Saturday, 29 June 2013

খুলনায় অধিকার-এর তথ্য প্রকাশ : দেশে ৫ বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গুমের শিকার ৮৭ জন

খুলনাসহ দেশে গত পাঁচ বছরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে গুমের শিকার ৮৭ জন। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ৩ জন, ২০১০ সালে ১৮ জন, ২০১১ সালে ৩০ জন, ২০১২ সালে ২৪ জন এবং ২০১৩ সালের মে মাস পর্যন্ত ১২ জন গুম হয়েছেন।
গতকাল খুলনায় ‘গুম হতে সব ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সনদ অনুমোদনের প্রচারাভিযান’ শীর্ষক বিভাগীয় অ্যাডভোকেসি সভায় মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর পক্ষ থেকে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।
নগরীর অভিজাত হোটেলে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন খুলনা সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র মো. মনিরুজ্জামান মনি এবং খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য নারায়ণ চন্দ্র চন্দ। সভায় উদ্বোধনী ও স্বাগত বক্তব্য রাখেন, অধিকার-এর কো-অর্ডিনেটর রেজাউল করিম হাশমী। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধিকার খুলনার হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার মুহাম্মদ নূরুজ্জামান। প্রবন্ধের ওপর আলোচনা করেন বাংলাদেশ অ্যালাইন্স এগেইনেস্ট টর্চারের নির্বাহী সদস্য বেনজিন খান। সভায় গুমের ঘটনা দ্রুত প্রতিহত করতে না পারলে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে একটি ট্রেন্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে জানানো হয়, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ অপরাধটি নতুন নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ব্যাপক গুমের ঘটনা ঘটে। যা যুদ্ধ পরবর্তীকালেও অব্যাহত রয়েছে। স্বাধীনতার পরবর্তীকালে গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হান এবং ১৯৯৬ সালে ক্ষুদ্রজাতি গোষ্ঠীর নেত্রী কল্পনা চাকমা অন্যতম। এছাড়া স্বাধীনতার পরপরই বিপ্লবী বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে প্রায় ত্রিশ হাজার তরুণ-যুবককে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হত্যা বা গুম করে। পরে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা বিভিন্ন সামরিক শাসনামলেও এ ধারা অব্যাহত থাকে। সম্প্রতি গুমের ঘটনা আবারও ঘটতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে কনভেনশন এগেইনস্ট টর্চার অনুস্বাক্ষর করেছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত গুম বিরোধী আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুমোদন করেনি।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে খুলনা সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র মো. মনিরুজ্জামান মনি বলেন, শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামকে গুম করা হয়েছে কয়েকজন গার্মেন্ট মালিককে প্রতিষ্ঠা করার জন্য। এখানে শ্রমিক স্বার্থ বিবেচনায় না এনে মালিকদের স্বার্থ বিবেচনা করা হয়েছে। যার ফলে আজ বিশাল পোশাক শিল্প ধ্বংসের মুখে নিপতিত। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা চরম হুমকির মুখে। গুম করার বিষয়টি এখনই ভেবে দেখার সময় এসেছে। তিনি বলেন, কাউন্সিলর চৌধুরী আলম গুম হন। কিন্তু তাকে উদ্ধারের ব্যাপারে সরকার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সরকার যখন নিজে কোনো কাজে জড়িত থাকে তখন তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার অবস্থা থাকে না। সিলেটের বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে আজও সরকার উদ্ধার করতে পারেনি। তার গুম হওয়ার পর সরকারের আন্তরিকতার খুবই অভাব পরিলক্ষিত হয়। সরকারের উচিত গুম এবং দায়মুক্তি প্রতিরোধে গঠিত আন্তর্জাতিক আইনে স্বাক্ষর করা। সরকার যাতে এ আইন বাস্তবায়নে বাধ্য হয় তার জন্য জনমত গড়ে তোলা। এক্ষেত্রে অধিকারের নেতৃত্বে দেশে গণমানুষকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। অধিকারের দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করে তিনি বলেন, গুম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদে বাংলাদেশ যাতে স্বাক্ষর করে সে ব্যাপারে তিনি ভূমিকা পালন করবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন।
অপর বিশেষ অতিথি খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বলেন, গুম আইনবহির্ভূত কাজ। এটি বন্ধ হওয়া উচিত। এটি মানবাধিকার লঙ্ঘন। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এটি মোকাবিলা করা উচিত। গুম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদে বাংলাদেশ যাতে স্বাক্ষর করে সে ব্যাপারে তিনি পার্লামেন্টে কথা বলার অঙ্গীকার করে বলেন, যারা মানুষকে হত্যা করে সেটাও মানবাধিকার লঙ্ঘন। ফলে মানবাধিকার কর্মীদের উচিত উভয় বিষয়ে তদারকি করা।
অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন নাগরিক নেতা অ্যাডভোকেট ফিরোজ আহমেদ, কাউন্সিলর হাফিজুর রহমান, কাউন্সিলর হাফিজুর রহমান মনি, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ মাজহারুল হান্নান, খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোল্যা মাসুম রশিদ, খুলনা থেকে গুম হওয়া কুষ্টিয়ার জাসদ নেতা মোহাম্মদ আলী মহব্বতের স্ত্রী ময়না খাতুন, ভিকটিম পরিবার নেটওর্য়াক-এর সমন্বয়কারী কোরবান আলী, পোলট্রি ফিস ফিড মালিক সমিতির সেক্রেটারি জেনারেল এসএম সোহরাব হোসেন, দৈনিক সময়ের খবর-এর যুগ্ম সম্পাদক গাজী আলাউদ্দীন আহমেদ, মহানগর আ.লীগের উপ-দফতর সম্পাদক মাহবুব আলম সোহাগ, কমিউনিস্ট পার্টির নগর সম্পাদক মিজানুর রহমান বাবু, মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি রেহেনা আক্তার, আমার দেশ-এর খুলনা ব্যুরো চিফ এহতেশামুল হক শাওন, ব্লাস্ট খুলনার কো-অর্ডিনেটর অশোক কুমার সাহা ও সাংবাদিক মাহবুবুর রহমান মুন্না।
সভায় বক্তারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ সরকারের গুম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর ও অনুস্বাক্ষর করতে সরকারের কাছে দাবি এবং এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দাবি করেন। একই সঙ্গে গুম হওয়া থেকে সবার সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সনদ অনুমোদনের বিষয়ে ব্যাপকভাবে প্রচারের পাশাপাশি এর বাস্তবায়ন এবং গুমজনিত অপরাধ বন্ধে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসারও আহ্বান জানানো হয়।