Monday, 3 June 2013

অধিকার-এর অনুসন্ধান : থানায় নিয়ে চোখ বেঁধে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে ফাহাদ ও আলমগীরকে গুলি করে পুলিশ : পুলিশের পায়ে ধরে অনুরোধেও রক্ষা হয়নি



গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডাকা হরতাল চলাকালে পথচারী আবদুল্লাহ আল ফাহাদ নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র এবং ব্যবসায়ী মো. আলমগীর হোসেনকে ধরে নিয়ে তাদের গায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে পুলিশ। এরপর আহত অবস্থায় তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একপর্যায়ে তাদের উভয়েরই একটি করে পা কেটে ফেলতে হয়। এদের মধ্যে পঙ্গু আলমগীর ৩০ মার্চ হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেলে ওইদিন তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণ করা হয়। আর ফাহাদ বর্তমানে পঙ্গু অবস্থায় হাসপাতালে পড়ে আছেন।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল সংগঠনটি এ সংক্রান্ত বিস্তারিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
অধিকার জানায়, ফাহাদ ও আলমগীরকে পুলিশ সদস্যরা বিনা মামলায় আটক করে থানায় আনার পর এএসআই আসাফুদ্দৌলাহ বাদী হয়ে ফাহাদ, আলমগীরের বিরুদ্ধে আরও ৭ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাত ১৫০ জনকে অভিযুক্ত করে মোট তিনটি মামলা করে পুলিশ।
পঙ্গু ফাহাদ এখন হাসপাতালের বেডে : ফাহাদের বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ থানার পূর্ববিঘা গ্রামে। তিনি বেসরকারি ইন্টারন্যশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটির (ঢাকা ক্যাম্পাসের) আইন বিভাগের তৃতীয় সেমিস্টারের ছাত্র। তিনি ঢাকার পান্থপথ এলাকায় মেসে থাকতেন। ফাহাদ অধিকার-কে জানান, ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল আনুমানিক ৭টায় নাস্তা খাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হন। কুতুববাগ এলাকায় আসামাত্রই তিনি দেখতে পান হরতালের সমর্থনে পিকেটাররা পিকেটিং করছে, সেই সঙ্গে গুলির শব্দও শুনতে পান। এ সময় কুতুববাগ এলাকা থেকে ফার্মগেটের দিকে লোকজন দৌড়ে যাচ্ছে। তিনিও ভয়ে কুতুববাগ থেকে ফার্মগেট এলাকার দিকে দৌড় দেন। কিছুদূর যাওয়ার পর আবার গুলির শব্দ শুনে তিনি উত্তর পাশে একটি দালানের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ান। তখন পেছন থেকে একজন লোক এসে তার শার্টের কলার চেপে ধরে। ওই লোক তখন তাকে লাঠি দিয়ে পেটাতে পেটাতে একটি মাইক্রোবাসের কাছে নিয়ে যায়। মাইক্রোবাসে উঠে দেখেন, দুজন ছেলে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। এ সময় ডিবি পুলিশের জ্যাকেট পরা একজন কর্মকর্তা এসে কাছে থাকা পুলিশদের জানায়, তাকে যেন শেরেবাংলা নগর থানায় নিয়ে ভালোভাবে গুলি করা হয়। মাইক্রোবাসে থাকার সময় তিনি তার বাবা মো. মোফাজ্জল হোসেন ভুইয়াকে মোবাইল ফোনে জানান, পুলিশ সদস্যরা তাকে শেরেবাংলা নগর থানায় নিয়ে যাচ্ছে। এরপর তাকে শেরেবাংলা নগর থানায় নিয়ে হাজতে রাখা হয়। তখন পুলিশ সদস্যরা তার কাছে থাকা মোবাইল ফোন এবং মানিব্যাগ নিয়ে যায়। এরপর দুজন পুলিশ সদস্য এসে তাকে হাজত থেকে বের করে থানার ভেতর গোসলের জায়গায় নিয়ে যায়। তাকে গুলি করা হবে বলে একজন পুলিশ সদস্য জানায়। এরপর অন্য এক পুলিশ একটা পরিত্যক্ত কাপড় দিয়ে তার চোখ বাঁধে। তিনি চোখের বাঁধন খুলে ওই পুলিশের পায়ে ধরে বলেন, তাকে যেন গুলি না করা হয়। ওই পুলিশ সদস্য আবার তার চোখ বেঁধে দেয়। এভাবে কয়েকবার বাঁধন খোলার পর এক পুলিশ সদস্য তাকে বলে, এরপর চোখ খুললে বুকে গুলি করা হবে। এরপর একজন পুলিশ সদস্য তার চোখ বেঁধে তাকে ধরে রাখে। আরেকজন পুলিশ তার বা পায়ে গুলি করে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পর তিনি তার চোখের বাঁধন খুলে ফেলেন। এরপর দুজন পুলিশ সদস্য তার কলার চেপে ধরে তাকে পুলিশের গাড়িতে তুলে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যায়। তিনি এক পুলিশ সদস্যের কাছে জানতে পারেন, তার নামে তিনটি মামলা হয়েছে। ১৩ মার্চ অপারেশনের মাধ্যমে তার বাম পায়ের উরু থেকে কেটে ফেলা হয়। বর্তমানে তিনি জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে আইজি ওয়ার্ডে জি ১১ নম্বর বেডে চিকিত্সাধীন অবস্থায় রয়েছেন।
পা হারিয়েও কারাগারে মো. আলমগীর হোসেন মিয়া : মো. আলমগীর হোসেন মিয়ার গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর থানার আশরাফগঞ্জ গ্রামে। তিনি একজন বই ব্যবসায়ী। ঢাকার নীলক্ষেত এলাকায় তার বইয়ের দোকান আছে। আলমগীর অধিকার-কে জানান, তিনিও পান্থপথ এলাকায় থাকেন। প্রতিদিন রাজাবাজার জামে মসজিদে ফজরের নামাজ পরে সংসদ ভবন এলাকায় হাঁটার অভ্যাস তার। ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে মসজিদে ফজরের নামাজ পড়ে তেজগাঁও কলেজের সামনে যান। তিনি সেখানে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করার দৃশ্য দেখতে পান। এ সময় তিনি কুতুববাগ এলাকার দিকে গুলির শব্দ শুনে ফার্মগেটের দিকে বাসায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেন। এ সময় হঠাত্ করে ৪-৫ জন পুলিশ সদস্য তাকে আটক করে শেরেবাংলা নগর থানায় নিয়ে রাখে। তখন পুলিশ সদস্যরা তার কাছ থেকে মোবাইল ও মানিব্যাগ নিয়ে নেয়। থানাহাজতে থাকাকালে একজন পুলিশ সদস্য তার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নেয়। তথ্য নেয়ার পর ওই পুলিশ সদস্য তাকে বলে, সে জামায়াতে ইসলামীর সদস্য। তিনি জামায়াতের সদস্য নন বলে জানান। এরপর সন্ধ্যার দিকে সাদা পোশাকধারী এক লোক উত্তেজিত স্বরে তার নাম ধরে ডাকতে থাকে এবং পুলিশ সদস্যদের প্রতি আলমগীরকে গুলি করার নির্দেশ দেয়। এরপর একজন পুলিশ সদস্য তাকে হাতকড়া পরিয়ে হাজতের বাইরে বের করে আনে এবং পেছন দিক থেকে বাম পায়ে গুলি করে। আলমগীর তখনই অজ্ঞান হয়ে পড়েন বলে অধিকার-কে জানান। জ্ঞান ফেরার পর তিনি নিজেকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের বিছানায় দেখতে পান। পরে তিনি জানতে পারেন, তার নামে তিনটি মামলা হয়েছে। তিনি হাসপাতালের সি ওয়ার্ডের ৭নং বেডে চিকিত্সা নেন। গত ৪ মার্চ ২০১৩ অপারেশনের মাধ্যমে তার উরু থেকে বাম পা কেটে ফেলা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মার্চ ২০১৩ আলমগীরকে ছাড়পত্র দিলে ওইদিনই শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায়।
এদিকে এ ঘটনাগুলোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে অধিকার। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ৪২ বছর ধরে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোতে দায় মুক্তির যে সংস্কৃতি চলছে, তার ধারাবাহিকতায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের দ্বারা এ ধরনের অপরাধগুলো সংগঠিত হচ্ছে। ফলে কাউকে গ্রেফতারের পর থানাহাজতে নিয়ে চোখ বেঁধে পায়ে গুলি করার ঘটনা ঘটছে। যার ফলশ্রুতিতে সেসব ব্যক্তির পা কেটে ফেলতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি এক ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবস্থাকেই তুলে ধরে। বর্তমানে পুলিশকে নির্বিচারে প্রাণঘাতি অস্ত্র ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে। অধিকার অপরাধী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে গ্রেফতার করে তাদের বিচারের সম্মুখীন করার দাবি জানাচ্ছে। সেই সঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকেও এ ব্যাপারে তার যথাযথ দায়িত্ব পালনের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। 

এই নিয়ে বাংলাভিশনের রিপোর্টটি দেখুন ...