Monday, 15 July 2013

৫০ আসনে নির্বাচনের প্রস্তাব দেয়া হয় হেফাজতকে


হেফাজতে  ইসলামের সঙ্গে সমঝোতার সব চেষ্টাই করেছিল সরকার। জোটবদ্ধভাবে ৫০টি আসনে নির্বাচনের প্রস্তাবও দেয়া হয়েছিল সময়ের আলোচিত এই অরাজনৈতিক সংগঠনকে। হেফাজত আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফীর সঙ্গে একাধিক বৈঠকে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরা এসব প্রস্তাব দিয়েছিলেন  
 বলে দাবি করেছেন হেফাজত নেতারা। তারা বলছেন, আল্লামা শফি এসব প্রস্তাবে রাজি না হওয়াতেই নির্যাতনের খড়গ নেমে এসেছে হেফাজত নেতা-কর্মীদের ওপর। হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক এ প্রসঙ্গে মানবজমিনকে বলেন, বিষয়টি এতদিন গোপন ছিল। দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে আমরা বলিনি। সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা হুজুর শফি সাহেবের সঙ্গে দেখা করে গিয়েছিলেন। তারা বলেছিলেন, প্রয়োজনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদেরকে জোট করতে। সংসদ নির্বাচনে ৫০টির বেশি আসন ছেড়ে দেয়া হবে। ১৩ দফার অনেক দাবিও মেনে নেয়ার কথা জানানো হয়েছিল। তিনি  বলেন, এখন আমাদের ঈমান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। দেশের মানুষের সামনে হেফাজতকে অপদস্ত করতে সশরীরে মাঠে নেমেছে সরকার। সরকারের দ্বিমুখী আচরণ দেখে হতবাক স্বয়ং আল্লামা শফি নিজেও। তার প্রেস সচিব মাওলানা মুনির আহমদও সরকারের আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, একটি ভিডিও টেপ নিয়ে সরকার এমন কিছু নেই যা করছে না। কারসাজি থেকে শুরু করে কণ্ঠ পরিবর্তন সবই করছে তারা। এতে তাদেরই মানসম্মান চলে যাচ্ছে। অথচ হেফাজতে ইসলাম কোন রাজনৈতিক দল নয়। সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা আমাদের দাবি-দাওয়া মেনে নেয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। এখন অন্য আচরণ করছেন। হেফাজতে ইসলামের নেতারা জানান, সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় প্রথম প্রস্তাবটি নিয়ে আসেন বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। গত ৩১শে মার্চ হাটহাজারী মাদ্রাসায় এসেছিলেন তিনি। সে সময় তার সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ নেতা আবদুস সালাম। তারা এক ঘণ্টার বেশি আল্লামা শফির সঙ্গে বৈঠক করেন। হেফাজত নেতারা জানান, ড. হাছান মাহমুদ আল্লামা শফির শারীরিক খোঁজখবর নেন। এই সময় তিনি সরকারের সঙ্গে দূরত্ব মেটানোর প্রস্তাব দেন। বলেন, ‘হুজুর আপনার বয়স হয়েছে। এই বয়সে কেন এত ঝামেলা মাথায় নেবেন। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীও আপনাকে ভাল জানেন। তিনিও চান না আপনাকে নিয়ে টানাহেঁচড়া হোক। তাই সরকারের সঙ্গে বন্ধু হয়ে কাজ করলে দুই জনেরই মঙ্গল।’ হাছান মাহমুদের কথার জবাবে আল্লামা শফি ওই সময় বলেছিলেন, ‘আমি এখন যে অবস্থানে আছি সেখান থেকে সরে আসার কোন সুযোগ নেই। তাহলে আমার ঈমান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে। তোমাদের প্রধানমন্ত্রীকে বলে দাও তার সঙ্গে কাজ করতে আমাদের কোন আপত্তি নেই। তবে তিনি যেন সব দাবি মেনে নেন।’ মন্ত্রী হাছান মাহমুদ যাওয়ার দুই দিন আগে আল্লামা শফির সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে দেখা করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান ও জেলা পুলিশ সুপার হাফিজ আক্তার। তারা ১৩ দফা আন্দোলনের জন্য ওই সময় ডাকা সব ধরনের কর্মসূচি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। জবাবে তাদেরকে তা সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দেন দলটির নেতা-কর্মীরা। তবে সরকারের সঙ্গে সমঝোতার প্রস্তাবে সবচেয়ে লোভনীয় কথাটি জানান হাটহাজারী আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। জাতীয় পার্টির অন্যতম নীতিনির্ধারক এই নেতা সরকারের পক্ষ থেকে সংসদ নির্বাচনে হেফাজতকে জোট গঠন করার প্রস্তাব দেন বলে জানান হেফাজতের একাধিক নেতা। তারা জানান, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ একবার নয়, একাধিকবার এসেছেন হাটহাজারী মাদ্রাসায়। তিনি আওয়ামীলীগ, জাতীয়পার্টি ও হেফাজত মিলে একটি নতুন শক্তি গঠনের কথাও বলেছিলেন। এই বিষয়ে জানতে জাতীয় পার্টির সাংসদ ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের সঙ্গে কথা বললে তিনি ওই সময় আল্লামা শফির সঙ্গে দেখা করার বিষয়টি সত্য বলে জানান। তবে তাদের মধ্যে কি কথা হয়েছে সে বিষয়ে খোলাসা করে কোন কথা বলতে চাননি। স্থানীয় এমপি হয়ে তিনি হুজুরের সঙ্গে দেখা করেছেন বলে উল্লেখ করেন। জোট গঠন করার প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যারিস্টার আনিস প্রশ্ন এড়িয়ে যান। হেফাজতে ইসলামের নেতারা জানান, বছর দুয়েক আগে একবার শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন আল্লামা শফি।  কওমি শিক্ষানীতি নিয়ে কথা বলতে ওই বৈঠকে হাজির হন তিনি। এরপর আরও একবার দেখা করেন আল্লামা শফি। দুইবারই প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করেন বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। জানতে চাইলে হেফাজতে ইসলামের সিনিয়র নায়েবে আমীর আলামা মহিবুল্লাহ বাবুনগরী মানবজমিনকে বলেন, সরকার আল্লামা শফিকে নিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু করেছে। বিষয়টিকে ভাল চোখে দেখছেন না দেশের আলেম সমাজ। তার বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে ছোট করার কৌশল হাতে নেয়া হয়েছে। সরকার এক সময় হেফাজতের সঙ্গে আপসে করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। এখন নিজেদের দুর্বল অবস্থানের কারণে সব রাগ হেফাজতের ওপর ঢালার চেষ্টা করছেন। একই রকম মন্তব্য করেন হাটহাজারী মাদ্রাসার প্রবীণ মোহাদ্দিস ও দলীয় নায়েবে আমীর শামসুল আলম। তিনি বলেন, সরকার কি করছে তা নিজেই জানে না। আল্লামা শফির মতো একজন বড় বুজুর্গকে নিয়ে তামাশা শুরু করেছে। তার ভিডিওকে ডিজিটাল কারসাজির মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে এই ধরনের আচরণ কাম্য নয়। অথচ দেখুন কয়দিন আগেও তাদের মন্ত্রী এমপিরা হুজুর শফি সাহেবের কক্ষে এসে পড়ে থাকতেন। এই হচ্ছে বর্তমান সরকারের দ্বিমুখী নীতি।