Saturday, 16 November 2013

কোনটি লাঠি আর কোনটি শিয়ালের পা, কুমির তা চিনে ফেলেছে


গল্পটি ধূর্ত শিয়াল ও বোকা এক কুমিরকে নিয়ে। এই ধূর্ত শিয়াল কুমিরকে বোকা পেয়ে বারবার ঠকায়। ঠকতে ঠকতে এক সময় সেই কুমির কিছুটা চালাক হয়ে পড়ে। একদিন সেই শিয়াল সাঁতরে নদী পার হতে যায়। তখন বাগে পেয়ে সেই কুমির শিয়ালের পা জাপটে ধরে। শিয়াল নদীর স্রোতকে শুনিয়ে শুনিয়ে হাসতে হাসতে বলে, ‘দেখো দেখো স্রোত ভাইয়া, কুমিরটি এখনো সেই আগের মতোই বোকা রয়ে গেছে। আমার পায়ে না ধরে লাঠিতে ধরে বসেছে।’ এমনভাবে জব্দ হওয়ার পরেও শিয়ালের হাসি দেখে কুমির আরো বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। শিয়ালের পা ছেড়ে দিয়ে লাঠিটি জাপটে ধরে। তখন হাতের লাঠি ফেলে রেখে ধূর্ত শিয়াল দ্রুত নদী পার হয়ে যায়।
শিয়াল-কুমিরের এই খেলা আমাদের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে অত্যন্ত ক্রিয়াশীল। এ দেশের জ্ঞানী-গুণী সমাজ এবং জাতীয়তাবাদী শক্তির মধ্যে সম্পর্কটি অনেক সময় এই শিয়াল-কুমিরের মতো। কেন যেন এরা বিএনপিকে কম বুদ্ধিসম্পন্ন কুমিরের মতো জ্ঞান করে। নিজেদের মনে করে একেক জন শিয়ালের মতো পণ্ডিত। এই সুযোগে শুধু নিরপেক্ষ বলয়ের সুশীল সমাজই নয়, পারলে শেখ হাসিনার আইটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় কিংবা হাসানুল হক ইনুও বিএনপির উপদেষ্টা সেজে বসেন। সঙ্গত কারণেই এদের বেশির ভাগ পরামর্শের সারমর্ম ও সুর হয়, ‘আরে ব্যাটা আহাম্মক, লাঠি ছেড়ে পা ধর।’ শাহবাগের কথিত গণজাগরণের সময় বিএনপির প্রতি পণ্ডিত সমাজের এই ধরনের পরামর্শ ও ধমক লক্ষ করা গেছে। এরা তখন রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে বিএনপির সম্মুখে শিয়ালের পা আর লাঠি খাড়া করে দেয়। বেচারা কুমিরের মতো বিএনপির মাথাও গুলিয়ে যায়, কোনটা ছেড়ে কোনটাকে ধরবে। শেষমেশ বিএনপি পা দু’টি চেপে ধরে বসে থাকলে এই ধূর্ত শিয়াল নদীর মাঝখানেই আটকা পড়ে যায়। বিএনপি নেতৃত্বের দৃঢ় ভূমিকার কারণেই ধূর্ত শিয়ালটির চেহারা আওয়ামী লীগসহ দেশবাসীর কাছেও স্পষ্ট হয়ে গেছে। অথচ শিয়ালের পা ছেড়ে লাঠিতে ধরার জন্য দেশের বুদ্ধিজীবীকুল বিএনপিকে কত গাল-মন্দই না পেড়েছে। এমনকি তখন হালকা ঈমানসম্পন্ন বিএনপির একটা অংশের ঈমানও অনেকটা নড়বড় হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের মতো তারাও এটাকে শিশুপীরের মাজেজা বলে ঠাহর করতে থাকে। মজার ব্যাপার হলো, আওয়ামী লীগ নিজেদের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল ও সবচেয়ে প্রজ্ঞাবান মনে করলেও তাদের অনেক বোধ বিএনপি মারফত ফিরে এসেছে। এক-এগারো’র সরকারকে নিজেদের আন্দোলনের ফসল বলেছে, তাদের শপথ অনুষ্ঠানে সদলবলে যোগ দিয়েছে; কিন্তু প্রথম থেকে এই জরুরি সরকার সম্পর্কে বিএনপির পর্যবেক্ষণ এবং মনোভাব শেষমেশ আওয়ামী লীগসহ সারা দেশ স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। প্রথম দিকে মহাগরম ‘শিশুপীর’ বলে ভক্তি করলেও এখন এটাকে অনেকটা অনাকাক্সিত আপদ জ্ঞান করছে। শেষমেশ আওয়ামী লীগও বুঝতে পেরেছে, গণজাগরণ মঞ্চকে নিয়ে কী ভয়ানক সমস্যায় তারা নিজেরা জড়িয়ে গেছে। ওই কয়দিন সরকার যা যা করেছে, এখন মনে হচ্ছে তারা নিজেরাও সেই সব স্মৃতি ভুলে থাকতে চাচ্ছে। যে শাহবাগকে জীবননৌকা (life boat) মনে করেছিল, পরে দেখা গেল তা ছিল আসলে আওয়ামী লীগের মারণফাঁদ। 

গণজাগরণ মঞ্চ সৃষ্টি না হলে হেফাজতের মতো এমন কঠিন শক্তির মোকাবেলা করতে হতো না। আমাদের এক সিনিয়র কলিগ, যার মা ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি এবং আওয়ামীভাবাপন্ন পরিবার হিসেবেই তাদের জানি। ৫ মে রাতের নির্বিচারে গুলি করার পর তার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘কোনো মুসলমানের বাচ্চা এখন আর আওয়ামী লীগকে সমর্থন করতে পারে না।’ এই ভদ্রলোকের স্ত্রী একজন কণ্ঠশিল্পী এবং এখনো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান করেন। ওই ঘটনার পর এই ধরনের বিশ্বাসে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। শাহবাগে গণজাগরণের ফাঁদ পেতে বিএনপিকে কুপোকাত করতে চাইলেও আজ নিজেরা সেই ফাঁদেই আরো করুণভাবে আটকা পড়েছেন। এখন প্রধানমন্ত্রী সামান্য উপলক্ষ পেলেই তার নিজের নামাজ এবং কুরআন তিলাওয়াতের কথা জাতিকে মাইক বাজিয়ে শোনান। আগে যেখানে আসরের নামাজ দিনে একবার পড়লেই চলতো, এখন মনে হচ্ছে এক আসর দুইবার পড়েও সবকিছু সামাল দেয়া যাচ্ছে না। শাহবাগের সেই একই শিয়াল পণ্ডিতগণ আবারো বিএনপিকে উতলা বানাতে চাচ্ছে। তারা চাচ্ছেন ন্যূনতম পরিবেশ সৃষ্টি হলেই শেখ হাসিনা বা তার কোনো খলিফার অধীনে বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ফেলুক। তাদের যুক্তি, মাঠটি কিছুটা অসমতল হলেও বিপুল জনপ্রিয়তায় বিএনপি এবার পাস করে যাবে। এই বেলাতেও তাদের ভরসা বাংলাদেশের মিডিয়ার দৃষ্টিতে বিএনপির ‘গুডবয়’গণ। আর বিএনপির ‘ব্যাডবয়রা’ এই শিয়াল পণ্ডিতদের দৃষ্টিতে হার্ড-লাইনার। নির্দলীয় সরকারের ইস্যু নিয়ে এই ‘ব্যাডবয়’রা শিয়ালের পা দু’টি আচ্ছামতো চেপে ধরতে চাচ্ছে। এখন এই পণ্ডিতগণ এই ব্যাডবয়দের হাত থেকে এই শিয়ালের পা মুক্ত করে লাঠিটি ধরিয়ে দেয়ার জন্য নানা কসরত করে যাচ্ছে। দেশের পত্রপত্রিকা ও টিভি চ্যানেলগুলোর ওপর চোখ বুলালেই এই সব কসরত চোখে পড়ে। একটি দৈনিক পত্রিকা নির্দলীয় সরকারের পক্ষে লোভনীয় সার্ভে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। সার্ভেতে যত হৃদয়বিদারক ফলাফল বেরিয়ে এসেছে সবকিছু ঈমানদারীর সাথে প্রকাশ করলে পত্রিকাটি এবং সম্পাদকের নাকি বারোটা বেজে যেত। যেমন ক্যান্সার শনাক্ত হলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে হবে, কর্কটরোগ। রিপোর্ট যত খারাপ হোক, বিশেষ মুন্সীয়ানায় চলনসই একটা শিরোনাম রাখতে হবে। সরকারের অনুকূলে পরিসংখ্যান যত খারাপ হোক, সংখ্যার প্যাঁচে তা আগের চেয়ে ভালো দেখাতে হবে। এই ধরনের কসরতের মাধ্যমে সরকারকে ভাসাতে গিয়ে পত্রিকাটি নাকি মাঝখানে নিজে ডুবতে বসেছিল। তারা ইতোমধ্যে নাকি বিরাটসংখ্যক পাঠক হারিয়েছেন।

নিজের অস্তিত্বের স্বার্থেই এখন কিছু সত্য বলতে হচ্ছে। এই সব পত্রিকার সার্ভে রিপোর্ট নিয়ে বিএনপিসহ আঠারো দলীয় জোটকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত। কারণ সামনে কখন যে কোন বিপদে ফেলে দেয় তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। এদের পরিবেশিত কোনটা দই আর কোনটা চুন তা বোঝা মুশকিল। কাজেই সাবধানের মার নেই। কারণ ওই সার্ভে রিপোর্ট প্রকাশের কিছু দিন পর একই পত্রিকার দু’জন কলামিস্ট গত ঈদের ছুটির দিনগুলোতে একটা ‘প্রীতি বিতর্ক ’ শুরু করে দেন। ইন্টারনেটের বদৌলতে তা পৃথিবীর বাংলা ভাষাভাষী অনেকেই উপভোগ করেছেন। দু’টি দলের মধ্যে ‘কার ফাঁদে কে পড়ে ’ এটা নিয়ে প্রীতি বিতর্কটি শুরু হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটিকে সংবিধান থেকে সরিয়ে আওয়ামী লীগ পুরো জাতির সাথে যে সাংবিধানিক প্রতারণা করেছে সেখান থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে দেয়ার মিশনেই এই পণ্ডিতগণ নিয়োজিত রয়েছেন। ২০০৬ সালে তারা বিচারপতি কে এম হাসানকে নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধান হিসেবে মেনে নেননি। কারণ কোনো এক সময়ে জনাব হাসান বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তারাই আজ বত্রিশ বছর ধরে আওয়ামী লীগের প্রধান হিসেবে অবস্থানরত বৃহত্তর ফরিদপুর নিবাসী শেখ লুৎফর রহমানের নাতনী শেখ হাসিনার অধীনে কিংবা তারই কোনো সুযোগ্য খলিফার অধীনে নির্বাচনকে যথাযুক্ত মনে করছেন! এরই নাম আওয়ামী লীগ। এরাই আওয়ামী বুদ্ধিজীবী। এদের আবদারকে বিএনপির যৌক্তিক দাবির সাথে গড় করে যারা একটা ফলাফল বের করতে চাচ্ছেন, তারা হলেন ‘নিরপেক্ষ’। 

আওয়ামী লীগকে এই কাজের জন্য ভর্ৎসনা না করে সুশীলসমাজের একটা অংশ বিএনপিকে এই অসমতল মাঠেই নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য প্রলুব্ধ করতে শুরু করেছে। উল্লিখিত প্রীতি বিতর্ক থেকে যে মেসেজটি বেরিয়ে এসেছে, তা হলো এই অবস্থায় নির্বাচনে অংশ নিলে পরিণামে বিএনপিই লাভবান হবে। এই ধরনের একটি মনকলা এই পণ্ডিতগণ বিএনপিকে খাওয়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এটা যেহেতু মনকলা, কাজেই যত বেশি খাওয়ানো যায়, ততই মন ও শরীর হৃষ্টপুষ্ট থাকবে। কলির যুগে সতীসাধ্বী স্ত্রীরা তাদের কুষ্ঠরোগী স্বামীদের মাথায় তুলে নিয়ে বারবনিতাদের বাড়িতে পৌঁছে দিতেন। হাইব্রিড নেতাদের কথা শুনে মনে হতে পারে, শেখ হাসিনা কলির যুগ থেকেও মহান এক যুগ সৃষ্টি করেছেন। অবাধ ও মুক্তভাবে হাজার হাজার স্থানীয় নির্বাচন (?) তিনি সম্পন্ন করেছেন। নির্বাচনসংক্রান্ত এই সব সাধনা করতে করতে তিনি এখন ‘গণতন্ত্রের রাবেয়া বসরী’ হয়ে পড়েছেন। আওয়ামী লীগ কে এম হাসানকে অবিশ্বাস করতে পারে; কিন্তু বিএনপি এই শেখ হাসিনা বা তারই কোনো খলিফাকে অবিশ্বাস করতে পারবে না। তিনি আসলে কতটুকু তাপসী হয়েছেন সেই পরীক্ষার জন্যই তার অধীনে একটি নির্বাচন করা দরকার। এই পরীক্ষাটি অনেকটা ভারতবর্ষের এক নেতার নিজের ইন্দ্রিয় পরীক্ষার মতো। এত দিনের পরিশ্রমে তারা যে প্রশাসন সাজিয়েছেন, পুলিশ বাহিনী সাজিয়েছেন, ওরা কলির যুগের সতীসাধ্বী নারীদের চেয়েও উদার এবং দিলদরিয়া হয়ে পড়েছে। এই সব প্রশাসনিক কর্মকর্তা কিংবা পুলিশের মনটি এমন সাদা দিলের বানিয়ে ফেলা হয়েছে যে, তারা পারলে বয়োবৃদ্ধ বিএনপি সমর্থক ভোটারদেরকে কোলে করে এনে ভোট দেয়াবেন। এখন বিএনপির উচিত আওয়ামী লীগের ইন্দ্রিয় পরীক্ষার এই সুযোগটি করে দেয়া। এই পরীক্ষার মাধ্যমে চোখ বন্ধ করেই বিএনপি ক্ষমতায় এসে যাবে। তারপর আচ্ছামত জব্দ হবে আওয়ামী লীগ। কারণ লজ্জা থাকলে তারা কোন মুখে আবার ২০১৯ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলবেন? কিন্তু দুর্মুখদের ধারণা একই কাজ আওয়ামী লীগ পুনঃপুন দশবার করলেও লজ্জা পাবে না, কিংবা এই পণ্ডিত ব্যক্তিগণ তা স্মরণ করিয়ে আওয়ামী লীগকে কখনোই লজ্জা দেবেন না। 

বিএনপির ব্যাডবয়দের এই ধরনের সংকীর্ণ ধারণায় বিরক্ত ও হতাশ হন এই পণ্ডিতগণ। এই পণ্ডিতদের বিভিন্ন বরাতে জানা যায়, বিএনপির এই ধরনের বোকামি দেখে নিজেদের মাথার চুল ছেঁড়েন এই গুডবয়রা। তাদের এই চুল ছিঁড়ার কথা নেত্রীকে বা বিএনপির অন্য নেতাদের জানাতে না পারলেও বিশেষ ঘরানার কয়েকজন বিশিষ্ট কলামিস্টকেই শুধু জানান। এদের মধ্যে স্বনামধন্য একজন কলামিস্ট আবার লন্ডনে থাকেন। গাঁটের পয়সা খরচ করে বিএনপির এই সব নেতা ফোন করে তাদের মনের আক্ষেপের কথা শুধু তাদেরই জানাচ্ছেন। বিএনপি নেতৃত্ব যাদের লেখা বেশি পড়ার সম্ভাবনা, তাদের কাউকে কখনোই এই ধরনের আক্ষেপের কথা জানান না। গাঁজা খেলে নাকি ভালো কবিতা লেখা যায়। কিন্তু গাঁজা খেয়ে পত্রিকায় রাজনৈতিক কলাম লেখাও যে সম্ভব তা জানা ছিল না। গত ২০ অক্টোবরে ‘কেউ সঙ্গে না আসলেও একাই আন্দোলন চালিয়ে যাবেন’Ñ বেগম জিয়ার এই ঘোষণা এই শিয়াল পণ্ডিতদের যারপরনাই হতাশ করেছে। বেগম জিয়ার এই দৃঢ় অবস্থানে যারা হতাশ হয়েছেন, তারা কখনোই বিএনপির সুহৃদ নন। বিএনপিকে নিয়ে এমন ধরনের চিন্তায় কাতর এই শুভাকাক্সীদের ভোট কখনোই বিএনপির বাক্সে পড়বে না। মনে হচ্ছে, বিএনপি তার নিজস্ব ভোটারদের এত দিনে চিনতে পেরেছে। কোনটি শিয়ালের পা আর কোনটি লাঠি, তা বোধ হয় কুমির এখন চিনে ফেলেছে। 

১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য সাবেক সহযোগী জামায়াতকে সাথে নিয়ে ২৭৩ দিন হরতাল করেছে আওয়ামী লীগ। তারাই এখন ক্ষমতায় এসে একতরফা সেই তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছে। ক্ষমতায় আসার জন্য তখন তাদের এই ব্যবস্থা দরকার হয়ে পড়েছিল। আজ ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য এই ব্যবস্থা বাতিল করা প্রয়োজন। আগে তাদের জন্য দরকার ছিল লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। এখন দরকার সংবিধান রক্ষা করা। এটা সেই সংবিধান যা তারা নিজেদের হাতে কেটেকুটে যা ইচ্ছা করেছে। এমনকি আস্ত একটা ভাষণের শেষ লাইনটি কেটে (জিয়ে পাকিস্তান) বাকিটা এই সংবিধানের পেটে ঢুকিয়ে দিয়েছে। পৃথিবীর অন্য কোনো সংবিধানে এই ধরনের ভাষণ ঢুকানো হয়েছে কি না জানি না। আর এই সংবিধান এখন সরকারের জন্য বাইবেলের চেয়েও পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয় হয়ে পড়েছে। শেখ হাসিনার বিপরীতে, বেগম খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলন আঠারো দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের দারুণভাবে উজ্জীবিত করেছে। প্রয়োজনে তিনি কতটুকু আপসহীন হতে পারবেন, তা প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার টেলিফোন সংলাপটিতে স্পষ্ট। সরকারের যে অংশ এই টেলিফোন সংলাপ লিক করেছেন, তা তাদের উদ্দেশ্যের বিপরীতে কাজ করেছে। এর মাধ্যমে বিরোধী জোটের আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে। কাজেই যে দু’টি টেলিফোন মনের মধ্যে অনেক দিন বাজবে বলে মনে হচ্ছে তার মধ্যে প্রথমটি বেগম খালেদা জিয়ার সাথে, অন্যটি ছিল হিলারি কিনটনের সাথে। এই শিয়াল পণ্ডিতগণের টার্গেট বিএনপির নতুন প্রজন্ম। তাদের ধারণা, এই নতুন প্রজন্মকে তাদের সুরে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে সহজেই বিভ্রান্ত করা সম্ভব হবে। কারণ বিএনপির বিপুল জনসমর্থন এবং জামায়াত-শিবিরের নিবেদিত ও সুশৃঙ্খল কর্মীবাহিনী এক হলে বাকশালী ফ্যাসিবাদ এই দেশে স্থায়ী আসন গাড়তে পারবে না। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতি সহজ হিসাব। কাজেই তাদের রাজনৈতিক কৌশল হলো, যেভাবেই হোক এদের মধ্যে দূরত্ব, সন্দেহ ও অবিশ্বাস সৃষ্টি করতে হবে।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, ১৯৯৬ সালে জামায়াতের সাথে একসাথে আন্দোলন করলেও এবং একই টেবিলে পাশাপাশি বসলেও এই ব্রাহ্মণদের জাত যায়নি। এখন বিএনপি জামায়াতের সাথে একতাবদ্ধ হলেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে পড়ছে। কাজেই এই শিয়াল পণ্ডিতদের কোনো ধরনের প্রচারণায় আঠারো দলীয় জোটসহ বিএনপির নেতা-কর্মী-সমর্থকদের বিভ্রান্ত হলে চলবে না। এই ফ্যাসিবাদ বা বাকশালকে রক্ষা করতে সেনাসমর্থিত কোনো সুশীল গ্রুপও যদি এগিয়ে আসেন তারাও গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামরত জনতার রোষের সম্মুখীন হবেন। জনগণ যদি বুঝে ফেলে এই ছদ্মবেশী সুশীলরা আওয়ামী লীগেরই বি-টিম তখন উদ্দীনদের মতো কোনো অসাংবিধানিক শাসনকে ধরে রাখা তাদের জন্যও কঠিন হবে। কারণ বিডিআরসহ অন্যান্য কেলেঙ্কারির প্রকৃত হোতা এবং গত পাঁচ বছরে যেসব লুটেরা ও বাজিকর সৃষ্টি হয়েছে তাদের জামাই আদরে রাখলে জনরোষ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে। কাজেই সরকারের জন্যও নিরাপদ এবং একমাত্র বিকল্প হলো গণতান্ত্রিক ধারাটি অব্যাহত রাখা। বিএনপি নেতৃত্বাধীন আঠারো দলীয় জোট শিয়ালের যে পা জাপটে ধরেছে, কোনো প্ররোচনাতেই তা ছেড়ে লাঠি ধরা ঠিক হবে না। অর্থাৎ যে পদ্ধতিতেই হোক না কেন, নির্বাচনের মাঠটি পুরো সমতল না হলে সেই নির্বাচনে অংশ নেয়া ঠিক হবে না। শেখ হাসিনা বা তার সুযোগ্য কোনো খলিফার অধীনে নির্বাচনে যাওয়া আঠারো দলীয় জোটের জন্য আত্মহত্যার শামিল। 
(নয়া দিগন্ত, ১৪/১১/২০১৩)
http://www.bdtomorrow.com/columndetail/detail/87/3072