Tuesday, 13 August 2013

আ.লীগের রমরমা খাম্বাবাণিজ্য : শেষ বেলায় সরকারি ক্রয়ে হিড়িক

সরকারের শেষ সময়ে এসে কোনো ধরনের নিয়মনীতি ছাড়াই কেনাকাটায় হাজার হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে আজ আবার এমন কিছু প্রকল্পে বড় অঙ্কের বরাদ্দ দিতে যাচ্ছে মন্ত্রিপরিষদ, যেসব প্রকল্পের সমীক্ষাই এখন পর্যন্ত শেষ হয়নি। অন্যদিকে বিদ্যুত্ খাতের বড় কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন না হলেও, এই খাতের খাম্বাবাণিজ্য এখন রমরমা। উদ্যোগ নেয়া হয়েছে নতুন করে আরও ৬০ হাজার ৬২৫টি খুঁটি (বৈদ্যুতিক খাম্বা) কেনার। চারদলীয় জোট সরকারের পাঁচ বছরে ১০ লাখ খুঁটি কেনা হলেও, বর্তমান সরকারের সাড়ে চার বছরে সরকারি বিভিন্ন বিদ্যুত্ বিতরণ কোম্পানি এরই মধ্যে প্রায় ১২ লাখ খুঁটি কিনেছে। এ বাণিজ্যের সঙ্গে নামে-বেনামে জড়িয়ে পড়েছেন সরকারি দলের রাঘব-বোয়ালরা।
গত ২৯ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ সভার বৈঠকে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেয়া হয় সাতটি দেশ থেকে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য। এর মাত্র দুই সপ্তাহ পরই আজ আবার ১০টি প্রকল্পে কেনাকাটার প্রস্তাব উঠছে মন্ত্রিসভার বৈঠকে। আর এসব প্রকল্পের বেশিরভাগই স্বপ্নবিলাস প্রকল্প, যার বাস্তবায়ন হবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে।
১৮ লাখ ৮ হাজার পল্লী গ্রাহকের জন্য বিভিন্ন সাইজের ৬০ হাজার ৬২৫টি বিদ্যুতের খুঁটি কেনার প্রস্তাব উঠছে আজ। পর্যাপ্ত বিদ্যুত্ উত্পাদন করতে ব্যর্থ সরকার বিতরণ লাইন সম্প্রসারণে রহস্যজনক কারণে বেশ উত্সাহ দেখিয়ে চলেছে। পল্লীবিদ্যুত্ সমিতিগুলো যেখানে গ্রামের গ্রাহকদের দিনে-রাতে পাঁচ ঘণ্টাও বিদ্যুত্ দিতে পারছে না, সেখানে নতুন গ্রাহককে সংযোগ দেয়ার নামে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। কেবল খাম্বাবাণিজ্যই নয়, প্রায় এক লাখ কিলোমিটার তার ও ২৪ লাখ বৈদ্যুতিক মিটার লাগানো, ট্রান্সফরমার স্থাপনসহ বিশাল বাণিজ্যে রীতিমত হরিলুট চলছে। এসব কাজ সিন্ডিকেট করে সরকারি দলের প্রভাবশালীরা ভাগবাটোয়ারা করে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০০১-০২ থেকে ২০০৫-০৬ অর্থবছর পর্যন্ত চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে আরইবি বিভিন্ন মাপ ও মানের ১০ লাখ ৩৩ হাজার ৪৮১টি খুঁটি কিনেছিল। এতে মোট খরচ হয়েছিল ৮৮৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এ হিসাবে প্রতিটি খুঁটির গড় দাম পড়েছে ৮ হাজার ৬০১ টাকা। আরইবি জানায়, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের মে মাসে আরইবি আর-৪১ মাপের খুঁটি কেনে ৪ হাজার ৪৬২ টাকায়। আর-৪২ মাপের খুঁটি কেনা হয় ৬ হাজার ৪২৬ টাকা দরে। এই দর আগের জোট সরকারের সময়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেক বলে তখন দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই আরইবি এখন খুঁটি কিনছে সাইজভেদে ১০ থেকে ১৬ হাজার টাকা দরে, যা তত্ত্বাবধায়ক আমলের তুলনায় দ্বিগুণ কিংবা তারও বেশি।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) কেনা মোট খুঁটির ৭০ ভাগ সরবরাহ করেছে আওয়ামী লীগ ঘরানার ব্যবসায়ী কাজী শাহেদ আহমদের মালিকানাধীন জেমকন গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। আবার আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-২০০০ আমলে আরইবি’র কেনা সব খুঁটিই সরবরাহ করে এ প্রতিষ্ঠান। মূলত পিডিবি থেকে আরইবির অধিগ্রহণ করা বিতরণ লাইনের খুঁটি পরিবর্তন করতে গিয়ে বিগত বিএনপি জোট আমলে ৮৭৯ কোটি টাকার কনক্রিট খুঁটি কেনা হয়। জেমকন গ্রুপ একাই তখন ৫১১ কোটি ৩০ লাখ টাকার ‘খাম্বা’ সরবরাহ করে। গিয়াসউদ্দিন আল-মামুনের খাম্বা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করে ১০০ কোটি টাকার খুঁটি। কনফিডেন্স গ্রুপ সরবরাহ করে ১১৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকার খুুঁটি। এছাড়া কনটেক গ্রুপ, টেসকো পাওয়ার, রয়াল গ্রিন, লুমেক লুম্বার বাকি খুঁটি সরবরাহের কাজ পায়। এর মধ্যে একমাত্র গিয়াসউদ্দিন মামুনের খাম্বা গ্রুপ ছাড়া বাকি কোম্পানিগুলোর মালিক আওয়ামী ঘরানার। কাজী শাহেদের জেমকন গ্রুপ থেকে বেরিয়ে কয়েকজন আলাদা কোম্পানি গঠন করে খুঁটির ব্যবসায় করেন। তারা জোট আমলে সিন্ডিকেট করে কাজ পেয়েছেন। গত তত্ত্বাবধায়ক আমলে জোট সরকারের খাম্বা দুর্নীতিসহ বিদ্যুত্ খাতের দুর্নীতি তদন্তে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি আবদুল মতিন পাটোয়ারীর নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আজও আলোর মুখ দেখেনি।
আরইবি সূত্র জানায়, বর্তমানে তাদের জানামতে দেশে খুঁটি তৈরির প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৮ থেকে ২০টি। এর মধ্যে দু-একটি বাদে সব প্রতিষ্ঠানের মালিক বর্তমান সরকারি দলের মতাদর্শের। সরকারের উচ্চপর্যায়ের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দানকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা চার-পাঁচটি। সিন্ডিকেট করে এরাই বেশিরভাগ খুঁটি সরবরাহের কাজ পেয়েছে বলে আরইবি’র নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
আজকের মন্ত্রিসভার বৈঠকে অন্যান্য কেনাকাটার মধ্যে মিরপুরে সরকারি ও আধা-সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণের প্রকল্প উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর জন্য ব্যয় হবে ১৩১ কোটি ৪ লাখ ৬৯ হাজার ২৪৭ টাকা। ইতোমধ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে বিক্রির জন্য মোহাম্মদপুরে একদফা ফ্ল্যাট তৈরির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
রেলওয়েকে আরও উন্নত করার নামে বেশ কয়েকটি প্রকল্পের আওতায় কাজের ঠিকাদার নির্বাচন করা হচ্ছে আজকের ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকে। পাশাপাশি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রকল্পের আওতায় দর্শনা-ঈশ্বরদী- সিরাজগঞ্জ বাজার সেকশনের রেললাইন উন্নত করতে কাজের ঠিকাদার নির্বাচনের প্রস্তাব উঠছে, যেখানে ব্যয় হবে ৩২ কোটি ১৮ লাখ টাকা। একইসঙ্গে ভারতীয় ঋণের চুক্তির আওতায় ভৈরব ও তিতাস রেলওয়ে ব্রিজের সঙ্গে অ্যাপ্রোচ রেললাইনের কাজের ঠিকাদার নির্বাচনের বিষয়টিও আজ গুরুত্ব সহকারে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর জন্য ব্যয় হবে ১৯১ কোটি ৬৩ লাখ ৪৬ হাজার ৩৯৯ টাকা।
আজকের সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বৈঠকের দুই ঘণ্টা আগে বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক, যে বৈঠকে ১২টি বিষয়ের মধ্যে ৮টি বিষয় হচ্ছে—স্বপ্নবিলাস প্রকল্প। যে প্রকল্পগুলোর বেশিরভাগের এখনও সমীক্ষাই শুরু হয়নি। এসব প্রকল্পের মধ্যে আছে, ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে হাসপাতাল সংলগ্ন অব্যবহৃত জমির ওপর ৫০ আসনের একটি মেডিকেল কলেজ ও ৫০ আসনের একটি নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপন। পাশাপাশি বিদ্যমান রেলওয়ে হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ। এই প্রকল্পের জন্য ব্যয় হবে আটশ’ কোটি টাকা। এছাড়া চট্টগ্রামে রেলওয়ে হাসপাতাল সংলগ্ন ৫০ আসনের একটি মেডিকেল কলেজ ও ৫০ আসনের নার্সিং ইনস্টিটিউট। পাবনা জেলার পাকশী রেলওয়ে হাসপাতালেও একই ধরনের প্রকল্প। খুলনায় একটি আধুনিক মেডিকেল কলেজ স্থাপন। সৈয়দপুরে একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপন। এছাড়া যমুনা নদীর ওপর বিদ্যমান বঙ্গবন্ধু সেতুর সমান্তরাল রেলসেতু নির্মাণ। পাশাপাশি যমুনা নদীর ওপর ফুলছড়ি-বাহাদুরাবাদ রেলসেতু নির্মাণ।