Wednesday, 18 September 2013

আবদুল কাদের মোল্লার দন্ড ও কয়েকটি প্রশ্ন


19 Sep, 2013
জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় ঘোষনার পর কয়েকটি প্রশন বার বার মনে পড়ছে। ‘ট্রুথ ইজ নো ডিফেন্স’ ইংরেজী ৪টি শব্দের এই বাক্যটি ঘুরপাক খাচ্ছে মনের ভেতরে। এই বাক্যটি খোদ আপিল বিভাগের বিচারপতিরা বিচারের আসনে বসেই অত্যন্ত দাম্ভিকতার সঙ্গে উচ্চারন করেছিলেন। দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ও আমাকে ২০১০ সালের ১৮ আগস্ট দন্ড দেয়ার আগে এটি উচ্চারণ করেছিলেন আপিল বিভাগ। আদালত অবমাননার মামলার শুনানীতে আমার দেশ সম্পাদক যখন আমার লেখা ‘চেম্বার মানেই সরকার পক্ষে স্টে’ শিরোনামে প্রতিবেদনের পক্ষে প্রমান উপস্থাপন করছিলেন তখন আপিল বিভাগ এ মন্তব্যটি করেছিল।
সুপ্রিমকোর্টের অনেক সিনিয়র আইনজীবী সহ শতাধিক আইনজীবী সেদিন উপস্থিত ছিলেন। কেউ এই বাক্যটির প্রতিবাদ করেননি। তখন ধরে নিয়েছিলাম সত্য উদঘাটন করা সুপ্রিমকোর্টের কাজ নয়। সত্য ন্যায় বিচারের ভিত্তি হতে পারে না। সত্য যতই সত্য হোক সেই প্রমান কাজে লাগবে না। আদালত যেটা চাইবে সেটা-ই হবে। সত্য আসলে ডিফেন্স নয়। না হলে কী আপিল বিভাগ বিচারকের আসনে বসে বলতে পারে ট্রুথ ইজ নো ডিফেন্স। সত্য উদঘাটন করা সুপিমকোর্টের কাজ হলে আইনজীবীরা অন্তত এই বাক্যটির প্রতিবাদ করতেন। যেহেতু আইনজীবীরাও চুপ করে বসে ছিলেন আমরা ধরে নিয়েছি আসলেও আপিল বিভাগে সত্য ডিফেন্স নয়।
আবদুল কাদের মোল্লার মামলায়ও নানা রকম কথা প্রচারিত রয়েছে। তিনি আদৌ রাজাকার ছিলেন নাকি মুক্তিযোদ্ধ ছিলেন এনিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি একটি টকশো অনুষ্ঠানে বলেছিলেন আবদুল কাদের মোল্লা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাঁর কমান্ডার কে ছিল সেটাও তিনি সেই অনুষ্ঠানে জানিয়েছিলেন। ট্রায়াল কোর্ট শোনা সাক্ষীর ভিত্তিতে আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন দন্ড দিয়েছিল।
আদালতের বাইরে চাউড় রয়েছে আবদুল কাদের মোল্লা রাজাকার নন, ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। যেমনটা বলেছেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি। কোনটা সত্য! এর বাইরে একেবারে প্রামান্য এবং বাস্তব সত্য হচ্ছে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে আবদুল কাদের মোল্লা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন সমাপ্ত করেছেন। তাঁর ডিপার্টমেন্টে তিনি প্রথম শ্রেনীতে প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় এতবড় কসাই রাজকার হয়ে থাকলে ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দাপটের সঙ্গে অধ্যয়ন সমাপ্ত করার কথা নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শেষে তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থিত উদয়ন স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। কসাই রাজাকার হয়ে থাকলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের পরপর তখন-ই উদয়ন স্কুলে চাকির পাওয়ারও কথা নয়। তখন শেখ মুজিবুর রহমানের দপুটে শাসন চলছিল। এত বড় কসাই রাজাকার শেখ মুজিবের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেনীতে প্রথম তারপর উদয়ন স্কুলে চাকির প্রাপ্তি ! বিষয়টা যেন কেমন লাগে।
আবদূল কাদের মোল্লার স্ত্রীর একটি স্টেটমেন্ট অনুযায়ী শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে চাকরিও দিয়েছিলেন। সেটা সত্য হয়ে থাকলে আর আবদুর কাদের মোল্লাহ কসাই রাজাকার হলে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে চাকির দিলেন কেমন করে! রাজাকার হলেতো অন্তত তাঁকে চাকরি দেয়ার কথা নয়। এছাড়া ১৯৭৭ সালে আবদুল কাদের মোল্লাহ রাইফেলস্ স্কুল এন্ড কলেজে চাকরি করেন এবং ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তখন পর্যন্ত কিন্তু আবদুর কাদের মোল্লাহ এত বড় কসাই রাজাকার ছিলেন বলে কেউ শোনেননি।
মুক্তিযুদ্ধের পরপর-ই চিহ্নিত রাজার ও দালালদের বিরুদ্ধে দালাল আইনে বিচার শুরু হয়েছিল। তখন হাজার হাজার লোককে দালাল আইনে গ্রেফতার করা হয়। সেই হাজার হাজার মানুষের মধ্যে কিন্তু আবদুল কাদের মোল্লার জায়গা হয়নি। এত বড় কসাই রাজাকার হয়ে থাকলে আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে তখন কেন একটি মামলা বা একটি জিডিও কোন থানায় দায়ের হয়নি! রাজকারের তালিকায় ঠাঁই হলো ২০১০ সালে এসে। আবদুল কাদের মোল্লার মানবতা বিরোধী অপরাধী হলেন ২০১০ সালে। কিন্তু দালাল আইনে যখন হাজার হাজার লোক গ্রেফতার হলেন, বিচার শুরু হলো তখনতো তাঁর বর্তমান দল জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় ছিল না। ১৯৭২ সালের পর যখন দালাল আইনে বিচার চলছিল তখনতো মুক্তিযুদ্ধের স্যোল এজেন্ট দাবীদার আওয়ামী লীগ-ই ক্ষমতায় ছিল। তখন কেন আবদুল কাদের মোল্লাকে গ্রেফতার বা তাঁর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ কোথায়ও দায়ের করা হয়নি। এটাতো বলার সুযোগ নেই বৈরী সরকার ক্ষমতায় থাকার কারনে তখন অভিযোগ দায়ের করা যায়নি। তবে তখন কেন এত গুলো হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির নামে কোন মামলা হয়নি?
আরেকটি বিষয় এখানে প্রশ্ন জাগে। আবদুল কাদের মোল্লা ছাত্র জীবনে দীর্ঘ সময় প্রগতির দাবীদার ছাত্র ইউনিয়ন করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নেতা ছিলেন তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা রাশেদ খান মেনন ও মতিয়া চৌধুরী। স্বাধীনতার পর পর কিন্তু আবদুল কাদের মোল্লার নেতা মতিয়া চৌধুরী মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বানিয়েছেন। কিন্তু হালে তিনি বড় আওয়ামী লীগার। আর তাঁরই এক সময়ের রাজনৈতিক অনুজ আবদুল কাদের মোল্লাহ হলেন কসাই রাজাকার! রাশেদ খান মেনন এবং মতিয়া চৌধুরী তাদের রাজনৈতিক অনুজ সম্পর্কে কী বলবেন! তারা কী বুকে হাত রেখে বলতে পারবেন আবদুল কাদের মোল্লাহ তাদের ছাত্র রাজনীতির অনুজ ছিলেন না! এজন্যই বার বার আমার হৃদয় ক্যম্পাসে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে সুপ্রিমকোর্টের সেই অমীয় বানী ‘ট্রুত ইজ নো ডিফেন্স’।
এই কথা বলে আমার প্রিয় সম্পাদক ও আমাকে দন্ড দেয়ার পর জ্যষ্ঠতম আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক উল হকের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম কোর্টের ভেতরে-ই। স্যার এটা কেমন রায় হলো? উত্তরে তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে বলে ছিলেন ‘আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করো তোমাদের ফাঁসি দেয়নি’! আজ মনে হচ্ছে তা-ই সুপ্রিমকোর্ট চাইলে ফাঁসি দিতে পারতো।
আবদুল কাদের মোল্লার ট্রায়ালের সময় কোন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী নেই। সবাই শোনা কথা জানিয়েছেন ট্রায়ালকোর্টে। শোনা কথার সাক্ষীতে চরম দন্ড হতে পারে সেটা বোধ হয় আমাদের এই বাংলাদেশে-ই সম্ভব। আরো একটি প্রশ্ন জাগে, এত গুলো লোক হত্যাকেন্ডর দাবীতে আবদুল কাদের মোল্লাকে শোনা সাক্ষীর ভিত্তিতে প্রথম যাবজ্জীবন এবং পরবর্তিতে ফাঁসির দন্ড হল। এত গুলো লোককে যিনি হত্যা করতে পারেন না তাঁর হুকুমে হত্যাকান্ড সংঘঠিত হতে পারে তিনিতো বিরাট কিছু। এতগুলো হত্যাকাান্ডের সঙ্গে যিনি জড়িত মুক্তিযুদ্ধের পরপর তাঁর নাম উঠে আসল না কেন? আবদুল কাদের মোল্লার হুকুমে যারা হত্যাকান্ড গুলো সংঘটিত করেছে তাদের একজনেরও নাম ঠিকানা পাওয়া গেল না! আবদুল কাদের মোল্লাহ একাই শুধু দায়ী হলেন! বিচার শুধু একজনের হবে! বাকীরা কোথায়! রাজকার, আল বদরের সদস্য সবাইতো বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন। তারা তো বাংলাদেশেই রয়েছেন। তাঁর সহযোগি একজনকেও খুজে পাওয়া গেল না! নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের যে অভিযোগ করা হচ্ছে সেটাই সত্য?
আবদুল কাদের মোল্লাকে প্রথমে ট্রায়াল কোর্ট (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল) যাবজ্জীবন দন্ড দিয়েছিল। এই দন্ড ঘোষণার পর ভারতীয় পত্র পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী ভারতের টাকায় শাহবাগে আন্দোলনের খুটি বসানো হয়। গণজাগরনের নামে জড়ো করা হয় হাজার হাজার মানুষ। দিনের পর দিন গুরুত্বপূর্ন রাস্তা অবরোধ করে রাখে তারা। বিরিয়ানি খাইয়ে টাকা বিতরন করে জিয়ে রাখার চেস্টা করা হয় সেই গণ জাগরণ। সেখানে দিনে-রাতে তরুন, তরুণীদের অবাধ মেলা-মেশার সুযোগের কথা না-ই বা বললাম। তাদের দাবী ছিল আবদুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসি দিতে হবে। বিচার নয়, ফাঁসি চাই সেই শ্লোগান ছিল শাহবাগে। সেই দাবী পূরনের জন্য-ই সংসদে আইন হল। মূল বিচার সমাপ্তির পর শুধু একজনকে ফাঁসি দেয়ার নিমিত্তে সংসদে আইন তৈরি হল শাহবাগের দাবীতে। সেই দাবী অনুযায়ী গত মঙ্গলবার আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় হল। এটাকে ইনসাফ বা ন্যায় বিচারের কোন স্থরে স্থান দেয়া যায় সেই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে হয়ত কোন দিন নির্ধারিত হবে।

লেখক: অলিউল্লাহ নোমান, দৈনিক আমার দেশ-এর বিশেষ প্রতিনিধি, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত