেল হেফাজতে মৃত্যু : একই সময়ে জেল হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ৬৩ জনের। দেশের ৬৮ কারাগারের ধারণক্ষমতা রয়েছে ৩৩ হাজার ৫৭০ জনের। কিন্তু এসব কারাগারে বন্দি রয়েছে ৬৮ হাজার ৭০০ জন। বিনা চিকিত্সা, নিম্নমানের খাবার ও পানির অসুবিধাসহ বিভিন্ন কারণে বন্দিদের মানবাধিকার প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হচ্ছে।
অন্যদিকে ২০১১ সালে প্রকাশিত অধিকার-এর রিপোর্টে বলা হয়, বর্তমান সরকারের প্রথম তিন বছরে বিচারবহির্ভূত হত্যা অর্থাত্ ক্রসফায়ারে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ৩৬৫টি। এর মধ্যে রয়েছে ২০০৯ সালে ১৫৪টি, ২০১০ সালে ১২৭টি ও ২০১১ সালে ৮৪টি।
অধিকারের ওপর আক্রমণ : মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ গুম ও গুপ্তহত্যা নিয়ে তত্পর ছিল। এ বিষয়ে তারা প্রতিমাসেই অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করত। কিন্তু তাদের তত্পরতাও থামিয়ে দেয়া হয়েছে। সংগঠনের সম্পাদক অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান খানকে ডিবি পুলিশ হঠাত্ তুলে নিয়ে যায় বাসার সামনে থেকে। অনেকটা গুম হওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল। চারদিকে হৈচৈ পড়ে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চিত করে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এমনই এক পরিস্থিতি চলছে এখন দেশে।
গত ১০ আগস্ট পুলিশ কোনো পরোয়ানা ছাড়াই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগে অধিকার সম্পাদক আদিলুরকে আটক করে। নিম্ন আদালতে তার জামিনের আবেদন করা হলে আদালত তা নামঞ্জুর করে। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ গত মঙ্গলবার তাকে জামিন দেয়। সরকার তার জামিন ঠেকানোর জন্য আপিল বিভাগের চেম্বার জজের কাছে গেলে সেখানে অ্যাটর্নি জেনারেল উত্থাপিত জামিন বাতিলের আবেদন নাকচ হয়। গতকাল আদিলুর রহমান খান মুক্তি পান। তবে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হয়নি।

Malala: The real story (with evidence)

In September 2012, a 15-year-old school girl from Pakistan’s Swat valley was reported to have been shot in the face and head by a Taliban activist.
The attack caused outrage around the world and the news was given widespread coverage in the local and international media.
Malala was reported to have barely survived after doctors in Pakistan and then England performed multiple surgeries on her face and head.
Today Malala lives in the UK and has repeatedly vowed to continue working for the cause of women’s education in Pakistan, especially in those areas of the country where extremists and militant outfits are said to have been blowing up girls’ schools.
But this is just one side of the whole story. The narrative about what really happened on the day Malala was allegedly shot has mostly been weaved by the Western media.
In April this year, Dawn.com sent a group of its most seasoned reporters to Swat to undertake an intensive five-month investigation of the event. Their collective findings unearthed a series of some stunning disclosures (with evidence) that are bound to affectively challenge the mainstream narrative of the Malala story.
The following are the major findings of the investigation:
• Malala was not born in Swat and neither is she a Pushtun. A respected medical doctor in Swat, Imtiaz Ali Khanzai, who runs a private hospital and clinic in Swat told our reporters that he has a DNA report that proves that Malala is not Pushtun.
Showing us the report, he said he extracted Malala’s DNA when as a child she visited his clinic (with her parents) complaining of an earache.
“After she was supposedly shot last year, I remembered I had a bottle where I had kept some of her earwax,” the doctor explained. “Collecting earwax of my patients is a hobby of mine,” he added.
He went on to claim that according to the DNA, Malala is a Caucasian, most probably from Poland.
After the discovery, the doctor called Malala’s father and told him that he knew who Malala was. “
“He was stunned and began to stutter,” the doctor said. “He pleaded that I did not make my findings public. I told him I wouldn’t but only if he told me the whole truth.”
Malala’s father told the doctor that Malala’s real name was Jane and she was born in Hungary in 1997. Her real biological parents were Christian missionaries who, after traveling to Swat in 2002, left Malala as a gift to her adopted parents after they secretly converted to Christianity.
Dr. Khanzai’s DNA extraction kit
Dr. Khanzai’s DNA extraction kit
When our reporters asked the doctor why he was revealing Malala’s real identity now, he said he was convinced that Malala was planted in Swat by anti-Pakistan elements.
He then added that he can also prove that the young man who shot her was not a Pushtun either. “I have his earwax as well,’ he claimed.
After extracting the DNA of the shooter’s earwax, the doctor discovered that he was probably from Italy. He then invited our reporters to look at the man’s earwax under a microscope.
“Those tiny yellow bits that you see in the wax are bits of pizza,” he explained.
The doctor told us that in January 2012 he emailed his findings to some senior members of Pakistan’s intelligence agency, the ISI.
After a few days his clinic was raided by the police. He was in Saudi Arabia at the time collecting earwax samples of some members of the Saudi royal family. His staff at the clinic was harassed by the police who wanted to know where he kept the earwax samples.
Pizza?
Pizza?
In June this year, the doctor was visited by a young ISI officer who apologised to him about the police raid and told him that the ISI were well aware of Malala’s real identity. After much coaxing on our part, the doctor eventually gave us the cell phone number of the ISI officer.
However, the officer kept refusing to talk to us but finally relented on the condition that we refer to him as ‘Master X’.
Master X met one of our reporters at an abandoned girls’ school in lower Swat. To hide his face, the officer wore a Spiderman mask.
Talking to the reporter he said: “This had to come out one day. And I just couldn’t let myself continue to keep such a dangerous secret hidden. I am a true patriot.”
He then added: ‘My father once told me, ‘Peter, with great power comes great responsibility’.’
The officer
The officer
His revelations led us to our next shocking discovery (with evidence):
• Malala’s shooting was staged by intelligence agencies. The officer told the reporter that the whole shooting incident was a stunt planned by Pakistani and US agencies to pave the way for the Pakistani army’s invasion of North Waziristan: “It was all a drama,” he explained. “It was staged so the Pakistan army would have an excuse to invade North Waziristan.”
When asked why he was using the word ‘invasion’ when North Waziristan was a part of Pakistan, the officer replied: “North Waziristan is an autonomous Islamic Emirates. It has been like that for centuries. But our history books distort the facts and teach our children that it is part of Pakistan. The area has unimaginable amounts of oil, gold, copper, silver, bronze, coal, diamonds, gas and fossilised dinosaur remains underneath its rugged grounds. That’s what the Americans are after.”
Our reporter then asked whether he had any evidence to prove his claim.
The officer pulled out a few photographs and showed it to the reporter. The photographs showed a few bones. “Dinosaur bones,” he explained.
He added: “These were excavated in North Waziristan by the archaeology division of the Taliban. After they were studied by the geology division of the Taliban, it had traces of oil, gold, copper, silver, bronze, coal, diamonds and gas.”
One of the photographs showing dinosaur bones excavated from the grounds of North Waziristan.
One of the photographs showing dinosaur bones excavated from the grounds of North Waziristan.
What about the evidence proving that the shooting was staged by American and Pakistani agencies?
Pulling out a piece of paper, the officer said: “This is the evidence. It was decoded by the Taliban’s division of quantum physics.”
The paper had screen shots of a brief exchange of tweets on Twitter between one ‘Lib Fish’ and ‘Oil Gul.’
The officer said that Lib Fish was actually a CIA operative based in Qatar and Oil Gul was an ISI sleuth on Twitter based in Lahore. The exchange was intercepted and decoded by one ‘Tsunami Mommy’ who is based in Swabi in the Khyber Pakhtunkwa province in Pakistan and is an engineer by profession.
We are publishing the Twitter exchange between Lib Fish and Oil Gul that was provided to us by the officer:
@LibFish Yo, @OilGul, how goes life?
@OilGul Life’s kool, mate.
@LibFish @OilGul Any chance of visiting Qatar soon?
@OilGul @LibFish Haha. Soon after I’m done with my O level exams. They suck.
@LibFish @OilGul Haha. Yea, they do, don’t they?
The officer told us that Tsunami Mommy jumped in after he realised what was taking place:
@Tsunami_Mommy Agents! I know what you two do. Anti-Islam anti-Pakistan bastaaas. @OilGul @LibFish
@OilGul Dude, who are you? Why are you trolling us?
@Tsunami_Mommy Shup ut fake liberalz fascist agents IK is best you bastaaas NA250 rigging 1 billion fake liberalz votes anti-Pakistan anti-Islam inshallah Nya Bakistan tabdeeli …
The officer said he used famous Pakistani linguist and WW-II code-breaker, Mustansar Hussain Tarar, to decode the suspicious Twitter exchange and that is when he discovered that the CIA and the ISI were planning the fake shooting.
He also gave the reporter the manuscript of the book that Tsunami Mommy was writing on the shooting after piecing together the evidence (with evidence) provided by the doctor, the officer and Mustansar Hussain Tarar.
The book’s title will be ‘A Fake Shooting of a Fake Liberal by a Fake Liberal, You Bastaaas.’
Below is the brief summary of what the manuscript claims:
October 1, 1997: Malala is born to Hungarian parents in Budapest and named Jane.
October 4, 2002: The parents are recruited by the CIA and given a crash course in evangelical Christianity, hypnosis and karate.
October 7, 2003: They land in Pakistan and head for Swat posing as NGO workers. They get in touch with a low-level ISI agent, and convert the family to Christianity, leaving Jane with him. He changes her name to Malala and instils in her the fear of Jesus.
October 30, 2007: Malala starts to write a blog that asks the militants of Swat to put down their weapons, pick up a Bible and boogie.
October 21, 2011: The militants request her to stop writing her evangelical blogs and finish her homework instead.
October 1, 2012: CIA recruits a Pashtu speaking Italian-American loner (Robert) living in New York and gives him a crash course in gun-slinging and acting.
October 7, 2012: CIA shares plan of Malala’s fake shooting with the ISI. The ISI agrees and gives Malala and her parents a briefing.
October 11, 2012: The Italian-America arrives in Swat posing as an Uzbek homeopath.
The fake gunman moments before taking a flight to Pakistan.
The fake gunman moments before taking a flight to Pakistan.
October 12, 2012: Robert is given a gun that is loaded with blanks. He intercepts Malala’s school van and fires blanks at her. She pretends to be hit and squeeze opens a small pack of Mitchel’s Tomato Ketchup she is hiding in one of her hands and rubs the ketchup all over her face. A fake ambulance suddenly arrives on the scene and takes away Malala. The world is told that she was shot in the face and head by a Taliban fanatic.
The story that ran in the media quoted Malala’s friends in the van saying that the gunman asked for Malala and then shot her.
But the officer shared with us the testimony of one of Malala’s friends that was repressed by vested interests in the media.
According to the testimony, a man stopped the van and shouted (in Pashtu), ‘who is Jane … I mean, Jeanette … no, Alberta Joan Lucas?’
The girls looked at each other in confusion and the driver was about to drive away when the gunman pulled out a gun and started to shout: ‘Uno momento, un momento …’
Then looking at a girl he asked: ‘You lookin’ at me?’ At which Malala threw down her school bag and shouted (in Italian): ‘No you idiot, I AM lookin’ at you. Malala, Malala, remember? Fool.’
Saying, ‘Oh,’ he shot her (with the blanks).
• The girl that the media was shown in the hospital was not Malala. The officer shared with us some photographs to prove this. He first showed us a video (on his iPhone) that he shot hours after the shooting. It shows Malala joyfully bungee jumping on the hills near River Swat.
Malala bungee jumping hours after she was allegedly ‘shot.’
Malala bungee jumping hours after she was allegedly ‘shot.’
Then the officer informed us that the doctor had the earwax samples of the girl in the hospital. When we contacted the doctor again and asked what the samples proved he said that the DNA he extracted from the sample suggests that the girl in the hospital was not a girl at all. It was a pillow.
He said he had managed to sneak into the operating room (posing as a postman) and while he was secretly drawing out earwax from the girl’s ears, he managed to take a picture of the girl with his Nokia phone.
‘I came back and was shocked when I enlarged the picture,’ he said.
He then gave us a printout of the picture …
We believe there is now enough evidence for Pakistan and the international community to have a serious re-look at the Malala story and demand that the United Nations orders a full investigation into the matter.

—DISCLAIMER: The above article is a work of satire and fiction and in no way attempts to depict events in real life.

Thursday, 10 October 2013

পদ্মার অতলে জাতীয় মর্যাদা

শুধু বিগত সংসদ নির্বাচনেই নয়, এর আগের দুটি সংসদ নির্বাচনী ইশতেহারে পদ্মা সেতু ছিল আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার। ক্ষমতার শেষ বেলায় এসে এখনও পদ্মা সেতুর কাজই শুরু করতে পারেনি মহাজোট সরকার। প্রধানমন্ত্রী পরিবারসহ সরকারের প্রভাবশালীদের বেশুমার দুর্নীতিতে যেন পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে পদ্মা সেতু। দুর্নীতির অভিযোগে পদ্মা সেতু প্রকল্পের অর্থায়ন বাতিল করে দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের এখন নতুন পরিচিতি দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র। দেশে-বিদেশে পরিস্থিতি এমন হয়েছে, পদ্মার অতলে বিলীন হয়ে গেছে জাতীয় মর্যাদা। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পদ্মা কেলেঙ্কারি বহু আগেই স্থান করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। পদ্মা কেলেঙ্কারি নিয়ে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক, জাইকা, আইডিবি ও এডিবির সঙ্গে। কানাডার আদালতে অভিযুক্ত করা হয়েছে আওয়ামী সরকারের একজন প্রভাবশালী সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে। খোদ প্রধানমন্ত্রী পরিবারের প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকার অভিযোগ করেছে বিদেশি গণমাধ্যম। এর পরও পদ্মা নিয়ে মন্ত্রী-এমপিদের বাগাড়ম্বর থেমে নেই। দেশীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু করা, মালয়েশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করা, চীনের বিনিয়োগে পদ্মা সেতু করা, পদ্মা সেতুর চাঁদা নেয়ার জন্য ব্যাংকে ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে বাধ্য করা, চাঁদার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ কর্মী খুন ও স্কুলছাত্রদের টিফিনের টাকা থেকে পদ্মা সেতুর জন্য টাকা নেয়া, মোবাইল ফোনে প্রতি মিনিটে ২৫ পয়সা সার চার্জ আরোপ করার প্রস্তাবসহ হেন কাজ নেই যা এই পদ্মা নিয়ে হয়নি। কিন্তু তার পরও শুরু হয়নি পদ্মা সেতুর কাজ। বরং এই প্রকল্প দেশের কপালে পরিয়েছে দুর্নীতির কলঙ্ক তিলক।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০০১ সালের ৪ জুলাই তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাওয়া ঘাটে পদ্মা সেতুর নামমাত্র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করেছিলেন। বিগত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোট সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প ছিল এই সেতু। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে ১/১১-পরবর্তী কারসাজির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। ক্ষমতার মেয়াদ প্রায় শেষ, কিন্তু সেতু আর হলো না। বরং দুর্নীতির কারণে পদ্মা কেলেঙ্কারির অতলে হারিয়ে গেছে দেশের জাতীয় মর্যাদা ও ভাবমূর্তি সবকিছু। সেতু হয়নি তাতে কি! জমি অধিগ্রহণ, অ্যাপ্রোচ রোড তৈরি, ঠিকাদার নিয়োগ, কাজ তদারকির জন্য পরামর্শক নিয়োগ, দরপত্র ও আর্থিক মূল্যায়ন কমিটি গঠন আর ভাঙ্গায় সরকারি দলের প্রভাবশালীদের বেপরোয়া লুটপাট এই সেতু বাংলাদেশের কপালে পরিয়েছে কলঙ্কের তিলক। শুধু দেশেই নয়, বিদেশের মাটিতেও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির পরিচিতি পেয়েছে একটি দুর্নীতিপরায়ণ দেশ হিসেবে। অযোগ্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কানাডিয়ান কোম্পানি এসএনসি লাভালিনকে কাজ দেয়ার জন্য মোটা অঙ্কের কমিশন চাওয়া থেকে এই কেলেঙ্কারির সূত্রপাত। কাজের কাজ কিছুই হয়নি, কিন্তু সেতুকে ঘিরে সরকারের ব্যয় হয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি। পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য বিশ্বব্যাংক, জাইকা, আইডিবি ও এডিবির সঙ্গে চুক্তি, দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দিয়ে প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংকের সরে গেছে। মালয়েশিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশের অর্থায়নের গল্পও শুনিয়েছে সরকার। শুনিয়েছে, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার খবরও। পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের জন্য সারা দেশের প্রায় প্রতিটি ব্যাংকে বিশেষ অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। পদ্মা প্রকল্পের নামে সরকারি চাঁদাবাজি চলেছে দেশজুড়ে। প্রকল্পের জন্য তোলা টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা নিয়ে খুন হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা। সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার পরও বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন সরকারের ফরমায়েশমতো একটি লোকদেখানো তদন্ত করেছে। বিশ্বব্যাংকসহ দাতারা প্রকল্প থেকে সরে গেলেও পদ্মা নিয়ে মন্ত্রীদের বাগাড়ম্বর থেমে নেই। যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি বলেছেন, ‘পদ্মায় বসে জ্যোত্স্নার আলো দেখব সেদিন আর বেশি দূরে নয়।’ সেই আশায় গুড়ে বালি।
এর জন্য দায়ী কে। সমালোচকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী পরিবারের প্রভাবশালী এক সদস্য, মন্ত্রী পরিবারের ঘনিষ্ঠ সৈয়দ আবুল হোসেন, আবুল হাসান চৌধুরী, নিক্সন চৌধুরী, সেতু বিভাগের মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া ও কয়েকজন প্রকৌশলী বাঁচাতে গিয়েই ভেস্তে গেছে পদ্মা সেতু। প্রকৃত অপরাধীদের বাঁচিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের পরমায়েশি তদন্তে নাখোশ হয়ে ফিরে গেছে বিশ্বব্যাংকসহ দাতারা। এর আগে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেলও সৈয়দ আবুল হোসেনকে মামলায় আসামি করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। কিন্তু তাদের কোনো যুক্তি গ্রাহ্য করেনি দুর্নীতি দমন কমিশন।
দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মংলা বন্দরের সঙ্গে রাজধানীর দ্রুত যোগাযোগের পথ সুগম করবে পদ্মা সেতু। ২০০৩ থেকে ২০০৫ সালে পরিচালিত সম্ভব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়সম্বলিত প্রকল্পের প্রস্তাব ২০১১ সালের ২৪ আগস্ট অনুমোদিত হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর দ্রুত সেতুর কাজ শুরু করার জন্য নকশা প্রণয়ন শুরু হয়। এ সময় মূল সেতু, নদীশাসন ও অ্যাপ্রোচ সড়কসহ আনুষঙ্গিক নকশা চূড়ান্ত হয়। এই নকশার ভিত্তিতে ২ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়সম্বলিত সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব একনেক সভায় অনুমোদন হয়।
২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মূল সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে ২০১৩ সালের মধ্যে সমাপ্ত হওয়ার কথা ছিল। এখন ২০১৩ সাল শেষ হতে চলল, কিন্তু দুর্নীতির কারণে সেই প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। প্রস্তাবিত পদ্মা সেতু করার পরিকল্পনা ছিল চার লেনবিশিষ্ট। এর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার, প্রস্থ ২২ মিটার। প্রণীত নকশা অনুযায়ী সেতুটি হওয়ার কথা দ্বোতলা রেল ও সড়ক সেতু।
পদ্মা কেলেঙ্কারির খবর প্রথম ফাঁস হয় কানাডিয়ান পুলিশের কাছে বিশ্বব্যাংকের দেয়া একটি অভিযোগের ভিত্তিতে। ২০১১ সালের আগস্টে কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে কাজ পেতে নির্দিষ্ট অঙ্কের কমিশন (ঘুষ) দেয়ার বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ইন্টিগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্ট অভিযোগটি করেন। অভিযোগের তদন্ত শুরু হলে ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ বাংলাদেশে পদ্মা সেতুর দুর্নীতি তদন্তে কানাডার পুলিশ শিরোনামে একটি সংবাদ বিশ্বজুড়ে হৈ-চৈ ফেলে দেয়। ওই মাসেই তদন্তে নামে কানাডিয়ান পুলিশ। ২০১১ সালে ৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ২৯০ কোটি মার্কিন ডলারের পদ্মা সেতু প্রকল্পের আর্থিক অনিয়ম নিয়ে যে আন্তর্জাতিক তদন্ত শুরু হয়েছে, তাতে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারেন।
২০১১ সালের ১ সেপ্টেম্বর কানাডার পুলিশ টরেন্টো শহরের উপকণ্ঠে এসএনসি লাভালিনের অফিসে হানা দেয়। তারা সেখান থেকে কম্পিউটারসহ বেশ কিছু আলামত জব্দ করে এবং দুর্নীতির পক্ষে প্রমাণ পায়। ওই সময় জব্দ করা একটি ডায়েরিতে হাতে লেখা ‘পারসেন্টেজ টু বি অ্যালোটেড টু স্পেসিফাইড পারসন ইন কানেকশন উইথ দ্য অ্যাওয়ার্ড অব দ্য সিএসসি কন্ট্রাক্ট।’ ওই ডায়েরিতে সংক্ষিপ্ত নামে কিছু নির্দিষ্ট পার্সেন্ট উল্লেখ ছিল। তাদের মন্ত্রীর নামে ছিল চার শতাংশ।
২০১১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাংকের ইন্টিগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্সির পক্ষ থেকে পদ্মা সেতু প্রকল্পে সরকারের প্রভাবশালী একটি অংশ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের কমিশন চাওয়ার অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দেয়া হয়েছিল। যার একটি অনুলিপি তদন্তের জন্য দুদক চেয়ারম্যানকেও দেয়া হয়। ওই চিঠিতে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও তার প্রতিষ্ঠান সাকোর ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক সাকোকে কমিশনের (ঘুষ) ভিত্তিতে এজেন্ট নিয়োগের জন্য চাপ দেয়ার প্রমাণসহ অভিযোগ ছিল।
বিশ্বব্যাংকের দাবি ও দেশজুড়ে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ এবং মেরামতে নজিরবিহীন ব্যর্থ্যতার কারণে সৈয়দ আবুল হোসনেক যোগাযোগমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে তথ্য-যোগাযোগ ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে নেয়া হয়। ওই সময় সৈয়দ আবুল হোসেনের অভিযোগ অনুসন্ধান করতে থাকে দুদক। এক পর্যায়ে অভিযোগ ‘দালিলিকভাবে প্রমাণিত হয়নি’ উল্লেখ করে ২০১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ওই চিঠি অনুসন্ধান সমাপ্ত করে। একই সঙ্গে সৈয়দ আবুল হোসেন এবং তার সহযোগীদের দায়মুক্তি দেয়া হয়।
দুদকের ওই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হয়ে বিশ্বব্যাংক আবার ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল আরেকটি চিঠিতে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সাকোর ঊর্ধ্বতন সব কর্মকর্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ভ্রমণ বৃত্তান্ত জব্দ করার জন্য বলে। অনুসন্ধান পর্যায়ে ‘সার্চ অ্যান্ড সিজার’-এর ক্ষমতা নেই উল্লেখ করে দুদক অপারগতা জানায়। দুদকের ওই বক্তব্য গ্রহণ না করে বিশ্বব্যাংক অনুসন্ধান কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য তাদের বেতনভুক একটি ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড প্রসিকিউটর প্যানেল’কে দেয়ার প্রস্তাব করে। কিন্তু আইনের কথা তুলে দুদক তাতে অসম্মতি জানায়।
ওই পরিস্থিতিতে গত ২০১২ সালের ২৩ থেকে ২৫ জুন বিশ্বব্যাংকের ৫ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করেন। তারা সরকার ও দুদকের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করে অনুসন্ধানের অগ্রগতি জানতে চান। কিন্তু তারা দুদক ও সরকারের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হয়ে গত ২৯ জুন একটি বিবৃতি দিয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ১২০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তা চুক্তি বাতিল করে।
২০১১ সালের ১ সেপ্টেম্বর জব্দকৃত এসএনসি লাভালিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট রমেশ সাহার ডায়েরিতে কাজ পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন জনকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ দেয়ার তথ্য ছিল। ওই তথ্য ৬ জনের জন্য মোট কাজের ১২ শতাংশ অর্থ ঘুষ হিসেবে দেয়ার ‘ষড়যন্ত্র’ হয়েছিল। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ বরাদ্দ ছিল সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের নামে। সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী ওরফে কায়সারের নামে ২ শতাংশ, মুজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরীর নামে ২ শতাংশ, প্রাধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা মশিউর রহমানের নাম রয়েছে ‘মসি রহমানের’ নামে এক শতাংশ, সেতু বিভাগের সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার নামে ১ শতাংশ লেখা ছিল। নিক্সনের নামের পরেই রয়েছে আরেকটি নাম। তার জন্য বরাদ্দ ২ শতাংশ বলে ডায়েরিতে উল্লেখ রয়েছে। ওই নামটি কার এ বিষয়ে কোনো সূত্র নিশ্চিত করেনি। তবে কানাডিয়ান সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত সিবিসি নিউজ পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি প্রসঙ্গে ১৫ মিনিটের একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয় যে, পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে প্রধানমন্ত্রীর বোন শেখ রেহানাও কমিশন নিতে চেয়েছিলেন। এমন অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তিনি নিজে বা তার মন্ত্রিসভার কোনো সদস্য এ ধরনের কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত নন। এই সংবাদ থেকে পরিষ্কার যে, প্রধানমন্ত্রীর আপন বোন শেখ রেহানা পদ্মা সেতু প্রকল্পে এসএনসি লাভালিনকে কাজ দিয়ে দুই শতাংশ কমিশন নিতে চেয়েছিলেন।
বিশ্বব্যাংক সরে যাওয়ার পর সরকারের নানামুখী তদবিরের প্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ৫ জুন চারটি শর্তসাপেক্ষে বিশ্বব্যাংক ফিরে আসার ঘোষণা দেয়। প্রথম শর্ত সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও অর্থ উপদেষ্টা এবং প্রকল্পের ইন্টিগ্রিটি অ্যাডভাইজার ড. মশিউর রহমানসহ দুর্নীতির অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্ব পালন থেকে ছুটি প্রদান। দ্বিতীয় শর্ত ছিল দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করে এ দুর্নীতি তদন্ত করা। তৃতীয় শর্ত ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল বা ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড প্রসিকিউটর প্যানেল’ দিয়ে দুদকের তদন্ত পর্যবেক্ষণ করা। চতুর্থত সেতু নির্মাণ পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে হবে, যাতে বিশ্বব্যাংক ও অপর ঋণদাতারা প্রকল্পের ক্রয় কর্মকাণ্ড আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেতে পারে।
সেই শর্ত অনুযায়ী ২০১২ সালের ২৩ জুলাই সৈয়দ আবুল হোসেন মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। একই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর ড. মশিউর রহমানকে এক মাসের ছুটিতে পাঠানো হয়। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি আবার কাজে যোগ দেন। ২০১২ সালের ১৪ অক্টোবর তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞ টিম ঢাকায় আসে। টিমের প্রধান ছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর লুই গাব্রিয়েল মোরেনো ওকাম্পো। অপর দুই সদস্য ছিলেন হংকংয়ের দুর্নীতিবিরোধী স্বাধীন কমিশনের সাবেক কমিশনার টিমোথি টং ও যুক্তরাজ্যের গুরুতর প্রতারণা দমন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক রিচার্ড অল্ডারম্যান। তারা ওই বছরের ১৫ ও ১৬ অক্টোবর দুই দফায় দুদকের সঙ্গে বৈঠক করেন। তারা দুদকের ওই সময় পর্যন্ত তদন্তের অগ্রগতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করে আবার তদন্তের পরামর্শ দিয়ে যান।
সেই প্রেক্ষিতে দুদক সৈয়দ আবুল হোসেনসহ আসামিদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করে। অনুসন্ধান পর্যায়ে দুদক সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, সংসদের হুইপ ও প্রধানমন্ত্রীর ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে জাতীয় সংসদের হুইপ নূরে আলম চৌধুরীর ভাই মুজিবুর রহমান চৌধুরী ওরফে নিক্সন চৌধুরী, সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, পদ্মা সেতুর সাবেক প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলাম, সাকো ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান মো. নূরুল হক এফসিএ, পরিচালক খন্দকার এনআই ইসলাম, সাকোর এমডি ও পরে আইসিটি মন্ত্রী মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ, ড. দাউদ আহমেদ, প্রকৌশলী রিয়াজ আহমেদ জাবের, ড. আইনুন নিশাত, পরামর্শক নিয়োগ সংক্রান্ত মূল্যায়ন কমিটির প্রধান ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীসহ অন্তত ৩০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রমাণ নিয়ে দুদক প্রতিবেদন তৈরি করে। এই পর্যায়ে ২০১২ সালের ৩ থেকে ৫ ডিসেম্বর বিশেষজ্ঞ টিম আবার বাংলাদেশে আসে।
সূত্র জানায়, বিশেষজ্ঞ দলের দ্বিতীয় সফরে দুদকের প্রতিবেদন ও তদন্তের নানা অসঙ্গতি, সৈয়দ আবুল হোসেন, আবুল হাসান চৌধুরী ওরফে কায়সার, নিক্সন চৌধুরীসহ সরকারের চার ব্যক্তিকে আসামি না করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্য দেখা দেয়। এক পর্যায়ে তারা বৈঠক ভেঙে দিয়ে চলে যান। দেশে গিয়ে দুদক চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি লেখেন প্যানেলের প্রধান মোরিনো ওকাম্পো। সেখানেও সৈয়দ আবুল হোসেন, আবুল হাসান চৌধুরী, নিক্সন চৌধুরীসহ প্রকৃত অপরাধীদের আসামি না করা প্রসঙ্গে ক্ষোভ জানিয়ে তাদের আসামি করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়। তবে প্যানেলের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার আগেই দীর্ঘ টানাপড়েনের এক পর্যায়ে ২০১৩ সালের ৩১ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকার বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ না নেয়ার ঘোষণা দেয়। ২০১৩ সালের ১৩ জুন বিশ্বব্যাংকের প্যানেল সৈয়দ আবুল হোসেনকে এজাহারভুক্ত আসামি না করায় তাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। তারা বলেন, তাদের অভিযোগ ছিল সঠিক, কিন্তু দুদকের তদন্ত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। ২০১৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঘুষ কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে রয়েল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ (আরসিএমপি) বাংলাদেশের আবুল হাসান চৌধুরী, কানাডিয়ান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনের সাবেক কর্মকর্তা কেভিন ওয়ালেস ও কানাডীয় নাগরিক জুলফিকার আলী ভূঁইয়াকে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন দেয়। এর ১০ দিন পর ২৮ সেপ্টেম্বর ১০ দিন তদন্ত শেষে আরসিএমপি আদালতে সাবেক পরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পরিবারের সদস্যসহ সরকারের প্রভাবশালী আরও কয়েক ব্যক্তি পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারিতে জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

মেয়াদজুড়ে হত্যা

গণহত্যার মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগ সরকার মেয়াদ শেষ করেছে। পাঁচ বছরে দেশে এমন বহু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে যার ভয়াবহতা বর্ণনা করলে শিউরে উঠতে হয়। পিলখানায় বিডিআর ট্র্যাজেডি থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গণহত্যার মতো নৃশংস ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে আর ঘটেনি। সরকারের শুরু থেকেই পুরো মেয়াদজুড়ে বিরোধী নেতাকর্মীদের দমন-পীড়নে নির্বিচারে চালানো হয় গুলি। গণতান্ত্রিক দেশে বিরোধী মত দমনে স্বৈরতান্ত্রিক স্টাইলে ব্যবহার করা হয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে। বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ঠেকাতে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হয় মানুষ। প্রতিবাদ করলেই জেল-জুলুম-হুলিয়ার খড়গ নেমে এসেছে। বিরোধী দলের প্রথম, দ্বিতীয় সারি ছাড়াও তৃতীয় সারির নেতাদের পর্যন্ত জেলবন্দি করে রিমান্ডে এনে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে নির্যাতন চালানো হয়। মেয়াদজুড়েই দেশের মানচিত্র সিক্ত হয় মানুষের তাজা রক্তে।
পিলখানায় ৫৭ চৌকস সেনা কর্মকর্তাকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করা হয়। এদের অনেকের লাশ পচে-গলে বীভত্স হয়ে যায়। স্যুয়ারেজ লাইনে লাশ ভাসিয়ে দেয়া হয় বুড়িগঙ্গা নদীতে। গণকবর দেয়া হয় তখনকার বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ আরও অনেক পদস্থ সেনা কর্মকর্তাকে।
এদিকে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পর অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে সারাদেশ। সাঈদীর মুক্তির দাবিতে রাস্তায় নেমে আসা ইসলামপ্রিয় নারী-পুরুষসহ সাধারণ জনগণের ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস ও বর্বর কায়দায় হত্যাযজ্ঞ চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পাখির মতো গুলি করে মানুষ হত্যা করা হয়। আল্লামা সাঈদীর রায় ঘোষণার পর সারাদেশে একটানা ১৫ দিন ধরে চলতে থাকা গণবিস্ফোরণ ঠেকাতে বিজিবি ছাড়াও কোথাও কোথাও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে খুন হয়
দেড় শতাধিক মানুষ। অন্যদিকে পবিত্র ইসলাম ধর্মের অবমাননাকারী নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাদরাসা শিক্ষক, ছাত্র, মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন থেকে শুরু করে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ ইসলাম অবমানকারীদের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এ সময় র্যাব-পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে আহত হয়েছে ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ।
অন্যদিকে দেশের প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ, আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখদের সমন্বয়ে গঠিত ‘হেফাজতে ইসলাম’ নামে অরাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাস্তায় নেমে আসেন মুসল্লিরা। ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি পালনের পর হেফাজতে ইসলামের মুসল্লিরা রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান করলে ঘুমন্ত মুসল্লিদের ওপর পৈশাচিক কায়দায় গুলি চালায় পুলিশ, র্যাব, বিডিআরের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী। গভীর রাতে পুরো মতিঝিল এলাকায় বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে যৌথবাহিনীর নির্বিচার গুলি ও বোমা বিস্ফোরণ এবং বেধড়ক পিটুনিতে প্রাণ হারান বহু ইসলামপ্রিয় মানুষ। হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাদের দুই থেকে আড়াই হাজার লোক নিহত হয়েছেন। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে হেফাজতের দাবি অস্বীকার করে বলা হয়েছে, সেদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে মাত্র ১৩ জন নিহত হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের মুসল্লিদের ওপর গুলি চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গণহত্যা চালানোর প্রতিবেদন প্রকাশ করায় দেশের শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থার সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমানকে গ্রেফতার করে কারারুদ্ধ করে রেখেছিল সরকার। অবশ্য এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী অনেক সমালোচনার পর সম্প্রতি তার জামিন মঞ্জুর করা হয়েছে।

বিডিআর হত্যাকাণ্ড
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বর্বর এবং বেদনাদায়ক ট্র্যাজেডি বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনা কর্মকর্তা হত্যাযজ্ঞ। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহে স্বজনহারা পরিবারগুলোর কান্না আজও থামেনি। তেমনি সেই দুঃখজনক স্মৃতি সাধারণ মানুষও ভুলতে পারছে না। কিন্তু কেন এই হত্যাযজ্ঞ, এর নেপথ্যে কারা ছিল—সেই প্রশ্নের জবাব ও ট্র্যাজেডির নেপথ্য রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি। জনসম্মুখে প্রকাশ হয়নি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনগুলোও। তেমনি এ ঘটনার বিচার নিয়েও চলছে অসন্তোষ। প্রকৃত হত্যাকারী এবং ষড়যন্ত্রের নায়করা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে। অনেকেই বর্তমান বিচার শ্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের ৫১ সামরিক কর্মকর্তা শহীদ হয়েছিলেন। আর এই স্বাধীন দেশে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি মাত্র দু’দিনের বিদ্রোহে পিলখানায় কর্মরত ৫৭ সেনা কর্মকর্তা, একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, দুজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী, ৯ বিডিআর জওয়ান, পিলখানার বাইরে সেনাবাহিনীর এক সিপাহি, এক পুলিশ কনস্টেবল ও তিন পথচারী নিহত হয়েছিলেন। ২৫ ফেব্রুয়ারিই পিলখানার স্যুয়ারেজ লাইন দিয়ে বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়েছিল ৩ সেনা কর্মকর্তার লাশ। ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বিদ্রোহীরা অস্ত্র সমর্পণের পর ২৭ ফেব্রুয়ারি মাটিচাপা অবস্থায় পাওয়া গেছে লাশের স্তূপ। অর্ধশত সাহসী ও নির্ভীক নিরস্ত্র সেনা কর্মকর্তার সারি সারি লাশ দেখে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল গোটা দেশের মানুষ। বর্বর ওই হত্যাকাণ্ড কারা ঘটিয়েছে, কারা এর অর্থের জোগান দিয়েছে, কারা পরিকল্পনা করেছে, কী তাদের উদ্দেশ্য ছিল—এসব বিষয় আজও রহস্যাবৃত। ঘটনার পর সেনাবাহিনী থেকে একটি এবং সরকারের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। কিন্তু ওইসব তদন্ত কমিটির দেয়া প্রতিবেদনগুলো আজও প্রকাশ করেনি সরকার।
পাঁচ বছর আগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের মাত্র দেড় মাসের মাথায় এ দিনই পিলখানায় বিডিআরের কথিত ‘সিপাহি’ পদের কিছু ব্যক্তির তপ্ত বুলেটে নিরস্ত্র ও অসহায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তার পাশাপাশি জীবন দিতে হয়েছে পিলখানার বাইরে রিকশাচালক, সবজি বিক্রেতা, ছাত্রসহ নিরীহ সাধারণ মানুষকেও। সেদিন সিপাহি মইন, সেলিম রেজা, ইকরাম, কাজল আলী, বাছেদ, জুয়েলসহ বিডিআরের কিছু ঘাতকের হিংস্র তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারগুলো। সেই পরিবারগুলো আজও শুধু কাঁদছেই। খুঁজে ফিরছে স্বজনদের। হত্যাকাণ্ডের আগে অবরুদ্ধ সেনা কর্মকর্তারা সরকারের কাছে সাহায্য চেয়ে আকুতি জানিয়েছিলেন। সেনা অভিযান চালিয়ে তাদের জীবিত অবস্থায় উদ্ধারের জন্য অনুনয়বিনয় করেছিলেন। কিন্তু সরকার তাতে কোনো সাহায্যের হাত বাড়ায়নি।
ঘটনা তদন্তে সরকার গঠিত কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী পিলখানা হত্যাকাণ্ড, লুটতরাজ ও অন্যান্য অপরাধ পরিকল্পনার সঙ্গে বিডিআরের অনেক সদস্যসহ বিপুলসংখ্যক বেসামরিক ব্যক্তিও জড়িত ছিল। প্রায় দু’মাস ধরে এর পরিকল্পনা চলছিল। এমনকি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই পরিকল্পনার কিছু তথ্য-প্রমাণ মেলে। কারণ নির্বাচনের আগে বিডিআরের বেশকিছু সদস্য মহাজোট প্রার্থী ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের (বর্তমানে সংসদ সদস্য) অফিসে যান। তাদের মধ্যে হাবিলদার মনির, সিপাহি তারেক, সিপাহি আইয়ুব, ল্যান্স নায়েক সহকারী সাইদুরসহ ২৬ জওয়ানের নাম জানা গেছে। তারা লালবাগ থানা আওয়ামী লীগ ক্যাডার জাকিরের মধ্যস্থতায় তাপসের সঙ্গে কথা বলেন। প্রতিশ্রুতি দেন তার পক্ষে কাজ করার। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে শেখ সেলিম এমপির বাসায় দুজন ডিএডি এবং আওয়ামী লীগ কর্মী জাকিরের মধ্যস্থতায় ১০ থেকে ১২ বিডিআর জওয়ান সাক্ষাত্ করেন। এ মামলায় বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু ও বিএনপির স্থানীয় নেত্রী সুরাইয়া বেগমের নামও রয়েছে। এ মামলার ২০ আসামি এখনও পলাতক।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ঐতিহ্যের ধারক ও বাংলার সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী ছিল বিডিআর। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। দেশের সীমান্ত রক্ষা, বিদেশি আগ্রাসন ও চোরাচালান প্রতিরোধে বাংলাদেশ রাইফেলস বা বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) ছিল নির্ভীক। আইন অনুযায়ী সব সময় বিডিআরের মূল নেতৃত্ব ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে। সেনাবাহিনী থেকে প্রেষণে আসা সাহসী কর্মকর্তাদের দিয়ে পরিচালনা করা হতো বিডিআর। সেই বিডিআরকে সেনাবাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন করার দেশি-বিদেশি ঘৃণ্য চক্রান্তের মাধ্যমে ঘটানো হয়েছিল বিডিআর বিদ্রোহ। দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাদের টার্গেট করে হত্যা করা হয়েছিল সেদিন।

বিরোধী নেতাকর্মী খুন
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাঁচ বছরে দেশ ‘পলিটিক্যাল কিলিং জোনে’ পরিণত হয়। পুলিশ ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এ সময় সারাদেশে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী খুনের ঘটনা ঘটেছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার। বিএনপি দাবি করেছে, তাদের ৩০ হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ, তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত ঘটেছে। বর্তমান সরকারের আমলে সংঘটিত এসব হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশ ঘটনারই চার্জশিট দাখিল করেছে পুলিশ; এমন কি এসব হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীদেরও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতেই দেশের বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে ৪৫ বিরোধী নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। গণতান্ত্রিক আন্দোলনসহ বিভিন্ন দাবিতে মাঠে নামলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নির্বিচারে চালানো গুলিতে তাদের মৃত্যু হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গু হয়েছেন অনেকেই।
অভিযোগ রয়েছে, নিহতদের পরিবার এসবের কোনো সুষ্ঠু বিচার পায়নি। অনেক ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বা পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরও করতে পারেনি। পুলিশ বাদী হয়ে উল্টো দলীয় নেতাকর্মী, ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজনকে আসামি বানিয়ে মামলা করে হয়রানি করছে। দলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে রিমান্ডে এনে নির্যাতন চালিয়েছে। কিছু ঘটনায় তীব্র অভিযোগ ওঠায় গুলিবর্ষণকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। আর তদন্ত সংস্থা সেই পুলিশ বাহিনীর সদস্য অথবা সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় তাদের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অনেক ঘটনা পুলিশ দিয়ে তদন্তের নামে আইওয়াশ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, নিহতদের পরিবারের বক্তব্য এবং অনুসন্ধানে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত চার বছরেই রাজনৈতিক সহিংসতা ও দুর্বৃত্তায়নের ফলে ৭৭৫ জন নিহত হন। চলতি বছর সহিংসতা আরও বেড়েছে। অধিকার-এর তথ্য অনুযায়ী চলতি বছর জানুয়ারি মাসেই রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে ১৭ জন নিহত এবং ১৬৪৩ জন আহত হয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে গত ৩১ জানুয়ারি জামায়াতের ডাকা হরতালে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বগুড়ায় জামায়াত-শিবির কর্মীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্রলীগ এবং পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণে ছাত্রশিবির নেতা আবু রুহানী ও কর্মী আবদুল্লাহ এবং মিজানুর রহমান নিহত হন। গত ৬ ফেব্রুয়ারি হরতাল চলাকালে চট্টগ্রামে জামায়াতের মিছিলে পুলিশ অতর্কিত গুলিবর্ষণ করলে চার নেতাকর্মী নিহত হন। গুলিবিদ্ধ হন দল দুটির অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী ও সমর্থক। পাঁচলাইশ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ একাধিক জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীকে ধরে নিয়ে হাতে-পায়ে গুলি করেন। ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি বিএনপির কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে মিছিল-সমাবেশকে কেন্দ্র করে চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরে পুলিশের গুলিতে চার ব্যক্তি নিহত হয়। লক্ষ্মীপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন যুবদল নেতা রুবেল এবং গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঢাকায় আনার পথে বিকালে আবুল কাশেম মারা যান। অপরদিকে পুলিশের গুলিতে চাঁদপুরে লিমন ও আবুল হোসেন নামে দু’জন নিহত হন। চাঁদপুরে বিএনপির সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় পুলিশের গুলিতে ২ জন নিহত হন।
বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী গুমের প্রতিবাদে গত বছর ২৫ এপ্রিল হরতাল চলাকালে সিলেটের বিশ্বনাথে পুলিশ-ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও সংগ্রাম পরিষদের মধ্যে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে গোলাগুলি ও ভয়াবহ সংঘর্ষে ছাত্রদল নেতা সেলিম আহমদ এবং যুবদল নেতা মনোয়ার হোসেন ও জাকির হোসেন নিহত হন। গত বছর ২৮ এপ্রিল লক্ষ্মীপুর সদর থানার পোদ্দার বাজারে হরতালের পক্ষে বিএনপির মিছিলে পুলিশের ছত্রছায়ায় আওয়ামী লীগ কর্মীরা গুলি চালালে একজন নিহত ও একজন আহত হয়েছে। গত বছর ৯ নভেম্বরে জয়পুরহাটে শিবির নেতা বদিউজ্জামান পুলিশের গুলিতে নিহত হন। গত বছর ৩০ জানুয়ারি বিকালে রাজশাহীতে বিএনপিসহ জোটের গণমিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণ ও অতর্কিত হামলায় শেখ শফিকুল ইসলাম শফিক নামে এক জামায়াত কর্মী নিহত হয়।
২০১০ সালের ২৩ অক্টোবর রূপগঞ্জে সেনাবাহিনীর নিজস্ব আবাসন প্রকল্পের জমি কেনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনতার সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ জামাল নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়।
২০১০ সালের ৮ অক্টোবর বিএনপির মিছিলে হামলা চালিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা সানাউলাহ নূর বাবুকে শত শত মানুষের সামনে কুপিয়ে এবং সাপ পেটানোর মতো নির্দয়ভাবে পিটিয়ে, দুই পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। এই মামলার ২৭ আসামিকেই জামিনে মুক্তি দেয়া হয়। ঠিক একই কায়দায় গত গত ৫ অক্টোবর রাতে বাবুর চাচা উপজেলা যুবদলের সহসভাপতি আবুল বাশার মাস্টারকেও হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয় দশজন। অপহরণের পর হত্যা করা হয় যশোর জেলার ঝিকরগাছা থানা বিএনপির সভাপতি নাজমুল ইসলামকে। ২০১১ সালের ১৪ ডিসেম্বর ঢাকার বাংলামোটরে নিজ ব্যবসায়িক কার্যালয় থেকে বের হয়ে তিনি আর বাসায় ফিরে আসেননি। পরদিন গাজীপুরের শালবনে তার লাশ পাওয়া যায়।

মতিঝিল হত্যাকাণ্ড
চলতি বছরের ৫ মে মধ্যরাতে মতিঝিল শাপলা চত্বরে অবস্থান করা ঘুমন্ত মুসল্লিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গণহত্যা চালায় র্যাব, বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী। যৌথবাহিনীর ‘অপারেশন ফ্লাশ আউট’ বা ‘অপারেশন শাপলা’ নামক গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা কত তা এখনো জানা যায়নি। হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের দুই থেকে হাজারের বেশি মুসল্লি মৃত্যু হয়েছেন। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ৬ মে ভোরে যৌথবাহিনীর অভিযানে কোনো মুসল্লি মারা যায়নি। হেফাজতের অবরোধ কর্মসূচিকে ঘিরে ১১ জন নিহত হয়েছে। কিন্তু হেফাজতে ইসলামের নেতারা বলেছেন, ঘুমন্ত ও ইবাদতরত মুসল্লিদের ওপর গুলি চালিয়ে ওই রাতে গণহত্যা চালানো হয়। এছাড়া অন্তত ১০ হাজার লোক আহত এবং বহু লোক এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। শুধু হেফাজত নেতারাই এই দাবি করেনি, দেশ-বিদেশের একাধিক মানবাধিকার সংগঠন এবং গণমাধ্যমও প্রায় একই দাবি করেছে। হংকংভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এশিয়ার হিউম্যান রাইটস কমিশন জানিয়েছে, শাপলা চত্বরে নিহতের সংখ্যা আড়াই হাজারেরও বেশি হতে পারে।
বাংলাদেশের খ্যাতনামা মানবাধিকার সংগঠন অধিকার বলেছে, শাপলা চত্বরে শত শত লোককে হত্যা করা হয়। এরপর ট্রাক ও কভার্ডভ্যানে করে লাশ সরিয়ে ফেলা হয়। বার্তা সংস্থা এপির বরাত দিয়ে মার্কিন টিভি স্টেশন সিএনএন জানায়, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা হয়তো কখনোই জানা যাবে না। প্রভাবশালী ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্ট ৫ ও ৬ মে’র হত্যাকাণ্ডকে ‘গণহত্যা বলেই মনে হচ্ছে’ বলে তাদের প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছে। পরে নিহত বেশ কিছু হেফাজত কর্মীর লাশ অজ্ঞাত হিসেবে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন রাজধানীর জুরাইনের স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা জানিয়েছেন, সাভারের রানা প্লাজার অজ্ঞাত লাশ বলে ব্যাপক নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে ৭ মে সকাল-সন্ধ্যায় ও ৮ মে ভোরে কিছু লাশ দাফন করা হয়েছে। এর প্রকৃত সংখ্যা কত, সেটা কেউ বলতে পারেননি। কিন্তু জুরাইন, ঢালকা নগর, ফরিদাবাদ এলাকার মানুষের মুখে মুখে শোনা যাচ্ছে, সাভারে বিধ্বস্ত রানা প্লাজা থেকে উদ্ধার করা অজ্ঞাত লাশের ছদ্মাবরণে মতিঝিল গণহত্যার বেশকিছু লাশ দাফন করা হয়েছে।
সেদিন ভোরের দৃশ্য বিভিন্ন মিডিয়ার ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মতিঝিলের আলিকো ভবনের সামনে টুপি-দাড়িওয়ালাদের বন্দুক দিয়ে পেটায় পুলিশ। একই সঙ্গে রাজপথে সাদা পাঞ্জাবি পরা বহু মানুষের রক্তাক্ত লাশ পড়ে ছিল। গুলিবিদ্ধ অনেককে মাটিতে ঢলে পড়তে দেখা যায়। অনেকের শরীর রক্তাক্ত। কেউ কেউ পুলিশের কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অ্যাম্বুলেন্সে লাশ তুলতে দেখা যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকেও ওই রিপোর্টের কোনো প্রতিবাদ জানানো হয়নি। এছাড়াও ইসলামের অবমাননাকারী নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইসলামী সমমনা দলের হরতাল চলাকালে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে পুলিশের নির্বিচারে চালানো গুলিতে আলেম ও মহিলাসহ পাঁচজন নিহত হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী। এ ঘটনায় পরদিন জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করা হয়।

মাওলানা সাঈদীর রায়-পরবর্তী গণহত্যা
মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল দেশের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়ার পর প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে সারা দেশের মানুষ। ইসলামপ্রিয় মানুষ ছাড়াও সাঈদীভক্ত সর্বস্তরের লাখ লাখ জনতা রাস্তায় নেমে আসে। আল্লামা সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিল করে তার মুক্তির দাবিতে সারা দেশে গণবিক্ষোভ একপর্যায়ে গণবিস্ফোরণে রূপ নেয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে জনতা। তারা তাত্ক্ষণিকভাবে প্রতিবাদে নেমে আসে রাস্তায়। হরতাল, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, অবরোধসহ ঘোষিত এবং অঘোষিত কর্মসূচিতে অচল হয়ে পড়ে দেশ। বিক্ষোভে ফেটে পড়া নারী-পুরুষের ওপর নির্বিচারে চালানো হয় গুলি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুহুর্মুহু গুলিতে রক্তে রঞ্জিত হয় গোটা দেশের বহু জনপথ। একটানা ১৫ দিন ধরে চলতে থাকা প্রতিবাদ বিক্ষোভে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহত হয় দেড় শতাধিক মানুষ। নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী, কিশোর, কৃষক, দিনমজুর, মুসল্লিসহ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী। সারা দেশে একইসঙ্গে সাঈদী ভক্ত, অনুসারীদের আন্দোলন-বিক্ষোভ সামাল দিতে ব্যর্থ হয় র্যাব ও পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মোতায়েন করা হয় বিজিবি ও সেনাবাহিনী। বগুড়ায় সেনাবাহিনীর টহল দেখে তখন জনমনে এক ধরনের অজানা উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছিল।
সাঈদীর রায় ঘোষণার পর চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত এক সপ্তাহের মধ্যেই সারা দেশে পুলিশ-বিজিবি ও র্যাবের নির্বিচার গুলিবর্ষণে গণহত্যার শিকার ৯৭ জনের মধ্যে সাধারণ নাগরিকের সংখ্যাই ৩৩ জন। এর মধ্যে চারজন মহিলা ও চারটি শিশুসহ আলেম-ওলামাও রয়েছেন। সাধারণ নাগরিক ছাড়া নিহত হয়েছেন জামায়াত-শিবিরের ৪৬ জন, বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের ৬ জন, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ৫ জন, এলডিপির ১ জন এবং ৭ জন পুলিশ সদস্য।
সাতক্ষীরায় ৮ জামায়াত-শিবির, ১ আ.লীগ কর্মী ও ১০ সাধারণ নাগরিকসহ ১৯ জন, বগুড়ায় ৭ জামায়াত-শিবির, ৩ মহিলা ও ১ শিশুসহ ১৪ জন, রংপুরে ১ পুলিশ সদস্যসহ ৯ জন, গাইবান্ধায় চার পুলিশ সদস্যসহ ৮ জন, ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের ৩ জনসহ ৭ জন, জয়পুরহাটে ৬, নোয়াখালীতে বিএনপি ও যুবদলের ২ জনসহ ৪ জন, রাজশাহীর বাঘায় ১ ও গোদাগাড়ীতে ২ জনসহ মোট ৩, সিরাজগঞ্জে ২, কক্সবাজারে ৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১ যুবলীগ কর্মীসহ ৪ জন, লোহাগাড়ায় ১ পুলিশ সদস্যসহ ২ জন, সাতকানিয়ায় ১ এলডিপি কর্মীসহ ৩ এবং মৌলভীবাজার, নাটোর, রাজধানীর মিরপুর, দিনাজপুর, বাঁশখালী, সোনাইমুড়ী, সিলেট, চট্টগ্রাম, কেরানীগঞ্জ, নীলফামারী, হরিণাকুণ্ড, সেনবাগ ও উল্লাপাড়ায় ১ জন করে। এ সময়ের মধ্যে পাঁচ সহস্রাধিক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অন্তত আরও ২০ সহস্রাধিক ব্যক্তি।
রায় ঘোষণার পর দেশব্যাপী বিক্ষোভ ঠেকাতে পুলিশ, বিজিবি ও র্যাবের নির্বিচার গুলিবর্ষণে বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ড ঘটে। এছাড়া যুবলীগ-ছাত্রলীগের তাণ্ডবেও হত্যার শিকার হন অনেকে। স্বাধীনতার পর মাত্র ৭ দিনে এত হত্যাকাণ্ডের নজির নেই। মানবাধিকার সংস্থাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি একে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, স্বাধীনতার পর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ এটি। এ ঘটনায় সবার কাছে এটা স্পষ্ট নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বেপরোয়া দুর্নীতির উপাখ্যান- ৯ : চাঁদাবাজির মহোত্সব : পরিবহন ও নৌ সেক্টরে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ খোদ মন্ত্রীর হাতে

বেপরোয়া চাঁদাবাজদের কবলে রাজধানীসহ সারাদেশ। হাট-ঘাট, ফুটপাথ, শহর-বন্দর কিংবা গ্রাম-গঞ্জ সর্বত্রই ক্ষমতাসীন দল আশ্রিত মাস্তানদের নামে চাঁদাবাজি চলছে। নিয়ন্ত্রণও করছেন সরকারি দলের মন্ত্রী ও এমপিরা। খোদ নৌপরিহন মন্ত্রীই চাঁদাবাজদের গডফাদারে পরিণত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিনিয়ত চাঁদা দিতে হয় সড়কে, বাসে, লঞ্চে, রেল স্টেশনেও। প্রতিটি বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল চাঁদাবাজদের কাছে যেনো সোনার খনি। প্রত্যেকটি সড়কে রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামে প্রকাশ্যেই চলে চাঁদা আদায়। বাস, ট্রাক, টেম্পো, রিকশা, অটোরিকশা, প্রাইভেটগাড়ি যে কোনো বাহনের চালক ও মালিকদেরই প্রতি ট্রিপেই পয়েন্টে পয়েন্টে মাস্তানদের চাঁদা দিতে হয়। দিন কিংবা মাস হিসেবে চাঁদা দিতে হচ্ছে সবাইকে। চাঁদা না পেলেই হামলা, মামলা, হুমকি এমনকি খুন যখম হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। চাঁদাবাজদের হাত থেকে কেউই রেহাই পাচ্ছে না। কখনো বড় ভাইয়ের নামে, কখনো নেতার নামে, কখনো পুলিশের নামে, কখনো বিভিন্ন সংগঠন বা অুনষ্ঠানের নামে চাঁদাবাজি চলছে। পালাতক ও আত্মগোপনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে চাঁদাবাজি চলে বড় শহর কিংবা বন্দরে। চাঁদা না দিলেই লাশ হতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কিংবা তার পরিবারের লোকজনকে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে ‘হয় চাঁদা না হয় মৃত্যু।’ চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় প্রাণহানিও হয়েছে বহু মানুষের। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে চাঁদাবাজির কারণে দেশের মানুষ চরম উদ্বেগ উত্কণ্ঠা ও আতঙ্কে দিন পার করতে হয়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজি হচ্ছে মোবাইল ফোনে। সন্ত্রাসীরা অদৃশ্যে থেকেই ভয়ভীতি দেখিয়ে আতঙ্ক তৈরি করে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের কাছে চাঁদাদাবি করছে। এই চাঁদাবাজি থেকে রেহাই পাচ্ছে না খোদ পুলিশ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। চাঁদা চেয়ে হুমকি হিসেবে আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য মিষ্টির বক্সে করে পাঠানো হচ্ছে কাফনের
কাপড়, ককটেল ও হাত বোমা। সন্ত্রাসীরা চাঁদা দাবিকৃত ব্যক্তি কিংবা তার সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের চলাফেরার পথ অনুসরণ করে ফোনে তা জানিয়ে গুলি করার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজি করছে কারাগারে বসেই। চাঁদাবাজিতে পিছিয়ে নেই পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশের দুর্বৃত্ত সদস্যরাও। র্যাবেরও কতিপয় অসাধু সদস্য ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজি কিংবা অর্থ আদায়ের বেশুমার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে প্রতি বছর গড়ে ১৩ হাজার পুলিশকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। যার অধিকাংশই ছিল চাঁদাবাজি কিংবা অর্থ আদায়ের মতো অপরাধ। টাকার জন্য নির্যাতন করে হত্যা, নির্মম নির্যাতন করে পঙ্গু করে দেয়া, সংবেদনশীল মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে চালান করার মতো অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে খোদ পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। পুলিশের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারারা দেশজুড়ে চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না।
এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে রাজধানী ঢাকার ফুটপাথ ও মার্কেটে প্রতিদিন কমপক্ষে ৭ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হচ্ছে। কমপক্ষে ঢাকার ২ লাখ ৬০ হাজার হকারকে জনপ্রতি দৈনিক চাঁদা দিতে হয় ৩০০ টাকা করে। এসব টাকা চলে যায় রাজনৈতিক নেতা মাস্তান এবং পুলিশদের হাতে।

চাঁদার নিয়ন্ত্রণ নৌমন্ত্রীর হাতে
নৌপরিবহনমন্ত্রী মন্ত্রী হলেও মাদারিপুরের এমপি শাজাহান খান নিয়ন্ত্রণ করেন সড়ক পরিবহন ও লঞ্চ ঘাট এবং নৌবন্দরের চাঁদাবাজি। শাজাহান খান একদিকে শ্রমিক নেতা, অন্যদিকে পরিবহন কোম্পানির মালিকও তিনি। শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা হয়ে পরিবহনে চাঁদার হার নির্ধারণ করেন। এজন্য একবার সরকারি প্রজ্ঞাপনও জারির চেষ্টা করেছিলেন। আবার এই শাজাহান খানই সরকারের সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। যে উপদেষ্টার প্রধান কাজ পরিবহন চাঁদাবাজি বন্ধ করা। তিনি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলেরও সদস্য, এই পদের ব্যক্তিরও প্রধান কাজ সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অথচ তিনি সড়কের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার কাজে নিয়োজিত। তিনিই ঘাতক গাড়ি চালকদের পক্ষ নিয়ে বলেছিলেন, গাড়ি চালকদের শিক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার জন্য গরু ছাগল চিনলেই হলো।
চাঁদাবাজির লাইসেন্স নেয়ার জন্য শাজাহান খান বর্তমান সরকারের সময় চাঁদার হার ঠিক করার চেষ্টা করেন। ঢাকায় মালিক-শ্রমিকের জন্য ৭০ টাকা এবং শুধু ঢাকার বাইরে শ্রমিকদের জন্য ২০ টাকা প্রস্তাব করে তা সরকারিভাবে প্রজ্ঞাপনের চাপ তৈরি করেন। ২০০৯ সাল থেকে ওই চেষ্টা চালান তিনি। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে উপত্তি ওঠায় ওই উদ্যোগ সফল হয়নি।
শ্রমিক নেতারা জানান, মালিক শ্রমিক ফেডারেশনের নামে যে চাঁদা তোলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অবৈধ। কারণ, সংগঠন পরিচালনায় খরচের জন্য শ্রম আইনে যে চাঁদার কথা বলা হয়েছে, তা দৈনিক নয়, মাসিক কিংবা বার্ষিক। এ ছাড়া ফেডারেশন সারা দেশের শ্রমিক সংগঠনের সমন্বয়কারী বা কেন্দ্রীয় সংস্থা। তাই ফেডারেশন সরাসরি প্রতিটি বাস থেকে চাঁদা তুলতে পারে না। কেবল শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে মাসে বা বছরে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা নিতে পারে ফেডারেশন। এখন ফেডারেশন ও শ্রমিক ইউনিয়ন আলাদাভাবে চাঁদা আদায় করে যাচ্ছে। বিআরটিএর সূত্র জানায়, সারা দেশে বর্তমানে প্রায় চার লাখ বাণিজ্যিক যানবাহনের নিবন্ধন রয়েছে। এর মধ্যে বাস-মিনিবাস ও ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। ১০ টাকা করে চাঁদা আদায় করলে এ তিন পরিবহন থেকেই দৈনিক ১৫ লাখ টাকার বেশি চাঁদা তোলা হয়। মাসে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা এর বাইরে অটোরিকশা, হিউম্যান হলার, ট্যাংক লরি থেকেও নিয়মিত চাঁদা তোলা হয়।
শাজাহানা খানের বাহিনী মাওয়া-কাওড়াকান্দি ঘাটে প্রতিদিন অর্ধকোটি টাকা চাঁদা নেয়। মাদারিপুর জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির একাধিক বৈঠকে খোদ পুলিশ সুপার ও মন্ত্রীর নামে বা তার নিয়োজিত ব্যক্তিদের চাঁদা আদায়ের কথা জানান। কিন্তু মন্ত্রী এসব বন্ধে কোনো প্রতিকার নেননি।
শাজাহান খানের নামে সদরঘাট টার্মিনালে চলে বেশুমার চাঁদাবাজি। ঘাটে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য প্রসিদ্ধ লালবাহিনীও তার নিয়ন্ত্রিত। মূলত তিনি নৌ ও সড়ক পরিবহনের চাঁদাবাজদের গডফাদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
শাজাহান খানের নিয়োজিত ব্যক্তিরা বা তার অনুমোদন দেয়া সংগঠনের নামে ঢাকা মুন্সীগঞ্জ, ঢাকা-মাওয়া, ঢাকা-মাদারিপুরসহ বিভিন্ন রুটের বাসে নিয়মিত চাঁদা আদায় হয়। যার সিংহভাগ যাচ্ছে শাহজাহান খানের হাতে। এছাড়া সড়ক পরিবহন সমিতি, সড়ক পরিবহন ফেডারেশসহ চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন সংগঠনেরও প্রধান তিনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, সর্ষের মধ্যেই ভূত দেখা দিয়েছে।

পণ্যবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি
বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. রুস্তম আলী জানান, দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতকারী প্রতিটি পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান থেকে গড়ে এক কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে পুলিশ। তিনি বলেন, এসব কথা মিডিয়ায় জানিয়েও লাভ নেই। কোনো উচ্চবাচ্য করলে হয়রানি আরো বেড়ে যায়। তিনি আরও জানান বাংলাদেশে প্রতিদিন ৯০ হাজার পণ্যবাহী ট্রাক এবং কাভার্ড ভ্যান চলাচল করে। যতই কাগজপত্র সঠিক থাকুক এর কোনোটিই পুলিশকে চাঁদা না দিয়ে চলতে পারে না? তার হিসাব সড়ক বা মহাসড়কে এই ট্রাক চলাচল করতে গিয়ে একেকটি স্পটে ৫০ টাকা থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। এই চাঁদা নেয় হাইওয়ে পুলিশ, টহল পুলিশ কিংবা থানা পুলিশ। আবার মালিক ও শ্রমিক সমিতির নামেও চলে চাঁদাবাজি। যুবলীগ, ছাত্রলীগ কিংবা আওয়ামী লীগের নামেও আদায় হয় চাঁদা। রুস্তম আলী খান জানান, বগুড়া থেকে ঢাকা পৌঁছাতে প্রতিটি ট্রাককে অন্তত ১২ জায়গায় চাঁদা দিতে হয়। এগুলো নির্দিষ্ট চাঁদা। এর বাইরে হঠাত্ গাড়ি আটকে চাঁদা নেয়া হয়। গড়ে একটি ট্রাককে কমপক্ষে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা চাঁদা গুনতে হয়।
গাড়ি চালকরা জানান, চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করে লাভ নেই। পুলিশ ১,০০০ টাকা চাঁদা চাইলো। কোনো ট্রাক ড্রাইভার যদি তা না দেন, পুলিশ তাহলে ১৫১ ধারায় ট্রাকের রঙ চটে গেছে বলে একটি মামলা করে দেয়। যার জন্য জরিমানা গুনতে হয় প্রায় ৫,০০০ টাকা। আবার পচনশীল পণ্যের ট্রাক চাঁদা না দিতে চাইলে অবৈধ পণ্য আছে বলে সব পণ্য রাস্তার পাশে নামাতে বলা হয়। তখন কয়েক লাখ টাকার পণ্য রাস্তাতেই পচে। এছাড়া বডি পরীক্ষা, রঙ পরীক্ষা, ইঞ্জিন পরীক্ষা, ওজন পরীক্ষা, ট্রাফিক আইন অমান্য ইত্যাদি বহু অভিযোগে পুলিশ ট্রাক থেকে চাঁদা নেয়।

বাস রুটে রুটে চাঁদাবাজি
সম্প্রতি ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী আনন্দ পরিবহনের বাস মালিকেরা প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়ে বলেছেন, আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানের ছত্রছায়ায় তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মুক্তার হোসেন ও দিদার এবং তার সহযোগীদের গত সাড়ে চার বছরে শুধু আনন্দ পরিবহন থেকে ২৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা চাঁদা দিয়েছেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর শামীম ওসমানের খলিফা হিসেবে পরিচিত মুক্তার হোসেন, সাইফুল উদ্দিন, জয়নাল আবেদীন, মোস্তফা কামাল, সুলতান ড্রাইভার ও আহাম্মদ আলী অস্ত্রের মুখে আনন্দ পরিবহনের কার্যালয় দখল করেন এবং পরিবহনটির কাছ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা চাঁদা নেন। পরিবহনে প্রতিটি নতুন বাস অন্তর্ভুক্ত করার জন্য গড়ে দুই লাখ টাকা করে চাঁদা নেয় এই সিন্ডিকেট। এভাবে তারা হাতিয়ে নিয়ে যায় আরও এক কোটি টাকা। মুক্তারের সহযোগী দিদারের ভাই কাজল কোনো বাসের মালিক না হয়েও প্রতিদিন গাড়ি প্রতি ৩০০ টাকা করে নিয়েছে আরো ৩৬ লাখ টাকা। চালক ও সহকারীর বেতন থেকে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে এই চক্র। এই হিসেবে মুক্তার, দিদার ও কাজল চালক ও সহকারীদের কাছ থেকে কমপক্ষে এক কোটি ২০ লাখ ২০ হাজার টাকা লুটপাট করেন। এই মুক্তার আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ। শামীমের ভাই এমপি নাসিম ওসমানের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও মুক্তারকে দেখা যায়। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির বিভিন্ন কর্মসূচিতে লোক পরিবহনের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে বাস সরবরাহ করেন তারা।
একই রুটের বন্ধন পরিবহনও প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়ে বলেছে, শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী চেঙ্গিস খান গংরা বন্ধন পরিবহন সাড়ে চার বছরে কমপক্ষে সাত কোটি নয় লাখ ৫২ হাজার টাকা চাঁদা নিয়েছে। এর আগে ২৩ আগস্ট নসিব পরিবহনের মালিকরা সংবাদ সম্মেলন করে জানান, শামীমের ছত্রচ্ছায়ায় তার শ্যালক এহসানুল হাসান নসিব পরিবহন থেকে একই সময়ে কমপক্ষে ৬ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেছে। নারায়ণগঞ্জের যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ ফোরামের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি বলেন, নাসিম- সেলিম-শামীম ওসমান ও তাদের সহযোগীরা গত সাড়ে চার বছরে নারায়ণগঞ্জের পরিবহন খাত থেকে ২০০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেছে।
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের রুটে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজির উদাহরণ থেকেই বোঝা যায় সারাদেশে পরিহন সেক্টরের অবস্থা। দেশের প্রতিটি জেলা উপজেলা এবং অঞ্চলে এভাবে প্রতিনিয়ত রাজনৈতি প্রভাবশালীরা শত শত কোটি টাকা চাঁদা আদায় করে নিচ্ছে। পুলিশ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করার সাহস পায় না।

বাস টার্মিনালে চাঁদাবাজি
রাজধানী ঢাকার তিনটি বাস টার্মিনাল থেকে দৈনিক কোটি টাকা চাঁদা তোলা হয়। তিনটি মালিক সমিতি ও দুটো শ্রমিক ফেডারেশনের প্রতিটির একাধিক কমিটির নামে এ চাঁদাবাজি চলছে। দিনরাত চাঁদা আদায়ের কাজটি করে থাকে ‘লাঠি বাহিনী’, ‘যানজট বাহিনী’ ও ‘লাইন বাহিনী’। চাঁদাবাজদের হাতে অসহায় ২০ লাখ পরিবহন শ্রমিক। ঢাকার ৩ টার্মিনালে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পরিবহন শ্রমিকরা জানান, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ও ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতি নিয়ন্ত্রণ করছে চাঁদাবাজি। ঢাকা-নোয়াখালী রুটে চলাচলরত একটি মিনিবাসের চালক বাবুল হোসেন জানান, সায়েদাবাদ টার্মিনালে ৭০ টাকার একটি স্লিপ দিয়ে তাঁর কাছ থেকে ৫৫০ টাকা চাঁদা নিয়েছে একটি বাহিনীর লোকজন। সরকারি দল সমর্থিত ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘আমরা যে টাকা তুলছি তা পরিবহন খাতের উন্নয়নেই ব্যয় করা হচ্ছে। সরকার আমাদের সমিতির নামে অর্থ তোলার জন্য হার নির্ধারণ করে দিয়েছে। নগরীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে প্রতিদিন ৬০ লাখ টাকা তোলা হয়। টার্মিনাল থেকে যাত্রী ওঠানোর আগেই পরিবহন ও রুট অনুযায়ী নির্ধারিত ‘জিপি’ অর্থাত্ চাঁদা দিতে হয়। এর পরিমাণ ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত। এটি আদায় করে লাঠিবাহিনী। টার্মিনাল থেকে গাড়ি বের করার সময় যানজট বাহিনীকে দিতে হয় ২০ টাকা ‘কাঙালি চাঁদা’। এরপর লাইনম্যানের পালা। এ ক্ষেত্রে দিতে হয় ২০ টাকা। এক্ষেত্রে প্রত্যেকটি রুটের জন্য আলাদা বাহিনী রয়েছে। এর বাইরে রয়েছে টার্মিনালে ডিসিসির নির্ধারিত ফি।
গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে উত্তর, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৫১টি রুটের গাড়ি থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি হয়। টার্মিনালে গাড়ি পার্কিং বাবদ সিটি করপোরেশনের নামে নির্ধারিত পার্কিং ফি পরিবহন প্রতি ৪০ টাকা। আদায় হচ্ছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। এরপরই দিতে হচ্ছে ‘জিপি’ বাবদ ১০০ টাকা। এছাড়া মালিক সমিতির নামে ২০ এবং শ্রমিক ইউনিয়নের নামে ২০ টাকা করে নেয়া হয়।
মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন চাঁদা আদায় হয় ১৫ লাখ টাকা। এই টার্মিনালে ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির তিনটি কমিটির নামে চলছে চাঁদাবাজি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা সাজেদুর রহমান হিরু ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির নেতা দাবিদার মনির চৌধুরী ও কাজী আলাউদ্দিন ও এনায়েতউল্লাহ গ্রুপ, আবুল হাশেম দেওয়ান গ্রুপসহ বিভিন্ন গ্রুপ এই টাকা আদায় করে। ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির নামে ২০ টাকা, শ্রমিক ইউনিয়নের নামে ১৫, মালিক সমিতির নামে ২০ এবং শ্রমিক ফেডারেশনের নামে ৫০ টাকা করে প্রত্যেক গাড়ি থেকে আদায় করা হয়। কিন্তু শ্রমিকরা জানান, বাস্তবে গাড়িপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা চাঁদা নেয়া হয়। এভাবেই ঢাকাসহ সারাদেশের প্রতিটি বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল থেকে বিভিন্ন সমিতি, ব্যক্তি কিংবা শ্রমিক ইউনিয়নের নামে শত শত কোটি টাকা চাঁদা আদায় চলছে। যার কোনো হিসাব খোদ পুলিশ কিংবা পরিবহন সমিতির নেতাদের কাছেও নেই।
বেশুমার চাঁদাবাজি হচ্ছে বাসা-বাড়ি কিংবা এলাকায়। রাজধানী ঢাকার যে কোনো মহল্লায় নির্মাণ কাজ শুরু করলেই বাড়ির মালিক কিংবা ঠিকাদারদের কাছে প্রথমে ‘মিস্টি খাওয়া’র টাকা চায় সন্ত্রাসীরা। নির্মাণ কাজ শুরুর প্রতিটি ধাপে ধাপে বিশাল অংকের চাঁদা দিতে হয় মহল্লার মাস্তান, পাড়ার বড়ভাই কিংবা রাজনৈতিক গডফাদারদের। ঢাকার শাহাজানপুরে বাড়ি করছিলেন কুষ্টিয়ার প্রবাসী আওলাদ হোসেন। তিনি জানান, সন্ত্রাসীরা ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। মাত্র আড়াই কাঠা জমিতে বাড়ি করার জন্য ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দেয়া অসম্ভব। কয়েক দফায় তিনি ১৫ লাখ টাকা চাঁদা দিয়েছেন। এরপরও সন্ত্রাসীদের হুমকিতে তিনি বাড়ির কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। গত ২৮ সেপ্টেম্বর মিরপুরে নিজ বেডরুমে খুন হন হোমস টেক নামক আবাসন কোম্পানির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাফরুল হক মোক্তার। সন্ত্রাসীরা চাঁদা চেয়ে না পেয়ে নির্মমভাবে খুন করে তাকে। এভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চাঁদাবাজদের হাতে খুন-যখম হচ্ছে নিরীহ মানুষ।

চাঁদাবাজির শিকার ঠিকাদাররা
রাজনৈতিক দল আশ্রিত মাস্তানদের হাতে সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজির শিকার হন ঠিকাদাররা। সড়ক, ব্রিজ, কালভার্ট, স্কুল কলেজ, হাসপাতালসহ যে কোনো উন্নয়নমূলক কাজ শুরু করতে গেলে ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গদলের সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা দিতে হয় পাড়ার মাস্তানদেরকেও। পুলিশের কাছে সহযোগিতা চেয়েও আশানূরূপ ফল হয় না। কারণ চাঁদাবাজদের পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দিলে তাদের সহযোগীরা নানান ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। সাম্প্রতিক সময়েও চাঁদা না দেয়ায় বেশ কয়েকজন ঠিকাদার হামলার সরকারি দল আশ্রিত মাস্তানদের হামলার শিকার হয়েছেন। এছাড়া শ্রমিকদের মারধর, হুমকি দেয়া, অপহরণ করাসহ হেন অপকর্ম নেই যা চাঁদাবাজদের পক্ষে সম্ভব নয়। দেখা যায় অনেক ঠিকাদার চাঁদাবাজদের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হয়ে নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।

ফোনে ও এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজি
বর্তমান সরকারের সময়ে অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়েছে মোবাইল ফোনে চাঁদাবাজি। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ মোবাইল ফোনে সন্ত্রাসীদের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজির শিকার হয়েছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আতঙ্কিত মানুষ থানা পুলিশকে না জানিয়েই চাঁদা দিয়ে যাচ্ছেন। ঈদ মৌসুমসহ বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায়ীদের কাছে মোটা অংকের টাকা দিতে হয়। কয়েকটি নমুনা তুলে ধরলেই ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীদের নামে চাঁদাবাজির ভয়াবহতা বোঝা যাবে।
মিরপুর রোডের ফার্নিচার ব্যবসায়ী আলমাস জানান, সম্প্রতি ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী শাহাদত কলকাতা থেকে তাকে ফোন করে বলেছে, ‘ছোট ভাইরা ৮ তারিখ দেখা করবে, ওদের পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে দিবেন। না হলে বউ, ছেলেমেয়ে নিয়ে ঈদ করতে পারবেন না। দেশের বাড়িতে সবার লাশ প্যাকেট করে পাঠিয়ে দিব। আর আমার লোক ছাড়া অন্য কেউ চাঁদা দাবি করলে আমার ছেলেদের জানাবেন। ওরা সব ম্যানেজ করে দিবে।’
শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও জানান ভিন্ন কথা। তারা বলেন, এখন শুধু তাদের নামের ওপর চাঁদা আদায় চলে না। কলকাঠি নাড়েন প্রভাবশালীরা। তাদের নাম শুনে মানুষ ভীত হলেও মূল চাবি থাকে রাজনৈতিক উপর মহলের হাতে। ফলে তারা যে টাকা পায়, এর সিংহভাগ দিতে হয় ওদের। এই নিয়ম আগেও ছিল, কিন্তু এখন অনেক বেশি বেড়ে গেছে। বিভিন্ন সময় ক্রসফায়ারসহ নানা ঘটনায় যেসব সদস্য মারা গেছে, তাদের পরিবারের সদস্যদেরও টাকার একটা অংশ দিতে হয়। এ ছাড়া আদায় হওয়া চাঁদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশই চলে যায় দেশের বাইরে আত্মপোগনে থাকা বড় ভাইদের হাতে। আর এর বাইরে পুলিশ ম্যানেজ খরচ তো আছেই।
জানা গেছে, শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ছদ্মবেশে প্রায়ই চাঁদার জন্য বেরিয়ে পড়ে। তাদের একজন কিলার খোরশেদ। সে চাঁদাবাজির জন্য কয়েক দফায় ভারত থেকে ঢাকায় আসে। মতিঝিল এলাকায় একটি রেস্টুরেন্টে তাকে কয়েক দিন আগে দেখা গেছে বাবুল তালুকদার নামে এক প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিরপুরের কাফরুলে শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীরের সহযোগী অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার আব্বাস কাশিমপুর কারাগারে বসেই মোবাইল ফোনে চাঁদাবাজি ও খুন খারাবি নিয়ন্ত্রণ করছে। তার সহযোগীদের মধ্যে রয়েছে চামাইরা বাবু, চৌধুরী বাবু, ভায়রা মাসুম, পুরনো কচু ক্ষেতে রাজু, লিটন, পল্লবীতে চামাইরা বাবু, রাসেল, চাকমা রাসেল, হাসান, সেনপাড়ায় নূরু, ১৩ নম্বরে আজাদ ও শাহীন চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ করে।
পুলিশের নথিতে রামপুরা এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহজাদা। সে বর্তমানে কারাগারে থাকায় এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য এখন খায়ের ও শাহিন নামে দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর হাতে। এই দলে আছে সন্ত্রাসী ঘাতক স্বপনের (মালয়েশিয়ায় পলাতক) বড় ভাই রিপন, পিচ্চি সোহেল, জহির ও ফয়সাল। এলাকায় এখন এই সন্ত্রাসী গ্রুপের প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসী হচ্ছে কারারুদ্ধ শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা পলাশের সহযোগী গুঁজা বাদশাহ, তপু, কিলার পলাশ, রাজীব, শাওন ও জাভেদ। বাদশাহ ও তপু তাদের দলনেতা। এ ছাড়া পিয়াস-ডিজিটাল কামাল গ্রুপ নামে আরো এক সন্ত্রাসী দল আছে এ এলাকায়। তিনটি গ্রুপই এখন গার্মেন্টসহ বিভিন্ন সেক্টরে চাঁদাবাজি করছে।
পাশের হাজীপাড়া, মালিবাগ ও চৌধুরীপাড়ার গার্মেন্ট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করছে শীর্ষ সন্ত্রাসী টুনু ও মনি। তাদের একজনের সঙ্গে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার সখ্য রয়েছে। শান্তিনগর এলাকায় চাঁদাবাজি করছে পিচ্চি শামিম ও তার সহযোগীরা। সিদ্ধেশ্বরীর ফ্রিডম রাসু কারাগারে। তার হয়ে চাঁদাবাজি করছে তার ছোট ভাই বাচ্চু এবং শিমুল ও শিশির।
মতিঝিল ও ফকিরাপুল এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এবং বিভিন্ন মার্কেটে চাঁদাবাজি করছে শোভন, মিন্টু, শাহিন, কামাল, শর্টগান সোহেল, রিয়াজ ওরফে মিল্কি ও কিলার তারেক। তারেক আগে শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিল। ইতোমধ্যে চাঁদাবাজির ভাগাভাগি নিয়ে মিল্কিকে খুন করেছে তারেক। তারেক আবার র্যাবের রহস্যজনক ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে। কিন্তু শোভন, মিন্টু, শাহীন, কামাল, শর্টগানসোহেল ও রাজাসহ অন্যান্য বাহিনীর চাঁদাবাজি অব্যহত আছে। স্টেডিয়াম এলাকার একজন ব্যাবসায়ী জানান, ‘রাজা বাহিনীকে মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা না দিলে ব্যবসা গুটিয়ে চলে যেতে হবে কিংবা জীবন দিতে হবে। তাই বাধ্য হয়েই প্রতিমাসে রাজা ভাইয়ের লোকজনকে টাকা দেই।’
পুরান ঢাকার ত্রাস ডাকাত শহীদ কয়েক দিন আগে ক্রসফায়ারে মারা গেছে। তবে চাঁদাবাজি বন্ধ নেই। সন্ত্রাসী বাঙ্গাল মামুন, দাঙ্গা লিটন, আরমান, এরফান, রাসেল, ভাগ্নে রনি, শাহজাহান, কালা মিন্টু, মুহিদ (ডাকাত শহীদের ডান হাত ছিল), চশমা নাসির, টিপু, লাবলু, সোহেল, রাসেল, মাহবুব, মুন্না, সোর্স আজমল এই এলাকায় চাঁদাবাজি করছে।
রাজধানীর তেজগাঁও-ফার্মগেট-কারওয়ান বাজার এখনো শীর্ষ সন্ত্রাসী এল. রহমান, ইরান, কিলার আশিক, চিটার জিল্লুর, মামু শাহজাহান, বাবুল ওরফে টাওয়ার বাবুল, আনোয়ার, লেংড়া শাহিন, বাচ্চু, মোশারফ, নবী সোলায়মান ও পলাতক জাকিরের (সুইডেন আসলামের ভাই) নিয়ন্ত্রণে। কারারুদ্ধ সুইডেন আসলামের স্ত্রী আয়েশাও একটি সন্ত্রাসী দল পরিচালনা করে চাঁদাবাজি করছে।
মোহাম্মদপুর, আগারগাঁও, ধানমণ্ডি আর লালমাটিয়ায় চাঁদাবাজি করছে কালা ফিরোজ, সেভেন স্টার গ্রুপের কালা খলিল, ফ্রিডম সবুজ, পিচ্চি তুহিন ওরফে মাতবর তুহিন, মজিবর, শামিম ও ডিশ শাকিল। ডিশ শাকিলের বাসা ধানমণ্ডির মধুবাজারে। তার ছিনতাইকারী বাহিনীও রয়েছে। তাদের নেতৃত্বে চলে লাখ লাখ টাকার চাঁদার খেলা।
মোহাম্মদপুর এলাকার চাঁদাবাজিতে শীর্ষ অবস্থানে আছে সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার সাইদ ব্যাপারীর ছেলে শামিম, আরেক সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার সলুর ভাতিজা মনির আর সন্ত্রাসী তুহিন। শামিম ও মনির একে অপরের প্রতিপক্ষ। দু’জনই বেশিরভাগ সময় দেশের বাইরে থাকে। মনিরের একটি সন্ত্রাসী বাহিনী আছে। মনির গ্রুপ প্রায়ই আসাদগেট ও টাউন হল এলাকায় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা নেয়।
রাজধানীর মগবাজার এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত, মুকুল, মোল্লা মাসুদ ও রনি দেশের বাইরে আত্মগোপনে। তাদের অবর্তমানে মগবাজারের চাঁদাবাজি এখন সন্ত্রাসী ফখরুলের নিয়ন্ত্রণে। কাঁঠালবাগান, কলাবাগান আর গ্রীন রোড এলাকায় চাঁদাবাজি করছে সাগর হত্যা মামলার অন্যতম আসামি নীরু ও তার সহযোগীরা।
মহাখালী, বাড্ডা ও গুলশান-বনানী এলাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে শীর্ষ সন্ত্রাসী আলমগীর-জাহাঙ্গীর। জাহাঙ্গীর যুক্তরাষ্ট্রে ছিল দীর্ঘদিন। মাঝে মাঝে দেশে আসে। তারা দুই ভাই একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী বাহিনী পরিচালনা করে। এছাড়া ওই এলাকার আরো কয়েকজন প্রভাবশালী চাঁদাবাজ হচ্ছে মিলু, কালা নাসির, আসলাম, হাসিফ, আলম, পনু, সাইদ, মনির, ইন্ডিয়ান বাবু, স্টেন রাজিব, জঙ্গি ও হাজারী মিলন। মূলত ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ই তাদের প্রধান পেশা।
খিলগাঁও তালতলা এলাকায় চাঁদাবাজি করে আওলাদ, জুয়েল, মোস্তাক ও রানা। পাশের গোড়ানে হান্নান, সবুজবাগ বাসাবোতে আজাদ, গোপীবাগে নান্নু, ইলিয়াস ও কালা নাসির। ফুলবাড়িয়া এলাকায় চাঁদাবাজি করছে বাচ্চু ও তার শ্যালক আউয়াল। এসব বাহিনী প্রতি মাসে ব্যবসায়ী, বাড়ির মালিক, চাকুরিজীবী বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে।
এভাবেই রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের সাধারণ মানুষ চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন। চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করা মানে নিজের নিশ্চত বিপদ ডেকে আনা। তাই মুখ বুঝে আতঙ্কিত হয়ে চাঁদা দিয়ে যান সাধারণ মানুষ।

চাঁদাবাজিতে দ্রব্যমূল্য বাড়ে—এফবিসিসিআই
চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইয়ের সহ-সভাপতি হেলাল উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশ ও রাজনৈতিক দল আশ্রিত মাস্তানদের চাঁদাবাজির কারণে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়। এতে পরিবহন ভাড়া বাড়ছে। মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে। এসব প্রতিকারের তিনি সরকারের কাছে অসংখ্য প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। চাঁদাবাজি প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য মনিটরিং কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন বলে জানান। নগরীর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও বলেছেন, ‘ক্ষমতাসীন দলের নেতা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং সিটি কর্পোরেশনের লোকেরাই যেখানে চাঁদাবাজি করছে সেখানে অভিযোগ করে লাভ নেই। তাই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাড়ি দিতে হবে ঈদের বাজার।’

মন্ত্রী বললেন পুলিশকে জানান
দেশের সর্বত্র চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু বলেন, চাঁদাবাজি বন্ধ ও আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে। যখনই কেউ চাঁদা চাইবে পুলিশকে জানান। তিনি বলেন, চাঁদাবাজি আগের চাইতে অনেক কমে গেছে। আর সড়ক-মহাসড়কে বাস ট্রাকে চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুলিশ গাড়ি থামায় ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক উদ্ধারের জন্য। চাঁদাবাজির জন্য। বিচ্ছিন্নভাবে কোনো কোনো পুলিশ গাড়ি থেকে টাকা আদায় করে থাকতে পারে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে পুলিশ সদর দফতর দায়ীদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে বলে জানান তিনি।