Friday, 28 June 2013

খুন গুম মিডিয়া দলনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘন : আন্তর্জাতিক আদালতে শেখ হাসিনাসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল


বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে হেগে আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল কোর্টে (আইসিসি) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেভলেপমেন্ট ফর বাংলাদেশ’ এবং গ্রেটার ওয়াশিংটন ডিসির বাংলাদেশী আমেরিকানরা। এ দু’সংগঠনের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনের ‘মারটিন এফ ম্যাকমহন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস’ ২৭ জুন বৃহস্পতিবার অভিযোগ দায়ের করে। ‘নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস, দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, দিগন্ত ও ইসলামিক টিভি এবং আমার দেশ পত্রিকার ওপরও সরকার আক্রমণ চালিয়েছে’ বলে ওই অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় মোট ২৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ কোর্টে যারা জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট প্রদান করেছেন অথবা তদন্ত করেছেন তাদের নামও রয়েছে এ অভিযোগনামায়। গত বছর ২৮৯ সাংবাদিকের ওপর সরকারের হামলা এবং ৫ জন নিহত হওয়ার তথ্যও উপস্থাপিত হয়েছে ওই অভিযোগপত্রে। দায়ের করা অভিযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানানোর জন্য একই দিন বিকালে ওয়াশিংটন ডিসি ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে অ্যাটর্নি মারটিন এফ ম্যাকমহন সংবাদ সম্মেলন করেন। এ সময় অ্যাটর্নিকে সহযোগিতা করেন ওলিভার টডিল ও মুয়াজ রহমান।
সাংবাদিক সম্মেলনে অ্যাটর্নি মারটিন এফ ম্যাকহাম সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘনে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন বলে জানান। তবে সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদসহ ৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলেন- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার, র্যাবের মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমান ও বিজিবির মহাপরিচালক আজিজ আহমেদ। বাকিরা হলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদ, চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানার ওসি প্রদ্বীপ কুমার, ডিএমপি মতিঝিল জোনের এসি মেহদী হাসান, ডিএমপি লালবাগ বিভাগের ডিসি হারুন অর রশিদ, মিরপুর মডেল থানার ওসি সালাউদ্দিন, গোয়েন্দা বিভাগের এডিসি মশিউর রহমান, দারুস সালাম থানার ওসি খলিলুর রহমান, কাফরুল থানার ওসি আবদুল লতিফ, কাফরুল থানার সাব ইন্সপেক্টর আশিক, যাত্রাবাড়ী থানার ওসি রফিকুল ইসলাম, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান নূর, শহিদুল ইসলাম, এম এম মোস্তাফিজুর রহমান ও হারুন রশিদ, পাবলিক প্রসিকিউটর সাজ্জাদুল হক শিহাব ও আসলাম।
সংবাদ সম্মেলনে অ্যাটর্নি মারটিন উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই দেশে মানবাধিকর লঙ্ঘন করে আসছে। বাংলাদেশে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে মারটিন বলেন, বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ বাংলাদেশী মিডিয়াসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, বিভিন্ন মানবাধিকার ও এনজিও সংস্থার রিপোর্টে রয়েছে। অ্যাটর্নি মারটিন বলেন, অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে রাষ্ট্রের চাপে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিক দিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্র হুমকির মুখে আছে। গত কয়েক মাস ধরে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত বেসামরিক মানুষ হত্যা, হয়রানি এবং গ্রেফতার ও অত্যাচার করা হচ্ছে। অভিযোগপত্রে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী ও ৫-৬ মে’র হত্যাকাণ্ডসহ আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করে নির্যাতন, হেফাজতে ইসলামের নেতা আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ও ছাত্রনেতা দেলোয়ার হোসেনকে গ্রেফতার ও নির্যাতন, বিরোধীদলীয় নেতা ইলিয়াস আলী গুম, শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলাম হত্যা, ছাত্রনেতা মোহাম্মদ ফিরোজ খান ও আনোয়ারুল ইসলাম মাসুম পুলিশ কর্তৃক নির্যাতনের শিকার এবং জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাক্ষী সুখরঞ্জন বালী নিখোঁজ ও কলকাতায় আটক থাকার ঘটনা তুলে ধরেন।
অ্যাটর্নি মারটিন দাবি করেন, বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী, র্যাব, বিজিবি ও ডিজিএফআইসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন করে আসছে। অভিযোগপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে অ্যাটর্নি মারটিন উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে ২০০৯ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যা ১৫৪ জন, ১০ সালে ১২৭ জন, ১১ সালে ৮৪ জন ও ১২ সালে ৭০ জন। ২০০৯ সালে বন্দি অবস্থায় মৃত্য ৫০ জন, ২০১০ সালে ৬০ জন, ১১ সালে ১০৫ জন, ১২ সালে ৬৩ জন। ২০০৯ সালে গুম হয়েছেন ৩ জন, ১০ সালে ১৮ জন, ১১ সালে ৩০ জন, ১২ সালে ২৪ জন। ২০০৯ সালে নির্যাতনে আহত ও নিহত হয়েছেন ৮৯ জন, ১০ সালে ৬৭, ১১ সালে ৪৬, ১২ সালে ৭২ জন। সাংবাদিক নির্যাতনের স্বীকার ২০০৯ সালে ২২১ জন, ১০ সালে ২৩১ জন, ১১ সালে ২৫৯ জন, ১২ সালে ২৮৯ জন।
রাজনৈতিক হত্যার শিকার ২০০৯ সালে ২৫১ জন, ১০ সালে ২২০ জন, ১১ সালে ১৩৫ জন ও ১২ সালে ১৬৯ জন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি মারটিন বলেন, আন্তর্জাতিক আদালতে আমরা অভিযোগটি দাখিল করেছি। আমরা আশা করছি, আইসিসি অভিযোগগুলো তদন্ত করে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে চূড়ান্তভাবে মামলাটি গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্তত ত্রিশজন প্রবাসী উপস্থিত ছিলেন। ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের গুরুত্বপূর্ণ একজন কর্মকর্তা সেখানে ছিলেন গোটা পরিস্থিতি অবলোকনের জন্য।