Thursday, 14 November 2013

‘ত্বকীকে হত্যার পর আজমিরী ওসমান বলে, সব শেষ- লাশটি ফেলে আয়’

15 Nov, 2013
নারায়ণগঞ্জে মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে হত্যা করা হয় আজমিরী ওসমানের মালিকানাধীন উইনার ফ্যাশনের অফিসে। হত্যার পর লাশ আজমিরীর গাড়িতে করে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়া হয়। ওই অফিসটি শহরে টর্চার সেল হিসেবে পরিচিত। অফিসটিতে গত ৭ই আগস্ট র‌্যাব-১১ অভিযান চালিয়ে রক্তমাখা একটি জিন্সের প্যান্টসহ টর্চার কাজে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ আলামত উদ্ধার করে। আজমিরী ওসমান নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি ও জাপা’র প্রেসিডিয়াম সদস্য নাসিম ওসমানের একমাত্র ছেলে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কঠোর গোপনীয়তায় নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কে এম মহিউদ্দিনের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে সুলতান শওকত ভ্রমর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ত্বকী হত্যাকাণ্ডের এসব তথ্য দেয়। এর আগের ওইদিন বিকালে রূপগঞ্জ এলাকা থেকে ভ্রমরকে আটক করে ত্বকী হত্যায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা র‌্যাব-১১ নারায়ণগঞ্জ ক্যাম্পের স্পেশাল ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানির এএসপি রবিউল ইসলাম। আজমিরী ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ভ্রমর। জবানবন্দিতে সে বলে, আমার ছেলে সুলতান নাঈম-এর অসুস্থতার কথা জানানোর জন্য আমি ৬ই মার্চ বিকালে আজমিরী ওসমানের অফিস উইনার ফ্যাশনে যাই। অফিসের রিসিপশনে ঢুকে দেখি পুল খেলছে বড় ভাই কাজল, শিপন, জেকিসহ অন্যরা। পুল খেলা দেখি অনেকক্ষণ, তারপর অফিসের সিসি ক্যামেরায় দেখি রাজীব ও কালাম এক্স ফাইল্ডার গাড়ি নিয়ে অফিস থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। তারপর আমরা অনেকক্ষণ পুল খেলি। পরে রাজীব, কালাম, মামুন, ত্বকী, বিলাই চক্ষু লিটন রাত ৯টা ৩০ মিনিটের দিকে আবার ওই অফিসে ফিরে আসে। তারপর রাজীব ও কালাম ত্বকীকে আজমিরীর রুমে নিয়ে যায়। এর দেড় ঘণ্টা পরে কাজল আমাকে বলে, চলো তো দেখি কাকে নিয়ে এসেছে! এই বলে আমাকে আজমিরীর পাশের রুমে নিয়ে যায়। ওই রুমে বসে আমরা চিৎকার, চেঁচামেচি ও গালিগালাজের আওয়াজ শুনতে পাই। চেঁচামেচি ও গালিগালাজের শব্দ আজমিরীর রুম থেকে আসছিল। রাত ১১টার দিকে আমি অফিস থেকে চলে আসতে চাইলে রাজীব আমাকে বলে, পরে যাও। এর এক ঘণ্টা পর ১২টার দিকে আজমিরী তার রুমের থাই গ্লাসের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। দরজা খোলার পর দেখি আজমিরীর রুমের মধ্যে কালাম, লিটন, রাজীব ও মামুন দাঁড়িয়ে আছে এবং ত্বকীর লাশ চোখ বাঁধা অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে। আজমিরী ওসমান দরজা খুলে বেরিয়ে এসে কাজলকে বলে- সব শেষ, তোরা যেখানে পারিস লাশটি ফেলে আয়। পরে যখন লিটন, রাজীব, কালাম ত্বকীর লাশ নিয়ে যাচ্ছিল তখন আজমিরী বলে ভ্রমরকে নিয়ে যা, তখন আমি বলি, আমি কেন যাবো? আমাকে কেন জড়াচ্ছেন? আমার ছেলে অসুস্থ। তখন আজমিরী পিস্তল দিয়ে সোফাতে ২টি গুলি করে। তখন আমি ভয়ে বলি, যাবো। তারপর রাজীব, কালাম, লিটন, মামুন, মিলে ত্বকীর লাশ ব্যাক ডালায় তুলে আজমিরী এক্স ফাইল্ডার গাড়িটি ড্রাইভার জমশেদ চালিয়ে নিয়ে চারারগোপ (নারায়ণগঞ্জ শহরের কালিরবাজার) যায়। আমি গাড়িতে ড্রাইভারের পাশের সিটে ছিলাম। রাত আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটের দিকে গাড়িটি চারারগোপ ১৬ তলা ভবনের অপরদিকে থামায়। গাড়ি থামার পর আমি গাড়ি পাহারা দিতে থাকি। আর রাজীব, লিটন, মামুন ও কালাম বস্তাবন্দি ত্বকীর লাশ নিয়ে ঘাটের দিকে যায়। ১৫/২০ মিনিট পর ওরা ৪ জন খালি হাতে ফিরে এসে গাড়িতে ওঠে। তারপর আমরা আবার আজমিরীর অফিসে চলে আসি। পরে সেখান থেকে আমরা যে যার মতো চলে যাই। এর আগে গত ২৯শে জুলাই ইউসুফ হোসেন লিটন আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দিকে বলেছিল, ভ্রমর একটি গজারীর লাঠি দিয়ে ত্বকীকে পিটিয়েছে। রাজীবের কথায় লিটনও ত্বকীকে ২/৩টি ঘা দেয়। মারধরের কারণে ত্বকী মাটিতে লুটিয়ে পড়লে কালাম সিকদার ত্বকীর বুকের উপর উঠে ত্বকীর গলা টিপে ধরে। ৩-৪ মিনিট পর ত্বকী মারা যায়। পরে লিটন, ভ্রমর, কালাম সিকদার গাড়িতে করে ত্বকীর লাশ নিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়।
উল্লেখ্য, গত ৭ই আগস্ট শহরের ৩৮/৪ আল্লামা ইকবাল রোডের তোলারাম কলেজের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত আজমিরী ওসমানের উইনার ফ্যাশনের অফিসে ২ ঘণ্টা সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে র‌্যাব-১১ নারায়ণগঞ্জ ক্যাম্পের সদস্যরা একটি রক্ত মাখা জিন্সের প্যান্ট, বিপুল পরিমাণ দড়ি, একটি হকিস্টিক, ২টি লাঠি, ৪টি মোবাইল সেট, একটি পিস্তলের বাঁট, ৩টি সিসি ক্যামেরা, বেশ কিছু সিডি ক্যাসেট, ডিভিডি, কম্পিউটার, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জামাদি উদ্ধার করে এবং অফিসে সোফা, দেয়াল ও আলমিরায় অসংখ্য গুলির চিহ্ন দেখতে পায়। নিহত ত্বকীর পিতা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, আমরা প্রথম থেকেই বলে আসছিলাম ত্বকী হত্যাকাণ্ডে ওসমান পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ জড়িত। তিনি অবিলম্বে তাদের গ্রেপ্তার দাবি করেন। উল্লেখ্য, গত ৬ই মার্চ বিকালে শহরের পুরাতন কোর্টের বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় মেধাবী তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। এর ২ দিন পর ৮ই মার্চ সকালে শীতলক্ষ্যা নদীর ৫ নং ঘাটের তীর থেকে ত্বকীর লাশ উদ্ধার করা হয়। তবে ৭ই মার্চ ত্বকী ‘এ’ লেভেল পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায় ত্বকী পদার্থ বিজ্ঞানে ৩০০ নম্বরের মধ্যে ২৯৭ পেয়েছে। যা ইংলিশ মিডিয়ামে ছিল বিশ্ব রেকর্ড।