Friday, 28 June 2013

কেমন আছেন আল্লামা সাঈদী-৩

29 Jun, 2013
মতিউর রহমান আকন্দ : ॥ তিন ॥ প্রচণ্ড গরম ও নিঃসঙ্গ একাকিত্ব নিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির কুঠরিতে বন্দী জীবন যাপন করছেন আল্লামা সাঈদী। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টে শুনানির জন্য অপেক্ষমান মামলার প্রস্তুতি ও দিকনির্দেশনার জন্য গত ২৩ জুন আল্লামা সাঈদীর সাথে আমরা দু’জন আইনজীবী সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম। ফাঁসির আদেশের পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এটা ছিল আল্লামা সাঈদীর সাথে আমার তৃতীয় সাক্ষাৎ। এ ঐতিহাসিক দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ডেপুটি জেলারের কক্ষে আল্লামা সাঈদীর সাথে সাক্ষাৎ আমাদের জীবনে এক স্মরণীয় ঘটনা।

২৩ জুন। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে নানা কারণে স্মরণীয় দিন। ১৭৫৭ সালের এ দিনে পলাশীর আ¤্রকাননে নবাব সিরাজুদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। স্বাধীনতা হারানোর বেদনা উপলব্ধি করেছিল বাংলার প্রতিটি মানুষ। আলেম-ওলামাদের পক্ষ থেকে ইংরেজ বেনিয়াগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সর্বপ্রথম। ১৭৬৩ সাল ছিল ইংরেজবিরোধী আন্দোলনের সূচনা বছর। ফকির মজনু শাহ ছিলেন সে আন্দোলনের প্রাণ পুরুষ। ইংরেজদের বিরুদ্ধে সেই বিদ্রোহ এক মহাবিদ্রোহে পরিণত হয়। নানান চড়াই উৎরাই আর দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মুসলমানরা গড়ে তোলে মুক্তি সংগ্রামের এক মহাআন্দোলন। এ আন্দোলনের কাহিনীতে জড়িয়ে আছে শত ফাঁসির মঞ্চ, হাজারো নির্বাসন আর লাখো মানুষের অশ্রুর ইতিহাস। ১৮৩১ সালে বালাকোটের রণাঙ্গনে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী তার শীর্ষ সাথীগণসহ শাহাদাত বরণ করেন। এরপর শহীদ তিতুমীরের মুক্তি সংগ্রাম, হাজী শরিয়তউল্লাহর মুক্তি আন্দোলন এবং ১৮৫৭ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ইংরেজবিরোধী আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। ১৮৩১ সালে তিতুমীরের শাহাদাতের পর ১৮৬২ পর্যন্ত শরিয়তউল্লাহর ফরায়েজি আন্দোলন ইংরেজবিরোধী আন্দোলনের এক মহাবিদ্রোহের অংশ। সৈয়দ আহমদ শহীদ সৃষ্ট মহাবিদ্রোহের লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের আল-কোরআন ও হাদীসের শিক্ষায় পূর্ণভাবে ফিরিয়ে আনা এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সময়ের ন্যায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে আলেম-ওলামা ও ফকিরদের ভূমিকা ছিল মুখ্য। কিন্তু এ সংগ্রাম গণরূপ পাবার আগেই কুচক্রী মহলের চক্রান্তে নিঃশেষ হয়ে যায়। সে আন্দোলনের বিদ্রোহী সৈনিকদের জীবন দান ও ফাঁসির মঞ্চে ঝুলিয়ে হত্যার পূর্ণ স্মৃতি নিয়ে আজও দেদীপ্যমান হয়ে আছে বাহাদুর শাহ্ পার্ক। বৃটিশবিরোধী অব্যাহত বিদ্রোহাত্মক তৎপরতার কারণে মুসলমানদের বিরাট মূল্য দিতে হয়। অনেকে ফাঁসিতে জীবন দেয়, আন্দামানের নির্বাসনে গিয়ে হারিয়ে যায় শত শত মানুষ, ইংরেজদের জেলে ধুঁকে ধুঁকে মরেছে হাজার হাজার মুক্তি সংগ্রামী, আর ইংরেজদের বিদ্বেষ ও বৈষম্য নীতির শিকার হয়ে গোটা মুসলিম জাতির জীবন কাঠামো সবদিক থেকে ধ্বংস হয়ে যায় বললেই চলে। শত প্রতিকূলতা, জুলুম-নিপীড়নে প্রিয় মাতৃভূমির আজাদী আন্দোলনে শরিক হয় লাখো মুক্তিকামী জনতা। আন্দোলন, সংগ্রাম ও এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অবশেষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন মুসলমানরা ইংরেজদের হাতে রাজ্য ও সর্বস্ব হারিয়ে যে করুণ পরিণতি বরণ করেছিল সে ঐতিহাসিক স্মৃতি বিজড়িত ২৩ জুনে আমরা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নিভৃত কক্ষে বন্দী আল্লামা সাঈদীর সাথে সাক্ষাতের জন্য হাজির হয়েছিলাম। ইতিহাসের নানা ঘটনায় সমৃদ্ধ এ দিনটির সাক্ষাৎকার আমাদেরকে ইংরেজ ও চক্রান্তকারীদের জুলুম-নিপীড়নের কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস সেই জুলুম-নিপীড়নের ধারাবাহিকতার নির্মম শিকার বিশ্ব বরেণ্য মুফাস্সিরে কোরআন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। কোরআনের সৈনিককে কারাগারে আটক রেখে শুধু তার ওপর জুলুম করা হচ্ছে তাই নয়, লাখো কোরআনপ্রেমিকের হৃদয়ে আঘাতের পর আঘাত হানা হচ্ছে।

২৩ জুনের এ সাক্ষাৎকারে আল্লামা সাঈদী আপিল প্রস্তুতির জন্য আমাদেরকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। তিনি অত্যন্ত বলিষ্ঠ কণ্ঠে উচ্চারণ করেন, “আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তার হাজার কোটি মাইলের মধ্যেও আমার কোন অবস্থান ছিল না। কোরআনের ময়দানে বিচরণ করে পথহারা বিভ্রান্ত মানুষকে কোরআনের আহ্বান পৌঁছে দেয়ার অপরাধে আমাকে মিথ্যা অভিযোগে এ মামলায় সাজা দেয়া হয়েছে। যারা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা কল্পকাহিনী রচনা করেছে তাদের জন্য আমার করুণা হয়। কারণ এসব মিথ্যা রচনাকারীদের আদালতে আখেরাতে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হয়ে নিজেদের কৃতকর্মের পূর্ণ জবাবদিহি করতে হবে। আজ যারা কাহিনী রচনায় বিভিন্নভাবে তাদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন সেদিন তারা কেউ কারো উপকারে আসবে না। সবাইকে অসহায় অবস্থায় আহকামুল হাকেমীন, বিচারকের বিচারক মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। সেদিনটির কথা ভেবে আমি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীদের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তারা যেন হেদায়াত প্রাপ্ত হন।”

কারাগারে তাঁর জন্য নির্ধারিত পত্রিকা পাঠ করে তিনি জানতে পেরেছেন প্রতিদিন জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। রিমান্ডে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তিনি পত্রিকায় দেখেছেন, নির্যাতনে অনেকের পা হারিয়ে গেছে, অনেকের চোখ তুলে ফেলা হয়েছে। এসব অবহিত হয়ে তার হৃদয় ভীষণভাবে ভারাক্রান্ত।

আল্লামা সাঈদী দৃঢ়তার সাথে বললেন, “পৃথিবীতে এমন কোন শক্তি নেই, যারা মুখের ফুঁৎকারে আল্লাহর দ্বীনকে নিভিয়ে দিতে পারে। যারা আল্লাহর একত্ববাদের আওয়াজ বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল আল্লাহ তাদের আওয়াজ বন্ধ করে দিয়েছেন। হযরত মূসা (আঃ)-এর নিকট ফেরাউনের পতন হয়েছিল। কারুন, হামান, নমরূদ কেউ শেষ রক্ষা পায়নি। তাদের সবাইকে করুণ পরিণতি বরণ করতে হয়েছে। সূরা বুরুজে মহান রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেছেন, ‘ওদের অপরাধ ছিল একটিই, তারা মহাপরাক্রমশালী স্বপ্রশংসিত আল্লাহর উপরে ঈমান এনেছিল।’ ঈমানের যে মিছিল বাংলার জমিনে শুরু হয়েছে, শহীদি রক্ত যে মিছিলকে করেছে বেগবান, পবিত্র জমিন হয়েছে রক্তাক্ত, শিশু-কিশোর-তরুণ-বৃদ্ধ-নারীরা যে মিছিলে শামিল হয়ে অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে, সে শহীদি মিছিলের নিকট জালিম শাহীর পতন অবশ্যম্ভাবী।”

পত্রিকায় প্রকাশিত খবর পাঠ করে তিনি জানতে পেরেছেন, মন্ত্রী, এমপিগণ ফাঁসির রায় কার্যকরের দিন, তারিখ, সময় নির্ধারণ করে বিভিন্ন স্থানে বক্তব্য দিচ্ছেন। আল্লামা সাঈদী মিথ্যা মামলায় তার বিরুদ্ধে ঘোষিত রায়ের বিষয়ে অকুণ্ঠচিত্তে বললেন, “যারা আমার গলায় ফাঁসির দড়ি লাগিয়ে আমার মৃত্যু কার্যকর করতে চায়, তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, জীবন মৃত্যুর মালিক আল্লাহ। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীই মরণশীল। সবাইকে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। আমার জন্য আল্লাহ তায়ালা মৃত্যুর যে দিন, সময় ও স্থান নির্ধারণ করে রেখেছেন তার আগে কেউ আমাকে মৃত্যু এনে দিতে পারবে না। আল্লাহ যদি চান তাহলে আমি শহীদ হবো। আমি মৃত্যুর পরোয়া করি না। সারা জীবন আমি শহীদি মৃত্যু কামনা করেছি। লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিয়ে উন্মুক্ত ময়দানে মহান আল্লাহর কাছে দু’হাত তুলে দোয়া করেছি শহীদি মৃত্যু বরণের জন্য। আমার এ চাওয়ার মধ্যে কোন ভনিতা ছিল না। মহান আল্লাহ সাক্ষী, আমি সব সময় শহীদ হওয়ার জন্য প্রস্তুত। স্বাভাবিক মৃত্যুর মধ্যে কোন গৌরব নেই, শহীদি মৃত্যু জীবনকে গৌরবান্বিত এবং মহিমান্বিত করে। জান্নাত লাভের গ্যারান্টি আছে শহীদি মৃত্যুতে। আমি সেই শহীদি মৃত্যু চাই। আমি আগেও বলেছি এখনো বলছি, আমার সারা জীবনের প্রত্যাশা মহা সত্যের বাণী আল-কোরআনের আহ্বান পৌঁছাতে পৌঁছাতে বাতিলের আঘাতে আমার দেহ রক্তাক্ত হবে, ফিনকি দিয়ে প্রবাহিত হবে আমার খুন, আল্লাহর পবিত্র জমিন হবে রঞ্জিত এ অবস্থায় আমি রক্তাক্ত পোশাক নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাজির হতে চাই। যে রক্ত থেকে মিশক্ আম্বরের চেয়েও সুগন্ধ ছড়াবে। সেই রক্ত মাখা পোশাক নিয়ে আল্লাহর আরশে আজীমে গিয়ে উপস্থিত হবো। এটাই হলো আমার কামনা। যেভাবে শহীদ হাসানুল বান্না গুলীবিদ্ধ হয়ে জীবন দিয়েছিলেন বাতিলের আঘাতে রাজপথে পড়ে ছিল মহান বিপ্লবীর অবিনশ্বর দেহ। আমি সেই পথের সৈনিক হিসেবে ঐভাবে জীবন দিতে চাই। মিথ্যা অভিযোগ, ধর্ষণ, লুটতরাজের অপবাদ দিয়ে যারা আমাকে কলঙ্কিত করতে চায়, আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তাদের কলঙ্কের চক্রান্ত থেকে আমার মুক্তির জন্য। আমি দেশবাসীর কাছেও দোয়া চাই।”

বিভিন্ন শাহাদাতের ঘটনা তুলে ধরে আল্লামা সাঈদী বললেন, “পৃথিবীতে এমন কোন জমিন নেই, যেখানে শহীদের রক্ত ঝরেছে অথচ: দ্বীনের বিজয় হয়নি। তার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত হচ্ছে মিসর। বিগত ১০০ বছরের ইতিহাসে মিসরের মাটিতে সবচাইতে বেশি জুলুম এবং নির্যাতন হয়েছে। সাইয়েদ কুতুব ও আবদুল কাদের আওদাহ্কে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে শহীদ করা হয়েছে। তাদের রক্ত শুধু মিসরেই নয়, সমগ্র পৃথিবীতে কথা বলছে।

আল্লামা সাঈদী শারীরিকভাবে অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছেন। ঠিকমত খাবার খেতে পাচ্ছেন না। কারাগারের খাবারে তার কোন রুচি আসে না। তার স্বাস্থ্য অনেকটা ভেঙ্গে পড়েছে। শুকিয়ে গেছে তার দেহ। কিন্তু তার মনের জোর পর্বত প্রমাণ। কারাগারের আবদ্ধ দেয়ালের মাঝে ফাঁসির কুঠরি। মাত্র ৩০ গজের ছোট্ট করিডোর। এ সামান্য স্থানে তার হাঁটার কোন সুযোগ নেই। তিনি বললেন, “৩০ বছর যাবত আমার ডায়েবেটিস। হার্টে ৫টি রিং বসানো। শরীরের এ অবস্থায় আমার হাঁটাহাঁটি করা খুব প্রয়োজন। কিন্তু সরকার আমাকে এমন এক নির্জন স্থানে বন্দী করে রেখেছে যে, এখানে কিছুতেই সুস্থ থাকা সম্ভব নয়। তবুও আমি আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। কারণ আমার জীবন, বেঁচে থাকা, আমার মৃত্যু এবং আমার অস্তিত্ব মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য। আমি জানি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আমাকে এখানে থাকতে হবে। যতদিন আল্লাহ চান ততদিন আমি এখানে থাকবো-তাঁর সন্তুষ্টির জন্য। তারপর আমি অনন্ত জীবনের পথে পাড়ি জমাবো। সে জীবনের কোন শেষ নেই। মহান আল্লাহ যদি আমার উপর সন্তুষ্ট থাকেন এ কারাজীবনের কষ্ট আমার জন্য কিছুই নয়।”

আল্লামা সাঈদী সারাদেশের ইসলামী আন্দোলনের খোঁজখবর নিলেন, নেতৃবৃন্দের শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলেন।

পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতির শারীরিক অবস্থা জেনে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন। তিনি বললেন, “আমার খুব কষ্ট হয় যখন পত্রিকায় দেখি শিবিরের ছেলেদের এ সরকার পিটিয়ে পঙ্গু করে দিচ্ছে। শিবির আমার কলিজার টুকরা। আমি কারা প্রকোষ্ঠে সর্বদাই দু’হাত তুলে শিবিরের জন্য চোখের পানি ছেড়ে দোয়া করি। নিশ্চয়ই আল্লাহ এ তরুণ যুবকদের কাফেলাকে হেফাজত করবেন।”

সাক্ষাতের সময় তিনি আমাদের পরিবারের খোঁজখবর নিলেন। আমি অবাক হলাম, দীর্ঘ তিন বছর যাবত যিনি কারাগারে বন্দী-ফাঁসির আদেশ মাথায় নিয়ে যিনি ১১৫ দিন যাবত ফাঁসির সেলে, ফাঁসির পোশাকে কষ্টকর জীবন যাপন করছেন তিনি নিজের পরিবার নিয়ে কোন উদ্বেগ প্রকাশ করলেন না। নিজ পুত্র শামীম সাঈদী কারাগারে কি হালতে আছেন তা নিয়েও তিনি বিচলিত নন। তিনি জানতে চাইলেন আমাদের স্ত্রী সন্তানরা কেমন আছে? আবেগ আর অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বললেন জানি, “তোমরাও ঘরছাড়া!” আমার পিঠে হাত রেখে বললেন, “তোমার ক’সন্তান? তাদের সাথে কি মাঝে মাঝে দেখা হয়?” বললাম, “আমার দু’সন্তান। মুসআব সে এবার ৭ম শ্রেণীর ছাত্র। আর মুয়াজ মাত্র সাড়ে চার বছর, সে স্কুলে যায়। আমার সন্তানদের জন্য দোয়া করবেন।” অশ্রুসিক্ত কাতর কণ্ঠে তিনি সাথে সাথে আকাশের দিকে দু’হাত তুলে দোয়া করলেন, “আল্লাহ তোমার সন্তানদের চক্ষুশীতলতা দানকারী এবং মুত্তাকীনদের ঈমাম বানিয়ে দিন।” দোয়া করি “তারা যেন বাবার চেয়েও যোগ্য হয়।”

আল্লামা সাঈদী দেশবাসীর নিকট সালাম পৌঁছে দেয়ার জন্য আমাদের অনুরোধ করলেন। তিনি বললেন, “আমি বিশ্বাস করি আপিল বিভাগে আমার বিরুদ্ধে আনীত প্রতিটি অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হবে এবং আমি আবারো কোরআনের ময়দানে ফিরে যাবো ইনশাআল্লাহ।”

ইতিমধ্যে সাক্ষাৎকারের জন্য নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গিয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষ কথা শেষ করার জন্য তাগিদ দিলেন। তিনি আমার হাত ধরে উঠে দাঁড়ালেন। তার হাতের স্পর্শ আমার অনুভূতির জগতে আবেগের তুফান সৃষ্টি করলো। আমরা কারাগারের ভিতরে প্রবেশের পথের মাথায় এসে দাঁড়ালাম। তিনি কোলাকুলি সেরে কপালে চুম্বন দিয়ে কারাভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন। যতদূর দৃশ্যমান হয় ততদূর বারবার হাতনেড়ে তিনি তার নির্ধারিত কুঠরীর দিকে এগিয়ে গেলেন।

৪২ মিনিটের সাক্ষাৎকারের যবনিকাপাত ঘটিয়ে আমরা কারাগার থেকে বের হয়ে আসলাম।

আজ সাক্ষাৎকারে আল্লামা সাঈদীকে শারীরিকবাবে দুর্বল দেখালেও মানসিকভাবে অনেক মজবুত দেখেছি। তিনি কোরআনের ময়দানে ফিরে যাবার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন মহান আল্লাহ তা কবুল করুন। আমি বিশ্বাস করি আল্লামা সাঈদী মিথ্যার বেড়াজাল থেকে বের হয়ে কোরআন প্রেমিকদের মাঝে ফিরে আসবেন ইনশাআল্লাহ। আবারো তিনি কোরআনের আহ্বান পৌঁছাবেন মানুষের দ্বারে দ্বারে। লাখো মানুষ শামিল হবে কোরআনের সে সমাবেশে। মানুষ মুক্ত হবে অভিশপ্ত পরিবেশ থেকে। মহান রাব্বুল আলামীন জুলুমের অবসান ঘটিয়ে দ্বীনের জন্য পরিবেশকে আরো উন্মুক্ত করে দিন। আমীন