Thursday, 19 September 2013

আবুল হাসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

মানবজমিন ডেস্ক: পদ্মা সেতু দুর্নীতি নিয়ে তোলপাড় চলছে। এ দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী ও বাংলাদেশী বংশোদভূত কানাডিয়ান জুলফিকার আলী ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে কানাডার আদালত। এরই মধ্যে এসএনসি-লাভালিনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ালেসকে কানাডার পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তিনি নিয়মিত আদালতে হাজিরা দেবেন এই শর্তে পরে বুধবার তাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। এ খবর দিয়েছে কানাডা থেকে প্রকাশিত বাংলা ভাষার একটি অনলাইন সংবাদ মাধ্যম এ খবর প্রকাশ হওয়ার পর কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশী ও দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। ওদিকে কানাডার সিবিসি নিউজ এক প্রতিবেদনে বলেছে, এ দুর্নীতিতে দু’জন বিদেশী অভিযুক্ত হয়েছেন। তাদের একজন আবুল হাসান চৌধুরী। তিনি বাংলাদেশ সরকারের একজন সাবেক কর্মকর্তা এবং ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী লবিস্ট। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু দুর্নীতি নিয়ে যে চিঠি দিয়েছিল তাতে তার নাম রয়েছে। বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু দুর্নীতির ঘুষের ভাগ তিনিও পেয়ে থাকতে পারেন। ওদিকে বুধবারই সিবিসি আবুল হাসান চৌধুরীর সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করে। এ সময় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, কানাডা কর্তৃপক্ষ তাকে অভিযুক্ত করেছেন এমন কোন তথ্য তার কাছে নেই। রয়েল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ (আরসিএমপি) এ দুর্নীতির কারণে গত মঙ্গলবার গ্রেপ্তার করে এসএনসি-লাভালিনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ালেসকে। বুধবার তাকে শর্তসাপেক্ষে ছেড়ে দেয়া হয়। এ খবর প্রকাশ হতেই বেরিয়ে আসতে থাকে নতুন সব তথ্য। বুধবার আরসিএমপি ঘোষণা করে যে, তারা কানাডার বিদেশী সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি বিষয়ক আইনের (করাপশন অব ফরেন পাবলিক অফিসিয়ালস অ্যাক্ট) অধীনে কেভিন ওয়ালেস, জুলফিকার আলী ভূঁইয়া ও বাংলাদেশের প্রথম সারির লবিস্ট আবুল হাসান চৌধুরীকে অভিযুক্ত করেছে। এছাড়া, এসএনসি-লাভালিনের নিম্ন পর্যায়ের দু’ কর্মচারী মোহাম্মদ ইসমাইল ও রমেশ শাহ’র বিরুদ্ধে এ দুর্নীতির অভিযোগে মামলা চলছে টরন্টোতে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পদ্মা সেতু বহুমুখী প্রকল্পের ৫ কোটি ডলারের সুপারভাইজিং কন্ট্রাক্ট এসএনসি-লাভালিনকে পাইয়ে দিতে তারা ঘুষের সঙ্গে জড়িত ছিল। এর প্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংক তদন্ত করে। বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়ায় প্রকল্পে দুর্নীতি তদন্তের কাজ করে বিশ্বব্যাংক। এরপর বিশ্বব্যাংকের উন্নয়ন প্রকল্পে এক দশকের জন্য নিষিদ্ধ করা হয় এসএনসি-লাভালিনকে। তারা বিশ্বব্যাংকের ওই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে। ওদিকে এসএনসি-লাভালিন গ্রুপের যে অঙ্গ প্রতিষ্ঠানে কেভিন ওয়ালেস দায়িত্ব পালন করেন তার নাম এসএনসি-লাভালিন ইন্টারন্যাশনাল ইন-করপোরেশন (এসএলআইইই)। এরই মধ্যে কানাডার সিবিসি নিউজ এবং গ্লোবাল অ্যান্ড মেইল প্রকাশ করেছে যে, ঘুষ দেয়ার ক্ষেত্রে কেভিন ওয়ালেসের প্রতিষ্ঠান এসএলআইআই গোপন অভ্যন্তরীণ কোড ব্যবহার করতো। এ রকম কোড হলো ‘পিসিসি’ অথবা ‘সিসি’। প্রজেক্ট কনসালটেন্সি কস্ট বা প্রকল্পের পরামর্শক ফি হিসেবে গোপন কোডের মাধ্যমে এসব ঘুষ দেয়া হতো। এভাবে ঘুষ দেয়ার একটি ব্যাংক চেক হাতে রয়েছে সিবিসি নিউজের। এসএলআইআই-এর প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইসমাইল বলেছেন, গোপন কোড হিসেবে ব্যবহার করা হতো পিসিসি শব্দটি। কখনও কখনও তা পরামর্শক ফি, কখনও বাণিজ্যিক খরচ হিসেবে এসব ব্যয় দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে এগুলো ছিল ঘুষ। বাংলাদেশে পদ্মা সেতু দুর্নীতিতে এরই মধ্যে অভিযুক্ত এই মোহাম্মদ ইসমাইল। তার বিরুদ্ধে যে প্রমাণ পাওয়া গেছে তা প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ওদিকে এভাবে গোপন কোডের মাধ্যমে অর্থ দেয়াকে অবৈধ বলে মেনে নিয়েছে এসএনসি-লাভালিন। এসব দুর্নীতি যখন ধরা পড়ে তখন এসএলআইআই-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ থেকে এবং জেনারেল ম্যানেজার পদ থেকে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে কোম্পানি কেভিন ওয়ালেসকে চাকরিচ্যুত করে। ওদিকে তার আইনজীবী স্কট ফেনটন বুধবার বলেছেন, তার মক্কেলের বিরুদ্ধে আরসিএমপি যে অভিযোগ এনেছে তা মারাত্মক ধরনের। তিনি বলেন, তদন্ত হয়েছে ১৮ মাস আগে। তখন তাকে অভিযুক্ত করা হয়নি। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্ত হয়েছে। তাতে কোন নতুন তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় নি। তাই তার মক্কেল নিজেকে নির্দোষ বলে মনে করছেন। তিনি সুনাম ফিরিয়ে আনার জন্য লড়াই করে যাবেন। আরসিএমপি এসএনসি-লাভালিনের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ালেসকে আদালতে উপস্থিত হওয়ার শর্তে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বুধবার ছেড়ে দিয়েছে। তবে অপর দুই অভিযুক্ত কানাডার বাইরে থাকায় তাদের গ্রেপ্তার করা যায়নি। আরসিএমপি’র এক বিবৃতিতে বলা হয়, পদ্মা সেতুর নির্মাণ তদারকের ৫ কোটি ডলারের কাজ আদায়ে ঘুষের ষড়যন্ত্রে নতুন ৩ জন জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে জুলফিকার আলী ভূঁইয়া কানাডিয়ান নাগরিক ব্যবসা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাংলাদেশে যুক্ত এবং সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বাংলাদেশের একজন সুপরিচিত লবিস্ট। অন্যজন কেভিন ওয়ালেস। অপরদিকে এই ৩ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আগে ২০১১ সালের ১লা সেপ্টেম্বর আরসিএমপি পদ্মা সেতু দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতায় টরন্টোর অদূরে ওকভিলে কেভিন ওয়ালেস নিয়ন্ত্রিত ডিভিশন এসএনসিটুতে হানা দেয় এবং সাবেক কর্মকর্তা ভারতীয় বংশোদ্ভূত রমেশ শাহ ও বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মোহাম্মদ ইসমাইলকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তাদের উভয়ের বিরুদ্ধে কানাডার ‘করাপশন অব ফরেন পাবলিক অফিসিয়াল অ্যাক্ট’ লঙ্ঘনের মামলাটি প্রাথমিক শুনানি শেষে চূড়ান্ত শুনানির জন্য সর্বোচ্চ প্রাদেশিক আদালত অন্টারিও সুপিরিয়র কোর্ট জাস্টিসে বিচারাধীন রয়েছে। ইতিমধ্যে মোহাম্মদ ইসমাইল এসএনসি-লাভালিনের বিরুদ্ধে ‘রংফুল ডিসমিসাল’ বা বিনা দোষে চাকরিচ্যুতির একটি ভিন্ন দেওয়ানি মামলা করেছেন। এই মামলায় রমেশ শাহ’র বিরুদ্ধে মোহাম্মদ ইসমাইলের অভিযোগ, তারা উভয়ে ২০০৭ সালে একত্রে গায়ানা রাষ্ট্রে একটি প্রকল্পে কাজ করেছেন। এখান থেকে ইসমাইল রমেশের হয়রানি, ভয়ভীতি ও ‘ক্যালাস’ বা ঔদাসীন্য আচরণ উপেক্ষা করে গেছেন। তাতে ইসমাইল মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ হয়েছেন। এছাড়াও ঘুষের সঙ্কেত ‘প্রজেক্ট কনসালটেন্সি কস্ট’ বা সংক্ষেপে ‘পিসিসি’ তারই অধিকর্তা রমেশের উদ্ভাবিত। এ বছর জুনে কেভিন ওয়ালেস নিজেও এসএনসি-লাভালিনের বিরুদ্ধে ‘রংফুল ডিসমিসাল’ মামলা করেছেন। ওই মামলায় কেভিন ওয়ালেসের দাবি, ২০১২ সালের ডিসেম্বরে পাবলিক রিলেশন স্ট্র্যাটেজিক কারণে তিনি চাকরিচ্যুত হয়েছেন এবং এসএনসি-লাভালিনের অন্য কর্মকর্তার ‘রংডুয়িং’ বা অপরাধপূর্ণ কাজ তার জ্ঞাতসারে হয়নি। সেই জবাবে এসএনসি-লাভালিন কোর্টকে জানিয়েছে, চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রে তিনি অবিশ্বস্ত হয়েছেন ও তার অগোচরীভূত কাগজপত্রে অন্যরা অনৈতিক ব্যবসায়িক কর্মে জড়িয়েছেন। গত বুধবার এসএনসি-লাভালিন তার গ্রেপ্তার বিষয়টি স্বীকার করলেও অন্য কোন মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছে। এদিকে গবেষণাগত কারণে রমেশ শাহ ও মোহাম্মদ ইসমাইলকে কেন্দ্র করে চলমান পদ্মা সেতু দুর্নীতি মামলার সকল প্রমাণাদি কোর্ট থেকে সিবিসি ও জাতীয় দৈনিক গ্লোব অ্যান্ড মেইল সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। তারা ভিন্ন এক গবেষণায় দেখিয়েছে, কেভিন ওয়ালেসের ডিভিশন ‘এসএনসিটু’ বাংলাদেশের বাইরে গোপন কোড ‘পিসিসি’ বা ‘সিসি’-কে ‘প্রজেক্ট কনসালটেন্সি কস্ট’ হিসেবে নাইজেরিয়া, জাম্বিয়া, উগান্ডা, ভারত এবং কাজাখস্তানের প্রকল্পের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছে।
তদন্তে খুশি অর্থমন্ত্রী
পদ্মাসেতু নিয়ে কানাডা পুলিশের তদন্ত রিপোর্টে খুশি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুুল মুহিত। গতকাল দুপুরে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরাসরি হজ ফ্লাইট চালুর পর সাংবাদিকদের কাছে অর্থমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে সন্তোষ প্রকাশ করেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এসএনসি-নাভালিনের সাবেক কর্মকর্তা কেভিন ওয়ালসকে আসামি না করায় আমি আগেই আপত্তি জানিয়েছিলাম। ওই সময় বলেছিলাম, তাকে মাফ করার কোন সুযোগ নেই।’ সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সে বাংলাদেশে সন্দেহভাজন ব্যক্তি। তাকে ওখানে অভিযুক্ত করায় ভাল হয়েছে।’
আবুল হাসানকে নজরদারিতে
রাখা হয়েছে
সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণ পেলে চার্জশিটে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছে দুদক। আবুল হাসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে কানাডা পুলিশ পদ্মা সেতু দুর্নীতির অভিযোগ এনে মামলা দায়েরের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর কমিশনার সাহাবুদ্দিন চুপ্পু গতকাল আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় একথা বলেন। তিনি বলেন, কানাডা পুলিশের এই তদন্ত আমাদের অনেক কাজে আসবে। কেভিন ওয়ালেসকে আসামি করা প্রসঙ্গে চুপ্পু বলেন, এটা আমাদের সাফল্য। কারণ কেভিন ওয়ালেস আমাদেরও আসামি। কানাডা আবুল হাসানকে আসামি করেছে আপনারা বাদ দিয়েছেন- এটাতে কি বিতর্ক উঠবে না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটাতে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে না, উজ্জ্বল হবে।
অভিযোগের ভিত্তি
নেই: আবুল হাসান
পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে কানাডার আদালতের দেয়া অভিযুক্তদের তালিকায় নাম থাকায় সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। কানাডার সিবিসি নিউজে প্রকাশিত সংবাদে তিনি তার নাম দেখেছেন উল্লেখ করে বলেন, তারা যে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছেন তার কোন ভিত্তি নেই।