Saturday, 25 May 2013

মহাজোট সরকারের ৪ বছরে সশস্ত্র বাহিনীতে চাকুরী হারিয়েছেন ১৬৭ জন ,ছেড়েছেন ১৬১ জন




সশস্ত্র বাহিনী (সেনা, নৌ ও বিমান) থেকে গত চার বছরে ১৯৭ জন কর্মকর্তা চাকরি হারিয়েছেন। স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়েছেন আরও ১৬১ জন। এ দুই ধরনের প্রক্রিয়ায় কর্মচ্যুত হওয়া কর্মকর্তার তালিকায় লেফটেন্যান্ট থেকে শুরু করে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদমর্যাদার কর্মকর্তা আছেন। চার বছরে প্রকাশিত সরকারি গেজেট থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ১১৬ জন সেনা কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। নৌ ও বিমানবাহিনীর অনেক কর্মকর্তার একই দশা হয় সে সময়।
দেশের সশস্ত্র বাহিনী সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন এমন ব্যক্তিরা বলছেন, দেশে রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীতে আতঙ্ক দেখা দেয়। এই রাজনৈতিক দূষণে বাহিনীর পেশাদারি নষ্ট হয় এবং দীর্ঘ মেয়াদে এর পরিণাম ভালো হয় না।
সাবেক সেনাপ্রধান কে এম সফিউল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর প্রত্যেক সদস্য দেশের জন্য জীবন দেওয়ার শপথ নিয়ে থাকেন। তাঁদের কারও বিরুদ্ধে যদি কোনো অন্যায্য কিছু করা হয়, তার প্রভাব পড়ে পুরো বাহিনীতে। তিনি বলেন, এই বাহিনী যেমন নিয়মকানুনের মধ্যে চলে, তেমনি সবকিছু হওয়া উচিত নিয়ম মেনেই।
মহাজোট সরকারের সময়: বর্তমান সরকারের আমলে চাকরি হারানো কর্মকর্তাদের বরখাস্ত, বাধ্যতামূলক অবসর, অকালীন অবসর বা বয়সসীমার আগে অবসর দেওয়া হয়েছে। আবার অনেকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়েছেন। স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়া কর্মকর্তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নারী কর্মকর্তা আছেন। তবে সম্প্রতি এভাবে চাকরি যাওয়ার প্রবণতা কমে গেছে বলে জানা গেছে।
২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত সরকারি গেজেটে দেখা গেছে, চার বছরে শুধু সেনাবাহিনী থেকে ১৬০ জন কর্মকর্তা চাকরি হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৫ জনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয় ১২ জনকে। অকালীন অবসর দেওয়া হয় ১২৩ জনকে। এর বাইরে ১২৮ জন স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন।
নৌবাহিনী থেকে এ সময় ২০ জন কর্মকর্তা চাকরি হারিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১১ জনকে বাধ্যতামূলক ও দুজনকে অকালীন অবসর দেওয়া হয়েছে। বরখাস্ত করা হয়েছে সাতজনকে। এর বাইরে ১২ জন স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়েছেন।
বিমানবাহিনী থেকে ১৩ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। বরখাস্ত করা হয়েছে চারজনকে। স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়েছেন ২১ জন।
সেনা কর্মকর্তাদের বরখাস্ত, বাধ্যতামূলক অবসর, স্বেচ্ছায় এবং অকালীন অবসর দেওয়ার ব্যাপারে তথ্য চেয়ে ‘তথ্য অধিকার আইন’ অনুসরণ করে গত ২৫ মার্চ আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরে (আইএসপিআর) লিখিত আবেদন জানানো হয়। তবে গতকাল ২৫ মে পর্যন্ত আইএসপিআর এ ব্যাপারে কিছুই জানায়নি।
বাধ্যতামূলক অবসর: বর্তমান সরকারের আমলে তিন বাহিনী থেকে ৩৬ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। এর মধ্যে সেনাবাহিনী থেকে ১২ জন, নৌবাহিনী থেকে ১১ ও বিমানবাহিনী থেকে ১৩ জন। এ তালিকায় আছেন একজন লে. জেনারেল, তিনজন মেজর জেনারেল বা সমমানের, তিনজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, দুজন কর্নেলসহ বিভিন্ন পদের কর্মকর্তা।
লে. জেনারেল আমিনুল করিমকে ২০০৯ সালের ১২ মার্চ বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। অবসরের আগে তিনি রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব ছিলেন।
নৌবাহিনীর রিয়ার অ্যাডমিরাল মোস্তাফিজুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয় গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর। বিমানবাহিনীর এয়ার ভাইস মার্শাল মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয় ২০০৯ সালের ৪ জুন।
বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ দলের সঙ্গে তিনিও ছিলেন। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। কেন অবসর দেওয়া হলো, তা তিনি জানেন না।
বরখাস্ত: গত চার বছরে তিন বাহিনী থেকে ৩৬ জন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন অভিযোগে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের দুজন ছাড়া বাকি সবাই মধ্যম শ্রেণীর কর্মকর্তা।
২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহের পর একজন নারী কর্মকর্তাসহ ছয় কর্মকর্তাকে বরখাস্তের ঘটনা বেশ আলোচিত হয়। ২০০৯ সালের ৭ জুন এক সরকারি প্রজ্ঞাপনে লে. কর্নেল শামসুল ইসলাম (আর্টিলারি), লে. কর্নেল মাহাদী নসরুল্লাহ শাহীর, লে. কর্নেল শফিউল হক চৌধুরী, মেজর মহসিনুল করিম, ক্যাপ্টেন হাবিবা ইসলাম এবং ক্যাপ্টেন এ কে এম আন্নুর হোসেনকে সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, বিডিআরের বিদ্রোহের ঘটনার পর তাঁরা সেনাপ্রধানের দরবারে সমালোচনা করেছিলেন। সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ ওই বছরের ১৫ জুন সেনাপ্রধানের পদ থেকে বিদায় নেন। সেনাপ্রধানের পদ থেকে বিদায় নেওয়ার আগমুহূর্তে তিনি ওই ছয় কর্মকর্তার বরখাস্তের আদেশে সই করেন।
এক-এগারো-পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আরও ছয়-সাতজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। ওই সময়ের আলোচিত দুই সেনা কর্মকর্তা এ টি এম আমিন ও চৌধুরী ফজলুল বারীকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। এদের বিরুদ্ধে এ ছাড়া চট্টগ্রামে দরবারে লুটের ঘটনায় বরখাস্ত হন লে. কর্নেল জুলফিকার আলী মজুমদার।
স্বেচ্ছা অবসর: সাড়ে তিন বছরে সেনাবাহিনী থেকে ১২২ জন, নৌবাহিনী থেকে ১২ জন এবং বিমানবাহিনী থেকে ২০ জন স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন। তাঁরা বেশির ভাগই কর্নেল থেকে শুরু করে নিচের পদের কর্মকর্তা। তাঁদের মধ্যে সেনাবাহিনী থেকে ১৪ জন এবং বিমানবাহিনী থেকে পাঁচজন নারী কর্মকর্তা চাকরি ছেড়েছেন।
স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার আবেদনের পর নিয়ম অনুসারে তাঁদের কারও কারও পেনশনের অংশ কেটে নেওয়া হয়েছে। কাউকে অতিরিক্ত অর্থ জমা দিতে বলা হয়েছে।
স্বেচ্ছা অবসরে যাওয়া বিমানবাহিনীর একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তিনি প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরে কর্মরত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার আসার পর নানাভাবে বাহিনীর ভেতরে মানসিক বিড়ম্বনার শিকার হন। একপর্যায়ে মনঃকষ্টে চাকরি ছেড়ে দেন। অন্য একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি নিয়ে ক্ষোভের কারণে অনেক কর্মকর্তা চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।
অকালীন অবসর: সেনা আইনের ১৮ অধ্যায়ের ১২(১) ধারা এবং সেনা প্রবিবিধানের ২৬১ ধারা অনুসারে সেনা সদরের প্রস্তাবে যে কারও বর্তমান পদবিতে চাকরিসীমা শেষে বা বয়সসীমা শেষ হওয়ার আগে বা অন্য যেকোনো কারণে অকালীন অবসর দেওয়া যায়। এই আইনের আওতায় চার বছরে সেনাবাহিনী থেকে ১১২ জনকে অকালীন অবসর দেওয়া হয়েছে। নৌবাহিনী থেকে অবসর দেওয়া হয়েছে মাত্র দুজনকে। বিমানবাহিনী থেকে এভাবে কাউকে অবসর দেওয়া হয়নি। অবসর দেওয়া কর্মকর্তাদের বেশির ভাগই মেজর ও লে. কর্নেল পদমর্যাদার। এ ছাড়া একজন লে. জেনারেল, দুজন মেজর জেনারেল ও সাতজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আছেন।
সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, সরকার বদল হলেই অন্য বাহিনীর মতো সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরেই আতঙ্ক শুরু হয়। কিছু কর্মকর্তা অকারণে ঝরে পড়েন। এ সংস্কৃতি ভালো নয়। সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটলে তার ফলাফল শুভ হয় না, আগেও সশস্ত্র বাহিনীকে এর খেসারত দিতে হয়েছে।
চারদলীয় জোট সরকারের আমলে যা হয়েছিল: প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, চারদলীয় জোট সরকারের আমলে অর্থাৎ ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে সেনাবাহিনী থেকে ১১৬ জন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত ও বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। এই কর্মকর্তাদের মধ্যে মেজর জেনারেল পদের কর্মকর্তা চারজন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদের তিনজন, নয়জন কর্নেল, ১১ জন লে. কর্নেল, ৬৮ জন মেজর, ১৪ জন ক্যাপ্টেন ও সাতজন লেফটেন্যান্ট পদের কর্মকর্তা ছিলেন। ওই আমলে নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর কত জন কর্মকর্তা পদচ্যুত হয়েছিলেন, তার সঠিক সংখ্যা জানা সম্ভব হয়নি। তবে এ সংখ্যা অর্ধশতাধিক বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের ৪৬ জনের চাকরি পুনর্বহাল করে তাঁদের স্বাভাবিক অবসর দেওয়া হয়। অবসরে যাওয়া ১৬ জনকে ভূতাপেক্ষা পদোন্নতিও দেওয়া হয়। এ তালিকায় আছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা তারেক আহম্মেদ সিদ্দিক, এনএসআইয়ের মহাপরিচালক মনজুর আহমেদ, বিটিআরসির প্রয়াত চেয়ারম্যান জিয়া আহমেদ, সৈয়দ সাফায়াতুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী শিকদার।
এভাবে ভূতাপেক্ষা পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন? জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের প্রবণতা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য সুখকর নয়। এখানে আগে-পরে যা হয়েছে, সবই রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই হয়েছে। এতে বাহিনীর পেশাদারির অনেক ক্ষতি হয়। এ ধরনের বাহিনীকে অবশ্যই রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা উচিত।
একই সময়ে নৌবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া ২৭ জনের চাকরি পুনর্বহাল করে তাঁদের স্বাভাবিক অবসর দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২৩ কর্মকর্তাকে পদোন্নতিও দেওয়া হয়। তাঁদের পদোন্নতি দিতে গিয়ে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে জারি করা ২১টি আদেশ বাতিল করা হয়।
বিমানবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া ১৩ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার চাকরি পুনর্বহাল করে তাঁদের স্বাভাবিক অবসর দেওয়া হয়। তাঁরা সবাই ভূতাপেক্ষা পদোন্নতি পেয়েছেন। ২০০৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ইমতিয়াজ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, সরকার অনেক ক্ষমতাশালী, তারা চাইলে তাদের অপছন্দের কোনো কর্মকর্তাকে বদলি করতে পারে, ওএসডি বা সরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এর ফলে যেটি হয়, সেটি আমলাতন্ত্রে হোক বা সামরিক বাহিনীতেই হোক, তাদের পেশাদারি নষ্ট হয়। এতে করে যখন যে ক্ষমতায় থাকে, কর্মকর্তারা তখন তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেন। আর যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাঁরা ক্ষুব্ধ থাকেন। শেষ পর্যন্ত এর খেসারত রাষ্ট্রকেই দিতে হয়।