Sunday, 3 November 2013

পাবনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ভাঙচুর : নেপথ্যে ছাত্রলীগের চাঁদাবাজি!

পাবনার সাঁথিয়ায় ফেসবুকে হজরত মুহাম্মদ সা: সম্পর্কে কটূক্তির বিষয়টি ছড়িয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনার নেপথ্যে ছাত্রলীগের চাঁদাবাজি মূল কারণ বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা। এই ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে প্রশাসন। এই ঘটনায় রাজিব সাহার বাবা বাবা বাবলু সাহা বাদি হয়ে আতাইকুলা থানায় একটি মামলা করেছেন। ঘটনায় জড়িতের অভিযোগে রেজাউল করিম নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অন্য দিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্টে। একই সাথে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি এ বি এম আলতাফ হোসেন সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেন।
ভাঙচুরের ঘটনা দেখেছেন এমন কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শনিবার বেলা ১১টার দিকে ক্ষেতুপাড়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের আহ্বায়ক জাকির হোসেন, ছাত্রলীগ নেতা কাওসার হাবিব সুইট, মতির ছেলে খোকনসহ ১০-১২ জন যুবক প্রথমে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার একটি প্রিন্ট কপি বের করে বনগ্রাম বাজারে ছড়িয়ে দেয়। পরে বাবলু সাহার মুদিদোকানে গিয়ে তার ছেলে রাজিবের খোঁজ করে। পরে তাকে না পেয়ে দোকান ভাঙচুর করে। এক পর্যায়ে এ খবর ছড়িয়ে পড়লে বনগ্রামে হাটের দিন হওয়ায় হাজার হাজার লোকজন একত্র হয়ে সাহাপাড়ায় হামলা চালিয়ে বাড়িঘরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। সাংবাদিকদের রাজিব সাহার বাবা বাবলু সাহা বলেন, তিন মাস আগে তার মেয়ের বিয়ের সময় স্থানীয় কিছু সন্ত্রাসী দুই লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছিল। তিনি ওই টাকা না দেয়ায় সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন সময় ফোনে হুমকি দিচ্ছিল। তারা ক্ষতি করতে এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাবলু সাহা বনগ্রাম এলাকার একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। বিভিন্ন সময় তার কাছে সন্ত্রাসীরা চাঁদা দাবি করত। দাবিকৃত চাঁদা দিতে রাজি না হলে তাকে বিভিন্ন সময় হুমকিও দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। তারই ধারাবাহিকতায় ওই সন্ত্রাসী চক্র উদোর পিণ্ডি বুঁধোর ঘারে চাপাতে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো ঘটনাটি ঘটিয়েছে বলে তাদের ধারণা। পাবনা জেলা প্রশাসক কাজী আশরাফ উদ্দিন জানান, এ ঘটনায় শনিবার রাতেই অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মুন্সি মুনিরুজ্জামানকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির অপর দুইজন সদস্য হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুস্তাইন ও ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুল আলম মাসুম এ দিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে গতকাল দুপুরে সর্বদলীয় বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে রাজশাহী অ্যাডিশনাল ডিআইজি খোরশেদ হোসেন, পাবনা জেলা প্রশাসক কাজী আশরাফ উদ্দিন, পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ, পাবনা র‌্যাব-১২ কমান্ডার মেজর মঈন উদ্দিন, সাংবাদিক রণেশ মৈত্র, পাবনা জেলা পূজা উৎযাপন কমিটির সভাপতি গণেশ ঘোষ, সাঁথিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন, আর-আতাইকুলা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ সভাপতি কোরবান আলী বিশ্বাস, উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহবুব মোর্শেদ জ্যোতিসহ প্রশাসন, স্থানীয় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত নেতারা উপস্থিত ছিলেন। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ পাবনা জেলা সভাপতি চন্দন কুমার চক্রবর্তী ও জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি গণেষ ঘোষের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। পরে তারা শহরে ঘটনার বিচার দাবি করে একটি মানববন্ধন করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাহাপাড়ার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, আমরা কোনো রাজনৈতিক দলকে দোষারোপ করি না। যুগ যুগ ধরে আমরা এখানে সহাবস্থানে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছি। হঠাৎ করে একটি গুজব রটিয়ে যারা এ কাজ করেছে আমরা তাদের বিচার দাবি করি। তারা আরো বলেন, বনগ্রামের পাশের রসূলপুর, মিয়াপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের কিছু পেশাদার সন্ত্রাসী তাদের ফায়দা হাসিল করতে এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে বলে ধারণা করছেন তারা। এ ঘটনা ঘটানোর পেছনে চাঁদা দাবির বিষয়টি থাকতে পারে বলেও জানান তারা। পাবনার পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ জানান, বর্তমানে এলাকার পরিবেশ শান্ত রয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। আতাইকুলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, এ ঘটনায় রাজিবের বাবা বাবলু সাহা বাদি হয়ে ২০ জনের নাম উল্লেখ করে আরো অজ্ঞাত পরিচয় ২০০-৩০০ লোকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাল, টিন ও টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে। ঘটনার পর থেকেই নিখোঁজ রাজিব সাহার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। শনিবার ফেসবুকে পবিত্র কুরআন শরিফ ও মহানবী হজরত মোহাম্মদ সা: সম্পর্কে কটূক্তির খবর ছড়িয়ে পড়লে বনগ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ২০-২৫টি বাড়ি, দু’টি মন্দির ও ব্যবসায়প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
http://www.dailynayadiganta.com/welcome/post/28770#.UncJvfnxqth