Friday, 4 October 2013

পদ্মার অতলে জাতীয় মর্যাদা

শুধু বিগত সংসদ নির্বাচনেই নয়, এর আগের দুটি সংসদ নির্বাচনী ইশতেহারে পদ্মা সেতু ছিল আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার। ক্ষমতার শেষ বেলায় এসে এখনও পদ্মা সেতুর কাজই শুরু করতে পারেনি মহাজোট সরকার। প্রধানমন্ত্রী পরিবারসহ সরকারের প্রভাবশালীদের বেশুমার দুর্নীতিতে যেন পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে পদ্মা সেতু। দুর্নীতির অভিযোগে পদ্মা সেতু প্রকল্পের অর্থায়ন বাতিল করে দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের এখন নতুন পরিচিতি দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র। দেশে-বিদেশে পরিস্থিতি এমন হয়েছে, পদ্মার অতলে বিলীন হয়ে গেছে জাতীয় মর্যাদা। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পদ্মা কেলেঙ্কারি বহু আগেই স্থান করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। পদ্মা কেলেঙ্কারি নিয়ে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক, জাইকা, আইডিবি ও এডিবির সঙ্গে। কানাডার আদালতে অভিযুক্ত করা হয়েছে আওয়ামী সরকারের একজন প্রভাবশালী সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে। খোদ প্রধানমন্ত্রী পরিবারের প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকার অভিযোগ করেছে বিদেশি গণমাধ্যম। এর পরও পদ্মা নিয়ে মন্ত্রী-এমপিদের বাগাড়ম্বর থেমে নেই। দেশীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু করা, মালয়েশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করা, চীনের বিনিয়োগে পদ্মা সেতু করা, পদ্মা সেতুর চাঁদা নেয়ার জন্য ব্যাংকে ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে বাধ্য করা, চাঁদার টাকা ভাগাভাগি নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ কর্মী খুন ও স্কুলছাত্রদের টিফিনের টাকা থেকে পদ্মা সেতুর জন্য টাকা নেয়া, মোবাইল ফোনে প্রতি মিনিটে ২৫ পয়সা সার চার্জ আরোপ করার প্রস্তাবসহ হেন কাজ নেই যা এই পদ্মা নিয়ে হয়নি। কিন্তু তার পরও শুরু হয়নি পদ্মা সেতুর কাজ। বরং এই প্রকল্প দেশের কপালে পরিয়েছে দুর্নীতির কলঙ্ক তিলক।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০০১ সালের ৪ জুলাই তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাওয়া ঘাটে পদ্মা সেতুর নামমাত্র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করেছিলেন। বিগত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোট সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প ছিল এই সেতু। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে ১/১১-পরবর্তী কারসাজির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। ক্ষমতার মেয়াদ প্রায় শেষ, কিন্তু সেতু আর হলো না। বরং দুর্নীতির কারণে পদ্মা কেলেঙ্কারির অতলে হারিয়ে গেছে দেশের জাতীয় মর্যাদা ও ভাবমূর্তি সবকিছু। সেতু হয়নি তাতে কি! জমি অধিগ্রহণ, অ্যাপ্রোচ রোড তৈরি, ঠিকাদার নিয়োগ, কাজ তদারকির জন্য পরামর্শক নিয়োগ, দরপত্র ও আর্থিক মূল্যায়ন কমিটি গঠন আর ভাঙ্গায় সরকারি দলের প্রভাবশালীদের বেপরোয়া লুটপাট এই সেতু বাংলাদেশের কপালে পরিয়েছে কলঙ্কের তিলক। শুধু দেশেই নয়, বিদেশের মাটিতেও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির পরিচিতি পেয়েছে একটি দুর্নীতিপরায়ণ দেশ হিসেবে। অযোগ্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কানাডিয়ান কোম্পানি এসএনসি লাভালিনকে কাজ দেয়ার জন্য মোটা অঙ্কের কমিশন চাওয়া থেকে এই কেলেঙ্কারির সূত্রপাত। কাজের কাজ কিছুই হয়নি, কিন্তু সেতুকে ঘিরে সরকারের ব্যয় হয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি। পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য বিশ্বব্যাংক, জাইকা, আইডিবি ও এডিবির সঙ্গে চুক্তি, দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দিয়ে প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংকের সরে গেছে। মালয়েশিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশের অর্থায়নের গল্পও শুনিয়েছে সরকার। শুনিয়েছে, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার খবরও। পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের জন্য সারা দেশের প্রায় প্রতিটি ব্যাংকে বিশেষ অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। পদ্মা প্রকল্পের নামে সরকারি চাঁদাবাজি চলেছে দেশজুড়ে। প্রকল্পের জন্য তোলা টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা নিয়ে খুন হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা। সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার পরও বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন সরকারের ফরমায়েশমতো একটি লোকদেখানো তদন্ত করেছে। বিশ্বব্যাংকসহ দাতারা প্রকল্প থেকে সরে গেলেও পদ্মা নিয়ে মন্ত্রীদের বাগাড়ম্বর থেমে নেই। যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি বলেছেন, ‘পদ্মায় বসে জ্যোত্স্নার আলো দেখব সেদিন আর বেশি দূরে নয়।’ সেই আশায় গুড়ে বালি।
এর জন্য দায়ী কে। সমালোচকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী পরিবারের প্রভাবশালী এক সদস্য, মন্ত্রী পরিবারের ঘনিষ্ঠ সৈয়দ আবুল হোসেন, আবুল হাসান চৌধুরী, নিক্সন চৌধুরী, সেতু বিভাগের মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া ও কয়েকজন প্রকৌশলী বাঁচাতে গিয়েই ভেস্তে গেছে পদ্মা সেতু। প্রকৃত অপরাধীদের বাঁচিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের পরমায়েশি তদন্তে নাখোশ হয়ে ফিরে গেছে বিশ্বব্যাংকসহ দাতারা। এর আগে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেলও সৈয়দ আবুল হোসেনকে মামলায় আসামি করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। কিন্তু তাদের কোনো যুক্তি গ্রাহ্য করেনি দুর্নীতি দমন কমিশন।
দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মংলা বন্দরের সঙ্গে রাজধানীর দ্রুত যোগাযোগের পথ সুগম করবে পদ্মা সেতু। ২০০৩ থেকে ২০০৫ সালে পরিচালিত সম্ভব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়সম্বলিত প্রকল্পের প্রস্তাব ২০১১ সালের ২৪ আগস্ট অনুমোদিত হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর দ্রুত সেতুর কাজ শুরু করার জন্য নকশা প্রণয়ন শুরু হয়। এ সময় মূল সেতু, নদীশাসন ও অ্যাপ্রোচ সড়কসহ আনুষঙ্গিক নকশা চূড়ান্ত হয়। এই নকশার ভিত্তিতে ২ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়সম্বলিত সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব একনেক সভায় অনুমোদন হয়।
২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মূল সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে ২০১৩ সালের মধ্যে সমাপ্ত হওয়ার কথা ছিল। এখন ২০১৩ সাল শেষ হতে চলল, কিন্তু দুর্নীতির কারণে সেই প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। প্রস্তাবিত পদ্মা সেতু করার পরিকল্পনা ছিল চার লেনবিশিষ্ট। এর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার, প্রস্থ ২২ মিটার। প্রণীত নকশা অনুযায়ী সেতুটি হওয়ার কথা দ্বোতলা রেল ও সড়ক সেতু।
পদ্মা কেলেঙ্কারির খবর প্রথম ফাঁস হয় কানাডিয়ান পুলিশের কাছে বিশ্বব্যাংকের দেয়া একটি অভিযোগের ভিত্তিতে। ২০১১ সালের আগস্টে কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে কাজ পেতে নির্দিষ্ট অঙ্কের কমিশন (ঘুষ) দেয়ার বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ইন্টিগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্ট অভিযোগটি করেন। অভিযোগের তদন্ত শুরু হলে ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ বাংলাদেশে পদ্মা সেতুর দুর্নীতি তদন্তে কানাডার পুলিশ শিরোনামে একটি সংবাদ বিশ্বজুড়ে হৈ-চৈ ফেলে দেয়। ওই মাসেই তদন্তে নামে কানাডিয়ান পুলিশ। ২০১১ সালে ৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ২৯০ কোটি মার্কিন ডলারের পদ্মা সেতু প্রকল্পের আর্থিক অনিয়ম নিয়ে যে আন্তর্জাতিক তদন্ত শুরু হয়েছে, তাতে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারেন।
২০১১ সালের ১ সেপ্টেম্বর কানাডার পুলিশ টরেন্টো শহরের উপকণ্ঠে এসএনসি লাভালিনের অফিসে হানা দেয়। তারা সেখান থেকে কম্পিউটারসহ বেশ কিছু আলামত জব্দ করে এবং দুর্নীতির পক্ষে প্রমাণ পায়। ওই সময় জব্দ করা একটি ডায়েরিতে হাতে লেখা ‘পারসেন্টেজ টু বি অ্যালোটেড টু স্পেসিফাইড পারসন ইন কানেকশন উইথ দ্য অ্যাওয়ার্ড অব দ্য সিএসসি কন্ট্রাক্ট।’ ওই ডায়েরিতে সংক্ষিপ্ত নামে কিছু নির্দিষ্ট পার্সেন্ট উল্লেখ ছিল। তাদের মন্ত্রীর নামে ছিল চার শতাংশ।
২০১১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাংকের ইন্টিগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্সির পক্ষ থেকে পদ্মা সেতু প্রকল্পে সরকারের প্রভাবশালী একটি অংশ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের কমিশন চাওয়ার অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দেয়া হয়েছিল। যার একটি অনুলিপি তদন্তের জন্য দুদক চেয়ারম্যানকেও দেয়া হয়। ওই চিঠিতে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও তার প্রতিষ্ঠান সাকোর ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক সাকোকে কমিশনের (ঘুষ) ভিত্তিতে এজেন্ট নিয়োগের জন্য চাপ দেয়ার প্রমাণসহ অভিযোগ ছিল।
বিশ্বব্যাংকের দাবি ও দেশজুড়ে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ এবং মেরামতে নজিরবিহীন ব্যর্থ্যতার কারণে সৈয়দ আবুল হোসনেক যোগাযোগমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে তথ্য-যোগাযোগ ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে নেয়া হয়। ওই সময় সৈয়দ আবুল হোসেনের অভিযোগ অনুসন্ধান করতে থাকে দুদক। এক পর্যায়ে অভিযোগ ‘দালিলিকভাবে প্রমাণিত হয়নি’ উল্লেখ করে ২০১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ওই চিঠি অনুসন্ধান সমাপ্ত করে। একই সঙ্গে সৈয়দ আবুল হোসেন এবং তার সহযোগীদের দায়মুক্তি দেয়া হয়।
দুদকের ওই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হয়ে বিশ্বব্যাংক আবার ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল আরেকটি চিঠিতে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সাকোর ঊর্ধ্বতন সব কর্মকর্তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ভ্রমণ বৃত্তান্ত জব্দ করার জন্য বলে। অনুসন্ধান পর্যায়ে ‘সার্চ অ্যান্ড সিজার’-এর ক্ষমতা নেই উল্লেখ করে দুদক অপারগতা জানায়। দুদকের ওই বক্তব্য গ্রহণ না করে বিশ্বব্যাংক অনুসন্ধান কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য তাদের বেতনভুক একটি ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড প্রসিকিউটর প্যানেল’কে দেয়ার প্রস্তাব করে। কিন্তু আইনের কথা তুলে দুদক তাতে অসম্মতি জানায়।
ওই পরিস্থিতিতে গত ২০১২ সালের ২৩ থেকে ২৫ জুন বিশ্বব্যাংকের ৫ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করেন। তারা সরকার ও দুদকের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করে অনুসন্ধানের অগ্রগতি জানতে চান। কিন্তু তারা দুদক ও সরকারের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হয়ে গত ২৯ জুন একটি বিবৃতি দিয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ১২০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তা চুক্তি বাতিল করে।
২০১১ সালের ১ সেপ্টেম্বর জব্দকৃত এসএনসি লাভালিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট রমেশ সাহার ডায়েরিতে কাজ পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন জনকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত ঘুষ দেয়ার তথ্য ছিল। ওই তথ্য ৬ জনের জন্য মোট কাজের ১২ শতাংশ অর্থ ঘুষ হিসেবে দেয়ার ‘ষড়যন্ত্র’ হয়েছিল। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ বরাদ্দ ছিল সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের নামে। সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী ওরফে কায়সারের নামে ২ শতাংশ, মুজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরীর নামে ২ শতাংশ, প্রাধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা মশিউর রহমানের নাম রয়েছে ‘মসি রহমানের’ নামে এক শতাংশ, সেতু বিভাগের সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার নামে ১ শতাংশ লেখা ছিল। নিক্সনের নামের পরেই রয়েছে আরেকটি নাম। তার জন্য বরাদ্দ ২ শতাংশ বলে ডায়েরিতে উল্লেখ রয়েছে। ওই নামটি কার এ বিষয়ে কোনো সূত্র নিশ্চিত করেনি। তবে কানাডিয়ান সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত সিবিসি নিউজ পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি প্রসঙ্গে ১৫ মিনিটের একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা হয় যে, পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে প্রধানমন্ত্রীর বোন শেখ রেহানাও কমিশন নিতে চেয়েছিলেন। এমন অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তিনি নিজে বা তার মন্ত্রিসভার কোনো সদস্য এ ধরনের কোনো কাজের সঙ্গে জড়িত নন। এই সংবাদ থেকে পরিষ্কার যে, প্রধানমন্ত্রীর আপন বোন শেখ রেহানা পদ্মা সেতু প্রকল্পে এসএনসি লাভালিনকে কাজ দিয়ে দুই শতাংশ কমিশন নিতে চেয়েছিলেন।
বিশ্বব্যাংক সরে যাওয়ার পর সরকারের নানামুখী তদবিরের প্রেক্ষিতে ২০১২ সালের ৫ জুন চারটি শর্তসাপেক্ষে বিশ্বব্যাংক ফিরে আসার ঘোষণা দেয়। প্রথম শর্ত সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও অর্থ উপদেষ্টা এবং প্রকল্পের ইন্টিগ্রিটি অ্যাডভাইজার ড. মশিউর রহমানসহ দুর্নীতির অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্ব পালন থেকে ছুটি প্রদান। দ্বিতীয় শর্ত ছিল দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করে এ দুর্নীতি তদন্ত করা। তৃতীয় শর্ত ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল বা ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড প্রসিকিউটর প্যানেল’ দিয়ে দুদকের তদন্ত পর্যবেক্ষণ করা। চতুর্থত সেতু নির্মাণ পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে হবে, যাতে বিশ্বব্যাংক ও অপর ঋণদাতারা প্রকল্পের ক্রয় কর্মকাণ্ড আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেতে পারে।
সেই শর্ত অনুযায়ী ২০১২ সালের ২৩ জুলাই সৈয়দ আবুল হোসেন মন্ত্রিপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। একই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর ড. মশিউর রহমানকে এক মাসের ছুটিতে পাঠানো হয়। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি আবার কাজে যোগ দেন। ২০১২ সালের ১৪ অক্টোবর তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞ টিম ঢাকায় আসে। টিমের প্রধান ছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর লুই গাব্রিয়েল মোরেনো ওকাম্পো। অপর দুই সদস্য ছিলেন হংকংয়ের দুর্নীতিবিরোধী স্বাধীন কমিশনের সাবেক কমিশনার টিমোথি টং ও যুক্তরাজ্যের গুরুতর প্রতারণা দমন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক রিচার্ড অল্ডারম্যান। তারা ওই বছরের ১৫ ও ১৬ অক্টোবর দুই দফায় দুদকের সঙ্গে বৈঠক করেন। তারা দুদকের ওই সময় পর্যন্ত তদন্তের অগ্রগতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করে আবার তদন্তের পরামর্শ দিয়ে যান।
সেই প্রেক্ষিতে দুদক সৈয়দ আবুল হোসেনসহ আসামিদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করে। অনুসন্ধান পর্যায়ে দুদক সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, সংসদের হুইপ ও প্রধানমন্ত্রীর ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে জাতীয় সংসদের হুইপ নূরে আলম চৌধুরীর ভাই মুজিবুর রহমান চৌধুরী ওরফে নিক্সন চৌধুরী, সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, পদ্মা সেতুর সাবেক প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলাম, সাকো ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান মো. নূরুল হক এফসিএ, পরিচালক খন্দকার এনআই ইসলাম, সাকোর এমডি ও পরে আইসিটি মন্ত্রী মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ, ড. দাউদ আহমেদ, প্রকৌশলী রিয়াজ আহমেদ জাবের, ড. আইনুন নিশাত, পরামর্শক নিয়োগ সংক্রান্ত মূল্যায়ন কমিটির প্রধান ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীসহ অন্তত ৩০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রমাণ নিয়ে দুদক প্রতিবেদন তৈরি করে। এই পর্যায়ে ২০১২ সালের ৩ থেকে ৫ ডিসেম্বর বিশেষজ্ঞ টিম আবার বাংলাদেশে আসে।
সূত্র জানায়, বিশেষজ্ঞ দলের দ্বিতীয় সফরে দুদকের প্রতিবেদন ও তদন্তের নানা অসঙ্গতি, সৈয়দ আবুল হোসেন, আবুল হাসান চৌধুরী ওরফে কায়সার, নিক্সন চৌধুরীসহ সরকারের চার ব্যক্তিকে আসামি না করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্য দেখা দেয়। এক পর্যায়ে তারা বৈঠক ভেঙে দিয়ে চলে যান। দেশে গিয়ে দুদক চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি লেখেন প্যানেলের প্রধান মোরিনো ওকাম্পো। সেখানেও সৈয়দ আবুল হোসেন, আবুল হাসান চৌধুরী, নিক্সন চৌধুরীসহ প্রকৃত অপরাধীদের আসামি না করা প্রসঙ্গে ক্ষোভ জানিয়ে তাদের আসামি করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়। তবে প্যানেলের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার আগেই দীর্ঘ টানাপড়েনের এক পর্যায়ে ২০১৩ সালের ৩১ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকার বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ না নেয়ার ঘোষণা দেয়। ২০১৩ সালের ১৩ জুন বিশ্বব্যাংকের প্যানেল সৈয়দ আবুল হোসেনকে এজাহারভুক্ত আসামি না করায় তাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। তারা বলেন, তাদের অভিযোগ ছিল সঠিক, কিন্তু দুদকের তদন্ত সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। ২০১৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঘুষ কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে রয়েল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ (আরসিএমপি) বাংলাদেশের আবুল হাসান চৌধুরী, কানাডিয়ান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনের সাবেক কর্মকর্তা কেভিন ওয়ালেস ও কানাডীয় নাগরিক জুলফিকার আলী ভূঁইয়াকে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন দেয়। এর ১০ দিন পর ২৮ সেপ্টেম্বর ১০ দিন তদন্ত শেষে আরসিএমপি আদালতে সাবেক পরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পরিবারের সদস্যসহ সরকারের প্রভাবশালী আরও কয়েক ব্যক্তি পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারিতে জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

Thursday, 3 October 2013

বেপরোয়া দুর্নীতির উপাখ্যান- ৩ : মহাজোটের লাইসেন্স রাজ : দলীয়ভাবে ব্যাংক-বীমা, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, রেডিও-টিভি ভাগবাটোয়ারা করে নেয়ার কাহিনী

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের দুর্নীতির উপাখ্যানে ব্যাংক, বীমা, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, প্রাইভেট টেলিভিশন-রেডিও এবং টেলিকম ব্যবসা ভাগবাটোয়ারা করে নেয়ার ঘটনাও নজির সৃষ্টি করেছে। এক কথায় বলতে গেলে একে বলা যাবে, মহাজোটের লাইসেন্সরাজত্ব কিংবা লাইসেন্সবাজির হরির লুট।
মহাজোট সরকারের পুরো মেয়াদে ৯টি বেসরকারি ব্যাংক, ১১টি বীমা কোম্পানি, ২৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ১২টি বেসরকারি টেলিভিশন, ২১টি বেসরকারি রেডিও, ৭৮টি টেলিকম লাইসেন্স এবং ২৪টি মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই দেয়া হয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, নেতা, এমপি, ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতা, আওয়ামীপন্থী ব্যবসায়ী, শিল্পী ও সাংবাদিকদের। মহাজোটের শরিকরাও এই ভাগবাটোয়ারার অংশ পেয়েছে।
তবে আওয়ামী লীগ বলয়ের বাইরের কাউকে এসব লাইসেন্সের ধারে-কাছে আসতে দেয়া হয়নি। মন্ত্রীদের ক্ষেত্রে চ্যাম্পিয়ন বলা যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে। তিনি যেমন ব্যাংকের লাইসেন্স পেয়েছেন, তেমনি পেয়েছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন। একইভাবে ব্যাংক ও টেলিভিশনের লাইসেন্স পেয়েছেন মহাজোটের শরিক জাপা চেয়ারম্যান এরশাদ। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও নিজ নির্বাচনী এলাকায় অনুমোদন নিয়েছেন একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের। প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় ফজলে নূর তাপস এমপি নিয়েছেন ব্যাংকের লাইসেন্স। ঠিকাদারি লাইসেন্স ছাত্রলীগ-যুবলীগের বাইরে বলা যায় কেউই পায়নি। বৈধ ঠিকাদারদের ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাদের কাছ থেকে বেশি টাকায় কিনে কাজ করতে হচ্ছে। লুটপাটের এমন রাজত্ব আওয়ামী লীগের আগের শাসনামলকেও হার মানিয়েছে।

দলীয় বিবেচনায় ৯টি ব্যাংক
মহাজোট সরকার দলীয় বিবেচনায় ৯টি ব্যাংকের অনুমোদন দিয়েছে। নতুন ৯টি ব্যাংকের জন্য যারা অনুমোদন পেয়েছেন, তাদের সবাই মহাজোটের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। দ্যা ফারমার্স ব্যাংকের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর। তিনি মন্ত্রী হওয়ায় বর্তমানে এ ব্যাংকের চেয়ারম্যান হয়েছেন তার স্ত্রী ড. সেতারা আলমগীর।
মধুমতি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির। এ ব্যাংকের পরিচালক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস এমপি।
মেঘনা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ এইচ. এন. আশেকুর রহমান এমপি। এ ব্যাংকে আওয়ামী লীগ নেতা ও রিহ্যাবের সভাপতি নসরুল হামিদ এমপির ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান এস.এম. আমজাদ হোসেন। আমজাদ হোসেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তিনি এলাকায় শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলাল এমপির (বাগেরহাট-১) ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। এ ব্যাংকের পরিচালক আওয়ামী লীগের সাবেক ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ও খুলনার সাবেক মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক। এ ব্যাংকটির অনুমোদনে আরও কাজ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান।
মিডল্যান্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আয়কর উপদেষ্টা এম. মনিরুজ্জামান।
ইউনিয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শহিদুল আলম। এ ব্যাংকটি অনুমোদনের সময় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান মহাজোট নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এমপির ১০ শতাংশ শেয়ার ছিল। যদিও বর্তমানে চট্টগ্রামের এস. আলম গ্রুপ ব্যাংকটি কিনে নিয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানটি আওয়ামী লীগ আমলে সবচেয়ে বেশি ব্যাংকিং সুবিধা ভোগ করছে।
প্রবাসীদের কল্যাণে তিনটি ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ নেতা ইঞ্জিনিয়ার ফরাসত আলী। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ নেতা সীমার্ক গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইকবাল আহমেদ এনআরবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান। এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা নিজাম চৌধুরী।
উল্লেখ্য, নতুন একটি ব্যাংক অনুমোদনের জন্য চারশ’ কোটি টাকা মূলধন জমা দিতে হয়েছে। মহাজোটের মন্ত্রী, নেতা যারা এ ব্যাংক পেয়েছেন, তারা সেটা দেখিয়েই এ অনুমোদন নিয়েছেন। লুটপাট দুর্নীতি যে কী হারে হয়েছে, তা এই ৪০০ কোটি টাকার মূলধন জমা দেয়ার মাধ্যমে সহজেই অনুমেয়। নতুন ৯টি ব্যাংক অনুমোদনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের দুই শাসনামলে (৮ বছরে) ২৩টি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হলো। আর বিএনপির দুই শাসনামলে (১০ বছরে) নতুন ব্যাংক দেয়া হয় ৮টি।

বীমা কোম্পানির লাইসেন্স পেয়েছেন যারা
দলীয় বিবেচনায় নতুন ১১টি বীমা কোম্পানির লাইসেন্স দিয়েছে মহাজোট সরকার। এর মধ্যে ৯টি জীবন বীমা কোম্পানি এবং দুটি সাধারণ বীমা কোম্পানি। নতুন এই লাইসেন্স দেয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের বর্তমান মন্ত্রী, সাবেক মন্ত্রী, আঞ্চলিক ও বিদেশ শাখার নেতা এবং দলের সমর্থক সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের।
সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির অন্যতম উদ্যোক্তা রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক। এই কোম্পানিতে রূপালী ইন্স্যুরেন্সেরও মালিকানা রয়েছে। সম্প্রতি রূপালী ইন্স্যুরেন্সের ২৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে রেলমন্ত্রী প্রধান অতিথিও হন। চার্টার্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সের উদ্যোক্তাদের মধ্যে আছেন সংসদের চিফ হুইপ আওয়ামী লীগ নেতা উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ। ইউনিক হোটেলের প্রতিনিধি হিসেবে এই বীমা কোম্পানিতে আরও আছেন আওয়ামী সমর্থক ব্যবসায়ী নূর আলী।
আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত আসনের এমপি ফরিদুন্নাহার লাইলী পেয়েছেন জেনিথ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের লাইসেন্স। চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতা এম. নাসির উদ্দিন নতুন অনুমোদন পাওয়া মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অন্যতম উদ্যোক্তা। গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্সের উদ্যোক্তারা হচ্ছে ব্র্যাক ফাউন্ডেশন, আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশন, স্কয়ার গ্রুপ এবং একে গ্রুপ। পরিচালক হিসেবে রয়েছেন সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর ও স্যামুয়েল এইচ চৌধুরীর নাম।
বেস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্সের উদ্যোক্তা মেজর জেনারেল (অব.) হাফিজ মল্লিক। মোশাররফ হোসেন নামক একজন হিসাববিজ্ঞানী এই কোম্পানির পরিচালক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে তিনি একজন ঋণখেলাপি।
প্রটেকটিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অন্যতম উদ্যোক্তা আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রফিকুল ইসলাম। পরিচালক রয়েছেন চট্টগ্রামভিত্তিক ক্রিস্টাল গ্রুপের মালিক ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি মোরশেদ মোরাদ ইব্রাহীমের ভাই রাশেদ মোরাদ ইব্রাহীম এবং ফুটবল ও ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকার চৌধুরী জাফরুল্লাহ শরাফত।
জাপানি কোম্পানি তাইও এবং স্থানীয় সামিট গ্রুপকে যৌথভাবে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে তাইও-সামিট ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি নামে। সামিট গ্রুপের তিনটি প্রতিষ্ঠান এবং এশিয়ান ফার্নিচারের মালিকানা রয়েছে এতে।
এনআরবি গ্লোবাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে কানাডা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল আহাদকে। এতে পরিচালক রয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতা মোস্তফা আজাদ চৌধুরী ও গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহফুজুল বারী চৌধুরী।
নতুন অনুমোদন পাওয়া দুটি সাধারণ বীমা কোম্পানির মধ্যে একটিতে মালিকানা রয়েছে শিকদার গ্রুপের। মমতাজুল হক শিকদার ও জয়নুল হক শিকদারের পাশাপাশি মিরপুরের এমপি আসলামুল হক এবং মেজর জেনারেল (অব.) বিজয় কুমার সরকার এই কোম্পানির পরিচালক হিসেবে রয়েছেন। অন্যটি হচ্ছে সেনাকল্যাণ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি।
দেশে বেসরকারি পর্যায়ে বর্তমানে ৪২টি সাধারণ বীমা কোম্পানি রয়েছে। জীবন বীমা কোম্পানি রয়েছে ১৭টি। মেটলাইফ অ্যালিকো নামে রয়েছে একটি বিদেশি জীবন বীমা কোম্পানি। এর বাইরে সরকারি সংস্থা রয়েছে দুটি—সাধারণ বীমা করপোরেশন ও জীবন বীমা করপোরেশন।
দেশে যে কোম্পানিগুলোকে আগের বারের আওয়ামী লীগ সরকার লাইসেন্স দিয়েছিল, সেগুলোর বেশিরভাগেরই অবস্থা এখন খারাপ। তেমন কোনো ব্যবসা নেই। কোনো সুশাসনও নেই এগুলোতে। দেড় যুগ আগে লাইসেন্স পাওয়া বীমা কোম্পানির বেশিরভাগই নামকাওয়াস্তে টিকে আছে। বেশ কয়েকটি সাধারণ ও জীবন বীমা কোম্পানির লাইসেন্স বাতিলের মতো পরিস্থিতি রয়েছে বলে এর আগে মত দিয়েছিল ইনস্যুরেন্স নিয়ন্ত্রণকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আইডিআরএ।

দলীয় বিবেচনায় ২৬ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন
দলীয় বিবেচনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের ক্ষেত্রেও নজির সৃষ্টি করেছে মহাজোট সরকার। গত পাঁচ বছরে চার দফায় ২৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় দেয়া হয়েছে সরকারের মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের নেতা, সরকার দলীয় এমপি, ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতা এবং সিটি করপোরেশনের সরকার দলীয় সাবেক মেয়রের নামে। শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরও বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েছেন। শিক্ষা সচিবের নামেও বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া হয়েছে। নতুন এই ২৬টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে দেশে বেসরকারি-বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এখন ৭৭টি।
অনুমোদন পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে মিরপুর শাহ আলীবাগে অবস্থিত ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের শর্ত পূরণ করতে না পারলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। সিলেটের গোলাপগঞ্জের নিজ নির্বাচনী এলাকায় অনুমোদন দেয়া হয়েছে শিক্ষামন্ত্রী নুরূল ইসলাম নাহিদের বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ-ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়। এর মূল উদ্যোক্তা চিকিত্সক আফজাল মিয়াকে দেখানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যায়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবাল আহমদ চৌধুরীকে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রকৃত মালিক শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ। রাজশাহীর মতিহারে অবস্থিত বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্যোক্তা হাফিজুর রহমান খানকে দেখানো হলেও মূল মালিকানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদার ও প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব সাইফুজ্জামান শিখরের। ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ চুয়াডাঙ্গার পৌর কলেজপাড়ায়। এর মূল উদ্যোক্তা সরকারদলীয় এমপি সোলায়মান হক জোয়ার্দার।
কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় অনুমোদন পেয়েছে ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। এর পেছনে আছেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য অধ্যাপক দুর্গাদাস ভট্টাচার্য। শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জের কার্তিকপুরের মধুপুর এলাকায় অনুমোদন পেয়েছে জেডএইচ সিকদার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি। এর পেছনে রয়েছেন আওয়ামী লীগ ঘরানার ব্যবসায়ী জয়নুল হক সিকদার। এই ব্যবসায়ী গ্রুপের সঙ্গে রয়েছেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এনামুল হক শামীম। সোনারগাঁ ইউনিভার্সিটি প্রথমে মধ্য বাড্ডায় অবস্থান বলা হলেও পরে কারওয়ানবাজারের ঠিকানা দেয়া হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা হিসেবে রয়েছেন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান এমপি নজরুল ইসলাম বাবু।
ফেনী ইউনিভার্সিটি ফেনীর ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে আবদুস সাত্তারের নাম থাকলেও এর পেছনে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একজন সহকারী একান্ত সচিব ও সাবেক একজন রাষ্ট্রদূত। খুলনার সোনাডাঙ্গার ১১৮ মজিদ সরণিতে নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির উদ্যোক্তা খুলনার সাবেক মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা তালুকদার আবদুল খালেক। চট্টগ্রামের পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রামের উদ্যোক্তা হলেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এনামুল হক শামীম। ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কুমিল্লার ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে এ এম মোজাহারুল ইসলাম হলেও এ বিশ্ববিদ্যালয়টির মূল উদ্যোক্তা হলেন শিক্ষা সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী।
একইভাবে অন্যগুলোরও উদ্যোক্তা আওয়ামী লীগ দলীয় ব্যক্তিরাই। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগই শর্ত পূরণ করেনি, দলীয় বিবেচনায়ই অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা ঢালাওভাবে বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন না দেয়ার সুপারিশ করা সত্ত্বেও মহাজোট সরকার দলীয় লোকদের ২৬টি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে।

দলীয় বিবেচনায় ২৪টি মেডিকেল কলেজ
মহাজোট সরকার দলীয় বিবেচনায় ২৪টি মেডিকেল কলেজেরও অনুমোদন দিয়েছে। বর্তমানে মেডিকেল কলেজগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নেই, অথচ একের পর এক মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেয়া হয়। দলীয় চিকিত্সক এবং ব্যবসায়ীরা এসব অনুমোদন পেয়েছেন।

দলীয় বিবেচনায় ১২টি টিভি ও ২১টি রেডিও
মহাজোট সরকার এ পর্যন্ত দলীয় বিবেচনায় ১২টি বেসরকারি টেলিভিশন ও ২১টি রেডিওর অনুমোদন দিয়েছে। রেডিওর মধ্যে এফএম রেডিও স্থাপন ও সম্প্রচারের অনুমোদন দেয়া হয়েছে ৭টি এবং কমিউনিটি রেডিও দেয়া হয়েছে ১৪টি। সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয়েছে বেসরকারি টেলিভিশন অনুমোদনের ক্ষেত্রে। অনেক টেলিভিশনের মালিকই সাংবাদিক নন।
যে ১২টি বেসরকারি টিলিভিশন চ্যানেল অনুমোদন দেয়া হয়েছে সেগুলো হলো এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি আওয়ামীপন্থী ব্যবসায়ী একে আজাদের চ্যানেল টুয়েন্টিফোর, এনায়েতুর রহমানের চ্যানেল নাইন, আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের সময় টেলিভিশন, কট্টর আওয়ামীপন্থী সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবুর একাত্তর টেলিভিশন, সরকালি দলীয় এমপি কামাল মজুমদারের মোহনা টেলিভিশন, স্কয়ার গ্রুপের অঞ্জন চৌধুরীর মাছরাঙা টেলিভিশন, আওয়ামী লীগ নেতা ও ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন, এটিএন বাংলার মাহফুজুর রহমানের এটিএন নিউজ, গাজী গ্রুপের মালিক গোলাম দস্তগীর এমপির গাজী টেলিভিশন, আওয়ামীপন্থী ব্যবসায়ী নাসির উদ্দীন সাথীর মাইটিভি, এসএ পরিবহনের মালিক সালাহ উদ্দিন আহমেদের এসএ টেলিভিশন ও আওয়ামী ব্যবসায়ী হারুন-উর রশীদের এশিয়ান টেলিভিশন।
যে ৭টি এফএম রেডিওর অনুমোদন দেয়া হয়েছে সেগুলোর মধ্যে বেগম ডলি ইকবালের একটি এফএম রেডিও, শিল্পী কুমার বিশ্বজিতের গাংচিল মিডিয়া লিমিটেড, ব্যবসায়ী আবদুল আওয়ালের পিপলস রেডিও লিমিটেড, অভিনেত্রী সারা যাকেরের এশিয়াটিক রেডিও, ব্যবসায়ী হারুন আর রশিদের এশিয়ান রেডিও, সাইদুর আফতাবের সিটি এফএম এবং রফিক মোহাম্মদ ফখরুলের টিউন এফএম। এসব রেডিও যেমন আওয়ামী লীগের দলীয় লোকদের দেয়া হয়েছে, তেমিন ১৪টি কমিউনিট রেডিও একইভাবে পেয়েছে দলীয় লোকেরা।

টেলিকম খাতের ৭৮টি লাইসেন্সও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালীদের
সরকারি দলের মন্ত্রী, এমপি আর প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়ে গেছে টেলিকম খাতের সবচেয়ে লোভনীয় শাখার ৭৮টি লাইসেন্স। কেউ সরাসরি আবার কেউ নেপথ্যে থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন এই লাইসেন্স। মন্ত্রী, এমপি আর ক্ষমতাসীনদের দলীয় প্রভাবে লাইসেন্স নেয়ায় প্রক্রিয়াটি ছিল নানা রহস্যে ঘেরা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খোদ বিটিআরসির (বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন) রেটিং পর্যন্ত মানা হয়নি। অমান্য করা হয়েছে নীতিমালার অনেক শর্ত। তালিকার উপরে থেকেও দলীয় হস্তক্ষেপের কারণে সত্যিকারের ব্যবসায়ীদের শেষ পর্যন্ত ঠাঁই হয়নি এই ব্যবসায়। অভিযোগ রয়েছে, লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে দলীয় প্রভাবের পাশাপাশি ছিল মোটা অংকের টাকার খেলা।
লাইসেন্সপ্রাপ্তদের মধ্যে খোদ রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ছেলের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘সেনগুপ্ত টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেড’ ছিল অন্যতম। নির্বাচনী হলফনামায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বার্ষিক আয় দেখিয়েছিলেন মাত্র ৭ লাখ টাকা। আর ওই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে তার ছেলে সৌমেন সেনগুপ্তের বেতন ছিল মাসে সর্বসাকুল্যে ৫০ হাজার টাকা। অথচ সৌমেন লাইসেন্স নিয়েছেন ৫ কোটি টাকা ফি দিয়ে। হঠাত্ কোনো ধরনের ব্যাংক লোন ছাড়াই এত টাকা লাইসেন্স ফি প্রদান করেছেন সৌমেন সেনগুপ্ত।
এর বাইরে ৭৮টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নিয়েছেন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে কমপক্ষে ৫ জন মন্ত্রী ও ১০ জন এমপি সরাসরি জড়িত রয়েছেন বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে জানা গেছে। এদের মধ্যে বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রী লে. কর্নেল ফারুক খানের ভাই আজিজ খানের প্রতিষ্ঠান সামিট নিয়েছে কয়েকটি লাইসেন্স। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সদস্য সুনামগঞ্জের একজন এমপি, কেরানীগঞ্জ এলাকার একজন এমপি, ঢাকার তেজগাঁও এলাকার একজন এমপি, আওয়ামী লীগের সাবেক একজন মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা বিটিআরসির কাছ থেকে আইজিএ, আইসিএক্স ও আইআইজি লাইসেন্স নিয়েছেন।
এছাড়া টেলিযোগাযোগ খাতের যত নতুন সেবা আসছে তার সবক’টিরই এক বা একাধিক লাইসেন্স পেয়েছে সামিট গ্রুপ। বহুল আলোচিত বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্পেরও কনসালট্যান্ট নিয়োগে বাংলাদেশী অংশীদার সামিট। ৩ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগের জন্য দেশি-বিদেশি ৩১টি কোম্পানি আবেদন করে। কিন্তু সবাইকে বাদ দিয়ে সামিটকেই যোগ্য বলে বিবেচিত করে বিটিআরটি। এনটিটিএন, আইটিসি, আন্তর্জাতিক গ্যাটওয়ে আইজিডব্লিউ, আইসিএক্স, আইআইজিসহ সবধরনের লাইসেন্স রয়েছে সামিটের হাতে।
বিটিআরসির ওয়াইম্যাক্স বরাদ্দেও বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। থ্রিজি নিলাম নিয়ে নাকটীয় পরিস্থিতির মধ্যে ৫ বছর আগের তরঙ্গ মূল্যে ওলো স্পেকট্রাম নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে ওয়াইম্যাক্স লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে ৩ হাজার কোটি টাকার ওয়াইম্যাক্স লাইসেন্স বরাদ্দ দেয়া হয়েছে মাত্র ২১৫ কোটি টাকায়।
পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী শুধু ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রোটোকল (ভিওআইপি) খাত থেকে প্রতিদিন রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে কমপক্ষে সাড়ে ১২ কোটি টাকা। মাসে এই ক্ষতির পরিমাণ ৩৭৫ কোটি টাকা। বার্ষিক হিসেবে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ হাজার ৫৬২ কোটি টাকারও বেশি। ভিওআইপির কারণে উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর আন্তর্জাতিক কল।
টেলিকম সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের ছত্রছায়ায় একটি মহল অবৈধ ভিওআইপির বাণিজ্যের মাধ্যমে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। সরকারের প্রভাবশালীদের আশ্রিত হওয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে না বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। অথচ ভিওআইপি শনাক্ত করার সব আধুনিক সরঞ্জাম বিটিআরসির রয়েছে। তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলেই অবৈধ ভিওআইপি বন্ধ ও সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব হতো।

বেপরোয়া দুর্নীতির উপাখ্যান- ২ : ব্যাংক ডাকাতদের কাহিনী

ডাকাতদের কবলে পড়েছে গোটা ব্যাংকিং খাত। সরকারি আর বেসরকারি দুই খাতের ব্যাংকেই চলছে সমানতালে লুটপাট। তবে বেসরকারি ব্যাংকে লুটপাট কিছুটা আড়ালে-আবডালে হলেও সরকারি ব্যাংকে লুটপাট এখন ডাকাতির পর্যায়ে চলে গেছে। ব্যাংক ডাকাতরা প্রকাশ্যেই রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো লুটেপুটে গিলে খাচ্ছে। ব্যাংক লুটপাটের এক নজির সৃষ্টি হয়েছে বর্তমান সরকারের আমলে। লুটপাটের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, বেসিক, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের অবস্থা চরম নাজুক পর্যায়ে চলে গেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ও বেসিক ব্যাংকের ব্যবসা এখন প্রায় বন্ধ। লুটপাটের কারণে সাধারণ গ্রাহক যেমন মিলছে না, তেমনি ব্যাংক দুটি থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠান বা বিভিন্ন সংস্থার আমানতও পুরোপুরি উঠিয়ে নেয়া হচ্ছে। ফলে এ দুটি ব্যাংক বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির জন্ম হয় বর্তমান মহাজোট সরকারের সময়ে। সরকারের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালীদের সরাসরি যোগসাজশে এই খাত থেকে বিগত ৫ বছরে লুটে নেয়া হয়েছে প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা। হলমার্ক, বিসমিল্লাহ্ গ্রুপসহ বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় ব্যাংক ডাকাতির মতো ঘটনার কবলে পড়ে গোটা ব্যাংকিং খাতকে টালমাটাল অবস্থায় ফেলে দিয়েছে।

যেভাবে লুটপাটের আয়োজন
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরই সরকারের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালীদের নজরে পড়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। আর এসব ব্যাংক টার্গেটে নিয়ে বসানো হয় দলীয় লোক। ব্যাংকিং রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে অদক্ষ ও নন-ব্যাংকারদের হাতে তুলে দেয়া হয় রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, বেসিক, জনতা, রূপালী ও অগ্রণী ব্যাংকের দায়িত্ব। এতে সহজ হয় ঋণের নামে লুটপাটের পথ।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেশি লুটপাটের শিকার হয়েছে সোনালী, বেসিক ও জনতা ব্যাংক। এ তিনটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান-এমডিসহ পরিচালনা পর্ষদে অধিকাংশই দলীয় লোকদের বসানো হয়। বেসিক ব্যাংকের দায়িত্ব দেয়া হয় মহাজোটের অংশীদার জাতীয় পার্টির নেতা শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর হাতে। তিনি আবার শেখ হেলালের ঘনিষ্ঠ বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিচালকদের মধ্যে সরকারি ব্যাংকে নিয়োগ পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সাবেক ভিপি ছাত্রলীগ নেতা শুভাষ সিংহ রায়, সবুজ কানন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং মহিলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক জান্নাত আরা হেনরী, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও আইনজীবী বলরাম পোদ্দার, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও নির্মাণ ব্যবসায়ী শাহজাদা মহিউদ্দিন, যুক্তরাজ্য আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকির আহমেদ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য, বুয়েট ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক আবদুস সবুর, কলামিস্ট ও মণি সিংহ-ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্টের সম্পাদক শেখর দত্ত, নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া, কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য খন্দকার জাহাঙ্গীর কবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের সাবেক ভিপি কেএমএন মঞ্জুরুল হক প্রমুখ।

হলমার্কের কবলে সোনালী ব্যাংক
দেশের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী ব্যাংক হিসেবে খ্যাত সোনালী ব্যাংকের ব্যবসা সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। এরই মধ্যে এ ব্যাংকটির সঙ্গে লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছে বিশ্বের নামি-দামি সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় ব্যাংক মে ব্যাংক জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা আর সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা করবে না। একইভাবে চীন-জাপানসহ পৃথিবীর দেড় শতাধিক বড় ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একইভাবে দেশের ভেতরকার সব ব্যাংক একযোগে সোনালী ব্যাংকের এলসি নেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এরই মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালীসহ কয়েকটি ব্যাংক পাওনা টাকা ফেরত চেয়ে সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে লিগ্যাল নোটিশও পাঠিয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আমদানি-রফতানিতেও। শুধু তাই-ই নয়, বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রেও সোনালী ব্যাংকের এলসি গ্যারান্টি গ্রহণ করছে না বিদেশি রফতানিকারকরা।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরই হঠাত্ করে নাম-ডাক আসে হলমার্ক গ্রুপের। গত দু’বছরে প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে নানা ফন্দিফিকির ও জালিয়াতির মাধ্যমে ৩ হাজার ৮৬৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা লুট করে। গণমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। পরে সোনালী ব্যাংকের জড়িত কর্মকর্তা এবং হলমার্কের এমডি, চেয়ারম্যান ও মহাব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে হলমার্কের নামে লুটপাটে জড়িত আওয়ামী লীগের দলীয় লোকজন ও প্রভাবশালীদের সবাই এখন পর্যন্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে। ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর উল্টো স্বয়ং অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তদবির করেছেন হোতাদের রেহাই দিতে। শুধু তাই নয়, এত বড় লুটপাটের পর একই প্রতিষ্ঠানকে আরও ঋণ দেয়ার চেষ্টা-তদবিরও করেছিলেন অর্থমন্ত্রী।
মহাজোট সরকারের শীর্ষ মহলের সরাসরি হস্তক্ষেপে হলমার্ক গ্রুপ সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে। প্রতিষ্ঠানটি ঋণের বিপরীতে যে সম্পত্তি দেখিয়েছে, তা ভৌতিক। যেমন হলমার্ক গ্রুপ সোনালী ব্যাংকের কাছে যেসব জমি বন্ধক রেখেছে, তার বেশিরভাগই দেখানো হয়েছে সাভারের হেমায়েতপুরে। বন্ধক হিসেবে সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় ২১৪৩ শতাংশ জমির কাগজপত্র জমা দেয়া হয় ব্যাংকের কাছে। যার বাজারমূল্য ধরা হয়েছিল ২ হাজার কোটি টাকা। সে হিসেবে প্রতি শতাংশ জমির দাম ধরা হয়েছে ৯৩ লাখ ৩২ হাজার টাকা। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ এলাকার উঁচু জমির দাম সর্বোচ্চ শতাংশপ্রতি ৫ লাখ টাকা। ফলে সোনালী ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা জমির মূল্য বাজারদরের চেয়ে ১৯ গুন বেশি দেখিয়েছে হলমার্ক গ্রুপ। সোনালী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় দেখা যায়, হলমার্ক গ্রুপের কাছে ফান্ডেড ও ননফান্ডেড ১৫৫ কোটি টাকা বকেয়া থাকার পরও ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল পর্ষদের বৈঠকে ৬৫ কোটি টাকার মেয়াদি ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। আর এটি হয়েছিল সরাসরি আওয়ামী লীগের কয়েক প্রভাবশালী নেতার সহযোগিতায়। জানা গেছে, সোনালী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের সাড়ে ৩ গুন অর্থ আত্মসাত্ করেছে হলমার্কসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
জেল থেকে হলমার্কের শীর্ষ কর্তাদের ছাড়িয়ে আনতে সরকারের ভেতর থেকেই একটি মহল সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও এতে ওকালতি করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ২৮ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়ে হঠাত্ এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকেন অর্থমন্ত্রী। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের হলমার্ক বিষয়ে তার অবস্থান অনেকটা স্পষ্ট করেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৮২ সালে ১০ জন বড় ঋণখেলাপি ছিলেন। একেকজন পয়সা নিয়েছিলেন সাত থেকে আটটি ব্যাংক থেকে। কিন্তু তখন তা ফেরত দেওয়ার অবস্থা ছিল না তাঁদের। ঋণখেলাপিদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও দায় হিসাব করে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। হলমার্কের ক্ষেত্রে এরকম কিছু একটা হবে।’ ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, ‘হলমার্ক যে টাকা নিয়ে গেছে, তা জনগণের টাকা। এই টাকা উদ্ধার করতে হবে। উদ্ধারের জন্য দরকার কারখানা চালু। আর সেজন্যই ওদের দরকার আরও ঋণ।’ হলমার্ক নিয়ে যারা কথা বলছেন, তাদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার রয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
সোনালী ব্যাংকে লুটপাটের ঘটনায় কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে জানতে চাইলে দুদকের একটি সূত্র বলেছে, ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান কাজী বাহারুল ইসলামসহ ১০ জনের ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে। অন্যরা হলেন—সাবেক পরিচালক জান্নাত আরা হেনরী, শুভাষ সিংহ রায়, কাশেম হুমায়ুন, আনোয়ার শহিদ, এএসএম নায়েম, কেএম জামান রোমেল, সত্যেন্দ্র চন্দ্র ভক্ত, মো. শহিদুল্লাহ মিয়া ও সাইমুম সারোয়ার কমল।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, সোনালী ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় হলমার্ক ও সোনালী ব্যাংকের মোট ৭৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। গত বছর ৪ অক্টোবর এ জালিয়াতির প্রেক্ষিতে হলমার্কের তানভীর মাহমুদসহ ২৭ জনের বিরুদ্ধে ১১টি মামলা করে দুদক।
দুই এমপিপুত্রের সহযোগিতায় বিসমিল্লাহ্ গ্রুপ লুট করেছে ১২শ’ কোটি টাকা : হলমার্কের পর মহাজোট সরকারের আমলে ব্যাংকিং খাতে লুটপাটের ঘটনায় এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ‘বিসমিল্লাহ্ গ্রুপ’। প্রতিষ্ঠানটির দুই অবৈতনিক পরিচালক জামিল হাসান দুর্জয় ও মোহাম্মদ আলীর সহায়তায় ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণের নামে ১২০০ কোটি টাকা লুট করা হয়। এরই মধ্যে দুদক এই দুর্নীতির তদন্ত শুরু করেছে।
সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির কাছে এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন সাজ্জাদ হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী। তার অভিযোগে বলা হয়, হলমার্ক গ্রুপের পর বড় ধরনের ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত বিসমিল্লাহ্ গ্রুপ। এই গ্রুপটি জালিয়াতির মাধ্যমে ৬টি ব্যাংক থেকে ১২শ’ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এই কেলেঙ্কারির ঘটনার তদন্ত শুরু করলেও বর্তমান সরকারের আমলে তা শেষ হবে কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ওই ব্যবসায়ী।
জানা গেছে, বিসমিল্লাহ্ গ্রুপকে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ১২শ’ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ পেতে সহযোগিতা করেছে প্রতিষ্ঠানটির দুই অবৈতনিক পরিচালক গাজীপুরের শ্রীপুর এলাকার আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট রহমত আলীর ছেলে জামিল হাসান দুর্জয় ও আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত কুমিল্লার এক এমপির ছেলে মোহাম্মদ আলী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তদন্তে দেখা গেছে, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন পক্ষের যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বিসমিল্লাহ্ গ্রুপের মালিক খাজা সোলায়মান আনোয়ার চৌধুরী। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের প্রাইম ব্যাংক থেকেই বিসমিল্লাহ্ গ্রুপ হাতিয়ে নিয়েছে ৪১১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে জনতা ব্যাংকের শীর্ষ ব্যক্তিরাও জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ড. আবুল বারকাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমপি পুত্রদ্বয়ের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকার কথা জানিয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। ফলে বিসমিল্লাহ্ গ্রুপ সহজেই জনতা ব্যাংক থেকে এই বিপুল অঙ্কের অর্থ লুটে নেয়।
জনতা ব্যাংকে অভিনব জালিয়াতি : সরকারি জনতা ব্যাংকে লুটপাট শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবন্ধ থাকেনি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে জনতা ব্যাংকের শাখায় অভিনব উপায়ে অর্থ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। ব্যাংকটির দুবাই শাখায় কোনো হিসাব খোলার আগেই মেসার্স স্টিভেন ফ্রন্স গ্রোসারির নামে হিসাব নম্বর ব্যবহার করে ৯ লাখ ৫১ হাজার ডলারের (প্রায় ৯ কোটি টাকা) এলসি জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কেবল কোম্পানিটির মৌখিক প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ওই এলসি খোলেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। পরে কোম্পানিটির রফতানি মূল্য বাবদ জমা হওয়া পাঁচ লাখ ১৮ হাজার ডলার আদায়ের সুযোগ থাকলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, ব্যাংকে স্টিভেন ফ্রন্সের কোনো সহায়ক জামানত না থাকায় ওই অর্থ আদায়ের আর কোনো সুযোগ নেই। এ অবস্থায় পুরোটাই জনতা ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রমাণ পেয়েছে, আমিরাতে জনতা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী এসব এলসি খোলা ও শিপিং ডকুমেন্ট পাঠাতে ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করেছেন। ওইসব জাল ডকুমেন্ট ইরানের ব্যাংক মিলিতে পাঠানো হয়। সেগুলো ভুয়া শনাক্ত হওয়ার পর ব্যাংকটি তা ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ফেরত পাঠায়। পরে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়টি তদন্ত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে অনুরোধ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি দল সরেজমিন পরিদর্শনকালে অনিয়মের প্রমাণ পায়। এসব অনিয়মের তথ্য-্রপ্রমাণসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
প্রতিবেদনে এই অনিয়মকে ‘গুরুতর ও নজিরবিহীন আর্থিক অনিয়ম’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একইসঙ্গে ঘটনার জন্য জনতা ব্যাংকের আমিরাতের প্রধান নির্বাহী শফিকুল ইসলাম, দুবাই শাখার তত্কালীন শাখা ব্যবস্থাপক আবদুল মোমেন ও কর্মকর্তা শাহাবুদ্দিনকে দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে জনতা ব্যাংকের পৃথক তদন্তে শফিকুল ইসলামকে অভিযোগ থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আবুল বারকাতের মৌখিক নির্দেশে অভিযুক্ত এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে তদন্ত থেকে বাদ দেয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এই অনিয়মের সঙ্গে শফিকুল ইসলামের সম্পৃক্ত থাকার যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। আর জনতা ব্যাংকের তদন্ত দল প্রকৃত ঘটনার উল্লেখ না করে মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে অনিয়মের হোতাকে বাঁচানোর অপচেষ্টা করেছে।

বেসিক ব্যাংক
রাষ্ট্র খাতের বেসিক ব্যাংকে লুটপাট চলছে। কোনো নিয়মনীতি, বিধিবিধানের তোয়াক্কা করছে না ব্যাংকটির পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। অন্তত সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা এই ব্যাংক থেকে জাল-জালিয়াতি, অনিয়ম করে বের করে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব কাজে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার যোগসাজশের বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনেও একাধিকবার উঠে এসেছে। যেমন গ্রাহক সম্পর্কে শাখা থেকে প্রধান কার্যালয়ে চিঠি দিয়ে লেখা হয়েছে, ‘তাদের ঋণ বা ক্রেডিট কমিটি ঋণ দিতে সম্মত নয়।’ তারপরও পরিচালনা পর্ষদ ঋণ অনুমোদন করেছে। আবার ঋণ প্রস্তাব শাখা থেকে পাঠানোর আগেই ঋণের অনুমোদন দেয়ারও উদাহরণ রয়েছে। এমনকি অনেক অস্তিত্বহীন, ভুয়া অর্থাত্ কাগুজে বা বেনামি প্রতিষ্ঠানকেও ঋণ দিয়েছে ব্যাংকের পর্ষদ। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর জাতীয় পার্টির নেতা শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে এই ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে বসানো হয়।
বছর পাঁচেক আগেও বেসিক ব্যাংক ছিল দেশের অন্যতম ভালো মানের ব্যাংক। কিন্তু নানা ধরনের অনিয়মের কারণে এখন ব্যাংকটির পরিস্থিতি নাজুক। বেসিক ব্যাংকের পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে আলোচনা চলছিল সেখানে প্রশাসক নিয়োগের। কিন্তু শীর্ষ পর্যায় থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বেসিক ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চে তা দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। অর্থাত্ চার বছর তিন মাসে ব্যাংকটি ছয় হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে, যার প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকাই নিয়ম ভেঙে দেয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে। এর মধ্যে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার অনিয়ম তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সার্বিক বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কাজী ফখরুল ইসলাম তাদের ব্যাংকের পরিস্থিতি ধারাবাহিকভাবে ভালো হচ্ছে বলে মত দেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ঋণ-আমানতের অনুপাত ৯০ শতাংশ থেকে কমে ৮১ শতাংশে চলে এসেছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের ভিত্তিতে বেসিক ব্যাংকে একটা বিশদ পরিদর্শন চালায়। সে সময় ব্যাংকের শান্তিনগর শাখায় ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঋণ হিসাব পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজের কম্পোজিট ঋণসীমা ১৫১ কোটি ৭৫ লাখ টাকার সহায়ক জামানত খুবই অপ্রতুল। লেনদেন অসন্তোষজনক হওয়া সত্ত্বেও অল্প সময়ের মধ্যে গ্রাহকের অনুকূলে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল ঋণ ছাড় করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণ ঋণ (এলটিআর) পুনঃ পুনঃ মেয়াদ বৃদ্ধির পরও অনাদায়ে মেয়াদি ঋণে পরিণত করা হয়েছে (৫০ কোটি টাকা), যার সন্তোষজনক মালামাল মজুত নেই। এরই মধ্যে মেয়াদি ঋণের কিস্তিও খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।’ ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজের মালিক ওয়াহিদুর রহমান।
পরবর্তী সময়ে জানা যায়, একই মালিকের অটো ডিফাইনের ঋণসীমা ১৬৩ কোটি টাকা। এই কোম্পানির ঋণ যেদিন (২০১০ সালের ২ নভেম্বর) অনুমোদন করা হয়, তার পরদিনই (৩ নভেম্বর) মালিকানা পরিবর্তন করা হয়। নতুন মালিক হন জনৈক আসমা খাতুন। এর কারণ হলো, দুই কোম্পানির মালিক একই ব্যক্তি হলে তাদের ঋণসীমা একক ব্যক্তি বা গ্রুপ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে। ফলে ব্যাংকের কর্মকর্তারা কৌশল শিখিয়ে এভাবে ঋণ দেন ওয়াহিদুর রহমানকে। দুটি ঋণই এখন খেলাপি।
পরে আবার গুলশান শাখা থেকেও ওয়াহিদুর রহমানকে ঋণ দেয়া হয়েছে নানা অনিয়ম করে। ওয়াহিদুর রহমানের বেনামি প্রতিষ্ঠান এবি ট্রেড লিঙ্ককে শাখা থেকে প্রস্তাব পাঠানোর আগেই প্রধান কার্যালয় থেকে ঋণের অনুমোদন দেয়া হয়। শাখা থেকে এবি ট্রেডের ঋণ প্রস্তাব পাঠানো হয় ২০১১ সালের ১২ সেপ্টেম্বরে আর পরিচালনা পর্ষদ ঋণটি অনুমোদন দেয় ৬ সেপ্টেম্বর।
গুলশান শাখায় মা টেক্স, এসপিএন ও ইএফএস এন্টারপ্রাইজের নামে মঞ্জুর করা ঋণের পরিমাণ ১৭২ কোটি টাকা। কাগুজে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী হচ্ছেন জনৈক শামীম চিশতি। ব্যাংক সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানগুলো ও তাদের হিসাব খুলতে যারা পরিচয়কারী ছিলেন, তাদের মধ্যে যোগসাজশ রয়েছে। এক ব্যক্তির ছবি একাধিক নাম দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিক বানানো হয়েছে। যেমন একই ব্যক্তির ছবি রয়েছে রেজকা শিপিং লাইন্সের মালিক জনৈক আবদুর রহমান ও এসপিএন এন্টারপ্রাইজের মালিক আবদুর রবের নামে। এরাই আবার একে অপরের পরিচয়কারী। এই প্রতিষ্ঠান তিনটিকে ঋণ দিতে ব্যাংকের গুলশান শাখা কোনো সুপারিশ করেনি। শুধু প্রস্তাবটি পাঠিয়ে দিলেই পরদিন পর্ষদ ঋণ অনুমোদন করে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৩ সালের শুরুতে ব্যাংকটির শান্তিনগর, দিলকুশা, গুলশান ও রাজশাহী শাখায় বিশেষ পরিদর্শন চালিয়েছিল। তারও আগে প্রধান কার্যালয়ে পরিদর্শন হয়েছে। আর নিয়মিত বিশদ পরিদর্শন চলেছে বছর বছর। সব ক্ষেত্রেই বড় বড় অনিয়ম ধরা পড়েছে। ব্যাংকটির অনিয়ম-দুর্নীতির পরিস্থিতি শুরুতেই সামাল দিতে না পেরে বছর তিনেক আগে তত্কালীন এমডি একেএম সাজেদুর রহমান ব্যক্তিগত ও শারীরিক অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে পদত্যাগ করেন।
বেসিক ব্যাংকের সংঘ স্মারকের ৪(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে ৫০ শতাংশ ঋণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে বিতরণের কথা। কিন্তু বেশিরভাগ ঋণই হচ্ছে বড় অঙ্কের। বেসিক ব্যাংকের গুলশান শাখা সূত্র জানায়, অনেকগুলো কোম্পানির চলতি হিসাব খোলার পর অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে ঋণ অনুমোদন করে পরিচালনা পর্ষদ। যেমন ২০১২ সালের ২ এপ্রিল শিফান শিপিং লাইন্স শাখায় চলতি হিসাব খোলে, ৪ এপ্রিল ঋণ প্রস্তাব দিলে পর্ষদ ৫ এপ্রিল তা অনুমোদন করে। শিফান শিপিং লাইন্সের ডিসেম্বরভিত্তিক স্থিতি ছিল ৫৮ কোটি দুই লাখ টাকা। এস সুহি শিপিং লাইন্স, ব্রাদার্স এন্টারপ্রাইজ, দিয়াজ হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ও এসজিএফ শিপিং লাইন্সের ঋণ প্রস্তাব যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ দেয়া হয়নি। শাখা সূত্রটি বলছে, তারা আসলে প্রধান কার্যালয়ের চাহিদা অনুসারে ঋণগুলোর প্রস্তাব তৈরি করে পাঠিয়ে দিয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক অদ্ভুত আচরণে সব ধরনের অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে বেসিক ব্যাংক। ব্যাংকের দিলকুশা, শান্তিনগর, গুলশান ও রাজশাহী শাখায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ধরা পড়েছে। এসব অনিয়মে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন দলকে কোনো ধরনের সহযোগিতা না করায় মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেছে তদন্ত। অবশেষে অনেকটা দায়সারা গোছের একটি চিঠি বেসিক ব্যাংকের অডিট কমিটির চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়েছে। এরপরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাড়া দেয়নি ব্যাংকটি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা গেছে, এ ব্যাংকের অধিকাংশ ঋণ বিতরণে বড় ধরনের অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। এসব অনিয়মের সঙ্গে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকার প্রমাণও পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এমনকি ঋণের একটি অংশ বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যম হয়ে চেয়ারম্যানের অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল ঘুষের টাকা স্থানান্তরে যেসব হাতবদল হয়েছে, সে চক্রের অনুসন্ধানে নামলে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে বাধা দেয়া হয়। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাকে একটি গোয়েন্দা সংস্থা ফোন করে বেসিক ব্যাংকের অনিয়মের অগ্রসর প্রতিবেদন দাখিল না করার জন্য সতর্ক করেছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এ প্রসঙ্গে বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফখরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ঋণ বিতরণে অনিয়মের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে আমরা একটি টিম গঠন করেছি। টিমটি এরই মধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে।
সূত্র জানায়, ব্যাংকের মাত্র তিনটি শাখা থেকে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। আর এসব ঋণের বেশিরভাগই অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে। গুলশান শাখা থেকে অনিয়মের মাধ্যমে এক হাজার ৬০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৬টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান, ৯টি প্রতিষ্ঠানের নামে অনুমোদনহীন ঋণসীমা প্রদান, ছয়টি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এলসি না খুলে বিদেশে অর্থ পাচার, এলসির অর্থ ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পে-অর্ডার করে স্থানান্তর ও ভুয়া জামানতের মাধ্যমে ঋণ প্রদান। আর যেসব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণ দেয়া হয়েছে, তার বেশিরভাগই নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে দেয়া। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দিলকুশা শাখার মাধ্যমে ১৪০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণে অনিয়ম পেয়েছে। এসব ঋণ প্রদানে ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান, মর্টগেজ ছাড়াই ঋণ এবং উেকাচ গ্রহণের মাধ্যমে ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে।
এদিকে সরকারি ৫ ব্যাংকের কাছে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের দুই-তৃতীয়াংশ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, তহবিল ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ঋণ বিতরণের কারণে ব্যাংকগুলোর এই উদ্বেগজনক চিত্র। প্রতিবেদন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী, জনতা, অগ্রণী এবং বিশেষায়িত কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে রয়েছে সর্বাধিক খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিসেম্বর ২০১২ শেষে সামগ্রিক ব্যাংক খাতে ৪২ হাজার ৭২৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানার তিনটি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত দুটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৬২ দশমিক ৭০ শতাংশ।
এক বছরে ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি বেড়েছে ৭০ শতাংশ : ব্যাংকিং খাতে সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি বৃদ্ধির হার অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবেই গত এক বছরে ব্যাংক সেক্টরে দুর্নীতি বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, দেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে অনিয়ম-দুর্নীতি জেঁকে বসেছে। ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও হয়রানির জন্য গ্রাহকদের অভিযোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে। গ্রাহকদের অভিযোগের শীর্ষে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংক। এ তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে হলমার্ক কেলেঙ্কারির জননী সোনালী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাস্টমার সার্ভিসেস ডিভিশনের ২০১২-১৩ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১-১২ অর্থবছরে গ্রাহকরা মোট ২ হাজার ৫২৬টি অভিযোগ করেছিলেন। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছিল ২ হাজার ৩৭০টি। অর্থাত্ নিষ্পত্তির হার ছিল ৯৩ দশমিক ৮২ শতাংশ। আর বিদায়ী ২০১২-১৩ অর্থবছরে গ্রাহকদের মোট অভিযোগ এসেছে ৪ হাজার ২৯৬টি। যার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ২ হাজর ৯৪১টি। অর্থাত্ মোট নিষ্পত্তির হার ৬৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
হিসাবমতে, গত অর্থবছরের আগের অর্থবছরের তুলনায় অভিযোগ বেড়েছে ১ হাজার ৭৭০টি। কিন্তু অভিযোগ নিষ্পত্তির হার কমেছে। গত বছরে তার আগের তুলনায় অভিযোগ নিষ্পত্তির হার ২৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ কমেছে।
এছাড়া ২০১১ সালের ২৮ মার্চ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে সর্বমোট ৭ হাজার ১৪৪টি অভিযোগ এসেছে। যার মধ্যে এখনও ১ হাজার ৫৪৭টি অভিযোগের কোনো সুরাহা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে। যা মোট অভিযোগের ৪৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ। তার পরের অবস্থানে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ৪ বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৩৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ। এছাড়া বিশেষায়িত ৪ ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১৪ দশমিক ০৫ শতাংশ, বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৩ দশমিক ০২ শতাংশ এবং ব্যাংক ব্যতীত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দশমিক ১৫ শতাংশ অভিযোগ এসেছে।
তবে প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৩০টি বেসরকারি ব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ৪৪.৮৩ শতাংশ; কিন্তু সরকারি মাত্র ৪টি ব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রায় ৩৮ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির শীর্ষে রয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংক। ব্যাংটির বিরুদ্ধে অভিযোগের সংখ্যা ৫৯৪টি। এর মধ্যে ২৯২টি অনিষ্পন্ন রয়েছে। ব্যাংকটির অভিযোগ নিষ্পন্নের হার মাত্র ৫০.৮৪ শতাংশ। অভিযোগের দ্বিতীয় স্থানে থাকা জনতা ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৩২৮টি ও তৃতীয় থাকা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের বিরুদ্ধে ২৯৬টি অভিযোগ রয়েছে।
বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর শীর্ষে রয়েছে প্রাইম ব্যাংক এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের বিরুদ্ধে অধিক পরিমাণ অভিযোগ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা পড়েছে। প্রাইম ব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে ১৩৩টি, যার মধ্যে ৯৩টি এখনও অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে।
গ্রাহকদের অভিযোগের শীর্ষ ১০ ব্যাংকের মধ্যে ৬টিই সরকারি ব্যাংক। ৪টি বেসরকারি ব্যাংক হচ্ছে—প্রাইম, যমুনা, ইসলামী ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, ব্যাংকের প্রকৃত মালিক হলেন গ্রাহকরা। সুতরাং তাদের অভিযোগ ব্যাংকগুলোকে শুনতে হবে। তাদের দিকে নজর দিতে হবে। ব্যাংকগুলোকে গ্রাহক সেবার মান বাড়াতে হবে।
তিনি আরও বলেন, গত চার বছরে ৫৬ শতাংশ ব্যাংক হিসাব বেড়েছে। বাকি ৪৪ শতাংশ ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার জন্য তিনি ব্যাংকারদের প্রতি আহ্বান জানান। এছাড়া ব্যাংকের গ্রাহক সন্তুষ্টিকে ক্যামেলস রেটিংয়ে অন্তর্ভুক্ত করে ব্যাংকগুলোর মান নির্ধারণ করার কথা বলেন তিনি।

বেপরোয়া দুর্নীতির উপাখ্যান- ১ : শেয়ারবাজার লুটপাট

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের বেপোরোয়া দুর্নীতির এক নিষ্ঠুর উপাখ্যান শেয়ারবাজার লুটপাট। ক্ষমতাসীন দলের লুটেরারা শেয়ারবাজারে কারসাজি করে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা গ্রাস করে নিয়ে গেছে। এই টাকার বেশিরভাগই পাচার হয়ে গেছে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারের ৩৩ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী তাদের পু্ঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। তাদের হাহাকারে সারাদেশ স্তম্ভিত। তবে লুটেরারা নির্বিকার। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার ঠিক দুই বছরের মাথায় শেয়ারবাজারে লুটপাটের এ ঘটনা ঘটে। লুটপাটের সঙ্গে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা সালমান এফ রহমান, মন্ত্রী ফারুক খান, লোটাস কামালসহ সরকারের ঘনিষ্ঠজন জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। দেশের শেয়ারবাজারের ইতিহাসে দু’বার কেলেঙ্কারি আর লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। আর দুটি ঘটনাই ঘটেছে আওয়ামী লীগের শাসনামালে। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে নিয়ে গেছে আওয়ামী লীগের লুটেরা গোষ্ঠী। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর তারা লুটপাটের কলঙ্কের দাগ মোছনের কোনো চেষ্টা তো করেইনি; বরং ১৯৯৬ সালের চেয়ে আরও বড় ধরনের কেলেঙ্কারি আর লুটপাটের রেকর্ড গড়েছে আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬ সালের মতো এবারও লুটপাটকারীদের কোনো ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি। তারা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। দেশের শেয়ারবাজারে এতো বড় লুটপাট ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটলেও আওয়ামী লীগের আজ্ঞাবাহী দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করেছে।

আওয়ামী লীগের লোকেরাই শেয়ারবাজারে লুটপাটের সঙ্গে জড়িত :
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে শেয়ারবাজারে সাধারণ মানুষকে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করা হয়। সাধারণ মানুষ না বুঝেই এ পাতা ফাঁদে পা দেয়। শেষ পর্যন্ত লুটপাটকারীরা নানা উপায়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুঁজির সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যায়। এ লুটপাটে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা জড়িত ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। তারা বলেন, ১৯৯৬ সালে যারা লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ছিল, এবারও তারা এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এবার নতুন করে আরও অনেকে যুক্ত হয়েছেন। তবে লুটপাটের সঙ্গে যারাই যুক্ত ছিলেন তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। লুটপাটের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততার বিষয়টি দলটির অনেক নেতাও স্বীকার করেছেন।
২০১১ সালের ২৩ মে সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য শেখ সেলিম বলেন, আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার জন্য আওয়ামী লীগ নামধারী কিছু লোক এ কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছে। দু’-একজনের জন্য সরকার বা আওয়ামী লীগ তার দায় নেবে না।’ তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ নামধারী কিছু লোক শেয়ারবাজারের এ অবস্থা করেছে। ১৯৯৬ সালেও এমন হয়েছিল। তখনও ব্যবস্থা নেবো-নিচ্ছি করতে করতে পুরো দায় আওয়ামী লীগের ওপর পড়েছিল।’ আওয়ামী লীগের আরেক সংদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একই আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, ‘শেয়ারবাজার কারসাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ধরতে হলে অর্থমন্ত্রীকে সর্ষের মধ্যেই ভূত খুঁজতে হবে। শেয়ারবাজার ঘটনায় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সর্ষ দিয়ে ভূত তাড়ানো যাবে না। কারণ, ‘ভূত সর্ষেতেই আছে। তিনি আরও বলেন, শেয়ারবাজার কারসাজির ঘটনায় কোথায় দরবেশ, কোথায় ইমাম, কোথায় মোয়াজ্জেম আছে খুঁজে বের করুন।’
বহুল আলোচিত, সমালোচিত সালমান এফ রহমান শেয়ারবাজারে ‘দরবেশ’ নামেই পরিচিত। তার শ্বেতশুভ্র দাড়ি এবং ধবধবে সাদা পোশাক-পরিচ্ছদের কারণে তিনি এ নামে পরিচিত। সালমান এফ রহমান আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা।
অবশ্য শেয়ারবাজার লুটপাটে বিএনপির লোকেরা জড়িত বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অভিযোগ করে বক্তব্য দিলেও আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য আ হ ম মোস্তফা কামাল প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যটি রাজনৈতিক।’ অর্থাত্ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের বিরোধিতা করে আ হ ম মোস্তফা কামাল প্রকারান্তে বলে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের লোকেরাই শেয়ারবাজার লুটপাটের সঙ্গে জড়িত। আর এ কারণেই লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের কোনো ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

আওয়ামী লীগ নেতাদের কয়েকটি কোম্পানির দুর্নীতি ও লুটপাটের চিত্র :
শেয়ারবাজার লুটপাটে আওয়ামী লীগের লুটেরাগোষ্ঠীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতার কোম্পানি নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে গেছে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া তো দূরেই থাকুক; বরং নানা আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে সেসব অনিয়মগুলোকে বৈধতা দিয়েছে। বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী ফারুক খানদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপ, সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো, অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য আ হ ম মোস্তফা কামালের মালিকানাধীন সিএমসি কামাল টেক্সটাইল মিলস নানা অনিয়ম আর কারসাজির মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বলে বড় ধরনের অভিযোগ রয়েছে।
‘সরাসরি তালিকাভুক্তি’র মাধ্যমে বেসরকারি কোম্পানির পরিচালকরা শেয়ারবাজার থেকে অর্থ তুলে নিজেদের পকেট ভারি করে থাকেন বিধায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে বিএসইসি এ পদ্ধতিটি বাতিল করে দেয়। কিন্তু এরপরও নিয়ম বহির্ভূতভাবে তত্কালীন বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খানের (পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী) পারিবারিক প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপের কেপিসিএল এবং ওসিএলকে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ দেয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বিএসইসিকে সুপারিশ করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশক্রমে কোনো ধরনের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই কোম্পানি দুটিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেয় বিএসইসি। শেয়ারের প্রিমিয়াম নির্ধারণে ব্যবহার করা হয় বুকবিল্ডিং পদ্ধতি। এ পদ্ধতিটি ব্যবহার করে মূলত কারসাজির মাধ্যমে অযৌক্তিক প্রিমিয়াম নির্ধারণ করে কোম্পানি দুটো। আর অযৌক্তিক দরেই কোম্পানি দুটিকে সরাসরি তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেয় বিএসইসি। ১০ টাকা অভিহিত দরের কেপিসিএলের শেয়ারের প্রিমিয়াম ধরা হয় ১৮৪ টাকা। সে হিসাবে প্রতিটি শেয়ারের ওসিএলের ১০ টাকার শেয়ারের দর নির্ধারণ করা হয় ১৪৫ টাকায়। এর মাধ্যমে কেপিসিএল এবং ওসিএলের পরিচালকরা শেয়ারবাজার থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।
ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর করার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের টাকা হাতিয়ে নেয় সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপের বেক্সটেক্স কোম্পানি। কোম্পানির ২০০৮ সালের ব্যালেন্সশিট অনুযায়ী ৪৫৩ কোটি টাকার ঋণ ছিল। পরবর্তীতে ঋণের বিপরীতে ৬৫৩ কোটি টাকার নতুন শেয়ার ইস্যু করা হয়। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ২২ টাকা প্রিমিয়াম ধরা হয়। ঋণকে শেয়ারে রূপান্তর করে আবার সেই শেয়ারকে প্রিমিয়ামে বিক্রি করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে কোম্পানিটি। এ অনিয়মের বিষয়ে যাতে ভবিষ্যতে প্রশ্ন তোলা না যায় তারই অংশ হিসেবে বেক্সটেক্স কোম্পানিকে বেক্সিমকোর সঙ্গে মার্জ করা হয়েছে।
হিসাব জালিয়াতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য আ হ ম মোস্তফা কামালের মালিকানাধীন সিএমসি কামাল টেক্সটাইল মিলস। এ কোম্পানিটি প্রিমিয়াম মূল্যে রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ৬৬ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা এ কোম্পানিটিকে হঠাত্ করেই ২০০৯ সালে লাভজনক কোম্পানি হিসেবে দেখানো হয়। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে হিসাব জালিয়াতির মাধ্যমে কোম্পানির আর্থিক হিসাব বিবরণী পাল্টে দিয়ে প্রিমিয়াম মূল্যে রাইট শেয়ার ইস্যুর অনুমোদনে আবেদন করে। কিন্তু হিসাব জালিয়াতি করেও প্রিমিয়াম মূল্যে রাইট শেয়ার ইস্যুর শর্ত পূরণ করতে পারেনি সিএমসি কামাল টেক্সটাইলস মিলস। পূর্ববর্তী ৩ বছরে কোনো কোম্পানি লোকসানে থাকলে প্রিমিয়াম মূল্যে রাইট শেয়ার ইস্যু করতে পারে না। কিন্তু সিএমসি কামাল টেক্সটাইলস মিলস ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে সাড়ে ৭ টাকা প্রিমিয়ামে বাজার থেকে অর্থ তুলে নিয়েছে। অর্থমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে রাইট শেয়ার ইস্যুর অনুমোদন করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া পরিকল্পিতভাবে সিএমসি কামাল টেক্সটাইলস মিলসের মূল্য সংবেদনশীল নানা ধরনের তথ্য প্রচার করে কোম্পানির শেয়ারের দর বাড়িয়ে অত্যন্ত চড়া দরে বোনাস শেয়ার বিক্রি করে আ হ ম মোস্তফা কামাল এবং তার পরিবারের সদস্যরা কোটি কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নিয়ে গেছেন।
এছাড়া কোনো নিয়মনীতি না থাকা সত্ত্বেও বিএসইসি ২০১০ সালে ৮টি কোম্পানিকে অগ্রাধিকার শেয়ার ছাড়ার অনুমোদন দেয়। এসব কোম্পানি অগ্রাধিকার শেয়ারের মাধ্যমেও হাজার কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নেয়। অগ্রাধিকার শেয়ার ছেড়ে অর্থ সংগ্রহকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে শেখ হাসিনার অন্যতম উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন কোম্পানি বেক্সিমকো ফার্মা। ফারুক খানদের পাবিরাবিক কোম্পানি সামিট পাওয়ার। এভাবে শেখ হাসিনার আমলে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে জড়িতরা শেয়ারবাজার থেকে নানা উপায়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এসব অপকর্মের হোতারা রয়ে গেছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

লুটপাটের নানা উপায় :
শেয়ারবাজারকে পরিকল্পিতভাবে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলার পর নানা উপায়ে শেয়ারবাজারে লুটপাটের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। শেয়ারের প্রচুর চাহিদা থাকার কারণে মাত্রাতিরিক্ত প্রিমিয়ামের মাধ্যমে কোম্পানির আইপিও, রাইট শেয়ারের অনুমোদন, কোনো ধরনের নিয়মনীতি ছাড়াই অগ্রাধিকার শেয়ার, মূলধন বাড়ানোর নামে প্রাইভেট প্লেসমেন্ট শেয়ারের বাণিজ্য গড়ে ওঠে। প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রির শক্তিশালী কয়েকটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়। সিন্ডিকেট চক্রগুলোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শুরু করে সামরিক, আধা-সামরিক, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জড়িয়ে পড়েন। সারাদেশে প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রির কার্ব মার্কেট গড়ে ওঠে। নাম সর্বস্ব অনেক কোম্পানির শেয়ারও প্লেসমেন্টের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে। প্লেসমেন্টের মাধ্যমে শেয়ার বিক্রি করে সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন জিএমজি এয়ার লাইন্স সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এরই মধ্যে জিএমজি এয়ার লাইন্স তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে। এ কোম্পানিটি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের টাকা নিয়ে সটকে পড়েছে। এভাবে আরও অনেক কোম্পানি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্লেসমেন্টের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। কিন্তু যারা এভাবে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে তাদের কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শুরু হয় লুটপাটের আয়োজন :
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই ১৯৯৬ সালে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতরা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রেসিডেন্ট হন শেয়ারবাজারে বহুল বিতর্কিত ও আলোচিত রকিবুর রহমান। ১৯৯৬ সালের কেলেঙ্কারির ঘটনার অন্যতম অভিযুক্ত হিসেবে তিনি ব্যাপকভাবে আলোচিত। শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ ও শেখ হাসিনার বিশেষ আস্থাভাজন রকিবুর রহমান ডিএসইর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। রকিবুর রহমান ‘শেখ রাসেল শিশু-কিশোর’ নামে একটি সংগঠনের প্রেসিডেন্টও বটে। আর তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরই শুরু হয় শেয়ারবাজার ঘিরে নানা পরিকল্পনা। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথম বছর (২০০৯ সালে) সাধারণ মানুষদের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগী আগ্রহী করে তুলতে নেয়া হয় নানা উদ্যোগ এবং তার পরের বছর অর্থাত্ ২০১০ সালে শুরু হয় শেয়ারবাজার লুটের ঘটনা। নানা উপায়ে, আইনের দুর্বলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ও কারসাজির মাধ্যমে লুটপাট করা হয় শেয়ারবাজার। আর এ জন্য পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসির) চেয়ারম্যান পদে বসানো হয় ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল হক খন্দকারকে। রকিবুর রহমানসহ শেয়ারবাজারে আওয়ামী লীগের কারসাজির সিন্ডিকেটের তদবিরের জোরে তিনি এসইসি (বর্তমানে বিএসইসি) চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পান। এসইসির চেয়ারম্যান হিসেবে তার দক্ষতা ও যোগ্যতা ছিল প্রশ্নসাপেক্ষ। মূলত জিয়াউল হক খোন্দকারের এসইসি চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ ছিল শেয়ারবাজারে কারসাজির পরিকল্পনারই একটি অংশ।
শেয়ারবাজারে ভয়াবহ ধসের পর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি শেয়ারবাজারে নানা অনিয়মের জন্য এসইসি চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খোন্দকারকে দায়ী করে তার অপসারণের সুপারিশ করে। অপরদিকে রকিবুর রহমান ও সালমান এফ রহমান পুঁজিবাজার লেনদেন ও প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে। এ থেকে স্পষ্ট আওয়ামী লীগের একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী শেয়ারবাজার থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ লুট করে নিয়েছে।

শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী বিনিয়োগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা :
সাধারণ বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বেড়ে যাওয়ায় শেয়ারবাজারে তারল্য প্রবাহ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। তবে শেয়ারবাজারে তারল্য বৃদ্ধিতে ব্যাংকগুলোর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজারে তার আমানতের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারে। কিন্তু ব্যাংকগুলো সে নিয়মের তোয়াক্কা না করে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত অর্থ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে। নির্ধারিত সীমার দুই থেকে ৩ গুণ বেশি অর্থও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে। এমনকি কলমানি মার্কেটের টাকাও শেয়ারবাজারে খাটাতে থাকে ব্যাংকগুলো। ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত বিনিয়োগের বিষয়টি জানা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। আওয়ামী লীগের মদতপুষ্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান রাজনৈতিক কারণেই ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেননি। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত বিনিয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক শুরু থেকেই কঠোর অবস্থান নিলে শেয়ারবাজারে এত তারল্য প্রবাহ তৈরি হতো না এবং বাজারেও ধস নামতো না। শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত বিনিয়োগ কারসাজির একটি অংশ বলে অনেকে ধারণা করছেন।
শুধু বাণিজ্যিক ব্যাংকই নয়, মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসগুলো শেয়ার ক্রয়ে আগ্রাসী অর্থায়ন শুরু করে। একই সঙ্গে একের পর এক মিউচুয়াল ফান্ডের অনুমোদন দিয়ে বাজারে তারল্যের জোয়ার বইয়ে দেয়ার বিষয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও (বিএসইসি) বিশেষ ভূমিকা পালন করে। গ্যাস, বিদ্যুত্ ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে শিল্প বিনিয়োগে স্থবিরতার কারণে শিল্পোদ্যোক্তারাও পুঁজিবাজারে অর্থ বিনিয়োগ শুরু করে। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে শিল্পঋণ, এসএমই ঋণের একটি বড় অংশ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেন তারা। ফলে শেয়ারবাজারে তারল্যের স্রোত বয়ে যায়।

চাহিদা ও সরবরাহে ভারসাম্যহীনতা তৈরির মাধ্যমে লুটপাট :
মূলত শেয়ারের লুটপাটের আয়োজনটি হয়েছে শেয়ারের চাহিদা এবং জোগানের মধ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করার মাধ্যমে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি ব্যাংকের মাত্রাতিরিক্ত বিনিয়োগের ফলে শেয়ারবাজারে যখন তারল্য প্রবাহ বেড়ে যায় তখন স্বাভাবিকভাবেই শেয়ারের চাহিদাও তৈরি হয়। কিন্তু এ চাহিদা অনুযায়ী শেয়ার সরবরাহ না বাড়িয়ে বরং কোম্পানির তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে নানা ধরনের শর্তজুড়ে দেয় বিএসইসি। ৪০ কোটি টাকা কমমূল্যের পরিশোধিত মূল্যের কোম্পানির শেয়ার বাজারে তালিকভুক্ত না করার বিষয়ে বিএসইসি সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে অনেক কোম্পানি বাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারেনি। অপরদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ২৬টি কোম্পানির শেয়ার ছাড়ার জন্য সময়সীমা বেধে দিয়েও একটি কোম্পানির শেয়ারও বাজারে ছাড়া হয়নি। ফলে বাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে কিছু কিছু কোম্পানির শেয়ারের দর ৫০০ থেকে ৮০০ শতাংশ বেড়ে যায়। এর মধ্যে স্বল্পমূলধনী, দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলো ছিল মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায়। মূলত কারসাজিচক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় বাজার। নিয়ন্ত্রক সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বরং কারসাজিচক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। বিএসইসির তত্কালীন চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খোন্দকারসহ আরও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্লেসমেন্টের শেয়ার বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে।
বাজার অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে শেয়ারবাজার থেকে অতিরিক্ত বিনিয়োগ সরিয়ে নেয়ার জন্য ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের সময়সীমা বেধে দেয়। এছাড়া একক গ্রাহক হিসেবে অতিরিক্ত ঋণ সমন্বয়েরও সময় বেধে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ফলে ২০১০ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে ব্যাংকগুলো তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার শুরু করলে কারসাজিচক্রের হোতারাও শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে সরে যেতে থাকে। এতে শুরু হয় শেয়ারাবাজারে ধস। গত আড়াই বছরে নানা উদ্যোগ নিয়েও ধসে ঠেকানো যায়নি। শেয়ারবাজার এখন তলানিতে এসে দাঁড়িয়েছে।

শেয়ারবাজারে লুটপাটে নিঃস্ব বিনিয়োগকারীরা :
শেয়ারবাজারে লুটপাটে নিঃস্ব হয়ে গেছে শেয়ারবাজারের ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারী। ১৯৯৬ সালের পুনরাবৃত্তি হবে না, এমন আশ্বাস দিয়ে সাধারণ মানুষকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করে অবশেষে তার চেয়ে আরও বড় কেলেঙ্কারির মাধ্যমে তাদের সব পুঁজি লুটে নিয়েছে আওয়ামী লীগের লুটেরা গোষ্ঠী। লাভের আশায় সাধারণ মানুষ সঞ্চিত অর্থের পাশাপাশি, বিভিন্ন উত্স থেকে ধার করে, জায়গা জমি বিক্রি কিংবা লিজ দিয়ে, স্ত্রীর অলঙ্কার বিক্রি করে, ব্যবসার মূলধন ভাঙিয়ে শেয়ারাবাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু লাভ তো দূরেই থাকুক পুঁজিটুকুও তারা ফিরে পাননি। আর পুঁজি হারিয়ে মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন রনি জামান, হাবিবুর রহমান যুবরাজ, দিলদার হোসেন নামে কয়েকজন বিনিয়োগকারী। হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন মিল্লাত হোসেন, রতন চৌধুরীসহ নামা না জানা আরও কয়েকজন বিনিয়োগকারী। শেয়ারবাজারে সর্বস্ব খুইয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন অনেক বিনিয়োগকারী। এক কথায় বিনিয়োগকারীদের পারিবারিক জীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে

Tuesday, 1 October 2013

আই অ্যাম সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী অব বাংলাদেশ’

স্টাফ রিপোর্টার: গত ১৭ই জুন ’১৩ থেকে শুরু করে নয় কার্যদিবস আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। জবানবন্দি শুরু হয় এভাবে- আমার নাম সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। জন্ম ১৩ই মার্চ ১৯৪৯। আমার কাজিনদের মধ্যে রয়েছেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি মাঈনুর রেজা চৌধুরী, সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন, আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী, ফজলে করিম চৌধুরী, আওয়ামী লীগ নেতা সালমান এফ রহমান প্রমুখ। আমার বাবার নাম একেএম ফজলুল কাদের চৌধুরী। তার সূত্রেই আমি এ মামলার আসামি হয়েছি। তাই তার ব্যাপারেতো বিস্তারিত বলতেই হবে। এখানে একজন প্রফেসর সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন যিনি ৪০ বছর ধরে নিজের জন্মস্থান নিয়ে মিথ্যা বলছেন। ফজলুল কাদের চৌধুরী ১৯১৯ সালের ২৬শে মার্চ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি নোয়াখালী জিলা স্কুল, বরিশাল বিএম কলেজ এবং কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষাজীবন অতিবাহিত করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র থাকাকালে তিনি থাকতেন কারমাইকেল হোস্টেলে। মেধাবী এবং এলিট পরিবারের শিক্ষার্থীরা সে হোস্টেলে থাকতেন। ফজলুল কাদের চৌধুরী দুই বার ওই হোস্টেলের নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। ফর্মাল চার্জে আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে তার প্রতিটি লাইনের জবাব আমি দিবো। তারা নবাব সিরাজউদ্দোলা থেকে শুরু করেছেন আমি এটা নিশ্চিত করতে পারি আমি সিরাজউদ্দৌলার আগে যাবো না। আমার বিরুদ্ধে উত্থাপিত ফর্মাল চার্জে বলা হয়েছে, দ্বিজাতি তত্ত্বের কারণে উপ-মহাদেশে সামপ্রদায়িক সংঘাত হয়েছে। এ বক্তব্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য অবমাননাকর। কারণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ২৮৮ পৃষ্ঠার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ তে দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ, তিতিক্ষার বর্ণনা করা হয়েছে। প্রসিকিউশন যে প্রস্তাব দিয়েছে তা বাংলাদেশের সীমানা উঠিয়ে দেয়ার প্রস্তাব। এটা খুবই প্রলুব্ধকর। বাংলাদেশের সীমানা উঠিয়ে অন্য কোন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সঙ্গে এক হয়ে যাওয়ার জন্য এ প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এটি আমাদের সংবিধানের লঙ্ঘন। কারণ ধর্মের ভিত্তিতে যে বিভক্তি হয়েছিল সে পূর্ব পাকিস্তানের সীমানাই সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সীমানা। আর বাংলাদেশের বিচারপতিদের সংবিধান রক্ষার শপথ নিতে হয়েছে। দেশে ফেরার তিন মাসের মধ্যে বঙ্গবন্ধু মিত্র বাহিনীর সদস্যদের দেশ ত্যাগ করিয়েছিলেন। এটাই তার জীবনের এক মহত্তম ঘটনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি এবং জাপান যা করতে পারেনি বঙ্গবন্ধু তা করেছিলেন। উত্তরাধিকারসূত্রে আমি এ মামলার আসামি হয়েছি। আজ চাচার (বঙ্গবন্ধু) বই নিয়ে এসেছি। আমার বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরীর সঙ্গে তার কি সম্পর্ক ছিলো? আমি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী কে তাতো এখানে বলতেই হবে। আমি শুধু নিজের জীবন রক্ষার জন্যই এখানে লড়াই করছি না আমি আমার মর্যাদা রক্ষার জন্যও এখানে লড়াই করছি। ৩৩ বছর ধরে সংসদে আছি। ছয় বার জনগণের কাছে পরীক্ষা দিতে হয়েছে আমাকে। ১৯৭৮ সালের শেষদিকে আমি রাজনীতিতে এসেছিলাম। সংবিধান ২ অনুচ্ছেদের ওপর পূর্ণাঙ্গ আস্থা স্থাপন করেই আমি রাজনীতিতে প্রবেশ করি। (যে অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় সীমানার অন্তর্ভুক্ত হইবে- ক) ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণার অব্যবহিত পূর্বে যে সকল এলাকা লইয়া পূর্ব পাকিস্তান গঠিত ছিল এবং সংবিধান (তৃতীয় সংশোধন) আইন ১৯৭৪-এ অন্তর্ভুক্ত এলাকা বলিয়া উল্লিখিত এলাকা, কিন্তু উক্ত আইনে বহির্ভূত এলাকা বলিয়া উল্লিখিত এলাকা তদবহির্ভূত।) এ সংবিধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের উপহার দিয়েছিলেন। ২ অনুচ্ছেদে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ পর্যন্ত সামপ্রদায়িকতার  ভিত্তিতে নির্ধারিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সীমানাকে স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রতি সুনিশ্চিতভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অঙ্গীকার প্রকাশ পায়। প্রসিকিউশন দ্বিজাতি তত্ত্বের বিরোধিতা করে যে প্রস্তাব দিয়েছে তা দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রতি একধরনের বিদ্রূপ। যে তত্ত্বের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। এ প্রস্তাব বাংলাদেশকে বলকান এবং সিকিম বানানোর প্রস্তাব। এ প্রস্তাবের মাধ্যমে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর এ বক্তব্যে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, সুলতান মাহমুদ সিমনসহ প্রসিকিউটররা বলতে থাকেন, এটা যাবে না। জবাবে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, এটা আমার বক্তব্য। আপনারা আপনাদের যুক্তির সময় জবাব দিবেন। এসময় ট্রাইব্যুনালের আদেশে বলকান এবং সিকিম বানানোর প্রস্তাব কথাগুলো জবানবন্দি থেকে বাদ দেয়া হয়। পরে সালাউদ্দিন কাদের তার জবানবন্দিতে বলেন, এ প্রস্তাব বলকান এবং সিকিম বানানোর প্রস্তাব তা আমি বলতে চাই কিন্তু কিছু লোক তাতে আহত (বিরক্ত) হবেন তাই আমি তা বলছি না। দ্বিজাতি তত্ত্বের সুবিধাভোগী কিছু বিখ্যাত ব্যক্তির নাম রেকর্ডে থাকা প্রয়োজন। এ সম্পর্কে বিখ্যাত আইনজ্ঞ যাদের নাম আমি স্মরণ করতে পারি তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল, সাবেক প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন, সাবেক প্রধান বিচারপতি সাত্তার, ব্যারিস্টার রফিক-উল হকসহ আরও অনেকের কথা। যাদের প্রত্যেককে নিয়ে এ জাতি গর্বিত। এ বক্তব্যের ব্যাপারে প্রসিকিউশনের আপত্তির জবাবে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, দ্বিজাতি তত্ত্ব আমাদের জন্য কিভাবে সুফল বয়ে এনেছে তা বুঝানোর জন্যই এটা বলা প্রয়োজন। আমাদের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুকে নিয়েও আমি গর্বিত। তিনিও দ্বিজাতি তত্ত্বের ফসল। সালাউদ্দিন কাদের বলেন, একজন বিখ্যাত রাজনৈতিক দার্শনিক (জওহরলাল নেহেরু) তার নিজের সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন এভাবে, সংস্কৃতিগতভাবে আমি মুসলিম, শিক্ষাগত দিক থেকে ইংরেজ এবং দুর্ভাগ্যজনিত জন্মগত কারণে হিন্দু। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমি জন্মসূত্রে চট্টগ্রামী। এটা কোন দুর্ঘটনা নয়। মতিলাল নেহেরুর ছেলের মতো আমি নিজেকে দুর্ভাগাও মনে করি না। চট্টগ্রাম কখনওই নবাব সিরাজউদ্দৌলার শাসিত অঞ্চলের অংশ ছিল না। আমি সিরাজউদ্দৌলাকে স্বীকার করি না। আমরা চট্টগ্রামের মানুষ। আমাদের নিজস্ব ভাষা এবং নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। সারা দুনিয়াতেই এখন মুসলিমদের ওপর নির্যাতন চলছে।  সোমালিয়া, বসনিয়া, গুজরাট, ফিলিস্তিন সারা দুনিয়ায় এখন মুসলমানরা নির্যাতনের শিকার। মুসলিমদের প্রতি আমার কমিটমেন্টের কোন রাজনৈতিক সীমানা নেই।
নিজেকে বঙ্গবন্ধুর এক নিকটজন দাবি করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় তখনকার সংসদ সদস্য আব্দুল কুদ্দুস মাখনের সুপারিশে বাংলাদেশের পাসপোর্ট পেয়েছিলাম।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ এবং মুসলিম উম্মাহর পক্ষে আমার অবস্থান। কোন বিশেষ ব্যক্তিবর্গ বা দলের বিরুদ্ধে আমার অবস্থান নেই। তিনি বলেন, ধারণা এবং বাস্তবতার মধ্যে অনেক সময়ই বড় ফারাক থাকে। এ প্রসঙ্গে তার বন্ধু ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশবন্ত সিংহের বাংলাদেশ সফরের সময় ঘটে যাওয়া এক কৌতূহল উদ্দীপক ঘটনার বর্ণনা দেন তিনি। সাক্ষ্যের এক পর্যায়ে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, মরেই তো যাবো। কিছু রেকর্ডে রেখে যাই। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, পছন্দসূত্রে আমি একজন বাংলাদেশী, জন্মসূত্রে নয়। আমি যখন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলাম। তখন সেখানে একটি সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে এসেছিলেন বিচারপতি স্যার জাফর উল্লাহ খান। যিনি আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক ছিলেন। ভারতের পূর্ব পাঞ্জাবে জন্ম নেয়ায় তার দেশপ্রেম নিয়ে একজন ছাত্র প্রশ্ন তুলেছিল। জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি পাকিস্তানি কারণ তোমার মা পাকিস্তানি। যখন আমি নিজ পছন্দের কারণে পাকিস্তানি। সালাউদ্দিন কাদের বলেন, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর আমি লন্ডনের বাসিন্দা ছিলাম। ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে আমি ঢাকায় আসি। বৃটিশ ভ্রমণ ডকুমেন্ট নিয়ে আমি ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন বিভাগে প্রবেশ করেছিলাম। আমি সে বৃটিশ ডকুমেন্ট ইমিগ্রেশন বিভাগে জমা দিয়েছিলাম এবং তখনকার একজন সংসদ সদস্যের সুপারিশে বাংলাদেশের পাসপোর্ট পেয়েছিলাম। সে সময় বাংলাদেশী পাসপোর্ট পাওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যের সুপারিশ বাধ্যতামূলক ছিল। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় আব্দুল কুদ্দুস মাখনের সুপারিশে সে পাসপোর্ট পেয়েছিলাম। এটা রেকর্ডে থাকা প্রয়োজন যে, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের পূর্বে পূর্ব পাকিস্তানে জন্ম নেয়া বহু মানুষ আর বাংলাদেশে ফিরেননি। তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালে লিঙ্কন্স ইন থেকে আমি বার এট ল’ পরীক্ষার প্রথম পর্ব শেষ করি। ১৯৭৪ সালে আমি দ্বিতীয় পার্টের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম এবং কাউটস অ্যান্ড কোম্পানিতে কাজ করছিলাম। এরইমধ্যে ১৯৭৩ সালের ১৮ই জুলাই আমার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। সালাউদ্দিন কাদের বলেন, প্রসিকিউশনের বর্ণনামত চুপি চুপি আমি বাংলাদেশে ফিরিনি। প্রসিকিউশন যেমনটা দাবি করেছে সে সময়ে অর্থাৎ ১৯৭৪ অথবা ’৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার সময় পর্যন্ত আমি কখনওই আত্মগোপনে ছিলাম না। ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে আমি কিউসি শিপিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আমার কার্যক্রম শুরু করি। ১৯৭৪ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত আমি বেশ কয়েক বার ব্যবসায়িক কারণে বিদেশ সফরে গিয়েছিলাম। এটাও সত্য যে, আমাদের রাজনীতির ইতিহাসের কালো দিন ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট আমি দেশের বাইরে ছিলাম। ১৫ই আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনা প্রতিরোধে কিছু করতে না পারা আমার এবং আমার পরিবারের সদস্যদের জন্য খুবই দুঃখের বিষয়। প্রেসিডেন্টের জীবন বাঁচানো যাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব ছিল, আজ ৩৮ বছর পর আমরা তাদের মায়াকান্না দেখছি। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমার মরহুম পিতা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যকার সম্পর্ক বঙ্গবন্ধু নিজে তার আত্মজীবনীতে বর্ণনা করেছেন। যে জাতীয় ঐতিহ্য (বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী) বঙ্গবন্ধুর এক নিকটজনের এ নিপীড়নমূলক বিচারে প্রদর্শনী হিসেবে গ্রহণ করতে প্রসিকিউশন অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। আমি আমার জীবনে প্রথম বার গ্রেপ্তার হয়েছিলাম ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর। খোন্দকার মোশ্তাক আহমাদের এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে। যিনি আমার পিতার ধানমন্ডির বাড়ি দখল করেছিলেন। মুসলমানদের বন্ধন মুক্তিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের কথা উল্লেখ করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমিও সেই মুসলিম উম্মাহার সদস্য। তিনি বলেন, ২০০ বছর ধরে ভারতে মুসলমানরা বৃটিশ রাজের ভয়াবহ বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন। যারা ভাগ এবং শাসনের (ডিভাইড অ্যান্ড রুল) রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নীতি অনুসরণ করেছিল। বৃটিশরা হিন্দুদের সুবিধা দিয়েছিল আর মুসলিমদের করেছিল বঞ্চিত। বাংলা ভাগ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরোধিতা মুসলিমদের আহত করেছিল। বৃটিশরাজও এতে বিরক্ত হয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে ১৯১১ সালে রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ভারতের মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষায় ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে স্যার সৈয়দ আহমদের আমন্ত্রণে একটি সম্মেলন হয়েছিল। আলাদা রাষ্ট্রের জন্য মুসলমানরা আন্দোলন শুরু করে। এ আন্দোলন মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছিলো। এরপর ১৯৪০ সালে শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ছুটে যান লাহোরে। যেখানে তিনি ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। যে প্রস্তাবে মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্রসমূহ (ংঃধঃবং) প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন। সালাউদ্দিন কাদের বলেন, এটা আমার বিশ্বাস যে ধারণার সঙ্গে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাস্তবতার ফারাক থাকে। এ প্রসঙ্গে রেকর্ডেড জবানবন্দির বাইরে তিনি বলেন, আমার সম্পর্কে ধারণা থেকে অনেক কথা বলা হয়। অনেকে হয়তো আমার নাম শুনলেই ভেবে বসেন পাকিস্তানের কথা, ভাবেন আমি এন্টি ইন্ডিয়ান। সালাউদ্দিন কাদের বলেন, জর্জটাউন স্কুল অব ফরেন সার্ভিসে পড়ার সময় যশবন্ত সিং আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। আমি এবং আমার স্ত্রী তার পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি। একসময় তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন। ৯০-এর দশকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর সঙ্গে যশবন্ত সিংও বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। সেসময় আমার অফিসের স্টাফরা আমাকে না জানিয়ে এক ঝুড়ি আম যশবন্ত সিংয়ের কাছে পাঠানোর জন্য রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আমের ঝুড়ির সঙ্গে একটি ভিজিটিং কার্ডও দেয়া হয়। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সঙ্গে সঙ্গে রেড এলার্ট জারি করে। আমাকে ফোন করে জানতে চাওয়া  হয় ঝুড়িতে কোন বিস্ফোরক দ্রব্য আছে কি না? প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জবানবন্দিতে আপত্তি জানিয়ে বলেন, উনি অনেক ভালো ইংরেজি বলছেন। বহুদিন এত ভালো ইংরেজি শুনি না। শুনতে ভালো লাগছে। কিন্তু এ মামলার সঙ্গে এসব বক্তব্যের কোন সম্পৃক্ততা নেই। এসব বক্তব্য বাদ দিতে হবে। এসময় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আপনারা আড়াই বছর বলেছেন। অথচ আমাকে বলতে দিচ্ছেন না। আমার সম্পর্কে তো আমাকে বলতে দিতে হবে। এটাতো হ্যামলেটের ভূত নয়। আমাকে তো আমার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে। রাজনীতি মুষ্টিযুদ্ধ নয়। তিনি বলেন, কাজী নজরুল ইসলামকে এ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসা এবং তাকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়া বঙ্গবন্ধুর কোন সাম্প্রদায়িক সিদ্ধান্ত ছিল না। বরং এর মাধ্যমে দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অঙ্গীকারই প্রকাশ পেয়েছে। সালাউদ্দিন কাদের বলেন, সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী হত্যার বিরুদ্ধে আমার প্রকাশ্য অবস্থান রয়েছে। প্রসিকিউশন এ বক্তব্যে তীব্র আপত্তি জানায়। পরে তা বাদ দেয়া হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে বার বার সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে সময় বেঁধে দেয়ার কথা বললে তিনি বলেন, ফাঁসিতো দিবেনই। তাড়াহুড়ার কি আছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর পরাজয়কে তিনি বর্ণনা করেন জনগণের ইচ্ছার কাছে শক্তির পরাজয় হিসেবে। রাজনীতিবিদদের ওপর নির্যাতের সংস্কৃতির বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হিসেবে আমি এখানে দাঁড়িয়েছি। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সবাই জানে আমার মুখে যা আসে তাই আমি সামনাসামনি বলে ফেলি। আমার দোষ একটাই আমি পুরো পলিটিশিয়ান। তিনি বলেন, রাজনৈতিক নিপীড়ন দক্ষিণ এশিয়ায় কোন রূপকথার বিষয় নয়। এ যুগে শুধু জ্যামেতিক হারে নিপীড়নের মাত্রা বেড়েছে। ঔপনিবেশিক যুগে রাজনীতিবিদদের কারারুদ্ধ করা হতো তাদের বাড়ি, ভিআইপি গেস্ট হাউজ অথবা কখনও কখনও কারাগারের কোয়ার্টারে। রাজবন্দিদের শারীরিক নির্যাতনের কোন নজির তখন ছিল না। রাজবন্দিদের তাদের চাহিদা অনুযায়ী সব সুযোগ- সুবিধা দেয়া হতো। তাদের ব্যক্তিগত আয়ের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দেয়া হতো। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রখ্যাত নেতাদের মধ্যে মহাত্মা গান্ধী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু এবং তার পিতা পণ্ডিত মতিলাল নেহেরুসহ অনেককে রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে। তাদের সঙ্গে বৃটিশ রাজের ব্যবহার ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ। রাজবন্দিদের প্রতি এ ধরনের শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ এমনকি ১৯৪৭ সালের পরেও বহাল ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার জীবনীতে এ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। পাকিস্তান আমলের দুঃসহ ২৩ বছরেও আমি এমন একটি ঘটনা মনে করতে পারছি না যেখানে কারাবন্দি রাজনৈতিক নেতাকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। এমনকি ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের পর কোন ধরনের শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ আমি শুনিনি।
পোশাকধারী ব্যক্তিদের দ্বারা আমি প্রথম দুর্ব্যবহারের শিকার হই ২০০৭ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তারের সময় যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় ছিল। সে সময় একজন ‘দেশপ্রেমিক’ সেনা কর্মকর্তা ঔদ্ধত্য দেখিয়ে আমার চোখ বেঁধে ফেলে। ধানমন্ডির বাসা থেকে ৫ ফুট দৈর্ঘ্য এবং নয় ফুট প্রস্থের একটি সেলে না নেয়া পর্যন্ত আমাকে ওই অবস্থাতেই রাখা হয়। আমার পাশের সেলেই আটক ছিলেন আমাদের বর্তমান মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর এবং আ.হ.ম মোস্তফা কামাল। পরের ৪৮ ঘণ্টা আমাদের টানা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সে সময় আমাদের ‘সামরিক আতিথেয়তা’ দেয়া হয়। সেটা ছিল ২০ মাসের আঘাতের শুরু। রাজনীতিবিদদের শারীরিক নির্যাতনের এ প্রক্রিয়ার আরও শিকার ছিলেন আবদুল জলিল, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ওবায়দুল কাদেরসহ অনেকে। নির্যাতনের মাধ্যমে অনেকের কাছ থেকে তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে বিবৃতি আদায় করা হয়েছিল। তখন নিপীড়ক সরকারের সহযোগী সংবাদ মাধ্যমে তা ফলাও করে প্রকাশও করা হয়েছিল। প্রত্যেক পেশার মানুষেরই নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সমিতি রয়েছে। আইনজীবী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, এমনকি সরকারি কর্মকর্তাদেরও সমিতি রয়েছে। কিন্তু অসহায় রাজনীতিবিদদের নিজের স্বার্থ রক্ষায় কোন সমিতি নেই। বরং রাজনীতিবিদরা মাংসাশী প্রাণীর মতো নিজ শ্রেণীর মানুষদের গ্রাস করতে ভূমিকা রাখেন। মরহুম ফজলুল কাদের চৌধুরীর সন্তান হিসেবে জন্মের পর থেকেই রাজনীতির সঙ্গে আমার এক ধরনের সংযোগ ছিল। ভিন্নমতের রাজনীতিবিদদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ ৭০-এর দশক পর্যন্ত ছিল। কিন্তু সমসাময়িক রাজনীতিতে তা আর নেই। তার দীর্ঘ জবানবন্দিতে প্রসিকিউশনের আপত্তির জবাবে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমসাময়িক সময়ে খেলাফত আন্দোলনের নেতা মাওলানা মোহাম্মদ আলী ও মাওলানা শওকত আলীকে রাষ্ট্রদ্র্রোহিতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ওই মামলায় ডিফেন্স সাক্ষী হিসেবে মাওলানা মোহাম্মদ আলী ২ মাস ২৪ দিন নিজের পক্ষে দাঁড়িয়ে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। তখন আমরা পরাধীন ছিলাম। অথচ এখন স্বাধীন বাংলাদেশে মাত্র তিন দিন জবানবন্দি দেয়ার পরই আমাকে টাইম ম্যানেজমেন্টের কথা শোনানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, হতে পারে এটাই আমার জীবনের শেষ বক্তৃতা। ফাঁসি দেয়ার দিবেন, কোন সমস্যা নেই। কিন্তু আমাকে আমার কথা বলতে দিতে হবে। পুরনো এক প্রবাদ বাক্যের উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি তুমি কাউকে হত্যা করতে না পারো তবে তাকে একটি খারাপ নাম দাও। ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনীতে ১৬ কোটি মানুষকেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে অভিযুক্ত করার যোগ্য করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইচ্ছাকে চাপিয়ে আইনে এ সংশোধনী আনা হয়েছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক নিপীড়ন বাংলাদেশে নিয়মে পরিণত হয়েছে। এটা জনপ্রিয় এবং নির্বাচিত রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে আরও বেশি সত্য। এক এগারোর নায়কেরা রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনেছিল যেন তাদের নির্বাচন এবং ক্ষমতার বাইরে রাখা যায়। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, ওয়ান ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দেশ ত্যাগের জন্য চাপ দেয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনাকে চাপ দেয়া হয়েছিল তিনি যেন দেশে না ফেরেন। খালেদা জিয়াকে তার বাসা ত্যাগ করে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (তৎকালীন নাম) যেতে চাপ দেয়া হয়েছিল। ওয়ান ইলেভেনের দস্যুদের এ দু’টি প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছিল। এ দুই জন জাতীয় আইকনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। এবং বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশী হাইকমিশনার লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত আদালতে তাদেরকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছিল। গণতন্ত্রকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে এ দুই জাতীয় আইকনসহ জনপ্রিয় রাজনীতিবিদদের পার্লামেন্টের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত আদালতের মুখোমুখি করা হয়েছিল। এ অপবিত্র কাজের সঙ্গী হয়েছিলেন ভাড়াটে শ্রেণীর কিছু  লোক। মিডিয়ার একটি অংশ, সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের  একটি অংশ এবং কিছু আইনজ্ঞ তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। যে আইনজ্ঞরা এক এগারোর শাসন সমর্থন করেছিলেন তাদের নেতৃত্বে ছিলেন দ্বিজাতি তত্ত্বের সুবিধাভাগী একজন সংবিধান বিশেষজ্ঞ।  এক এগারোর দস্যুরা যে উদ্দেশ্যে রাজনীতিবিদদের নিপীড়ন করেছিল সে একই উদ্দেশ্যে এখনও রাজনীতিবিদদের ওপর নিপীড়ন হচ্ছে। ১৯৭৯ সাল থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রে আমি একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। এরপর সব নির্বাচনেই আমি অংশ নিয়েছি, যেসব নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও অংশ নিয়েছিল। সমঝোতা অথবা এক দলীয় কোন সরকারে আমি কখনওই অংশ নেইনি। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীকে পরাজিত করে প্রতিটি সংসদেই আমি প্রতিনিধিত্ব করেছিলাম। আমি আমার বিজয় ভাগ করে নিয়েছিলাম প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সমালোচকদের সঙ্গে। সংসদের তৈরি আইনের অধীনে আমাকে এখানে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে এ আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইচ্ছায় সামরিক বাহিনী, আধা সামরিক বাহিনী এবং সহযোগী বাহিনীর সদস্যদের বিচারের জন্য এ আইন করা হয়েছিল। প্রথম যে বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়েছিল তাতে ‘ব্যক্তি’ কথাটি যুক্ত ছিল। কিন্তু পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায় তা বিল থেকে বাদ দেয়া হয়। ২০০৯ সালে চলতি সংসদের দ্বারা সংশোধিত আইনে ‘ব্যক্তি অথবা ব্যক্তিবর্গ’ কথা যুক্ত হয়। এরমাধ্যমে ১৬ কোটি মানুষকে এ আইনে বিচারের যোগ্য করা হয়েছে।
আইন তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সংসদ সার্বভৌম। সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি হচ্ছে নারীকে পুরুষ অথবা পুরুষকে নারী বানানো ছাড়া সংসদ সব কাজই করতে পারে। নবম সংসদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ইচ্ছাকে চাপিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধনীতে ‘ব্যক্তি অথবা ব্যক্তিবর্গ’ শব্দ আইনে যুক্ত করা হয়। ২০১০ সালের ১৯শে ডিসেম্বর থেকে এ আইনে আমাকে আটক রাখা হয়েছে। অথচ কোন আটকাদেশ আমি এখনও পাইনি। এসময়ে সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতে প্রেসিডেন্ট আমাকে সমন পাঠিয়েছেন। সংসদে যোগ দেয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করে আমি এ ট্রাইব্যুনালে আবেদন দায়ের করেছি। অথচ ট্রাইব্যুনাল তার বিচারিক ইচ্ছা অনুযায়ী আমার আবেদনগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জবানবন্দির এ পর্যায়ে আবারও প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়। প্রসিকিউকর তুরিন আফরোজ বলেন, এরই মধ্যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ১০ সেশন জবানবন্দি দিয়েছেন। তিনি যেসব কথা বলছেন তা এ মামলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদেরকে আইনের মধ্যে থেকে এগুতে হবে। জবাবে সালাউদ্দিন কাদের বলেন, আপনারা ১০ সেশনের হিসাব করছেন। আর আমি হিসাব করছি আমার জীবনের। আমাকে আমার কথা বলতে দিতে হবে। বৃটিশ আমলে মাওলানা মোহাম্মদ আলী দুই মাস ২৪ দিন নিজের পক্ষে জবানবন্দি দিয়েছিলেন। আর স্বাধীন বাংলাদেশে আমাকে প্রতিদিন টাইম ম্যানেজমেন্ট শেখানো হচ্ছে। শাহবাগ চত্বর ডাক দিলো আর আপনারা আইন সংশোধন করে ফেললেন? এখনতো দেখছেন আপিল বিভাগ সাত জন এমিকাস কিউরি নিয়োগ দিয়েছে। প্রসিকিউশন যেভাবে ভাবছে কাল সকালেই আমার ফাঁসি হয়ে যাবে সবকিছু এত দ্রুত হবে না। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, এ মামলায় প্রসিকিউশনের আনা হাজারো মিথ্যার মধ্যে একটাই সত্য আমি মরহুম একেএম ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে। তিনি বলেন, ফর্মাল চার্জে প্রসিকিউশন আমার পিতাকে সামপ্রদায়িক ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তাকে বর্ণনা করা হয়েছে হিন্দু বিরোধী ব্যক্তি হিসেবে। তার অর্জনকে অস্বীকার করা হয়েছে। আমার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী  প্রেসিডেন্সি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র ছিলেন। সেসময়ে তিনি থাকতেন কারমাইকেল হোস্টেলে। সেসময় নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর শিষ্য হিসেবে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর ভারত ত্যাগ না করা পর্যন্ত তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নেতাজীর দেশ ত্যাগের পর ফজলুল কাদের চৌধুরী ছয় মাসের জন্য আল্লামা মাশরিকির দলে যোগ দিয়েছিলেন। পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন সত্ত্বেও নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সমাবেশে সভাপতিত্ব করা নিয়ে ফজলুল কাদের চৌধুরী সবচেয়ে গর্বিত ছিলেন। প্রসিকিউশন ঐ ঐতিহাসিক সত্য অস্বীকার করেছে যে, ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে কোন ধরনের সামপ্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। যখন আমার পিতা চট্টগ্রামের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, কলকাতার জনপ্রিয় ছাত্র নেতা হিসেবে আমার পিতার রাজনৈতিক অনুসারীদের মধ্যে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নিজের আত্মজীবনীর বহুস্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সে কথা বলেছেন। এ মামলা চলাকালীন সময়েই যে আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়েছে।
স্যামুয়েল জনসনকে স্মরণ করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, সত্য এমন এক গাভী যা প্রসিকিউশনকে দুধ দেয়নি যে কারণে ষাঁড়ের কাছে গেছে দুধ দেয়নি। আমার পিতা এবং আমাকে নিয়ে ফর্মাল চার্জে যে অকল্পনীয় কল্পকাহিনী তৈরি করা হয়েছে যা কল্পকাহিনীর লেখকদের কল্পনাকে হার মানায় তার জবাব দেয়ার মধ্যেই আমি আমার জবানবন্দি সীমাবদ্ধ রাখবো। দর্জিদের মতো নিজের ইচ্ছামত ইতিহাস তৈরির প্রবণতা মানুষের মধ্যে রয়েছে, তবে সুখের বিষয় হলো ইতিহাস তা অনুমোদন করে না। ১৯৭১ সালের ২৯শে মার্চ করাচির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছিলাম। সেসময় বিমানে আমার সঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন রাষ্ট্রদূত ওসমান সিদ্দিকী। যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ইয়ার মেট ছিলেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইশরাতও ওই বিমানে ছিলেন। এটা ঐতিহাসিক সত্য যে আমার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আইনজীবী ছিলেন। এ মামলার ফর্মাল চার্জে আমাকে মনোবিকারগ্রস্ত খুনি হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়নি। মানসিক প্রতিবন্ধীর অভিযোগও তারা আমার বিরুদ্ধে আনেনি। আমি আমার মরহুম পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর রাজনীতির অনুসারী ছিলাম এ সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করেই আমার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ আনা হয়েছে। ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম জেলা মুসলিম লীগের সেক্রেটারি হিসেবে আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন ফজলুল কাদের চৌধুরী। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সমর্থন সত্ত্বেও ১৯৪৬ সালে বেঙ্গল এসেম্বলির নির্বাচনে আমার পিতাকে মনোনয়ন দিতে মুসলিম লীগ ব্যর্থ হয়। মুসলিম লীগের অর্থের যোগানদাতাদের একজন খান বাহাদুরকে মনোনয়ন দেয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তরুণ মুসলিম লীগ নেতাদের মধ্যে ফরমান উল্লাহ খান, মাজহার কুদ্দুস এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে কলকাতায় মুসলিম লীগ অফিসের সামনে বিক্ষোভ হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর ফজলুল কাদের চৌধুরী একটি বিবৃতি দিয়ে ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন, যেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়। যে নির্বাচনে আমার পিতা পরাজিত হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের ক্র্যাকডাউনের পূর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ইয়াহিয়া খানের সমঝোতা প্রচেষ্টা চলাকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধু এবং আমার পিতা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষা করেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পূর্ববর্তী সময়ে তার নিজের এবং তার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর ভূমিকার বিশদ বর্ণনা দেন সালাউদ্দিন চৌধুরী। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেসময় আমার ধানমন্ডির বাসায় নিয়মিত আসতেন শেখ কামাল, তোফায়েল আহমেদ, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, সিরাজুল আলম খান, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, সালমান এফ রহমান, শাহজান সিরাজসহ আরও অনেকে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে আসাদকে যখন হত্যা করা হয় তখন তার ১০ ফুট দূরত্বের মধ্যেই ছিলাম। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক সমাবেশেও অংশ নিয়েছিলাম। ওই সমাবেশে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাকে স্বাধীনতার ঘোষণা বলে দাবি করা হয়ে থাকে। যদি তাই হয় তবে আমি দাবি করতে পারি আমি মুক্তিযুদ্ধের একজন সমর্থক ছিলাম। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত আমি ঢাকায় বাস করতাম। যেহেতু ঢাকায় আমাদের কোন ড্রাইভার ছিল না, সেকারণে আমরা পিতার বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমিই গাড়ি ড্রাইভ করতাম। আমার ধানমন্ডির বাড়িটি আমার কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের আড্ডাখানা ছিল। আমার জানা মতে, আমিই একমাত্র ছাত্র ছিলাম যে  ধানমন্ডিতে একাকী একটি বাড়িতে বাস করতাম এবং আমার একটি গাড়ি ছিল। আমার পিতা চট্টগ্রামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। এমএলএ, এমএনএ, মন্ত্রিসভার সদস্য, স্পিকার এবং ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট থাকার সময় আমার পিতা চট্টগ্রামের জন্য যে অবদান রেখেছিলেন তার স্বাক্ষর আজও বহন করছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমী প্রভৃতি। ১৯৬০ সালে যখন আমি ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম তখন থেকে আমি নিজস্ব পদ্ধতির জীবন যাপন করতাম যা আমার পুরো শিক্ষা জীবনেই বহাল ছিল। যার মধ্যে সাদিক পাবলিক স্কুল, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নের সময় অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৬৫ সালের শেষ এবং ’৬৬ সালের শুরুর চার মাস সময়, যখন আমি প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম সে সময় ছাড়া ’৬৬ সাল থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত আমি কখনওই চট্টগ্রামে আমার পারিবারিক বাসভবন গুডস হিলে বাস করিনি। চট্টগ্রামের সঙ্গে আমার সামাজিক যোগাযোগের পুরোটাই ১৯৭৪ সালের পরের। ১৯৭৯ সালের পূর্বে চট্টগ্রামের ভোটার তালিকায়ও আমার নাম ছিল না। ১৯৬৬ সালের শুরুর দিকে আমার পিতা যখন মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কার হন তখন থেকে ’৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি গণপরিষদের একজন স্বতন্ত্র সদস্য ছিলেন। এসময় তিনি আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন, যে আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে আইয়ুব শাসনের সমাপ্তি হয়। তখন সাধারণভাবেই তার যোগাযোগ ছিল মুসলিম লীগার নন এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিচারপতি মাহবুব মোর্শেদ, এয়ার ভাইস মার্শাল আসগার খান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান, নুরুল আমীন, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।
পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে তখন আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। যদিও আমি নিজে কখনও কোন ছাত্র সংগঠনের সদস্য ছিলাম না। আমার বন্ধুদের সঙ্গে ’৬৯ সালে আমি আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম। সে আন্দোলনের একটি ধানমন্ডি অধ্যায়ও ছিল। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা প্রায়শই আমার ধানমন্ডির বাসায় মিলিত হতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া আমার বন্ধুদের মধ্যে যারা ধানমন্ডিতে থাকতেন এবং যারা ধানমন্ডির বাইরে থাকতেন তারা আমার বাসায় আসতেন। তাদের মধ্যে যাদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ছিল তারা হলেন- তাওহিদ সামাদ, সালমান এফ রহমান, শেখ কামাল, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, নিজাম আহমেদ, খায়রুল বাশার, ইরফান খান, ইমরান আহমেদ, কাজী আনোয়ার, আবদুস সামাদ, কাইয়ুম রেজা চৌধুরীসহ আরও অনেকে। সিনিয়রদের মধ্যে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু তার সমসাময়িক যেমন আবদুর রউফ, তোফায়েল আহমেদ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, সিরাজুল আলম খান, আবদুল কুদ্দুস মাখন, শাজাহান সিরাজদের আমন্ত্রণ জানাতেন। আন্দোলনকে বেগবান করতে তারা আমার বাড়িতে মিলিত হতেন। সিনিয়রদের এসব মিটিংয়ে আতিথেয়তা দেয়াই ছিল আমার কাজ। এসব নেতার অনেকে আমার পিতার সঙ্গেও প্রায়শই দেখা করতেন। ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়নের বন্ধুদের সঙ্গে আমিও ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক সমাবেশে অংশ নিয়েছিলাম। সেখানে ঐতিহাসিক বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণের আকাঙ্ক্ষাই ব্যক্ত করেছিলেন। এটা দাবি করা হয়ে থাকে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ কার্যত স্বাধীনতার ঘোষণা। ঐ ঐতিহাসিক সমাবেশে আমার উপস্থিতি সুনিশ্চিত করতে পারেন, এমন বহুসংখ্যক ব্যক্তির মধ্যে রয়েছেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম, তোফায়েল আহমেদ, মনিরুল হক চৌধুরী, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, সালমান এফ রহমান, খায়রুল বাশার, নিজাম আহমেদ, কাইয়ুম রেজা চৌধুরী, ড. বেলাল বাকী, তাওহিদ সামাদসহ আরও অনেকে। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ থেকে ২২শে মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আমার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর একাধিক বৈঠক হয়। ঐসব বৈঠকের খবর সে সময়কার সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস সময় বাংলাদেশে ছিলেন না বলে দাবি করেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৯শে মার্চ করাচির উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেছিলাম। প্রথম তিন সপ্তাহ ছিলাম করাচিতে। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত লাহোরে। যেখানে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করি। সেখানে একইসঙ্গে পড়তেন শামীম হাসনাইন (বর্তমানে হাইকোর্টের বিচারপতি)। অক্টোবরের ১০ তারিখে লাহোরে শেষ বারের মতো আমার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমার। অক্টোবরের ১২ তারিখে লন্ডনের উদ্দেশ্যে লাহোর ত্যাগ করি। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্র্যাকডাউন এবং নির্বিচার গণহত্যার পর ঢাকা পরিণত হয় এক আতঙ্কের নগরীতে। আমি এবং আমার বন্ধুরাও এর বাইরে ছিলাম না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তারের পর পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত গণপরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদের সব সদস্যরাও ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন। সাত কোটি নিরস্ত্র বেসামরিক জনগোষ্ঠীর জীবন পরিণত হয়েছিল পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর করুণার বিষয়ে। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ তাদের নিজেদের এবং তাদের আপনজনদের জীবন রক্ষার এবং টিকে থাকার পথ খুঁজেছিল। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৯শে মার্চ বিকালে আমি করাচির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছিলাম। আমাকে তেজগাঁও বিমানবন্দরে দিয়ে এসেছিলেন আমার কাজিন কাইয়ুম রেজা চৌধুরী। পিআইএল-এর ম্যানেজার হামিদ জং-এর সহযোগিতায় আমি ফ্লাইটে একটি সিটের ব্যবস্থা করেছিলাম। করাচি বিমানবন্দরে আমাকে নিতে এসেছিলেন আমার স্কুল জীবনের বন্ধু মুনীব আর্জুমান্দ এবং মাহমুদ হারুনের ব্যক্তিগত সহকারি। করাচির ভিক্টোরিয়া রোডে হারুনদের পারিবারিক বাসস্থানে আমি অবস্থান করেছিলাম। হারুনরা তিন ভাই ছিলেন। তারা হলেন- ইউসুফ এ হারুন, মাহমুদ এ হারুন এবং সাইয়েদ এ হারুন। তাদের পিতার নাম স্যার আব্দুল্লাহ হারুন। যিনি বৃটিশ শাসনামলে  আমার  পিতার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। হারুন ভাইয়েরা ৫০ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি তাদের মালিকানাধীন আলট্রা ইন্স্যুরেন্সের উপদেষ্টা ছিলেন। করাচিতে আমি মাহমুদ এ হারুন, তার স্ত্রী এবং তাদের দুই কন্যার অতিথি ছিলাম। আমি করাচিতে তিন সপ্তাহ অবস্থান করেছিলাম। সে সময় ইউসুফ এ হারুনের সঙ্গেও আমার কয়েক দফায় দেখা হয়েছে। তখন তিনি ঢাকায় বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ডন গ্রুপ অব পাবলিকেশন্সের মালিক হারুন ভাইয়েরা মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের পুরোটা সময়ই বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছিলেন। পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তির পর হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে বঙ্গবন্ধু প্রথম যার সঙ্গে কথা বলেছিলেন তিনি হলেন মাহমুদ এ হারুন। ১৯৯৮ সালে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় ইউসুফ এ হারুন ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি হয়ে এসেছিলেন। তিনি বলেন, সাদিক স্কুলে আমার ক্লাসমেট ও রুমমেট ছিলেন মোহাম্মদ মিয়া সুম্র। পরে তিনি ২০০৮ সালে পাকিস্তানে কেয়ারটেকার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। সুম্র এবং মুনীর আর্জুমান্দ-এর সঙ্গে করাচি অবস্থানকালে আমার সামাজিক যোগাযোগ ছিলো। তারা আমার করাচি অবস্থানের ব্যাপারে লিখিত এফিডেভিট দিয়ে আমাকে জানিয়েছেন। এ ট্রাইব্যুনালে তার সাক্ষী দিতেও আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের ভিসা দেয়া হয়নি। করাচিতে অবস্থানকালে ঢাকার বন্ধুদের মধ্যে সালমান এফ রহমান, নিজাম আহমেদ, কাউয়ুম রেজা চৌধুরী, ওসমান সিদ্দিকী, রেজাউর রহমানের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। আমি সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমার ছাড়পত্রের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আমার বন্ধু ওসমান সিদ্দিকী যা আমাকে সংগ্রহ করে দিয়েছিল, তার পিতা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তায় আমি লাহোরে চলে যাই। আমি সেখানে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাসে ভর্তি হই। রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের ফাইনাল ইয়ারে ভর্তি হই। সেখানে আমি দেখা পাই আমার বন্ধু শামীম হাসনাইনের। তাকে ১৯৬৬ সাল থেকে আমি চিনতাম। নটর ডেম কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েও আমরা বন্ধু ছিলাম। তিনি বলেন, জুন, জুলাই এবং আগস্ট মাসের পুরোটাই আমি লাহোরে ছিলাম। এসময় আমি ও শামীম হাসনাইন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে দীর্ঘ সময় কাটাই। আগস্টে আমার ফাইনাল পরীক্ষা হয়।
১৯৭১ সালের ১৩ই এপ্রিল রাউজানের কুণ্ডেশ্বরীতে আমার উপস্থিতির মিথ্যা গুজবের জন্মদাতাকে চিহ্নিত করতে এ ট্রাইব্যুনাল আমাকে সুযোগ দিয়েছে। প্রসিকিউশনের একজন সাক্ষী ওই দিন আমার কুণ্ডেশ্বরীতে উপস্থিত থাকার কথা বলেছেন। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন তিনি তা শুনেছেন ভারত থেকে ফিরে আসার পর। এ দাবি মিথ্যায় প্রতিপন্ন হয় এই কারণে যে, নতুন চন্দ্র সিংয়ের ছেলে সত্য রঞ্জন সিং ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে আমার মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রস্তাবক ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৩ই এপ্রিল আমি বাংলাদেশ থেকে ১২০০ মাইল দূরে ছিলাম। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ কল্পকাহিনী, আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যা তৈরি করেছে। রাউজানে তিনটি নির্বাচনে আমি পরীক্ষা দিয়েছি। প্রতিবারই আমি আমার প্রতিপক্ষকে পরাজিত করেছি। এ অভিযোগের প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেননি যে তিনি আমাকে অতীতে দেখেছেন। রাজনৈতিক কারণে আমাকে এ বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। এ নিয়ে আমার মনে কোন সন্দেহই নেই যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ব্যাপকমাত্রার গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। এ ভূমির এক সন্তান হিসেবে এবং যেহেতু আমি ভারত থেকে আসা উদ্বাস্তু নই তাই সামপ্রদায়িকতার ভিত্তিতে বিভক্ত সীমানায় সৃষ্ট বাংলাদেশের প্রতি আমার প্রেম এবং আনুগত্য শর্তহীন। অর্থনৈতিক এবং বস্তুগত সুবিধা দিয়ে আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকি। আমি এটা বিশ্বাস করি যে উদ্দেশ্য প্রণোদিত মিথ্যের কারণে আমরা ৩০ লাখ শহীদের নাম গোপন রেখেছি। আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর শহীদদের নাম ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ফটকে টানানো আছে। এটা দুঃখজনক যে ৪২ বছরে আমরা ৩০ লাখ শহীদের নাম চিহ্নিত করে তাদের স্বীকৃতি দিতে পারিনি। তবে এটা সুখের বিষয় যে আমার বিরুদ্ধে ফর্মাল চার্জে কিছু নতুন শহীদের নাম উন্মোচিত হয়েছে, ৪২ বছরে যাদের কথা বলা হয়নি। এদের বেশির ভাগই হিন্দু সমপ্রদায়ের। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং শত্রু সম্পত্তি অধ্যাদেশ জারির পর বহু হিন্দু পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করে ভারতে চলে গিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তারা আবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন। নতুন চন্দ্র সিং ছাড়া চার্জে উল্লিখিত মৃত ব্যক্তিদের কারও নামই ৭০’ সালের ভোটার তালিকা অথবা কোন ভূমি রেকর্ডে ছিল না। ট্রাইব্যুনালের প্রশ্নের জবাবে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমি এ কথা এ কারণে বলছি নিহত হয়েছেন বলে এমন অনেকের কথা বলা হয়েছে যারা ৭১’ সালে বাংলাদেশেই ছিলেন না। তিনি বলেন, উনসত্তরপাড়ার ঘটনা নিয়ে ১৯৭২ সালে মামলা হয়েছিল। যে মামলায় আমাকে আসামি করা হয়নি, এটা স্বীকার করে যে, ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে আমি বাংলাদেশে ছিলাম না। মধ্যগরিয়া, বণিকপাড়া এবং সুলতানপুরের ঘটনায় কোন থানায় কোন মামলা হয়নি, আবারও এটা স্বীকার করে যে, ১৯৭১ সালের এপ্রিলে আমি বাংলাদেশে ছিলাম না। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নিপীড়নের স্পন্সর হচ্ছেন ধর্মনিরপেক্ষতার ছায়ায় আশ্রয় নেয়া কিছু হতাশ সমাজতন্ত্র প্রেমিক। তারা জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ এবং বিপক্ষের শক্তিতে বিভক্ত করতে চান। এ অপচেষ্টার অংশ হিসেবেই মুসলিম উম্মাহার নেতাদের নানা অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ অপচেষ্টার শিকার হিসেবে আমি এ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়েছি। বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসীদের এই বিভক্তির সময়ে আমি প্রতিনিধিত্ব করি হুমকির মুখে থাকা বিশ্বাসীদের এবং আমি নিজেও বিশ্বাসী। এ জন্য আমি অবিশ্বাসীদের টার্গেট হয়েছি, যারা প্রথাগতভাবেই আমার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি বলেন, তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আবারও বলছি ১৯৭১ সালের ২৯শে মার্চ থেকে ১৯৭৪ সালের ২০শে এপ্রিল পর্যন্ত আমি বাংলাদেশে ছিলাম না। জবানবন্দি শেষে প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম জেরায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তিনি এতদিন যা বলেছেন তা জেনে বুঝে বলেছেন কিনা? জবাবে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আই অ্যাম সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী অব বাংলাদেশ। যখন যা বলি জেনে-বুঝে এবং অর্থপূর্ণতাসহ বলি।