Saturday, 22 June 2013

এয়ারটেলকে বিনামূল্যে তরঙ্গ বরাদ্দ: সরকারের ক্ষতি ১২০০ কোটি টাকা

 দেশের অন্যান্য অপারেটরদের তরঙ্গ বরাদ্দের বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে ফি নেওয়া হলেও এয়ারটেলকে বিনামূল্যে তরঙ্গ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর ফলে সরকারের ক্ষতি হয়েছে ১২০০ কোটি টাকা। বিনামূল্যে শত কোটি টাকা তরঙ্গ বরাদ্দ দেয়া মানেই হলো বরাদ্দ-সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পকেট ভারি করা। তবে বিষয়টি নিয়ে বিটিআরসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউ-ই প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। সম্প্রতি কম্পট্রোলার জেনারেল অব অডিট (সিএজি) কার্যালয় থেকে দেয়া নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তরঙ্গ বরাদ্দে অনিয়ম ও আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই আলোচনায় চলে এসেছে এয়ারটেল।

এয়ারটেলের বিনামূল্যে তরঙ্গ বরাদ্দ এবং ১২০০ কোটি ক্ষতির বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনেরচেয়ারম্যান সুনীল কান্তি বোসের কাছে জানতে চাইলে তিনি গত ৯ জুন জাতীয় সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না।
২০০৫ সালের ২০ ডিসেম্বর তৎকালীন ওয়ারিদ টেলিকম বর্তমান এয়ারটেলকে ১৫ বছরের জন্য জিএসএম সেলুলার মোবাইল টেলিকমিউনিকেশন সার্ভিসেস অপারেটর লাইসেন্স প্রদান করে। এ সময় লাইসেন্স ফি বাবদ ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৩৩০ কোটি ৭৫ লাখ ৫৫ টাকা আদায় করে বিটিআরসি।
এ সময় ওই কোম্পানিকে বিটিআরসির জিএসএম (গ্লোবাল সিস্টেম ফর মোবাইল কমিউনিকেশন) ১৮০০ মেগাহার্জ ব্যান্ড থেকে ১৫ মেগাহার্জ তরঙ্গ বিনামূল্যে ১৫ বছরের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়।
প্রতি মেগাহার্জ তরঙ্গের দাম ৮০ কোটি টাকা হিসেবে ১৫ মেগাহার্জ তরঙ্গে দাম আসে ১২০০ কোটি টাকা। বিনামূল্যে প্রদানের কারণে এই ১২০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। বিনামূল্যে তরঙ্গ বরাদ্দ দেয়ার কারণেই এই ক্ষতি হয়েছে।
২০১০ সালের ১৫ জুলাই মোবাইল অপারেটর কোম্পানিটি জিএসএম’র চেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ই-জিএসএম ব্যান্ডে ৫ মেগাহার্জ বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করে। এই আবেদনের বিপরীতে একই বছরের ১২ আগস্ট আগে বরাদ্দ দেয়া জিএসএম ১৫ মেগাহার্জ তরঙ্গ থেকে ৫ মেগাহার্জ তরঙ্গ প্রত্যাহার করে ই-জিএসএম ব্যান্ডে নতুন করে ৫ মেগাহার্জ বরাদ্দ দেয়া হয়।
উল্লেখ্য, বিটিআরসি ২০০৫ সালে ‘স্পেকট্রাম প্রাইসিং পলিসি’ প্রণয়ন করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালে বিটিআরসি প্রতি মেগাহার্জ তরঙ্গের মূল্য ৮০ কোটি টাকা ধার্য করে।
এই হিসেবে গ্রামীণফোন লিমিটেড থেকে ৭ দশমিক ৪ মেগাহার্জ তরঙ্গ বরাদ্দের বিপরীতে ৫৯১ কোটি টাকা, ওরাসকম টেলিকম (বাংলালিংক) থেকে দুই দশমিক ৬ মেগাহার্জ তরঙ্গ বরাদ্দের বিপরীতে ২০৮ কোটি টাকা এবং আজিআটা বাংলাদেশ লিমিটেড (রবি) থেকে দুই মেগাহার্জ তরঙ্গ বরাদ্দের বিপরীতে ১৬০ কোটি টাকা আদায় করে বিটিআরসি।
বিটিআরসির তরঙ্গ বরাদ্দ নিয়ে সম্প্রতি কম্পট্রোলার জেনারেল অব অডিট (সিএজি) কার্যালয়ে থেকে দেয়া নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও তরঙ্গ বরাদ্দে অনিয়মের বিষয়টি উঠে আসে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বেতার তরঙ্গ জাতীয় সীমিত সম্পদ। এ সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করে আর্থিক লাভবানের বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনের আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১ অনুসারে বিটিআরসি’র অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো উন্নত টেলিযোগাযোগ সেবা প্রদান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি বজায় রাখা এবং এতে উৎসাহ দান করা।
কিন্তু তরঙ্গ বরাদ্দের ক্ষেত্রে এয়ারটেলকে (আগের ওয়ারিদ টেলিকম) বিনামূল্যে ১৫ মেগাহার্জ বরাদ্দ দেয়া সত্ত্বেও কোনো অর্থ আদায় না করায় এবং অন্যদিকে গ্রামীণফোন, ওরাসকম টেলিকমের আজিআটা থেকে বেতার তরঙ্গ বাবদ অর্থ আদায় করায় বিটিআরসি অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করেছে।
বিটিআরসির কর্মকর্তারা বলেন, বিনামূল্যে তরঙ্গ বরাদ্দ করার পেছনে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে বিটিআরসির ঊর্ধ্বতন অনেক কর্মকর্তাও জড়িত ছিলেন। সম্প্রতি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বিষয়টি ধরা পড়ে।
তারা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে আরও বড় পরিসরে তদন্ত করলে ভয়াবহ তথ্য বেরিয়ে আসবে।
২০১২ সালের ২২ জুন রাজশাহী জেলার কেশবপুর পুলিশ লাইন এলাকায় বরাদ্দহীন স্পেকট্রাম ব্যবহারের ২০০ কিলোহার্টজের দুটি চ্যানেলের উপস্থিতি পায় বিটিআরসির টেকনিক্যাল টিম।
সেখানে এয়ারটেল ১৭০০ ব্যান্ডে স্পেকট্রাম ব্যবহার করছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। পরদিন সকাল সাড়ে দশটায় আবারো একই স্থানে পরীক্ষা করা হলে একই তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু এই ব্যান্ডে তাদের কোনো স্পেকট্রাম বরাদ্দ নেই।
প্রসঙ্গত, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১১ এর ৫৫ (৭) ধারায় ‘কোনও ব্যক্তি উপধারা (১)-এর বিধান লঙ্ঘনক্রমে লাইসেন্স ব্যতিরেকে বেতার যন্ত্রপাতি স্থাপন, পরিচালনা বা ব্যবহার করিলে তাহার উক্ত কাজ হইবে অপরাধ, এবং তজ্জন্য তিনি অনধিক ১০ (দশ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ৩০০ কোটি টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং উক্ত অপরাধ অব্যাহতভাবে সংঘটিত হইলে অব্যাহত মেয়াদের প্রথম দিনের পরবর্তী প্রত্যেক দিনের জন্য অতিরিক্ত অনধিক ১ (এক) কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।’