Sunday, 22 June 2014

বিদ্যুতের খাম্বা কিনতে লুটপাট

অবিশ্বাস্য দামে কেনা হচ্ছে কাঠ ও সিমেন্টের (এসপিসি পোল) তৈরী খাম্বা। প্রতিটি এসপিসি পোল ১৯ হাজার ৪২০ টাকায় আর কাঠের খাম্বা ১৮ হাজার ৯০৩ টাকায় কেনা হচ্ছে। এমন বেশি দামে খাম্বা কিনতে গিয়ে কোটি কোটি টাকার লুটপাট শুরু হয়েছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (পবিবো)-এ। চলছে ঠিকাদারদের সুবিধামতো টেন্ডার প্রক্রিয়া। কাঠ ও সিমেন্টের খাম্বা কিনতে এসব টেন্ডারে ঘুরেফিরে কয়েকটি মুখচেনা কোম্পানি অংশ নিচ্ছে। তারা দর উল্লেখ করছে প্রাক্কলিত দরের চেয়ে অনেক বেশি। এরপরও প্রস্তাবগুলো পার করে দিচ্ছে খাম্বা কেনা সংক্রান্ত দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি। কোন কিছুতেই যেন সমস্যা হচ্ছে না। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সব কিছু ম্যানেজ হয়ে যাচ্ছে। গত ১৫ই জুন দুই লাখ ৪১ হাজার ৭১০টি খাম্বা কেনার প্রস্তাব সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। 


গতকাল দুইটায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে খাম্বা কেনার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য ওঠে। এখন প্রস্তাবগুলো অনুমোদন করিয়ে নেয়ার জন্য রিহার্সেল শুরু হয়েছে। পবিবো সূত্রে জানা গেছে, এসপিসি পোল কেনার দরপত্রে মেসার্স কনফিডেন্স পাওয়ার লিমিটেড এবং মেসার্স কনটেক কনস্ট্রাকশন লিমিটেড মূল দরপত্রদাতা থেকে অন্য আরও তিনটি কোম্পানিকে সহযোগী হিসেবে রেখেছে। এসপিসি পোল কেনার সবগুলো দরপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাব-প্যাকেজ নং ৪৮-১১৩-এর দরপত্রে ৩২ হাজার ২৫০টি পোল কিনতে ৬২ কোটি ৫৬ লাখ ৫৪ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা নির্বাচিত হয়েছে মেসার্স কনফিডেন্স পাওয়ার লিমিটেড। এ দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা ছাড়া মেসার্স চরকা এসপিসি পোলস লিমিটেড এবং মেসার্স ক্যাসেল কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড অংশ নেয়। সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে দ্বিতীয় ও তৃতীয় সর্বনিম্ন দরদাতার পার্থক্য খুব বেশি নয়। এছাড়া, এ প্যাকেজে প্রাক্কলিত দরের সঙ্গে সর্বনিম্ন দরদাতার পার্থক্য ১০ কোটি টাকার বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমঝোতার মাধ্যমে দর উল্লেখ না করলে এত বেশি দাম হওয়ার কথা নয়। অন্যদিকে প্যাকেজ নং ৪৮-১১৪ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এ দরপত্রেও মেসার্স কনটেক কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, মেসার্স কনফিডেন্স পাওয়ার লিমিটেড এবং মেসার্স রয়েল গ্রীন প্রোডাক্টস লিমিটেড অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে ৩২ হাজার ২৫০টি এসপিসি পোল কেনার জন্য সর্বনিম্ন দরদাতা নির্বাচিত হয়েছে মেসার্স কনটেক কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। তারা দর দিয়েছে ৬২ কোটি ৬৩ লাখ ৪০ হাজার ১০০ টাকা। এসব দরপত্রে অংশ নেয়া কোম্পানিগুলোর দরও কাছাকাছি। সর্বনিম্ন দরদাতা কোম্পানি প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ১৮ দশমিক ৭৪ ভাগ বেশি দর দিয়েছে। সব মিলিয়ে প্রাক্কলিত দরের সঙ্গে তাদের দামের পার্থক্য ১০ কোটি ১০ লাখ টাকার বেশি। 

পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, কাঠের খাম্বা কেনার দরপত্রে অংশ নেয় মাত্র একটি কোম্পানি। ১২,৬৫০টি খাম্বা কিনতে মেসার্স নরডিক উডস লিমিটেড ২৫ কোটি ৮০ লাখ ৫০ হাজার টাকা দর দিয়েছে। তাদের দাম প্রাক্কলিত দরের চেয়ে তিন কোটি টাকা বেশি অর্থাৎ শতকরা ৭ দশমিক ৯১ ভাগ। এ দরপত্র নিয়েও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে নানা কথা চালু রয়েছে। অন্যদিকে আলাদা কয়েকটি দরপত্রের মাধ্যমে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৫৬০টি এসপিসি পোল কেনা হচ্ছে। এসব পোল কেনা নিয়েও নানা কথা রয়েছে। ওদিকে পল্লী এলাকায় ১৮ লাখ গ্রাহকের মধ্যে বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দিতে জিওবি অর্থায়নে একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। ২০১২ সালের ৩১শে জানুয়ারি প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায়। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয় ২০১৫ সালের ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৪১৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এ প্রকল্পের আওতায় দেশের ৭০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন ৪৫৩টি উপজেলায় নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ, নতুন ৩৩ কেভি লাইন নির্মাণ, বিদ্যমান লাইনের নবায়ন বা পুনর্বাসন, নতুন ৩৩/১১ কেভি সাব-স্টেশন নির্মাণ, পুরনো ৩৩/১১ কেভি সাব-স্টেশনের ক্ষমতা বাড়ানো, পূর্ত নির্মাণ কাজ এবং ভূমি অধিগ্রহণে ব্যয় করা হচ্ছে ডিপিপিতে উল্লেখ করা অর্থ। পবিবো সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ১৩৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২৩০ কোটি টাকা দিয়ে মালামাল কেনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব অর্থের মধ্যে বেশির ভাগ অর্থেরই অপচয় হচ্ছে। খুব একটা কাজ হচ্ছে না।
http://mzamin.com/details.php?mzamin=+MjkxNjc%3D&s=Mw%3D%3D